হোম গদ্য গল্প শূন্যে দাউ দাউ

শূন্যে দাউ দাউ

শূন্যে দাউ দাউ
5.60K
0

স্বরূপ ঘোষালের সকাল। খাঁখাঁ চারদিক জুড়ে যেন বেজে উঠছে আলাউদ্দিন খাঁর তুমুল সরোদ। যার শেষ প্রান্তে সুরের তার ছিঁড়ে নেমে আসে আস্ত কান্না। মন তার শ্রাবণ ডাকা দিন। স্ত্রী শচীর মৃত্যুর পরও এমন শূন্য মনে হয় নি। একাত্তরে ত্রিপুরার শরণার্থী ক্যাম্পে যখন মায়ের মৃত্যু হয়, তরুণ মুক্তিযোদ্ধা স্বরূপ ঘোষাল কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু এতটা ভেঙে পড়ে নি।

দালান বাড়ি, রাস্তা ঘাট এমনকি পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরটাকেই যেন শূন্য মনে হয়। অলিগলি থেকে বয়ে আসা বাতাস নিরীহ কুকুরের কান্নার মতো আছড়ে পড়ে তার জানালায়।

মানুষ মানুষের এমন আপন হয়! যতদিন বেঁচে থাকে বোঝা যায় না, কিন্তু যখন নাই হয় তখন মন বোঝে মনের ভার! রাহাত খান। বন্ধু। পরানের দোসর। নেই। গতকাল সকালে হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে। বিকেলে কবরে শোয়ায়ে ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো বাসায় ফিরেছে স্বরূপ। তিনটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়েছিল। সত্তরের কোঠায় বয়স, নানা রকম ওষুধ আর নিয়ম মানতে হয়। কিন্তু কখনও কখনও এসব মানার অবকাশ থাকে না। তবু তিনটা ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক হয় নি।

জেগে উঠতে উঠতে সকাল এগারোটা। শোবার ঘরের সাথে সংযুক্ত শান্তি কক্ষ। প্রাতঃক্রিয়া সেরে হাত মুখ ধুয়ে নিজের কক্ষের দরজা খুলল। বাসায় কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। স্ত্রীর মৃত্যুর আগেই বড় ছেলে তুষার পাড়ি দিয়েছে কানাডায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার কাজ নিয়ে। সংসারে শুধু ছোট ছেলে রতন, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান। গতকাল থেকেই তারা রয়েছে খান বাড়ি। অবশ্য গোপালগঞ্জ থেকে আসা একটি কাজের মেয়েও আছে—মালতী; বাসায় তার অন্তত থাকার কথা, নেই। হয়তো খান বাড়ির মৃত্যুশোক উদ্‌যাপন করতে গেছে। যাক, এ সময়ে পাশে থাকা ভালো, নিজেকে প্রবোধ দেয় স্বরূপ।


নারায়ণগঞ্জ শহরে যে শক্তিতে একদিন সিংহের মতো দাপিয়ে বেড়াত স্বরূপ, আজ যেন তা মিলিয়ে গেছে কালের কুয়াশায়।


