হোম গদ্য গ্রাম্যগানের জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম্যগান

গ্রাম্যগানের জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম্যগান

গ্রাম্যগানের জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম্যগান
280
0

গ্রাম্যগান, লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন, চর্চা করেছেন, বাংলাভাষী এমন সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [১৮৬১-১৯৪১] থেকে শুরু করে অনেকেই আছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশের এসব চর্চা-গবেষণার কারণ ও উদ্দেশ্য আছে, বাইরে থেকে বোধ করা প্রেরণার ব্যাপার-স্যাপার আছে। এগুলো অধিকাংশ সময় স্বয়ংক্রিয় বা স্বয়ম্ভূ নয়; স্বভাবজ নয়। গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখব, এসবের পেছনে কখনো ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়ের দেশকালজাত জাতীয়তাবাদী আবেগ কাজ করেছে, কখনো ইউরোপীয় চিন্তাজাত শেকড়-সন্ধানের মনোবৃত্তি কাজ করেছে। অর্থাৎ গ্রাম্যগান ও লোকসাহিত্যের অপরাপর শাখার জগতে বিচরণকারী অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক বাইরে থেকে প্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত। কেউই লোকজীবনের ভেতরবাড়ির একজন হয়ে এখানে থিতু হন নি। তারা যেন লোকজীবনের আত্মীয়। কিন্তু এ যেন সেই আত্মীয়, যে লেখাপড়া শিখে শহুরে হয়েছে, যার শান-শওকত হয়েছে, ঠাটবাট বেড়েছে এবং একই সাথে মাটির সাথে দূরত্বও বেড়েছে। সোজা কথায় আত্মার সূত্রটি কেটে গিয়েছে। তিনি মূলত আধুনিক লিবারেল। তিনি এর গুরুত্ব বোঝেন ও স্বীকার করেন। কিন্তু তার এই আত্মীয়টির প্রতিষ্ঠার জন্যে কারো সাথে কোনো সংগ্রামে যাবেন না। লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি বা গ্রাম্যগান নিয়ে তাদের কাউকেই ‘আধুনিকতা’ বা আধুনিক সাহিত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করতে দেখাও যায় নি। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন [১৯০৩-১৯৭৬] ঠিক এর উল্টো। গ্রাম্যগান, লোকসংস্কৃতি, লোকজীবনের সাথে জসীমউদ্‌দীনের শ্লিষ্টতা কোনো আলগা বিষয় নয়। তিনি লিবারেল নন, জাতীয়তাবাদী আবেগে কম্পিতও নন। জসীমউদ্‌দীন এই জীবনেরই একজন হয়ে কাজ করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, চর্চা করেছেন।

১.
পূর্ব বাংলার গ্রাম্যগানের গর্ভ থেকে জসীমউদ্‌দীন [১৯০৩-১৯৭৬]-এর কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিল—একথা অনুমানসিদ্ধ নয়। জসীমউদ্‌দীনের বিভিন্ন আত্মজৈবনিক রচনার পরতে পরতে এর সাক্ষ্য রয়েছে। বাল্যকাল থেকেই গ্রাম্যগান জসীমউদ্‌দীনকে দারুণভাবে আকর্ষণ করত। এমনকি তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন—১৯৩৮ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত—তখনও ফরিদপুরে গেলে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে তার কাছে কবিগানের বায়না আসত। তিনি সেগুলোতে অত্যন্ত আগ্রহ ও আনন্দ সহকারে অংশগ্রহণ করতেন। এ-নিয়ে তার মনে কোনো হীনম্মন্যতা ছিল না। আধুনিক মানুষের মধ্যে পদ-পদবি ও শিক্ষার যে-একটা হামবড়া ব্যাপার থাকে—বিশেষত গানের প্রশ্নে—তা জসীমউদ্‌দীনের মধ্যে একেবারেই ছিল না। বরং তিনি যে কবিগান করেন, এ-নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের অহংকার কাজ করত। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এরকম সাহিত্যিক নেই যিনি সারাজীবন গ্রাম্যগান, গ্রাম্যসাহিত্য, গ্রামীণজীবন, গ্রামীণসংস্কৃতি নিয়ে নিরলস শুধু চর্চা আর অহংকারই করেন নি বরং নিজের যাবতীয় সাহিত্যকর্মের বিষয় আর প্রকরণকে গ্রামীণজীবনের আনাচ-কানাচের অনুগামী রেখেছেন।


আপনার রচিত নিমাই সন্ন্যাস গানটি যদি আমি আগে শুনিতাম তবে হয়তো আমার ‘কবর’ কবিতা রচনা করিতাম না।


জসীমউদ্‌দীনের কবি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সাথে গ্রাম্যগানের এক গভীর সম্পর্ক আছে। জসীমউদ্‌দীনের বয়স তখন সাত-আট বৎসর হবে। তিনি তার এক চাচার বিয়ের বরযাত্রী হয়ে যান শ্যামসুন্দরপুর গ্রামে। গ্রামটা তাদের বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে। বিয়েবাড়িতে রাতে ঘুমিয়ে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেছেন। সেই সাত সকালে ঘুমের আলস্যের মধ্যেই তার কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা হালকা ঢোলের বাদ্য। লোকের কাছে জিজ্ঞেস করে জানলেন, পাঁচচর গ্রামের জমিদারের কাছারিতে কবিগান হচ্ছে। জসীমউদ্‌দীন আর স্থির থাকতে পারলেন না। ঢোলের বাদ্য তাকে দিগ্বিদিক শূন্য করে ফেলল। ঠিক যেমন বীণ সাপকে দিগ্বিদিক শূন্য করে ফেলে। সেই সাত সকালে তিনি দূরাগত ঢোলের বাদ্য অনুসরণ করে এগোতে লাগলেন। ক্রমে ঢোলের বাদ্যের সাথে গানের অস্পষ্ট সুর কিশোরের কানে আসতে লাগল। জসীমউদ্‌দীন বলেছেন, ‘সেই সুর যেন আমাকে স্বপ্নাবিষ্টের মতো কবিগানের আসরের দিকে টানিয়া লইয়া চলিল।’ সেখানে গিয়ে কবি দেখলেন যম এবং সতীর পাঠ নিয়ে দুইজন কবি-গায়ক ‘জবাজবি’ করছেন। সেই আসরে কবিদের উপস্থিত বোল রচনা শুনে, পদের সাথে পদের মিল রচনা দেখে কবির ‘সর্ব দেহ-মন আলোড়িত হইতেছিল’। একটা অজানা ঘোর নিয়ে সেখান থেকে বেলা একটার সময় তিনি ফিরে আসেন আবার বিয়েবাড়িতে। এসে দেখেন বরযাত্রীরা বর-কনেকে সাথে নিয়ে তাদের গ্রামের গ্রামে রওনা দিয়েছেন। কোনো মতে কিছু খেয়ে নিয়ে তিনি আবার রওনা হলেন বরযাত্রীদের সাথে। কিন্তু এবার বালক বরযাত্রীদের মধ্যে না থেকে ইচ্ছে করে পেছনে পড়লেন। আর কবিগানের আসর থেকে শিখে আসা একটা গানের কলি জোরে জোরে বারবার ভাজতে লাগলেন। কবির ভাষ্যটা দেখা যাক—

বরযাত্রীরা অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছে। এখন আরও স্বাধীনতা। নাচিয়া নাচিয়া কেবল এই সুর গাহিতেছি। এইরূপ গাহিতে গাহিতে সুরের ভিতরে যেখানে নারে নারে করিতেছিলাম সেখানে যা-তা ইচ্ছামতো কথা জুড়িয়া দিয়া ছন্দের পরিমাপ বিষয়ে আমার মনে একটা ধারণা আসিল। তারপর হঠাৎ কথার সঙ্গে কথা আসিয়া কেমন করিয়া যেন একের সঙ্গে অপরের মিল হইয়া গেল। তখন আর আমাকে পায় কে; সারা পথ ইচ্ছামতো উপস্থিত বোল রচনা করিয়া গান গাহিতে লাগিলাম। সে কি আনন্দ! কথার সঙ্গে কথা আসিয়া যখন মিলের বন্ধন পরিতেছে, তাহার তালে তালে আমার বুক নাচিয়া উঠিতেছে।

ওই বাল্যবয়সেই জসীমউদ্‌দীন গ্রামের প্রবীণ কবিয়ালের সাথে কবিগান করে এই প্রশংসাও আদায় করেছিলেন যে, ‘এই ছেলেটি বাঁচিয়া থাকিলে একজন বড় কবিয়াল হইবে’। এরপর থেকে কবিগান এবং অপরাপর গ্রাম্যগানের প্রতি জসীমউদ্‌দীনের আগ্রহ দিনদিন বেড়েই চলেছে। একই সাথে অব্যাহত থেকেছে এসবের চর্চা। একারণে জসীমউদ্‌দীনের আত্মজীবনী আর বিভিন্ন স্মৃতিকথায় আমরা দেখব সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে গ্রাম্যগান ও কবিগানের অখ্যাত সব মানুষেরা। রহিম মল্লিক, যাদব সরকার, পরীক্ষিত, হরিচরণ পাটনী, ইসমাইল, হরি আচার্য, গুরুচরণ, কালিপদ, হরিবর, মনোহর, নিশিকান্ত, কবিরত্ন এম. এ. হক, হাজেরা, বিজয় সরকার, আইজদ্দি, এরোন ফকির, বোষ্টমী ঠুকুরুন, আজাহের, কানাই প্রমুখ কবিয়াল, পল্লিগানের গীতিকার ও গায়কদের সাথে জসীমউদ্‌দীনের আজীবন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণও নিহিত রয়েছে গ্রাম্যগানের প্রতি তার অসীম দরদ আর আকর্ষণ। এদের মধ্যে যারা লিখতেন তাদের রচনাকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। একটি উদ্ধৃতি লক্ষ করা যাক—

পরিণত বয়সে আমি একবার হরি আচার্য মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করিয়াছিলাম। তখন তিনি কবিগান ছাড়িয়া দিয়া সন্ন্যাসী হইয়া ঢাকা জেলার নরসিংদীতে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। কত আদর করিয়া তিনি আমাকে গ্রহণ করিলেন। তাঁহার রচিত কবির ঝংকার ও বঙ্গে কবিগান নামে দুইখানি পুস্তক আমাকে উপহার দিলেন। কবির ঝংকার দুই খণ্ড পুস্তকে আচার্য মহাশয়ের কবিগানগুলি প্রকাশিত হয়। বঙ্গে কবিগান পুস্তকে তিনি সারাজীবন যেসব কবিয়ালের সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন, তাহাদের কথা লিখিয়াছেন। আমি তাঁহাকে বলিলাম, “আপনার রচিত নিমাই সন্ন্যাস গানটি যদি আমি আগে শুনিতাম তবে হয়তো আমার ‘কবর’ কবিতা রচনা করিতাম না।”

কবিয়ালরা তো পুরো বাংলা সাহিত্যের আসরে খুবই গৌণ হিসেবে চিত্রিত হন। কবিয়ালদের সম্পর্কে এত উচ্চ ধারণা জসীমউদ্‌দীন ছাড়া আর কেউ পোষণ করেছেন বলে মনে হয় না। জসীমউদ্‌দীন তো তার এক আত্মজৈবনিক রচনায় কবিগানের কিছু ধুয়ার উল্লেখ এক জায়গায় বলেইছেন যে, ‘এইসব ধুয়ার সঙ্গে পদ রচনা করিতে করিতে আপনা হইতেই নানা ছন্দে কবিতা রচনা করিবার অভ্যাস লাভ করিলাম। কিন্তু তখনও আমি জানিতাম না, আমার এই উপস্থিত-রচিত বোলগুলি আমার অগোচরে কবিতা হইয়া যাইতেছে।’ জসীমউদ্‌দীন তো কবিয়ালই হতে চেয়েছিলেন; ঘটনা ফেরে হয়েছেন কবি। কিন্তু তার সাহিত্যকর্মের গভীরে কবিগানের স্বভাব রয়েছে। একারণে রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্‌দীনের কবিতার সাবলীলতা এবং ছন্দের সহজ গতির প্রশংসা করলে জসীমউদ্‌দীন বলেছিলেন—

ইহা যদি আমার গুণ হইয়া থাকে তবে এই শিক্ষা আমি পাইয়াছি আমার দেশের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত কবিয়ালদের কাছ থেকে। তাহারাই আমার কাব্য জীবনের প্রথম গুরু। সেই যাদব, পরীক্ষিত, ইসমাইল, হরি পাটনী, হরি আচার্য এঁদের কথা আমি যখন ভাবি আমার অন্তর কৃতজ্ঞতায় অশ্রুসিক্ত হইয়া ওঠে।১০

তার কাব্য-কবিতায় কাহিনির বিস্তারণ, ছন্দ আর ভাষার সারল্য, স্বতঃস্ফূর্ততা, গ্রামীণজীবনের একেবারে খাঁটি বাস্তবতার রূপায়ণ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মন-মনস্তত্ত্ব-সাহিত্যরুচি ইত্যাদির সাথে কবিগান বা অপরাপর গণ-সাহিত্যশাখার ঘনিষ্ঠ যোগ সহজেই চোখে পড়ে। জসীমউদ্‌দীনের কবিতার মধ্যে কবিগানের মার্জিত বাসনা আর তার যাপন-কাজ-চিন্তার মধ্যে কবিগানের প্রতি ব্যাকুল টান লক্ষ করেই কি তবে এক সময়ের রেডিও পাকিস্তানের সহকর্মী শামসুদ্দীন আবুল কালাম [১৯২৬-১৯৯৭] জসীমউদ্‌দীনকে ‘কবিয়াল-ভাই’ বলে ডাকতেন!১১

