হোম গদ্য গল্প বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ত

বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ত

বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ত
522
0

ক. ভণিতা

অরূপ রায় সম্পাদিত ‘কলাপক’ সাহিত্য পত্রিকার সর্বশেষ সংখ্যায় আমার লেখা ‘বটুল্যার পান্টি’ শিরোনামে একটা গল্প প্রকাশের পর আমার সাহিত্যবোদ্ধা বন্ধুরা আমাকে বেশ ভর্ৎসনামূলক কথাবার্তা বলেছে। গল্পটা এক রাখাল বালককে নিয়ে লেখা। বন্ধুদের আপত্তি, শহুরে মধ্যবিত্ত হয়ে আমি কেন গ্রামের এক দরিদ্র রাখাল বালককে নিয়ে গল্প ফাঁদতে গেলাম। তাদের অভিযোগ, আমি শহুরে মধ্যবিত্ত কিশোরদের রোম্যান্টিকতা ওই গ্রাম্য রাখাল বালকের উপর চাপিয়ে দিয়েছি।

যার হাতে গল্পটা ছাপানোর ও বাতিল করার সব ক্ষমতা ছিল, সেই সম্পাদক নিজেই আমাকে একদিন বলল, ‘তুমি আমার বন্ধু বইল্যা ছাপায়া দিলাম। কিন্তু এইসব বানোয়াট গল্প আর লেইখো না।’

সে আমাকে আরও উপদেশ দিল, ‘ভালো গল্প তুমি লেখতে পারতা, কিন্তু ভুল পথে আগায়া পারতাছ না। হের লাইগ্যাই কই, তুমি ভালো গল্পকার, কিন্তু বাজে গল্প ল্যাখ।’

আমি গ্রামের গরিব চাষি-মজুর, কিষান-কিষানিদের নিয়ে কিছু গল্প লিখেছি। আমার বন্ধুরা বলেছে ওগুলো সব নকল জিনিস, আমার বানানো। সুতরাং পণ্ডশ্রম।

ওদের এধরনের কথাবার্তা শুনে আমার মন খারাপ হয়, আমি মনমরা হয়ে যাই। ওরা তা স্পষ্ট দেখতে পায়, কিন্তু আমাকে মাফ করে না। উল্টা বরং পুলিশের মতো জেরা আরম্ভ করে। যেমন, ওরা আমাকে বলে, তুমি গাঁয়ের কিষান-কিষানিদের কতটুকু চিনো? কী জানো তাদের সম্পর্কে? তারা বলে, গ্রামের ওই সব নিম্নবর্গের [বন্ধুদের মুখে ‘নিম্নবর্গ’ কথাটা এখন বেশ চলছে, কেউ কেউ বলে ‘সাব-অলটার্ন] মানুষের চিন্তা-ভাবনা-কল্পনা-বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করাই আমার পক্ষে অসম্ভব। কারণ আমি শহরে বাস করি এবং মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান।

তারা আমাকে বোঝায়, মানুষকে নিয়ে লেখতে হলে মানুষের মনের খবর জানতে হয়, মন বুঝতে হয়। তাদের স্বপ্ন, কল্পনা, বিশ্বাস, সংস্কার, চিন্তাভাবনার ধরনধারণ বুঝতে হয়।

‘তোমার গল্পে দেখি তুমি লেখছ, কিষানটি ভাবছিল, কিষানিটির মনে হচ্ছিল, ক্ষেতমজুরটি স্বপ্ন দেখছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের বাক্য তুমি কোন সাহসে লেখ?’

