হোম গদ্য গল্প বিয়ের প্রশিক্ষণ

বিয়ের প্রশিক্ষণ

বিয়ের প্রশিক্ষণ
1.71K
0

পৌষের শেষে ঢাকায় কিঞ্চিৎ শীত পড়েছে। তবে শীতবস্ত্র এখনও কেউ পরছে না।

দিশারি গোটা চারেক শপিং ব্যাগ নিয়ে বাসায় ঢুকল। বাসায় এই মুহূর্তে শুধু তার বাবা-মায়ের থাকার কথা। কিন্তু ছোট মামাকে দেখা যাচ্ছে।

ছোট মামা গোমড়া মুখে সোফায় বসে টিভি দেখছে। দিশারি ব্যাগগুলো মায়ের হাতে দিয়ে সোফায় বসল। “মামা, কখন আসলে?” তার নির্বিকার কণ্ঠ।

মামা চুপ। কয়েক মাস ধরে এক ব্যাংকারের সঙ্গে দিশারির বিয়ের কথা চলছে। এখন প্রায় চূড়ান্ত। অথচ ছোট মামাকে বলা হয় নি। গত কাল খবর পেয়েই বগুড়া থেকে ছুটে এসেছে। কেউ বলে নি বলে ত আর সে এমন একটা গুরুতর বিষয় থেকে দূরে থাকতে পারে না।

“কী ব্যাপার, কথা কবা না?” দিশারি বলল।

মামা নড়েচড়ে বসছে। সে জানে তাকে কেন বিয়ে সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। সবার ধারণা, খোদা তাকে সব কাজে বাগড়া দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। এর আগে এক প্রকৌশলীর সঙ্গে দিশারির বিয়ে হয় নি এই মামার কারণেই।


“ত বিয়ে করতে যাচ্ছিস যে,” মামা যেন অনেকক্ষণ পর দম ছাড়ল, “ভালো কিছু করার আগে প্রশিক্ষণ লাগে যে এটা জানিস ত?”


আষাঢ়ের এক বিকালে দিশারিদের মিরপুরের এই বাসাটাতেই সোফায় বসে দুই পক্ষের লোকজন গপসপ করছিল। ছোট মামা প্রকৌশলীকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা বল দেখি প্রকৌশল বিদ্যায় গণিত এতটা জরুরি কেন?”

সদ্য পাস করা তরুণ প্রকৌশলী হেসে বলল, “গণিত ছাড়া প্রকৌশল বিদ্যা কল্পনা করা যায় না। প্রকৌশল বিদ্যা মানেই গণিত।”

ছোট মামা বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি কী প্রশ্ন করলাম আর তুমি কী উত্তর দিলে! কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করে কথা বল।”

তরুণ প্রকৌশলী অল্পতেই চেতে যায়। উত্তেজিত হয়ে বলে, “আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমার কাণ্ডজ্ঞান নেই?”

ছোট মামা তাকে ‘তুমি জ্ঞানী ছেলে’ বলে তেল দেওয়ার পর প্রশ্নটা আবার করল। কিন্তু তরুণ প্রকৌশলী এই প্রশ্নের কোনো মানে খুঁজে পেল না।

মামা তার মুখের ওপর বলে ফেলল, “তোমার সঙ্গে কারোর বনিবনা হবে না। অন্তত এখনও তেমন কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয় নি। ভবিষ্যতে হয়তো তোমার আক্কেলবোধ তৈরি হবে। কিন্তু তা না-ও ত হতে পারে। সবার হয় না এমন নজির ভূরি ভূরি আছে।”

তবু প্রকৌশলী রাজি ছিল। দিশারিকে তার মনে ধরেছিল। কিন্তু দিশারি তাকে না করে দিল। আর সব দোষ গড়াল ছোট মামার ওপর। সবাই তাকে আচ্ছামতো শায়েস্তা করল।

তারপর দিশারি দিন দিন অনুশোচনায় ভুগেছে। অত কিছু দেখতে গেলে কি আর বিয়ে করা যায় নাকি। ‘জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে আল্লার হাতে।’ কিন্তু ছোট মামা তা মানতে নারাজ। আর তার লেকচার শুনতে শুনতে দিশারি বারবার ঘাবড়ে যায়।

“ত বিয়ে করতে যাচ্ছিস যে,” মামা যেন অনেকক্ষণ পর দম ছাড়ল, “ভালো কিছু করার আগে প্রশিক্ষণ লাগে যে এটা জানিস ত?”

