হোম গদ্য গল্প মানসিক কষ্ট

মানসিক কষ্ট

মানসিক কষ্ট
166
0

অনেক পীড়াপীড়ির পর অবশেষে অপরাজিতার সাথে আমার প্রেম হয়। নিকেল নিকানো এক বিকেলে আমি আর অপরাজিতা এই শহরের এক পার্কের নির্জন কোনায় কংক্রিটের বেঞ্চে বসে আছি। পাশাপাশি বসে থাকা আমাদের দু-জনার মধ্যে খুনসুটির পেন্ডুলাম ধীরে-সুস্থে দুলছে। একপর্যায়ে সে কোনো একটা কথার সূত্র ধরে একটা ওজনদার মন্তব্য ছুড়ে দিল, ‘শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক কষ্ট নিশ্চয়ই অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।’ অতঃপর মহৎ একটা কিছু বলে ফেলেছে এমন ভাব করে মতামত জানতে চাওয়ার আশায় আমার দিকে আড়াআড়িভাবে তাকিয়ে রইল।

আমি বললাম, ‘নিশ্চিত করে কি বলা যায়।’

সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ‘কেন, এ কথা তোমার বিশ্বাস হয় না?’

আমি হালকা চালে বললাম, ‘পুরোপুরি না, কেন জানি একটু সন্দেহ হচ্ছে।’

সে মুখের মধ্যে একটা কাঠিন্য ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘এতে আবার সন্দেহ করার কী আছে? এরকমটাই তো সবাই বলে।’

বেঞ্চের মসৃণতা ঘেঁষটে আমি তার দিকে সরে আসতে আসতে বললাম, ‘সবাই বললেই কি কোনো কিছু সত্য প্রমাণিত হয়? পরীক্ষালদ্ধ প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু বিশ্বাস করাটা কি ঠিক, তুমিই বলো? আচ্ছা অপরাজিতা শোনো, আমার মাথায় দুর্দান্ত একটা আইডিয়া এসেছে। চলো না, দুজনে মিলে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখি।’

ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকাল সে। কিভাবে ব্যাপারটি পরীক্ষা করে দেখা যায় তাই বোধহয় ভাবতে শুরু করল।


যেহেতু তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি সুতরাং আমাকে মানসিক কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা তোমার অঢেল আছে।


অপরাজিতার মন এখন পরীক্ষা করার ব্যাপারটায় পুরোপুরি নিমগ্ন। এই সুযোগে আমি তার পিঠটাকে বেড় দিয়ে ধরে তার মসৃণ নাঙ্গা বাহুতে হাত বোলাতে বোলাতে থাকলাম এবং তার বাহুতে আমার হাতের বিচরণের মতোই ধীর গতিতে বললাম, ‘এটা তেমন কোনো কঠিন কাজ না, খুব সহজেই পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব।’

সে তার কোমল থুতনিটা খানিকটা উপরের দিকে তুলে ব্যাপারটি পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া সমন্ধে জানতে চাইল। তার কন্ঠস্বর কৌতূহল ও সন্দিগ্ধতায় জড়াজড়ি।

গলা খাকরি দিয়ে বলতে শুরু করলাম, ‘পরীক্ষাটা হবে এরকম—যেহেতু তোমার কথা হচ্ছে মানসিক কষ্ট শারীরিক কষ্টের চেয়ে বেশি যন্ত্রণাদায়ক সেহেতু আমি তোমাকে একটা ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করতে থাকব। আর তুমি আমাকে যত পারো মানসিক যন্ত্রণা দিতে থাকবে। যেহেতু তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি সুতরাং আমাকে মানসিক কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতা তোমার অঢেল আছে, এটা তো নিশ্চয়ই মানো?’

আমার হাতটি ইতোমধ্যে তার বাহু ছেড়ে দিয়ে তার পিঠময় ছড়িয়ে পড়া রাশি রাশি রেশমি চুলের চিচে ঘাড় এবং পিঠের উপরের দিকের খোলা জায়গায় বিচরণ শুরু করে দিয়েছে।

অপরাজিতা চমকে উঠে বলল, ‘আরে কী বলো তুমি, অদ্ভুত কথা! চাকুর আঘাতে আমি তো মারাও যেতে পারি।’

