শোধ

শোধ
0
Latest posts by কায়সার আহমদ (see all)

ফাতেমা শুয়েছিল। এমন সময় একটা রোমশ হাত ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে চিৎকার করতে, উঠে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না। নড়তে পারছে না। হাতটা কাছাকাছি চলে এসেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘুম ভেঙে গেল। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল সে। লেপটা একদিকে সরিয়ে রেখে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। সে ঘামছে। দরদর করে ঘামছে। জগ থেকে ঢেলে পানি খেল এক গ্লাস। এই স্বপ্নটা সে প্রায়ই দেখে।

বিছানায় শুয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে তার ছয় বছরের ছেলে আর তার স্বামী সিএনজি চালক ফারুক। ফাতেমা কিসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে তারা তা টের পায় না। আর না বললে বুঝবেই-বা কিভাবে। কিন্তু সব কথা কি বলা যায় সবাইকে। কিছু কথা আছে যার ভার একাই বইতে হয়। অকালে বাবা মারা যাওয়াতে তার কপাল পুড়ল। একদিন সন্ধ্যাবেলা আজান দিয়েছে এমন সময় তার বাবা বলল যে তার বুকের বাম দিকটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। তারপর তিনি ঘামতে থাকলেন। ঘেমে গোসল করে ফেললেন। দুতিনবার বমি করলেন। ফাতেমা কাসেম ভাইকে ডেকে এনেছিল। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল তো থাকে না। জেলা সদরের হাসপাতালে নিতে লাগল দুঘণ্টা। ওখানে নেয়ার পর ডাক্তাররা ঘোষণা করল যে উনি আর বেঁচে নেই। তারপর তার বড় ভাই তাকে বিয়ে দিয়ে দিল সিএনজি চালক ফারুকের সাথে। সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য নেই, কিন্তু কিছুটা সুখ সেখানে ছিল। একটা ছেলে হলো। সে এখন স্কুলে যায়।


তার বুকে মুখ রাখতে পেরেছে স্বামী বাদে অন্য দুজন।


ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। আজ বড্ড বেশি শীত পড়েছে। লাল রঙের একটা গরম চাদর গায়ে দিয়ে সে নাস্তা তৈরি করার জন্য রান্নাঘরে গেল। ফারুক উঠবে একটু পরেই। আর তার ছেলে উঠবে আটটায়। তার স্বামী নাস্তা খেয়ে সিএনজি নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। আবার আসবে দুপুরে খেতে। রাতে ফিরবে দশটার একটু পর।

২.
সারি সারি উঁচু বিল্ডিং। তারপর হঠাৎ একতলা একটি সেমিপাকা ঘর। ওইটাই ফাতেমাদের বাসা। সে ঘরে একা। তার ছেলে গেছে খেলতে। বাইরে একটা কাক ডেকে ডেকে উড়ে চলে গেল। কুয়াশায় ঢেকে আছে শহর। ঘরের মধ্যে তাদের জংধরা আলমারির আয়নার সামনে ফাতেমা দাঁড়িয়ে দেখছে নিজেকে। চেহারায় কোনো সমস্যা নেই। ক্রিম দেয়া মুখ চকচক করছে। বুকের কাপড়টা নামিয়ে বুকটা একটু দেখল। না, আগের মতোই আছে। ছেলে হওয়া সত্ত্বেও স্তন একটুও ঝুলে পড়ে নি। দেহ ঘুরিয়ে দেখল পিঠ, নিতম্ব। তার বুকে মুখ রাখতে পেরেছে স্বামী বাদে অন্য দুজন। এর মধ্যে একজন হলো কাসেম ভাই। কাসেম ভাইকে সে কতই না ভালোবাসত। খড়ের গাদার উপর যখন চাঁদ উঠত তারা বসে বসে সেখানে গল্প করত। কাসেম ভাই কত চেয়েছে তার দেহের একেবারে গভীরে প্রবেশ করতে। কিন্তু অত বেশি সে দিতে পারত না। তার ভয় হতো। কাসেম ভাইয়ের অধিকার ছিল নাভি পর্যন্ত। কাসেম ভাই কোনো কাজকর্ম করত না। চালচুলোহীন ভবঘুরে। বয়াতিদের গান শুনতে খুব পছন্দ করত। এসব কারণেই বড় ভাই কাসেম ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে দেয় নি। আজ কাসেম ভাই যে কোথায় আছে!