আমলা পাড়ার এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি প্রায় দুই যুগ আগে বানিয়েছিল স্বরূপ ঘোষাল। তার ঘর থেকে বাড়ির আঙিনা, সামনের রাস্তা দেখা যায়। প্রবেশদ্বারে পাহারারত দারোয়ানকে একবার দেখে আবার নিজের কক্ষের ছিটকানি এঁটে দেয় স্বরূপ। একটা পুরানো অ্যালবাম বের করে আলমারি থেকে, সাদাকালো ছবিতে ভরা। এই ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষ এখন আর এসব রাখে না, কিন্তু স্বরূপের কাছে এটা একটা অবলম্বন। মা, বাবা, শচীর চেয়েও রাহাতের বেশি ছবি আছে এতে। সেই স্কুল জীবনের, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের, শচীকে বিয়ে করার সময়ের বেশকিছু ছবি অ্যালবামে ভরা। আর যে সব ছবি এতে নেই, তা আছে মনে। সেই শৈশবে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাট, একসাথে ন্যাংটো হয়ে শীতলক্ষ্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার স্মৃতি, অন্য পাড়ার আমচুরি করার স্মৃতি, মিলাদুন্নবির রাতে মসজিদে ঢুকে জিলাপি খাওয়ার স্মৃতি, বাবা অরূপ ঘোষালের ফার্মেসিতে বসে পাতার পর পাতা ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাওয়ার স্মৃতি, মনে পড়ে আরো অনেক বন্ধুদের মুখ। সিদ্ধিরগঞ্জের রশিদ ব্যাপারী, মাতুয়াইলের হাসেম মজুমদার, ডেমরার শ্যামল চক্রবর্তী, আড়াই হাজারের অখিল দত্ত, পাশের পাড়ার নুরু মল্লিক, হামেদ চৌধুরী, মিজান সিনহা—আরও কত মুখ, কত স্মৃতি! সবাই গত হয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে গোয়ালার সাইকেলের মতো ঘণ্টি বাজিয়ে যেন ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেছে সব।

তবে রাহাতের ব্যাপারটি একদমই আলাদা। একটানা সাতদিন দেখা হয় নি এমন ঘটনা সারা জীবনে খুবই কম। খান বাড়ির ছেলেদের সাথে অনেকটা ভাইয়ের মতোই বড় হয়েছে স্বরূপ। কারণও ছিল। রাহাত খানের মা আয়শা খানম এবং স্বরূপ ঘোষালের মা নলিনী দেবী দুজনারই জন্ম গ্রাম রূপগঞ্জের কাঞ্চনে। বয়সে কিছুটা ছোট নলিনী দেবীকে আদর করে নেলি ডাকত আয়শা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানবিরোধী অনেক হিন্দু-মুসলমান পরিবারকেই দেশ ছেড়ে সীমান্তের ওপারে আশ্রয় নিতে হয়। ত্রিপুরার শরণার্থী ক্যাম্পে তখন খান পরিবারের সাথে ঘোষাল পরিবারও থাকত। আয়শা খানমের পাঁচ ছেলের সাথে স্বরূপও প্রশিক্ষণ নিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। প্রতিটা অপারেশনের আগে যখন মায়েদের কাছ থেকে ছেলেরা বিদায় নিতে আসত, নলিনী দেবী কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে যেত। আয়শা খানম সান্ত্বনা দিয়ে বলত, আহা নেলি! ওরা তো যাইতাছে লড়াই করতে, অখন কাঁদলে সাহস হারাইবো পোলাপান। মহাভারতের গল্প হুনোস নাই? কুন্তি দেবী কিভাবে পাঁচ পোলারে যুদ্ধে পাঠাইত! আমার পোলারাও তো যাইতাছে। ওরা যুদ্ধ না করলে দ্যাশ স্বাধীন হইবো কেমনে!

নলীনী দেবী চোখ মুছতে মুছতে বলত, বুবু, তোমার তো পাঁচ পোলা। আমার তিন মাইয়ার পর ওই বাত্তি। ওর কিছু হইলে কেমনে বাঁচুম!

না, নলিনী দেবী তারপর খুব বেশি দিন বাঁচে নি। ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শরণার্থী ক্যাম্পে মারা যায়। মৃত্যুর আগে আয়শা খানমের হাত ধরে অনুরোধ করে গেছে, বুবু, আমি আল্লার কাছে যাইতাছি, তুমি তো দেবী কুন্তি, মনে কইরো পাঁচ পোলার লগে স্বরূপও তোমার ছয়…

