ভুল

ভুল
91
0

ঘটনা সামান্য। বলবার মতো কিছু নয়। এই ধরনের টুকটাক ভুল তার রেগুলার হয়। কিন্তু এ নিয়ে এমন হৈচৈ শুরু করবে লায়লা, আফজাল তা ভাবে নি। এর আগে আফজাল সম্পর্কে একটু বলে নেই। আফজাল সরকারি হাঁস পালন খামারের ব্যবস্থাপক। সরকারি লেখাটি বোধহয় ঠিক হয় নি। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এখনো সরকারের খাতায় ওঠে নি। উঠে নি বলেই আফজাল বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে অনেকদিন। না ঘরকা না ঘাটকা। গত ৬ মাস ধরে বেতন বন্ধ। কখন পাবে তারও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।


লায়লার উপলব্ধি হলো পার্টনার হিশেবে হাবাগোবারাই বেস্ট।


বেতন বন্ধের কিছুদিন পর লায়লা টের পেল তার শরীরে আরেকটা মানুষের অস্তিত্ব। খাওয়া দাওয়ায় রুচি চলে গেছে। মুখের সামনে যা আনে তাতেই একটা বিশ্রী গন্ধ। নাড়িভুঁড়ি উল্টে যেন বমি আসে। ক’দিন ধরে লায়লার বেদানা খাওয়ার শখ হয়েছে। তার ধারণা বেদানা খেলেই তার খাদ্যসংক্রান্ত জটিলতা মিটে যাবে। প্রতিদিন মায়ের সাথে আলাপ হয়। মাও বলে, ‘এ সময় যা খেতে ইচ্ছে হয় তাই খাওয়া উচিত। খাওয়াটাই মেইন’। গত সাতদিন ধরে প্রতিদিন আফজাল সন্ধ্যা হলে বেদানার খুঁজে সান্তাহার যায়। ফেরে বিচিত্র সব জিনিস হাতে। একদিন ফিরল কুরিয়ারে আসা এনিমেল সায়েন্সের উপর একটা জার্নাল নিয়ে। তাতে ডাক নিউটেশনের উপর তার একটা লেখা ছাপা হয়েছে।  লায়লা এগ্রিকালচারের স্টুডেন্ট। এসব বোঝার কথা নয়। তারপরও স্বামীর উচ্ছ্বাসের প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে মনোযোগের ভান করে কথাগুলো শুনল। অবশ্য তার মন পড়েছিল অনেক দূরে।

লায়লা তখন মাত্র এগ্রি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ময়মনসিংহ সরাসরি বাস সার্ভিস ছিল না। ভেঙে ভেঙে আসতে হতো। এক বাস থেকে ব্যাগ টেনে নিয়ে আরেক বাসে উঠতে হতো। এমনই বাস বদলের সময় হালকা পাতলা শরীরের মাথা ভর্তি চুলের একটা ছেলের সাথে তার পরিচয় হয়। পুরো মুখটা সারল্যেভরা। মেয়েদের ইম্প্রেস করার জন্য ছেলেদের চোখে মুখে যে চাতুর্যের তুবড়ি ফোটে, তা নেই। বরং গ্রাম্য একটা সজীবতা আছে চাহনিতে। চোখাচোখি হতেই ছেলেটি বলে ওঠে, আরে তুমি উত্তর পাড়ার রহিম শেখের মেয়ে না?

কেমন অসভ্য ছেলে, তার বাবার নাম ধরে ডাকছে। লায়লা আগুনছোড়া চোখ করে তাকাল তার দিকে।

—আরে, তাই তো। তুমি কি আশেক মাহমুদে পড়ছিলা?

