হোম গদ্য গল্প সব নাম জানা হয় না

সব নাম জানা হয় না

সব নাম জানা হয় না
845
0

ছেলেটি আমাদের শহরে আজ এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঠিক শহর নয়; মফস্বল। তবু কিছুটা আত্মতৃপ্তির আশায় আর খানিক শহর ও মফস্বলের মাঝে তমিজ করবার বিদ্যা কম থাকায় মফস্বলই আমাদের কথাবার্তায় শহর বলে উচ্চারিত হয়।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে যাবার পরও ছেলেটির নাম আমাদের কারোরই জানা হয় না। কোত্থেকে সে এসেছে কিংবা কোথায় আবার ফিরে যাবে, কিছুই না৷ হারু মিঞা অবশ্য আমাদের জানিয়েছে—ক’দিন থেকেই সে ছেলেটিকে শহরে দেখে আসছে। রহিমের হোটেলে খানা খাদ্য খায়; রাত হলে শঙ্কর বাবুর পাট-ঘরের বারান্দাতে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে।


কিছু দেখতে না পেরে ভিড়ের মধ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে : কী হইছে? এত মানুষ ক্যা এহ্যানে? লাশ! কার লাশ? 


কিন্তু হারু মিঞার চরিত্র আমাদের কাছে অনুদ্ঘাটিত নয়। কোনো কালেই তার কথা আমাদের খুব একটা বিশ্বাস হয় নি; আজও হয় না। তদন্তের খাতিরে তাই রহিম মিঞাকে আমরা জাপ্টে ধরি। তার কাছে জানতে চাই—ছেলেটিকে সে কোনোদিন তার হোটেলে দেখেছে কিনা! বহু সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেও রহিম এই চেহারার কোনো মূর্তি ইতঃপূর্বে দেখেছে কিনা মনে করতে পারে না। সে অপারগতা প্রকাশ করে—নারে মিঞাভাই, এরোম কাউরে কুনোদিন দেহিছি বলে তো মনে কত্তির পারতিছিনে। আমার হোটেলে এক কাপ চা খালিও তো তার চিহারা জীবনভর মনে তাহে আমার।

সে-আমরাও জানি। রহিম মিঞার হোটেলে একবার যে প্রবেশ করে, তা সেটা যে কারণেই হোক, তার ছবি ছাপা হয়ে যায় রহিম মিঞার মনে। একবার তো এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। কোথাকার কোন আব্দুল গফুর ডাকাতি মামলায় ফেঁসে যায়। পুলিশের কাছে সে বলে—এ ডাকাতির সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ডাকাতির সময় সে আমাদেরই শহরে, রহিম মিয়ার হোটেলে ভাত-মাংস খেয়ে আয়েশ করে দাঁত খিলাল করছিল।

পুলিশ তার কথা শুনবে কেন! তারা সেই আবদুল গফুরকে আদালতে চালান করে দেয়। কোনো উপায়ন্তর না দেখে আব্দুল গফুরের পরিবার রহিম মিঞার সাথে যোগাযোগ করে। তারা রহিম মিঞাকে আবদুল গফুরের ছবি দেখালে সে তাকে চিনতে পারে। এবং রহিম মিঞা ভাবে—একজন নির্দোষ লোককে ফাঁসিয়ে দেয়া হবে! রহিম মিঞার মানবিক কর্তব্যবোধ জেগে ওঠে। অতঃপর রহিম মিঞা সাক্ষ্য দিতে আদালত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উকিলের জেরার মুখে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে—জি হুজুর, ডাকাতির যে সুমায়ের কতা কচ্চেন ওই সুমায়ে তিনি আমার হোটেলেই ছিলেন। রান্না মজা হইছিল দেইখে ডাবল মাংস অর্ডার করিছিলেন।

আদালত রহিম মিঞার কথা আমলে নিয়ে আরও সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরে প্রমাণিত হয়েছিল—আবদুল গফুর ডাকাত দলের সাথে যুক্ত থাকলেও সেদিনের ডাকাতিতে সে যুক্ত ছিল না। ডাকাতির সময়টাতে সে রহিম মিঞার হোটেলে গরুর হাড্ডি চিবুচ্ছিল।

