হোম গদ্য গল্প সম্মানের রকমফের

সম্মানের রকমফের

সম্মানের রকমফের
29
0

আমরা তিনবোন আর একভাই। শিউলি, জবা, হাসনাহেনা, আর শিমুল। নাম শুনেই বোঝা যায় যে, বাবা-মা ফুলের নামে আমাদের এসব নাম রেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের এ নামগুলো আমাদের বাবা-ই রেখেছেন, মায়ের এ ব্যাপারে তেমন কোনো ভূমিকা নেই। মায়ের অনেক ব্যাপারেই তেমন কোনো ভূমিকা নেই। সহজ-সরল মা আমাদের পড়ালেখায় প্রায় বকলম হলেও সন্তানদের শাসনের ব্যাপারে আমাদের শৈশব-কৈশোরে বেশ কঠোর-ই ছিলেন। সে-তুলনায় বাবা নিতান্তই ঠান্ডা গোছের মানুষ। বাবা শিক্ষিত-কালচার্‌ড এবং সুদর্শন। এদিক দিয়ে অবশ্য মা, বাবার ধারেকাছেও নেই। তবুও মা তো মা-ই ।

আমি বাবা-মায়ের বড় সন্তান হওয়ার কারণে বাবা-মায়ের দাম্পত্যজীবন একটা সময় খুব কাছে থেকে দেখেছি; উপলব্ধি করেছি। আপনারা হয়তো বলতে পারেন, ‘আপনি একজন বেহায়া-বেলাজ মহিলা। তাই বাবা-মায়ের দাম্পত্যজীবন নিয়ে কথাবার্তা বলছেন।’ দাম্পত্যজীবন বলতে কেবল কি একান্ত ব্যক্তিগত সময় কাটানো সময়টাকে বোঝায়? নিশ্চয়ই না। তাহলে তো কথাবার্তা বলা যায়।


নানামুখী চাপ ও পরামর্শের কারণে আমাদের মেয়েদের পছন্দ দৃশ্যমান হয় না।


তখন আমি ক্লাস সেভেন পাশ করে কেবল এইটে উঠেছি। হ্যাঁ, ক্লাস এইটেই তো। দাদু যে বছর ইহজগৎ ত্যাগ করলেন, তখন তো আমি ক্লাস এইটেই উঠলাম। আমার বাবা-মায়ের তখন খুব আনন্দে দিন কাটছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দাদু মারা যাওয়ার সময়ে আপনার বাবা-মায়ের আনন্দে দিন কাটছে! না, আমার বাবা-মা, বিশেষ করে আমার বাবা তাঁর মায়ের জন্যে যথেষ্ট করেছেন, সকল ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছেন। তাও দাদুকে বাঁচানো যায় নি। হয়তো হায়াত ছিল না। এই আরকি ।

তো যে কথা বলছিলাম, বাবা-মায়ের তখন আনন্দে দিন কাটছে। এখানে একটি কথা যোগ করে নেয়া ভালো, আর তা হলো, বাবা আগ বাড়িয়ে কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতেন না ; কারও ওপর ক্ষেপেও যেতেন না। তবে, বাবার ওপর ক্ষেপে গেলে খবর ছিল। বাবা দ্বিগুণ শক্তিতে ক্ষেপে গিয়ে ভিকটিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। মা আমাকে বলেছেন, ‘তোর বাবাকে বুঝতে আমার বছর পাঁচেক সময় লেগেছিল।’ আসলে দুটো ফ্যামেলির দুই ধরনের কালচারে অভ্যস্ত হওয়া দুজন মানুষের একই ছাতার নিচে এসে বসবাস করা যে একটি মানিয়ে নেয়া সংগ্রাম তা অনেকে হয়তো জানেনই না। আসলে মানিয়ে চলতে হয়, সেক্রিফাইস করতে হয়। সকলে এ কাজটি করতে পারেন না। যারা করতে পারেন, তারা সুখের সংসার করেন।

