হোম গদ্য গল্প হাটের খেলা

হাটের খেলা

হাটের খেলা
126
0

আশরাফুল চাকরি করে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে।

গ্লাস ফ্যাক্টরি মানে জানলা, শোকেস, টেবিলের উপরে দেবার ট্রান্সপারেন্ট কাচ বানানোর কারখানা। আশরাফুল কাটার। মেশিনে গ্লাস বেরুলে মাপমতো কেটে নেয়। এক সপ্তায় এক শিফট ডিউটি। প্রতি সপ্তায় শিফট বদলায়। মাসের প্রথম সপ্তা এ শিফট, ছটা-দুটা ডিউটি পড়লে পরের সপ্তা দুটা-দশটা। রাতের পালায় ডিউটি দশটা হতে ভোর ছটা। কোনো শিফটে কেউ না এলে বাড়তি ডিউটি। বেতন হয় মাসের প্রথম সপ্তায়। দ্বিতীয় সপ্তা পায় ওভারটাইম, বাড়তি ডিউটির টাকা।

দ্বিতীয় সপ্তায়, সোমবার বাড়তি ডিউটির টাকা তুলে আশরাফুল রওনা দেয় ব্রিকফিল্ড। মোহন্তের হাট হতে গোলাবাড়িয়া যাবার রাস্তার মুখে টেক্সিস্ট্যান্ড। স্ট্যান্ড থেকে টেক্সি যায় মীরেরহাট, ব্রিকফিল্ড, শেখেরহাট আর বাকখালির মধ্যেরধারি পর্যন্ত। সব লোকাল রুট। প্রতি রুটে আলাদা আলাদা টেক্সি।

টেক্সি স্ট্যান্ডে এসে আশরাফুলের মনে পড়ে নাস্তাপানি কিছু কেনার। চার-পাঁচটা ফলের দোকান আছে স্ট্যান্ডেই। সে ভাবে মিষ্টি কিনবে। স্ট্যান্ড থেকে আসে মন্দির সড়কের মুখে। এ রাস্তা পূর্বমুখী হয়ে চলে গেছে ব্যাসকুণ্ড-আস্তানবাড়ি-স্বয়ম্ভুনাথ হয়ে একেবারে চন্দ্রনাথ শিবমন্দির। মন্দির যাবার রাস্তা, তাই মন্দির সড়ক। সড়কমুখের উল্টো দিকে মিষ্টির দোকান। অমলেন্দু সেন অ্যান্ড সন্স আর কনিকা সুইটস। অমলেন্দু সেনের দোকানে ভিড় থাকায় আশরাফুল কনিকা সুইটসে ঢোকে। এক কেজি রসগোল্লা কেনে। কিনে আবার আসে স্ট্যান্ডে।

ব্রিকফিল্ড না, আশরাফুল আদতে যাবে ব্রিকফিল্ড থেকে একটু সামনে তার শ্বশুরবাড়ি কালামিয়া মৌলবি বাড়ি। গত এক সপ্তা ধরেই সে শ্বশুরবাড়ি যাবে যাবে করছে। কিন্তু নাইট শিফট ডিউটি আর জ্বর ব্যথা সর্দি থাকায় যাওয়া হয়ে ওঠে নাই। সোমবার ওভারটাইমের পাওনা তুলে, সে রওনা দেয় ব্রিকফিল্ড। বউ সাহেনা আছে সেখানে।

বড় সম্বন্ধী পারভেজের ছেলে হয়েছে মেট্রোপলিটন ক্লিনিকে, সিজার। ইপিজেডে জুতা কারখানায় চাকরি করে। থাকে চিটাগাং শহরে। খবর পেয়ে শাশুড়ি গেছে নাতি দেখতে। সাহানাকে নিয়ে আশরাফুলও গিয়েছিল। ভেবেছিল, দেখার কেউ না থাকলে বউকে ভাইয়ের বাসায় রেখে আসবে। সম্বন্ধীর বাসায় কাজের লোক আছে। তবুও বাচ্চা দেখার জন্য কাছের শক্ত কাউকে লাগে। আশরাফুলের ঘরে মা, দুই ভাই-বউ আছে, সাহানা সপ্তা দুয়েক থাকলে কোনো অসুবিধা হবে না। তার মা-ই বলে পাঠিয়েছে, অ পুত, বদ্দিন বাদে পুত্রার পোলা হৈচে, বউয়েরে লৈ চাই আ গৈ। মা শহরে যাওয়ায় ভাইয়ের ছেলেকে দেখে সাহেনা চলে আসে বাপের বাড়ি। ঘরে বাপ আর ছোট ভাই একা। মা না আসা পর্যন্ত অর্থাৎ সপ্তা দুয়েক নাইওর থাকবে।