যেকোনো কবির বেড়ে ওঠার ধরনের সাথে, চারপাশের সাথে কবির সম্পর্কের ধরনের সাথে, কবির বাল্যকালের আগ্রহের বিষয়ের সাথে, ওই কবির পরবর্তী চিন্তার একটা গভীর যোগ থাকে। জসীমউদ্‌দীনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয় নি। জসীমউদ্‌দীনের বাল্যজীবনের দিকে দৃষ্টি ফেললে আমরা দেখি যে, তিনি বেড়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ সংস্কৃতির কোলেপিঠে। জসীমউদ্‌দীনের এক অন্ধ দাদা ছিলেন। নাম দানু মোল্লা। এই মানুষটির পেট যেন গিজগিজ করত গ্রাম্যগান, কেচ্ছা আর রূপকথায়। তার এসব কেচ্ছা ও রূপকথা এখনকার কেচ্ছা-রূপকথার মতো নয়। এগুলোর কাহিনিতে কথা খুব কমই থাকত। পুরোটাই প্রায় গান। গানের ভেতর দিয়ে এর কাহিনি এগিয়ে চলত। জসীমউদ্‌দীন সাত-আট বছর বয়স থেকেই ছিলেন এই অন্ধ দাদার ন্যাওটা। সারাদিন দাদার পেছনে লেগে থাকতেন আর বলতেই থাকতেন, ‘ও দাদা একটা কেচ্ছা বল, ও দাদা একটা কেচ্ছা বল না!’ অনেক সাধ্যসাধনার পর দাদা রাজি হতেন। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির উঠানে মাদুর পাতা হতো। বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ আসত, পান খাওয়া চলত। আর চলত গানবহুল কেচ্ছা অথবা রূপকথা। দাদার সাথে দোহার হিসেবে থাকত গ্রামের মানুষ আর স্বয়ং বালক জসীমউদ্‌দীন। রাতের বেলার সেই গাননির্ভর ‘মধুমালার কেচ্ছা’র আসরের বর্ণনা দিয়েছেন জসীমউদ্‌দীন এভাবে—

হরিণ শিকারে যাইয়া মধুমালাকে স্বপ্নে দেখিয়া মদন কুমার যখন মায়ের আঁচল ধরিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া গাহিতে লাগিল, ‘ও আমি যাব মা ধন/মধুমালার দেশে হে’, তখন আমাদের বালককণ্ঠের সঙ্গে দাদা আর গ্রামবাসীর কণ্ঠ মিলিয়া কি যে এক সুরের উন্মাদনা সৃষ্টি করিতে লাগিত তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। পদের শেষে মধুমালা কথাটিতে আসিয়া গানের সুর কি যে মধু ছড়াইয়া দিত তাহা যদি গাহিয়া শুনাইতে পারিতাম!১২

জসীমউদ্‌দীনের কবিজীবনের ওপর, গ্রাম্যগানের গীতিকার সত্তার ওপর, গ্রাম্যগানের সংগ্রাহক সত্তার ওপর এই দাদার গানের প্রভাব ছিল বেশ গভীর। জসীমউদ্‌দীনের ভাষায় শোনা যাক সেই কথা—

আমার কবিজীবনের প্রথম উন্মেষ হইয়াছিল এই দাদার গল্প, গান ও কাহিনীর ভিতর দিয়া। সেই ছোটবেলায়ই মাঝে মাঝে আমাকে গানে পাইত। নিজে মনোক্তি করিয়া ইনাইয়া বিনাইয়া গান গাহিয়া যাইতাম। দাদা একদিন একজনকে বলিতেছিলেন, “পাগলা গানের মধ্যে কি যে বলে কেউ শোনে না। আমি কিন্তু শুনি। মনোযোগ দিয়া ওর গান।” কি অন্তর্দৃষ্টি বলেই না আমার রচক-জীবনের প্রথম আকুল-বিকুলি তিনি ধরিতে পারিয়াছিলেন।১৩

জসীমউদ্‌দীন গ্রাম্যগানের এই সম্মোহন থেকে সারা জীবনেও বের হতে পারেন নি। সে চেষ্টাও তিনি করেন নি। তার প্রমাণ তার উত্তর জীবনের যাবতীয় সাহিত্যকর্ম, জীবন-যাপন আর কর্মতৎপরতার মধ্যে রয়েছে।

২.
জসীমউদ্‌দীন বাল্যকালে একবার বাড়ি ছেড়েছিলেন। সেটা ১৯২০ সালের কথা। তিনি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে চলে যান কলকাতায়। স্কুল ছাড়ার কারণ ছিল ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়া।১৪ কলকাতায় গিয়ে তিনি এক দুর্বিষহ সময় কাটান। কারণ তার হাতে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। আত্মীয়-পরিজনও তেমন ছিল না। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকার হকারি করে তার খাবারের ব্যবস্থা করতে হতো। অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে স্কুল ছেড়ে কলকাতায় গেলেও কিছুদিন পরে দেখা গেল অসহযোগ আন্দোলন আসলে তার উপলক্ষ। মূল লক্ষ ছিল নিজের লেখা কবিতা দেখানোর জন্য বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের সাথে দেখা করা। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম [১৮৯৯-১৯৭৬] ছাড়া তেমন কেউই এই সতের বছর বয়সী কিশোর কবিকে সেদিন পাত্তা দেন নি। অনেকে কথাই বলেন নি। এক প্রকার হতাশ হয়েই তিনি সেবার ফিরে এলেন ফরিদপুরে। ফিরে এসে তার লেখার খাতায় নজরুলের দাগ দেয়া কিছু কবিতা পাঠিয়ে দেন নজরুলের কাছে। কিছুদিন বাদে সেসব কবিতার কিছু কিছু মোসলেম ভারতসহ একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কাছাকাছি সময়ে এমনকি প্রবাসী-তেও তার কবিতা ছাপা হয়। কিন্তু এসব লেখা তাকে তৃপ্তি দিচ্ছিল না। তৃপ্ত না হওয়ার বিষয়টি তিনি আবিষ্কার করেন কলকাতা থেকে ফরিদপুর আসার কিছুকালের মধ্যে। এর কারণ ওই গ্রাম্যগান। কলকাতা থেকে ফরিদপুরে এসে কবি আবার পড়াশোনা এবং একইসাথে গ্রাম্যগান সংগ্রহে মনোযোগী হন। এই গ্রাম্যগান সংগ্রহ করতে গিয়েই তার কবিতা সম্পর্কিত ধারণার বদল হয়।১৫ কারণ গ্রাম্যগান সংগ্রহ শুরুর আগে তিনি যে কবিতা লিখতেন—যেগুলো মোসলেম ভারত, প্রবাসীসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল—তা রবীন্দ্রনাথের ভাব-ভাষার অনুকরণে লিখতেন। গ্রাম্যগান সংগ্রহে নেমে তিনি দ্রুত তার কবিস্বভাব আবিষ্কার করেন। ফিরে আসেন নিজের স্বভাব ও ব্যক্তিত্বে। এবার তিনি গ্রাম্যগানের মানুষ আর তাদের সংস্কৃতি নিয়ে লেখা শুরু করেন গ্রামীণ জীবনভিত্তিক কবিতা। এবার তার এই ধারার কবিতা কিন্তু আর কেউ ছাপতে চাইলেন না।১৬ কেউ ছাপুক আর না ছাপুক জসীমউদ্‌দীনের কবিব্যক্তিত্বের পালাবদলে গ্রাম্যগানই নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।


কবিগানের গর্ভ থেকে কবি জসীমউদ্‌দীনের জন্ম।


৩.
গ্রাম্যগানের প্রতি জসীমউদ্‌দীনের ছিল সীমাহীন আকর্ষণ। এই আকর্ষণ শুধু আকর্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রাম্যগানের যারা স্রষ্টা আর মূল ভোক্তা তাদের সঙ্গে তার ছিল এক অভিন্ন-হৃদয় সম্পর্ক। এই সম্পর্ক এত গভীর ছিল যে, একে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘জীবনে জীবন যোগ’। ‘জীবনে জীবন যোগ’ হলেই শুধু গ্রাম্যগানের উৎসের মানুষেরা বলে ওঠে, ‘উনি আমাগো আপন মানুষ’।১৭ জসীমউদ্‌দীনকে গ্রাম্যগানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষেরা মনে করতেন তিনি তাদের লোক। লোকগানের স্রষ্টারা যে জসীমউদ্‌দীনকে তাদের সংস্কার-কুসংস্কারের সঙ্গে কিভাবে একাকার করে ফেলেছিলেন তার দৃষ্টান্ত আছে তার স্মৃতির পট [১৯৬৮] গ্রন্থে। সেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন যে, গ্রামের লোকজন তাকে মুর্শিদ ফকিরদের মতো মস্ত বুজুর্গ মনে করত। কোনো সমস্যা হলে তারা দোয়ার জন্য জসীমউদ্‌দীনের দ্বারস্থ হতো। একবার ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে সারারাত মুর্শিদা গান শোনা এং গাওয়ার পর ভোরবেলা আইজদ্দি নামে গ্রামের এক লোক এসে কবির পায়ে পড়েছিল। আইজদ্দির সমস্যা তার স্ত্রীর গর্ভেই সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। সে কবির কাছে তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে দোয়ার জন্য, এর প্রতিকারের জন্য। আইজদ্দির ভাষ্য জানাটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। আইজদ্দি বলেছিল, ‘হুনছি কবিরা আল্লার পিয়ারা। আপনি উয়ারে [আইজদ্দির স্ত্রীকে] একটু দুয়া কইরা যান, যাতে উয়ার আর পুলা নষ্ট হয়া না যায়। … গরিবরে পায়ে ঠেলবেন না। আমাগো মতন কাঙাল আল্লার আলমে আর নাই।’১৮ গ্রামের মানুষেরা এই ধরনের প্রত্যাশা এবং নিবেদন মুরশিদ ফকিরদের কাছেই করে থাকে। এই মুরশিদ ফকিররা মূলত গানের লোকই হয়ে থাকেন। তাদের সাধন-ভজন গানকেন্দ্রিকই হয়ে থাকে। গ্রাম্যগানের প্রতি জসীমউদ্‌দীনের আকর্ষণের মাত্রা ধরা পড়েছে জসীমউদ্‌দীনের নিম্নোক্ত বক্তব্যে—

চরভদ্রাসন একটি সুন্দর গ্রাম। ফরিদপুর জেলা হইতে ষোল মাইল দূরে। বহুদিন হইতে এই গ্রামে আমি প্রায়ই গ্রাম্য-গান শুনিতে যাই। গ্রামের আবদুল ফকিরের বাড়িতে মুর্শিদা গানের বৈঠক বসে। সারারাত্র জাগিয়া গ্রাম্য ফকিরেরা ভাব-গান করে। সেই গানে মাঝে মাঝে এত ভাবসমাবেশ হয় যে বহু লোকের জজবা আসিয়া যায়। সরলপ্রাণ গ্রাম্য লোকেরা জজ্বাগ্রস্ত ফকিরদের কাছে নানারূপ বর প্রার্থনা করে। আমি এসবে বিশ্বাস করি না। কিন্তু সারারাত্র জাগিয়া ফকিরেরা যে গান করে সেই গানের কথা আর সুর আমাকে পাগল করিয়া দেয়। নেশাগ্রস্ত লোকের মতো বহু আয়াস স্বীকার করিয়া বহু মাইল পথ অতিক্রম করিয়া আমি প্রায়ই সেই গ্রামে মুর্শিদা গান শুনিতে যাই।১৯

হেমাঙ্গ বিশ্বাস [১৯১২-১৯৮৭] জসীমউদ্‌দীনের সঙ্গে একদিনের আড্ডার স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে কবিকে তিনি মূলত সাব্যস্ত করেছেন লোকগানের প্রকৃত সাধন-ভজনকারী হিসেবে। তিনি তার এক স্মৃতিকথামূলক রচনায় জসীমউদ্‌দীনকে বলেছেন, ‘পদ্মাপারের মুরশিদ’ এবং ‘লোককবি’।২০ হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁকে যে ‘লোককবি’ বলেছেন, তা নিশ্চয়ই তাঁর কবিতাকে মাথায় রেখে নয়। তিনি এটি বলেছেন, তার গানের কথা মাথায় রেখে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে সেই সাক্ষাতে জসীমউদ্‌দীন যেকথা বলেছিলেন তা থেকে গ্রাম্যগানের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক আর শহুরে গানের সঙ্গে তার খাপ খাওয়াতে না পারার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জসীমউদ্‌দীন বলেছেন—

এর আগে কয়েকবার কলকাতায় এলেও ১৯২৭ ইংরেজি থেকে অনেকটা স্থায়ীভাবে এলাম কলকাতায়। কলকাতার শিক্ষা, সভ্যতা, চালচলনের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চাইলেও মনে মনে আমি রয়ে গেলাম সেই ফরিদপুরের গোবিন্দপুরের গ্রাম্য ছেলেটি। শহরের সংগীতের জলসা শুনতে যেতাম—ভালো লাগত, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত খুবই ভালো লাগত, কিন্তু গ্রামে শোনা গানগুলিতে যে কী যাদু ছিল—আমাকে পাগল করে দিত। কিন্তু শহরের শিক্ষিতদের দরবারে তার অবহেলা দেখে আমার মনে খুব দুঃখ হত।২১

