হোম গদ্য গল্প হোসাইন্না

হোসাইন্না

হোসাইন্না
371
0

একদিন বাসা থিকা রাগারাগি কইরা বাইর হইয়া গেল জনি। আর ফিরবে না মর্মে। হিতাহিতজ্ঞানশূণ্যবস্থায় সকালে এক বাসে উঠলে রাত সাড়ে দশটায় দেখে বিরিশিরি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ায়ে।

বিরিশিরিতে এইটাই অনেক রাত। অনতিদূরে সোমেশ্বরী।কুলু কুলু বহিয়া চলেছে। উপরে বিরাট এক সেতু। পার হইলেই দুর্গাপুর। শুসং দুর্গাপুর। শুসং রাজার বাড়ি। মনি সিংয়ের বাড়ি। টঙ্ক বিদ্রোহের ঘাঁটি।

তা থাকুক, জনির দরকার একটা থাকার জায়গা। রাত্রিযাপনের।

চেনা না থাকলে বিপদে পড়ার চান্স ছিল। কিন্তু গতবছর মিজানের সাথে বিরিশিরিতে এক দফা আইছিল জনি। এনজিওর কর্মশালায়। গণগবেষণা। পার্টিসিপেটরি একশন রিসার্চ।

গালভরা ব্যাপার স্যাপার। গ্রাম গঞ্জের দুনিয়ার লোক ডাইকা আইনা সারাদিন ভ্যাজর ভ্যাজর করা। আর দুপুর হইলে মাছ দিয়া মাংস দিয়া ডাইল দিয়া ভাত খাওয়া।

জনি বেশিক্ষণ টিকতে পারে নাই। ঘণ্টাখানেক থাইকাই খেলা বুইঝা গেছে। ফলে আলগুস্তে গবেষণা কর্ম বাদ দিয়া সোমেশ্বরী পানে ছুটেছে।

রিশকায় কলমাকান্দা, মাথার উপরে নীলাকাশ, সোমেশ্বরীর ওইপারে মেঘালয়ের নীলচে পাহাড়।

আয় আয় কইরা জনিরে ডাকতেছিল এইরকম না ব্যাপারটা। তারপরও জনির ছুইটা যাইতে ইচ্ছা করতেছিল।

ছুইটা যাওয়ার বেদনা কাটাইতে জনি ফশ কইরা একটা সিকারেট ধরায়।

জোরে একটা টান দিয়া ফুক ফুক কইরা নিজেই নীলচে ধোঁয়া উড়ায়। ফিক ফিক কইরা হাসে আর মনে মনে কয়, ঘন গো এষণা।

ঘুইরা মুইড়া আইসা দেখে খানাদানা শেষের পথে। জনিরে দেইখাই মিজান ঈষৎ উস্মা প্রকাশ করে।

এতক্ষণ কই ছিলি? কত দারুণ সব ব্যাপার নিয়ে কথা হলো!

জনি মিচকি হাসে। একটু সোমেশ্বরী দেখলাম।

মিজানও হাসে। আয় খাবি, তর জন্য বসে আছি।


এই দেশেই উন্নয়ন সম্ভব, বিপ্লবও। জনগণের বুঝাবুঝিডা কেবল পরিষ্কার করতে হবে।


খাওয়া শেষে ফের ভ্যাজর ভ্যাজর। জনি রুমে চইলা আসে, বইসা বইসা বিড়ি টানে। আর ফুক ফুক কইরা হাসে।

সন্ধ্যায় পানির বড় বড় বোতলে মিজান চু নিয়া আসে। স্টিলের দুইটা গেলাশ উবু ডুবু কইরা ভইরা কয়, নে খা।

জনি চুক চুক কইরা টক টক চু টানতে থাকে। এক গেলাশ টানার পরেই একটা নিঃসঙ্গ আমোদ একটু একটু করে ঘিরে ধরে তারে।

ডর্মের উঠানে দণ্ডায়মান ছাতিম বৃক্ষ হতে ছাতিম ফুলের বাসনা উড়িয়া আসিতে থাকে। তার কেবলই ঘুম পাইতে থাকে।

