হোম গদ্য গল্প বিষ বিষাদ, একাকিত্বের মোহন

বিষ বিষাদ, একাকিত্বের মোহন

বিষ বিষাদ, একাকিত্বের মোহন
187
0

পৃথিবীর একজোড়া দুর্বল পথিক ওরা। চারদিকের ঝঞ্ঝা যখন বিষিয়ে তোলে বায়ুর স্রোতকে, নিশ্বাসে কেবল নিঃসঙ্গতার তীব্রতা! তখন ওরা পরস্পরের দীর্ঘ নিশ্বাসকে দূর দিগন্তে ছুটি দিয়ে এক ভিন্ন বিষের মধুর স্বাদে মিশে যায় শেষ রাতে।

শকুন্তলা বারান্দার গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশটাকে দেখছে। অগণিত তারার ভিড়ে মায়ের মুখটা সে খুঁজে বেড়ায়। উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণের সে মুখের ছবি, যেন শিল্পীর আঁকা অতি কষ্টের ঐশ্বর্য। টুকরো টুকরো স্মৃতির মেঘমালা শকুন্তলার চোখে এসে ভিড় করে। ভেতরটা ভেঙে কান্নার জোয়ার আসতে চায়। ঠোঁট কামড়ে শকুন্তলা নিজেকে শক্ত করে। বাবার কথা মনে হতেই সম্বিত ফিরে পায়। প্রায় মৃত এই মানুষটার জন্য ভারি কষ্ট হয় শকুন্তলার। আর একা পৃথিবীর সংসারে বেঁচে থাকা কিংবা টিকে থাকা প্রসঙ্গে অসুস্থ পঙ্গু বাবাই ওর একমাত্র অবলম্বন। মহাঝড়ে উত্তাল সমুদ্রে ভেসে থাকার এক টুকরো ভাঙা তরী।

মানুষ একাকিত্বের দুর্যোগে আক্রান্ত হলে, নিজেকে বার বার হারিয়ে ফেলে। তখন সে হয়ে থাকে অতলে ডুবতে ও ভাসতে থাকার মতো করুণ অবস্থায় দোদুল্যমান। ব্রাউনীয় গতির অভিশাপ পিচ্ছিল পথকে আরো পিচ্ছিলতর করে তোলে। ভঙ্গুর পথকে পথিক যেমন সহ্য করতে পারে না, পথও পথিকের ভার সইতে না পেরে ভেঙে পড়ে। পরস্পরের দ্বন্দ্ব স্থবির হবার প্রত্যাশা নিয়ে সামনে ছুটতে থাকে।


ডায়েরির পাতা খুলে কয়েক লাইন লিখে থেমে যায়। বিগত আনন্দের স্মৃতি আজ বিষাদের স্বরলিপি।


…শকুন্তলা, শকুন্তলা, কোথায় গেলিরে মা?

এই তো বাবা, আসছি।

তারার আকাশ রেখে শকুন্তলা বাবার ঘরে এসে বিছানার দিকটায় উঁকি দেয়।

এখনো তুমি সজাগ?

কী করব? ঘুম আসছে না। আয় একটু গল্প করি। গামছা ঢাকা মুখ থেকে কথাগুলো বেরোয়।

তুমি তো সেই পুরনো গল্পই শুনাবে। একই গল্প বার বার..

গল্প পুরনো হলেও রস কখনো ফুরায় না রে মা। শোন, তোর মাকে যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিনই ভালো লেগে যায়। তারপর আমি বেজায় অস্থির হয়ে পড়ি বিয়ে করতে। কিন্তু, ভাগ্যে এসে হাজির হলো…

জানি কী হাজির হয়েছিল। ভাদ্র মাস। তাই তো তোমার আর মায়ের বিয়ে এক মাস পিছিয়ে গেল। তাই না?

হুম। ভাদ্র মাসে বিয়ে করা অমঙ্গল। তাই শাওন মাসে সবকিছু ঠিক হইল। কিন্তু মঙ্গলের সাক্ষাৎ পাইলাম না। তারপর তো..

তারপর বিয়ে হলো। সবই শুনেছি বললাম তো, মুখস্থ হয়ে গেছে।

সব শোনা হয় নি। বাসর রাতে তোর মার সেকি লজ্জা..