অপারেশন শেষ করে ক্যাম্পে ফিরে স্বরূপ যখন জানল মা নেই, তখন মাথা রেখে কান্নার মতো একটা বুক ছিল—আয়শা খানম। যমজ ভাইয়ের মতো একটা বন্ধু ছিল—রাহাত খান। আজ তারা কেউ নেই। নারায়ণগঞ্জ শহরে যে শক্তিতে একদিন সিংহের মতো দাপিয়ে বেড়াত স্বরূপ, আজ যেন তা মিলিয়ে গেছে কালের কুয়াশায়।

আয়শা খানম নেই, রাহাত খান নেই, স্ত্রী শচী নেই, বাবা অরূপ ঘোষালের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে।

মনে পড়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর দুয়েক পরের কথা। সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে সদা উত্তেজিত চুল্লি থেকে আসা টকটকে ইস্পাতের মতো তারুণ্যের স্বরূপ ঘোষাল পরিবারের দুর্ভাবনার কারণ ছিল। বাবা অরূপ ঘোষাল একদিন আয়শা খানমের কাছে গিয়ে বলেছিল—বুবু, আপনার বোইনের মরণের পর থিকা সংসারে তো শুধু বাপবেটাই রইলাম। আমার হার্টে সমস্যা ধরা পড়ছে, এইবার স্বরূপরে একটা বিয়া সাদি দেওনের ব্যবস্থা করেন। টেকাটুকা যা লাগে আমি জোগাড় করতাছি, বাকিটা আপনের দায়িত্ব।

সে দায়িত্ব বেশ দক্ষতার সাথেই পালন করেছিলেন আয়শা খানম। কনে দেখা থেকে বিয়ে অব্দি একজন মায়ের যতটুক দায়িত্ব থাকে তার সবটুকুই পালন করেছিলেন। তবে তার মৃত্যুর পর যে ঘটনাটি ঘটেছিল তাতে কেঁপে উঠেছিল সমগ্র ঘোষাল পরিবার।

দুই পুত্রসন্তান জন্মের পর শচীর শারীরিক সমস্যার কারণে ডাক্তার নিষেধ করেছিলেন আর বাচ্চা নিতে। কিন্তু স্বরূপ ঘোষালের একটা আক্ষেপ ছিল—মেয়ে সন্তানের জন্য। কাছাকাছি সময়েই বিয়ে করেছিলেন বন্ধু রাহাত। তার প্রথম তিন সন্তানই পুত্র, শেষটি কন্যা; রাবেয়া। শুরু থেকেই যেন ছিল দুই পরিবারের একটি মেয়ে। ব্যবসায়িক কাজে স্বরূপ ঘোষাল যখন দেশের বাইরে যেত—ফিরে আসার অপেক্ষা করত ছোট্ট রাবু। কেননা, স্বরু’কা তার সব আবদার মেটানোর মানুষ। রাবুর আবদার রক্ষায় স্বরূ’কার কোনো জুড়ি ছিল না। রাহাত খানের স্ত্রী মাহমুদা খানমের সাথে শচী দেবীর সম্পর্ক খুব গাঢ় না হলেও সৌহার্দপূর্ণ ছিল। মাঝে মাঝেই খানপাড়া থেকে আমলাপাড়ার ঘোষাল বাড়ি আসত রাহাত খানের ছেলেমেয়েরা। তখন আর মাহমুদা খানমকে চিন্তা করতে হতো না। শচী দেবী বেশ আনন্দের সাথেই সামাল দিতেন বাচ্চাদের। যেমনটা ঘটত খানবাড়িতে ঘোষাল বাড়ির বাচ্চাদের বেলায়ও। বিশেষ করে ছোট ছেলে রতন একঅর্থে বড়ই হয়েছে খানবাড়িতে।

এই অবাধ মেলামেশা, বড় হওয়া এবং ঘনিষ্ঠতার মধ্যে ঘটে যাচ্ছিল আরেক কাণ্ড। যা অনেক দিন কেউ বুঝতে পারে নি।