লায়লা মাথা নাড়াল।

—ও, তাহলে ওমেনে পড়ছ। ভালো। তা কোন হোস্টেলে উঠছ। রুম পাও নাই তো। আমিও পাই নাই, মাটিত ঘুমাই।

পরে জানতে পারল ছেলেটি এনিমেল হাসবেনড্রিতে পড়ে। সাংঘাতিক মেধাবী। অল্পের জন্য এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করে নি। ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়ার। বিভিন্ন কারণে হয়ে ওঠে নি।

যা’হোক, ছেলেটাকে বিশেষ একটা পাত্তা দেয় নি লায়লা। তাকে দেখলেই ছেলেটা আগবাড়িয়ে কথা বলে। একটা সিনিয়রসুলভ মাতব্বরি ফলায়। লায়লা কৌশলে এড়িয়ে যেত। এভাবে কাটল প্রথম দুটো বছর। তার সাথে অনেক ছেলের পরিচয় হলো। দুয়েকজনের সাথে যে সম্পর্কে জড়ায় নি তা বলা যাবে না।

অনেক চালাক চতুর ছেলের সাথে মেশার পর লায়লার উপলব্ধি হলো পার্টনার হিশেবে হাবাগোবারাই বেস্ট। এমন ছেলেদের সাথে সংসার করা সহজ। ফলে আফজালকে ধীরে ধীরে মেনে নিতে লাগল।

আফজালের বাবা দেখলেন ছেলে পাস করে বড়ো চাকরি করবে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো সময় তার হাতে নেই। ঘরে দুটো অবিবাহিত মেয়ে। একটা ছোট ছেলে আছে। তাকেও পড়াতে হবে। এরমধ্যে ছেলে বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব পেলেন। মেলান্দ’র গফ্‌ফর মল্লিক ডিবি পেয়ে আমেরিকা গিয়েছিল সেই বড়ো বানের বছর। সম্প্রতি দেশে এসেছেন মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি আফজাল সম্পর্কে জেনেছেন। নম্র ভদ্র মেধাবী ছেলে। তিনি এসে আফজালের বাবার কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন তার বড়ো মেয়ের জন্য। আফজালের বাবার কাছে এ প্রস্তাব ছিল লটারিতে লাখ টাকা পাওয়ার মতো। সাথে সাথে তিনি লুফে নেন। এ তো আফজালের সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যেমন রচিত হবে, তেমনি তাদের অর্থকষ্টের অবসান ঘটবে। কিন্তু হলো না।

আফজালের বাপের বক্তব্য ‘তার ছেলের বেইমানি’ আর ‘নাছোড়বান্দা লায়লা’র কারণে সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। এখন আফজাল দেশে বসে হাঁসের খামার সামলায়। বড়ো আফসোসের বিষয়!

কিন্তু সমস্যা একটাই। ভয়াবহ রকমের সমস্যা। লায়লা লক্ষ করছে, আফজালের আইকিউ লেভেল দিন দিন ডিগ্রেড করছে। পশু পাখিদের সাথে থাকতে থাকতে হয়তো এ বিপর্যয়। ভার্সিটিতে বিভাগের সেরা ছাত্র ছিল আফজাল। সে-ই মাস্টার্সে পড়া অবস্থায় দু’চারটা ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে তার আর্টিকাল ছাপা হয়েছিল। কিন্তু এ ছেলে অনার্স কমপ্লিট করেই একটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল। কয়েক মাস চাকরিও করেছিল। প্রফেসর সবুর স্যার বিষয়টা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনিই একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বললেন, অনেক হইছে আফজাল, তুমি এখন এমএসে ভর্তি হও।

—স্যার, সম্ভব নয়। আমার অনেক লায়বেলিটি।

—এই বেয়াদব ছেলে, মুখের উপর কথা বল কেন? জলদি ভর্তি হও। বাদবাকি আমি দেখছি।

সবুর স্যার সত্যিই আফজালের বিষয়টি দেখেছিলেন। কিছুদিন ধরে আফজাল স্যার হাঁসের একটা উন্নত ব্রিড দেশে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। দেশি জাতের হাঁস বছরে ৯০ টির বেশি ডিম পাড়ে না। সেখানে চায়নার জিনডিং প্রজাতির হাঁসগুলো ২৭০ টির বেশি ডিম দেয়। তিনি সরকারের বিভিন্ন মহলে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। অফিসারদের বোঝাতে চেয়েছেন, দেশি হাঁসের জায়গায় চায়নার হাঁসগুলো রিপ্লেস করতে পারলেই রাতারাতি ডিমের উৎপাদন তিনগুণ হয়ে যাবে।