হাঁ হাঁ… হয়েছে। তারপরের গল্পও আমার মনে আছে। তুমিই প্রথম লজ্জা ভেঙে মাকে জড়িয়ে ধরেছিলে। তারপর সবকিছু একাকার হয়ে গেল। সেদিনই তোমার দাম্পত্য জীবনের প্রথম রাত।

হু হু করে কেঁদে ওঠেন রাজিব হায়দার। মুহূর্তে অর্ধেক মুখ গামছার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। যা দেখতে বিকৃত ও ভয়ংকর।

বাবা, তোমার এভাবে কান্না করাটা ভারি অস্বস্তিকর ঠেকে।

এই কান্নায় যে কী সুখ, তা কিভাবে বোঝাব তোরে? পারব না বোঝাতে। এভাবে কান্না করলে ভেতরের ফাঁপ কিছুটা বেরোয়, আর রাতে স্বপ্নের ঘোরে যেন তোর মায়ের সাক্ষাৎ পাই। তোর মাকে কাছে পেলে দুনিয়ার সব দুঃখ শেষ হয়ে যায়। কী সুন্দর চাঁদের মতো আমার মেহেরজান!

বাবা, তুমি সেই একই স্বপ্ন কতবার দেখবে? এখন একটু বোঝার চেষ্টা করতে পারো। এটা পাগলামি।

না রে মা, কিছু বুঝতে পারব না। তোর মাকে স্বপ্নে দেখি বলেই বেঁচে আছি। নয়তো আমার জীবনটা কী হতো তা ভেবে পাই না। স্বপ্নের দুনিয়া থেইক্যাই মেহের আমারে ভালোবাসে। বুঝলি মা..।

বারো বছর আগে এই পৃথিবীর বুকে রাজিব হায়দারের একটা সুন্দর সংসার জীবন ছিল। স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে সাজানো তিনটি নয়নতারার নকশা কাটা টব নিয়ে একটি ছোট্ট টববাগান। শকুন্তলার বয়স তখন তেরো। হেসে খেলে আনন্দে কেটে যাচ্ছে রাতদিন। আর সে আনন্দের বন্ধু প্রিয় পিতা। শকুন্তলা স্কুল ফেরার পর রোজ অপেক্ষায় থাকত, কখন ফিরবে বাবা, কখন শোনা যাবে বাইকের সুতীব্র হর্ন, তারপর বাসার কলিংবেল। টিভি দেখে গল্প করে কাটবে সন্ধ্যারাত, কখনো আবার চাঁদমুখী রাতে ছাদে সময় কাটাবে।

সাজানো সংসারে অন্ধকার নামতে সময় লেগেছিল মাত্র মিনিট খানেক সময়। হাঁ, আনন্দ খুশির সে সুন্দর সময়টাতে তখন একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যায় ওদের জীবনে। মধ্যবিত্ত জীবনধারার শৃঙ্খলে বন্দি সরকারি চাকরিজীবী রাজিব শহরে চলাফেরা করত বাইকে চড়ে। এক ছুটির দিনে স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যায়। নানা দিকে ঘুরে বেরিয়ে রাত দশটার দিকে ফিরছিল। গোলচত্বর ক্রস করার সময় নিয়ন্ত্রণহীন একটা ট্রাকের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। আর সাথে সাথে ঝরে যায় মেহেরজানের প্রাণ! ছিটকে পড়ে কপালে আঘাত পায় শকুন্তলা, একটা পা ভেঙে যায়। রাজিব হায়দারের ডান পা পিষে যায় ট্রাক। তারপর সে কাত হয়ে আছড়ে পড়েও চলন্ত মোটর সাইকেলকে আকড়ে ধরে রেখেছিল। কাত হওয়া মোটর সাইকেলের সাথে রোডে ঘষতে ঘষতে মুখের বামপাশ ও হাত-পা-হাঁটু, দেহের বাম পাশের নানা অংশ ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে। নির্মমতা শুধু এখানেই থামে নি, আরো জটিল ও যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে পরের দৃশ্যটা। সে সময় মহা সড়কের সংস্কার কাজে গোল চত্বর রোডের পাশে বিশাল কড়াইয়ে পিচ উত্তপ্ত করা হচ্ছিল। ব্যস্ত নগরীতে এই কাজগুলোর জন্য রাতের সময়টাই মোক্ষম। আর দুর্ভাগা রাজিব হায়দারের চলন্ত মোটর বাইক ছিটকে এসে খানিকটা হিঁচড়ে পিচের কড়াইকে ধাক্কা দিয়ে অগ্নিকুণ্ডের পাশে থামে। গরম পিচের কিছুটা অংশ রাজিব হায়দারের মুখের বামপাশে ও মাথায় লেগেছিল। একপলকে আগুনের স্পর্শে তার শরীরের অনেকটা অংশ পুড়ে যায়। শ্রমিকরা ধরাধরি করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে ও ঠান্ডা পানি ঢেলে… হাসপাতালে নিয়ে যায়। রাজিব হায়দায় বাঁচবেন এই প্রত্যাশা স্বজনদের কাছে কল্পনার মতো ঠেকেছিল। মরতে মরতেই হৃদপিণ্ডের ঢিব ঢিবটা টিকে গেল। কিন্তু তার মুখের আকৃতি হয়ে উঠেছে বিকৃত ও ভীষণ ভয়াবহ।