বোতল শেষ হইতেই মিজানের চোখ লাল। কারে জানি সে ফোন দেয়।আস্তে আস্তে গলা চড়তে থাকে।

ঘর হইতে দোতলার বারান্দায় বাইর হইয়া যায়। তারপর হৃদয়বিদারক চেঁচামেচি করিতে থাকে।

ঝুমুর তুই কি ‍বুঝস না, আমি তোরে কতটা ভালবাসি? আর কবে বুঝবি? চুদমারানি খানকি মাগী। বাল কস তুই। হই সর, এইসব আমারে বলবিনে।

অভিমানে ফাটিয়া পড়ে। মিজানের গলার রগ ফুলিয়া যায়। তার ঝাঁকড়া চুল লাফাইতে থাকে। সে ঘামিয়া চুরিয়া অস্থির হইয়া যায়। তার চোখ লালিমা বর্ণ হইতে রক্তাভা ধারণ করে।

জনি ঘুমে ঢলিয়া পড়িতে থাকে।ছাতিমের ঝাঁঝালো সুবাস মাথায় ঢুকিয়া ঝুমুর ঝুমুর নাচিতে থাকে। ঝুমুর কথা শোনে না, মিজান তারে কথা শুনাইতে চাহে।

এই যে চাওয়া চাওয়ি এই যে পাওয়া পাওয়ি পারাপারি কাড়াকাড়ি গণগবেষণার ফললাভে ব্যর্থ হইয়া মিজান রক্তাভা বর্ণ ধারণ করিতে থাকে।

তারপর এক সময় সব চুপচাপ, শুনশান, নিশ্চুপ চারিধার।

মিজান ঘরে ঢুকিয়া জনিরে ধাক্কায়, দোস্ত ঘুমাইয়া পড়ছ?

না নাহ বলিয়া জনি কালঘুম তাড়ায়।

মিজানের কাছথন সিকারেট লইয়া জোরসে টান দেয়, তারপর ফুক ফুক ধুমা ছাড়িয়া যায়।

মিজান আরেকটা সিগ্রেট ধরাইয়া কহিতে থাকে, এই দেশেই উন্নয়ন সম্ভব, বিপ্লবও। জনগণের বুঝাবুঝিডা কেবল পরিষ্কার করতে হবে।

কথা না বলিয়া ফিক ফিক ধুমা ছাড়িয়া যায় জনি।

জনির রিকশা ডর্মে আসিয়া পড়ে। চারপাশ শুনশান। কেউ নাই যেন। কেবল ছাতিম গাছটা পরিচিতের মতো হাসে, ঝাঁঝালো সুবাস ছড়াইয়া।

ডর্মের সব ঘর অন্ধকার, কেবল একটা ঘরে টিমটিমে বাতি জ্বলিতেছে। জনি রিকশাওয়ালাকে ছাড়ে না, তাকে নিয়াই টিমটিমে ঘরের দিকে আগাইতে থাকে।

আর তখনই একটা লোক অন্ধকার থেকে এগিয়ে আসে। কহে, কোথা থেকে এসেছেন।

ঢাকা থেকে।

কী করেন?

কিছু করি না, কহিতে চাইয়া কহে, লেখালেখি।

মানে?

মানে সাংবাদিকতা।

ও সাংবাদিক?

জ্বি।

কিন্তু আমরা তো এইভাবে রুমভাড়া দেই না। আমাদের সাথে আগেভাগে যোগাযোগ করে আসতে হয়।

জনি মুশকিলে পড়ে যায়। কয়, কিন্তু আমার তো আসলে একটু জরুরি…

আগে কখনও আসছিলেন?