৪.
জসীমউদ্‌দীন তখন কবিখ্যাতি মোটামুটি অর্জন করেছেন। রাখালী [১৯২৭], নক্‌শী কাঁথার মাঠ [১৯২৯] কাব্যগ্রন্থও বেরিয়ে গিয়েছে। ‘কবর’ কবিতা প্রবেশিকা পর্যায়ে তখন পাঠ্য। রবীন্দ্রনাথ তাকে বিশেষ স্নেহ করেন। রবীন্দ্রনাথ তার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে তাকে থাকার প্রস্তাবও দিয়েছেন। কলকাতায় ইতোমধ্যে চাউর হয়ে গিয়েছে যে, জসীমউদ্‌দীন দীনেশচন্দ্র সেনের চেলা। জসীমউদ্‌দীনের ক্ষেত্রে এই সবই ঘটেছে তার কবিতার জন্য। কবিতাকেন্দ্রিক এই যশের কল্কে কবি জসীমউদ্‌দীন পেয়েছেন ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে। ইতিহাস সচেতন যে কেউ জানেন যে, সেই সময়ের পূর্ব বাংলার একজন কবির জন্য কলকাতায় এহেন অবস্থান রীতিমতো একটা শ্লাঘার বিষয়ই বটে। কিন্তু গ্রাম্যগানের মানুষ জসীমউদ্‌দীনের কবিতাকেন্দ্রিক এই খ্যাতিতে এবং নিজের কবিতাকেন্দ্রিক তৎপরতায় যেন মন ভরে না। একারণেই তিনি প্রথমাবধি গান নিয়ে কলকাতায় বিচিত্র তৎপরতায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি আগ্রহী ছেলেমেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন গানের দল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সাধারণ অনুষ্ঠানে তার আলোচনার জন্য ডাক পড়লেই তিনি সেই গানের দলকে নিয়ে যেতেন। তিনি বক্তৃতা করতেন আর সেই বক্তৃতার বিষয়ের সঙ্গে মিল রেখে কথার ফাঁকে ফাঁকে তার গানের দল দিয়ে গ্রাম্যগান গাওয়াতেন। এই দলে কিছুদিন আব্বাসউদ্দীনও ছিলেন। বলা বাহুল্য, এই গানের দলকে জসীমউদ্‌দীন মাসের পর মাস গ্রাম্যগানের চর্চা করাতেন। এমনকি এসব অনুষ্ঠানে যে গ্রাম্যগানগুলো গাওয়া হবে সেগুলো দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস পরিশ্রম করে আব্বাসউদ্দীনকেও তিনি শেখাতেন।২২ জসীমউদ্‌দীনের শেখানো সেইসব গান পরে আব্বাসউদ্দীন গাইতেন। শুধু তাই নয়, গান করে বেড়াতে বেড়াতে জসীমউদ্‌দীনের পরিচয় হয় গুরুসদয় দত্ত [১৮৮২-১৯৪১]-এর সঙ্গে। তাকে নিয়ে জসীমউদ্‌দীন একটি লোকগান চর্চার সংগঠনও গড়ে তোলেন। জসীমউদ্‌দীনের মুখেই শোনা যাক কলকাতায় তার লোকসংগীত চর্চার উদ্দেশ্য আর সংগ্রামের কথা—

কিছু উৎসাহী যুবক ও যুবতীকে নিয়ে গ্রাম্যসংগীত প্রচারের কাজে লেগে গেলাম। কিন্তু তখন কলকাতাতে এ-কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম বাংলাদেশ কলকাতার দিকেই তাকিয়ে থাকে—কলকাতাকে দেশের লোক অনুসরণ ও অনুকরণ করে—কাজেই কলকাতার অনাবাদী মাটিতে ফসল ফলাতে হবে—সংকল্প নিলাম। কলকাতার কলেজে কলেজে বক্তৃতার আয়োজন করতাম—গান সহযোগে। শুধু কলকাতা নয়—একাজে তখন বাংলার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। এই অভিযান চলাকালীন বীরভূমে সিউড়িতে গুরুসদয় দত্তের সাথে দেখা হল। গুরুসদয় দত্তের উদ্যোগে গঠিত হল Rural Heritage Revival Society—গুরুসদয় দত্ত হলেন সভাপতি আর আমি হলাম সেক্রেটারী। সে সময়কার শিক্ষিতসমাজে লোকসংগীতের কদর কী ছিল তা বুঝতে পারবে একটি দৃষ্টান্ত দিলে। সে সময় আমাদের সোসাইটির সভাপতি হিসাবে গুরুসদয় দত্ত পত্রিকায় এক বিজ্ঞাপন দেন—‘যিনি আমাদের কাছে এসে লোকসংগীত শিক্ষা করবেন—তাঁকে মাসে মাসে পনের টাকা করে মাসিক বৃত্তি দেওয়া হবে।’ আমিই প্রধান শিক্ষক। ছাত্র জুটল মাত্র একটি। নাম তার বিনয়কৃষ্ণ ঘোষ। গানের হাতেখড়ি হয়েছিল ভীমনাগের বড় সন্দেশ দিয়ে, অন্তত মিষ্টির প্রলোভনেও ছাত্রটি যাতে নিয়মিত আসে।’ ২৩

আগেই বলা হয়েছে, মূলত কবিগানের গর্ভ থেকে কবি জসীমউদ্‌দীনের জন্ম। গ্রামের এই কবিগানকে শহরে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য এবং এই গানের প্রতি শহুরে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তিনি কম চেষ্টা করেন নি। কলকাতা বেতারে তিনি নিজেও কবিগান গেয়েছেন।২৪ শুধু বেতারে নয়, তিনি কলকাতার আলবার্ট হলে একবার কবিগানের আয়োজন করেছিলেন। সেটা ১৯৩২ সালের কথা। সেই কবিগানের মূল গায়েন ছিলেন ফরিদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কয়েকজন কবিয়াল। রাজেন সরকার, বিজয় আর নিশিকান্তের সেই কবিগানের মহড়া চলেছিল জসীমউদ্‌দীনের কলকাতার মেসে। তিনদিনব্যাপী আলবার্ট হলে আয়োজিত সেই কবিগানের টিকিটের মূল্য ছিল তিনটাকা, একটাকা আর চার আনা। সেদিন কলকাতা শহরে গ্রাম্য কবিগানের আয়োজন করতে জসীমউদ্‌দীনের তৎপরতার বর্ণনাটি কবি নিজে দিয়েছেন এভাবে—

তারপর আমার মেসে সারাদিন চলিল তাঁহাদের গানের মহড়া। যেসব ধুয়ার সুর চটকদার এবং বিলম্বিত লয়ের করুণ সুর, সেগুলিকে দিয়া নূতন করিয়া পালাটি রচনা করিয়া দিলাম। শহরের লোকেরা বহুক্ষণ গান শোনে না। তাই প্রত্যেক পালাটিতে একঘণ্টা সময় নির্দেশও করিলাম। বন্দনা গাহিয়া আর এক গান বারবার গাহিয়া সময় নষ্ট না করার নির্দেশও দিলাম। কলিকাতার কাগজগুলিতে কবিগানের উপর নানা খবর ও প্রবন্ধ ছাপাইবার ব্যবস্থা করিলাম।২৫

গ্রাম্যগান নিয়ে জসীমউদ্‌দীনের এই যে বহুবিচিত্র এবং হৃদয়বন্ত তৎপরতা এটি সারাজীবনই অব্যাহত ছিল। গান নিয়ে জসীমউদ্‌দীনের সারাজীবনে যে-তৎপরতা আগ্রহ আর আবেগ আমরা লক্ষ করি, তা কবিতা নিয়ে ছিল না। অন্তত তার গদ্য রচনা থেকে তাই মনে হয়। তার আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথাগুলোতেও গানের আলাপ আর গ্রাম্যগানের মানুষের আলাপই সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে। আত্মজীবনী আর স্মৃতিকথাগুলো পাঠ করলে মনে হয়, তিনি নিরন্তর গান নিয়েই ভেবেছেন, চর্চা করেছেন, আর এর পাশাপাশি কবিতার চর্চা চালিয়ে গিয়েছেন। মনে হয় কবিতা যেন তার গানেরই বাইপ্রোডাক্ট; গান যেন তার কবিতার রসদ যুগিয়েছে। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন সাধারণ্যে এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কবি হিসেবে অতি বিখ্যাত হওয়ায়, তিনি যে মূলত গানের মানুষ, তা আড়াল হয়ে গিয়েছে।

৫.
জসীমউদ্‌দীন গ্রাম্যগান বা লোকগানের শুধু সমঝদার আর প্রচারক-সংগ্রাহক ছিলেন না, তিনি নিজে রচনা করেছেন অসংখ্য লোকগান। ওই কালে তার গান কলকাতার গানপিপাসু মানুষদের মধ্যে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর বিশ, ত্রিশের দশকের কলকাতা শুধু নয় এখনও তার গান বাংলাদেশের মানুষের লোকগানের পিপাসা নিবৃত্ত করে চলেছে।

তার গানের বইয়ের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। রঙিলা নায়ের মাঝি [১৯৩৫], গাঙের পাড় [১৯৫৪], জারীগান [১৯৬৮], মুর্শীদা গান (১৯৭৭), রাখালী গান (?)। এছাড়া বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে বেশ কিছু গান রয়েছে। উপরে উল্লেখিত গ্রন্থগুলোর অধিকাংশ গানই সংগ্রহ করা গান। বিশেষত জারীগান, মুর্শীদা গান এবং রাখালী গান এই গ্রন্থগুলোর সব গানই লোকমুখ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আর গাঙের পাড় সম্পর্কে বইয়ের ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে—‘শেষাবধি গাঙের পাড় কবিতা হয়েও মাত্রা পায় জাগরণের গান হিসেবে।’ এগুলো কবির নিজের রচনা। তবে এই গ্রন্থের ‘কোরবানীর জারী’ এই গানটির মূল রচয়িতা আফাজদ্দিন বয়াতী। তার মূল গানের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কবি এই গানটি লিখেছেন।২৬ এসব ছাড়াও জসীমউদ্‌দীন কলকাতা থাকাকালীন এবং পরেও বিভিন্ন সিনেমায়ও প্রচুর গান লিখেছেন। শুধু ‘আবদুল আলীম কবির রচিত প্রায় দুইশত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।’২৭ কলকাতায় থাকাকালীন হিজ মাস্টার’স ভয়েস [এইচএমভি] থেকে এবং একই সময়ে কলকাতার অনেক নামি-দামি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে জসীমউদ্‌দীনের রচিত অসংখ্য গ্রাম্যগানের রেকর্ড আব্বাসউদ্দীনসহ বিখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে বের হয়েছে। তখনকার দিনে সেগুলো দারুণ জনপ্রিয় ছিল। জসীমউদ্‌দীনের বিখ্যাত গানের মধ্যে আছে, ‘উজান গাঙের নাইয়া’, ‘বাবু সেলাম বারে বার’, ‘রসুল নামে কে এল মদিনায়’, ‘স্বরূপ তুই বিনে দুখ বলব কাহার কাছে’, ‘ও আমার দরদি আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না’, ‘নিশিতে যাইয়ো ফুল বনেরে ভোমরা’, ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে’, ‘প্রাণ বন্ধুরে তুমি এমন করে কেন্দ না আর’, ‘তোরা কে কে যাবি লো জল আনতে’, ‘তুই যারে আঘাত হানলিরে মনে, সেজন কি তোর পর’, ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে’, ‘সামাল সামাল ডুবল তরী’, ‘যারে ছেড়ে এলাম অবহেলেরে সে কি আবার আসবে ফিরে’ ইত্যাদি। এসব গান যারা গেয়েছেন তাদের মধ্যে কৃষ্ণচন্দ্র দে [১৮৯৩-১৯৬২], শচীন দেব বর্মণ [১৯০৬-১৯৭৫], আব্বাসউদ্দীন [১৯০১-১৯৫৯], গিরীন চক্রবর্তী [১৯১৬-১৯৬৫], আবদুল আলীম [১৯৩১-১৯৭৪] বিখ্যাত।


জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় যে-আধুনিকতা লক্ষ করা যায়, সেই আধুনিকতা বাংলার, বিশেষত পূর্ব বাংলার নিজস্ব আধুনিকতা!


৬.
জসীমউদ্‌দীনের নিজের রচিত গ্রাম্যগানের মৌলিকত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে প্রশ্ন তোলেন এই বলে যে, কারো কারো মূল গান বিকৃত করে জসীমউদ্‌দীন গান রচনা করেছেন। অনেকে বলেন, তিনি অন্যের গান নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি প্রচলিত লোক গানের শব্দ অদল-বদল করে গান রচনা করেছেন; তার রচিত লোকগান মৌলিক নয়।

জসীমউদ্‌দীনের গান বিষয়ে ওপরের অভিযোগগুলো মাথায় রেখে মোস্তাক আহমাদ দীন তার ‘জসীমউদ্‌দীন : একালের বিবেচনা’ নামক এক প্রবন্ধে জসীমউদ্‌দীনকে হাতেনাতে ধরার মতো এক প্রমাণ হাজির করেছেন। তিনি তার প্রবন্ধে আল-ইসলাহ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল হকের বরাত দিয়ে জসীমউদ্‌দীনের ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভোমরা’ গানটির উল্লেখ করে বলেছেন, ‘সেটি আসল গান নয়, মূল সুরেও গাওয়া হয় নি; জসীমউদ্‌দীন তার [নূরুল হক] কাছ থেকে উনিশ শতকের মারফতি কবি শেখ ভানুর পাণ্ডুলিপিটি চেয়ে নিয়ে ফেরত তো দেনই নি বরং দেহতত্ত্বের গানটিকে প্রেমের গান বানিয়ে রেকর্ড করালেন।’২৮ মোস্তাক আহমাদ বলেন, ‘… এর মধ্য দিয়ে আরেকটি বিশেষ ভাবের ক্ষতি করে তাঁর স্রষ্টার প্রতি যে-অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে গেলেন তা নিয়ে তাঁর [জসীমউদ্‌দীনের] কোনো খেদ ছিল বলে মনে হয় না…।’২৯ মোস্তাক আহমাদ জসীমউদ্‌দীনের গানে ‘ভেজাল’ দেখে তার কবিতায় ‘ভেজাল’ খোঁজার প্রস্তাব রেখেছেন। তিনি জসীমউদ্‌দীনের গানের মতো কবিতায়ও ‘ভেজাল’ আছে সন্দেহ করে বলেছেন, ‘কবিতা বিষয়ে তাঁকে কি কেউ কখনো এমন প্রশ্ন/অভিযোগ করেছিল?’ এই প্রশ্ন উত্থাপন করে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে মোস্তাক তার প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সমালোচকরা জসীমউদ্‌দীন বিষয়ে কী কী কথা বলেছেন তার একটা ধারণা দিয়েছেন। তিনি নানামুনির বক্তব্য উদ্ধৃত করতে করতে শেষে দীনেশচন্দ্র সেনের নক্‌শী কাঁথার মাঠ কাব্যালোচনার একটি অংশ উদ্ধৃত করেছেন। দীনেশচন্দ্র সেন নক্‌শী কাঁথার মাঠ সম্পর্কে বলেছিলেন—

ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাঙ্গলা ভাষার শ্রী উল্টিয়া গিয়াছে। যেমন আজকাল দুধে ভেজাল, ঘিয়ে ভেজাল, মধুতে ভেজাল, মেঠাই-এ ভেজাল, তেমনি এখন সাহিত্যে ভেজালের ছড়াছড়ি, এমন যে তিলোত্তমা, তাতেও নাকি রেবেকার ভেজাল আছে। উর্বশী পড়িতে পড়িতে হঠাৎ এ পিপ, সাইকিডিয়ান মনে পড়িয়া যায়। ইংরেজি সাহিত্যে ইংরেজি সমাজ আমাদের বাঙ্গলা সাহিত্য ও বাঙ্গলা সমাজের গায়ে যে দাগ দিয়া যাইতেছে, তাহা বড় স্পষ্ট এবং সময়ের কলঙ্কস্বরূপ।’৩০

এই উদ্ধৃতি শেষে মোস্তাক বলেছেন, জসীমউদ্‌দীনের “গানের ক্ষেত্রে তো বলাই নিষ্প্রয়োজন, কবিতার ক্ষেত্রেও তিনি [জসীমউদ্‌দীন] যা করেছেন, তাও তো দীনেশচন্দ্রকথিত ‘ভেজাল’ মেশানোর পর্যায়েই পড়ে। ‘উর্বশী’ পড়তে পড়তে যাঁর ‘এ পিপ, সাইকিডিয়ান’-এর কথা মনে পড়ে, নক্‌শী কাঁথার মাঠ পড়তে গেলে তাঁর জ্ঞাত-অজ্ঞাত কবির গীতিকাগুলোর কথা অবশ্যই মনে পড়বার কথা…।”৩১

জসীমউদ্‌দীনের গান ও কবিতা বিষয়ে মোস্তাক আহমদ দীনের এই বক্তব্য যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপক এবং গভীর তাৎপর্যবাহী। কারণ মোস্তাকের এই বক্তব্য আসলে সাহিত্যের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত, জ্ঞানতাত্ত্বিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত, ঔপনিবেশিক মন-মনস্বিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই যে জসীমউদ্‌দীনের নক্‌শী কাঁথার মাঠ পড়তে গিয়ে ‘জ্ঞাত-অজ্ঞাত কবির গীতিকাগুলোর কথা মনে পড়বার কথা’ বলেছেন, এর পেছনে সক্রিয় থেকেছে আধুনিক কাব্যবিচারের মানদণ্ড এবং চেতনা। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মোস্তাক জসীমউদ্‌দীনকে ইউরোপীয় অর্থে ‘আধুনিক’ কবির কাতারে দাঁড় করিয়েছেন। এই কাজটি জসীমউদ্‌দীনের সমকালেও অনেকে করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ‘আধুনিক’ চেতনায় বেড়ে ওঠা সাহিত্যিক-সমালোচকরা জসীমউদ্‌দীনকে যখন তাদের ঘরানাভুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, কিন্তু উপেক্ষা করতে পারছিলেন না, তখন তারা জসীমউদ্‌দীনের কাব্য-কবিতার গায়ে আধুনিকতার তকমা লাগালেন। যারা বললেন তিনি আধুনিক কবি, তারা অবশ্য একটু নোকতা দিলেন যে, তিনি পল্লি নিয়ে লিখলেও ভাষা, চেতনা ইত্যাদিতে আধুনিক। এটাকেই বলে দলে টানার কায়দা। তারা একবারও, জসীমউদ্‌দীনের কবিতার এই আধুনিকতার সঠিক উৎস অনুসন্ধান করলেন না। তারা একবারও বললেন না যে, জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় যে-আধুনিকতা লক্ষ করা যায়, সেই আধুনিকতা বাংলার, বিশেষত পূর্ব বাংলার নিজস্ব আধুনিকতা! সমকালে চলতি ইউরোপীয় আধুনিকতার মাপেই তাকে মাপতে চাইলেন। কারণ তারা তো চেতনায় জসীমউদ্‌দীনের সগোত্র নন, জসীমউদ্‌দীনের মতো দেশজ নন। মোস্তাক আহমাদ দীনও ঠিক একই কাজ করেছেন। তিনি জসীমউদ্‌দীনকে ইউরোপীয় অর্থে ‘আধুনিক’ ঠাওরেছেন। আমাদের এটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রধান কারণ ইউরোপীয় আধুনিকতায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণা অত্যন্ত প্রবল। এই ধারণা মোতাবেক, কবিতা ব্যক্তির সৃষ্টি। ব্যক্তির ছাপ সেখানে মুুখ্য। টিএস এলিয়টরা যে ঐতিহ্যের কথা বলেছেন তা থাকে কবির জ্ঞানগত অভিজ্ঞতায়, চৈতন্যের অদেখা স্তরে, শোণিত ধারার মতো। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন তো এই ইউরোপীয় অর্থে ‘আধুনিক’ নন। পূর্ব বাংলায় তিনি যে সময়ে বেড়ে উঠছেন, পড়াশোনা এবং কবিতাচর্চা করছেন, তখন তো সেখানকার বাঙালি মুসলমানের ব্যক্তিক মুক্তি ঘটে নি। এই জনগোষ্ঠী তো তখনো সমষ্টিগত জীবন যাপন করে। ফলে তখনো পর্যন্ত এই কৌমের উদ্‌যাপন এবং নন্দনের ধারণাও সমষ্টিগত। আর তাছাড়া জসীমউদ্‌দীনের বেড়ে ওঠা, যাপন, উদ্‌যাপন, নন্দনের ধারণা কী পরিমাণ সমষ্টির সঙ্গে যুক্ত তা জসীমউদ্‌দীনের যেকোনো আত্মজৈবনিক গ্রন্থ পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায়। তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তিনি তো চেতনায় কলকাতার মানুষ নন। পূর্ব বাংলার জনচৈতন্যের গভীরে তার ভাবনা-কল্পনার নাভি পোঁতা। একারণে শুধু তার গানই নয়, কবিতা, নাটক কোনো কিছুই পূর্ববাংলার জনচৈতন্যের কাঠামোর বাইরের জিনিস নয়। একারণে সমালোচক জসীমউদ্‌দীনের কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁর কবিতা পূর্ব বঙ্গেরই নির্যাস। পূর্ববঙ্গ বাদ দিলে তাঁর কবিতার সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে।’৩২

শুধু পূর্ব বাংলার বিষয়টিই নয়, গ্রাম্যগান এবং যেকোনো লোকসাহিত্য তো ব্যক্তির একক কোনো রচনা নয়। এটি সমষ্টির রচনা। একজনের মুখ দিয়ে রচিত হলেও তাতে সকলের ভাগ আছে। এজন্য গ্রাম্যগান বা লোকসাহিত্য কার রচনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা জনমানুষের ভাবনা-ব্যাকুলতাকেই বাক্সময় করে তোলে। তাই লোকগানের এবং সাহিত্যের একটা নিজস্ব প্রকরণ ও চিন্তা-কাঠামো থাকে। সেই প্রকরণ ও কাঠামোর মধ্যেই গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে বহুমানুষের কথা। একারণে লোকগানের কথা দেখে হঠাৎ বলে ওঠা মুশকিল হয়ে পড়ে গানটি কার রচিত। আমরা দাবি করছি না যে, জসীমউদ্‌দীন লোককবি। যদিও শামসুদ্দীন আবুল কালাম, হেমাঙ্গ বিশ্বাসসহ অনেকেই মনে করতেন তিনি লোককবি। আমাদের মত হচ্ছে, জসীমউদ্‌দীন লোককবি না হলেও তিনি সাহিত্যের এই তরিকার মানুষ। একারণে তার কবিতা ও গান তার একক রচনা বলে সাধারণ্যে চালু থাকলেও এটি আসলে সমষ্টির সাহিত্য বলেই বিবেচিত হবে। এতে কোন লোককবির প্রভাব আছে, কার রচনার কিছু লাইনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তা একান্তই গৌণ বিষয়। এই আলোচনা ও অনুসন্ধান ‘আধুনিক’ সাহিত্যের বিষয়। জসমীউদ্‌দীনের সাহিত্যালোচনার ক্ষেত্রে এই আলোচনা ও অনুসন্ধান ‘আধুনিকতার’ দোষে দুষ্ট এবং উদর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো বিষয়। জনসংস্কৃতির আকর জনসাহিত্যে ভেজাল বলে কিছু নেই। ভেজালের প্রসঙ্গ আসে বাইরের কোনো কিছুর অনুপ্রবেশের সময়। যেমনটি বাংলা সাহিত্যে ইউরোপীয় চেতনা ও প্রকরণের অনুপ্রবেশে ভেজালের ঘটনা ঘটেছে। যে কথা দীনেশচন্দ্র সেন ঠিকই বলেছেন।

জসীমউদ্‌দীনের গান শুধু নয়, তার কাব্য-কবিতাও জনসাহিত্য। কাব্য-কবিতায় তিনি জনসাধারণের কথা বলেছেন এজন্য নয়, সেখানেও জনসাহিত্যের প্রধান যে বৈশিষ্ট্য, আদান-প্রদান, তা সহজেই লক্ষ করা যায়। তার কাহিনিকাব্যগুলোর মধ্যে সহজেই আবিষ্কার করা যাবে বাংলার লোকগানের এবং গ্রাম্যগীতিকাগুলোর অপরাপর কবিদের। এ প্রসঙ্গে জসীমউদ্‌দীনের একটি ভাষণের উল্লেখ না করলেই নয়। ১৩৬২ বঙ্গাব্দে তিনি নিখিল ব্রহ্ম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তার বক্তব্যের শিরোনাম ছিল ‘বাংলা লোকসাহিত্য’। সেই ভাষণে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে লোকগানের সৃষ্টি হয়। তিনি সেখানে বলেছেন কোনো মা হয়তো তার নবজাত শিশুকে কোলে নিয়ে হঠাৎ কবিত্ব করে বলে উঠেছিলেন, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে’য় এলো বান’। তারপর সেই নবজাতক একদিন মা হয়ে তার শিশুকন্যাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়ের মুখে শোনা একটি লাইন গাইতে গাইতে হঠাৎ নিজেই জুড়ে দিল আরেকটি লাইন, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে’য় এলো বান/ শিবঠাকুরের বিয়ে হল তিন কন্যে দান’। তারপর সেই মেয়ে একদিন মা হয়ে তার কন্যাকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে দুই লাইন গাইতে গাইতে হয়তো জুড়ে দিল আরো দুই লাইন, ‘এক কন্যা রাঁধে-বাড়ে তিন কন্যা খায়,/মাঝে মাঝে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি যায়’। এইসব উদাহরণ দিয়ে জসীমউদ্‌দীন বলেছেন যে, ‘এইভাবে এর গান, ওর গান, তার গান, সকলের গান একত্র করিয়া লোকসাহিত্যের সৃষ্টি হইয়াছে। সেইজন্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, লোকসাহিত্য না-পুরাতন না-নতুন। যেমনি ইহা সকলের রচিত, তেমনি ইহা সকল কালের রচিত।’৩৩ একথা বলে জসীমউদ্‌দীন তার ওই ভাষণে একটি গানের উল্লেখ করেছেন। গানটি এরকম, ‘দেইখ্যাছি দেইখ্যাছি আমরা নবীনচাঁন সন্ন্যাসী,/ ও তার, কান্ধে ঝোলা গলায় মালা করে মোহন বাঁশি।’ গানটি চৈতন্যদেবকে নিয়ে বেঁধেছেন কোনো এক লোককবি। এই গানেরই আরেকটি ‘ভাষান্তর’ পাওয়া যায়, ‘দেইখ্যাছি দেইখ্যাছি আমরা সানাল চাঁন সন্ন্যাসী,/ ও তার, হাতে অসি বগলে কোরান মুখে মধুর হাসি।’ পূর্বোক্ত গানটি সানাল ফকিরের কোনো শিষ্যের হাতে পড়ে এভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এই গানের উদাহরণ দিয়ে জসীমউদ্‌দীন বলেছেন, ‘এইভাবে শুধু গানের কথাগুলিতেই নয়, তাহার সুর, তাহার প্রকাশভঙ্গিমা এক যুগ হইতে আর এক যুগে আসিয়া, এক সম্প্রদায় হইতে আর এক সম্প্রদায়ে আসিয়া, এক গ্রহ হইতে আর এক গৃহে আসিয়া নানান পরিবর্তনের অলংকার গায়ে পরিয়া সব নবরূপ গ্রহণ করিয়াছে।’৩৪ গান সম্পর্কে যে-মানুষ এই ধারণা পোষণ করেন, তার বিরুদ্ধে অন্য কারো লোকগানের অনুকরণ-অনুসরণ-পরিবর্তন-পরিমার্জনের অভিযোগ আসলে একটি বিশেষ ঘরানার সাহিত্যের খোল-নলচে নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতোই শোনায়। গান সম্পর্কে এই ধারণার জসীমউদ্‌দীন এবং জনসাহিত্যতত্ত্বের পোষক জসীমউদ্‌দীন যখন কবিতা লিখেছেন তখনও তার কাব্যভাবনায় গ্রাম্যগান অপরাপর লোকসাহিত্য রচনার প্রক্রিয়া আছর করেছে তাতে সন্দেহ কী! বাংলা গান ও কবিতার যে ধরনকে—ইউরোপীয় আধুনিকতার ধরন—মাথায় রেখে জসীমউদ্‌দীনের গান ও কবিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় তা জসীমউদ্‌দীনের সাহিত্যভাবনার সম্পূর্ণ বিরোধী।


লোকগানের এই বিচিত্র ধরনের পরিবর্তন সবাই করার অধিকার রাখেন না। জসীমউদ্‌দীন রাখতেন। 