রতন লেখা পড়ায় খুব একটা ভালো ছিল না। টেনেটুনে ইতিহাসে অনার্স। আগ্রহ ছিল ব্যবসায়। স্বরূপ ঘোষালেরও আক্ষেপ ছিল না। কারণ অনেক কষ্টে গড়ে তোলা তার টেক্সটাইল মিলটি পরিচালনার একজন যোগ্য উত্তরসূরি মিলেছে। যেহেতু বড় ছেলে তুষার তখন শিক্ষকতার পেশা নিয়ে কানাডা যেতে চাইছে—সেদিক থেকে ছোট ছেলের ব্যবসায়ী হওয়ার আগ্রহে খুশিই স্বরূপ ঘোষাল। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু হঠাৎ গোল বাধল অন্যখানে।

রাহাত খানের অনার্স পড়ুয়া মেয়ে রাবুর বিয়ের কথা চলছিল। এমন সংবাদে রতন সরাসরি খানবাড়ি গিয়ে মাহমুদা খানমের কাছে বলে আসে—রাবুর সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক, তাকে যদি অন্য কোথাও বিয়ে দেয়া হয় তবে রতন আত্মহত্যা করবে। পাথরের মূর্তির মতো কেবল দাঁড়িয়ে ছিল মাহমুদা খানম। ঘটনাটি চাউর হয়ে যায় সারা নারায়ণগঞ্জে। থমথমে খানপাড়া, ভয়ে সিঁটিয়ে যায় আমলা পাড়ার হিন্দু পরিবারগুলো। সূর্যগ্রহণের হঠাৎ অন্ধকারের মতো ঘনিষ্ঠ মুখগুলো জুড়ে নেমে আসে অস্বস্তির আঁধার। হঠাৎ থমকে যাওয়া বাতাসের পরে যেমন ঝড়ের আপেক্ষা, তেমনি সবাই অপেক্ষা করছিল পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার।

তখন প্রতিবেশীরা এসে ইনিয়ে বিনিয়ে নানারকম ভয়ের কথা বলে যেত স্বরূপ ঘোষালের কাছে। পরের দিন আর ফ্যাক্টরিতে যায় নি স্বরূপ। অস্বস্তিবোধে হাঁসফাঁস করছিল বাসায়। তুষার তখন ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করত। দিনশেষে বাসায় ফিরে জামাকাপড় না ছেড়েই শুরু করে চেঁচামেচি।

—এসব কী হচ্ছে, বাবা?

—কী?

—রতুইন্না এইটা কী করল?

—সে কোথায়?

—শুনছি কোন বন্ধুর বাসায় কাইল থিকা একটার পর একটা মদের বোতল খালি করতাছে।

—অরে ধইরা বাসায় লইয়ায়।

—সে আমার কাম না।

—তাইলে আর কথা কইস না; তোর কামে তুই যা।

—কইলেই হইল, ঘরে নতুন বউ আছে, মা আছে, তুমি আছো।

—তো… কী হইছে?

—সন্ধ্যার পর যদি কোনো ঘটনা ঘটে!

—ঘটনা! কী ঘটনা?

—তোমার মেঝকাকার পোলা ডেমরার সম্ভু ঘোষাল ফোন করছিল।

—সম্ভু! কী কইছে?

—সম্ভুকাকু আমারে দুপুরে ফোন কইরা সব কইছে। রাতের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আমগো বাসায় আইসা পৌঁছব।

দিনটা ভয়-অস্বস্তিতে আর একটার পর একটা সিগারেট টেনে কাটিয়েছে স্বরূপ ঘোষাল। ভাবছে, হিন্দু পরিবারের মেয়েরা মুসলিম পরিবারে বউ হয়ে গেলে মেনে নেয় বটে, কিন্তু মুসলিম পরিবারের মেয়েরা হিন্দু পরিবারে বউ হয়ে আসার ব্যাপারটি খুবই রেয়ার। বাঙালি মুসলমানরা এটা একদমই মেনে নিতে চায় না। অধিকাংশ সময়ই ঘটে থাকে ভয়াবহ রক্তারক্তির কাণ্ড। অথচ আন্তঃধর্মের বৈবাহিক সম্পর্কটা অবাধ হলে বাঙালির জাতীয় অসুখ—ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাটা বিলুপ্ত হতো। একটা মজবুত জাতিগঠন প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হতো।