এই দেখুন কত কথা বলছি! আমরা যারা শিক্ষক, তা প্রাইমারিরই হোক, আর বিশ্ববিদ্যালয়েরই হোক, ধান বানতে আমাদের শিবের গীত গাইতে হয়। ওই যে ক্লাসে ক্লাস মেইনটেইন করতে গিয়ে কত ধরনের বাতচিত করতে হয়, তার প্রভাব পড়ে ক্লাসের বাইরেও। আর কত বছর আগের কথা বলছি ! তা বছর বিশেক তো হবেই।

জানালা দিয়ে দেখছি, বাবা দরজার বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আকাশ গুড়গুড় করছে। বর্ষণ হবে হয়তো। আমাকে দেখেই ইশারা করলেন, কথা যেন না বলি। বাবার কথা শিরোধার্য। ভেতরে তখন দাদু আর মায়ের মধ্যে তুমুল বাক্য বিনিময় হচ্ছে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। বাবা এসব ব্যাপারে বেশ উদার। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাবা কোনো অবস্থাতেই কারও পক্ষ অবলম্বন করেন না। পরে দোষ দেখে কথা বলেন; লজ্জা দেন। এই যেমন আমার স্পষ্ট মনে আছে, বাবা ঘরে ঢুকে দাদুকে বলেছিলেন, ‘আমি সব শুনেছি। তোমার দোষ মা। কেন তুমি হারামজাদি, ছোটলোকের মেয়ে বললে।’ মা তখন আশকারা পেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, বাবা ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমার কথা বলার দরকার নাই।’ আরেকবার, বাবা বাইরে থেকে এসে সব শুনে মাকে বললেন, ‘শোন, ইনি আমার মা। একটু বুঝেশুনে কথা বলো। না, তোমার পারিবারিক শিক্ষা এই রকম!’ মা কথা বলবেন! অপমানে মিইয়ে গেলেন। বাবা এরকমই ছিলেন। কথা বলতে ছাড়তেন না। সেই বাবার মেয়ে আমি। কথা বলতে আমিও ছাড়ি না।

তো আনন্দেই আমাদের দিন কাটছিল। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। কী পোস্টে চাকরি করতেন, তা আপনাদেরকে বলছি না। তাছাড়া বলার মতো পদ-পদবিও ছিল না। তবে, আমাদের কোনো কিছুর তেমন অভাব হয় নি। যখন যেটা আবদার করেছি, বাবা সে-আবদার পূরণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। হয়তো বাবার কিছুটা উপরি আয় ছিল। তবে, নিশ্চয়ই তা বলার মতো না। আর না হলে বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পড়ালেখা বাদ দিয়ে আমাকে মেয়ে হয়েও সংসারের হাল ধরতে হলো কেন?

এসএসসি আর এইচএসসিতে সায়েন্স থেকে ভালো রেজাল্ট করে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভালো একটা সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ার জন্যে জোর চেষ্টা-চরিত্র করছি। বছর পাঁচেক হয় আমাদের শহরে তখন ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। পড়লে এই ইউনিভার্সিটিতে পড়ব, এই রকম মানসিকতা নিয়ে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ, আমার আরও ছোট ছোট ভাইবোন আছে, তাদের বিষয়ও খেয়াল রাখতে হবে। আমি যদি উচ্চশিক্ষা নেয়ার জন্যে নিজ শহর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার ব্যাপারে বাবা-মায়ের ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করি, তাহলে সীমিত আয় নিয়ে বাবার পক্ষে সংসার চালানো রীতিমতো বেশ কঠিন হয়ে যাবে। তো প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ওই যে বললাম বেশ জোরেশোরেই, কিন্তু অ্যাডমিশন টেস্টের আগের দিন কপালে ঠাটা পড়ল।