সহজ কথায়, ওরা আমাকে বুঝিয়ে দেয়, শহুরে মধ্যবিত্তের ভাবনা, আবেগ, মূল্যবোধ, সংস্কার ইত্যাদিকে গ্রামের ওইসব নিম্নবর্গ মানুষের বলে চালিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার নাই। কারণ এটা এক ধরনের দুষ্কর্ম, এইভাবে সাহিত্য কলুষিত হয়, নকল জিনিসে ভরে ওঠে।

আমার এই সাহিত্যবোদ্ধা বন্ধুরা সকলেই সুশিক্ষিত এবং স্বশিক্ষিত এবং প্রবল ব্যক্তিত্বে মানুষ। তারা যা ঠিক বা উচিত বলে মনে করে, খুব দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই তা করে।

কিন্তু আমি দুর্বল প্রকৃতির সংশয়বাদী মানুষ। আমার মনে দুর্বলতা এমন যে, আমার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে যাওয়া দেখে যদি কোনো কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে বলেন, তোমার হাঁটার ভঙ্গিটা তো ঠিক হচ্ছে না, তাহলেই আমি দমে যাব, আমার মনে সংশয় দেখা দেবে।

 

খ. বিরজু আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল

কাহিনিটার আদ্যোপান্ত শোনার পর থেকে বিরজু আমাকে আর স্বস্তি পেতে দিচ্ছিল না। ও আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, রীতিমতো তাড়া করে ফিরছিল। একবার আমার মনে হয়েছিল এটা আমার বিলাস, বুঝি এক ধরনের ভান। কিন্তু পরে দেখলাম ভান নয়। ভান করার ক্ষমতাই আমার হারিয়ে গেছে। এটা কোনো নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যা নয়; বিরজুকে নিয়ে গল্প লিখব তাতে সমস্যা কী। কিন্তু খোদ কাহিনিটা নয়, বিরজু নিজেই আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল।

কারণ আমি ওকে চিনতাম। শুধুই কি চেনা? ও ছিল আমার ছেলেবেলার খেলার সাথিদের একজন, অতি উজ্জ্বল একজন। এখনও বিরজু আমার কৈশোরের একটা জানালা।

মেথরের ছেলে, কিন্তু খেলার মাঠে জুটেছিল আমাদের সঙ্গে। আমরা কেউ কলেজের অধ্যাপকের ছেলে, কেউ স্কুলশিক্ষকের ছেলে, কেউ ব্যাংক ম্যানেজারের ছেলে, কেউ অ্যাডভোকেটের ছেলে, কারও বাবা এমবিবিএস ডাক্তার, কারও বাবার রড-সিমেন্টের ব্যবসা; ছোটখাটো ব্যবসায়ী, মুদি দোকানি কিংবা দর্জিখানার মালিকের ছেলেও ছিল আমাদের দলে। কিন্তু মেথরের ছেলে? হ্যাঁ, ছিল। তবে ওই একজনই: বিরজু।

আমরা ফুটবল খেলতাম আবুল কাশেম ময়দানে। মাঠের দক্ষিণ পাশে একটা পুকুর ছিল, বেশ খাড়া ছিল তার পাড়গুলো। আমাদের বল পুকুরটাতে পড়ে গেলে, বলতে হতো না, সবার আগে বিরজু দৌড়ে গিয়ে ঝপাং করে লাফিয়ে পড়ত পুকুরে। হাসতে হাসতে তুলে নিয়ে আসত বলটা। পুকুরে বল পড়া নিয়ে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না : কারণ বিরজু আছে। পুকুরে বল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সবার চোখ এক সঙ্গে ছুটে যেত ওর দিকে। যে দিন ও খেলতে আসত না, সেদিন হতো বিপদ : পুকুরে বল পড়ে গেলে কেউ তুলে আনার দায়িত্বটা নিতে চাইতাম না। ‘তুই নাম।’ ‘না, তুই নাম।’ এই করে নষ্ট হতো অনেক সময়।

অবশ্য সেরকম দিন খুব কমই আসত; ফুটবলের মাঠে বিরজুর অনুপস্থিতি ছিল একেবারেই বিরল ঘটনা।

