হোম গদ্য গল্প হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস

হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস

হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস
292
0

মায়ের বয়স আশি পেরিয়ে গেছে বছর ছয়-সাত হয়।

মনে হয়, এই তো সেদিন হাগুমুতু দিয়ে প্যান্ট-পা মাখামাখি করে বই নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে স্কুল থেকে দৌড়ে বাসায় ফিরছি। তখন পুলিশ লাইন স্কুলে কেবল ভর্তি হয়েছি। আমাদের সময় পুলিশ লাইন ছিল, পুলিশ লাইন্স নয়। যাই হোক, প্রথমদিনের কথা এখনও মনে আছে। ইমিডিয়েট বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে গেছি, ক্লাসে তো আর ঢুকি না; কেউ ঢুকাতেও পারে না। বারান্দায় বসে ক্লাসের দিকে তাকিয়ে আছি, আর বোনের কিনে দেয়া আইসক্রিম খাচ্ছি। শেষ-মেশ, মাহবুব স্যার এসে কষে এক ধমক দিয়ে ক্লাসে ঢুকিয়ে দিলেন।

সেই আমি আজ বুড়ো হয়ে গেলাম। বুড়োই তো। বছর তিনেক আছে পিআরএলে যেতে। শুনেছি, সরকারের চিন্তা-ভাবনা আছে, অবসরের বয়সসীমা ৬২ করার, তখন হয়তো আরও কিছুদিন চাকরি করা যাবে। এমনিতে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫ পর্যন্ত চাকরি করছেন। আমাদের ৫৯। গড় আয়ু তো বেড়েছে। ৬২ হলে দোষ কী? দেখা যাক কী হয়!

এই শিক্ষকতাই করছি বছর পঁচিশ হয়ে গেল। আমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট ছিল, আর না হয় আরও দু-চার বছর শিক্ষকতার বয়স বাড়ত। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করলে সকলেই একটা অসুবিধার সম্মুখীন হোন, আর তা হলো, কম বয়সী সকলকেই নিজের ছাত্র বলে মনে হয়। এমনকি অনেক সময় বন্ধুদেরও! বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন।

তখন আমি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে পড়াই। সরদার স্যার ছিলেন আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল। তরুণ কলিগরা দলবেঁধে ব্যাংকে যাবে শুনে সরদার স্যার এসে বললেন, ‘আচ্ছা, ওই ব্যাংকে যাচ্ছ, কোন সমস্যা নাই। ম্যানেজার আমার ছাত্র। ওকে বললেই তোমাদের কাজ তাৎক্ষণিক হয়ে যাবে।’ ফিরে এসে কলিগদের কী দমফাটানো হাসি! জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার বলুন তো, এত হাসছেন যে!’ জবাব এল, ‘ ম্যানেজার সাহেব তো বলছেন, সরদার ওর ক্লাসমেট। হাসব না কাঁদব?’ আসলে, ১২ বছর শিক্ষকতা করলে…। আর বললাম না। বললে নিজেরই খারাপ লাগবে।

এই যে ধান বানতে শিবের গীত গাইছি। শিক্ষকতা করলে এই-ই হয়। ধান বানতে শিবের গীত গাইতে হয়। তবে, এই পেশা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। শহরে বাড়ি বানিয়েছি। ফ্ল্যাটবাড়িও আছে। সরল স্বীকারোক্তি দিচ্ছি, বলতে গেলে সারাটা জীবনই শুধু প্রাইভেট পড়িয়েছি। এই শহরে ম্যাথমেটিক্সের প্রফেসর বলতে আমাকেই বোঝায়! বছর চারেক হয় আর পড়াচ্ছি না। দরকার নেই। পদবির তো একটা মূল্য আছে। ফুল ফ্লেজেড প্রফেসর আমি।


ক্লাস টেন পড়ুয়া মৌরি কোনো খোঁজ না নিয়ে আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে ঘুমের বড়ি খেয়ে হসপিটালাইজড হলো। 


