হোম গদ্য গল্প ব্ল্যাকমেইল

ব্ল্যাকমেইল

ব্ল্যাকমেইল
0
Latest posts by কায়সার আহমদ (see all)

১.
নীলার স্বামী রায়হান মামলার আসামি। সে পালিয়ে আছে। মামলার এক, দুই ও চার নাম্বার আসামি গেছে ক্রসফায়ারে। রায়হান তিন নাম্বার আসামি। সুতরাং ধরা পড়লে ওর অবস্থা কী হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। তাই নীলা ঠিক করেছে যেকোনো মূল্যে তার স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়ে দিবে। নীলা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্ন দেখছে। নীলার পা দুটো রেললাইনের মাঝখানে আটকে গেছে। আশেপাশে কেউ নেই। সে একবার ডানে একবার বামে পা ঘুরাচ্ছে। উপরের দিকে টান দিচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। রেলগাড়িটা আসছে দ্রুত বেগে। হুইসেল দিচ্ছে। সে আরো জোরে পা টেনে বের করার চেষ্টা করছে। নিষ্ফল। রেলগাড়িটা কাছাকাছি চলে এসেছে। আরো জোড়ে হুইসেল দিচ্ছে। গাড়িটা এবার তাকে থ্যাঁতলে দিবে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। গাড়িটা এই বুঝি তাকে চাপা দিল। সে কেবল একটা চিৎকার করতে পারল। তার ঘুম ভেঙে গেল। সে এই স্বপ্নটা প্রায়ই দেখে। সে ঘেমে গেছে, যদিও এসি চলছে। তার গলায়, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে পাতলা কম্বলটা সরিয়ে রেখে ওয়াশরুমের বাতি জ্বালল।


আরিফের কথা শুনে নীলা মনে মনে ভাবছে আবার সেই আরিফ। যদিও আরিফের ফোন নাম্বারটা চেয়ে নিতে সে ভুলে গেল না।


বেডরুমে একটা নীল রঙের ডিম লাইট জ্বলছে। ঘরে হালকা মৃদু আলো। হালকা আলোর মধ্যে কেবল দেয়াল ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক শব্দ করে ঘুরছে। সে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ঘরের বাতি জ্বালল। রুমটা বেশ বড়। রুমের ঠিক মাঝখানে একপাশের দেয়ালের সাথে মাথা লাগানো একটি তেঁতুলের বিচির রঙের বক্সখাট। তার দুপাশে দুটো সাইড টেবিল। খাটের পায়ের দিকে দেয়ালে লাগানো আছে একটি বড় টিভি। খাটের এক পাশে আছে বড় আয়না লাগানো একটি ড্রেসিং টেবিল। তার পাশে আছে দেয়াল আলমারি।

সাইড টেবিলে ঢাকনা দিয়ে রাখা গ্লাস থেকে পানি খেলো পুরো এক গ্লাস। ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। সে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে যেটা নিয়ম করে সকাল সাতটায় বাজে। সাতটা বাজতে অনেক দেরি। এতক্ষণ সে কী করবে? তার ঘুম একবার ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না। ভাবল চা খাবে। চায়ের সরঞ্জাম ডাইনিং টেবিলে রাখা আছে। এত ভোরে তাদের কাজের মেয়ে নাসিমাকে ডাকা যাবে না। কারণ ও ঘুমায় দেরিতে। সব কাজ সেরে। তাই সে জগ থেকে একটা চায়ের কাপে পানি নিয়ে ওভেনে দিল। এক মিনিট পর ওভেন টিটি করে শব্দ করা শুরু করলে ওভেন খুলে কাপ বের করে আনে। এক চামচের তিনভাগের এক ভাগ চিনি কাপে ঢেলে দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়ে। তারপর একটা টিব্যাগ তাতে ডুবিয়ে দেয়। সে চায়ে দুধ খায় না। যদি ওজন বেড়ে যায়। চা নিয়ে তাদের বেডরুমের সাথে লাগানো ব্যালকনিতে চলে আসে।

তাদের ফ্ল্যাটটি দক্ষিণমুখী। ব্যালকনির পূর্বদিকে আছে একটি ছোট চেয়ার আর তার সামনে একটি ছোট টি-টেবিল। তার স্বামী রায়হান এখানে বসে চা, কফি, সিগারেট খায়। সে আজ প্রায় ছ’মাস হলো এই বাসায় আসে না। সে পালিয়ে বেরাচ্ছে। এই ছ’মাস যে কিসের মধ্যে দিয়ে গেছে তা একমাত্র নীলাই বলতে পারবে। নীলা চেয়ারে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।

