হোম গদ্য গানের শহর, কবিতার শহর : একটি অসমাপ্ত অভিযান 

গানের শহর, কবিতার শহর : একটি অসমাপ্ত অভিযান 

গানের শহর, কবিতার শহর : একটি অসমাপ্ত অভিযান 
178
0

জীবনের প্রথম বিলাত যাত্রা এতটাই আকস্মিকভাবে হয়ে গেল যে বেড়ানোর হোমওয়ার্ক করার সুযোগটাও পাই নি। কথা ছিল লিভারপুল যাব, ওখান থেকেই ফিরে আসব, কেননা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আছে। কিন্তু যাবার দু দিন আগে সেই অনুষ্ঠান কিছুটা পিছিয়ে যাওয়াতে দেখা গেল তিন-চারদিন লন্ডন ঘুরে ফিরে দেখায় কোনো সমস্যা নেই; আর সবুজ মায়াপুরীর শহর ইয়র্কেও একটা চব্বিশ ঘণ্টার ঢুঁ দেয়া যাবে সেটা ঠিক হয় বিমানে উঠার আগে আগে! তবুও গুগল মামার সহায়তায় কিছুটা হোমওয়ার্ক করে একটা খেরোখাতায় টুকে রাখি নি তা নয়, কিন্তু ব্যতিব্যস্ত সফরসূচির পাল্লায় পড়ে সেই খেরোখাতা খুলে দেখবার কোনো অবকাশই হয় নি দিন দশেকের সফরে।


ফুটবল ছাড়াও লিভারপুলের নামটা প্রথম শুনেছি বিটলসদের শহর হিসেবে খ্যাতির কারণে, দ্বিতীয়ত খোন্দকার আশরাফ হোসেনের এক দুর্দান্ত প্রবন্ধ ‘লিভারপুল কবিকুল’ মারফত।


দেশে ফেরার আগের রাতে লন্ডনপ্রবাসী বন্ধু ফজলে রাব্বী আর ফয়সালের পরিবারের সাথে এক বিখ্যাত তুর্কী রেস্তোরাঁয় ভোজ শেষে ফয়সালের বাসায় ফিরে লাগেজ গুছাতে গিয়ে রাব্বীর উপহার দেয়া বই দুটো হাতে নিয়ে দেখি একটা বই মিথোলজি বিষয়ে—আমাকে দিয়েছে যাতে কবিতায় মিথ ব্যবহার করি; অন্যটি ঢাউস এক প্রেমের কবিতার সংকলন—আমি যাতে অনুবাদ করি কিছু কিছু। কবিতার এনথলজির প্রথম পাতা খুলেই যুগপৎ বিস্মিত আর কুণ্ঠিত হয়ে দেখি প্রথম কবিতার কবির নাম আড্রিয়ান হেনরি—যিনি কিনা আমার হোমওয়ার্কের খাতায় ছিলেন তার সতীর্থ কবিদেরসহ, এমনকি তাদের বিচরণ করা মার্সে নদীর পাড়ে ঘুরেও এসেছি, তাদের লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হওয়া বিখ্যাত কাব্য সংকলনটি [দ্য মার্সে সাউন্ড] যে বুকস্টলে পাওয়া যায় সেটি ছিল আমার প্রথম হোটেল থেকে কাছেই [লিভারপুলে দু দুটো হোটেলে থেকে এসেছি, ৩ দিন হ্যাম্পটনে, ৪ দিন হিলটনে—এখান থেকেও অস্থির সফরসূচির আলামত মিলবে!] এমনকি এই কবিতাটির বাংলা অনুবাদও আমি পড়েছি আগে। তবে সীমিত হোমওয়ার্কে তাদের অন্য কোনো স্মারকের কিংবা মিউজিয়ামের হদিস পাই নি বলে ‘লিভারপুল কবিকুলে’র সন্ধানে কিছুটা নিরুৎসাহিত ছিলাম।

ফুটবল ছাড়াও লিভারপুলের নামটা প্রথম শুনেছি বিটলসদের শহর হিসেবে খ্যাতির কারণে, দ্বিতীয়ত খোন্দকার আশরাফ হোসেনের এক দুর্দান্ত প্রবন্ধ ‘লিভারপুল কবিকুল’ মারফত। বিটলস মিউজিয়াম [দ্য বিটলস স্টোরি] ঘুরে দেখে এসেছি লিভারপুলে পা দিয়েই, কেননা সুবিধা ছিল সম্মেলনস্থল [এসিসি কনভেনশন সেন্টার] থেকে আলবার্ট ডকের সেই মিউজিয়াম ছিল ইস্টক নিক্ষেপ দূরত্বে [‘ইস্টক নিক্ষেপ দূরত্ব’ কথাটা অন্য কোনো প্রসঙ্গে খোন্দকার কবির মুখে উচ্চারিত হতে শুনেছি বলেই মনে পড়ে গেল]।