এখন মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

বাবার চাকরির সুবাদে তখন আমরা শহরে বসবাস করি। বাবা চাকরি করেন, আর মা কষ্ট করে সংসার সামলান। সেই সময়ে মায়ের মমতা ও তেজ দুটোই দেখেছি। হায়রে কী মায়া! হায়রে কী তেজ! মা সারাটা দিন পরিশ্রম করতেন। কঠোর শাসন আর অপার স্নেহে আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে আগলে রেখেছিলেন। পান থেকে চুন খসে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ওই সময়ে বছর খানেকের ব্যবধানে প্রথমে ছোট খালু ও পরে ছোট খালা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে মা অনেকটা বাধ্য হয়ে তার আদরের বোন ঝি মৌরিকে নিজ জিম্মায় নিয়ে এলেন। মৌরি ছিল আমার সমবয়সী। তখন ওর বয়স দশ। গভর্নমেন্ট গালর্সে যেত-আসত। মা-ই ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ক্লাস এইটে উঠে আমাদের দুজনের পাখা গজিয়ে গেল। আমি পাশের বাসার নিম্মির সঙ্গে, আর ও আজিজ স্যারের সঙ্গে লটর-পটর শুরু করল। আজিজ স্যার ছিলেন আমাদের প্রাইভেট টিউটর, আর ওদের স্কুলের সদ্য যোগদানকৃত বিএসসি টিচার। খুব সুন্দর করে অঙ্ক ও ইংরেজি পড়াতেন। ও আজিজ স্যারে মুগ্ধ হলো। ওর এই মুগ্ধতা পরে ভালোবাসায় রূপ নিল। সবকিছু সুন্দরভাবে চলছিল। আমি আর নিম্মি, ও আর আজিজ স্যার। মা-ও পেছন থেকে কায়দা করে ধোঁয়া দিতেন। মায়ের এই প্রচ্ছন্ন আশকারা পেয়ে ওদের প্রেম-ভালোবাসা ধীরে সুস্থে অগ্রসর হয়ে ক্রমশ পরিণতির দিকে এগুচ্ছিল, কিন্তু সময় ও সুযোগ বুঝে বড় ভাই একদিন তার কাঙ্ক্ষিত বোমাটি ফাটিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আজিজ তো বিবাহিত। গ্রামো তার বউ-বাইচ্চা আছে। ওতার লাগি (এই জন্যে) তো হে গনগন (ঘন ঘন) গ্রামোর বাড়িত যায়।’ বড় ভাই কী এক অজ্ঞাত কারণে আজিজ স্যারকে সহ্য করতে পারতেন না। অনুমান করি, আজিজ স্যার তাকে দেখলে সালাম-টালাম কিছুই দিতেন না। হয়তো এই কারণে আজিজ স্যারের ওপর তার এত রাগ, এত ক্ষোভ। অবশ্য, সালাম বড় ভাইয়ের প্রাপ্যই ছিল বলা যায়। কারণ, সেই সময়ে পিএসসি ফেস করে বড় ভাই লেকচারার হিসেবে মুরারিচাঁদ কলেজে যোগ দিয়েছিলেন। যাই হোক, কথা আর বাড়াচ্ছি না। মৌরির তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মা-ও মিইয়ে গেছেন। গ্রীষ্মের ছুটি চলছিল তখন। ক্লাস টেন পড়ুয়া মৌরি কোনো খোঁজ না নিয়ে আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে ঘুমের বড়ি খেয়ে হসপিটালাইজড হলো। দিন সাতেক জম আর মানুষের টানাটানির পর জম ক্ষান্ত হলে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে এল।

সেই মৌরি এখন কানাডায়।

২.
গরম পানি দিয়ে গোসল-টোসল সেরে রেডি হয়ে কলেজের উদ্দেশে বের হব হব করছি, দেখি মিশফাকের ফোন। মিশফাক আমার বড় ভাইয়ের ছোট ছেলে। সদ্য মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বাড়িতে বসেই বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওরা বাড়িতে থাকে। বড় ভাই প্রিন্সিপাল হয়ে রিটায়ার্ড করে আর শহরে থাকেন নি; বাড়িতে চলে এসেছিলেন। এবং মাস ছয়েক আগে বাড়িতেই ইন্তেকাল করেছেন। বড় ভাইয়ের দেখাদেখি মেজো ভাইও বাড়ি ফিরেছেন। আমাদের গ্রাম আর গ্রাম নেই; শহর হয়ে গেছে। বছর বারো আগেই পৌরসভা ঘোষিত হয়েছিল। এবার সি গ্রেট থেকে বি গ্রেড পৌরসভার স্বীকৃতি পেয়েছে।

ফোন কানে তুলতেই শুনি মায়ের কণ্ঠ। মা কথা বলতে পারছেন না। বুঝতে পারছি, শ্বাসকষ্ট তার বেড়ে গেছে। শীত এলেই মায়ের শ্বাসকষ্টটা বেড়ে যায়। চল্লিশ বছর ধরে মায়ের এই অসুখটা দেখছি। তখন তো এখনকার মতো ইনহেলার-নেবুলাইজার ছিল না। সারারাত যে কী কষ্ট করতেন মা! আমার এখনও মনে পড়ে, সেই কিশোর বয়সে শীতে হাঁপানি বেড়ে গেলে গ্যাসের চুলোর পাশে মায়ের সঙ্গে বসে থাকার দৃশ্য, যতক্ষণ না গরম লেগে শ্বাসকষ্ট কমে, মা ততক্ষণ বসে থাকতেন, কোনও কোনও রাত কাবার হয়ে ভোর হয়ে যেত শ্বাসকষ্ট কমতে কমতে!