জ্বি, একবার একটা এনজিওর একটা কর্মশালায়।

ওহ আচ্ছা। ঠিক আছে, দোতলার একটা রুম দিচ্ছি। পরের বার অবশ্যই যোগাযোগ করে আসবেন।

জ্বি আচ্ছা বলে জনি ফশ করে একটা সিগ্রেট জ্বালায়। আগুন্তক ২০৩ লেখা একটা চাবি দেয়।

রিকশাভাড়া মিটাইয়া হ্যান্ডব্যাগটা নিয়া জনি ধীরে ধীরে দোতলায় উঠে।

সেই রুমটাই। যে রুমে মিজান আর সে মিলে জীবনের একটা কিংবা দুইটা রাত একসাথে কাটাইছে।

তালা খুলে ঘরে ঢুকে আলো জ্বালে। ছোট্ট ঘরজুড়ে একটা নিঃসঙ্গতা হাহাকার করছে। জনি বুঝে যায় সেইদিন আর এইদিন আলাদা।

স্যান্ডেল খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। একটা অনাড়ম্বর আরাম তারে ঘিরে ধরে। জনির ভালো লাগতে থাকে। খুব ইচ্ছা করে নীপাকে একটা ফোন দেয়। বদলে সে একটা সিগ্রেট জ্বালায়।

হঠাৎ ঝুমুরকে মনে পড়ে। ঝুমুর কি মিজানের প্রেমিকা ছিল? নাকি শুধুই বান্ধবী?

মিজান কিছু বলে নাই। জনিও কিছু জিগায় নাই। কেবল মনে হইছিল কী এক গভীর সম্পর্কের জাল তারা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিম্বা বুনে বুনে।

ছাতিম বৃক্ষ কুয়াশা কেটে কেটে সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। জনি ঘুমাইয়া পড়ে।

সোমেশ্বরীর পাড় ঘেঁষে হাঁটতে থাকে জনি। কলমাকান্দার দিকে, উদ্দেশ্যবিহীন। কিছুই ভালো লাগে না তার। দূরে মেঘালয়ের নীলচে পাহাড়।

ফিরে আসে সে।

দুপুরে ডিমভাজি দিয়া রুটি খায়, বিরিশিরি বাজারে। খাওয়া শেষে হাত ধুইতে ধুইতে হোটেলের বয়রে জিগায়, এইখানে চু পাওয়া যায় কই?

পিচ্চি ফিচেল হাসে। কয়, আমি তো জানি না।

জনি বুঝে যায়, তার মানে চু পাওয়া যথেষ্ট ইজি না।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ছোট্ট বাজারটি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে জনি। তখনই চোখে পড়ে গাড়োদের পণ্য বোঝাই একটা বিপণী।

ভিতরে ঢুকে দেখে সদা হাস্যময় এক নারী। শৈমুল। স্বামীহীনা, দুই বাচ্চার মা।

দাদা ঢাকা থেকে এসেছেন?

জ্বি ঢাকা থেকে।

দুপুরে খেয়েছেন?

জ্বি মাত্র খেলাম। আপনারা খাননি বুঝি?

না খাইনি। এখনই খাবো।

কী খাবেন?

শামুক।

শামুক!

জ্বি শামুক।

দেখি তো?

আপনি খাবেন?

হু…

শৈমুলের সে কি হাসি। তার টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি কালো কালো ছোট ছোট শামুক। গুগলি। শামুকের উপর ছড়ানো ছিটানো সাদা ভাত।

দেখে জনির মাথা ঘুরান্টি দেয়। এইটা কীভাবে খাবে?

শৈমুল খাওয়ার কায়দা দেখাইয়া দেয়।

সেই অনুযায়ী জনি খাইতে যায়, কিন্তু পারে না।

শৈমুল হাসে, পাশে দাঁড়াইয়া থাকা তরুণীও হাসিতে থাকে। একে অন্যের গায়ে ঢলিয়া পড়ে।

শৈমুল অবশেষে মুক্তি দেয়, থাক দাদা তোমার আর চেষ্টা করতে হবে না।

জনি হাফ ছাড়িয়া বাঁচে।শৈমুলের বিপণী ছাড়বার আগে তার মোবাইল নম্বর খানা টুকিয়া লইয়া আসে।