নিস্তব্ধ অন্ধকারে হঠাৎ টিটি পাখির ডেকে ওঠার মতো একটা শঙ্কা যেন তীব্র ডেকে যাচ্ছে স্বরূপ ঘোষালের মন জুড়ে।


দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা সিগারেট ধরায় স্বরূপ ঘোষাল। সবাই ভয়ের কথা বলছে, কিন্তু ভয়টা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না তার। আয়শা খালাম্মার ছেলে রাহাত, শৈশবের বন্ধু রাহাত, একাত্তরের সহযোদ্ধা রাহাত, সুখের রাহাত, দুখের রাহাত, সে কিনা আসবে তাকে হত্যা করতে! যে মাহমুদা খানমের হাতে বড় হয়েছে রতন, সেই রতনকে তারা হত্যা করবে! বিশ্বাস করতে পারছে না স্বরূপ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। বাসার সবাই আতঙ্কিত। হঠাৎ কলিং বেল বাজে। হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ঢোকে সম্ভু, ‘অ কী, বউদি, তোমরা জিনিসপত্র গোছগাছ করো নাই? কী রে তুষার, তাড়াতাড়ি রেডি হ,  রাতে আখাউড়ার এক বাড়িতে গিয়া থাকবি, সকালে বর্ডার পার হবি, ত্রিপুরা থেইকা দুপুরে কলকাতার ফ্লাইট ধরবি, দাদা কোথায়?’

—বাবা রুমেই আছে। আগে তার সাথে কথা বলো। বিমর্ষ কণ্ঠে উত্তর দেয় তুষার। রুমে ঢুকেই স্বরূপ ঘোষালকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে সম্ভু।

—দাদা, এতকাল তুমি কালসাপের সাথে বাস করেছো, ওরা মানুষ না, ওরা মুসলমান। স্বার্থে আঘাত লাগলে ওরা বাপকেও ছাড়ে না। সব শেষ কইরা দেবো সব শেষ কইরা দেবো। (চোখ মুছতে মুছতে) নাও তৈরি হয়ে নাও। আর চেক থাকলে দিয়ে যাও আমি ব্যাংক থেইকা টাকা উঠাইয়া পাঠায়া দিমু।

স্বরূপ ঘোষাল ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে থাকে সম্ভুর দিকে। অস্বস্তি কাটাতে একটা সিগারেট ধরায়। একটু কাঁচুমাচু করে বলতে শুরু করে সম্ভু।

—দাদা, বলছিলাম কী, তোমার ফ্যাক্টরি আর বাড়িটা লেইখা দিয়া যাও, কইলেই উকিল আসব। পুড়েটুড়ে যদি কিছু থাকে তাইলে তো বংশের লোকেরাই পাইব।

—শোন সম্ভু, বাঙালি হিন্দু যেখানে ক্ষমতাধর, ধর্মের নামে সেখানে বাঙালি মুসলমানদের লুট করে। বাঙালি মুসলমান যেখানে ক্ষমতাধর, ধর্মের নামে সেখানে বাঙালি হিন্দুদের লুট করে। বিপদে পড়লে বংশের লোকেরা আসে বাড়ি, ফ্যাক্টরি নিজের নামে লেইখা নিতে। এই তো আমার জাতি, আমার বংশ!

—দাদা! তুমি ব্যাপারটারে অন্যভাবে নিলা!