কিন্তু এখন বউকে দেখতে না, আশরাফুল শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে কার্তিকওঠা শিমের বিচির জন্যে। ক্লিনিকেই শ্বশুরকে বলেছিল কার্তিকওঠা শিমের বিচি লাগবে তার।

আশরাফুলের শ্বশুরেরা বনবিভাগ থেকে প্রতি বছর বেড়িবাঁধ লিজ নেয়। ব্রিকফিল্ডের পশ্চিমেই বেড়িবাঁধ। তাতে শিম চাষ করে। বাঁধের উপর বৃষ্টির পানি জমে না বলে শ্বশুরদের সব চাষই কার্তিকওঠার। প্রতি সিজনে অনেক টাকার শিম বেচে হাটে।


বাজিকর ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়ে। কিন্তু কাটা ছেলে আর জোড়া লাগে না।


কার্তিকওঠা শিমের গুণ হচ্ছে ফসল আসে কার্তিকে, জাত শিমের অন্য জাতের দু মাস আগে। আশরাফুলের শ্বশুর বলে, ছৈঁ কার্তিকে আইয়ে বলি নাম হৈচে কার্তিকওঠা। আশরাফুল জানে, আগিলা ধরা দেয়ায় কার্তিকওঠার দাম পাওয়া যায় বেশি। খোসা খানিক মোটা বলে ঢাকা-চিটাগাংয়ের বাজারে চালান দেওয়ার পরও দেখায় তাজা।

তবে আপত্তির দিকও আছে। অন্য জাতের শিম ভাদ্রে, আউশ খোন্দের ধান ওঠার পর আর কার্তিকওঠা শিম লাগাতে হয় শ্রাবণ মাসে—বর্ষায় পানি না জমা উঁচু জমিতে। কার্তিকওঠা আদতে পাহাড়ি জুমের শিম। উঁচু জমি নাই বলে কার্তিকওঠা শিমের বিচি এত দিন সংগ্রহে ছিল না আশরাফুলের।

এ বছর আমেরিকান ফয়েজুল্লার, ডিবি পেয়ে ছেলে আমেরিকা যাওয়ায় এ নাম, মসজিদে দান করা কাফের উপরের উঁচু জমি কর্ষা নিয়েছে আশরাফুল। কাফ মানে বেড়িবাঁধ দেওয়ার আগে সন্দ্বীপ চ্যানেলের জোয়ার আসত এ পর্যন্ত। কাফের এক ধারি জমি তুলনামূলক উঁচু সামনে পেছনের নাবাল জমি থেকে। কাড়ি দেবার আগে, কাফের পরেই ছিল চরের শুরু। ভাবছে, এ জমিতে কার্তিকওঠা শিম লাগাবে।

আশরাফুল পার্টটাইম কৃষি শ্রমিক। গ্লাস ফ্যাক্টরির শিফট ডিউটির সঙ্গে খেত-গৃহস্থির কাজ করে। জ্যৈষ্ঠ-ভাদ্র আউশ আর আশ্বিন-অগ্রহায়ণ শাইল খোন্দ। শিম রোকে ভাদ্রে, উঠে অগ্রহায়ণে। অগ্রহায়ণে লাগায় বাঙ্গি। ফুলটাইমাররা সঙ্গে বেগুন, ঢেঁড়শ, লাউ, তিতকরলা, বরবটি, ঝিঙ্গা, পরুল লাগায়।

আশরাফুলের বাড়ি ফ্যাক্টরি সোজা দু মাইল পশ্চিমে।

কারখানার চিমনির উপর উঠে সোজা পশ্চিমে তাকালে সন্দ্বীপ চ্যানেলের আগে তার বাড়ি চোখে পড়বে।

মসজিদের উঁচু জমি কর্ষা নেয়ায় ডিউটি শেষে আশরাফুল কার্তিকওঠা শিম বিচি আনতে রওনা দেয় শ্বশুরবাডি ব্রিকফিল্ড।