বিটলসদের মিউজিয়ামে ওদের সারাজীবনের গল্পগুলো জীবন্ত করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে—অজস্র ছবি, হেডফোনে ধারা বর্ণনা, লিভারপুলে তাদের হয়ে ওঠা, প্রথম আবির্ভাব, প্যান আম বিমানে চেপে আমেরিকায় জয়যাত্রা, দল ভেঙে যাওয়া, জন লেননের মৃত্যু, বর্ণাঢ্য ভারত সফর, সেকালের মঞ্চের আদলে সাজানো মঞ্চ, ওদের আড্ডা দেয়া ক্যাফের আদলে কিংবা ওদের অফিস ঘরের হুবহু প্রতিস্থাপন, ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, বিটলস ম্যানিয়ার সাক্ষ্য প্রমাণ, তাদের পোশাক, হলুদ একটা সাবমেরিন, জন লেননের চশমাগুলো—সব কিছু মিলিয়ে বিটলসকে চিরজীবী রাখবার আয়োজন। মিউজিয়ামের স্যুভেনির বিক্রির জায়গাটাও যেন-বা এক মিনি জাদুঘর—বিটলসদের লোভনীয় সব স্যুভেনির। রকগানের দল বিটলস ষাটের দশকে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।

কিন্তু বিটলসের গল্পের আগেও লিভারপুলের গান-কবিতার জগতে আরেকটু গল্প আছে। ষাটের দশকে আড্রিয়ান হেনরি ও তার সতীর্থরা মিলে পপ সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে কবিতা লিখতে শুরু করলেন সংগীতের তালে তালে, গানের সাথে কবিতার ব্যবধান দিলেন ঘুচিয়ে, শ্রোতারা ভিড় করে কবিতা শুনতে এল, কবিতার রেকর্ড বিক্রি হতে থাকল গানের সাথে পাল্লা দিয়ে এবং তাদের কেউ কেউ [রজার ম্যাকগাফ, ‘স্ক্যাফোল্ড’ নামের পপ দল গড়েন পল ম্যাককার্টিনির ভাইয়ের সাথে, আড্রিয়ান হেনরির গানের দল ছিল ‘পোয়েট্রি ইন মিউজিক’] গানের দলের সাথেও যুক্ত হলেন। রিঙ্গো স্টার এদের সাথে বাজিয়েছেন, এলটন জনও ছিলেন এদের যাত্রার কোনো এক দৃশ্যপটে। কবি ও চিত্রকর আড্রিয়ান হেনরি, ব্রায়ান প্যাটেন, রজার ম্যাকগাফরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বিট কবিদের থেকে [পরে এলেন গিনসবার্গ, এই ত্রয়ীর কাব্য সংকলন ‘দা মার্সে সাউন্ড’ এর ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন]।ব্রিটিশ কবিতায় তারা নতুন এক জনপ্রিয় ধারার সূচনা করেন। বিটলসদের ওপরেও লিভারপুল কবিকুলের প্রভাব ছিল।

ষাটের দশকে তাদের কবিতার সংকলন [পেঙ্গুইন মডার্ন পোয়েটস সিরিজের ১০ম খণ্ড] ঢাকায় এসে পৌঁছুলে ঢাকার কবিরাও আলোড়িত হন, তাদের নাকি ‘নিদ টুটে যায়!’ শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ এমনকি শামসুর রাহমানের অনেক কবিতায়ও মার্সে নদীর তরঙ্গ খেলা করতে লাগল। গানের আস্থায়ীর মতো পুনরাবৃত্তি, একটি ধ্রুবপদকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসা, মুখের ভাষা, কৌতুক—এসব ছিল লিভারপুল কবিকুলের কবিতার বৈশিষ্ট্য। আড্রিয়ান হেনরির ‘লাভ ইজ [ভালোবাসা মানে ফিস অ্যান্ড চিপস শীতরাত্রির মুখ/ ভালোবাসা মানে কম্বল তলে অদ্ভুত কিছু সুখ]’ কবিতার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় রফিক আজাদের ‘ভালোবাসা মানে’ [ভালোবাসা মানে দুজনের পাগলামি,/ পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা; /ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া…] কবিতায়, ‘যদি ভালোবাসা পাই’ [যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেব/ জীবনের ভুলগুলি/ যদি ভালোবাসা পাই…] কবিতায়। নির্মলেন্দু গুণের ‘তুমি চলে যাচ্ছ’ কবিতায় বারবার এই ধ্রুবপদটি ফিরে আসতে দেখা যায় [তুমি চলে যাচ্ছ, নদীতে কান্নার কল্লোল,/ তুমি চলে যাচ্ছ, বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ,/ তুমি চলে যাচ্ছ, চৈতন্যে অস্থির দোলা, লঞ্চ ছাড়ছে]; কিংবা গুণের ‘সংসার মানে সোনার কাঁকনে জীবনের রঙ লাগা,/ সংসার মানে রক্ত মাংসে সারারাত্তির জাগা]। শামসুর রাহমানের ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে ‘জীবন মানেই’ [জীবন মানেই/ মাথলা মাথায় মাঠে ঝাঁ ঝাঁ রোদে লাঙল চালানো,/ জীবন মানেই/ ফসলের গুচ্ছ বুকে নিবিড় জড়ানো,/ জীবন মানেই/ মেঘনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে দাঁড় বাওয়া পাল খাটানো হাওয়ায়/] কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার দীর্ঘ তালিকাবয়ন লিভারপুল কবিদের শৈলীতেই লেখা হয়েছে [প্রিয়তমা তুমি বিড়ালের থাবা, মধ্যরাতের/ সোনালি মাছের নীল নীরবতা/ প্রিয়তমা তুমি ঢেউয়ের নাচন/ নম্র শীতল পাখির পালকে ঢেকে রাখো পাতা/ আমার পায়ের/ প্রিয়তমা তুমি প্রায় আনকোরা খেলনা ভালুক… রজার ম্যাকগাফ, হোয়াট ইউ আর] । আড্রিয়ান হেনরির ‘ডোন্ট ওরি এভরিথিংজ গোয়িং টু বি অলরাইট’ [Don’t worry/ About those lunatics in the government/ Everything’s going to be all right/ The country will be governed by beautiful girls under I8… ] কবিতার অনুসরণে শহীদ কাদরী লিখলেন ‘ভয় নেই প্রিয়তমা/ আমি এমন ব্যবস্থা করব…’ [তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা]। শহীদ কাদরি তালিকাবয়নের কাজটি করেছেন ‘রাষ্ট্র মানেই’ কবিতায়ও। শহীদ কাদরী নিজের মেজাজ থেকে বেরিয়ে এসে এই বইয়ের কবিতাগুলো লিখেছিলেন। [পুনশ্চ : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘যদি নির্বাসন দাও’ কবিতাটিও একই ঘরানার]।