এই হলো রহিম মিঞা৷ সে যখন বলে—এ ছেলে তার হোটেলে কোনোদিন খায় নি, তখন আমাদের তা মেনে নিতেই হয়।

আচমকা ভিড়ের মধ্য থেকে আওয়াজ আসে—হারু মিঞা যার কতা কতিছে সে ছাওয়াল তো একটা পাগল! তারে তো আমুউ দেহিছি শঙ্কর বাবুর পাটের ঘরে শুয়ে থাকতি। তার পুশাক-আশাক আর ছ্যামড়ার পুশাক-আশাক তো এক না। তফাত আছে!

এ বক্তব্যে আমরা নতুন করে নড়েচড়ে বসি। আমরা আরও মনোযোগী হয়ে লক্ষ করি—যে ছেলেটি আজ হাতের তালুর মতো আমাদের ছোট্ট শহরটিতে অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে, যার নাম-পরিচয়-ঠিকানা কিছুই আমাদের জানা নয়। তার চেহারাতে একটা আভিজাত্যের ছাপ আছে। গায়ের পোশাক-আশাকও বেশ পরিপাটি।

কিন্তু আমরা বুঝে উঠতে পারি নাকে সে! কোত্থেকেই-বা এসেছে? আমাদের মধ্যে বিদ্যায়-বুদ্ধিতে একটু অগ্রসর যে মামুন সে পরিচয় সন্ধানের উদ্দেশ্যে ছেলেটার পকেট হাতড়েছিল। যদি কোনো পরিচিতি পাওয়া যায়; জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা অন্য কিছু! তাকে হতাশ হতে হয়েছে। আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও কিছু মেলে নি। ছেলেটির পরিচয় বলতে আমাদের এতটুকুই কেবল জানা—আমাদের শহরের পানবিক্রেতা রাজীবই প্রথম দেখে তাকে। ফজরের পরপর রাজীব দোকান খোলে। প্রতিদিনের মতো পানি আনতে সে যায় নদীর ঘাটে। বালতি ভরে নিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় ওর চোখ পড়ে ঘাটের চওড়া সিঁড়ির কোনার দিকে। দেখে—কেউ একজন চিত হয়ে পড়ে আছে। প্রথমে তার সন্দেহ হয়; কিন্তু কাছে যেতে সে নিশ্চিত হয়—চিত হয়ে যাকে শুয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে সে একজন মানুষই এবং একজন অল্পবয়সী ছেলে। তার চোখ মুদিত, ঠোঁটে পাতলা হাসি; হাসিটুকু যেভাবে খেলা করছে তাতে একবার মনে হয় ছেলেটি জেগে আছে এবং জীবন্ত। নিস্পন্দ পড়ে থাকা মানুষকে জীবন্ত ভ্রম হতে ঘাবড়ে যায় রাজীব; ভোরের আধো অন্ধকারে আতঙ্ক এসে জাপটে ধরে তাকে। রাজীব হাতের বালতি ফেলে দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে ছুটতে থাকে। তাকে এভাবে দৌড়াতে দেখে মসজিদ-ফেরত মুসল্লিদের কৌতূহল হয়; তারা রাজীবের পথ আটকায়। রাজীবের মুখে কথা সরে না; আঙুল দিয়ে নদীর ঘাটের দিকে ইশারা দিতে পারে কেবল।

আমাদের যতক্ষণে ঘুম ভাঙে ততক্ষণে এ সংবাদ আর কারোরই অজানা নয়। মফস্বল কিংবা শহর অথবা শহরতলি যাই বলি না কেন, এখানে আমাদের যাপিত জীবন বড্ড আটপৌরে; একঘেয়ে। কোথাকার কোন যুবক আমাদের সেই আটপৌরে জীবনে হঠাৎই অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়ে থাকে; যদিও সে জীবন হাতে করে আসে নি। নিস্তরঙ্গ গাঙের বুকে এমন ভাসতে ভাসতে আমাদের ঘাটে এসে আটকে গেছে বলেই হয়তোবা শহর এভাবে ভেঙে পড়েছে তার নিথর নিস্পন্দ দেহের ওপর।

আমরা যখন ঘটনাস্থলে হাজির হই তখন সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে। তবু মানুষ আসছে। মানুষ কান খাড়া করে শুনতে চাইছে, পায়ের পাতায় ভর করে দেখতে চাইছে। কিছু দেখতে না পেরে ভিড়ের মধ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে : কী হইছে? এত মানুষ ক্যা এহ্যানে? লাশ! কার লাশ? আহা রে! কোন মার কোল জানি আবার খালি হইল!