বাবা রোড অ্যাক্সিডেন্টে বিদায় নিলেন। অফিস থেকে বেরিয়ে বাসে করে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন, পথে বাসে-বাসে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। কেউ মরল না, গুরুতর আহতও হলো না, শুধু বাবা মরে গেলেন। কপাল খারাপ হলে এরকমই হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ কি পরীক্ষা দেয়; অ্যাডমিশন টেস্টে অংশগ্রহণ করে? আমার আর অংশগ্রহণ করা হলো না। মা বললেন, ‘মা রে কী বলব, মন তো মানে না। তোর ছোট ছোট ভাইবোন…।’ মাকে আর বলতে দিলাম না। নিজে নিজে সবকিছু বুঝে, চিন্তা করে, চাকরির প্রিপারেশন নিতে শুরু করলাম। বছর খানেকের মাথায় চাকরি হয়ে গেল। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করলাম।

এই আমি একজন নিজের ঢোল নিজে পেটাতে দ্বিধা করি না। এ নিয়ে আপনারা কে, কী ভাবলেন, তা নিয়েও ভাবি না। কাজেই ঢোল বলতে আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি, সেটা হচ্ছে, আমি পড়ালেখায় মেধাবী ছিলাম এবং আমার ভাইবোনেরা আমার চেয়েও মেধাবী হয়েছে। এবং একটা সময় প্রাইভেট টিউশনি করে ওরা নিজেদের যাবতীয় খরচ নিজেরাই জোগান দিয়েছে এবং স্মুথলি এগিয়েও গেছে। সংসারের চিন্তা করতে হয় নি। সংসারের চিন্তা তো ছিল মা আর আমার ওপর। মায়ের ফ্যামেলি পেনশন, আর আমার বেতনে মোটামুটি সংসার চলেছে। তেমন কোনো অসুবিধা হয় নি।

অসুবিধা বা গণ্ডগোল যাই বলি না কেন, ওইটি প্রথম ঘটায় বা লাগায় জবা। অর্থনীতি অনার্সে ফার্স্টক্লাস সেকেন্ড হয়ে মাস্টার্স পড়ার সময়ে ওকে আর ওরই ডিপার্টমেন্টের তরুণ শিক্ষক জাহিদুর রহমানকে নিয়ে কী একটা গুজব যেন ইউনিভার্সিটিতে মুহূর্তের মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে যায়। তড়িঘড়ি করে কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে সেরে ওরা নিজেরা নিজেদেরকে সামাল দেয়।

কিন্তু, মাকে সামাল দেয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বকেঝকে, কেঁদেকেটে জবাকে একেবারে তুলোধুনো করে ছাড়েন মা। আমি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে প্রকাশ্যে জবার পক্ষ নিয়ে মাকে বোঝাই এবং গোপনে বিষয়টির লাভ-লোকসান সম্পর্কে মাকে অবহিত করি। দ্রুত মা স্বাভাবিক হোন, ততদিনে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে প্রাইভেটে বিয়ে পাশ করে নিয়েছি।


প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আমি বিয়ে করব না—এই ব্রত নিয়ে রেখেছি।


এই আমরা শিক্ষিতরা যতই মুখে, ‘এখন একবিংশ শতাব্দী চলছে, এখন নারী-পুরষে কোনো বৈষম্য নেই’ বলে চিৎকার-চেঁচামেচি করি না কেন, আমাদের সমাজ, আমাদের মন-মানসিকতা এখনও প্রাচীন, এখনও পুরোপুরি পুরষতান্ত্রিক! মেয়েদের এখনও পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়! অন্য কোনো সময়ে না হলেও বিশেষ করে বিয়ের মওসুমে বিষয়টি তো একেবারে ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়ে। জবা একদিক দিয়ে ভালোই করেছে। পণ্যসামগ্রী হিসেবে বিয়ের বাজারে বারে বারে তাকে সেজেগুজে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয় নি। যৌতুকের কাছে নিজের ইচ্ছেকে হেরে একেবারে জলাঞ্জলি দিতে হয় নি। যেটি আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিল।