মা দেখি হট টেম্পারড।

বলছেন, ‘আমারে বাড়িত তাকি লইয়া যা।’

একটু বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুঝতে পারছেন, নওরিনের মা শুনছে। কী দরকার শোনার? এই নওরিনের মা কে, পরে এমনিতে আপনারা বুঝতে পারবেন।

‘কিতা অইছে? কিতার লাগি (কীসের জন্যে) বাড়িত তাকি লইয়া যেইতাম?’

‘কাউকরার ওউ কমজাতোর (ছোট লোক) বেটিয়ে কয়, আমি মরি না কেনে! আমি মরলে তারা বুলে আদায় (রক্ষা) পাইব। আমি আর বাড়িত থাকতাম নায়।’

মায়ের কথায় মন খারাপ হয়ে যায়। এই বাড়ি ঘর মা তো বলতে গেলে একাই গড়েছেন। সারা জীবন চাকরিজীবী বাবার সঙ্গে শহরে কাটিয়ে পেনশনে যাবার বছর ছয়েক আগে বাবা বদলি হয়ে নিজ থানা শহরে ফিরে এলে মা-ও উৎসাহের সঙ্গে বাবার সঙ্গী হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এবং দিনরাত খাটা-খাটুনি করে বছর খানেকের মধ্যে বাড়িটিকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলেন।

বললাম, ‘তুমার বাড়ি, আর তুমি থাকতায় না!’

‘তাই আমারে দুই চোউখে দেখতে পারে না। পুয়া-পুরিন (ছেলেমেয়ে) বিয়া দিয়া নাতি-নাতনি পাইলেইছে, আবো (এখনও) জাতোর (বংশের) খাসলত বদলাইতে পারেন না।’

বড় ভাবি আর মায়ের এই দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো। অনেক সময় বড় ভাবির আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও কখনও মুখ দিয়ে টু শব্দ করি নি। বড় ভাই আছেন, তিনি দেখবেন। আবার মা যে সবসময় ভালো আচরণ করছেন, তাও নয়। এই যে কথায় কথায় কম জাতোর পুরি-কম জাতোর বেটি বলে থাকেন, বড় ভাই’র সঙ্গে বড় ভাবির বিয়ের পর থেকেই এই শব্দগুলো মায়ের মুখ থেকে অনবরত শুনে আসছি। বড় ভাবিও কম যান না। বলেন, ‘আফনে গো মা জমিদারোর বেটি। দুইদিন বাদে কানাডাত যেই বাগি (চলে যাবেন)।

কথায় কথা বাড়ে। সেই কোন কালে বড় ভাবি যখন কেবল বড় ভাবিই হয়ে আমাদের মাঝে এলেন, মা তখন কী এক প্রসঙ্গে কানাডা যাওয়ার কথা বড় ভাবিকে বলেছিলেন। মৌরিও তো কম চেষ্টা-চরিত্র করে নি মাকে নেয়ার জন্যে। কিন্তু, মায়ের যাওয়া হলো না। তারপর মৌরি নেই; কানাডাও নেই! কিন্তু, খোঁটাটা অস্ত্র হয়ে বড় ভাবির কাছে রয়ে গেছে।

‘তুইন আইবেনি আমারে নিতে? তুমরার কোন খবর পাই না। তারা হাবুইতা (সব কিছু) আমারে হুনায় (শোনায়) না।’

মনে মনে বলি, ‘ মাগো, তুমি সব কথাবার্তা হুনার ঊর্ধ্বে গেছোগি। সাংসারিক ঝামেলায় হামাইয়া কিতা করতায়?’

‘নওরিনোর খবর কিতা? তাই বুলে আর ফিরিয়া যেই তো নায়!’

বুঝলাম, এটি আমার বড় ভাবির তিলকে তাল বানানোর কইশিশ।

নওরিন আমার বড় মেয়ে। দিন পনেরো হয়, বাবার বাড়ি এসেছে। ওর স্বামীর সঙ্গে একটু ঝামেলা হয়েছে। হতেই পারে। আজকালকার মেয়ে। তাছাড়া, এখন তো নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। আপনি ঝামেলা পাকাবেন, গায়ে হাত তুলবেন, আর মেয়ে কী বসে থাকবে? যাই হোক, অর্ণব কালকে এসেছে। ওদের বোঝাপড়া হয়ে গেছে। আজই ওরা চলে যাবে।

বড় ভাবির স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে ঢের জানি। এর কথা ওর কাছে, ওর কথা এর কাছে লাগানো বড় ভাবির স্বভাব। চুগোলখোর আর কি।

