হোম গদ্য গল্প ভুল মানুষ

ভুল মানুষ

ভুল মানুষ
439
0

‘হাড়েরও ঘরখানি চামড়ারও ছাউনি
বন্ধে বন্ধে জোড়া
সেই না ঘরে বসত করে
মন-মুনিয়া এক জোড়া গো সাঁইজি
কার আশায় বান্ধিয়াছ ঘর!’

এক যুগ আগে, সোভিয়েট-পতনে ওর তরুণ স্বপ্নচারী হৃদয় যেরকমভাবে ভেঙেচুরে যায়, আজ আবার সেই ধরনের অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফেরে আবিদ জাফর। সে ভেবেছিল, ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি দেখার ফাঁকে ফাঁকে গরিব মানুষগুলোর কিছুটা কাজে আসবে সে, গরিব মহিলাদেরও কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী দেখতে পাবে। এই নিয়ে জীবনের তৃতীয় রোমান্টিসিজম ধরা খেয়ে যায়।


আঘাতটা সয়ে নিতে পেরেছিল তরুণী সহযোদ্ধার [ততদিনে ‘সহচরী’] সান্নিধ্যে, সান্ত্বনায়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ হয়ে যায়, জোরদার হয়ে ওঠে জীবনের দাবি।


খুব পছন্দ ও কৌতূহলে এনজিওর চাকরি নিয়ে কিছুদিন দেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায় আবিদ। বন্ধুরা মজা করে ডাকে ‘আবেদ’। আমরা ‘আবিদ’ই বলব। জীবনের দ্বিতীয় রোমান্টিসিজম মিসমার হয়ে যাবার পর এনজিওর চাকরিটাকে সে অবলম্বন করে নেয়। আবিদের জীবনের প্রথম রোমান্টিসিজম ছিল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বাম রাজনীতি, সেই সূত্রে সোভিয়েত-সমগ্র। দ্বিতীয়টার [একটু পরে সবিস্তারে জানাচ্ছি] গুরুত্ব কতখানি ছিল, সেটা আজ রেট্রোস্পেক্টিভ ছবি দেখার মতো করে ভাবতে বসার অবকাশ আছে তার।

রাজনীতি আর রোমান্টিসিজমকে আলাদা করতে পারে নি আবিদ জাফরের বন্ধুবান্ধবেরা। আবিদ জাফর হয়তোবা হয়ে উঠেছিল রোমান্টিক বিপ্লবী [একই সাথে আপাত নিষ্পাপ এবং চরম দুটি শব্দবন্ধের বিশেষণ ছিল এই প্রজাতি বা প্রজন্মের।] তবে  সকলের কথা নয়, ওর একার কথাই হোক। ওর স্বভাবের মধ্যে চিরকাল একটা প্রতিরোধ ছিল। স্বপ্নজীবী কৈশোর, উথালপাথাল বয়ঃসন্ধি, কত সব মারাত্মক সময় পেরিয়ে এসেছে সে ওই প্রতিরোধের গুণে। ওর এরকম একটা অহংবোধ ছিল কোনো মেয়েকে [নারীকে] কোনোদিন ভালোবাসবে না, কারো হাসি বা কটাক্ষ তাকে দুর্বল বা বিচলিত করবে না। যথেষ্ট কারণ ছিল ওর এরকম দৃঢ়তার : ক) বৃষ্টির রাতে জানালার পাশে কে যেন একজন এসে দাঁড়ায় ভেনাসের ধরনে, ওকে অহংকারের যুদ্ধে রসদ জোগায়; খ) ভোরবেলা ঘুম ভেঙে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে বাগানের সব ফুল কেমন করে যেন একক, অস্তিত্বে ফুলেশ্বরী সেজে চিবুক নুয়ে দাঁড়ায় ওকে অহংকারের যুদ্ধে ঋজুতা দেয়; গ) মাঝরাতে বন্দরনগরী অন্ধকারে ডুবে গেলে নিজেকে যখন নিমজ্জিত বলে মনে হতে থাকে, সে সময় কেউ এসে ওর উজ্জ্বল উদ্ধার হয়। এরকম এক অশরীরী [আবিদের পছন্দের শব্দ ‘অবয়বহীন’] মানবীর [আবিদের মনে হতো ‘স্বপ্নেশ্বরী’] প্রেম নিয়ে পৃথিবীতে মানুষের যৌবনকাল ছুঁয়েছে সে। যতবার সম্ভাবনার উপক্রম হয়েছে, ততবারই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে যাবতীয় পার্থিব সম্পর্ক থেকে।