বিরজু পুকুর থেকে বল তুলে কিন্তু কাপড় বদলাতে বাড়ি যেত না। ভেজা হাফ প্যান্ট, ভেজা স্যান্ডো গেঞ্জি পরেই আবার খেলতে শুরু করত। এমনকি ভেজা মাথাটা মুছতও না। খেলতে খেলতেই কখন সব শুকিয়ে যেত ওর খেয়াল থাকত না, আমরাও টের পেতাম না।

বিরজুর কখনো সর্দি-জ্বর হতো না। অনন্ত আমি কখনো শুনেছি বলে মনে পড়ে না। ওর মাথাভর্তি ছিল কোঁকড়ানো মিশকালো চুল, আর গায়ের রঙটাও কী চকচকে কালো! দাঁতগুলো ছিল খুব সাদা, ধবধব করত কালো মুখমণ্ডলে, বেশ একটা কনট্রাস্ট হতো।

মেথরের ছেলে, কিন্তু স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। তবে একটু পিছিয়ে; আমরা যখন ক্লাস সেভেন-এইটে, ও তখন ফোর কি ফাইভে। আমাদের স্কুলেও নয়। তাই কি হয়? রূপনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম আমরা সব বড় বড় মানুষের ছেলেরা। মেথরের ছেলে বিরজুকে টাউনের একদম প্রান্তে অন্য একটা দীনহীন প্রাইমারি স্কুলে যে ওকে নেওয়া হয়েছিল, সেটাই ছিল ওর চৌদ্দ পুরুষের জন্যে সম্মানের ব্যাপার।

কিন্তু তখন আমরা এতসব বুঝতাম না। আমরা খেলাঘর করতাম, বিরজুও ছিল আমাদের সাথি। খেলাঘরে শুধু যে খেলাধুলো হতো তা নয়। আমাদের শিক্ষাও দেওয়া হতো যে মানুষের মধ্যে ছোট-বড় ভেদাভেদ নেই, সবাই সমান। বিরজু যে মেথরের ছেলে তা মনেই হতো না আমাদের। এক সঙ্গে খেলাধুলা করতে করতে আমরা বড় হয়েছি।

আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত ওকে খেলাঘরে আসতে দেখেছি। তার পরে ওর আসা কমে গিয়েছিল। শেষের দিকে আর আসতই না। শুনেছি, কোন জুতোর দোকানে কাজ নিয়েছে, স্কুলে আর যায় না। একবার রাস্তায় দেখা হয়েছিল : ‘কেন রে, লেখাপড়া আর করবি না?’ বিরজু সাদা দাঁতগুলো বের করে শুধু হাসে।

পড়াশোনায় ওর মন বসে নি। এত উড়নচণ্ডী ছেলের কি পড়ায় মন বসে?

তার পরে আর দেখি না ওকে। অনেকদিন পর হঠাৎ করে একদিন হয়তো উদয় হতো। খেলাঘরের কোনো কোনো অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে দেখা যেত ওকে। এসে হয়তো সামিয়ানা টাঙাচ্ছে বা খুঁটি পোঁতার কাজে হাত লাগিয়েছে। কলেজে উঠে আমি যখন ক্ষেতমজুর আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম, তখন মাঝে মাঝে হঠাৎ দেখতে পেয়েছি, ক্ষেতমজুদের মিছিলের মধ্যে বিরজু। মিছিলের লাইন ঠিক করে দিচ্ছে, অথবা কোনো সাঁওতাল বৃদ্ধ ক্ষেতমজুরের হাত ধরে হাঁটতে সাহায্য করছে।

 

গ. লছমীটা যখন মমি হয়ে যাচ্ছিল

রূপনগরে তখন চৈত্র মাস। উত্তরবঙ্গে চৈত্র মাস কী সময়, কী তার চণ্ড রূপ তা শুধু তারা জানে যারা ওই অঞ্চলে বাস করে। বিরজুর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকে আমার অবস্থা আচ্ছন্নের মতো। তার উপর কটকটে চোখ-ধাঁধানো রোদে পুড়ে যাচ্ছে সমস্ত কিছু। জীবন্ত গাছের সবুজ পাতার রস শুকিয়ে ওঠার একটানা চোঁও শব্দ শোনা যাচ্ছে; রোদ যেন গলিত রূপা, সে রূপায় ধুয়ে ধুয়ে খয়েরি মাটি চালের আটার মতো সাদা হয়ে যাচ্ছে।