বহু চেষ্টা ও চিকিৎসা শেষে রাজিব হায়দারকে বরণ করে নিতে হলো পঙ্গু জীবন। ডান পা কেটে ফেলা হলো। তারপর থেকে একটা আবদ্ধ কক্ষ, হুইল চেয়ার ও এক চিলতে ব্যালকনি। অন্যদিকে ভেতরে ডেবে যাওয়া বিকৃত মুখটাকে কাপড়ের আড়ালে রেখে তাকিয়ে থাকে বাইরে, জানালার ওপাশে।

রাজিব হায়দারের পৈতৃক সম্পত্তির প্রায় সবকিছু বেচে দিতে হলো শকুন্তলার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পেছনে। মাথায় আঘাত পাওয়াতে ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পায়ের জন্য শকুন্তলাকে কয়েক বছর ক্রাচ ব্যবহার করে চলতে হয়েছে। তবুও সে পড়াশোনা থামায় নি। এরই মধ্যে একসময় মস্তিষ্কে অপারেশন করা হলো। পায়ে হাড়ের স্থানে রডের প্রতিস্থাপন তাকে পায়ের উপর ভর দিয়ে চলার পথ দেখাল। শকুন্তলাকে দেখে এখন স্বাভাবিক সুস্থই মনে হবে, কিন্তু ভেতরটা মাতৃহারা কষ্টে জর্জরিত। আরো জর্জরিত প্রিয়জন নামক শব্দটির সাথে বিচ্ছেদের ফলে একা জীবনের নিয়মকে। তারপর পঙ্গু পিতার পাশে নিজেকে সঁপে দিয়ে একটা অনিশ্চিত জীবনকে বরণ করে নেয়া।

রাত তিনটায় বাবার গোঙানিতে ঘুম ভাঙে শকুন্তলার। এ গোঙানি আগেও অনেকবার শুনেছে সে। একাকিত্বের যন্ত্রণা এক ভয়ংকর রূপে প্রস্ফুটিত হয় গভীর রাতের বন্দরে।

শকুন্তলা উঠে চেয়ারটা টেনে টেবিলের পাশে বসে। ডায়েরির পাতা খুলে কয়েক লাইন লিখে থেমে যায়। বিগত আনন্দের স্মৃতি আজ বিষাদের স্বরলিপি। মৃণালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি ও উষ্ণ চুম্বনের কথা মনে পড়ে। আবার গভীর কষ্ট এসে স্মৃতির বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ে, ভেঙে দেয় বালুঘর, কাঁচা ভাস্কর্য! মনের ভেতর ছোঁ মেরে যায় ছেলেখেলার মতো ভালোবাসা, যা কর্পূরের মতো উবে গেল বিরূপ পরিস্থিতিতে। শকুন্তলা তো তেমন কিছু চায় নি, শুধু চেয়েছিল বাবাকেও সাথে নিয়ে সংসার জীবনটা সাজাতে। আর একা এই মানুষটা কোথায় যাবে, কী করে বাঁচবে? কী করে সম্ভব পঙ্গু পিতাকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়ে সংসার করা? অচেনা যে কারোর হৃদয়েও তো অসহায়ের জন্য সহানুভূতি জেগে উঠবে। অথচ বিন্দুমাত্র মানবিক মূল্যবোধ মৃণালদের মধ্যে জাগল না। বাবাকে সাথে রাখতে চেয়েছিল শকুন্তলা, আর সেটা মানতে পারল না, মৃণালের পরিবার। সবকিছুকে বিষিয়ে তুলল আঘাতে আঘাতে। কখনো কখনো শকুন্তলার মনে প্রশ্ন জাগে, কী এমন অপরাধ করেছেন বাবা? কেন তাকে এমন একটা দুঃসহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে?