মিষ্টি কিনে ব্রিকফিল্ডের টেক্সিতে উঠতে না উঠতে আজান পড়ে। আসরের। আশরাফুল ভাবে বাজারের মসজিদে নামাজ পড়ে পরের টেক্সিতে যাবে। কিন্তু বাজারের মসজিদে ভিড় থাকে বেশি। মিষ্টি রেখে নামাজ পড়া ঝামেলা। এই ভেবে ঠিক করে একেবারে ব্রিকফিল্ড গিয়ে পড়বে। অক্ত না পেলে কাজা পড়ে নেবে। হাটবার ছাড়া অন্য দিন টেক্সিতে প্যাসেঞ্জার ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এক টেক্সিতে পাঁচজন, কোনো কোনো সময় ছয়জনও ওঠে। গতিক খারাপ হলে, একজনের জন্যও বসে থাকতে হয় আধঘণ্টা। সে-রকম হলে পরের সিরিয়ালে গিয়ে মাগরিবও পাবে না। এসব ভেবে সে ঠিক করে, ব্রিকফিল্ড গিয়ে স্থির করবে নামাজ কোথায় পড়বে। ব্রিকফিল্ডেও এখন মসজিদ হয়েছে।

কিন্তু হাটবার না হলেও আশরাফুলের ভাগ্য আজ ভালো। উঠবার কিছুক্ষণের মধ্যেই টেক্সি ফিলাপ।

ঢাকা ট্রাংক রোড থেকে টেক্সি বাঁক ফিরে জেলা পরিষদের রাস্তায় পড়েছে, আশরাফুলের ফোন বেজে ওঠে। সাহানা বলে, শহরের তোন আইবার সমে বাইরে যনের স্যান্ডেল ছিড়ি গেছে। পাইল্লে এক জোড়া লৈ আইয়েন।

বউ জানে আজ সে শ্বশুরবাড়ি আসবে। কিন্তু থানা সদরের বড় বাজার পার হয়ে এসেছে, বউকে তা আর বলে না। সে বলে, আইচ্ছা, লৈ আমু।

আশরাফুল ব্রিকফিল্ড পৌঁছাতে পৌঁছাতে আসর অক্ত প্রায় শেষ। টেক্সি থেকে নামতেই বাজিকরের লোক জমানো ডাক শোনে, ‘খেলা দেখায় খেলোয়াড়, খেলা দেখে কে…।’

ব্রিকফিল্ড এখন অনেক বড় বাজার। অথচ দশ বছর আগেও এখানে এক মিসিরের চায়ের দোকান ছাড়া আর কিছু ছিল না। ব্রিকফিল্ড জমে উঠে মঞ্জু চেয়ারম্যানের ব্রিকফিল্ড টু মোহন্তের হাট টেম্পো সার্ভিস চালু করার পর। নামে ব্রিকফিল্ড হলেও জামাই হবার পর ব্রিকফিল্ড তো বটে, গোটা সৈয়দপুরেও কোনো ব্রিকফিল্ড দেখে নি আশরাফুল।

তবে ব্রিকফিল্ড না থেকেও জায়গার নাম ব্রিকফিল্ড হবার বৃত্তান্ত বলে তার বাপ মোজাফ্‌ফর মেম্বার। তিন ওয়ার্ড একত্রে থাকবার সময়ের মেম্বার। মেম্বার বলে, পঁয়ষট্টিত চট্টগ্রাম শহরের সোনামিয়া কন্ট্রাক্টর বেড়িবাঁধে স্ল্যুইস গেটের লাই কোনো মিক্যা ইট নো পাই, ইট পোড়াই ছিল খালপারে। সেই থেকে ব্রিকফিল্ড। আগে নাম ছিল দোখালি। এ জায়গা থেকে বাঁকখালি খালের এক মাথা উত্তরে শেখেরহাটের দিকে, অন্য মাথা পশ্চিমে সোজা সমুদ্রে পড়েছে দেখে দোখালি। দোখালি হালে ব্রিকফিল্ড হয়ে জমজমাট বাজার। শেখেরহাটের বদলে ব্রিকফিল্ড এখন বাঁকখালি জনপদের মুখ।