আর তখনই হোটেলের পিচ্চি ছুটিয়া আসে, স্যার পাওয়া গেছে। দুইশ ট্যাকা লাগব।

দুইশ কীরে, একশতে দুই বোতল দেয়। জনি উল্টো পিকাপ নিতে চায়।

কিন্তু পিচ্চি ফিচেল আছে। কয়, আগে দিত, এখন বাইড়া গেছে।

জনি জানে, কিন্তু কিছু করার নাই। অগত্যা পকেট হইতে দুইশ বাইর কইরা দেয় পিচ্চির হাতে।

পিচ্চি টাকা হাতে নিয়া কয়, বিকালে আইসেন।

টাকা মাইর যাবার ভাবনা জনিকে পেয়ে বসে। সে সন্দেহের দৃষ্টিতে পিচ্চিকে দেখতে থাকে। কিন্তু ঝুঁকি বিনে কার্য হাসিল হবে না জেনে সন্দেহকে দূরে সরিয়ে দেয়। বরং মিজানের উপর এক ধরনের গোস্বা হয় তার। শালায় থাকলে এইরকম ঝামেলা পোহাইতে হইত না তারে।

ট্যাকা লইয়া পিচ্চি চম্পট দিলে জনি ফের হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে সোমেশ্বরী, কুলু কুলু বহিয়া যায়।

সেতু পার হইয়া সুশং দুর্গাপুর। মেয়েদের ইশকুল। বাজার। দূরে মেঘালয়ের নীলচে পাহাড়। ডাকে আয় আয় আয়। যাইতে পারে না বিধায় জনি ফশ করে সিগ্রেট ধরায়। টানিতে টানিতে ফেরার রাস্তা ধরে।

সন্ধ্যায় চু লইয়া পিচ্চি হাজির। জনি কিঞ্চিত লজ্জা পায়, নিজের ভাবনার কথা ভাইবা।

তবে খুশি হইতে দেরি করে না, দুই লিটারের একটা ঢাউস বোতল দেইখা।

মাল বুইঝা লইয়া পিচ্চিকে দশটি টাকা উপঢৌকন দেয়। পিচ্চিও খুশি হয়।

পিচ্চি চইলা গেলে জনি গেলাশ ভইরা নেয়। চুক করিয়া একটা চুমুক দিয়া চুয়ের টক টক স্বাদটা বুইঝা নেয়। তারপর একটা গভীর চুমুক। গেলাশ প্রায় খালি হইয়া যায়। ছাতিম ফুলেরা ঝাঁঝালো সুবাস ছড়াইয়া দেয়, কুয়াশার ফাঁকে ফুঁকে।

চাঁদের আলোয় ডর্মের দোতলা ভাইসা যায়। জনির ফোন বাইজা ওঠে। স্ক্রিনে লেখা নীপা। বহু আকাঙ্ক্ষিত কল।

জনি ধরতে যায়, কিন্তু ধরে না। চিরিপ চিরিপ ফোন বাইজা যায়।

জনি আরেক গেলাশ ঢালে। চুক চুক করে গলায় ঢালতে থাকে। ফোন বাজিয়া যায় চিরিপ চিরিপ চিপ…

জনির চোখ মিজানের ন্যায় লালিমা বর্ণ ধারণ করতে থাকে। ঈষৎ ঢুলু ঢুলু লাগে। ফোন বাজতে বাজতে হয়রান হইয়া যায়।

ফোন হাতে লইয়া জনিরও মিজানের ন্যায় ঝুমুরের সাথে ঝগড়া করিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে করে না। তার ভয়ানক নিঃসঙ্গ লাগে।

দরোজা খুইলা দোতলার বারান্দায় দাঁড়ায়। ছাতিম গাছের নিচে কে যেন দাঁড়াইয়া আছে। ভূত? হতে পারে। কিচ্ছু আসে যায় না তাতে।

জনি বুক ফুলাইয়া দাঁড়ায়, তার ভূতের সাথে বোঝাপড়া করবার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু কোথাও কেউ নাই। না ভূত না মানুষ। পুরো ডরমিটরি খা খা। এ এক বিজাতীয় নিঃসঙ্গতা।

জনির শৈমুলের কথা মনে পড়ে। সে ফোন টিপে টিপে শৈমুলের নম্বর বের করে। কল দেয়।

হ্যাঁলো দাদা?