আর মৃণাল তাকে কেমন ভালোবাসল? ঝড়-ঝাপটায় হাতে হাত রেখে পাড়ি দিতে পারল না এই সামান্য পথটুকু। আর মানিয়ে নেয়ার হিম্মতটুকু বিসর্জন দিল কত সহজে!

শকুন্তলার প্রায়ই মনে পড়ে, রবি ঠাকুরের হৈমন্তী গল্পের কথা। চাইলেই সে পারত হৈমন্তীর মতো নিঃশেষ হয়ে যেতে। পারে নি কেবল বাবাকে ভালোবাসে বলে।

অথচ, মৃণাল ও তার পরিবার এ ভালোবাসাকে কত নিচু চোখে দেখেছে, ভাবতেই দু’চোখ বোজে আসে। অন্ধকার নামে পৃথিবীর বুকে।

চেয়ারে বসে থাকা বাবাকে শিশুর মতো লাগে। আর সে শিশুকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া কি মহাপাপ? প্রশ্নটা ডানা মেলতে থাকে শকুন্তলার আকাশে, নয় তো কেন মৃণালের কাছে এভাবে অগ্রাহ্য হতে হলো? হাঁ, বাবা-মেয়ের সহজ সম্পর্ক ও চুমু আদান-প্রদানকে বাজে চোখে দেখত ওরা। ক্ষত হৃদয়ে আরো ক্ষত চিহ্ন এঁকে দিয়ে ওরা পেত পৈশাচিক মজা! মেয়েটা ছাড়া পিতার ভেতরে এক অপরিমিত আহাজারি। বাবা মেয়েকে এতটা ভালোবাসে বলেই সারাক্ষণ অস্থির থাকে। তাছাড়া একলা থাকার ব্যথা কেবলই একারাই বুঝে। তাদের নিঃসঙ্গ পৃথিবী সবার কাছেই দুর্বোধ্য বিষয়।

শকুন্তলার মনে পড়ে সংক্ষিপ্ত সাংসারিক সেদিনগুলো। যখন অসুস্থ পিতাকে একা রেখে স্বামীর ঘরে সুখের জীবন যাপন নিজের ভেতরটাকে সাংঘাতিক ধিক্কার দেয়। শুধু বিচ্ছেদের ব্যথা বা কষ্ট নয়, সন্তান হিসেবে অপরাধী লাগে। সে-প্রবণতাই একদিন সবকিছুকে ছুটি দিয়ে কেবল বাবাকে ঘিরে বেঁচে থাকায় উদ্বুদ্ধ করেছে। আট-দশটা মেয়ের মতো তাকে হতে হবে এমন তো কথা নেই। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে, সামান্য একটা এনজিওতে চাকরি করে একটা জীবন পাড়ি দেবার সিদ্ধান্ত নিতে শকুন্তলা দ্বিধাবোধ করে নি। সেই চাকরিতেও আরো একটি গোপন ত্যাগ লুকিয়ে রেখেছে সে। তেজস্বী মননের কন্যারাই পারে পিতাকে ভালো রাখার শপথে এমন সিদ্ধান্ত নিতে।

তাছাড়া শকুন্তলার কাছে সামাজিক রীতি, ধর্মবিধি সবই এখন জীবন ঘনিষ্ঠ বিষাদ কঠিন কিংবা ছাইপাশ।

কখনো কখনো শকুন্তলার মনে প্রশ্ন জাগত, মৃণালকে ত্যাগ করে ভুল করে নি তো শকুন্তলা? সেই জাগ্রত প্রশ্নকে সে গলা টিপে বলত, না কোনো ভুল নয়, সবই শুদ্ধ, সবই সঠিক!

দু’চোখ বন্ধ করে ভাবনায় ডুবে থেকে নিজেকে জাপটে ধরে ঝাঁকি দেয় শকুন্তলা! হঠাৎ বাবার চিৎকারে বোধ ফিরে পায়। শকুন্তলা বাবার ঘরে এগিয়ে যায়। দেখতে পায় বাবা চোখ বন্ধ করে গোঙাচ্ছে। কখনো তীব্র চিৎকার ও কখনো অস্ফুট স্বরে বলছে, মেহেরজান তুমি এসেছ? আসো, কাছে আসো…। তুমি কাছে না এলে আমি বাঁচব কী করে?