—সম্ভু, আমি মুক্তিযোদ্ধা স্বরূপ ঘোষাল। কোনো তাড়া খাওয়া কুত্তা-বিলাই না। রাইতের অন্ধকারে চোরের মতো দ্যাশ থিকা পালাইয়া যাওয়ার জন্য দ্যাশ স্বাধীন করি নাই। যদি মরতে হয় তাইলে নিজের ভিটাই মরুম।

—দাদা গো, বিজাতির লগে যুদ্ধ করন যায়। স্বজাতির লগে পারোন যায় না। জান বাঁচাইতে হইলে রাইতের অন্ধকারেই পালাইতে হয়।

—হ… সম্পদ সব বংশের প্রদীপের নামে লেইখ্যা দিয়া পালাইতে হয়। তোরে আমি চিনি না! তোরে তো জন্মাইতে দেখছি। ডেমরার চাঁন্দাবাজ, মাস্তান, তুই আইছোস আমারে জ্ঞান দিতে…

—ছি দাদা, বিপদের দিনে আইলাম তোমার পাশে দাঁড়াইতে আর তুমি আমারে অপমান করলা! ছি ছি! আমার বোঝা উচিত ছিল তোমার মতো মানুষরা সবই পারে। খানগো বাড়ি খাইয়া, খানগো পইড়া, হেগো প্রতাপে একদিন নারায়ণগঞ্জ কাঁপাইছো। আর আইজ বাপপুত মিইলা তাগোর সম্মানের দিকে হাত বাড়াইছো! ছি তোমরা ঘোষাল বংশের কলঙ্ক।

—ধুত্তুরি নিকুচি করি তোর ঘোষাল বংশের, বাইর হ আমার বাসা থিকা, বাইর হ…

—অ… (বের হতে হতে) তুমি তো আবার খানবাড়ির পোলা হইয়া গেছালা, ঘোষাল বংশের নিকুচি তো তুমিই করবা, তয় মনে রাইখো চিতায় ওঠানোর লোক কিন্তু পাইবা না।

—হেই চিন্তা তোগো করন লাগবো না, কামে যা…

—আইচ্চা। দেখো কী ঘটে!

বাসা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে চলে যায় সম্ভু, হুঙ্কার ছাড়ে স্বরূপ ঘোষাল।

—সম্ভু, মনে রাখিস, আমার ফ্যাক্টরি বা বাসায় যদি কেউ হামলা করে তারে কিন্তু জীবিত ছাড়ুম না।

হঠাৎ একটু থমকে যায় সম্ভু, কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে, আরে তোমার ফ্যাক্টরি দিয়া আমাগো কী! পারলে ঠেকাও তোমার খান ভাইগো।

তারপর গট গট করে দ্রুত নেমে যায় সম্ভু। দরজা বন্ধ করে নিজের কক্ষে ফিরে আসে স্বরূপ ঘোষাল। ভাবে, কী করা উচিত! তার কী এই শঙ্কা অস্বস্তি ঝেড়ে রাহাতের সাথে দেখা করা উচিত! বাসার সবার মনের অবস্থাই থমথমে। স্ত্রী শচী এসে, কাঁচুমাচু করে বলতে শুরু করে :

—ইয়ে, বউমা একটা কথা কইবার চাইছিল।

—কই বউমা! আসো।

বড় ছেলে তুষার ঘোষালের সদ্য-বিবাহিতা শিবানী, দিনাজপুরের মেয়ে। বেশ লাজুক এবং ভীতু। শ্বশুরের সামনে হাত ঘষতে ঘষতে বলে, বলছিলাম কী বাবা, চলুন না আজ আমরা সবাই দিনাজপুর যাই। ক… ক’দিন থেকে…

—শোনো বউমা, তুমি, তোমার স্বামী বা শাশুড়ি কেউ যদি এখানে থাকতে ভয় পাও, দোহাই—এক্ষুনি বাসা থেকে চইলা যাও। আর ড্রাইভাররে গাড়ি বাইর করতে কও, আমি বাইর হবো রতনরে খুঁজতে।

জানালা দিয়ে বাড়ির আঙিনার দিকে তাকিয়েছিল তুষার। বাবার কথা শুনছিল। ঠিক তখনই আঙিনায় খয়েরি রঙের একটা প্রাইভেট কার ঢোকে। খুব পরিচিত এই গাড়ি। তুষার বাবার কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বলে, বাবা, রাহাত কাকু আসছে মনে হয়!