কে? শৈমুল?

হ্যাঁ দাদা আমি বলছি।

কী করছ?

কিছু না, ভাত খেয়ে শুয়ে পড়ব ভাবছি।

এত তাড়াতাড়ি!


নীপার টেক্সট, খানকির পোলা, তুই আর বাসায় ফিরবি না।


এটাতো ঢাকা নয় দাদা, এখানে এটাই অনেক রাত। আপনি কী করছেন?

চু খাচ্ছি।

চু খাচ্ছেন?

হ্যাঁ, কেন তুমি খাও না?

না, আমরা তো এসব খাই না।

বলো কি! আমি তো ভাবছিলাম, এখানকার সবাই চু খায়।

না, সবাই না, কেউ কেউ খায়।

তাই নাকি! আমি তো ভাবছিলাম, তোমার সাথে বসে চু খাব।

শৈমুল হাসে। জনি বিরাট রিস্ক নেয়। বলে, তুমি চলে আসো এখানে। আমার কাছে।

শৈমুল হাসি থামিয়ে বলে, আমার বাচ্চা আছে। সংসার আছে।

কিন্তু তোমার তো স্বামী নাই। জনি মরিয়া হয়ে ওঠে।

তাতে কী। আমি এসব করি না।

জনি তখন অনন্যোপায় হয়ে ওঠে। কয়, তোমার সাথের মেয়েটা?

ওর নতুন বিয়ে হয়েছে।

তাতে কি তুমি ওকে বলে দেখ..

না, ও এসব করবে না। আমি জানি।

ও। হতাশ হয়ে পড়ে জনি।চূড়ান্ত হতাশ।

তুমি ঢাকা থিকা নিয়া আসো নাই কেন? সবাই তো নিয়া আসে..

আমি তো জানি না আসলে…

মৈমনসিঙ যাও…ওখানে পেতে পারো।

ঘুম থিকা উইঠা জনি মৈমনসিঙ রওনা হয়। বাস গাদাগাদি, হেলতে দুলতে রওনা হইছে কি হয় নাই, তখনই নীপার টেক্সট, খানকির পোলা, তুই আর বাসায় ফিরবি না। তর মা খানকি, তর ভাইয়েরা খানকি বোনেরা খানকি।

এর বেশি আর পড়তে পারে না জনি। মোবাইলটা অফ কইরা দেয়।

লক্‌কর ঝক্কর বাস মৈমনসিঙ পৌঁছাইতে পুরা বিকাল।জনি দেরি না কইরা রিকশা লইয়া সোজা খানকি পাড়া চইলা যায়। সামনে যারে পায় তারে নিয়া ঠাকুর ডোবায়।

হুঁশ ফিরে এলে জিগেশ করে, তর নাম কী?

শিউলি।

বিরিশিরি যাবি?

বিরিশিরি যাইতাম না। আঙ্গো নিষেধ আছে।

জানালার পাশে বসে সিগ্রেট ফুকতে থাকে জনি। বাস হেলতে দুলতে বিরিশিরি ফিরতে থাকে। রাস্তায় কত মানুষ ওঠে কত মানুষ নাইমা যায়, কে জানে। বিরিশিরি যতই কাছাইয়া আসে, মানুষ ততই কমতে থাকে।

জনি অন্ধকারে তাকাইয়া জানালা দিয়া আসা বাতাস খায়। হঠাৎ বাসের ভিতর গেঞ্জাম লাগে। অন্ধকার থিকা মুখ ফিরাইয়া বাসের ভিতরে তাকায়।

আর তখনই মেয়েটারে দেখতে পায় জনি। তারই পাশে বসা। চোখে অপার কৌতুক নিয়ে ভাড়া বিষয়ক গেঞ্জাম দেখতেছে।

জনি মেয়েটারে জিগায়, কী হইছে?