মেথরপট্টি ঘুরে এসে আমাদের গলিতে ফের ওই পাড়াটাকেই গনগনে রোদের তলে পুড়তে দেখি; সবুজ পাতা শুকিয়ে খড়ের মতো হয়ে যাচ্ছে, শুকনো পাতা পুড়ে ধূসর ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে। বিধবা মেথরানি লছমী মরে পড়ে আছে তার ঘরের চালাহীন বারান্দায়, ঘরের পেছনে দাঁড়ানো ছাতার মতো বিশাল কড়ই গাছটা তার উপর ছায়া ফেলেছে, কিন্তু ছায়ার ফাঁক-ফোকর গলে রোদ নয়, টুকরো টুকরো সাদা আগুন লছমীকে পোড়াচ্ছে।

ওর দুটি ছোট ছোট ছেলে বারান্দায় মায়ের লাশের চারপাশে ঘুরে ঘুরে খেলা করছে। ক্ষুদ্র, অবোধ দুটি প্রাণী। তারা এই হাসছে, এই কাঁদছে, আবার হাসিকান্না ভুলে গিয়ে খেলায় মেতে উঠছে। কিছুক্ষণ পর পর তারা মায়ের পিঠে ঠেলা মেরে ডেকে উঠছে, ‘হুই মাই, উঠ উঠ, খিদা নাগ্ছে।’

একটা কুকুর বারান্দার কিনারে একটি থাবার মধ্যে মুখ রেখে চুপ করে শুয়ে ছেলেদুটি আর তাদের মাকে পাহারা দিচ্ছে। একটি নীল ভোমা মাছি লছমীর মুখের চারাপাশে চক্কর খাচ্ছে।

মেথরপট্টিতে এই দৃশ্য একটা স্থিরচিত্রের মতো আটকে ছিল পুরো তিন দিন। লছমীর শরীরে হাড্ডি ছিল, হাড্ডি ঢাকার জন্যে কালো পাতলা চামড়া ছিল, কিন্তু পচার মতো মাংস বা চর্বি ছিল না। তাই চৈত্রের রোদে আর শুষ্ক বাতাসে সে একটা মমিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। মেথরপট্টির সমস্ত লোক সেটা জানতে পাচ্ছিল। না জানার কোনো কারণ ছিল না। আসলে সবাই মৃত লছমীকে তার চালাহীন বারান্দায় তিন দিন ধরে পড়ে থাকতে দেখেছিল। শহরে যাওয়ার রাস্তাটা একটা বাঁক নিয়েছে লছমীর ঘর থেকে একটু দূরেই। সে পথে আসতে-যেতে প্রতিবেশীরা তিন দিন ধরে দেখছিল বিধবা লছমীটা মমি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা শুধু পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেছে, ভুলেও উচ্চারণ করে নি লছমীর মৃত্যুসংবাদ। তাদের এই নিষ্ঠুর নীরবতার কারণ আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছিল। আমি যখন তাদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের কেউ আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলছিল না।

 

ঘ. বিরজুর নিয়তি

লছমীটা মরে গিয়ে চৈত্রের রোদে আর শুষ্ক বাতাসে যখন শুকাচ্ছিল, সেই তিন দিন ধরে সুখলালের আলাভোলা ছেলে বিরজু পাড়ায় ছিল না। সে পৌরসভার ঘর-বারান্দাগুলো ঝাঁট দেয়, রেলস্টেশনের প্লাটফরম ও শৌচাগারগুলো পরিষ্কার করে আর সন্ধেবেলা তাড়ি খায়। মাঝে মাঝে অবশ্য মধ্যরাতে ঘরে ফিরে আসে।