—কোথায়? চমকিত স্বরূপ।

—গেট দিয়ে তার গাড়ি ঢুকতে দেখলাম।

—আসুক, তোমরা যার যার ঘরে যাও।

নিস্তব্ধ অন্ধকারে হঠাৎ টিটি পাখির ডেকে ওঠার মতো একটা শঙ্কা যেন তীব্র ডেকে যাচ্ছে স্বরূপ ঘোষালের মন জুড়ে।

একটু পরেই কলিং বেল বাজে। দরজা খুলে দেয় শচী। রাহাত খানের ভারি কণ্ঠে আওয়াজ ওঠে, স্বরু কোথায়?

বাসার সকলেই যেন দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়। শচী দেবী আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, রুমেই আছে।

আওয়াজ পেয়ে হাতের সিগারেট অ্যাস্ট্রেতে গুঁজে উঠে দাঁড়ায় স্বরূপ ঘোষাল। ততক্ষণে রুমে প্রবেশ করে রাহাত খান। এক হাতে সেলফোন আরেক হাতে মেয়ে রাবেয়ার হাত।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই বলে, মেয়ের বাবা হওয়ার খুব শখ ছিল তোর। নে, মেয়ে নিয়ে এসেছি।

ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো বন্ধু রাহাতের দিকে তাকিয়ে থাকে স্বরূপ। যখন সংবিৎ ফেরে শুধু একটা শব্দই প্রশ্ন হয়ে বাজে তার কণ্ঠে—সমাজ?

—সমাজ! হ-সমাজ… সে আমি দেখব। দুই রীতিতেই বিয়ে পড়ানের ব্যবস্থা কর।

সেই বন্ধু রাহাত, পরস্পরের ছায়া হয়ে যার সাথে কেটেছে দীর্ঘ জীবন। আজ কবরের ধূলায় শুয়ে আছে তার মৃতদেহ আর শূন্যে অদৃশ্য এক চিতায় মৃতদেহ নয়, দাউ দাউ জ্বলছে জীবন্ত স্বরূপ ঘোষাল। বিকেল পড়লেই সে এখন কোথায় যাবে! সৈয়দ আলী চেম্বার রোড; বোস কেবিন! যেখানে গত চল্লিশ বছর সমবয়সীদের নিয়ে দুই বন্ধু আড্ডা দিয়েছে। আজ সন্ধ্যায় সেখানে আর ফিরবে না রাহাত। যেন এক ডানার পাখির মতো স্বরূপ ঘোষাল প্রতিদিন প্রতীক্ষা করবে—কখন কালের শেয়াল এসে খেয়ে যাবে তাকে।

সারাদিনের কাজ শেষ করে বোস কেবিনে মিলিত হতো দুই বন্ধু। একদা এই ক্যাফেটিতে নেতাজি সুভাষ বোস এসেছিলেন। সেই থেকে এর নাম বোস কেবিন। সুভাষ বোস, রাহাতের নায়ক, বাঙালি হিরো।


মেয়েটা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শ্বশুরকে হারানোর ভয়ে কাঁদছে, সে গতকাল হারিয়েছে তার বাবাকে।


মনে পড়ে গত বছর বন্ধু মিজান সিনহার মৃত্যুর কয়েক দিন পরের কথা। খুব বৃষ্টি হয়েছিল। সন্ধ্যায় বোস কেবিনে স্বরূপ আর রাহাত ছাড়া কেউ ছিল না। ডায়াবেটিস সহ নানা রকম অসুখের বাসা স্বরূপ ঘোষালের শরীর। কোনো বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই মনটা তরল হয়ে যেত। রাহাতের হাত চেপে ধরে বলেছিল, হ্যারে… মইরা গেলে আমারে তো চিতায় উঠাইবো, তোরে দিবো কবরে! আমরা হারায়া যামু! এই দুনিয়ার আলো-অন্ধকারে আমগো কোনো চিহ্ন থাকবো না, না থাকমু আমি আমার, না থাকমু তোর!