তার দেহের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছে আরেকজন। কিন্তু ওর কথা কাউকে বলা যায় না। সব কথা কি সবাইকে বলা যায়? সমাজ, সংসার এসবের কথাও তো ভাবতে হবে। তবে সব কথা খুশিকে বলা যেত। খুশি তার বান্ধবী—একই ক্লাসে পড়ত। এর আগে ওর মোবাইলটা যখন হারিয়ে গেল তখন খুশির নাম্বারটাও হারিয়ে গেছে। তাই ওর সাথে কথা বলা যাচ্ছে না। কী যে ভালো হতো যদি ওর নাম্বারটা আজ থাকত।

তার সংসারটা তো সুখেরই ছিল। ঝগড়াঝাটি হতো তবে খুব কম সময়ই। ফারুক তার গায়ে কখনো হাত তুলত না। তবে বেশি রেগে গেলে হাত উঁচু করে মারবে এমন ভঙ্গি করে বলত “চুপ কর”। ফাতেমা ভয় পেয়ে চুপ করে যেত। তবে ফাতেমাকে আদরও করত অনেক। সে প্রায়ই বাসায় এসে গল্প করত যে, মডেলের মতো দেখতে যুবক-যুবতীরা কফি খেতে যায় খিলগাঁও, গুলশান, বেইলীরোডে। সে নাকি একবার এক যাত্রীকে জিগ্যেস করেছিল গুলশানে একটা কফির দোকানের সামনে নামিয়ে দিয়ে “কফির দাম কয় টাকা?” যাত্রী অবাক হয়ে বলেছিল “দেড় শ টাকা। কেন? তুমি খাবে?” সে বলেছিল, “না। এমনিতেই জিগ্যেস করলাম।” ওসব কফি নাকি খুব মজা। ফাতেমাকে বলেছিল। এসব গল্প শুনে ফাতেমারও কফি খাওয়ার লোভ জেগেছিল। সে বলেছিল, “আমাকে একদিন ওই কফি খাওয়াবে?” ফারুক বলেছিল “আচ্ছা”। তারপর সত্যি সত্যি একদিন খিলগাঁয়ে তাকে কফি খাইয়েছিল। দারোয়ান তো প্রথমে ঢুকতেই দিবে না। পরে যখন তার স্বামী দারোয়ানকে পকেট থেকে টাকা বের করে দেখাল তখন সে বিশ্বাস করেছিল এবং কফির দোকানে ঢুকতে দিয়েছিল। খিলগাঁয়ে চকলেট কফি খেয়ে খুব মজা পেয়েছিল ফাতেমা।

তবে এখন আর ফাতেমার কফি খেতে ইচ্ছে করে না। সারাক্ষণ কী যেন ভাবে। সমাজ, সংসার, সন্তান, স্বামী সবকিছুকে অর্থহীন মনে হয়। প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছেটাও মাঝে মাঝে মনের মধ্যে উঁকি মারে। কিন্তু কিভাবে? এর সহজ কোনো উত্তর সে খুঁজে পায় না। তবে এটা ঠিক যে সুযোগ যদি কখনো আসে তবে সে সেই সুযোগ হাতছাড়া করবে না। সে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে।

৩.
ফজরের আজান দিয়েছে। পাড়ার কুকুরগুলো দল বেধে ঘোরাঘুরি করছে। একটা দাঁড়কাক তাল গাছে বসে ডেকে যাচ্ছে। চড়ুইয়ের দল একটা দেবদারু গাছে বসে ঝগড়া করছে। মুসুল্লিরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে নামাজে যাচ্ছে। বাতাস নেই তবে কনকনে শীত। চাঁদ এখনো ডুবে যায় নি। দালানকোঠার মাঝখান দিয়ে স্থির হয়ে জ্বলে আছে শুকতারা। ফাতেমার ঘুম ভেঙে গেছে। সে সাবধানে লেপটা সরিয়ে মশারি উঁচু করে বিছানা থেকে নামল। খাটের পায়ের দিকে আছে একটা আলনা। কাপড় চোপড় গোছানো। দরজার পাশে স্টিলের আলমারির সাথে আছে একটা ভাঙা শোকেস। তাতে কিছু কম দামি কাচের জিনিসপত্র আছে।