ভাড়া কম দিতে চাইছে।

ওমা তাই নাকি!

হুম। মেয়েটা এমনভাবে হুম বলল যে তার গাম্ভীর্য ফুঁড়ে সকল সৌন্দর্য জনির কাছে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার মাথাভরা কোকড়া চুল, মরাল গ্রীবা, সুগঠিত ওষ্ঠে কৌতুকময় হাসি।

বিমোহিত জনি ফের জিগেশ করে, আপনি কোথায় যাবেন?

বিরিশিরি। চোখ না ফিরিয়েই জবাব দেয় সে।

ওহ তাই! আমিও তো বিরিশিরি যাব। নিজের উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারে না জনি।

এইবার তরুণী সৌজন্যবশত জনির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায়।

জনির সামনে একটা পদ্মফুল প্রস্ফুটিতে হতে থাকে। সে বিহ্বল গলায় ফের জিগেশ করে, আপনার নাম জানতে পারি?

হোসাইন্না। তোর?

জনি ধাক্কা খায় কিঞ্চিত। বাপের জন্মে কোনও অপরিচিত নারী তাকে তুই তুকারি করেনি। কিন্তু এখানকার নিয়ম হয়তো এরকমই।

তাই সে ধাক্কা ভুলে জবাব দেয়, জনি।

তোর নামটা সুন্দর, তুইও। নায়কের মতো দেখতে।

এইবার জনিও পেয়ে বসে। ফশ করে একটা সিগ্রেট ধরায়। অন্ধকারে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, তুইও সুন্দর। অনেক সুন্দর। মাথাখারাপ করা সুন্দর।

হোসাইন্না খিলখিল করে হাসে। বাসে তেমন লোক নাই। তাই কেউ দেখেও না দেখে।

তুই কী করিস? চাকরি না পড়াশোনা?

চাকরি।

কোথায়?

একটা বিউটি পার্লারে।

বিউটি পার্লারের কথা শুনে জনি আশায় বুক বাঁধে। আরও সাহসী হয়ে ওঠে সে, এইজন্যই তুই এত সুন্দর।

ফের খিলখিল করে হাসে হোসাইন্না। জনির কেন যেন মনে হয়, হবে। এখানে হবে, কিছু একটা হবেই।

তুই কোথায় থাকিস, জনি ফের প্রশ্ন করে।

অনেক দূরে। পাহাড়ের কাছে।

যাবি কীভাবে?

সেটাই ভাবছি।কী করে যে যাই। দুর্গাপুরে আমার কেউ নাই।

আমার সাথে যাবি?

কোথায়?

ডর্মে

কত টাকা দিবি?

জনির মন নেচে ওঠে, এত সরাসরি আলাপে।কিন্তু দরদাম ভুলে যায় না। তাই পাল্টা প্রশ্ন করে, তুই কত চাস?

দুই হাজার।

ইশ না! অনেক বেশি। পাঁচশ দিতে পারি।

পাঁচশতে হবে না, এক হাজার দিস।

এক হাজার পারব না, সাতশ নিস।

তুইতো অনেক কিপ্টা?

এইবার জনি হাসে।খিল খিল করে হাসে।

কন্ডাকটর তাগাদা দেয়, ভাই নামেন, হাসাহাসি পরে কইরেন।

রিকশায় উঠে হোসাইন্নারে জড়িয়ে ধরে জনি। টুক করে চুমা খায়। হোসাইন্না খিলখিল করে হাসে। দুনিয়ার আমোদ জনির মনে উপচে পড়ে।

ডর্মে এসে সন্তর্পণে হোসাইন্নারে নিয়ে রুমে ঢোকে। যাতে কেউ টের না পায়। কেবল ছাতিম ফুলেরা মুচকি হেসে সুগন্ধ বিলায়।

ঘরে ঢুকে সাততাড়াতাড়ি দরোজা এঁটে দেয়। তারপর নিশ্চিন্ত।

এবার বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে গত রাতের বোতলে থাকা অবশিষ্ট চু গেলাশে ঢেলে নেয়। একটা হোসাইন্নাকে দিয়ে আরেকটা নিজে নেয়।

তুই চু খাস তো?