কিন্তু এবার টানা তিন দিন আসে নি; সেই তিন দিনে তার নিয়তি ঘনিয়ে উঠেছিল। তৃতীয় দিন দুপুরে খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে যখন সে লছমীর ঘরের পাশ দিয়ে সুখলালের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, তখন লছমীর বস্তিকোটরের উপরে সে একটা কাককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তারপর যখন সে ‘লছমী বহিনটা মইরে পচতিছে, তোরা কেউ দেখতি পালু না’ বলে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসে, তখন সারা পাড়ার লোক তাকে ছেঁকে ধরে, যেন তারা তাকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে, পাওয়ার জন্যেই যেন এই তিন দিন ওঁত পেতে ছিল।

সুখলাল প্রমাদ গোনে, গরুর মতো হামলায়: ‘কী সত্যনাশ করলু রে বিরজু..!’

সুখলালের বয়েস ষাট, কাজকম্ম করতে পারে না, ছেলের কামাই খায়। বিরজু বিয়ে করে নি। সে যা এনে দেয় এক বাঁজা বিধবা পিসি তাই রেঁধে-বেড়ে বাপ-বেটাকে খাওয়ায়। সুখলাল ছেলের আহাম্মকি দেখে চিৎকার করে কাঁদে, ‘কী সত্যনাশ করলু রে বিরজু…!’

প্রতিবেশীরা হামলে পড়ে সুখলালের ঘরে : ‘ইবার খিলা সুখলাল! পাঁঠা খাই না কত কাল! ইবার খিলাতেই হোবে!’

সুখলাল কেঁদে বলে, ‘ইবারের মতন বিরজুকে তোরা ক্ষেমা করে দে।’

‘ক্ষেমা করার হামরা ত কেউ লই! ক্ষেমা করার মালিক ভগোমানে ত ক্ষেমা করবেক লাই!’

সুখলাল কপর্দকশূন্য হলেও কঠোর ধার্মিক। তাই সে ফের কাঁদে, ‘পাঁঠা কিনার সাধ্যি মোর নাইকো, তোরা ক্ষেমা করে দে।’

‘না করিস না সুখলাল! লছমীর আঁৎমা ভূত হয়া গোটা পাড়াটাক লণ্ডভণ্ড কোরে ছাড়বে।’

‘গোটা জাতের সব্বোনাশ হোবে। না না সুখলাল, না করিস না! জাত ধ্বংস হয়া যাবে!’

এমন ধারার সংলাপের এক পর্যায়ে সুখলাল কান্না থামিয়ে ক্ষেপে ওঠে, ‘যা, তোরা হামার বেটাক লিয়ে যা। ওকি কাট, কাটি ভোজ কর! লছমীর আঁৎমার শান্তি হোক, জাত বাঁচুক!’

পাশেই বসে ছিল বিরজু। বাপের মুখে এমন নিষ্ঠুর কথা শুনে সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। দাঁতে দাঁত ঘষে বাপকে বলে, ‘হামার কামাই খাস, আর হামাকেই কাটার কথা কস?’

 

ঙ. বিরজুর অধর্মাচার

বিরজু বলেছিল, তোমরা হামাকে সাত দিন টাইম দ্যাও। সাত দিন পর পাঁঠার ভোজ হোবে। হামরা অবিস্বাস করি নি, লড়কা ঝুট বুল্ত না। উ চ্যালেঞ্জ লিছিল, পাঁঠার ভোজ দিতেই হোবে।

বিরজু তোর মনের কথা আমি জানব কী করে? তোর প্রতিবেশীরা যে বলছে, ওরা তোকে বোকা ঠাউরেছিল, কিন্তু তুই নিজেকে বোকা ভাবিস নি। এ কি সত্য? লছমীর মৃত্যুসংবাদ প্রথম সশব্দে উচ্চারণ করার ফলে ধর্মমতে তোর ওপর যে দায়িত্ব বর্তেছিল তা তুই এড়িয়ে যেতে চাস নি, তোর প্রতিবেশীদের এই ধারণা কি সত্য? তুই কি একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলি?