এখন প্রশ্ন হচ্ছে চৈতন্যদেব সম্পর্কিত গানের বা অপরাপর গ্রাম্যগানের পরিবর্তন করা যদি গ্রাম্যগানের সাধারণ প্রবণতা হয়ে থাকে, তবে কে সেই পরিবর্তন করতে পারবেন? নিশ্চয় সবাই পারবেন না। সবার সে-অধিকারও নেই। কারণ যুগে যুগে লোকগানের পরিবর্তন করে লোকগানকে যেভাবে আধুনিকায়ন করা হয়েছে তাতে এই পরিবর্তনকে কৃষিতন্ত্রের ওপর পুঁজিতন্ত্রের আধিপত্য বিস্তার ছাড়া আর কী বলা যায়! কারণ এই পরিবর্তনগুলো হয়েছে সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের দ্বারা। তারা আসলে যাপনে-চিন্তায় গ্রামীণ মানুষের থেকে যোজন যোজন দূর। তারা আধুনিক রুচি দিয়ে লোকগানের সুর ও ভাবসম্পদকে দেখেছেন। তারা লোকগানের পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন না। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন রাখতেন। কারণ জসীমউদ্‌দীন তো যাপনে-চিন্তায় লোকমানুষদেরই একজন ছিলেন। একথা হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেনও। অনেক গানের মুখ রেখে অন্তরায় যে জসীমউদ্‌দীন পরিবর্তন করে লোক গান রচনা করেছেন সে-সম্পর্কে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেন—

ভাবের ও প্রকাশভঙ্গির গতিশীলতা কিন্তু সুরের ও গায়কীর রক্ষণশীলতা—লোকসংগীতের রূপান্তরের এই হল রূপরেখা—এটাই আমার বক্তব্য। কিন্তু নতুন রচনার অধিকার সবাইকার নেই। পল্লীজীবনের ও পল্লীসাহিত্যের মধ্যে ডুব না দিলে এ-অধিকার কেউ অর্জন করতে পারে না। এ-বিষয়ে অধিকারভেদ আমি মানি। আপনি [জসীমউদ্‌দীন] এ-অধিকার অর্জন করেছেন। তাই আপনি যখন দেহতত্ত্বের গানের মুখটা নিয়ে পরে তাতে পল্লীপ্রেম ও প্রকৃতির কথা বসিয়েছেন, তখন কথাগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এত মুখে মুখে বসে গেছে যে, মনে হয় না কারো জুড়ে দেওয়া।৩৫

শুধু মোস্তাক আহমাদ দীন কথিত ‘নিশীথে যাইও ফুল বনে রে ভোমরা’ গানটি নয়, এরকম আরো অনেক গানের শুধু মুখটি ঠিক রেখে পরের কথাগুলো নিজে রচনার মাধ্যমে জসীমউদ্‌দীন লোকগানের ‘ভাবের ও প্রকাশভঙ্গির গতিশীলতা’কে যেমন অব্যাহত রেখেছেন, তেমনি ‘লোকসংগীতকে চলমান জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে সংগ্রহশালার মৃত বস্তুতে রূপান্তরিত’ হওয়া থেকে রক্ষার কাজও করেছেন। লোকগান রচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন-পরিমার্জন, গ্রহণ-বর্জন সম্পর্কে বলতে গিয়ে জসীমউদ্‌দীন বলেছেন—

সেদিন ছিল শিক্ষিত ভদ্রশ্রেণীকে দিয়ে গ্রহণ করানোর সমস্যা, কাজেই খাঁটি গ্রাম্যভাষায় যে সব গান ওদের কাছে দুর্বোধ্য ছিল তাতে কিছু ভাষার অদল-বদল করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তরাও “লোকে নেবে না” বলে ভাষাকে মার্জিত না করে রেকর্ড করতে চাইতেন না কিছুতেই। তৃতীয়ত সংগ্রহ বললে যে টাকা পাওয়া যেত, নিজের রচনা বললে দক্ষিণা তার চেয়ে অনেক বেশি মিলতো। এই প্রলোভনও পিছনে কাজ করছিল।৩৬ আরেকটা সমস্যা ছিল, দেহতত্ত্বের জবরুৎ, মালাকুত কিংবা ‘আটকুঠুরী নয় দরজা’ প্রভৃতি সেদিনের, এমন কি আজকেরও শিক্ষিতশ্রেণীর কাছে দুর্বোধ্য। সেদিক দিয়েও দেহতত্ত্বের গানকে অনেক সময় প্রেমের গানে রূপান্তরিত করতে হয়েছিল।৩৭

আগেই বলা হয়েছে যে, লোকগানের এই বিচিত্র ধরনের পরিবর্তন সবাই করার অধিকার রাখেন না। জসীমউদ্‌দীন রাখতেন। এর প্রমাণ আমাদের পুরো প্রবন্ধের বিভিন্ন প্রসঙ্গের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। সর্বশেষ উদাহরণ দিতে চাই জসীমউদ্‌দীনের গ্রাম্যগানের গায়কী বিষয়ে দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মন্তব্যের মাধ্যমে। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান [১৯২৪-১৯৯৪] পাকিস্তান আমলে কিছুদিন জসীমউদ্‌দীনের কমলাপুরের বাড়িতে ছিলেন। সারাদিন কাজ শেষে জসীমউদ্‌দীন প্রায়ই বিকেলবেলা বসতেন সুলতানের সাথে। তাদের আলাপ হতো গান নিয়ে, মাঝেমধ্যে বাঁশি বাজাতেন সুলতান। সে বাঁশির সুরে কখনো কখনো কেঁদে-কেটে বুক ভাসাতেন জসীমউদ্‌দীন। ভাববিহ্বল মুহূর্ত তৈরি হলে কখনো কখনো নিজে গান গেয়ে শোনাতেন সুলতানকে। জসীমউদ্‌দীনের কণ্ঠের সেই গান সম্পর্কে সুলতান বলেছেন, ‘পল্লীকবির কণ্ঠস্বর যেমন হোক না কেন তাঁর কণ্ঠে গায়কি আছে।’৩৮ হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রায় একই কথা বলেছেন আরো গভীরভাবে। তিনি জসীমউদ্‌দীনের কণ্ঠের প্রশংসা করেন নি। তবে সুলতান কথিত ওই একই গায়কীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। হেমাঙ্গ বলেছেন—

সুরের গুনগুনানিতেই কথা পাখা মেলে। নানা অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গান গেয়ে চলেছিলাম আমরা। কাজেই কবি জসিমউদ্‌দীনও [?] গান ধরলেন। পূর্ববঙ্গের রাখালীয়া গানের বিলম্বিত সুরের সূক্ষ্ম খোঁচগুলি এমন চমৎকার তাঁর গলায় উঠছিল যে সরল সবুজ গ্রাম্যতার স্পর্শ আমরা সবাই তাতে পাচ্ছিলাম। অথচ গায়ক বলে কিন্তু তাঁর নাম নেই। এ-গানই হয়তো রেকর্ড বা রেডিওতে অচল। অন্য যে কোনো শহুরে পল্লীগায়ককে দিয়ে গাওয়াতে গেলে তাঁর গলার এই গান জল ছাড়া মাছের মতো ছটফটিয়ে মরবে।৩৯

জসীমউদ্‌দীনের কণ্ঠ সম্পর্কে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বক্তব্য কেবল জসীমউদ্‌দীনের কণ্ঠ সম্পর্কিত নয়। এটি এই প্রমাণ করে যে, জসীমউদ্‌দীন গ্রাম্যগানের খাঁটি মানুষ ছিলেন। তিনি শহুরে আলগা আবেগে গ্রাম্যগানের সাথে যুক্ত ছিলেন না। কোনো ব্যক্তি বা গায়ক গ্রাম্যগানের সাথে কতটা গভীরভাবে যুক্ত তা তার কণ্ঠের ‘সুরের সূক্ষ্ম খোঁচ’ আর গায়কীর অকৃত্রিমতা, আঞ্চলিক টোন, আঞ্চলিক ভাষা এবং উচ্চারণের বিশেষ সুর বা ‘ইনটোনেশন’ ইত্যাদি দেখলে বোঝা যায়। এগুলো কখনো চর্চা করে আয়ত্ত করা যায় না। এগুলো ভূমিজ, স্বতঃস্ফূর্ত। অঞ্চলের মাটি, পানি, বাতাস থেকে সঞ্চারিত হয় আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তাই অঞ্চল থেকে বিচ্যুত ব্যক্তির পক্ষে গ্রাম্যগান যথাযথভাবে গাওয়া সম্ভব নয়। জসীমউদ্‌দীনের পক্ষে সম্ভব ছিল। কারণ তার নাড়ি পোঁতা ছিল পল্লির নদী, মাটি, বিলঝিল, হাওড়-বাওড়ের গহিনে। ফলে তিনিই তো লোকগান রচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন-পরিমার্জন, গ্রহণ-বর্জন করার অধিকার রাখেন।

৭.
গ্রাম্যগান জসীমউদ্‌দীনের কাব্যরুচি, কবিত্বকে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে, তিনি কখনো এ থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। মুক্ত হতে চানও নি। জসীমউদ্‌দীনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ রাখালী [১৯২৭]। এটি মূলত কাব্যগ্রন্থ। এতে আঠারোটি কবিতা আছে। কিন্তু আঠারোটি কবিতার পাশাপাশি এতে স্থান পেয়েছে পাঁচটি গ্রাম্যগান। গানগুলি হলো ‘সিঁদুরের বেসাতি’, ‘সুজন বন্ধুরে’, ‘মনই যদি নিবি’, ‘বৈদেশী বন্ধু’ এবং ‘গহীন গাঙের নায়া’। এর মধ্যে ভাটিয়ালি সুরে রচিত ‘গহীন গাঙের নায়া’ গানটি পরবর্তীতে জসীমউদ্‌দীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবাসউদ্‌দীনের কণ্ঠে গীত হয়। গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তাও লাভ করে। ‘সিঁদুরের বেসাতি’ মূলত ‘মেয়েলি গানের সুরে উত্তর-প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে রচিত’ একটি গীতিনাট্য। সমালোচকের ভাষায় ‘এটি গীতিময় সংলাপে গ্রথিত পল্লি-নরনারীর জীবন-নাট্যেরই যেন একটি অধ্যায়।’৪০ রাখালী কাব্যের ঘোষিত গানগুলোর বাইরেও জসীমউদ্‌দীনের বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের কবিতার মধ্যে মাঝেমধ্যেই উঁকিঝুকি দিয়েছে জসীমউদ্‌দীনের গানঅন্তপ্রাণ সত্তাটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, তার শেষ জীবনে লেখা মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো [১৯৭৬] কাব্যগ্রন্থটির কথা। সেখানে ‘ভাইটাল গাঙ’ নামক কবিতাটি পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে, এটি আসলে কবিতার ছদ্মাবরণে গান।৪১

জসীমউদ্‌দীনের নক্‌শী কাঁথার মাঠ [১৯২৯] এবং সোজন বাদিয়ার ঘাট [১৯৩৩] কাব্যগ্রন্থেও গানের প্রভাব চোখে পড়ার মতো। দুটি কাহিনিকাব্যেই প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদের শুরুতে রাখালী গান, মুর্শিদা গান, ময়মনসিংহ গীতিকা, গাজীর গান, আসমানসিংহের গান, মুসলমান মেয়েদের বিবাহের গান, মহররমের জারি, মেঘরাজার গান, জারিনাচের গান, কবিগানের ধুয়া, বিচ্ছেদ গান, বাউল গান ইত্যাদি বিচিত্র সব গ্রাম্যগানের কিছু কিছু অংশ তুলে দিয়েছেন। এসব গানের অংশবিশেষের সাথে সংশ্লিষ্ট পরিচ্ছেদের ঘটনাংশের গভীর যোগ আছে।৪২ শুধু পরিচ্ছেদ শিরোনামে লোকগানের অংশ বিশেষ ব্যবহার করার মধ্যে জসীমউদ্‌দীনের লোকগান-শ্লিষ্টতার বিষয়টি স্পষ্ট তা নয়। জসীমউদ্‌দীনের মূল কাব্যগ্রন্থের বর্ণনার মধ্যেও সাংগীতিকতা খুবই স্পষ্ট। এই সাংগীতিকতা আধুনিক কবিদের কবিতার ধ্বনিমাধুর্যপ্রসূত সাংগীতিকতা নয়। এই সাংগীতিকতা বরং তার কাব্য-কবিতার বিষয় এবং প্রকাশের বিশেষ ধরনের মধ্যেই নিহিত থাকে। একারণে তা লোকগানের মধ্যে অনুসন্ধ্যেয়। কোনো কোনো সমালোচক জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় বিষয় আর প্রকাশের এই বিশেষ ধরনকে বলেছেন, ‘প্রাকৃতায়ন’। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে সমালোচক বলেছেন, ‘পাণ্ডিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির অপর পিঠে কবিতা রচনার যে আবেগ-আবিষ্ক্রিয়ায় জড়িয়ে থাকে জাতির মনস্তাত্ত্বিক চলন, তার আর্কেটাইপের বিন্যাস, ইলিউশন রচনার আদি প্রাণশক্তি এবং বেদনার বিভূতি তা-ই আমরা নক্সী-কাঁথার মাঠ কাহিনিকাব্যে পেয়ে যাই। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির যাবতীয় চাপ সত্ত্বেও এখানে ধরা পড়েছে আমাদের ভাষার সেই প্রাণবাহী শিরাটি যা আমরা আমাদের আবেগতাড়িত প্রাকৃতিকতার অন্তঃসার দিয়ে অন্তঃস্থলে নিজেরাই বহন করে চলি। জসীমউদ্‌দীন সেই প্রাকৃতায়নের ধারক।’৪৩ এই ‘প্রাকৃতায়নের’ কারণেই জসীমউদ্‌দীনের শুধু নক্‌শী কাঁথার মাঠ নয়, প্রতিটি কাব্য-কবিতাই সংগীতাত্মক। সমালোচকের ভাষায় প্রাকৃতায়নই ‘কাহিনি-দৃশ্যকে, জীবনকথাকে সুরধ্বনিতে স্রোতঃস্বিনীর মতো বহমান করে রাখে।’৪৪ মনে রাখা দরকার, জসীমউদ্‌দীনের নক্‌শী কাঁথার মাঠ এবং অপরাপর কাব্যের মধ্যকার যে ‘সুরধ্বনি’ তা লোকগানের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধা, ‘আধুনিক’ গানের সঙ্গে নয়। একারণে সমালোচক বলেছেন, ‘তাঁর কাব্যকলার যদি কোনো উৎস খুঁজে পেতে হয় তা হলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল, ময়মনসিংহ গীতিকা ও অজস্র পল্লীগীতি গাথার দিকে।’৪৫ জসীমউদ্‌দীনের বিশেষত কাহিনি-কাব্যগুলোর বর্ণনার ভেতরে খেয়াল করলে দেখা যাবে সেখানে অনেক জায়গার কথা, উপমা ও অপরাপর অলংকারগুলো লোকগান থেকেই গৃহীত হয়েছে। জসীমউদ্‌দীন নিজেও নক্‌শী কাঁথার মাঠ কাব্যের ‘নিবেদন’ অংশে বলেছেন, ‘…আমি প্রাচীন পল্লী-কবিদের অনেক পদ কোন কোন চরিত্রের কথোপকথনে জুড়িয়া দিয়াছি।’৪৬ জসীমউদ্‌দীনের ‘মূলধারার’ সাহিত্যকর্মের ওপর বিভিন্ন প্রকার গ্রাম্যগানের প্রভাব খুব সহজেই বোঝা যায়। তাঁর নক্‌শী কাঁথার মাঠ ও সোজন বাদিয়ার ঘাট থেকে কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। প্রথমে নক্‌শী কাঁথার মাঠ থেকে উদাহরণ দেখা যাক—