রাহাত খান হেসে বলেছিল, ধুর পাগল! তুই আর আমি কি এখন আলাদা আছি! রেজা আর শ্রেয়ার মধ্যে একাকার হয়ে গেছি না! ওদের শরীরে তোর জিন যেমন আছে, আমারও আছে। ওদের শরীরে আমাগো নতুন জীবন, তারপর ওদের সন্তানদের শরীর ধইরা আবার জীবন। কেউ মরে না, আমরা বাঁইচা থাকি সন্তান থিকা সন্তানদের শরীরে।

রতন আর রাবেয়ার সন্তান রেজা ঘোষাল ক্লাস নাইনে, শ্রেয়া মনি ক্লাস থ্রিতে। নাতিদের এখন কাছে পেতে ইচ্ছে করছে স্বরূপ ঘোষালের। রতনসহ সবাই কাল থেকে খানবাড়িতে। বাসায় ছিল শুধু মালতি রানী।

হঠাৎ বাসার দরজা খোলার শব্দ। রাবেয়ার উদ্বিগ্ন কণ্ঠের আওয়াজ। ফোনে কথা বলছে। সম্ভবত রতনের সাথে। ‘কই তুমি… এতবার ফোন করতাছি ধরো না কেন…বাবা নাকি গত সন্ধ্যায় বাসায় আইসা দরজা বন্ধ করছে আর খোলে নাই… মালতি সকাল থেইকা দরজা টোকাইছে… একটু আগে আমার কাছে গিয়া কইলো…ফোন বন্ধ… না… আমি বাসায় আসছি… তাড়াতাড়ি আসো… বাচ্চারা সাথেই আছে।’

রুমের মধ্য থেকে কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল স্বরূপ ঘোষাল। মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল, চার্জ নেই, বন্ধ হয়ে ছিল। দ্রুত দরজা খুলে বের হওয়া দরকার।

হঠাৎ খেয়াল হলো, যে মেয়েটা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শ্বশুরকে হারানোর ভয়ে কাঁদছে, সে গতকাল হারিয়েছে তার বাবাকে, সে বউমা, মা, রাবেয়া, কন্যা রাবু, রাহাতের মেয়ে। রাহাত! বন্ধু, যে মৃত্যুর আগের দিন রাতে এই বাড়িতেই মেয়ের হাতের রান্না খেয়েছে স্বরূপের সাথে। মেয়ে যখন আদর করে শ্বশুরের পাতে বড় মাছের দুটি টুকরো তুলে দিয়েছিল, শাসিয়েছিল রাহাত, ‘অত আদর কইরা শ্বশুররে বেশি খাওয়াইও না, এমনিতেই ডায়াবেটিসের লেভেল হাই।’ সেই বন্ধু, সেই ভালোবাসার শাসক রাহাত, নেই! দরজা খুললেই মুখোমুখি হতে হবে পিতৃহারা রাবেয়ার। তাকে কী সান্ত্বনা দেবে! যে স্বরূপ জ্বলে যাচ্ছে শূন্যে দাউ দাউ, সে কী সান্ত্বনা দেবে!


ঈদসংখ্যা ২০১৯

রাজু আহমেদ মামুন

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৪; তালতলী, বরগুনা। এমএসএস, সমাজ বিজ্ঞান। পেশায় সাংবাদিক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক ধাবমান।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
দহন সংক্রান্তির কবিতা [ম্যাগনাম ওপাস, ২০০৬]
ওঁ নিরর্থকতা ওঁ গতিশাশ্বত [বলাকা, ২০০৮]
ম্যানগ্রোভ মন [কাগজ প্রকাশন, ২০১৭]

ই-মেইল : razumamun@gmail.com