কেবল একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

জবা-জাহিদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার মাস চারেক বাদে আত্মীয়-পরিজন সকলের প্রচেষ্টায় তখন একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাব আসছে। কেউ পছন্দ করছে, কেউ করছে না। আর আমিও যে সকলকে পছন্দ করব তাও তো না। তবে, আমি দেখেছি, শেষমেশ নানামুখী চাপ ও পরামর্শের কারণে আমাদের মেয়েদের পছন্দ দৃশ্যমান হয় না। বিপরীত পক্ষের পছন্দই সাধারণত কার্যকর হয়। তারপরও কোনো কিছুৃই শেষমেশ ফ্রুটফিল হলো না ।

অবশেষে তিনি এলেন। আমাকে পছন্দ করলেন। এই তিনি হলেন সরাসরি নিয়োগ প্রাপ্ত আমাদের এক সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। যিনি আবার শ্বশুরবাড়ির টাকায় প্রাইভেটকার চালাতে ইচ্ছুক। তারপরও কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়ে গেল। যখন ওঁর মন-মানসিকতা বোঝার জন্যে আমি কথাবার্তা শুরু করলাম, ওমা, দেখি ভদ্রলোক বলছেন, ‘প্রথম মাস থেকেই আমরা সাশ্রয়ী হয়ে চলব। দুইজনের বেতন একসঙ্গে রাখব, সেখান থেকেই খরচ করব।’ আমি যা বোঝার বুঝে গেলাম। আমার সংকল্প হচ্ছে, যেটা আমি সবসময় ধারণ করি, সেটা হচ্ছে, আমি আমার সবচেয়ে ছোট ভাইটিকে মানুষ না করা পর্যন্ত সংসারের খরচ দেয়া অব্যাহত রাখব। কাজেই, হেডমাস্টার সাহেবের সঙ্গে বনিবনা হলো না।

এদিকে কে বা কারা রটিয়ে দিয়েছে, ডাক্তারের সঙ্গে নাকি ‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আমি বিয়ে করব না’—এই ব্রত নিয়ে রেখেছি, তাই যেকোনো ছলছুতোয় বিয়ের প্রস্তাব খারিজ করে দিচ্ছি। আরে বেটা হাঁদারাম, দেবদাস ছেলেরা হয়, মেয়েদের ডিকশনারিতে ওই শব্দটি নেই।

আর ও তো আয়মান; ডাক্তার আয়মান। ডাক্তার আয়মানের সঙ্গে আমার ফ্রেন্ডশিপ ছিল। সে তো আমার ক্লাসমেট। ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাসমেট। কিন্তু ডাক্তার সাহেব কি প্রাইমারির শিক্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন? নিশ্চয়ই না। কাজেই, এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তার হওয়ার বছর তিনেক আগেই ওই-ই ফ্রেন্ডশিপ চুকিয়েছে।

এরই মধ্যে একদিন আমাদের শহরের ওই ইউনিভার্সিটি থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে হেনা বছর খানেক চেষ্টা-চরিত্র করে কানাডার ভিসা জোগাড় করে পহেলা ফাল্গুনে বিয়ে সেরে ওর বর আসিফকে সঙ্গে নিয়ে এসে মনে হয় কিছুই হয় নি এই ভাব নিয়ে মাকে সালাম করে বলল, ‘মা, আসিফ। তোমার মেয়ের হাসব্যান্ড।’ মা কী বলবেন, দেখি রাগে ফুসছেন। তাড়াতাড়ি সম্মুখে গিয়ে বললাম, ‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ড্রইংরুমে গিয়ে বস।’ মাকে কী বলব। বোঝালাম। ওই আগের কথাই রিপিট করলাম। তারপর বললাম, ‘তোমার এক ভাগ্য মা। এক মেয়ের জামাই ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, আরেক মেয়ের জামাই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।’ মা কিছু বললেন না। শুধু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার ভাগ্য।’ কথাটি কি আনন্দের, না দুঃখের, তা বোঝা গেল না।