কী নেই ব্রিকফিল্ডে। সেলুন, লন্ড্রি, দর্জি, জুতার দোকান, যার জন্য মীরেরহাট অথবা মোহন্তের হাটে যেতে হতো—সবই পাওয়া যায় এখানে। টেম্পো ভরতে দেরি হলে লোকেরা দাড়ি কেটে নেয় ফাল্গুনি হেয়ার কাটিংয়ে। পরিমলের লন্ড্রিতে কাপড় দিয়ে মোহন্তের হাট ঘুরে এক কেজি হাইব্রিড লালতীর তিতকরলা, ঢেঁড়শ অথবা ঝিঙে বিচি কিনে স্ত্রী করা কাপড় নিয়ে ফেরা যায় ঘরে। টেম্পো সার্ভিস গিয়ে ফোর স্ট্রোক টেক্সি আসায় লোকজনেরও হেভি সুবিধা, অপেক্ষা করতে হয় কম। টেম্পোর চৌদ্দজনের বদলে পাঁচজনে টেক্সি ভর্তি।

বাজারের মুখ দেখা দিলে অথবা একটু জমে উঠলে পরহেজগার মুসল্লিদের যার জন্যে কিঞ্চিত হা-পিত্যেস হতে পারত, খালপাড়ের পয়স্তি জমিতে মসজিদ হয়ে তাও ফুরিয়েছে। ব্রিকফিল্ডের সওদাগর আর আসা-যাওয়ার পথের প্যাসেঞ্জাররা মুসল্লি। ফোর স্ট্রোক টেক্সি থেকে নেমে নামাজের ওয়াক্ত কাজা হচ্ছে বলে বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে না। মসজিদে নামাজ সেরে বাজারের দোকানে চা-পানি খেয়ে ডিশে নানা চ্যানেলের খবর, সিরিয়াল দেখে একবারে বাড়ি ফেরা যায়। আসরের পর থেকে এশার, ব্রিকফিল্ড একেবারে হাটের মতো গমগমে।

আসরের পরের এ সময় সব দিন ভিড় থাকলেও আজ ভিড় খানিক বেশি। টেক্সি থেকে নেমে আশরাফুল উৎসাহিত হয়ে ভিড়ের কাছে যায়। গিয়ে দেখে রঙিন আলখেল্লা পরা বাজিকর খেলা দেখানোর আয়োজন গুছিয়ে নিচ্ছে। আর খেলার সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে উঁচু গলায় লোক জমানো ডাক দিচ্ছে, ‘খেলা দেখায় খেলোয়াড়, খেলা দেখে কে…।’

শীতের সময় সাপ-বেজি, বানর আর নানা আজগুবি খেলা দেখানো বেদে বাজিকরদের হামেশা হাটে হাটে দেখা গেলেও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে দেখা মেলে কদাচিৎ।

উচ্চ কণ্ঠের চিৎকারে চারপাশে অর্ধচন্দ্রের মতো লোক জমে। বাজিকর তার সামনে মানুষের জমজমাট অর্ধবৃত্ত তৈরি হলে সমবেত সকলকে পছন্দ মতো কিছু নিয়ে হাত মুঠো করতে বলে। কেউ টাকা নেয়, কেউ পয়সা, কেউ কোনো কিছু ছাড়া মুঠো করে। বাজিকর সমবেত লোকজনের সামনে ঘুরে ঘুরে মুঠো করা হাত নিজের হাতে নেয়। নিয়ে ঘ্রাণ শোঁকে। ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে বলে, ‘খেলা দেখায় খেলোয়াড়, খেলা দেখে কে…।’

বাজিকর বলে, ভাই আপনার নাম কী?

আকবর।

বাজিকর আবার বলে, পুরা নাম বলেন।

আকবর হোসেন, ভাই।

আপনার হাতে পাঁচ টাকার নোট আছে।

ঠিক ঠিক মিলে যায়। আকবর হোসেন ব্রিকফিল্ডে সবজি বেচে। আশরাফুল ভেবেছিল একটু উঁকি মেরে চলে যাবে। কিন্তু বাজিকরের কেরামতিতে সে আরো উৎসুক হয়ে খেলা দেখে।

মুঠো কেরামতির পর বাজিকর তার সাথে আসা ছেলেকে ডাকে। ছেলের বয়স ১৪-১৫ বছর। তাকে মাটিতে শুইয়ে কালো কাপড়ে ঢেকে দেয়। ঢেকে দিয়ে উঁচু কণ্ঠে বলে, ‘খেলা দেখায় খেলোয়াড়, খেলা দেখে কে…।’ বলতে বলতে মুঠোভর্তি বালি নিয়ে বৃত্তের চারদিকে ছিটায়। বালি ছিটানোর সময় বাজিকর কুক কুক করে ডাক ছাড়ে। তার মুরগির মতো ডাকে জমায়েতের ছোট ছেলেরা হেসে ফেলে। ডাকের পর বলে, যার কাছে টেঁয়া নাই তার কাছে দাবিও নাই, কিন্তু যার জেবে টেঁয়া আছে, ন দি এক কদম গেলে বেহুস হৈ পড়বা।