আমরা হাজির হয়ে ঘটনাস্থলের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নিয়ে নিই। প্রথমে ছেলেটিকে আমরা পানির বুকে ভেসে থাকা থেকে উদ্ধার করি। যদিও আমাদের দ্বিধা ছিল—পুলিশের কাছে এ কারণে জবাবদিহি করতে হয় কিনা! কিন্তু সব কিছু উপেক্ষা করার বয়সী আমরা ভাবি—ওসব তখন দেখা যাবে। আমাদের এই মফস্বল ও থানার মধ্যবর্তী যে দূরত্ব তা অতিক্রম করতে তো পুলিশের দিনও পেরিয়ে যেতে পারে! এত সময় কী ছেলেটা নদীতে ভাসতে থাকবে! জবাবদিহি ও থানার কথা মনে হতেই আমাদের ভাবনাতে আরও আসে—পুলিশকে তো এখনও খবর দেয়া হয় নি; অথচ এসব ঘটনাতে পুলিশের ভূমিকাটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বনাথপুর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ুয়া মিরাজকে তাই দায়িত্ব দিই মোবাইলে সরাসরি দারোগা সাহেবের সাথে কথা বলে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানাতে এবং তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হবার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের করণীয় কী সে ব্যাপারেও জেনে নিতে।


পানিতে ধুয়ে গেলেও মেরুন রঙের টি-শার্টে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ আবছাভাবে প্রতীয়মান৷ 


মাদুর পেতে ছেলেটিকে রহিম মিঞার হোটেল সংলগ্ন চাতালে শুইয়ে দিই৷ পানিতে থেকে ছেলেটির শরীর ভারী হয়ে পড়েছে; পাশাপাশি আমাদের কাছে এটাও আবিষ্কৃত হয় যে, চেহারা, যেটা আমরা দূর থেকে অক্ষত মনে করে ভাবছিলাম—মনোযাতনিক কারণে আত্মাহুতি দিয়ে থাকতে পারে। এই বয়সের ছেলেরা যেমন অনেকেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা উপার্জনে বিফল হয়ে করে থাকে। কিন্তু কাছ থেকে নিরীক্ষা করলে আমাদের চোখে পড়ে—মাথার পেছনের দিকটা একদমই থেতলে গেছে। পানিতে ধুয়ে গেলেও মেরুন রঙের টি-শার্টে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ আবছাভাবে প্রতীয়মান। কালো জিন্সের ভেতর দিয়ে আমরা আরও দেখতে পাই—কোনো শক্ত আঘাতে ডান পায়ের গোছা এরেবারেই চুর হয়ে গেছে; বেঁচে থাকলেও পঙ্গুত্বের জীবন টেনে চলতে হতো তাকে।

ভিড়ের মধ্যে নতুন করে গুঞ্জন নেমে আসে। আমাদেরও শিড়দাঁড়া বেয়ে বরফের মতো শীতল স্রোত নেমে যায় : এ তবে আত্মহত্যা নয়; হত্যা। কিন্তু কে করল এ নিষ্ঠুর কাজ! আমাদের এই তল্লাটে, আমরা যদ্দুর জানি, প্রতারক আছে, জোচ্চর আছে, কিন্তু কারও দেহ থেকে প্রাণ বের করে দিবে এমন খুনি তো কেউ নেই! তবে কি এই ছেলে এখানকার কারও দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত নয়! অন্য কোথাও অন্য কারও হাতে প্রাণ খুইয়ে নদীর বুকে ভাসতে ভাসতে আমাদের ঘাটে এসে থমকে গেছে? কিন্তু কে করল এমন নিষ্ঠুর কাজ! কেনই-বা করল?