মায়ের অনেক কথাই অনেক সময় কোনটা আনন্দের, আর কোনটা দুঃখের, তা বোঝা যায় না। একবার হলো কী, তখন আমি বেশ ছোট। মায়ের সঙ্গে বাবা রাগ করে সপ্তাহ খানেক বাড়ির বাইরে কাটিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার সময় মায়ের জন্যে শাড়ি একটা নিয়ে এলেন। বললেন, ‘রেখা, তোমার জন্য শাড়ি এনেছি। দেখ, কত সুন্দর শাড়ি! পছন্দ হয়েছে?’ মা উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, পছন্দ হয়েছে। বেশ সুন্দর শাড়ি।’ বাবা আর কথা বাড়ালেন না। আমার মনে হয়, বাবা বুঝতে পারেন নি, মা আনন্দ নিয়ে কথাগুলো বলছেন, না দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বলছেন?

দু-দুটো মেয়ের বিয়ে দেয়ার ঝামেলা চুকে-বুকে গেলেও মা কিন্তু আনন্দে নেই। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে কাঁদেন, আর আমাকে দেখলেই তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছেন। এসব ব্যাপারে আমার তেমন কোনো অনুভূতি নেই। টাইমিংয়ে তালগোল পাকালেও আমি মনে করি ভালোই করেছে ওরা। নিজেদের বর নিজেরাই বেছে নিয়েছে। পণ্য হয়ে কারো সম্মুখে গিয়ে হাজির হয় নি। প্রত্যাখ্যানের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে নিজেকে ধ্বংস করে নি।

সময় এভাবেই বয়ে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে আমি আবার অনুমোদন নিয়ে প্রাইভেটে ইসলামের ইতিহাসে এমএটা করে নিয়েছি। এবং প্রমোশন না পেলেও চলতি দায়িত্বে হেডমাস্টারের দায়িত্বভারও বুঝে নিয়েছি।

এই যে আমি আপনাদের আমার জীবনের গল্প শোনাচ্ছি। গল্প বলতে আর কত সময় লাগে! মিনিট পনেরো, কিংবা তার থেকে আরও কিছুটা বেশি। অথবা, আরও কিছুটা বেশি। কিন্তু, জীবনের এই জ্বালা-যন্ত্রণাকে, এই কষ্টটাকে আপনি সময়ের নিক্তিতে কখনও মাপতে বা উপলব্ধি করতে পারবেন? জানি পারবেন না।

যাই হোক, বয়স প্রায় চল্লিশের ধারেকাছে চলে যাওয়ায় এখন আর বিয়ের প্রস্তাব আসার কথা না, তাই আসেও না। তবে, হঠাৎ কালেভদ্রে বউমরা প্রৌঢ়রা বিভিন্ন কায়দায় ঢিল ছোড়াছুড়ি করে। তবে, আমার দৃঢ়তার কারণে ওদের এগোবার আর সৎ-সাহস হয় না।

এদিকে, আমার থেকে বছর দশেক ছোট শিমুলও অ্যাকাউন্টিংয়ে বিবিএ, এমবিএ করে সিনিয়র অফিসার হিসেবে একটি প্রাইেেভট ব্যাংকে যোগদান করেছে। জানি না কদিন ব্যাংকে থাকে। বলেছে, যে কোনো ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পেলেই লেকচারার হিসেবে ঢুকে যাবে। সে-চেষ্টাও সে অবিরাম করছে।