ক.
আমার জন্য ভাবিনাক আমি, কঠিন ঝড়িয়া-বায়,
যে গাছ পড়িল, তাহার লতার কি হইবে আজি হায়!
হায় বনফুল, যেই ডালে তুই দিয়েছিলি পাতি বুক,
সে ডালেরই সাথে ভাঙিয়া পড়িল তোর সে সকল সুখ।৪৭

খ.
মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে,
দুটি কালো চোখ সাজাইয়া নিও কালো কাজলের রাগে।
সিন্দুরখানি পরিও ললাটে—মোরে যদি পড়ে মনে,
রাঙা শাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে।
মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যতনে বাঁধিও চুল,
আলসে হেলিয়া খোঁপায় বাঁধিও মাঠের কলমী ফুল।
যদি একা রাতে ঘুম নাহি আসে—না শুনি আমার বাঁশি,
বাহুখানি তুমি এলাইও সখি মুখে মেখে রাঙা হাসি।
চেয়ো মাঠ পানে—গলায় গলায় দুলিবে নতুন ধান;
কান পেতে থেকো, যদি শোন কভু সেথায় আমার গান।
আর যদি সখি, মোরে ভালবাস মোর তরে লাগে মায়া,
মোর তরে কেঁদে ক্ষয় করিও না অমন সোনার কায়া!৪৮

গ.
সোঁতের শেহলা ভাসে সোঁতে সোঁতে, সোঁতে সোঁতে ভাসে পানা,
দুখের সাগরে ভাসিছে তেমনি সাজুর হৃদয়খানা।
কোন্ জালুয়ার মাছ সে খেয়েছে নাহি দিয়ে তার কড়ি,
তারি অভিশাপ ফিরিছে কি তার সকল পরাণ ভরি!
কাহার গাছের জালি কুমড়া সে ছিঁড়েছিল নিজ হাতে,
তাহারই ছোঁয়া কি লাগিয়াছে আজ তার জীবনের পাতে!
তোর দেশে বুঝি দয়া মায়া নাই, হা-রে নিদারুণ বিধি
কোন্ প্রাণে তুই কেড়ে নিয়ে গেলি তাঁর আঁচলের নিধি।৪৯

অধিক উদ্ধৃতি অবান্তর। আদতে সাজুর বেদনার যে ভাষ্য নক্‌শী কাঁথার মাঠ কাব্যে দেয়া হয়েছে তা ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, রাখালি গানের ভেতরকার হাহাকার আর প্রকাশভঙ্গিমা ছাড়া আর কি! লোকগানের সমষ্টি-মানুষের হাহাকার আর সাজুর হাহাকার একই সুরে ঝংকার তুলেছে এখানে। একই কথা খাটে সোজন বাদিয়ার ঘাট অথবা সকিনা কাব্যের ক্ষেত্রেও। লক্ষ করা যাক সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যের কিছু অংশ—

সেই কূল তুমি ভাঙিছরে নদী, যে কূলেতে কর বাস,
তোমার নিকটে শিখেছে বন্ধু এই রীতি বার মাস।
আগে যদি জানতাম নদী, পিরীতির এত জ্বালা,
নারে যাইতাম কদম্ব তলে, নারে গাঁথিতাম মালা।
ঘসীর অনল রহিয়া রহিয়া ধিকি ধিকি জ্বলে ওঠে,
দেহ পুড়ে যায়, হারে অভাগার পরাণ নাহিক ছোটে।

নদীরে! তোমার বুকে ঢেউ দিলে কূলেতে আঘাত লাগে;
বুকের ব্যথার দোসর নাহিক আপনারে শুধু দাগে।
‘বন পুড়ে গেলে, সব লোকে দেখে, মনের অনল যার
দ্বিগুণ জ্বলিছে, তবু কেহ তার জানেনাক সমাচার।৫০

এই যে নদীর সঙ্গে বিরহীর মনের ভাব বিনিময়, এ তো ভাটিয়ালি গানের এক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাকরণ। একারণে এক লোককবি তার ভাটিয়ালি গানে নদীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কেবল, তোমার কথা আমি বুঝি,/আমার কথা তুমি,/তোমার আমার বন্ধু যে জন,/সে কি রে পাষাণী!/ওরে ও ঢেউ খেলানো নদী!/আমি তোমার কাছে শুনতে চাই/তোমার কেন এত হায় হায়!/আমার কাছে কওনা দুখের বাণী।’৫১ প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় আবদুল আলীমের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী…’। জসীমউদ্‌দীনের সব কাব্য-কবিতায় এরকম লোকগানের প্রত্যক্ষ সন্নিবেশ ঘটেছে তা নয়, কিন্তু লোকগানের নিজস্ব একটা ব্যাকরণ আছে, কাঠামো আছে, উপমা চয়নের কিছু প্রথা আছে, ভাষার একটা ভঙ্গি আছে। এই বিষয়গুলো জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় এত সুলভ যে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন হয় না যে, জসীমউদ্‌দীনের কাব্য-কবিতার ওপর গ্রাম্যগানের একটা গভীর প্রভাব আছে। জসীমউদ্‌দীনের কাব্য-কবিতার সঙ্গে গ্রাম্যগান ও সমগোত্রীয় অপরাপর সাহিত্যকর্মের যোগযুক্ততা সম্পর্কে সমালোচক যথার্থই বলেছেন—

বাংলার চলমান কাব্যধারা ও গানে কথকতার যে ভঙ্গিটি নিজস্ব ঘরানার কেজো উচ্চারণে বিকশিত হয়েছে, জসীেউদ্‌দীন তাকেই মান্য করেছেন। রূপক ও অতিশায়নে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা কাব্য এবং উপনিবেশ আমলের ‘প্রান্তীয়’ কবিতা-গানে খুবই সুলভ। জসীমউদ্‌দীন সেই ধারাতেই চলেছেন। … বাউল গানের ভাবে-রূপে তাঁর নিবিড় যোগ, বৈষ্ণব কবিতার রসপ্রবাহেও তিনি গা ভাসিয়েছেন; কিন্তু তাঁর আত্মীয়তা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’-র মতো লোকগাথা কিংবা মঙ্গল কাব্যের মতো জীবনগাথার সাথেই বেশি। আরেকটি রচনাধারাকে তিনি নিজের সম্পদ বলে গণ্য করেছেন—ভাটিয়ালি-মুর্শিদি-ভাওয়াইয়া গানের বহমান স্রোতধারা’।৫২


গানগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনবে আমাদেরই ভেতর, আমাদের স্বপ্ন, প্রেম ও হৃদয়-সত্যের ভেতরে।


জসীমউদ্‌দীনের সাহিত্যকর্মের ওপর গ্রাম্যগানের প্রভাব খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তার রচিত নাটকগুলো দেখলে। একটা সময় ছিল জসীমউদ্‌দীনের নাটক বছরে একদিন রেডিওতে প্রচারিত হতো। রাত দশটায়। গ্রামে তখনো বিনোদনের এত মাধ্যম ছড়িয়ে পড়ে নি। নাটকের রাতে সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ির উঠানে মাদুর পেতে দেয়া হতো। সেখানে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন লোক আশেপাশের বাড়ি থেকে আসত। উদ্দেশ্য মধুমালা [১৯৫১] অথবা বেদের মেয়ে [১৯৫১] নাটক শোনা। এরকম নাটক জসীমউদ্‌দীন আরো লিখেছেন। যেমন, পদ্মাপার [১৯৫০], পল্লীবধূ [১৯৫৬], গ্রামের মায়া [১৯৫৯], ওগো পুষ্পধনু [১৯৬৮] ইত্যাদি। কিন্তু সারাদেশের গ্রামের মানুষের কাছে মধুমালা আর বেদের মেয়ে নাটকের আবেদন ছিল আলাদা। কী আছে এই নাটকে? বেদের মেয়ে মূলত একটি গীতিনাট্য। গদ্য সংলাপ নামমাত্র থাকলেও মূলত গানের মধ্য দিয়ে নাটকটির সংলাপ আর কাহিনি নির্মিত হয়েছে। এই গানের কথা আর সুরের মূর্ছনায় মোহিত হতো হাজার হাজার গ্রামের কোটি কোটি মানুষ। আর মধুমালা নাটকটিও একটি গীতিনাট্য। রূপকথার জনপ্রিয় লোককাহিনি মদনকুমার ও মধুমালার কেচ্ছাটিকে অবলম্বন করে তেরোটি খণ্ডে জসীমউদ্‌দীন এই নাটকটি লেখেন। এই নাকটিরও সাধারণ সংলাপগুলো গদ্যে হলেও অধিকাংশ সংলাপ লোকগানের দ্বারা রচিত। পদ্মাপার নাটকেও লক্ষ করা যায় অসংখ্য লোকগানের সমাবেশ। লোকমুখ থেকে সংগ্রহীত গানকে পরিবর্ধন-পরিমার্জন করে কবি এসব গান ব্যবহার করেছেন।৫৩ লক্ষ করলে দেখা যাবে, লোক গানই এসব নাটের প্রাণ।

শুধু মূলধারার কাব্য-কবিতার মধ্যেই জসীমউদ্‌দীন গ্রাম্যগানের কাঠামো-প্রকরণ-চেতনার সমাবেশ ঘটিয়েছেন তা নয়, তিনি একাধিক স্বতন্ত্র গানের বইও রচনা করেছেন। রঙিলা নায়ের মাঝি [১৯৩৫], গাঙের পাড় [১৯৫৪] তার স্বতন্ত্র গানের বই। স্বতন্ত্র গানের বই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামও করেছিলেন। কিন্তু তাদের গানের চর্চা কবিতার সমার্থক নয়। যে অনুভূতি প্রকাশের জন্য শুধু কথা যথেষ্ট নয়, সুরের খোঁচা প্রয়োজন সে-কথা তারা গানের বাণী ও সুরের যৌথ প্রযোজনায় প্রকাশ করেছেন। একারণে আমরা দেখব উপর্যুক্ত দুই কবিই গানে পদার্পণ করেছেন অপেক্ষাকৃত পরে। আর জসীমউদ্‌দীনের লোকগানের চর্চা ছিল আবাল্য। সংগ্রহও শুরু করেন কৈশোর থেকে। তার কর্মজীবনের দিকে দৃষ্টি দিলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ছিলেন। এছাড়াও ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের পাবলিসিটি বিভাগে অফিসার পদে চাকরি করেন। তার এই কাজটি ছিল মূলত লোকগানের প্রচার-প্রসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগের Additional Song Publicity Organiser হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে এই বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর পদ থেকে অবসরে যান। জসীমউদ্‌দীনের আত্মজীবনী ঘাটলে দেখা যায় সেখানে গানের প্রসঙ্গই মুখ্য হয়ে উঠেছে। আত্মজীবনীসূত্রে তার সারাজীবনের নিত্যকার কাজের দিকে লক্ষ করলে মনে হবে, তিনি মূলত গানের মধ্যেই থেকেছেন, মাঝে মধ্যে কবিতার পাড়ায় বেড়াতে গিয়েছেন। একারণে তাঁর কবিতার মধ্যে প্রায়শ গান গলা বাড়িয়ে দিয়েছে। কখনো কখনো গ্রাম্যগানের পাখায় ভর করে তিনি কবিতার আকাশে বিচরণ করেছেন। স্থানে স্থানে সুযোগ পেলেই গান আর কবিতার পার্থক্যকে একাকার করে দিয়েছেন। গান থেকে কবিতা রচনার দিকে যাওয়ায় গান এবং কবিতা রচনা তার কাছে প্রায় সমার্থক ছিল। ফলে জসীমউদ্‌দীনের আলাদা গানের সংকলন করার মানে ঠিক অন্যদের মতো নয়।

জসীমউদ্‌দীনের সৃষ্টিশীল সত্তায় গানের এই প্রবল ক্রিয়াশীলতা দেখেই কি তবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি, সৈয়দ শামসুল হক জসীমউদ্‌দীনের কবিপ্রতিভার যথার্থ নিরূপণে তার গানের দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বলেছেন! শোনা যাক সৈয়দ শামসুল হকের বক্তব্য—

জসীমউদ্‌দীন রচিত ও সুরারোপিত গান, যার মাত্র কয়েকটি রেকর্ডে সংকলিত হয়েছে, গানের রেকর্ড আমাদের সাহায্য করবে তা’কে আবিষ্কার করতে, বাংলা সাহিত্যে তা’র সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আসনটিকে সনাক্ত করতে, এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শিল্প কর্মের যা কাজ—এই গানগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনবে আমাদেরই ভেতর, আমাদের স্বপ্ন, প্রেম ও হৃদয়-সত্যের ভেতরে।৫৪

আমাদেরও তাই মত। প্রকৃত জসীমউদ্‌দীনকে তার কবিতার মধ্যে পাওয়া যাবে, কিন্তু তার রচিত গান, গানময় জীবনযাপন আর কর্মজীবনের মধ্যে আরো বেশি পাওয়া যাবে।


তথ্যনির্দেশ টীকা :