হাজারটা প্রশ্ন এসে হাজির হতে থাকল আমাদের চোখের সমুখে। ঘটনার উৎসমুখ সন্ধানে আমরা তৎপর হয়ে উঠি। কিন্তু কোনো প্রকার সূত্র আমরা দেখি না—যেটাকে আঁকড়ে ধরতে পারি।

আমি বলি কী, রতনপুরের ঘটনা না তো!

তাকিয়ে দেখি মেম্বার চাচা কথা বলে উঠেছেন। এতক্ষণ তবে কি তিনি ভিড়ের ভেতরেই ছিলেন! আশ্চর্য! চোখে পড়ল না কেন! মেম্বার চাচা তার আশঙ্কার কথা শেষ করেন।

‘শুনা যাতিছে মালিক পক্ষ রাতে রাতে লাশ সরায়ে ফেলতিছে। ট্রাক ভইরে ভইরে ম্যালা লাশ নাকি এদিক সেদিকে গাঁও-গেরামে ফেলায়া দিয়ে আসতিছে!

মেম্বার চাচার বক্তব্য আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি; কিন্তু বিশ্বাস করে নিতে আগ্রহ বোধ করি না।

রতনপুরের ঘটনা তো আমরাও জানি! দুইদিন যাবৎ খবরে কেবল ওই ছয় তলা ভবনধসের দৃশ্যই অনবরত দেখিয়ে যাচ্ছে। আহতদের রোনাজারি আর নিহতদের স্বজন হারানোর আহাজারিতে আমাদের মতো শক্তপোক্ত যুবকদের হৃদয়ও তো হু হু করে উঠছে। টেলিভিশনের পর্দায় যখন দেখেছি : অশীতিপর বৃদ্ধা তার পুত্রের ছবি বুকে ঝুলিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের আঙুল গণ্ডদেশে পৌঁছে গেছে অশ্রু ফোঁটা শুষে নিতে। কিন্তু এই যে সংবাদ মেম্বার চাচা মাত্র আমাদের দিলেন, এবং গতদিন থেকে আমাদের এই মফস্বলের বাতাসেও ভেসে বেড়াচ্ছে তা মেনে নিতে আমাদের আগ্রহ হয় না; বরং শক্তপোক্ত একটা গুজব বলেই একে আমাদের মনে হয়। দেশে বড় কোনো দুর্ঘটনা যখন ঘটে যায়, এমন দুর্ঘটনা, যা পাষাণ হৃদয়কেও স্পর্শ করে তখন এমন ছোটখাটো বহু গুজব বহু জায়গা থেকে মাটি ফুঁড়েই গজিয়ে যায় বলে আমাদের ধারণা। কারণ, আমাদের জানা—মানুষের আর্দ্র হৃদয় গুজব প্রতিস্থাপনের এক উর্বর ক্ষেত্র বটে।

আমরা মেম্বার চাচাকে বোঝাতে উদ্যোগী হই—না চাচা, তা কিরাম করি হয়! এই ছাওয়ালরে দেকলি বুঝতিছেন না, এর চিহারা দেইখে কিন্তুক মনে হয় না যে সে কারখানায় কাজ করে! কেমন ইস্টাইলির প্যান্টশার্ট পরা দেখিছেন!

চাচা আমাদের মুখের কথা যেন কেড়ে নিয়ে যান। আরে বাপু, এত বিরাট কারখানা, সেখানে তো আর খালি অশিক্ষিত পোলাপানই কাম করে না! ক্যান, আমাগের সেলিম, সেও তো গার্মেন্টে কাম কত্তিছে আজ ম্যালা বছর ধইরে। তারে দেখলি পারা কি কতি পারবা!

আমরা মাথা নেড়ে স্বীকার করে নিই যে, মেম্বার চাচার কথাতে যুক্তি আছে। যে যুক্তি অগ্রাহ্য করার নয়। তবু আমাদের মন সায় দেয় না। আমাদের মন আমাদের বলে—কোথায় রতনপুর! আমাদের তিন জেলা পর, রাজধানীর সাথে মিশে, সেখানকার কোনো পোশাক কারখানার ভবন ধসে মারা গেছে কিছু শ্রমিক, সেই মৃতদের একজনের লাশ এই এতদূর এক মফস্বলের স্রোতহীন মরা গাঙে কিভাবে আসবে!