খুব খাই।

কিন্তু শৈমুল তো খায় না।

শৈমুল কে?

এইখানে একটা দোকানে কাজ করে।

ও।অনেকেই তো খায় না।

তাহলে তুই খাস কেন?

সব মেয়েই কি তোর কাছে আসে?

হুম…হোসাইন্নার পাল্টা প্রশ্নটা অনুধাবন করে জনি বলে, তুই তো দেখছি সাংঘাতিক ইনটেলিজেন্ট…

হোসাইন্না হাসে। খিলখিল করে হাসে।

জনি তটস্থ হয়, আস্তে…কেউ জেনে ফেলবে।

ধুর কেউ জানবে না। সবাই ঘুমিয়ে পড়ছে। শুধু শুধু ভয় পাস তুই।

জনির তটস্থ ভাব কাটে। হোসাইন্নার কোকড়া কুন্তল দামে কাঁপা কাঁপা হাত রাখে। চুলে আঙ্গুল ডুবিয়ে ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকে। হোসাইন্নার মরাল গ্রীবা ধরে কাছে টানে।

ঘাই হরিণীর ন্যায় ধরা দেয় হোসাইন্না। নাক ডুবিয়ে সমস্ত সুরভী টেনে নিতে থাকে জনি। চুক চুক করে চুমু খায় আর চুক চুক করে চু। চুমুকে চুমুকে দুজনের ওষ্ঠাধর লালিমা বর্ণ ধারণ করিতে থাকে।

জনি বাঘ হয়, হোসাইন্না ঘাই হরিণী। ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ফের গেলাশ ভর্তি। চুক চুক করে চুমু। চুক চুক করে চু।

এইবার হোসাইন্না উপরে, রায় বাঘিনী। নীচে আহত ক্ষুব্ধ মহিষাসুর জনি।

চাঁদের আলোতে হোসাইন্নার সোনারঙ ঝলমল করে। তার বুকের সুগঠিত পায়রাদ্বয় লাফাতে থাকে। উড়ে যাবার বায়নায়।

জনি উহাদের বন্দি করে, মুষ্ঠিবদ্ধ তালুতে। আর তখনই একটা গভীর ক্ষত উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে হোসাইন্নার বাঁ স্তনের নীচে।

জনি পায়রা ছেড়ে ওই গভীর ক্ষততে আঙ্গুল বুলাতে থাকে। আর জিগেশ করে, এখানে কেটেছিল কী করে রে?

উত্তর না দিয়ে হোসাইন্না খিলখিল করে হাসে। আরও জোরে আরও জোরে স্ট্রোক মারে।


বুকের সুগঠিত মাংসল পায়রারা লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে যাবার আগে ওদের খপ করে ধরে ফেলে জনি।


একটু বেলা করে ঘুম ভাঙে জনির। দেখে হোসাইন্না নাই! তার সন্দেহ হয়। সে তাড়াতাড়ি মানিব্যাগে হাত দেয়। না ঠিকই তো আছে।

বরং একটু অবাকই হয়, যে সাতশ টাকা দেবার কথা ছিল সেটাও নেয়নি!

জনি বালিশের তলা দেখে, চাদরের কোনা কাঞ্চি খুঁজে, টেবিলের ড্রয়ার খুলে টুলে দেখে। নাহ, কোথাও কোনও চিরকূটও রাখা নাই।

তাহলে সে কীভাবে হোসাইন্নারে খুঁজে পাবে! মেয়েটার ফোন নম্বর রাখা উচিত ছিল। নিজের বোকামিতে নিজেই মুষড়ে পড়ে।

ফশ করে সিগ্রেট ধরায়। এলোমেলো বিছানা ঠিক করার চেষ্টা করে। সারা শরীরে হোসাইন্নার কাব্যময় স্পর্শ অনুভব করিতে থাকে।

সিগ্রেট টানতে টানতেই মনে হয়, একবার শৈমুলের কাছে যাই। হয়তো সে খোঁজ দিতে পারবে।

বিরিশিরি বাজারে আসে জনি। ডিম ডাল আর পরোটায় দুপুরের আহার সারে। পিচ্চি কাছে আইসা কয়, স্যার আর লাগত না?