আমি ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তাকে বললাম, ‘তোমার যে মৃত্যু হবে না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারি। জানো তো তোমাকে কত ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমার পুরো জীবনটাই যে অন্ধকারের চাইয়ে ঠাসা। আমাকে কি বুনো শুয়োরে তাড়া করেছে যে, এত সাধের প্রেমিকাকে মেরে ফেলতে যাব। তুমি মারা গেলে আমারও যে বাঁচার আর কোনো সাধ থাকবে না। অন্যথা হলেও আইনের হাত থেকেই বা নিজেকে বাঁচাব কিভাবে। যদিও জায়গাটা একটু নির্জন তবুও প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা কোনো খুনিকে ক্রসফায়ার থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ধরো ক্রসফায়ারের হাত থেকে যদি বেঁচেও যাই, ফাঁসি তো নিশ্চিত, তাই না? আর যাই হই, এত বড় আহাম্মক আমি নই—এখনই মরার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। দেখে দেখে তোমার শরীরের এমন জায়গায় আঘাত করব যাতে তোমার মৃত্যু না হয়। রক্তপাত হয়তো একটু হবে। তবে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, কাছেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রিকশায় উঠিয়ে সোজা নিয়ে যাব ইমার্জেন্সিতে। নার্সরা ক্ষতস্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ করে দিলে অল্প দিনের মধ্যেই ক্ষত শুকিয়ে যাবে। ক্ষতি আমারই বেশি হবে, বেশ কয়েকদিন তোমার সাথে ঘুরতে না পারার কষ্ট সইতে হবে। তুমিই তো বললে মানসিক কষ্ট বেশি যন্ত্রণাদায়ক।’

সে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে তার পেলব ঘাড় থেকে আমার বাঁ হাতটি টেনে সরিয়ে দিল।

আমার কথা শুনে তার বেশ খানিকটা ভয় পাওয়া ও সামান্য রাগ হওয়াকে তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে প্যান্টের পকেটে ডান হাতটি ঢুকিয়ে সবসময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আমার শখের চাকুটি বের করে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে বাটনে একটা চাপ দিতেই সাই করে ধারালো ফলাটি বের হয়ে চকচক করতে লাগল। দেখে তার ঠোঁট ও থুতনী কাঁপতে শুরু করল, তবে তার ঠোঁট ফুঁড়ে কোন কথা বের হল না।  তারপরও চাকুটির তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ তার দিকে তাক করে পরীক্ষা শুরু করার ব্যাপারে তার অনুমতি চাইলাম মোলায়েম গলায়।

বেঞ্চের ডান পাশে রাখা তার পার্সটা আস্তে করে কাঁধে ঝুলিয়ে এক লাফে ওঠে পড়ে সে পার্কের গেটের দিকে হাঁটা দিল। সে হয়তো আমায় পাগল ঠাউরে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অপরাজিতা অন্য একটা ছেলের হাতে হাত চোখে চোখ রেখে বসে আছে—এমন একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মনে হলো কোনো একজন বলশালী লোক যেন তার পেশল হাত দিয়ে আমার শরীরের ভেতরকার সব কিছুকে একসাথে চেপে ধরেছে। আমার বুদ্ধি এতটাই  লোপ পেল যে বের হয়ে থাকা ধারালো ফলা বাটের ভেতরে ঢুকিয়ে প্যান্টের পকেটে চাকুটি পুরে না দিয়েই তার পিছন পিছন জোরেশোরে হাঁটা দিলাম। আর ওদিকে সে এতই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে যে আশেপাশের যে কেউ তাকিয়ে দেখলে মনে করবে কোনো হিংস্র আততায়ী বুঝি হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করেছে। আমি পিছন থেকে চিৎকার করে বললাম সে যে আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছে এতে কিন্তু আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছি। যা হোক, আমার কথা শুনে অপরাজিতা থমকে দাঁড়াল এবং তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ভীরু ভীরু চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল। আমি হাঁটার গতি দিলাম বাড়িয়ে, ইচ্ছে হলো এক দৌড়ে গিয়ে তার পা-দুটি জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেই এবং কান ধরে ওঠবস করতে করতে বলি জীবনে আর কোনো দিন এ ধরনের পাগলামি করব না। বেখেয়াল প্রলম্বিত হওয়ায় উত্থিত ফলা সমেত চাকুটি তখনও আমার শক্ত মুঠিতে বাগিয়ে ধরা। আর ভয়ানক মানসিক কষ্টে এরমধ্যেই আমার দু-চোখের সরু সরু শিরায় রক্তের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে।


কসাই যদি আমার খুলির ভেতর থেকে মস্তিষ্কটা এবং বুকের ভেতর থেকে হৃৎপিণ্ডটা খুলে নিয়ে বলিষ্ঠ হাতে চাপাতি দিয়ে অবিরাম কোপাতে থাকত তাহলেও বোধহয় এত কষ্ট লাগত না।