“তা ত জানি। কিন্তু তুমি এখন কিসের মধ্যে কী বলছ কে জানে!”

“বিয়ে যে করবি, তার প্রশিক্ষণ নিয়েছিস?”

দিশারি আকাশ থেকে পড়ল। বাবা-মায়ের দিকে তাকাল একবার।

মা বলল, “পাগলে কি না কয় ছাগলে কি না খায়! ওর কথায় কান দিস নে। যা এখান থেকে।”

দিশারি গেল না। সে বরং তার বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবা মুখ ভার করে উঠে পড়ল। দিশারি ভাবল আজ সে মামাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করবে।

মামা একটা কলেজে পড়ায়। কদিন আগে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছে। সহজ কথা হলো, হয় মামার কাছে কিছু শেখার আছে নয় মামার মাথা ঠিক করা জরুরি। মামার মুখের দিকে তাকাল সে। মামা টেলিভিশনের দিকে চেয়ে আছে। টেলিভিশনে এক চাইনিজ তরুণী সেতার বাজাচ্ছে, যেন করুণ সুরে কাঁদছে। মামা চোখ বুজে শুনছে।

“বিয়ের আগে প্রশিক্ষণ নিতে হয় যে এ বিষয়ে আজ তুমার কাছে প্রথম শুনলাম।”

“খুবই স্বাভাবিক। তুই কেবল এমএ দিলি। তাছাড়া সারাক্ষণ ত চোখ-কান বুজে থাকিস।”

“তুমি কি আমাকে অপদস্থ করতে চাচ্ছ?”

“সত্যি কথাই ত বলছি নাকি মিথ্যে বলছি?”

দিশারি মুখ ভার করে রাখল। তার উঠে পড়তে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভাবল, একটু ধৈর্য ধরে দেখা যাক মামা কী বলে।

মামা চট করে দিশারির মুখের দিকে তাকাল, “তোর বুদ্ধি বেড়েছে মনে হচ্ছে! আগে তুই যা না বুঝতি তা মানতিস না। মুখ ঝামটা মেরে চলে যেতিস।”

“এখনও চলে যেতে ইচ্ছে করছে। তুমার কথাবার্তা মোটেই বরদাশত হয় না।”

“তবু যে যাচ্ছিস না এটা একটা ভালো লক্ষণ।”

“এখন আগে বল এ বিষয়ে ঢাকায় কোথায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়?”

“তা ত জানি না। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়াটা যে জরুরি এতে কোনো সন্দেহ নেই।”

“ত আমি এখন প্রশিক্ষণ নেব কোথায় গিয়ে?”

“ভারি চিন্তার বিষয়,” মামা মুখে হাত দিয়ে চিন্তা করতে বসল। দিশারিকে বলল চা দিতে।


তারা বধির হয়ে গেছে। বিয়ের প্রশিক্ষণটা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।


দিশারি চা বানিয়ে আনার পর মামা বলল, “আপাতত তুই নিজে চিন্তা কর। কে তোকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে এটা বোঝার মতো আক্কেল আছে তোর। তাছাড়া নিজে চিন্তা করলে, চেষ্টা করলে, আক্কেল আরেকটু বাড়বে তা নিশ্চিত।”

দিশারি মুখ ভার করে রাখল।

মামা বলল, “আর এ বিষয়ে অন্তত এক হাজার পৃষ্ঠা পড়ে ফেল। বিয়ে, সংসার, ঢাকায় বাচ্চা মানুষ করা, ইত্যাদি। শাহবাগ, নীলক্ষেত, অথবা বাংলাবাজার গেলে বই পাবি।”

দিশারির মুখটা আরো ভার হলো। খানিক পরে বলল, “তুমি ত ঢাকায় থাক না। বাংলাবাজার বা নীলক্ষেত একদিন গিয়ে দেখ কেমন লাগে। ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে—! ঢাকার মানুষ ভালো-মন্দ ভুলে গেছে।”

“ভালো বলেছিস। তবে বিষয়টা এমনও হতে পারে যে তারা বধির হয়ে গেছে। বিয়ের প্রশিক্ষণটা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।” মামা উঠে দাঁড়াল। তারপর ব্যাগ কাঁধে তুলে পা বাড়াল।

“কী ব্যাপার? চলে যাচ্ছ নাকি?”

“হা। আর কিছু বলার নাই।”

(1708)

Latest posts by তারেক খান (see all)