উ চ্যালেঞ্জ লিছিল, হামরা বিস্বাস করেছিলোম চ্যালেঞ্জ লিবার মুরাদ উর আছে; পৌরসভাতে নকরি করে না? ফির পিলাটফরমে নকরি করে না?

শহরের কাপড়পট্টিতে যে মাড়োয়ারিদের বাস, তাদের কথা বলে ওরা। মাড়োয়ারিরা ছাগল পোষে, ছাগলের দুধ খায়, ছাগবংশ বিস্তারের জন্য তারা পাঁঠা পোষে এবং সেই পাঁঠারা কাপড়পট্টির গলিতে-চাতালে ঘুরে বেড়ায়। বিরজু, তুই কি মনে করেছিলি, সেই ধর্মের পাঁঠাগুলোর একটাকে তোর জ্ঞাতিদের ভোজের জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া একটা ধর্মীয় কাজ হবে?

না বাবু, ধর্মের পাঁঠা ত খাতি নাই।

 

চ. বিরজু যেভাবে মারা যায়

পাঁঠা ধরতে গিয়ে বিরজু নিজেই ধরা পড়ে যায়। তাড়ির নেশায় তখন সে আবোল-তাবোল বকছিল : লিয়ে যাই, সম্প্রদায়ের লোকজনকে ভোজ করাই, লছমীর বহিনের আঁৎমা শান্তি পাক, জাত বাঁচুক।

রূপনগরের লোকেরা বলে, মাড়োয়ারিরা পুলিশ ডেকে তাদের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিল, শালাকে আচ্ছামতন বানায়া দিবেন। শালা এযাবৎ পাঁচটা পাঁঠা গাপ করিছে।

কিন্তু প্রসিদ্ধ বস্ত্রব্যবসায়ী মুরারী প্রসাদ আগরওয়াল আমাকে বলেন, টাকা-পয়সা কিছু নয়, তার এক খুড়ো নাকি পুলিশকে শুধু বলেছিলেন যে, বিরজুকে যেন তারা শাস্তি দেয়, যাতে সে চুরি-চামারি ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যায়।

পুলিশ বলে, তারা বিরজুকে নির্যাতন করে নি, গোটা-দুই লাঠির বাড়ি মেরেছিল মাত্র। নিম্নমানের মদের বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে।

কিন্তু আমি মৃত বিরজুর দুই কবজিতে রশির দাগ দেখেছি। পুলিশ সাফাই গেয়েছে : তারা বিরজুর দুই হাত রশি দিয়ে বেঁধে থানার কড়িবর্গার সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছিল মাত্র। আর তেমন কিছুই করে নি। তবে তখন দুই-একটা বাড়ি তাকে মারা হয়, তা-ও পায়ের দিকে।

রূপনগরের লোকেদের ধারণা, পুলিশেরা বিরজুকে মারুক বা না-মারুক, তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেই অন্য ঘরে গিয়ে তাস খেলতে বসেছিল, আর বিরজু হেগে, মুতে, বমি করে ঝুলন্ত অবস্থায় মরে গেছে, খুব সম্ভব মদের বিষক্রিয়াতেই। রূপনগরের লোকেরা বলে, বিরজুকে নির্যাতন করে পুলিশের কোনো লাভ ছিল না, কারণ তাকে বাঁচাবার জন্যে টাকা নিয়ে থানায় দৌড়ে চলে আসবে এমন সামর্থ্যবান স্বজন বিরজুর ছিল না। এসব পুলিশের ভালোভাবেই জানা ছিল। তাই তারা বিরজুকে নির্যাতন করার পরিশ্রম স্বীকার করতে রাজি হয় নি।

রূপনগরের লোকেরা এইভাবে বিরজুর মৃত্যুকে খাটো করে দেখে এবং দেখাতে চায়। কেউ দুঃখ প্রকাশ করে না, প্রতিবাদের কথা বলাই বাহুল্য।