সবুর স্যারের প্রস্তাব সরকার গুরুত্বসহকারে নিয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০ টি হাঁসের প্রদর্শনী খামার স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। সেই প্রকল্পেই চাকরি হয়ে যায় আফজালের।

আফজালের চাকরি ধরিয়ে দেয়া সবুর স্যারের কোনো নিষ্কাম কর্ম ছিল না। এর পিঠে একটা উদ্দেশ্য ছিল। আফজাল তা পরে বুঝেছিল। স্যার একদিন থিসিসের কাজে তাকে বাসায় ডেকে পাঠান। তার ছোট মেয়ে খুব সেজেগুজে নাস্তার ট্রে হাতে আফজালের সামনে হাজির হয়। ততক্ষণেও আফজাল কোনো ইঙ্গিত বুঝতে পারে নি।

যাওয়ার আগে সবুর স্যার আফজালকে জিজ্ঞেস করে, আমার মেয়েটাকে তোমার কেমন লাগল।

—ভালো স্যার।

—আমি ওর ব্যাপারে তোমাকে নিয়ে ভাবছি।

—স্যার, আমি তো স্যাটেলই হতে পারলাম না। প্রজেক্টের চাকরি—

—সে তুমি চিন্তা করবে না। তোমার জন্য চাকরি রেডি। আমাদের ডিপার্টমেন্টে ২ জন শিক্ষক নেবে। বিয়ের আগেই আশাকরি তোমার চাকরি হয়ে যাবে।

—আচ্ছা স্যার, ফ্যামিলিকে বলে দেখি।

এই বলে আফজাল সেদিন পালিয়ে এসেছিল। এর আগেই তো লায়লাকে কথা দিয়ে ফেলেছে আফজাল। আর ফেরার সুযোগ ছিল না। তাই আফজালের আজকের অবস্থার জন্য লায়লা মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করে। ছেলেটা তাকে বিয়ে না করলে হয়তো নিষ্কণ্টক একটা জীবন পেত।


বাচ্চাটা এখন আমরা না নেই। আমরা একটু গুছিয়ে উঠি, তারপর


বিয়ের পর বছর দুয়েক ভালোই কেটেছিল। আফজাল কর্মপাগল মানুষ। সারাদিন খামার নিয়ে পড়ে থাকে। জিনডিং-এর উৎপাদন বাড়াতে সারাদিন ব্যস্ত। এদিকে জিনডিং-এর ডিমের রং নীলাভ। এসব লোকজন খেতে চায় না। এসবকে জনপ্রিয় করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। লায়লা ঘরে একা। দুই পরিবারের গুঞ্জন তার কানে আসে। ঠারে ঠুরে সবাই জানতে চায়, ‘কার সমস্যা’। লায়লা তখন সচেতন হয়ে উঠল। ডাক্তার কবিরাজ দেখাতে লাগল। এ সময় আফজাল একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত জানাল। সে বাচ্চা নিতে চায় না।

—কেন?

—তার চাকরি যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। আগামী জুনে তাদের প্রজেক্ট শেষ হয়ে যাবে। এ সময় সে বাচ্চা নিতে চায় না।

যে ভয়ের বীজ আফজাল বুনে দিয়েছিল তা অল্পদিনের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল। প্রতিমাসের ৫ তারিখের মধ্যে ফুড সাপ্লাইয়ারের ট্রাক আসে হাঁসের খাবার নিয়ে। ১৮ তারিখ হয়ে গেল, খাবারের খবর নেই। খামারের শ্রমিকরা চাকরি ছেড়ে কেউ দিনমজুরের কাজে লাগল। সেই রিকশার প্যাডেল পা বসাল। পুরো খামারের কাস্টডিয়ান হয়ে আফজাল একা রয়ে গেল। বেতন বন্ধ। এখন সে নিজে কি খাবে, আর হাজার দেড়েক হাঁসকেই বা সে কী খাওয়াবে?