এ দৃশ্যটা শকুন্তলার পরিচিত। মানসিক ব্যথা একটা মানুষকে এই পরিস্থিতিতে নির্দ্বিধায় ঠেলে দিতে পারে। শকুন্তলার চোখ ভিজে ওঠে। বাইরের আলোয় দেখতে পায়, বাবার বন্ধ চোখ বেয়েও জল নামছে, এক অফুরন্ত কাতরতা ঝড়ের বেগে ঘূর্ণায়মান।

এক পা ও অর্ধেক দেহটুকুরও রয়েছে জীবন্ত তৃষ্ণা। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না রাজিব হায়দার ঘুমন্ত নাকি জাগ্রত। তবে তার ডান হাত দুই ঊরুর ভাঁজে একখণ্ড বিদ্যুৎ নিয়ে মৈথুনে সঞ্চালিত, তা স্পষ্ট!

আর অস্পষ্ট কণ্ঠ বলছে, মেহেরজান আমাকে জড়িয়ে ধরো, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। এই জীবনের সবখেলা ফুরিয়ে গেলে আমাকে তোমার কাছে ঠাঁই দিও।


জগতের অংকে মন ও শরীর দুটোই নিহিত সরল ও সহজ রূপে।


শকুন্তলা ঘরে ফিরে আসে। বেসিনে গিয়ে দু’চোখে জলের ঝাপটা দেয়। ভেবে পায় না, জীবনের যোগ-বিয়োগে বিধাতা এত ভুল করে কেন? এসব ভুলের মাশুল এত জটিল হয় কেন?

রাজিব হায়দার কি চাইলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারত না? পারত হয়তো। বিয়ে করে নি। জমানো টাকা দিয়েই চলেছে বাবা-মেয়ের চিকিৎসা নামক নিয়তির কর্ষণ! শ্বাস রুদ্ধকর জীবন, পঙ্গু চলকের মৃত্যুর মলম মাখা ছোট্ট মন। আজ রাজিব একেবারে নিঃস্ব। বিকৃত মুখ ও সামান্য শরীর!

রাজিব হায়দার জীবনের সবটুকু দিয়ে অন্তত শকুন্তলাকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পার করতে পেরেছে। ঘুস বাণিজ্যের কাছে নত হয়েই মেনে নিতে হয়েছে সরকারি চাকরির মতো সোনার হরিণ ধরতে চাওয়া হারাম। তবু সর্বোচ্চ চেষ্টায় শকুন্তলা একটা এনজিওতে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। বাবার মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে পারে, এটাই সর্বোচ্চ পাওয়া। বাবাকে সুখে রাখবে বলেই মৃণালের সংসারকে ত্যাগ করেছে শকুন্তলা। কিন্তু আজ বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে শকুন্তলা বার বার ভাবছে, সত্যিই কি সে বাবাকে সুখে রাখতে পেরেছে?

বছর সাতেক আগের কথা মনে পড়ে শকুন্তলার। ওর দূর সম্পর্কের চাচি একবার রাজিব হায়দারকে দেখতে এসেছিল। তাদের কথাগুলো পড়ার টেবিলে বসে শুনছিল শকুন্তলা।

চাচি বলছিল, রাজু ভাইজান, বিয়াডা তো করলা না। বৃদ্ধ বয়সকালে তোমার সেবা যত্ন কেডা করব? কিছু ভাবছ?

তখন রাজিব হায়দার বলেছিল, ওসব নিয়ে ভাবনা নাই গো ভাবি! সবই দয়ালের হাতে।

তা বুঝলাম। তারপরেও জান-গতরের জন্যি মানুষ দরকার!