মানুষ নানা অঙ্কের টাকা দেয়। আশরাফুলের পকেটে ওভারটাইমের টাকা আছে। সে বাজিকরের বয়ান শোনে, কিন্তু টাকা বের করে না। টাকা তোলা শেষে বাজিকর মাটিতে শোয়ানো ছেলেটাকে ছুরি দিয়ে দু ভাগ করে ফেলে।

খেলা দেখা লোকের ভিড় বাড়ে। বাজিকর কাটা ছেলের চারপাশ ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়ে। ভিড় করা লোকজন কাটা ছেলে জোড়া লাগার দৃশ্য দেখার জন্যে উশখুশ করে। আশরাফুল ভাবে, কাটা ছেলে জোড়া লাগার পর উঠে কথা বলতে পারবে তো! যদি না পারে! সময় যায়। বাজিকর ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়ে। কিন্তু কাটা ছেলে আর জোড়া লাগে না।

ভিড়ের খেলা দেখা লোকজন ততক্ষণে উত্তেজিত। সময় যায় কিন্তু ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়ে কাটা ছেলেকে জোড়া লাগাতে না পেরে শেষে বাজিকর বলে, ওস্তাদ, আমনের হায়ে হড়ি। ঘড়ির বান খুলি দেন।


ভিড়ের এতগুলো লোকের সামনে বাজিকরের এভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া, এ এক আশ্চর্য!


সমবেত লোকজন বোঝে, ভিড়ের কেউ জোড়া লাগার সময়কে স্থির করে রেখেছে। বাজিকর বারবার ঘড়ি দেখে। ঘড়ি চলে না। ভিড়ের লোকেরা তাকে ঘিরে ধরে, মারতে উদ্যত হয়। বলে, ভালা করার মন্ত্র জানে না, হেতে আবার মানুষ দু ভাগ করার খেলা দেখার।

কালো কাপড়ের নিচে ছুরি দিয়ে দু ভাগ করা ছেলে পড়ে আছে।

আশরাফুল পকেট চেপে ধরে ঘটনা দেখে। ভাবে, দু ভাগ করা ছেলেকে কি আর জোড়া লাগাতে পারবে বাজিকর! যদি আর জোড়া লাগাতে না পারে!

উত্তেজনা দেখে বাজিকর থলে থেকে সাদা সুতার পিন্দা বের করে। পিন্দা হাতে নিয়ে গুটানো সুতার মাথা ধরে খুলতে থাকে। লোকজন ভাবে, বাজিকর কী করছে? পিন্দার সুতা খুলে ভিড় করা লোকজনের সামনেই সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ভিড়ের লোকজন অবাক হয়ে বাজিকরের মিলিয়ে যাওয়া দেখে। আশরাফুল পকেটের টাকার কথা ভুলে আশপাশে তাকিয়ে দেখে, বাজিকর কোথায় গেল। ভিড়ের এতগুলো লোকের সামনে বাজিকরের এভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া, এ এক আশ্চর্য!

ভিড়ের লোকজনের চোখ সামনে পেছনে বাজিকরকে খোঁজে। কোথাও নেই। বৃত্তের মাঝখানের জায়গাটা শূন্য। শুধু দু’ভাগ করা ছেলেটা পড়ে আছে।

খেলা দেখা লোকজনের অবাক ভাব কাটতে না কাটতেই বাজিকর আবার ফিরে আসে। সঙ্গে সাদা চুলের সাদা আলখেল্লা পরা বুড়ো এক লোক। তার হাতে কচি লাউ। লোকটা দু ভাগ করা ছেলেকে ভালোভাবে পরখ করে দেখে। দেখা শেষ করে সঙ্গে আনা কচি লাউ কাটে আর সেলাই করে, সেলাই করে আর কাটে। বুডোর লাউ সেলাই করা শেষ হলে দু ভাগ করা ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে সবাইকে ঘুরে ঘুরে সালাম দেয়। বাজিকরকে ঘিরে ভিড় আরো জমে ওঠে।