এই যখন আমাদের মনের অবস্থা তখন মিরাজ, বিশ্বনাথপুর কলেজে যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত, যাকে খানিক আগে থানার দারোগা সাহেবের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সে আমাদের জন্য এক অভিনব তথ্য আমদানি করে। মিরাজ জানায়—মিঞা ভাই, গত পস্যু রাতে রাজধানীতে যে ভয়াবহ গোলাগুলি হইছে শুনা যাতিছে মাদরাসার ম্যালা ছাত্র তাতে মারা পড়িছে। প্রশাসন নাকি লাশ লুকায়ে ফেলতিছে। যমুনা নদীতেও নাকি দশ বারোটা লাশ পাওয়া গেছে।

মিরাজের কথা শেষ না হতেই আমরা সজোরে ধমকে উঠি। ধুর মিঞা, এমনিই এক গুজবে অস্থির তার মইদ্যে তুমি আরেকখান নিয়া হাজির! তুমি কলেজপড়া ছাওয়াল, এট্টু হুঁশ কইরে কথা কবা না! তুমি দেকতিছো যে এই ছাওয়াল প্যান্টশার্ট পরা!

প্যান্টশার্ট পরা অনেক ছাওয়াল-পাওয়ালও কিন্তুক গতদিন মিছিলে গিছিল! মিরাজ আমাদের কথা থামিয়ে যেন বলে ওঠে।


এমন লাশ যে জীবদ্দশায় আমাদের কারুর স্বজন ছিল না।


ভারি তর্ক কত্তিচো যে! গত পরশু রাত্তিরে কেউ মরিছে কিনা সিডাই তো নিশ্চিত না; তুমি কও নদিতে লাশ ভাসতিছে! মিরাজ কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে আমরা থামিয়ে দিই। বলি—

আহ্, বাদ দাও তো! এই ছাওয়াল কিডা, কোনতে আইছে, তা বাইর করা আমাগের কাম না। এগুলান পুলিশের কাম। তারা আইসে দেকপিনে। দারোগার সাথে যোগাযোগ করছিলা!

দারোগা সাহেব থানায় নাই। বাইরি গেছে। এক কনস্টেবল কলো, দারোগা সাহেব এলেই তারে ঘটনা জানাবি।

টিকাছে। তুমি নাম্বারডা আমারে দাও।

মিরাজের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে আমি ফোন দিই; ও প্রান্তে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। দশ-বারো বার রিং হওয়ার পর দারোগা সাহেব ফোন রিসিভ করেন। জানান যে, তিনি ঘণ্টা খানিকের মধ্যে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে যাবেন।

এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভিড় কমতে থাকে। আমাদের মফস্বলের অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। কাজকর্ম বাদ দিয়ে সারাদিন তো আর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না! সেও এমন লাশ যে জীবদ্দশায় আমাদের কারুর স্বজন ছিল না। হঠাৎই বুকটা ফাঁকা হয়ে আসে। আমরা কেউ তার স্বজন নই; কিন্তু কেউ তো আছে যে এই ছেলের আত্মার আত্মীয়; গতরাতেও যে দরজা খুলে তার পথ চেয়েছিল। আজও হয়তোবা থাকবে। কিন্তু কোনোদিনই তার জানা হবে না—কেন সে আর ফিরছে না!

আহমাদ সাব্বির

১৪ জুলাই, ১৯৯৬; মাগুরা সদর, মাগুরা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : কওমি শিক্ষা ধারায় দাওরায়ে হাদীস [মাস্টার্স সমমান]।

পেশা : লেখালেখি ও শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই—

কিংবদন্তির কথা বলছি [ডকুফিকশন, নাশাত পাবলিকেশন, ২০১৯]

ই-মেইল : ahmedsabbir7422@gmail.com

Latest posts by আহমাদ সাব্বির (see all)