শাড়ি পরে আছে প্রিন্টের। চুল খোঁপা করা। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। বুক উঁচু। পেট নেই।


বিছানা থেকে নেমে প্রথমেই খাটের নিচে রাখা ইঁদুর ধরার ফাঁদটা বের করে আনল। ওটাতে একটা বড় ইঁদুর ধরা পড়েছে। ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছিল। সে ইঁদুরটাকে দেখে খুশি হলো। যাক তাহলে হারামজাদাটাকে ধরা গেছে। ফাঁদটা খাঁচার মতো। সে খাঁচাটাকে ইঁদুরসহ নিয়ে ঢুকল গোসলখানায়। বাতি জ্বালল। কল ছেড়ে বালতিটাকে পুরা করল। ইঁদুরটা ফাঁদ থেকে বেরোবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এবার আস্তে আস্তে খাঁচাটাকে বালতির পানিতে ডুবাতে লাগল। খাঁচাটা পানিতে ডুবে যাচ্ছে আর ইঁদুরটা খাঁচার যে অংশ এখনো পানিতে ডুবে নাই সেখানে থাকার আপ্রাণ চেষ্ট করছে। কিন্তু খাঁচাটা আস্তে আস্তে পুরোটাই পানিতে ডুবে গেল। ইঁদুরটা কযেক সেকেন্ড পানির মধ্যে দম নেয়ার চেষ্টা করল। তাতে পানি ঢুকে গেল তার ফুসফুসে। আর এভাবেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইঁদুরটা মারা গেল। নিথর হয়ে গেল তার দেহ। ইঁদুরের মৃত্যু নিশ্চিত করে ফাতেমা ওটাকে খাঁচা থেকে বের করে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। তারপর বালতির পানি ফেলে দিয়ে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকল নাস্তা তৈরি করতে। আজ তার মন ফুরফুরা। সকালটা ভালো গেছে। প্রাণ কেড়ে নেয়ার মধ্যে, সেটা যত ছোট প্রাণীই হোক না কেন, হয়তো আনন্দ আছে। সে সেই আনন্দ পেল।

ফারুক নাস্তা খেয়ে চলে গেলে সে নাস্তা খায়। তারপর আটটার সময় ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে নাস্তা খাইয়ে তবেই সে একটু দম ফেলার ফুসরত পায়। কিন্তু ছেলেটাকে নিয়ে সে আছে বিপদে। সকালে ডিম ছাড়া নাস্তা করতে চায় না। চকলেটের লোভ ফুচকা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে সে ছেলেকে নাস্তা খেতে রাজি করায়। এগারোটা বেজে গেলে ছেলে তার বন্ধুদের সাথে কাছেই একটা সরকারি স্কুলে পড়তে চলে যায়। আর ফাতেমা তখন রান্না করতে বসে। আজ বাজার নেই তাই আজ ডিম ভুনা আর ডাল রান্না করবে সে। এক চুলায় ডিম সিদ্ধ আর আরেক চুলায় ডাল চড়িয়ে দেয়।

তার রান্না প্রায় শেষ। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফাতেমা রান্না ঘর থেকে বের হয়ে দরজা একটু ফাঁক করল এবং চমকে উঠল। তার শ্বশুর এসেছেন। একটা অতিরিক্ত ঢোলা জ্যাকেট পরা, প্যান্ট ইস্ত্রি নেই, পায়ে আছে চামড়ার স্যান্ডেল। তিনি বললেন :

“বউমা, কেমন আছো?” হাতে চিপসের একটি প্যাকেট।

“ভালো।”