বাজিকর বলে, আসেন এবার আমরা দেখি ছুরি খেলা।

একটা কাঠের ফ্রেমের সামনে দু ভাগ থেকে জোড়া লাগা ছেলেটা হাতুড়ি আকৃতিতে দাঁড়ায়। তার পেছনে একসারি খেজুরগাছ। রাস্তার নিচে পরুল খেত। পরুল খেতে হলুদ ফুল। ছুরি খেলার বালকের সঙ্গে পরুল খেতের হলুদও একই ফ্রেমে চোখে পড়ে।

বাজিকরের খেলা শেষ হতে হতে মাগরিবের আজান পড়ে।

ব্রিকফিল্ড মসজিদে নামাজ শেষ করে বেরুলে আশরাফুলের মনে পড়ে, বউ ফোন করেছিল স্যান্ডেল কিনতে।

ব্রিকফিল্ডে নতুন জুতার দোকান দিয়েছে সনজিত, নাম বাঁকখালি পাদুকালয়। সনজিতকে আশরাফুল চেনে। সনজিতের ভায়রা দোলন দে চাকরি করে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে। একই সেকশনে। ব্রেকার। আশরাফুল মেশিন থেকে মাপমতো গ্লাস নামালে তারা সাইট কেটে ট্রলিতে তুলে দেয়। ব্রিকফিল্ড গেলে যাইয়ো আঁর হজনের হেডে, নোয়া জুতার দোয়ান দিছে—এই অনুরোধে গত বার শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে সনজিতের দোকানে বসে গিয়েছিল।

মসজিদ থেকে সোজা ব্রিকফিল্ডের একমাত্র জুতার দোকান বাঁকখালি পাদুকালয়ে এলে দেখে, সনজিত বসে আছে। আশরাফুলকে দেখে বলে, আইয়েন দাদা। হরগো বাইত যাইবেন নে?

আশরাফুল হেসে ভেতরে ঢোকে। বলে, হ ভাই। আমনের ভইনও আছে। এক জোড়া স্যান্ডেল দেন আমনের ভইনের লাই।

গ্রামের বাজার আর খদ্দেরদের প্রায় সবাই খেত-কৃষ্টি করা বলে দোকানে মহিলাদের কোনো চামড়ার জুতা নাই। সবই প্লাস্টিকের। আশরাফুল বউয়ের জন্য এক জোড়া প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পছন্দ করে। পছন্দ করা জুতার দাম দেবার জন্যে পেছনের পকেটে হাত দিলে তার অবাক হবার পালা। দেখে পকেট খালি। পকেটে রাখা মানিব্যাগ নাই। আশরাফুল শার্ট-প্যান্টের সব পকেটে খোঁজে। কোথাও নাই। অথচ তার স্পষ্ট মনে আছে, টাকার পকেট চেপে ধরে সে বাজিকরের খেলা দেখছিল।

মানিব্যাগ না পাওয়া আশরাফুল সনজিতকে পকেটমারের বৃত্তান্ত বলে। বলে, পুরো মাসের ওভারটাইমের টাকা ছিল ব্যাগে। দোকানি বলে, আমনে জুতা লৈ যান, টাকার চিন্তা কৈরেন না।

আশরাফুল রাজি হয় না। সে প্রস্তাব করে মিষ্টি রেখে পছন্দের জুতা দিলে সে নেবে। সনজিত বলে, মিষ্টি আইনসেন হোরগো বাড়ির লাই, আমনে ভাবির স্যান্ডেল লৈ যান, টাকা পরে দিয়েন। কিন্তু আশরাফুলকে রাজি করাতে পারে না।

বদলা-বদলির প্রস্তাবে সনজিতও অখুশি হয় না। আজ রাতে কাস্টমার একজনের বিয়ের দাওয়াত আছে শেখেরহাট বাঘাতাইয়ার বাড়ি। দোকান বন্ধ করে এমনিতেও মিষ্টি কিনতে মোহন্তের হাটে যেতে হতো।

অগত্যা সে মিষ্টি রেখে স্যান্ডেল দেয়।

শোয়ায়েব মুহামদ

জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯৭৬; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশা হিশেবে বসায়ন শিল্পসংস্থায় চাকরি করছেন।

প্রকাশিত বই—
ঘুড়িযাত্রা [পাঠসূত্র, ২০১৫]

ই মেইল : mohammed.shoayeb@gmail.com

Latest posts by শোয়ায়েব মুহামদ (see all)