হাসে রাজিব হায়দার। বলে, তোমরা যে কও, বিয়ার কথা। আমার মতন পঙ্গু বেটারে কে বিবাহ করব? আর টাকা-পয়সা ধন-দৌলত বলতেও তো কিছু নাই। তো কোন আশায় আমার ঘর করতে আইব? আর আমার মুখ-ছুরতের অর্ধেক তো নাই বললেই চলে।

হুম, বুঝলাম রাজু ভাইজান।

টাকা না থাকলে কোনো বেটি তো আমার কাছে বিয়া বসব না। সবই কপাল…। আর আমারে সহানুভূতি দেখায়া কেহোই জীবনডারে বানের পানিতে ভাসায়া দিব না।

পঙ্গু তাতে কী, যেই সুময় তোমার টাকা-পয়সা ছিলো, তহন ঠিকই জোয়ান মাগি বিয়া করতে পারতা। আর অহন তো সব বেইচ্যা দিছো।

শোনো ভাবি, এসব নিয়া ভাবনা নাই, বুঝলা। সবই চলতে থাকব খোদার ইশারায়। আমার একটি মেয়ে আছে, ওর জন্য সব সেক্রিফাইস করতে হবে আমার।

তারপরেও তোমার বয়স তো মুডে চল্লিশ-পাঁচচল্লিশ, শইল গতরেরও তো একটা ভুখ থাকে নাকি।

শকুন্তলার স্পষ্ট মনে পড়ে ঐ মুহূর্তে বাবা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ব্যতীত আর কোনো অনুভূতি প্রকাশ করে নি। এই দীর্ঘনিশ্বাসের যন্ত্রণা সেদিন বুঝতে পারে নি শকুন্তলা। কিন্তু এতদিনে তা জানা হয়ে গেছে।

সত্যিই কি শকুন্তলা বাবাকে সুখে রাখতে পেরেছে? প্রশ্নটা বার বার উঁকি দিচ্ছে শকুন্তলার মনে। মানুষকে সুখে রাখা কিংবা সুখে থাকার জন্য শরীর ও স্পর্শ কতটা জরুরি! তা উপলব্ধির অন্দরে প্রবেশ করে জানতে হয়। শকুন্তলা প্রথম থেকে শেষ অবধি জেনেছে, তবু শরীরের ক্ষুধাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে একটু মানসিক সুখের আশায়। জগতের অংকে মন ও শরীর দুটোই নিহিত সরল ও সহজ রূপে।

রাত পোহাবার পর অফিসে যায় শকুন্তলা। নিজের ডেস্কে ব্যাগ রেখে সরাসরি ঢুকে পরিচালক মিজান চৌধুরীর কক্ষে। বুকের ওড়না সরিয়ে টেবিলে বসে। বলে, স্যার আজ তো শনিবার, তাই ব্যাপারটা কি আগে-ভাগে করা যায় না? একটু বাইরে বেরোবার তাড়া আছে।

মিজান চৌধুরী হেসে বলে, ঠিক আছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি ওদিকটা সামলে আসছি।

মিজান চৌধুরী স্টাফদের কাজ তদারকি করে, ম্যানেজারের উপর কাজ চাপিয়ে শকুন্তলাকে নিয়ে রেস্ট হাউসের দিকে পা বাড়ায়। রুমে ঢুকেই ঝটপট শরীরের উপরের অংশ মেলে ধরে শকুন্তলা।

আবারো জানায়, যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে অন্য একটি গন্তব্যের দিকে রওনা দিবে।

আধঘণ্টা পর, শরীর ও মাংস চোষার ক্ষুধা শেষে মিজান চৌধুরী টাকার নোট বিছানায় রাখে। টিস্যু পেপারে হাতে লেগে থাকা তরল মুছে, প্যান্টের জিপার আটকে সুপুরুষের বেশে অফিসের দিকে চলে যায়। ব্রা পরে জামা ও ওড়না জড়িয়ে নেয় শকুন্তলা, রোডে নেমেই রিজার্ভ ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে চলে পদ্মার ঘাটে।