বললাম, ‘না গো মা। অর্ণব গতকাইল আইছে। আইজ তারা যেইবোগি।’

মা আরও কী বলতে চাচ্ছিলেন, অনবরত কাশির দমকে তার কথায় ব্যাঘাত ঘটল।

তারপর বললেন, ‘আমারে তারা ডাক্তারো লইয়া যায় না। কয়, আর গিয়া (যেয়ে) কিতা করতায়। ওউ বড় শয়তান বেটিয়ে কয়, ডেইট অভার অই (হয়ে) গেছে। এক মিশফাক থাকায় আসনি-ফাসনি (কথাবার্তা) হুনে, ঔষধ-টউষধ দেয়। হে (সে) আর কয়দিন । চাকরি-বাকরি অই যেইবো। যেইবোগি। আর আমার কোন দাম নাই। হ (ওই) বাড়ির হাশিমোর পুয়ায় বাঁশ কাটিয়া নের, কইলাম, এই বাঁশ কাটিস না। তাই কয়, ‘আমি অর্ডার দিছি।’ তাই অর্ডার দেয়। আল্লায় তাইরে অর্ডারোর মালিক বানাইছইন।’

বুঝলাম, শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক এবার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।


এই কষ্ট পাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া ভালো। আল্লায় আমাদেরকে নেয় না কেন ?


মা আরও কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তার আর বলা হলো না। আমি ইচ্ছে করে কল ব্যাক করলাম না।

নওরিনের মা নিম্মি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কিতা অইছে?’

বললাম, ‘ মা আইবার চাইরা (আসতে চাচ্ছেন)।’

‘বুড়া মানুষ। আইবার ধকল সহ্য করতে পারতা না। এক কাম করো, তুমি বাড়িত যাওগি।’

৩.
খুব কষ্টে বাড়ি পৌঁছলাম।

রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা দেখে কিভাবে আবার ফিরে যাব, তাও আবার সন্ধের ভেতর,  চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে। নওরিনকে তো বিদায় করতে হবে।

বড় ভাবির সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন।

বললাম, ‘তুমি বুলে কও, মার ডেইট অভার অই গেছে।’

‘ভাইরে-দাদারে, কইলেও ভুল কইছি না। তুমি একদিন থাকিয়া যাও। দেখো তাইন (তিনি) কিতা করোইন! মাঝেমাঝে খাট-পালং পেশাব-পায়খানায় ভরাইলাইন। কে সাফ করতো ইতা? তারপরও সাফ অয়। একটা বেটিও নাই। তান লগে (তার সঙ্গে) কেউ থাকে না। সারারাইত কাশোইন (কাশি দেন)। কে থাকব তান লগে!’

মেজো ভাবির সঙ্গে দেখা করলাম। মেজো ভাবি প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় আছেন বছর খানেক হয়। বললেন, ‘সবকিছু বুঝি, দেখি। কিন্তু আমার কিছু করার নাইরে ভাই।’  বললেন, ‘এই কষ্ট পাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া ভালো। আল্লায় আমাদেরকে নেয় না কেন ?’

আমাদের বাড়ি ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে। আমি আমার অংশ এখনও নিই নি। মা যদ্দিন আছেনম কিছুই করব না। তারপর কী করি দেখা যাবে। সেজো ভাই তো ঢাকায় সেটেল্ড করেছেন। তার অংশ বড় ভাই’র কাছে বলা যায় পানির দরে হস্তান্তর করেছেন।

‘মাগো,  তুমার কিছু খাইবার মন চায় নি?’

‘ডেইট অভার অই গেছে, আর খাইয়াউ কিতা করতাম!’

বুঝলাম, মায়ের রাগ এখনও পড়ে নি।

‘বাদ দেও মা। কিতা আর করতায়। আল্লারে ডাকো, তাইন সিফা (রোগমুক্তি) দিবা।’

তারপর বললাম, ‘চলো যেইতামগি।’

‘কানো যেইতাম?’

‘আমার লগে আমার বাসাত।’

‘তর লগে গিয়া কিতা করতাম। আমারে আমার বাড়িত মরবার দে।’

বাড়ির সকলের সঙ্গে দেখা করে মায়ের সঙ্গে খেয়ে-দেয়ে বিকেল নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। বাজারে একটা মাইক্রোবাস পাওয়া গেল।

দূরের দোকান থেকে ইথারে ভেসে আসছে, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস। তবু তো ভাই কারোরই নাই একটুখানি হুঁশ…।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

ইকবাল তাজওলী

জন্ম ১৯৬৭, সিলেট।

শিক্ষা : স্নাতকোত্তর।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই—
শরীরের কান্না এবং পনেরো ফোঁটা অশ্রু [নাগরী, ২০১৯]

ই-মেইল : itajolee@gmail.com