 

ছ. ময়দানে কয়েকটি মরীচিকা

আমি যেদিন রূপনগরে যাই তার পরদিন সকালেই খবর পাই, আগের রাতে থানায় পুলিশের নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ নাকচ হয়ে যায় সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জনের কথায়। তিনি সাক্ষ্য দেন যে, এক মাতাল সুইপারের মৃত্যু ঘটেছে নিম্নমানের মদের বিষক্রিয়ায়।

আমি দুপুরে মৃত বিরজুকে দেখার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে যাই। আমাকে প্রথমে তার মৃতদেহ দেখার অনুমতি দেওয়া হয় না। তখন সিভিল সার্জনের কক্ষে প্রবেশ করি, আমার লেখক-সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভদ্রলোক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান এবং আমার জন্য চা-নাশতা আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমি তার আপ্যায়ন প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েও পারি না, কারণ ভদ্রলোক আমার সঙ্গে অতিশয় ভদ্র ব্যবহার করতে থাকেন। তিনি আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেন, বিরজুর লাশের কাছে আমাকে নিয়ে যান, কাপড় সরিয়ে তার মুখটি আমাকে দেখতে দেন। আমি বিরজুর শরীর দেখতে চাই, তিনি কাপড় সরিয়ে তা-ও দেখতে দেন।

আমি বিরজুর দুই কবজিতে রশির দাগ দেখে সিভিল সার্জনকে জেরা আরম্ভ করলে তিনি স্বীকার করেন যে, হাতদুটি বেঁধে পুলিশ তাকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত আমার মধ্যে এই বিশ্বাস উৎপাদন করতে সক্ষম হন যে, পুলিশ যদি বিরজুকে প্রহার করেও থাকে, সেই প্রহারে তার মৃত্যু ঘটে নি। তার মৃত্যুর কারণ ছিল বিষাক্ত মদ।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আমি দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে আনমনে হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে কখন আবুল কাশেম ময়দানে গিয়ে দাঁড়াই টের পাই না। ময়দানে তখন একদল কিশোর ফুটবল খেলছে। রুপোলি রোদের মধ্যে তারা যেন কয়েকটি মরীচিকা।

 

জ. স্বপ্ন অথবা বিভ্রম

রূপনগর থেকে ঢাকায় ফিরে আসার কয়েক দিন পর এক দুপুরে আমার চোখের সামনে একটা ঘটনা ঘটে। আমি কারওয়ানবাজারের আন্ডারপাসের অন্ধকার সুড়ঙের সিলিঙের সঙ্গে বিরজুকে ঝুলতে দেখি। তার কাতর আর্তনাদ শুনতে পাই, পাতালপথের চার দেয়ালে তার আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। আমি থমকে দাঁড়িয়ে বিমূঢ় হয়ে ঝুলন্ত বিরজুর দিকে তাকিয়ে থাকি, তার মুখটা দেখার চেষ্টা করি, কিন্তু তার কালো মুখের জায়গায় এক দলা জমাট অন্ধকারে আমার দৃষ্টি হারিয়ে যায়। তারপর লছমীকে উড়ে আসতে দেখি, সে এসে বিরজুর দিকে হাত বাড়ায়, তার হাতের বাঁধন খুলে দেয়, তারপর তাকে কোলে নিয়ে ভেসে চলে যায়, মিশে যায় অন্ধকারে। আমি তখন শুনতে পাই থানার পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠেছে।

আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারি যে এটা আমার দিবাস্বপ্ন বা ইন্দ্রিয়-বিভ্রম; মুহূর্তের জন্য একটা অলীক জগৎ আমার সামনে খুলে গিয়েছিল। কিন্তু সংবিৎ ফিরে পেয়ে ভিড়ের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আন্ডারপাসের মুখেই যে দৃশ্যের মুখোমুখি হই তা আমার মধ্যে একটা নিয়তিবাদ জাগিয়ে তোলে। আমি দেখতে পাই, দুটি বালক-বালিকা একটা বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে রাস্তায় জড়াজড়ি করে নিষ্প্রাণ পড়ে আছে।