তাদের ব্যালকনি থেকে আকাশ দেখা যায়। নীলা আকাশ দেখতে চেয়েছে। তাই নয় তলা বিল্ডিংয়ের আট তলায় তারা ফ্ল্যাট নিয়েছে। বাইরে এখনো আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠে নি। ঈষৎ অন্ধকার। তাদের বিন্ডিংয়ের বিপরীত দিকে একটা ছয়তলা বিল্ডিং আছে। ওই বিল্ডংয়ের ছাদে কে যেন কবুতর পালে। গ্রিবাজ কবুতর। ওগুলো আকাশে উড়ে। ডিগবাজি খায়। নিচে নেমে আসে আবার। কবুতরের বাসাটা ছাদ থেকে কিছুটা উপরে বানানো হয়েছে যাতে কবুতরগুলো নিরাপদে থাকতে পারে। কবুতরের বাসা এখনো খোলা হয় নি। নিচে রাস্তা দেখা যায়। একটি বিড়াল আতঙ্কে দুই লাফ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করে পালাল। একটি কুকুর দূরে কোথাও একটানা কান্না করে যাচ্ছে। বাতাস নেই। রাস্তার শেষ মাথায় যে দেবদারু গাছটা আছে তার পাতাগুলো নড়তে ভয় পাচ্ছে। ভীত সন্ত্রস্ত চাঁদ পশ্চিম দিকে একটা বিল্ডিংয়ে পানির ট্যাঙ্কির উপর ঝুলে আছে। আকাশে মেঘ নেই। নক্ষত্রেরা পলাতক। নীলা টবে রাখা গাছগুলোকে দেখছে। পাতাবাহার গাছটা পানির অভাবে মরে যাচ্ছে। বাগান বিলাস গাছটা ভালোই আছে। রায়হানের প্রিয় গোলাপ গাছে এখনো কোনো ফুল ফোটে নি। ছুটির দিনে নীলা নিজ হাতে গাছে পানি দেয়, সার দেয়। সে না পারলে নাসিমা গাছগুলোর দেখাশোনা করে। সে চা শেষ করল।

অন্তু তাদের একমাত্র সন্তান। নীলা অন্তুর রুমের দরজার হাতল আস্তে করে ঘুরিয়ে বাতি জ্বালল। অন্তু অঘোরে ঘুমাচ্ছে একটা কোল বালিশ বুকে নিয়ে। নীলা অন্তুকে তার সাথে ঘুমাতে বললে সে রাজি হয় না। কেবলমাত্র যেদিন সে ভূতের সিনেমা দেখবে সেদিনই সে মায়ের সাথে ঘুমাতে চায়। না বললেও চলে আসে। সে বাসার কাছেই একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। সে স্কুলে যায় পৌনে আটটায়। স্কুলে গেলে নীলা অফিসে যায় নটার দিকে।

অন্তু নাস্তা খেয়ে স্কুলের পোশাক পরে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গাড়িতে করে স্কুলে চলে গেছে। নীলাও নাস্তা খেয়ে একটা প্রিন্টের সুতি শাড়ি পরে তৈরি হয়েছে অফিসে যাবে। আজ বেশ কয়েকদিন হলো রায়হান ফোন দেয় না। সে কখনো ড্রাইভারের কখনো দারোয়ানের আবার কখনো নীলার কলিগের মোবাইলে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন দেয়। নীলাকে নিষেধ করে দিয়েছে সে যেন ফোন না দেয়। নীলা গাড়িতে করে অফিসে যাচ্ছে এমন সময় ড্রাইভার বলল, ‘ম্যাডাম, স্যার ফোন দিয়েছে। কথা বলেন।’

নীলা বলল, ‘হ্যালো।’

—হ্যাঁ কেমন আছো?

—ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

—ভালো আছি। অন্তু কেমন আছে?

—ও ভালোই আছে। শুধু চকলেট আর চিপস খেতে চায়। তা এয়ারপোর্ট ম্যানেজ করার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হলো?

—না। এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারি নাই। সব চেষ্টাই তো করলাম। কিন্তু কোনো রাস্তা বের করতে পারলাম না। আমার যতগুলো চ্যানেল ছিল সবখানেই নক করেছি। কিন্তু উত্তর একই আসে। না, পারব না। এটা অসম্ভব কাজ।

—আমি কি একটু চেষ্টা করে দেখব?

—দেখতে পারো। তোমার পরিচিত কেউ আছে নাকি?