তো এই শিমুল, যে কথা বলি নি, ব্যাংকে যোগদান করেছে, আর ওর ক্লাসমেট আরেক ব্যাংকার দেবলিনাকে কোর্টমেরেজ করে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। অবশ্য দেবলিনাকে কোর্টমেরেজ করা ছাড়া ওর আর উপায়ও ছিল না। ভট্টাচার্য পরিবারের মেয়ে দেবলিনাকে বিয়ে করতে হলে তো কোর্টমেরেজই লাগবে। এই দেবলিনা আবার আমাদের জবা-হেনার মতো বেশ সুন্দরী। আসলে বামুনের মেয়ে তো ফর্সা-সুন্দর না হয়ে পারে না।

এবার কিন্তু দেখছি মা ব্যতিক্রম। মা আনন্দে আছেন। মায়ের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে বললে মনে হয় অত্যুক্তি হবে না। আমি যেটা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝি, একমাত্র ছেলের সাফল্যে মায়ের এই আনন্দধারা বইছে। বয়ে চলুক আনন্দধারা। মা খুশি হলে তো আমরাও খুশি।

যাই হোক, ইদানীং আমার দায়িত্বেও একটি পরিবর্তন এসেছে। হেডমাস্টারের চলতি দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে পুরোপুরি হেডমাস্টার হিসেবে দায়িত্বভারও সমঝে নিয়েছি। কিন্তু হলে কী, সারাটা দিন তো এক দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই টিইও অফিস, এই স্কুল, এই ট্রেনিং, এই ক্লাস্টার মিটিং! সরকার আবার বছর তিনেক আগে হেডমাস্টার পদটি আপগ্রেড করে সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড অফিসার করেছে, কিন্তু বেতন ওই থার্ড ক্লাসের!

এদিকে আবার আমাদের নতুন টিইও স্যার উপজেলা অফিসে যোগদান করেছেন। ইনি আবার আমাকে বেশ ফেভার করেন। কারণে-অকারণে ডেকে পাঠান। টিইও তো, তাই না গিয়েও পারি না।


জীবন তো প্রায় শেষ হয়ে গেল। এই এক জীবনে বলা যায় কারও প্রেমে পড়লাম না।


দেখলাম, সুযোগ যখন পাচ্ছি, তখন সুযোগের একটা সদ্ব্যবহার করি। কাজেই, মাইল পাঁচেক দূরের স্কুল থেকে সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে টপকিয়ে বাড়ি লাগোয়া স্কুলে বদলি হয়ে এসেছি।

গুঞ্জন ছড়িয়েছে চারদিকে। কী গুঞ্জন? আমার আর টিইওর ডুবে ডুবে জল খাওয়ার রসায়ন ।
যা রটে, তা বটে।

জীবন তো প্রায় শেষ হয়ে গেল। এই এক জীবনে বলা যায় কারও প্রেমে পড়লাম না।

আর এখন এই বয়সে বিশ্বাস করার মতো মনে হয় একটা অবলম্বন খুঁজে পেয়েছি ।

আজ এক বৃহস্পতিবার। গত বৃহস্পতিবারে, বৃহস্পতি বৃহস্পতি গুনলে তো দিন আটেক হবে, টিইও অফিস থেকে কাজ সেরে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরে এসে দেখি, জবাকে নিয়ে এসে শিমুল মায়ের সঙ্গে তুমুল গুনগুন করছে।

কেবল ফিরেছি। কাপড়ও বদলাই নি। মাগরিবের আজান ইথারে ভেসে আসছে। আজানও শেষ হয় নি, ওরা মাকে সঙ্গে নিয়ে এসে সমস্বরে বলল, ‘বড়োপা, এগুলো তুমি কী শুরু করেছ! আমাদের তো সমাজে বসবাস করতে হয়। আমরা তো সমাজে বসবাস করি, নাকি!’ কত কথা বলল ওরা! শেষমেশ দেখলাম ওই দেবলিনাও কথা বলছে।

আজও দেখি, অফিস থেকে ফিরে এসে দেবলিনা মায়ের সঙ্গে কেবল গুনগুন করছে।

দেবলিনারও সম্মান যাচ্ছে!

(29)