মার্সে নদীতীরের লিভারপুল কবিকুলের সেই কাব্যধারা নদীর গতিপথ বদলানোর মতো করেই বদলে গেছে, ব্রিটিশ এবং বিশ্বকবিতায় এসেছে নতুন বাঁক।


বাংলা ভাষার এই কবিতাগুলো আবার দীর্ঘ ও বিস্তৃত প্রভাব ফেলেছিল তরুণ কবিদের ওপর, কেননা এই শৈলীতে কবিতা লেখা আপাত সহজ মনে করে তরুণ—অনতি তরুণেরা হাজার হাজার ‘ফেব্রুয়ারি তুমি ‘অমুক তমুক কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’ অমুক তমুক’ লিখতে শুরু করলেন; এখনো এই ধারা বন্ধ হবার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্সে নদীতীরের লিভারপুল কবিকুলের সেই কাব্যধারা নদীর গতিপথ বদলানোর মতো করেই বদলে গেছে, ব্রিটিশ এবং বিশ্বকবিতায় এসেছে নতুন বাঁক। কিন্তু ষাটের দশকে হয়তোবা অলৌকিক কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় লিভারপুল শহরের মার্সে নদীর তীর থেকে বিটলসের গান আর লিভারপুল কবিকুলের কবিতা যে দুনিয়া মাতিয়েছিল সেই ইতিহাস মিথ্যে হয়ে যাবে না। দেশে ফিরে এসে আমার একটাই আফসোস ছিল যে এদের কোনো স্মারক সংগ্রহ করে আনতে পারি নি। প্যারাসিটামল কিনতে গিয়ে এয়ারপোর্টে পঞ্চাশ পাউন্ডের নোট ভাঙানোর আফসোস ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এই আফসোস দীর্ঘস্থায়ী। মন্দের ভালো রাব্বীর দেয়া বইটিতে সেকালের কবিতার নমুনা আছে—

Well I woke up this mornin’ it was Christmas Day
And the birds were singing the night away
I saw my stocking lying on the chair
Looked right to the bottom but you weren’t there
there was
apples
oranges
chocolates
. .. . aftershave
but no you.

So I went downstairs and the dinner was fine
There was pudding and turkey and lots of wine
And I pulled those crackers with a laughing face
Till I saw there was no one in your place
there was
mincepies

brandy
nuts and raisins
. . . mashed potato
but no you.

Now it’s New Year and it’s Auld Lang Syne
And it’s 1 2 o’clock and I’m feeling fine
Should Auld Acquaintance be Forgot?
I don’t know girl, but it hurts a lot
there was
whisky
vodka dry Martini (stirred
but not shaken)

… and 12 New Year resolutions
all of them about you.

So it’s all the best for the year ahead
As I stagger upstairs and into bed
Then I looked at the pillow by my side
… I tell you baby I almost cried

there’ll be

Autumn

Summer

Spring

. . . . and Winter

all of them without you.

[Poem by Adrian Henri / Adrian Henri’s Talking After Christmas Blues]


রেফারেন্স :

•  লিভারপুল কবিকুল, বিশ্ব কবিতার সোনালি শস্য, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আগামী, ২০০৫
•  Love Poems [collection of love poems from BBC radio program ‘Poetry Please’] Faber & Faber, 2015

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

গল্প—
স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প [চৈতন্য, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com