—হ্যাঁ, একজন আছে। গতকাল ও আমাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। আজ ওর ফোন নাম্বার নিয়ে কথা বলব।

—ঠিক আছে কথা বলে দেখো কিছু করা যায় কিনা। আজ আর কথা বলতে পারছি না। এখন অন্য এক শহরে যাব। ওখানে গিয়ে আবার ফোন দেবো। খোদা হাফেজ।

—আচ্ছা ঠিক আছে। খোদা হাফেজ।

অফিসে পৌঁছেই নীলা তার ক্লাসমেট মোশাররফের ফোন নাম্বার জোগাড় করে। কলিগের ফোন দিয়ে ওকে ফোন দেয়। সব ঘটনা শুনে মোশাররফ বলে যে সে বিশেষ কোনো হেল্প করতে পারবে না এই ধরনের কেইসে। তবে সে আরিফের কথা বলে। আরিফের অনেক ক্ষমতা আছে। তাছাড়া এই মুহূর্তে আরিফের পোস্টিং হলো ইমিগ্রেশনে। সুতরাং যদি কেউ কিছু করতে পারে তবে সে হলো আরিফ। তারা তিনজনই ক্লাসমেট ছিল। আরিফের কথা শুনে নীলা মনে মনে ভাবছে আবার সেই আরিফ। যদিও আরিফের ফোন নাম্বারটা চেয়ে নিতে সে ভুলে গেল না।


সুসজ্জিত নারীর সাজ ভেঙে পুরুষেরা কী আনন্দ পায়?


২.
আজ শুক্রবার। নীলা ব্যালকনির চেয়ারটায় বসে চা খাচ্ছিল। ভীষণ গরম পড়েছে। আকোশে মেঘের দেখা নেই। বাতাস নেই। সে পাশের বিল্ডিংয়ের কবুতরগুলোকে দেখছিল। মনে মনে ভাবছিল কখন ওগুলো আকাশে উড়বে। এমন সময় কোত্থেকে যেন একটা বিড়াল এসে ছাদে উঠে পড়েছে। সে বিড়ালটাকে দেখছে। ওটা কিছুক্ষণ বাসাটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর একটু দূরে গিয়ে বসে পড়ল। হঠাৎ একটা কবুতর খাবার খেতে বাসা থেকে উড়ে ছাদে নামল। বিড়ালটা সাথে সাথে কবুতরটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাথায় কামড় দিয়ে ঘাড়টা ভেঙে ফেলল। কবুতরটা কয়েকবার পাখা দিয়ে চাটি মারল। দাপাদাপি করল। তারপর স্থির হয়ে গেল। বিড়ালটা তখনো কবুতরের মাথাটা কামড়ে ধরে রেখেছিল। নীলার মাথা ব্যথা করছিল। টেনশন করলে ওর মাথা ব্যথা করতে থাকে। মাথা ব্যথার ওষুধ খেলেও ব্যথা কমে না। সে ব্যালকনি থেকে বেডরুমে চলে এল। অন্তু কার্টুন দেখছিল আর চকলেট খাচ্ছিল। নীলা ভাবছিল আরিফকে এই সময়ে ফোন দিবে কিনা। মোবাইল ফোনে আরিফের নাম্বারটা বের করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর নাসিমাকে পাঠাল দোতলার ভাবির ফোনটা আনতে। নাসিমা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোন নিয়ে এল। এবার কিছু না ভেবেই কল দিয়ে ফেলল। রিং হচ্ছে। ওপাশ থেকে একটা কন্ঠস্বর বলল, ‘হ্যালো।’

—হ্যালো, আরিফ বলছেন?

নীলার গলা এত বছর পরও আরিফ ঠিকই চিনে ফেলল। সে বলল, ‘কে নীলা?’

—হ্যাঁ আমি। তোমার সাথে কিছু কথা ছিল। আমার ভীষণ বিপদ। তেমার সাথে দেখা করতে চাই।

—আমার তো এয়ারপোর্টে ডিউটি। কিন্তু ওখানে কথা বলতে পারবে না। ওখানে আমি ভীষণ ব্যস্ত থাকি। তুমি কি হোটেল শেরাটনে শুক্রবার বিকেলে আসতে পারবে? আমি হোটেলের লবিতে শুক্রবার বিকেলে থাকব।

নীলা হোটেলের কথা শুনে প্রথমে একটু ইতস্তত করল। তারপর কী ভেবে যেন রাজি হয়ে গেল।

৩.
ভ্যাপসা গরম। আকাশের মেঘেরা যেন কোথায় পালিয়েছে। একটা চিলকে তাড়া করছিল তিনটে কাক। চিলটা পূর্ব দিকে দ্রুত উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল পাখা নেড়ে। কাকগুলোও চিলটাকে অনুসরণ করে তার পিছু পিছু উড়ছিল আর চিলটাকে ঠোকর দেয়ার চেষ্টা করছিল। চিলটা দিক পরিবর্তন করল। নিচু দিয়ে উড়ে যাবার চেষ্টা করল। উঁচুতে উঠল। কাকগুলো কোনোমতেই চিলটার পিছু ছাড়ছিল না। উড়তে উড়তে তারা উঁচু বিল্ডিংয়ের আড়ালে চলে গেল।