ফাতেমা খুব ভালো করে খেয়াল করল যে, তাকে ফাতু বলে ডাকছে না, বউমা বলছে। ফাতু বলে ডাকলে সে শঙ্কিত হতো। সে পাল্টা আপনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস না করেই বলল, “ভিতরে আসেন।”

ফাতেমা দরজাটা খুলে দিয়ে দ্রুত ওখান থেকে সরে রান্নাঘরে চলে গেল।

তার শ্বশুর রুহুল মিয়া গ্রামে থাকে। অটোরিকশা চালায়। বিপত্নীক। মাঝে মাঝে ছেলের কাছে আসে টাকা চাইতে। এবার কী জন্য এসছেন সেটা ফাতেমা আন্দাজ করার চেষ্টা করল। রুহুল মিয়া ঘরে ঢুকে রুমে বিছানো চৌকির উপর বসে পাশে বসানো টেবিলটায় চিপসের প্যাকেটটা রাখল। সে হাঁপাচ্ছে। জোরে জোরে দম নেয়ার চেষ্টা করছে। ফাতেমা এসে বলল, “চা দেই?” রুহুল মিয়া ফাতেমাকে আপাদমস্তক দেখল। সে একটা শাড়ি পরে আছে প্রিন্টের। চুল খোঁপা করা। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। বুক উঁচু। পেট নেই। রুহুল মিয়া ফাতেমার বুকের দিকে চাইতেই ফাতেমা বুকের কাপড় ঠিক করতে লাগল। রুহল মিয়া জবাব দিল, “আচ্ছা দাও।”


ফাতেমা শক্ত হয়ে গেল। ভেতর থেকে তার দরজার খিল আরো কঠিনভাবে লাগিয়ে দিল।


কিছুক্ষণ পর ফাতেমা চা নিয়ে এল। কাপটা এক হাতে ধরে পিরিচের পানি আরেক হাতে ফেলে দিল।

রুহুল মিয়া বলল, “শরীরটা ভালো নেই। ডাক্তার দেখাতে এসেছি। সকাল থেকে দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথা ঘুরছে। বমি বমি লাগছে। ফারুককে একটু খবর দাও।”

“আচ্ছা দিচ্ছি।” বলে ফাতেমা ভিতরের রুমে মোবাইল খুঁজতে গেল। তারপর ফারুককে কল দিল। ফারুক বলল, “মিরপুর যচ্ছি ট্রিপ নিয়ে। যাত্রী পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরতে আরো দু তিন ঘণ্টা লাগবে।”

রুহুল মিয়া চা শেষ করলেন এবং বললেন, “ফারুককে খবর দিয়েছ?”

“হ্যাঁ দিয়েছি। ফিরতে ফিরতে আরে দু তিন ঘণ্টা লাগবে।”

রুহুল মিয়া চা শেষ করে চৌকির উপর শুয়ে পড়ল। বলল, “বউমা, আমার অনেক খারাপ লাগছে।”

“ঠিক আছে আপনি শুয়ে থাকুন।”

ফাতেমা ভাবছে সে এখন কী করবে। কিছুক্ষণ পর রুহুল মিয়া ঘামতে লাগল। কনকনে শীতের মধ্যেও ঘেমে গোসল করে উঠলেন। তার বুকের বাম দিকে চিনচিন করে ব্যথা করছে। এরপর বমির শব্দ হলো। ফাতেমা সব কিছুই খেয়াল করছে। এই লক্ষণগুলো মরে যাওয়ার সময় তার বাবার মধ্যে দেখেছিল। মনে মনে খুশি হলো। সে ভাবছে তাহলে সেই বহুল প্রতীক্ষিত ক্ষণ কী এসে গেছে? ফাতেমা নিজের ঘরে চলে গেল।

পাশের রুম থেকে শোনা যাচ্ছে, “বউমা। বউমা, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।” আবার বমির শব্দ।

ফাতেমা শক্ত হয়ে গেল। ভেতর থেকে তার দরজার খিল আরো কঠিনভাবে লাগিয়ে দিল।