এত ঝড়ের মধ্যে লায়লা টের পেল তার মধ্যে নারীত্বের সুখ ফুটে উঠছে। একটা স্নিগ্ধা হাওয়া এসে তাকে শিহরিত করে যায় ক্ষণে ক্ষণে।

বাসায় ফিরে লায়লার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে চেয়ারে বসাল আফজাল। ভালো করে লায়লার দিকে তাকাল। মেয়েটা একাই তার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বাসর রাতের পর কোনো দিন তার দিকে ভালো করে তাকিয়েছে বলে মনে পড়ে না। নিজেকে বড়ো অপরাধী লাগে আফজালের।

—আচ্ছা লায়লা, আমার উপর তোমার রাগ হয় না।

—কেন? রাগ করার মতো কী এমন করেছ যে রাগ করব।

—আমার অপরাধের তো শেষ নেই। তোমার প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করি নি কখনো।

—হয়েছে, রাখো। এত ভালোবাসা দেখাতে হবে না।

—না লায়লা, নিজেকে বড়ো অপরাধী লাগে। কখনো তা তোমাকে বলা হয় নি।

—আচ্ছা উঠো, খেতে আসো।

—আরেকটু বসো না। আফজাল হাত টেনে ধরল।

—আচ্ছা বসলাম।

—একটা ভালো খবর আছে লায়লা। কিন্তু খবরটা তোমাকে দিতে ইচ্ছে করছে না।

—কী খবর।

—আমাদের খামারের জন্য এনুয়াল বাজেট পাস হয়েছে। হাঁসগুলোকে এবার ভালো খাবার দেয়া যাবে।

—তাহলে তো তোমার বেতনও…

—না লায়লা। আমার আগে আমার হাঁসগুলো রেভিনিউতে চলে গেল। আমার চেয়ে সরকারের কাছে হাঁসের গুরুত্ব বেশি।

—আচ্ছা হয়েছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লা মানুষকে বালা মুসিবত দেন ধৈর্য পরীক্ষার জন্য। তিনিই আবার সব ঠিক করে দেন। এত ভেঙে পড়ো না।

—লায়লা, তুমি আমাকে একটু হেল্প করবে।

—বলো।

—বাচ্চাটা এখন আমরা না নেই। আমরা একটু গুছিয়ে উঠি, তারপর—

—তুমি কি এবারশনের কথা বলছ?

—না, তা করা লাগবে না। এই ওষুধটা তুমি খেয়ে দেখতে পারো।

—মানে, ঔষধ পর্যন্ত তুমি নিয়ে এসেছ আমার ওপেনিয়ন না নিয়েই। তোমার এত সাহস হলো কী করে।

ঝনঝন করে উঠল লায়লার কণ্ঠ। এক ঝটকায় সে লাফিয়ে উঠল। লায়লা ইচ্ছেমতো বকে যাচ্ছে। আফজালের কানে কোনো কথাই যাচ্ছে না। সে মাথা নিচু করে বেরিয়ে পড়ল অন্ধকারে। ইনকিউবেটরে হাসের বাচ্চাগুলো চিঁচিঁ করছে। কাছেপিঠে ঝিঁঝি ডাকছে।

রাতের স্টেশন যেন ঘুমিয়ে পড়া কোনো দুরন্ত কিশোর। তার ঘুমের মধ্যে একটা পবিত্র আভা আছে। কিন্তু দুষ্টামির ইঙ্গিত চোখে মুখে। যাত্রী নেই। দু’চারটা হকার নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একটা জটাধারী ভিক্ষুক দূরে বসে তার সংসার গোচাচ্ছে। সংসার বলতে একখানা পোটলা। সেটাই গভীর মনোযোগে উল্টেপাল্টে দেখছে। জিআরপি পুলিশের একটা কনস্টেবল বেঞ্চিতে বসে ঝিমুচ্ছে। পয়েন্টস ম্যান একটা হাতলন্ঠন নিয়ে আউটার সিগন্যালের দিকে যাচ্ছে।

আকাশ ভরা অজস্র তারা। চাঁদ নেই। সন্ধ্যায় তো চাঁদ দেখেছিল আফজাল। গেল কই?