শকুন্তলা নিজেকে প্রায়ই বলে, তার এনজিওর চাকরিটা লাভ করতে সাহায্য করেছে স্মার্ট শরীরের আভিজাত্য প্রদর্শন। টান টান করে সুডৌল স্তনের ডাগর দৃষ্টি পরিচালকের মনকে করেছে বিগলিত। ভালো বেতন ও চাকরি স্থায়ীত্বের নিশ্চয়তার জন্য বেছে নিতে হয়েছে পরিচালকের সাথে এই সহজ সম্পর্ক। কেবল ধরা-ছোঁয়া, তবে কখনো সেই দেহ মৈথুন বিছানা অবধি সম্ভব হয় নি। তাছাড়া লোকটার অতদূর ক্ষমতা বা চাহিদাও নেই। স্তনকে ময়দা মাখানোর মতো দলন, চুুমু, কামড়ানো ও স্বলিঙ্গে স্বমেহন ব্যতীত তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। এই সময়টাকে মানিয়ে নিয়েছে শকুন্তলা, যদিও প্রথম দিকে বিরক্তি লাগত। কখনো কখনো আবার নিজের ভেতরের সঙ্গম ইচ্ছা সজাগ হতো, তখন মিজান চৌধুরীকে তীব্রভাবে দেহের সাথে মিশিয়ে দিতে চাইত। কিন্তু এখানে অপারগ মিজান চৌধুরী। তারপর থেকে সবকিছু মেনে নিয়েছে শকুন্তলা। ব্যাপারটা কিছুটা, সময়ের প্রয়োজনে সামান্য অভ্যাস মাত্র। কিছু সুখ পাওয়া নয়, দেয়াটাই প্রধান। আর আপন কামনাকে ছুটি সে দিয়েছে মৃণালের প্রতি তীব্র ঘৃণার সংশ্রবে।

পরিচালক মাসে দু-তিনবার এই কাজটা করে থাকে। শকুন্তলার স্তনে হাত বুলিয়ে সে খুশি হয়ে ভালো বেতন ছাড়াও অতিরিক্ত হাত খরচের টাকা দিয়ে থাকে। শকুন্তলা নিজেকে প্রবোধ দিত, এতটুকু সহ্য করে যদি বাবাকে ভালো রাখতে পারে, তাতে সে সুখীই। কিন্তু, সুখের ঘাটতি কোথায় গতরাতে তা জ্বলন্ত শিকলের মতো প্রশ্নাকারে কপালের সামনে ঝুলতে দেখেছে।

পাটুরিয়া পৌঁছে ওখানকার যৌনপল্লী থেকে সুরমা নামের একজন মেয়েকে সাথে নিয়ে আবার ট্যাক্সিতে ওঠে শকুন্তলা। মাত্র তিন হাজার টাকার কন্ট্রাক। শকুন্তলা আগাগোড়া পুরো বিষয়টা তুলে ধরে। সুবোধ বালিকার মতো মাথা নাড়ে মেয়েটি। শকুন্তলা মেয়েটাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য পারিশ্রমিকের তিনহাজার টাকা আগেই হাতে গুঁজে দেয়। আরো অতিরিক্ত দু’হাজার টাকা দেবার আশ্বাস দেয়।

শকুন্তলা বলে, তুমি চাইলে আমার বাসায় থাকতে পারো। আমি সব ব্যবস্থা করব। তোমাকে যত টাকায় বিক্রি করেছিল, আমি তার চেয়েও বেশি টাকা পরিশোধ করে তোমাকে নিয়ে আসব।

সুরমা কিছুই বলে না, কেবল তাকিয়ে আছে শকুন্তলার দিকে। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে।

লাঞ্চের পর ঘুমাচ্ছিল রাজিব হায়দার। জেগে উঠল শেষ বিকেলে। শকুন্তলা অপেক্ষা করছে কখন রাত নামবে। দিনের বেলায় বিকৃত মুখ দেখে মেয়েটা ভয় পেতে পারে, তাই অন্ধকারটাই ভালো। ঠিক ঠিক অন্ধকার নামল। বাবার ঘরের জানালা লাইট বন্ধ করে সবকিছু বুঝিয়ে সুরমাকে পাঠালো সেখানে। কিছুক্ষণ টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সুরমা স্বেচ্ছায় এগিয়ে গেল। জড়িয়ে ধরে কাছে টানল। হাতে স্তন গুঁজে দিল, নিজের হাত বাড়িয়ে দিল ঊরুর ফাঁকে নিস্তেজ পুরুষাঙ্গে।

রাজিব হায়দার হেসে বলল, মেহেরজান তুমি আসছ ভালোই হলো।

সুরমা বলল, আপনি খুশি হইছেন?