নীলা একটি সিল্কের আকাশি রঙের শাড়ি পরে কাঁচের দরজা ঠেলে হোটেলের লবিতে প্রবেশ করল। ভেতরে উজ্জ্বল আলো। সারি সারি মুখোমুখি সোফা বসানো আছে। প্রতি সেট সোফার মাঝখানে একটি করে টি-টেবিল আছে। আরিফ ভেতরের দিকে একটি সোফায় বসে কফি খাচ্ছিল। নীলাকে দেখে বলল, ‘তুমি বসো। আমি তোমার জন্য কফি আনছি।’

তারপর কফি হাতে নিয়ে ফিরল। দুজনেই কফি খাচ্ছে। আরিফ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে পুরো সমস্যাটার কথা শুনল। তারপর বলল, ‘সমস্যাটা কঠিন। তবে সমাধান করা সম্ভব। ভিসা লাগানো আছে?’

—হ্যাঁ আছে। পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা লাগানো আছে। কত টাকা লাগবে?

—টাকা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

—তবে?

—তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়ে গেছ।

—মানে?

—মানে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।

—তুমি আমাকে একবার ঠকিয়েছ। এখন চাইছ আমার সর্বনাশ করতে।

—তুমি ঠকো নি। তুমি জিতে গেছ। স্বামী সংসার নিয়ে সুখেই আছ। ঠকেছি আমি। ওরা আমাকে ঠকিয়ে একটা অ্যাজমা রোগীকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে।

—তুমি কী চাইছ?

—শুধু একবার এবং শেষবার।

—ছি আরিফ! তুমি এত নিচে নেমে গেছ। এত ছোট হয়ে গেছে।

—এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আমি যা বললাম তা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ।

—আমি চলি।

গাড়িতে উঠে রাগে দুঃখে নীলার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হলো। সে ভাবছে আরিফটা এত নিচে নামল কী করে।

৪.
নীলার বড় একাকী লাগে। রায়হান কাছে থাকলে যেকোনো সমস্যায় তার সাথে আলাপ করত। সে-সমস্যা অফিসের হোক বা সামাজিক হোক, রায়হান খুব সহজেই সমাধান বের করে ফেলতে পারত। নীলা সেটা পারে না। এখন সে এমন একটা সমস্যায় পড়েছে যেটা নিয়ে রায়হানের সাথে আলাপ করা যায় না। কোনো মেয়ে কি তার স্বামীকে বলতে পারে যে আমি পরপুরুষের সাথে শোব, তুমি কী বলো? তার মাথা ব্যথা বাড়ছে। সে ক্রমাগত ভাবতে লাগল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা যখন চিন দখল করে তখন তারা চিনা পিতাদেরকে তাদের মেয়েদের সাথে যৌনক্রিয়া করতে বাধ্য করত। পরে শোকে, অনুশোচনায় পিতা ও মেয়ে উভয়েই আত্মহত্যা করত। তাকে তো অন্তত আত্মহত্যা করতে হবে না। তাছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সাথে শুতে গেলে হয়তো তার বমি আসত। এখানে তার বমিও আসবে না। কারণ আরিফের গায়ের ঘ্রাণের সাথে সে ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই পরিচিত। কিন্তু আরিফ কেন এটা করতে চাইছে? এটা কি তার লাম্পট্য, যৌনাকাঙ্ক্ষা না অন্য কিছু? এটা কি ব্রাউনিংয়ের দ্য লাস্ট রাইড টুগেদার কবিতার নায়কের মতো প্রথম ও শেষবারের মতো তার দেহের স্বাদ নেয়ার ইচ্ছা, যেটা তাকে আনন্দ দিবে অনন্তকাল? এমনটাও হতে পারে। তাই সে রাজি হয়ে আরিফকে ফোন দিল। বলল, ‘শুক্রবার চারটায় আমার বাসায়।’ আরিফ বলল, ‘একটা শর্ত আছে। তোমাকে খুব সেজে থাকতে হবে।’ শুতে যাওয়ার আগে রায়হানেরও একই বায়না থাকে ‘সাজতে হবে।’ সুসজ্জিত নারীর সাজ ভেঙে পুরুষেরা কী আনন্দ পায়?