রেলের একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ে আফজাল। ছোটবেলায় রেললাইন দেখলে তার পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হতো। তার মনে হতো রেলগাড়িটা কোনো এক স্বপ্নের দেশে যায়। নইলে ট্রেন থামলে সবাই এমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে কেন। ছোটবেলায় তার কখনো ট্রেনে চড়ার সুযোগ হয় নি।

বড়ো হয়ে সে অনেক ট্রেনে চড়েছে। ট্রেনের প্রতি বিশেষ কোনো আকর্ষণ সে আর বোধ করে নি। কিন্তু ইদানীং কেন জানি ট্রেন দেখলেই তার উঠে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু পেছন থেকে লায়লা এসে তার হাত টেনে ধরে। তার খামারের হাঁসগুলো পেছনে পেছনে ছুটে। খামারিরা এসে ভিড় করে বাচ্চার জন্য। মনে পড়ে ইনকিউবেটর ভর্তি বাচ্চা চিঁচিঁ করছে। তখন আর ট্রেনে উঠতে মন সায় দেয় না।


পাগলের বাচ্চা। এগুলার হিশাব কে রাখে।


এসব ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে আফজাল। জীবনের হিশাবটা দিন দিন ভারি হয়ে উঠছে। একদিকের পাল্লা কেবল ঝুলে পড়েছে।

আফজালের চোখে মাত্র ঝিমুনিটা লেগেছে। এমন সময় হুমমুড় করে একটা বাতাস এসে স্টেশনটাকে উড়িয়ে দিয়ে গেল। অথচ আফজাল বসে রইল সেই বেঞ্চিতে। বেঞ্চির চারদিক ভরে গেল ফুলের বাগানে। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে থালার মতো একটা সূর্য উঠতে লাগল আকাশের এক কোণ থেকে। অবশ্য পরে বোঝা গেল এ সূর্য নয়, দূরাগত একটা ট্রেনের আলো।

ঝমঝম শব্দ তুলে ট্রেনটা এসে দাঁড়াল তার সামনে। সাদা ধবধবে একটা ট্রেন। ট্রেনটা থামতেই ট্রেনের দরজা খুলে গেল। লায়লার কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা। পেছনে সাদা এক ঝাঁক হাঁস। হাঁসগুলো দেদারে বকবক করছে। লায়লার মুখে মিষ্টি হাসি, আরে বোকা, এখানে বসে আছো কেন। রেভিনিউতে যাবে না। আমরা সবাই রেভিনিউতে চলে গেছি। দেরি করো না, তাড়াতাড়ি আসো। ট্রেন ছেড়ে দেবে।

ঘুম ভাঙে লোকজনের হট্টগোলে। একটা লোকাল ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে প্লাটফরমে। একটা পাগল ট্রেনের ছাদে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেছে দুই বগির মাঝখানে। তার লাশ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। যাত্রীদের বেশিরভাগই জনমজুর। রাজশাহী বগুড়ায় জন খাটতে যাবে বা ফিরছে। যেকোনো বিষয় নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি। এদের ছোটাছুটি দেখে আফজালেরও আগ্রহ হলো দৃশ্যটি দেখবার। ভিড় ঠেলে তাকে ঘটনাস্থলে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। তার পোশাক আশাক দেখে সম্ভ্রমে সবাই পথ করে দিল। দুটো বগির মধ্যের জায়গায় গিয়ে দেখে বীভৎস দৃশ্য। একটা নবজাতক শিশু পড়ে আছে রেললাইনের উপর। তার মাথা থ্যাঁতলে গেছে। গলগলিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।

আফজাল চিৎকার করে উঠল, আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? এত মানুষের বাচ্চা। হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেঁচে যেতে পারে।

কে একজন বলে উঠল, পাগলের বাচ্চা। এগুলার হিশাব কে রাখে।

জয়দীপ দে
জয়দীপ দে

Latest posts by জয়দীপ দে (see all)