হঠাৎ করেই, এক তরুণী সহযোদ্ধার সঙ্গে মিছিলে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একদিন আবিদের মনে হয়, বাস্তবের কারো সাথে স্বপ্নের মানুষীর মিল খুঁজে পেলেই যেন সে বর্তে যায়। ওরা দুজন মিলে হাঁটিয়াছে বহুদিন পতেঙ্গার সৈকতে, রাঙামাটির সেতু জুড়ে, সীতাকুণ্ডের পাহাড় আর চিম্বুকের মেঘের ভেতর। এইভাবে একদিন দুজনের দুটি আলাদা জীবনযাপন হয়ে গেল যৌথ জীবন। এরই মাঝে গ্লাসনস্ত-পেরস্ত্রেইকার পরের ঘটনা প্রবাহে ওর স্বপ্নভঙ্গ হয়ে যায়। আঘাতটা সয়ে নিতে পেরেছিল তরুণী সহযোদ্ধার [ততদিনে ‘সহচরী’]  সান্নিধ্যে, সান্ত্বনায়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ হয়ে যায়, জোরদার হয়ে ওঠে জীবনের দাবি। সব পথের শেষে লেখা দেখতে পায় ‘নো ভ্যাকেন্সি’—চাকরি কোথাও নেই। ‘আয় তবে সহচরী…’ এ প্রস্তাবটুকু আর গলা খেলিয়ে বলার শক্তি-সাহস থাকে না। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে জুতোর হাফসোল ক্ষয়; গতানুগতিক গল্পের মতো সহচরীর বিয়ে হয়ে যায় একদিন। আবিদ জাফরের একটা চাকরি অবশেষে হয়—‘তুমি তখন অন্য কারো, অন্য কোনও ঘরে’।

ফিরে আসা যাক বর্তমানে। সে আজ একটা নতুন উপন্যাসের চরিত্র হতে যাচ্ছে। তার এনজিওর প্রধান নির্বাহী আগে পুরো প্রতিষ্ঠানকে রাখতেন পকেটে কিংবা ব্রিফকেসে, অন্তিমে তার খায়েশ হলো গোটা প্রতিষ্ঠানকে গিলে খেতে; খেলেনও। আর এতে বিবমিষা হলো খাদ্যের, মানে একজন কর্মী আবিদের। শেষ অধ্যায়ের এখানেই যবনিকা। তিন তিনটি বিশাল অধ্যায়বিস্তৃত আবিদ জাফরের জীবনকেন্দ্রিক দ্বিতীয় উপন্যাসটা হতে পারে : এক) প্রথমটির রোমন্থন, চর্বিত-চর্বণ; দুই) তিন আহত [মতান্তরে নিহত] রোমান্টিসিজম থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ঝকঝকে ছাপা-বাঁধাই হয়ে চাররঙা অফসেট প্রচ্ছদের ব্যাক কভারে দাঁত কেলানো; তিন) অন্যান্য অপশন। তবে তাকে আর একটু ভাবতে বসার অবকাশ দেওয়া প্রয়োজন।


আবিদ জাফর যেহেতু তিনটি চ্যাপ্টার ক্লোজড করে এনেছে, আজ তাই সে দাঁড়িয়ে আছে বার্ধক্যের কালো বারান্দায়? 


মোটামুটিভাবে জীবনের চার নম্বর অস্তিত্ব আজ তার নিজের হাতে। আবিদ জাফরের ব্যক্তিত্বে স্বপ্নজীবিতা ছিল আগাগোড়া; সেটাকে বাদ দিলে নতুন উপন্যাসটা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আবার স্বপ্নজীবিতা বজায় থাকলে ‘চর্বিতচর্বণ’ (১) হবার সম্ভাবনা বেশি থাকা সত্ত্বেও আবিদ চাররঙা প্রচ্ছদের ব্যাক কাভারে দাঁত কেলানোর (২) লোভ এড়াতে চায়। নতুন পর্বটি অহেতুক জটিল বলে মনে হতে থাকে তার কাছে। অন্যান্য (৩) কোনও পথে যাবে কিনা তা ভাবনাস্থ আছে।

আবিদ জাফরের ভাবতে বসার সময়টা সময়ের বেশ আগে এসে গেল। সে যদি জীবনের স্বাভাবিক তিন পর্বান্তর শেষে মিছা দুনিয়ার ইতিহাসটা  নিয়ে ভাবতে বসতে পারতো—

‘শিশু না কাল গেল হাসিতে খেলিতে
যৌবনকাল গেল রঙে
বৃদ্ধকাল যাবে ভাবিতে ভাবিতে …’

তার মানে কি এই দাঁড়াল যে, আবিদ জাফর যেহেতু তিনটি চ্যাপ্টার ক্লোজড করে এনেছে, আজ তাই সে দাঁড়িয়ে আছে বার্ধক্যের কালো বারান্দায়? এমন কোনো কথা নেই যে এই আটতিরিশ-উনচল্লিশে সে নতুন একটা উপন্যাসের নায়ক হতেই পারে না! কিন্তু আমরা তো দেখলাম স্রেফ বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কায় সে তথাকথিত নিয়তির চক্রে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে।

এখনো অবশ্য সে ভাবছে।


গল্পকারের কথা

ছোটগল্পে খুব বেশি বর্ণনার সময়-সুযোগ নেই। ঘটনার ঘনঘটা দেখানোর নিয়ম নেই। সেসব নিয়ম থাকলে আবিদের বিয়ে-থা দিয়ে গল্পটা শেষ করতে পারতাম। তাতে আমার শান্তি হতো। তাহলে হয়তোবা পাঠকের অন্তরে অতৃপ্তি থাকে না। এখানে আবারও সেই চক্র। তাহলে কী আর করা! পাঠক, চলুন, আবিদ জাফর তার দ্বিতীয় রোমান্টিসিজমের ভাবনা জ্বরে পুড়তে থাকুক। হতভাগাটাকে অইখানে রেখে আমরা বরং আধুনিক কোনো গল্প পড়তে বসি ‘চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’!

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

গল্প—
স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প [চৈতন্য, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com