 

ঝ. বিরজুকে নিয়ে গল্প

বিরজুকে নিয়ে একটা গল্প আমি লিখেছি। সে গল্প অরূপ রায়ের ‘কলাপক’ পত্রিকাতেই পাঠানো হবে। আমার ওই স্বপ্নের বা বিভ্রমের বিবরণ আছে গল্পটাতে। তা ছাড়া, বিরজুর মৃত্যুর কয়েক দিন পর মেথরপট্টিতে কলেরার মহামারি দেখা দেবে, উজাড় হয়ে যাবে মেথরপট্টি, ওদের জাতটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার গল্পে এই বিবরণও আছে। নিশ্চয়ই এ আমার কল্পনা। বাস্তবে এই ওরস্যালাইনের যুগে কলেরায় একটা জনপদ উজাড় হয়ে যাওয়া বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কিন্তু তেমন কিছু যদি ঘটে যায়, মেথরপট্টির কোনো নারী-পুরুষ একটুও অবাক হবে না।

কিন্তু আপনারা শুনে অবাক হবেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপনগরের মেথরপট্টিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তিনটি শিশু ও একজন বৃদ্ধা পুড়ে অঙ্গার হয়েছে এবং সেখানকার সমস্ত ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মেথরপট্টির লোকজন নিজেদের এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছে যে, ঐশ্বরিক অভিশাপটি অল্পের ওপর দিয়ে পার হয়েছে।

মশিউল আলম

জন্ম ১৫ জুলাই, ১৯৬৬; জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
গল্পগ্রন্থ—
১. রূপালী রুই ও অন্যান্য গল্প [সাহানা, ১৯৯৪]
২. মাংসের কারবার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০২]
৩. আবেদালির মৃত্যুর পর [ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৪]
৪. পাকিস্তান মাওলা ব্রাদার্স [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১]

উপন্যাস—
১. আমি শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছি [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
২. তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত [মাওলা ব্রার্দাস, ২০০০]
৩. নাবিলাচরিত [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৪. ২০৯৯ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০১]
৫. ঘোড়ামাসুদ [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
৬. প্রিসিলা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৭. বাবা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৯]
৮. বারে বারে ফিরে আসি [জনান্তিক, ২০১১]
৯. জুবোফস্কি বুলভার [প্রথমা, ২০১১]
১০. দ্বিতীয় খুনের কাহিনি [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
১১. কাল্লু ও রেজাউলের সত্য জীবন [আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৬]
১২. যেভাবে নাই হয়ে গেলাম [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬]

শিশু সাহিত্য [উপন্যাস]—
১. তুমুল ও হ্যারি পটার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
২. তুমুলের আঙুলরহস্য [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
৩. বিড়াল কাহিনি [চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০১৬]

কলাম সংকলন—
১. জাহাঙ্গীর গেট খোলা আছে [অনন্যা, ২০১১]
২. বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়েছিল কে ও অন্যান্য নিবন্ধ (আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৭]

অনুবাদ—
১. প্লেটোর ইউটোপিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৭]
২. অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৯]
৩. সক্রেটিসের আগে : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০৩]
৪. সাদা রাত : ফিওদর দস্তইয়েফস্কি [বাংলা একাডেমি ২০০০, অবসর প্রকাশনা সংস্থা ২০১৬]
৫. বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি : আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
৬. উইকিলিকসে বাংলাদেশ : মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তার অনূদিত সংকলন [প্রথমা প্রকাশন ২০১৩]
৭. দ্য গুড মুসলিম : তাহমিমা আনাম [প্রথমা প্রকাশন ২০১৫]

ই-মেইল : mashiul.alam@gmail.com

Latest posts by মশিউল আলম (see all)