১. ‘গ্রাম্যগান’ শব্দবন্ধটির মধ্যে আধুনিক সাহিত্যরুচির মানুষেরা এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবের সন্নিবেশ দেখেন। এর কারণ ‘গ্রাম্য’ শব্দটি। ‘গ্রাম্য’ শব্দটির মধ্যে এই নেতিবাচকতার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন সম্ভবত আধুনিক রুচির শিক্ষিত মানুষেরা। ভাষার মধ্যে তারাই ঠিক করেছেন যে, ‘আধুনিক’ এবং শহুরের বিপরীত হচ্ছে ‘গ্রাম্য’। এই মনোভঙ্গির মধ্যে গ্রামকে ‘অপর’ এবং হীন করে দেখার চৈতন্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন এসবে পাত্তা দেয়ার মানুষ ছিলেন না। গ্রাম ছিল তার চেতনার অত্যন্ত গভীরে। একারণে তিনি পূর্ব বাংলার বিভিন্ন আঞ্চলিক গান সম্পর্কিত তার সমস্ত আলোচনায় নিঃসঙ্কচে ‘গ্রাম্যগান’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন। আঞ্চলিক গানের আলোচনায় সাধারণত অধিকাংশ আলোচক ভদ্রলোকের চেতনা থেকে উৎপাদিত ‘লোকসংগীত’ শব্দটিই বেশি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন সে পথে হাঁটেন নি। তিনি ‘গ্রাম্যগান’ শব্দবন্ধই ব্যবহার করেছেন। তিনি তার গান সম্পর্কিত লেখায় ক্বচিৎ ‘লোকসংগীত’ শব্দবন্ধটির ব্যবহার করেছেন। আমরা বর্তমান প্রবন্ধে পারতপক্ষে জসীমউদ্‌দীন ব্যবহৃত ‘গ্রাম্যগান’ শব্দটিই ব্যবহার করব; ‘লোকসংগীত’ অর্থেই ব্যবহার করব। জসীমউদ্‌দীন ব্যবহৃত ‘গ্রাম্যগান’ শব্দবন্ধটি একারণে ব্যবহার করব যে, ‘গ্রাম্যগান’ শব্দটি গ্রামীণ মানুষের গানের যত গভীরে ঢুকতে পারে ‘লোকসংগীত’ ততটা পারে না বলেই আমাদের মনে হয়।

২. বাংলা অঞ্চলে বাঙালির অতীত আর লোকসংস্কৃতি বিষয়ে সচেতনতার বিষয়টি দেখা দেয় মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীতে। এই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমবিকশিত হচ্ছিল, তখন এখানকার বিদ্বদ্‌সমাজের মধ্যে এই জাতির অতীত আর যা কিছু নিজের তা জানার ও আবিষ্কারের আগ্রহ তৈরি হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ যখন আরো উৎকর্ষ লাভ করে, আরো দানাদার হয়ে ওঠে তখন এই প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। একারণে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিককার দুটি গ্রন্থ চর্যাপদ আর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আবিষ্কৃত হয়। শুধু তাই নয় লোকসাহিত্য বিষয়ক রবীন্দ্রনাথের যত লেখালেখি এবং গ্রন্থ তা-ও এই জাতীয়তাবাদী চেতনার ধাক্কার সময়ে রচিত হয়। বলাবাহুল্য, বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি শেকড় সন্ধানের চেষ্টা ও শিক্ষা লাভ করেছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমেই। কারণ তারা ইউরোপীয় ইতিহাস পড়ে দেখেছিল, সেখানকার রেনেসাঁস কিভাবে তাদের গ্রিক এবং অপরাপর পুরোনো সাহিত্য-ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নতুনভাবে দেখতে ও এগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

৩. জসীমউদ্‌দীন তার জীবনকথা [১৩৭১] গ্রন্থে কবিগান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘সুযোগ পাইলেই কবিগান গাওয়ার শখ আমাকে পাইয়া বসিত। আমাদের ফরিদপুর শহরে কলিপদ দাস নামে আমার এক বন্ধু আছে। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি, তখনও ফরিদপুরে গেলে সুযোগ মতো তাহার সঙ্গে কবির লড়াই করিয়াছি। …ফরিদপুর শহরের নানা স্থান হইতে কবিগান গাওয়ার জন্য আমাদের নিমন্ত্রণ আসিত।’ [জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১২২, ষষ্ঠ মুদ্রণ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৩]

৪. সৃজনশীল কাব্য-কবিতায় গ্রামীণজীবন নিয়ে অন্যদের রচনা সম্পর্কে সমালোচক যথার্থই বলেছেন—

জসীমউদ্‌দীনের আগে-পরে আর সমকালে পল্লির বিষয়-আশয় নিয়ে কবিতা আরও অনেকে লিখেছেন। যেমন গোবিন্দচন্দ্র দাস, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, সাবিত্রিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখ। কিন্তু এদের কাউকেই ‘পল্লিকবি’ বলা হয় না। কারণ এরা কেউ পল্লির মানুষের কথা পল্লির মানুষের মতো করে বলতে পারেন নি। এঁরা পল্লিকে দেখেছেন রোমান্টিক দৃষ্টিতে, অনেকটা ট্রেনের জানালা থেকে দেখার মতো করে। তাছাড়া কবিদের অনেকে পল্লিজীবনকে এঁকেছেন ভদ্রজনের নাগরিক ভাষায়।’ [কুদরত-ই-হুদা, জসীমউদ্‌দীন, পৃষ্ঠা : ৬১, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৮]

৫. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১১৭, ষষ্ঠ মুদ্রণ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৩।

৬. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১১৭, প্রাগুক্ত।

৭. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১২২, প্রাগুক্ত।

৮. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১২৭, প্রাগুক্ত।

৯. ‘আমার প্রথম লেখা’ শিরোনামে ১৯৫৭ সালে রচিত জসীমউদ্‌দীন-এর একটা রচনা আছে। পরবর্তীতে এটি গ্রন্থিত হয়েছে জসীমউদ্‌দীনের প্রবন্ধসমূহ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে। সেখানে জসীমউদ্‌দীন বলেছেন, ‘পাড়ার লোকেরা আমার কবিগান শুনিয়া মন্তব্য করিত, কালে এই ছেলেটি চেষ্টা করিলে একজন বড় কবিয়াল হইবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইল না। আমি কবিয়াল হইতে পারিলাম না, হইলাম কবি। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে কবিয়াল হইতে চেষ্টা করি।’ কবিয়াল হওয়ার সাধনা ছিল তাঁর আজীবন। অর্থাৎ তিনি কবিয়ালি চেতনাকে সারাজীবন লালন করতে করতেই তাঁর যাবতীয় সাহিত্যকর্মের প্রাসাদ গড়ে তুলেছেন। [জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের প্রবন্ধসমূহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৫৫, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯০]

১০. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১৩১, প্রাগুক্ত।

১১. কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের সাথে জসীমউদ্‌দীনের প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৪৮-এর দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁকল্যান্ড বাঁধে। শামসুদ্দীন আবুল কালামের সেই প্রথম পরিচয়ে জসীমউদ্‌দীনের সঙ্গে কারা ছিলেন এবং তারা কী নিয়ে কথা বলছিলেন—জসীমউদ্‌দীনের শিল্পীসত্তা বোঝার জন্যে এও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লক্ষ করা যাক শামসুদ্দীন আবুল কালামের স্মৃতিকথামূলক রচনার কিছু অংশ—

সেই সন্ধ্যায় তাঁর আশেপাশে কয়েকজন পল্লীগায়ক ছিলেন। মনে হয় বেদারউদ্দীন এবং মমতাজ আলী খানও সেইখানে ছিলেন। কানাই শীলও সেইখানে ছিলেন কিনা ঠিক মনে নেই। তবে তাঁরই মতো একজন বলে উঠলেন : কাইল বাড়িতে কীর্তনের আসর বসবে বলে শুনলাম, যাবেন না কি? [শামসুদ্দীন আবুল কালাম, ‘কবিয়াল-ভাই’, মাটি ও মানুষের কবি জসীমউদ্‌দীন [সম্পা. নাসির আলী মামুন], পৃষ্ঠা : ৬৮৪, আদর্শ, ঢাকা, ২০১৩]

নগর ঢাকায় যিনি এই পরিবেশ আর আলাপে মগ্ন থাকেন, তাকে গানের লোক ছাড়া আর কী বলা যায়! জসীমউদ্‌দীনের সাহিত্যকর্ম পড়ার স্মৃতি আর তাৎক্ষণিক পরিবেশ ও আলাপ-আলোচনা থেকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম ওইদিনই জসীমউদ্‌দীনকে ‘কবিয়াল-ভাই’ বলে ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। জসীমউদ্‌দীনকে ওই সম্বোধনে ডাকতে পেরে শামসুদ্দীন আবুল কালাম এক ধরনের শ্লাঘাও বোধ করেছেন পরবর্তী জীবনে। তিনি লিখেছেন যে, ‘কবিয়াল-ভাই’ এই ‘নামে অন্য কেউ তাঁকে বিশিষ্ট করেছেন বলে আমার জানা নেই।’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের এই বাক্যে একটু শ্লাঘার ব্যাপার আছে বৈ কি! কারণ কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম পরবর্তীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের গণসংযোগ দফতরে আব্বাসউদ্দীন ও জসীমউদ্‌দীনের সাথে চাকরি করতেন। সেই হিসেবে শামসুদ্দীন আবুল কালাম নিশ্চয়ই চিন্তক-সাহিত্যিক হিসেবে জসীমউদ্‌দীনকে গভীরভাবে দেখেছিলেন ও জেনেছিলেন। এই দেখা এবং জানার ফলই এই শ্লাঘা। শামসুদ্দীন আবুল কালাম আজীবন জসীমউদ্‌দীনকে ভালোবেসে ‘কবিয়াল-ভাই’ বলেই ডাকতেন। তিনি কি জসীমউদ্‌দীনের সাহিত্যকর্মের আর যাপনের মধ্যে কবিয়ালি ব্যাপার-স্যাপার লক্ষ করেই এই সম্বোধন করতেন! এটা হওয়াই তো স্বাভাবিক।

১২. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ৩৭-৩৮, প্রাগুক্ত।

১৩. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ৪৫, প্রাগুক্ত।

১৪. জসীমউদ্‌দীনের জীবনীকার জানাচ্ছেন, ‘ছেলেরা স্বদেশী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্কুল-কলেজ ছেড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। জসীমউদ্‌দীনও এ সময় স্বদেশী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্কুল ছেড়ে দেন।’ [কুদরত-ই-হুদা, জসীমউদ্‌দীন, পৃষ্ঠা : ৩০, প্রাগুক্ত]

১৫. ১৯২০ সাল বা ১৯২১ সালকে আমরা জসীমউদ্‌দীনের নিজস্বভাবী কবিতায় পা রাখার সূচনাসময় হিসেবে শনাক্ত করতে চাই এবং একইসাথে বলতে চাই গ্রাম্যগানই জসীমউদ্‌দীনকে এই পথে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ১৯২০ বা এর কাছাকাছি সময়কে গ্রাম্যগান সংগ্রহের শুরুর সময় হিসেবে চিহ্নিত করার কারণ আছে। জসীমউদ্‌দীনের একটি গানের সংকলন আছে, যার নাম মুর্শিদা গান। এই গ্রন্থটি প্রথম ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এটি ২০০৩ সালে পলাশ প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত হয়। এই গ্রন্থে মুর্শিদা গান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কবি বেশ কিছু গানের উদাহরণ দিয়েছেন। সেখানে একটি গানের পুরোটা তুলে দিয়ে শেষে গানের সংগ্রহ সাল উল্লেখ করেছেন ১৯২০ সাল। সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, ১৯২০ সাল থেকে বা এর কাছাকাছি সময় থেকে তিনি গ্রাম্যগান সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন। এই গানের খাতা নিয়েই তিনি আইএ ক্লাসের ছাত্র থাকাকালীন দেখা করেছিলেন দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে। সেই সাক্ষাতে জসীমউদ্‌দীনের চাকরি হয় গ্রাম্যগান সংগ্রাহক হিসেবে। এরপর থেকে তিনি পুরোদস্তুর গ্রাম্যগানের সংগ্রাহক বনে যান। কলেজ ছুটির সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করতে থাকেন বিচিত্র সব গ্রাম্যগান। এই সংগ্রহ করতে করতে এরই ফাঁকে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা। তখন তিনি আইএ ক্লাসের ছাত্র। ‘কবর’ কবিতা যখন লেখা হয়েছে তখন তিনি গ্রামীণ বিষয়-আশয় নিয়ে কবিতা লেখায় সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছেন। ত্যাগ করেছেন পূর্বতন ধারার ‘রবীন্দ্রানুকরণে’ লেখা আধুনিক কবিতা। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, জসীমউদ্‌দীনের এই চেতনাগত পরিবর্তনে প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে গ্রাম্যগান। ১৯২০ সালে কলকাতা থেকে ফিরে এসে তিনি সংগ্রহ সূত্রে যতই গ্রাম্যগানের সান্নিধ্যে এসেছেন ততই তিনি তার কবিপ্রতিভার কেন্দ্রীয় প্রবণতাটিকে আবিষ্কার করেছেন। সুতরাং জসীমউদ্‌দীনকে আমরা যেভাবে চিনি সেভাবে হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গ্রাম্যগান বড় নিয়ামক ছিল। গ্রাম্যগানের ভাণ্ডার থেকে তিনি নিজের কবিতার মালমসলা নিয়ে বাংলা কবিতার ধারায় সৃষ্টি করলেন এক নতুন ধারা।

১৬. জসীমউদ্‌দীন এই নতুনধারার কাব্য-কবিতা ছাপা সম্পর্কে বলেছেন—

আমি তখন সবে আইএ ক্লাসে উঠিয়াছি। আমার কবিতার রচনারীতি পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। পূর্বে রবীন্দ্র-রচনার পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া যাহা লিখিতাম, বহু কাগজে তাহা ছাপা হইয়াছে। এমন কি ‘প্রবাসী’ কাগজে পর্যন্ত আমার লেখা প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু গ্রাম্য-জীবন লইয়া গ্রাম্য-ভাষায় যখন কবিতা রচনা করিতে আরম্ভ করিলাম, কেহই তাহা পছন্দ করিল না। কাগজের সম্পাদকেরা আমার লেখা পাওয়া মাত্র ফেরত পাঠাইয়া দিতেন। সবটুকু হয়তো পড়িয়াও দেখিতেন না। সে সময়ে আমার মনে যে কি দারুণ দুঃখ হইত, তাহা বর্ণনার অতীত।