শুক্রবার এসে গেল। নীলা নাসিমা আর অন্তুকে গাড়ি করে মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। আর বলে দিল তারা যেন সারাদিন ওখানে কাটিয়ে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে। তিনটার দিকে সে সাজতে বসল আয়নার সামনে। চোখে কাজল দিল। মাশকেরা, আইলাইনার, আইশ্যাডো, ফাউন্ডেশন সবকিছু দিয়ে সাজল। কানে ঝুমকা পরল, গলায় হার। আলমারি থেকে একটা সাদা রঙের কাতান শাড়ি বের করে পরে নিল। সে আয়নায় নিজেকে দেখে নিল আবার যাতে কোনো খুঁত না থাকে। ব্লাঙ্ক কাট চুল একটু আঁচড়ে নিল। একটা পারফিউম আছে যেটা থেকে ঘামের মিষ্টি একটা ঘ্রাণ বেরোয় সেটা মেখে নিল। এই সাজে ও যেকোনো পণ্যের মডেল হতে পারবে।


আরিফ মুগ্ধ হয়ে দেখছে নীলাকে। তার বুক উন্নত। কোমরে, পেটে মেদের হালকা একটা আবরণ আছে যার কারণে তাকে আকর্ষণীয় লাগে।


কলিং বেল বাজল। নীলা দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ। পরনে টিশার্ট, গ্যাবাডিনের প্যান্ট আর সু। আরিফকে সোজা বেডরুমে নিয়ে এল। দারোয়ানকে দিয়ে কাবাব আর পরোটা আনিয়ে রেখেছিল। বলল, ‘কী খাবে।’ আরিফ জবাবে বলল যে পরে খাবে। আরিফ বিছানায় বসে আছে। আরিফ মুগ্ধ হয়ে দেখছে নীলাকে। তার বুক উন্নত। কোমরে, পেটে মেদের হালকা একটা আবরণ আছে যার কারণে তাকে আকর্ষণীয় লাগে। নিতম্ব ভারী। বলল, ‘কাপড় খোলো।’ নীলা বাধ্য মেয়ের মতো পেঁচিয়ে কাপড় খুলতে লাগল।

৫.
বেশ কিছুদিন যাবৎ বৃষ্টি হচ্ছে না। গরম অসম্ভব। কাকেরা রাস্তার কল থেকে, ড্রেন থেকে পানি খাচ্ছে। প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটা বিশে ফ্লাইট। আরিফ সেদিন এয়ারপোর্টে ওই সময়ে উপস্থিত থাকবে। নীলাকে বলল রায়হান যেন ঠিক এক ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছে। রায়হানও তৈরি। বৃহস্পতিবার রাত তিনটার সময় নীলা অন্তুকে নিয়ে গাড়িতে করে এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা হলো। রাস্তা ফাঁকা। জ্যাম নেই। তাই গাড়ি দ্রুত চলতে লাগল। রামপুরা, বাড্ডা পেরিয়ে নিকুঞ্জের কাছ দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। একটা সাপ ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ওপারে যাচ্ছিল। তাদের গাড়িটা সাপটাকে থ্যাঁতলে দিয়ে ধেয়ে চলল। তারা যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছুল তখন বাজে সাড়ে তিনটা। নীলার টেনশন বৃদ্ধি পেতে লাগল। মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত রায়হানের সাথে দেখা হলো। রায়হান অন্তুকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘বাবা বেশি চকলেট খেয়ো না দাঁতে পোকা হবে।’ নীলাকে বলল, ‘তুমি অন্তুকে দেখে রেখো।’ আরিফ চলে এসেছে। নীলা আরিফের সাথে রায়হানের পরিচয় করিয়ে দিল। আরিফ বলল, ‘চলুন ভেতরে চলে যাই।’ আরিফ আর রায়হান পাশাপাশি হেঁটে ডিপার্চার গেট দিয়ে ভেতরে চলে গেল। নীলা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। তারপর গাড়িতে উঠে বসল। বাতাস দিচ্ছে। ধূলা-বালি, কাগজ, খড়কুটো উড়ছে। একটু পর শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। পৃথিবীটা শীতল হলো। তারা যখন বাসায় ফিরল তখন পাঁচটা বেজে গেছে। ঘরে ঢুকে নীলার টেনশন আর শেষ হয় না। কখন বাজবে পাঁচটা বিশ। অন্তু ব্যালকনি থেকে চিৎকার করে বলছে, মা দেখে যাও একটা জিনিস। নীলা ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে অন্তু গোলাপ গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর গাছে ফুটে আছে একটি মসৃণ গোলাপ।