কিছু না বলে জনি দুইশ টাকা বের করে দেয়।

হাঁটতে হাঁটতে শৈমুলের দোকানে ঢোকে। জনিকে দেখেই শৈমুল মিচকি হাসে।

দাদা ঘুম হয়েছে?

খুব ভালো ঘুম হয়েছে।

তাই?

হ্যাঁ, এত ভালো ঘুম আমি জীবনেও ঘুমাই নাই।

ওমা তাই নাকি!

হ্যাঁ, এত সুন্দর একটা মেয়ে পেয়েছিলাম। আহা।

পেয়েছিলাম মানে! চলে গেছে নাকি?

আমার তো এখন তাই মনে হচ্ছে।

শৈমুল খিলখিল করে হাসে। আপনি এমন অদ্ভুত সব কথা বলেন না।

না অদ্ভুত ঠিক না। তবে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত আছে।

কী রকম?

জানো মেয়েটা টাকাটাও নেয় নাই।

ওমা তাই নাকি! মৈমনসিঙ থিকা আনছিলেন?

না, তোমাদের বিরিশিরির।

শৈমুল ফের হাসে। কয়, বিরিশিতিতে এরকম মেয়েও আছে?

আছে তো।আমিই তো পেয়েছি।

কী নাম ওর?

হোসাইন্না।

কেঁপে ওঠে শৈমুল। চোখ এড়ায় না জনির। শৈমুলের হাসি হাসি মুখ কালো হয়ে ছাইবর্ণ ধারণ করে।

কী ব্যাপার?

আপনি বাড়ি চলে যান দাদা। খুব খারাপ জিনিসের পাল্লায় পড়েছেন।

মানে? অজানা আশঙ্কায় জনিও দুলে ওঠে।

হোসাইন্না দুই বছর আগে খুন হয়ে গেছে।

মাথা ঘুরান্টি দিয়া জনি পড়ে যেতে থাকে। শৈমুল তাকে ধরে ফেলে।

এইবার নীপা উপরে চড়ে। ছোট ছোট স্ট্রোক দিয়ে শুরু করে। নীপার রেশমি চুল ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকে।

জনি বুড়ি আঙ্গুল আর তর্জনি দিয়ে নীপার কানের লতি চটকায়। চটকাতে চটকাতেই দেখতে পায় নীপার রেশমি চুল ক্রমশ কোকড়া হয়ে যাচ্ছে।

বুকের সুগঠিত মাংসল পায়রারা লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে যাবার আগে ওদের খপ করে ধরে ফেলে জনি।

বাঁ স্তনের গভীর ক্ষততে আঙ্গুল বুলাতে থাকে। আর জিগেশ করে, এইখানে কাটছে কীভাবে রে?

ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে জনির বুক ভেসে যেতে থাকে নীপার অশ্রুতে।


গল্পের বানানরীতি লেখকের নিজস্ব
Abu Mustafiz

আবু মুস্তাফিজ

জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৭৬, টাঙ্গাইল। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, সরকার ও রাজনীতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : ব্যবসায়।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
লুহার তালা [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
একটি প্রাকৃতিক সাইন্স ফিকশন: শিন্টু ধর্মাবলম্বী রাজা, সবুজ ভদ্রমহিলা ও একজন অভদ্র সামুকামী [গুরুচণ্ডা৯, কলিকাতা, ২০১২]
ট্যাকারে ট্যাকা [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]

ই-মেইল : abumustafiz@gmail.com
Abu Mustafiz