একবার গ্রীষ্মকালে দুপুরবেলা আমাদের গ্রামের মাঠ দিয়া চলিয়াছি, এমন সময় পিয়ন আসিয়া ‘ভারতবর্ষ’ হইতে অমনোনীত ‘বাপের বাড়ির কথা’ নামক কবিতাটি ফেরত দিয়া গেল। পিয়ন চলিয়া গেলে আমি মনোদুঃখে সেই ঢেলা-ভরা চষা-ক্ষেতের মধ্যে লুটাইয়া পড়িলাম। [জসীমউদ্‌দীন, যাঁদের দেখেছি, পৃষ্ঠা : ২৫, পঞ্চম সংস্করণ, পলাশ প্রকাশনী, ১৯৯৯, ঢাকা]

১৭. জসীমউদ্‌দীন, স্মৃতির পট, পৃষ্ঠা : ৭৪, ষষ্ঠ প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ২০১৩, ঢাকা।

১৮. জসীমউদ্‌দীন, স্মৃতির পট, পৃষ্ঠা : ৭৪, ষষ্ঠ প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ২০১৩, ঢাকা।

১৯. জসীমউদ্‌দীন, স্মৃতির পট, পৃষ্ঠা : ৭৪, প্রাগুক্ত।

২০. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনাসংগ্রহ-১, পৃষ্ঠা : ৪০৯, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১২ ।

২১. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনাসংগ্রহ-১, পৃষ্ঠা : ৪১০, প্রাগুক্ত।

২২. জসীমউদ্‌দীন এবিষয়ে বলেছেন—

এক একটি গান শিখিতে আব্বাস এক মাসেরও বেশি সময় লইত। তবু আমি নিরস্ত হইতাম না। ভাবিতাম, তার মতো সুরেলা কণ্ঠে যদি গ্রাম্য-গান ঢুকাইয়া দিতে পারি, তবে শহুরে সমাজে লোকগীতির একটি উচ্চস্থান তৈরি হইবে। তখনকার দিনে শহরের কোনো জলসায়ই পল্লীগান শোনা যাইত না। কোনো কোনো নাটকে পল্লীগানকে বিকৃত করিয়া নানা অঙ্গভঙ্গি করিয়া গায়কেরা শ্রোতাদের হাস্যরসের উদ্রেক করিত। [জসীমউদ্‌দীন, স্মৃতির পট, পৃষ্ঠা : ৩৩৬-৩৭, প্রাগুক্ত]

২৩. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা সংগ্রহ-১, পৃষ্ঠা- ৪১১, প্রাগুক্ত।

২৪. জসীমউদ্‌দীন তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, ‘কবিগান উপলক্ষে বিজয় আর নিশিকান্তের সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্ব হইয়া পড়ে। আমার ঘরে বহুবার তাহাদের সঙ্গে কবিগানের পাল্লা দিয়াছি। একবার কলিকাতা বেতারে রাজেন সরকারের সঙ্গেও পাল্লা দিয়াছিলাম। আমাদের পাল্লার বিষয়বস্তু ছিল হুঁকো আর কলকে।’ [জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১২৫, প্রাগুক্ত]

২৫. জসীমউদ্‌দীন, জীবনকথা, পৃষ্ঠা : ১২৪, প্রাগুক্ত।

২৬. এই গানটি সম্পর্কে জসীমউদ্‌দীন বলেছেন, ‘আফাজদ্দিন বয়াতীর নাম শোনেননি বাংলাদেশে এমন লোক খুব কমই আছে। তাঁর মুখে কোরবানীর জারী শুনে অজস্র লোক রোদন করত। … তাঁর রচিত এই জারী গানটির কাঠামোর উপর আমি নিজেও কিছু কারুকার্য করে বর্তমান কালের উপযোগী করে গড়ে নিয়েছি।’ [জসীমউদ্‌দীন, গাঙের পাড়, পৃষ্ঠা : ২৩, তৃতীয় প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৩]

২৭. জহির আলীম, ‘পল্লীগীতি ও জসীমউদ্‌দীন’, মাটি মানুষের কবি জসীমউদ্‌দীন [সম্পা. নাসির আলী মামুন], পৃষ্ঠা : ৪৮৯, প্রাগুক্ত।

২৮. মোস্তাক আহমাদ দীন, মননচিন্তা বিবেচনা, পৃষ্ঠা : ৬০, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১৮।

২৯. মোস্তাক আহমাদ দীন, মননচিন্তা বিবেচনা, পৃষ্ঠা : ৬০, প্রাগুক্ত।

৩০. মোস্তাক আহমাদ দীন, মননচিন্তা বিবেচনা, পৃষ্ঠা : ৬৪, প্রাগুক্ত।

৩১. মোস্তাক আহমাদ দীন, মননচিন্তা বিবেচনা, পৃষ্ঠা : ৬৪, প্রাগুক্ত।

৩২. সাজ্জাদ শরিফ, ‘ভূমিকা’, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা [সম্পা. রণজিৎ দাশ ও সাজ্জাদ শরিফ] পৃষ্ঠা : ৯, সপ্তর্ষি প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৯।

৩৩. জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের ভাষণ, পৃষ্ঠা : ৮, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৫।

৩৪. জসীমউদ্‌দীন, জসীমউদ্‌দীনের ভাষণ, পৃষ্ঠা : ৮, প্রাগুক্ত।

৩৫. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা সংগ্রহ, পৃষ্ঠা- ৪১৬, প্রাগুক্ত।

৩৬. এ কারণে বোধ করি জসীমউদ্‌দীনের নিজের লেখা গানের কোনো কোনো সংকলনে অন্য লোককবির লেখা গান তিনি নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। যেমন, রঙিলা নায়ের মাঝি গানের সংকলনের ৪২ সংখ্যক গান। গানটি হুবহু লালনের। জসীমউদ্‌দীন গানটিকে তার নিজের রজনা বলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। জসীমউদ্‌দীনের মতো প্রকৃত গানের মানুষের জন্যে এটা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত ও অপ্রয়োজনীয়ও বটে। সম্ভবত গানটি সংগ্রহ করে রেডিওতে অতিরিক্ত ‘দক্ষিণা’র ‘প্রলোভনে’ নিজের নামে চালিয়ে পরে সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে তার নিজের আরো সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার ছিল। জসীমউদ্‌দীন-গবেষকদেরও উচিত এরকম আরো গান থাকলে তা চিহ্নিত করা। যাতে করে জসীমউদ্‌দীনের গান বিষয়ে অনভিপ্রেত বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হয়।

৩৭. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা সংগ্রহ, পৃষ্ঠা : ৪১২, প্রাগুক্ত।

৩৮. এস. এম. সুলতান, ‘আমার বড়ো ভাই কবি জসীমউদ্‌দীন’, মাটি মানুষের কবি জসীমউদ্‌দীন [সম্পা. নাসির আলী মামুন], পৃষ্ঠা : ৬৭১ , প্রাগুক্ত।

৩৯. হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা সংগ্রহ, পৃষ্ঠা : ৪০৯, প্রাগুক্ত।

৪০. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্‌দীন, পৃষ্ঠা : ৬৭, চতুর্থ সংস্করণ, নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ঢাকা, ১৯৯৭।

৪১. কবিতাটির কিছু অংশ দেখে নেয়া যেতে পারে—

ভাইটাল গাঙের পানি ভাটি বায়া যায়,
লিলুয়া বাতাসে ঢেউ ভাঙে কূলের গায়।
সে পারের ঢেউ এপার আসে গাঙে দিয়া পাড়ি,
দুইখানা কূল লয়ে করে কাড়াকাড়ি।
সেই না ভাইটাল গাঙের নাহি আছে দেশ,
কোথা হইতে কোথায় চলে কে করে উদ্দেশ।
[জসীমউদ্‌দীন, মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো, পৃষ্ঠা : ৪৩, তৃতীয় প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১২]

৪২. জসীমউদ্‌দীন তার কাহিনিকাব্যগুলোতে মূলত গ্রামীণ মানুষের কথা তাদের সংস্কৃতির গভীর রূপসহ তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ মানুষের হৃদয়ানুভূতি ও তাদের সংস্কৃতির আকর যে গ্রাম্যগানগুলো এ কথা জসীমউদ্‌দীন গ্রাম্যগান সংগ্রহ করতে গিয়ে গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। এ কারণে তিনি গ্রামীণ জীবনের নানা ঘটনাংশের মধ্যেকার সংস্কৃতির খাঁটি রূপের সমপ্রকাশ হিসেবে গ্রাম্যগানগুলোকে জুড়ে দিয়েছেন। ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গান সংগ্রহ করতে গিয়ে, গানের ভাবাবেশের মধ্যে থেকেই কিন্তু নক্‌শী কাঁথার মাঠ কাব্যটি লেখার প্রেরণা কবি অনুভব করেছিলেন। কবির বর্ণনায় শোনা যাক সেকথা—

সে আমার প্রথম যৌবনকাল। ভাল লাগিবার বয়স। গ্রামদেশে ঘুরিতে ঘুরিতে কত যে সুন্দর সুন্দর হলুদ-বরনী চাষী মেয়েদের দেখিতাম! তারা চকিত-হরিণীর মতো আমাকে দেখিয়া বিজলি-ঝলকে পালাইয়া যাইত! কেহ কেহ আবার ডাগর দুইটি চোখে দূরের একটি গ্রাম হইতে বহু বহুক্ষণ চক্ষু মেলিয়া আমার দিকে চাহিয়া কৌতূহল মিটাইত। ভাবিতাম, এই গাঁয়ের একটি মেয়ে আর অপর গাঁয়ের আর একটি ছেলের সঙ্গে ভালবাসা হইলে কেমন হয়? ঘুরিতে ঘুরিতে যত ছেলে দেখিতাম, আর যত মেয়ে দেখিতাম তাদের লইয়া মনে মনে জাল বুনিতাম আর ভাবিতাম ওদের দুইজনকে লইয়া একটি কাহিনী-কাব্য রচনা করিব। নৃপেন দাদার পত্র পাইয়া এই কাহিনী-কাব্য লিখিতে আরম্ভ করিলাম। [জসীমউদ্‌দীন, স্মরণের সরণী বাহি, পৃষ্ঠা : ১৭, তৃতীয় মুদ্রণ, পলাশ প্রকাশনী, ২০১৫, ঢাকা]

বলা দরকার যে, এই কাহিনি-কাব্যটিই হচ্ছে নক্‌শী কাঁথার মাঠ। এই কাব্য রচনার কথা কবি যখন ভেবেছেন আর যখন রচনা করেছেন উভয় সময়ই কবি গ্রাম্যগানের ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। [দ্রষ্টব্য : জসীমউদ্‌দীন, স্মরণের সরণী বাহি, পৃষ্ঠা : ১৬, প্রাগুক্ত] ফলে কবি যখন একটি কাহিনি-কাব্য লিখছেন তখন সেখানে গানের সন্নিবেশ ঘটা অসম্ভব কিছু নয়।

৪৩. বেগম আকতার কামাল, ‘প্রাকৃতায়নের সংস্কৃতিমন্যতা’, উলুখাগড়া [সম্পা. সিরাজ সালেকীন], পৃষ্ঠা :৮০, সংখ্যা-২৩, এপ্রিল-জুন-২০১৭, ঢাকা।

৪৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৮১।

৪৫. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্‌দীন, পৃষ্ঠা : ২৪, প্রাগুক্ত।

৪৬. জসীমউদ্‌দীন, নক্‌শী কাঁথার মাঠ, পৃষ্ঠা : ৬, একবিংশ প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৭।

৪৭. জসীমউদ্‌দীন, নক্‌শী কাঁথার মাঠ, পৃষ্ঠা : ৬৩, প্রাগুক্ত।

৪৮. জসীমউদ্‌দীন, নক্‌শী কাঁথার মাঠ, পৃষ্ঠা : ৬৬, প্রাগুক্ত।

৪৯. জসীমউদ্‌দীন, নক্‌শী কাঁথার মাঠ, পৃষ্ঠা : ৬৮, প্রাগুক্ত।

৫০. জসীমউদ্‌দীন, সোজন বাদিয়ার ঘাট, পৃষ্ঠা : ১২৬-১২৭, একুশতম প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৫।

৫১. কবিরত্ন এম. এ. হক, এপার-ওপার, পৃষ্ঠা : ৩০-৩১, মোসলেম প্রিন্টিং, ফরিদপুর, ১৯৬৭।

৫২. মোহাম্মদ আজম, ‘জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় গ্রামজীবন : যাপন-পদ্ধতির বিকল্প প্রস্তাব ও কাব্যের রাজনীতি’, মাটি মানুষের কবি জসীমউদ্‌দীন  [সম্পা. নাসির আলী মামুন], পৃষ্ঠা : ৫৫৪ , প্রাগুক্ত।

৫৩. জসীমউদ্‌দীন তাঁর পদ্মাপার গীতিনাট্যের শেষে বলেছেন, ‘এই গীতিনাট্যের গানগুলির অধিকাংশই প্রচলিত গ্রাম্যগান পরিবর্ত্তিত ও পরিবর্দ্ধিত।’ [জসীমউদ্‌দীন, পদ্মাপার, পৃষ্ঠা : ৩১, সপ্তম প্রকাশ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৪]

৫৪. সৈয়দ শামসুল হক, ‘ভাটির দেশের গান’, মাটি ও মানুষের কবি জসীমউদ্‌দীন [সম্পা. নাসির আলী মামুন], পৃষ্ঠা : ১৫৭, প্রাগুক্ত।

Kudrat E-Hud

কুদরত-ই-হুদা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুৱ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন 'ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ ও বাংলাদেশের কবিতা' বিষয়ে। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচাৱ [আদর্শ, ২০১৩]
জসীমউদ্‌দীন [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৮]

ই-মেইল : kudratehuda@gmail.com
Kudrat E-Hud