হঠাৎ করে সে মাথাটিকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে দিল এক ঝাড়া দৌড়। আর সাথে সাথে আমার পা দুটি যেন পরিণত হলো সিমেন্টের ছোট ছোট দুটি থামে, চলতে পারা তো দূরের কথা বেশ কিছুক্ষণের জন্য নড়াচড়ারও কোনো জো রইল না। এই সুযোগে সে আমার কাছ থেকে আরো বেশ খানিকটা দূরে চলে গেল। তার ব্যাপার-স্যাপার কিছুই আমার মাথায় ঢুকল না। সে থেমেই বা দাঁড়াল কেন আবার হঠাৎ অমন করে দৌড়াতে শুরু করার কারণই বা কী? যা হোক, যে কোনো ভাবে তাকে আজ ফেরাতেই হবে, এরকম অবস্থায় চলে গেলে তার আবার ফিরে আসার সকল সম্ভাবনার অঙ্কুর নষ্ট করে তবেই যাবে। তবে একবার ধরতে পারলে হয়! তার জমে বরফের মতো কঠিন হয়ে ওঠা তার মনটাকে উষ্ণ অশ্রুর আঁচে গলিয়ে নিতে খুব একটা বেশি বেগ পেতে হবে না। এসব ভেবে ছুটলাম তার পেছনে পেছনে। আমাকে তার ছেড়ে যাওয়ার দুঃখে এমনই ভারাক্রান্ত ছিলাম যে হাত থেকে ছুরিটা পকেটে চালান করার কথা তখনও আমার মনে আসে নি, এতটাই বেকুব আমি। এদিকে সে পার্কের গেটের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আশেপাশের জোড়া জোড়া চোখ আমার দিকে এমন সুচারুতায় তাকাচ্ছে যেন খানিক বাদেই ওদের জোড়া জোড়া পা তেড়ে আসবে, তারপর জোড়া জোড়া হাত দিয়ে আমাকে পাকড়াও করে উত্তম-মাধ্যম দেওয়া শুরু করে দিবে। ধারালো চাকু  হাতে কোনো তরুণীকে ধাওয়া করার মতো অপরাধকে এই আমজনতা নিশ্চয়ই ক্ষমার চোখে দেখবে না। প্রেমিকা ফিরে পেতে গিয়ে অবশেষে কি গণধোলাইয়ে মারা পড়ব! হায় ঈশ্বর! বাক্যের শেষের দাঁড়ির মতো দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। অপরাজিতা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো রিকশাগুলোর একটাতে পা বাড়িয়ে দিল।

মাথাটা বুকের উপর হেঁলিয়ে দিয়ে চাকুটির ধারালো ফলা বাটের ভেতর ঢোকাতে গিয়ে অনেক বেশি তাড়াহুড়া কারণে সফল হওয়ার আগে বেশ কয়েকবার ব্যর্থতার গ্যাঁড়াকলে পড়তে হলো। অতঃপর ওটাকে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে সামনের দিকে তাকাই। সেই রিকশাটি পুরোপুরি উধাও। হায়! হায়! এখন আমার কী হবে! গেট পেরিয়ে ফুটপাতে উঠে দেখি রাস্তা দিয়ে শতশত রিকশা চলাচল করছে। এত রিকশার মধ্যে কোনটাতে যে সে ঘাপটি মেরে বসে আছে তা বোঝা তো প্রায় অসম্ভব। তার ফোন নাম্বারে ডায়াল বাটন চাপতেই আবেদনময়ী একটা নারী কন্ঠ বলল, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারে এই মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন। ধন্যবাদ।’ আমি দু-হাত দিয়ে মাথাটাকে চেপে ধরে ফুটপাতের উপর বসে পড়লাম, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু, তাকে ফেরানোর কাজে লাগতে না পারার ব্যর্থতায় অসহায়ের মতো গাল বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল শুধু। আমার মনে হলো, শরীরের এখানে-ওখানে জমাট বাঁধা রক্তের ফোঁটা ও মাংসের ছোট ছোট টুকরা লেগে থাকা কোনো দুর্দান্ত কসাই যদি আমার খুলির ভেতর থেকে মস্তিষ্কটা এবং বুকের ভেতর থেকে হৃৎপিণ্ডটা খুলে নিয়ে বলিষ্ঠ হাতে চাপাতি দিয়ে অবিরাম কোপাতে থাকত তাহলেও বোধহয় এত কষ্ট লাগত না।

মেহেদী হাসান

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৮৩; টাংগাইল। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক, সম্মান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই—

অসময়ের গল্প [গল্প, সাকী পাবলিশিং ক্লাব, ২০১৩]

ই মেইল : mehedihassan1952@gamil.com

Latest posts by মেহেদী হাসান (see all)