খুব ভালো লাগছে, খুশি হবো না কেন? কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আলোটা জ্বেলে দাও না, জানালাটা খুলে দাও একটু হাওয়া আসুক। দয়া করে জানালাটা খুলে দাও। আলোটা আনো, লোডশেডিংটা বড্ড জ্বালায়।

সুরমার মনে পড়ল শকুন্তলার কথা, ঘরের লাইট অন করতে নিষেধ করেছেন। তবু লোকটার আকুতির কারণে জানালা খুলে দিয়ে, আবার সঙ্গম প্রস্তুতির দিকে অগ্রসর হলো। বাইরে থেকে ল্যাম্পপোস্টের একচিলতে তির্যক আলো রুমে ঢুকল। দুটো শরীর বিছানায় এদিক-ওদিক হেলে-দুলে চুমু চোষণে ব্যস্ত। দরজার পাশে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু অবলোকন করছিল শকুন্তলা। ওদের দু’জনের শীৎকার ধ্বনিতে আনন্দে দু’চোখ ভিজে এল। নিজস্বতার বৃত্তে আজ ভিন্ন আমেজ! নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে হাহাকারের দিগন্ত পেরিয়ে ইচ্ছার পূর্ণতা হঠাৎ এসে টোকা দিল, সেই সাথে আপন অপূর্ণতাকে দেখাল চোখে আঙুল দিয়ে।


পাপ কোথায় পেলে? পাপ তো করেছে ভাগ্যবিধাতা, আমরা সে-পাপমোচন করছি।


মৃণালের কথা বার বার মনে পড়তে লাগল। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো শকুন্তলার শরীরটা কেঁপে উঠল। মাথা ভারি হয়ে এল, পুরো পৃথিবী ঘুরছে। শকুন্তলা বিছানায় এলিয়ে দিল নিজেকে, দু’চোখ মুছে কোলবালিশটা কাছে টেনে নিল। ধীরে ধীরে সরে যায় গায়ের জামা, জেগে ওঠে নিশ্বাসের স্বমেহন অস্তিত্ব। অন্যদিকে ওপাশে দু’জনেরই হাসির শব্দ একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই হঠাৎ ঘটে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হঠাৎ সুরমার তীব্র চিৎকার! শকুন্তলা কোলবালিশ ছেড়ে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে এগিয়ে যায়। মুঠোফোনের আলোয় দেখতে পায়, সুরমাকে। মেয়েটা বিছানা থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে আছে, দরজার সামনে। ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছে।

রাজিব হায়দারের আহাজারি কানে আসে।

কোথায় গেলে মেহেরজান? আমি কী দোষ করলাম? কাছে আসো…

শকুন্তলার বুঝতে বাকি থাকে না জানালা পেরিয়ে আসা ল্যাম্পপোস্টের একচিলতে আলোই এর জন্য দায়ী। পিতার মুখের এই দৃশ্যটার জন্য কেউ অজ্ঞান হতে পারে, এটা কখনো কল্পনাও করতে পারে নি শকুন্তলা। রাজিব হায়দারের হাসির দৃশ্যটা নিশ্চয়ই সুরমার চোখে ধরা পড়ে গিয়েছিল।

যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে রাজিব হায়দার। আহাজারির সুতীব্র শব্দ!

কী পাপ করেছি, এভাবে কেন চলে গেলে?

এবার শকুন্তলা নিজেকে দেখে চমকে ওঠে। গায়ে সামান্য বিছানার চাদর ব্যতীত কিছুই নেই। এক অজানা শক্তি তাকে ঠেলে দেয় সামনের দিকে। যেখানে একজন কাম ভিখারি হতভাগ্য পুরুষ আর্তনাদ করছে।

শকুন্তলা ভুলে যায় আপন পরিচয়, সম্পর্কের ফাঁদ। কামনা ও কষ্টের দহনে এক হয়ে যায় মানব-মানবী।

পরদিনই সুরমা বিদায় নেয়। তারপর বহুদিন কেটে যায়!

প্রায় রাতেই শকুন্তলা মেহেরজান হয়ে উদ্ভাসিত হয় জৈবিক যাতনায়। পরস্পরের যোগ-বিয়োগ নিয়ে পৃথিবীর অর্থনীতি জাগে, যন্ত্রণা উপশমে সার্থক হয় ক্যালকুলেটরের হিসেব।

একদিন রাজিব হায়দার বলে ওঠে।

একি পাপ তুই করছিস মা?

পাপ কোথায় পেলে? পাপ তো করেছে ভাগ্যবিধাতা, আমরা সে-পাপমোচন করছি।

সৌর শাইন

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, ১৯৯৫; কাপাসিয়া, গাজীপুর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক, ঢাকা কলেজ।

ই-মেইল : souroshine@gmail.com

Latest posts by সৌর শাইন (see all)