হোম গদ্য গল্প বাবা কাহিনি

বাবা কাহিনি

বাবা কাহিনি
540
0

ইব্রাহিমের আব্বা ইয়াকুব পুলিশ, বয়স পঞ্চাশে ফেলতে না ফেলতেই চুপেচাপে আরেকটা বিয়া করে ফেলছে—এমন খবর ছড়ায়া গেল। জেল-পুলিশ ইয়াকুব আলির বিয়ার এইরকম একটা খবর ফাঁশ হওয়ার পর প্রথম মন্তব্যটা করল তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জব্বার চৌকিদার। শালায় চোরের সাথে থাকি থাকি নিজেও চোর হয়া গেছে, না হইলে কি আর এই বুইড়াকালে ভীমরতি ধরে নাকি! এই কথা বলে সে ইব্রাহিমের দিকে তাকায়া জিহ্বায় চোৎ চোৎ আওয়াজ করে আরও বলে, হাজার হউক বাপ যখন বিয়া করছে তারে তো তুমি আম্মা ডাকো নাকি! তো তোমার নতুন আম্মারে নিয়া আমাদের বাড়ি তোমার আব্বারে বেড়াইতে আসতে বলিও।

চৌকিদারের এমন টিটকারি ইব্রাহিম হজম করতে না পেরে নিজের বাপরে গাইল দেয়, বুইড়া ভাম একখান, আকাম করার আর জিনিস পাইল না।

জব্বার চৌকিদার এতদিন পর প্রতিশোধ নেওয়ার একটা চান্স পাইছে, সহজে ছাড়বে নাকি!


অ্যাকশনে যাওয়ার আগে আগে ওই বেটি একটা কাগজ বাহির কইরা বলল, সে এইখানে আসার আগে থানায় জিডি কইরা আসছে। তার কিছু হইলে খবর আছে।


জব্বার চৌকিদার আর ইব্রাহিমের বাপ ইয়াকুব পুলিশ এক বয়সে স্কুল শুরু করছে, পাড়ার গাছের ডাব চুরি করছে, বাপের পকেট থাকি মাল হাতায়া লুকায়া সিনেমা দেইখা দিন কাটাইছে। কিন্তু তারা দোস্ত বনতে পারে নাই। জব্বারের মধ্যে একটা গোপন হিংসা-হিংসি মন ঘাপটি দিয়া থাকছে। আর এইটা প্রকট হয় যখন তারা পড়ালেখা ইস্তফা দিয়া পুলিশের চাকরির লাইনে খাড়ায়। দুইজনের বডি চেক হয়া গেলে বুকের মধ্যে সিল মারার পর আন্ডারওয়ার পিন্দায়া মাঠে চক্কর দিতে লাগায়া দিলে, ওই চক্কর প্রতিযোগিতায় ইয়াকুব একটা চক্কর বেশি মারে জব্বারের চেয়ে। আর তখন ইয়াকুবরে পুলিশে সিলেকশন দেয় আর জব্বাররে দেয় চৌকিদারে সিলেকশন। এমন কাহিনি ছড়ায়া পড়ার পর জব্বার কোণঠাসা হয়া পড়ে আর ইয়াকুবরে চিরশত্রু বানায়। জব্বার মনে কষ্ট পায়া ইয়াকুবরে বলছিল, দৌড়ে জিতছোস ভালা কথা, তাই বইলা আমার হারার খবরটা রাষ্ট্র করার দরকার আছিল না। এতদিনকার পুষি রাখা মনের ঝাল জব্বার চৌকিদার বড় সুখ নিয়া মিটাইতেছে এখন।

অবস্থাটা তখন এমন দাঁড়াইল, ইব্রাহিম বাড়ি থাকি বাহির হওয়ার পর চুপেচাপে আগায়া দেখে জব্বার চৌকিদার আশেপাশে আছে কি-না। যদি না-থাকে তাইলে কিছুটা স্বস্তি নিয়া বাহির হয়। সেদিন ওইরকম বাড়ি থাকি বাহির হয়া আশেপাশে চেক করি দেখে চৌকিদার নাই। আর তখন হাঁটতে হাঁটতে ইব্রাহিম মনে মনে বলে, চৌকিদারের ব্রেক নাই, জায়গা-বেজায়গা বুঝে না পুরা হান্দায়া দেয়। এমন ভাবতে ভাবতে যখন পাড়ার মোড়ে গেছে তখন দেখে চৌকিদার লোকজন মিলা চা বিস্কিট খাইতেছে। ইব্রাহিম চাইতেছিল কোনোরকমে পাশ কাটায়া যাইতে কিন্তু চৌকিদারের চোখ তারে নিশানা করল আর মুখ দিয়া গুলি করল, ইব্রাহিম চা খায়া যাও। তোমার মুখটা শুকনা লাগতেছে ক্যান? দৌড়ের উপর আছো, বুঝছি। তা তোমার আব্বার মতন দৌড়াইও না। তোমার আব্বা এমন দৌড় দিছিল তার স্পিড এখনও কমে নাই। তোমার আব্বারে বলিও, আমি দৌড়ে ইস্তফা দিছি। দুই বউ চালার স্পিড আমার নাই। এই কথার পর চায়ের দোকানের লোকজন জামাত হয়া এমন একটা হাসি দিল, ইব্রাহিমের কইলজা পুড়ি ছারখার।

তখন তার মনটা চাইল, বাড়ি থাকি বাহির না-হয়া ঘরের মধ্যে ঘাপটি দিয়া থাকতে। কিন্তু সেইটাও সম্ভব হইতেছে না। বাড়ির মধ্যে বাপের দুই নম্বর বউ সোফায় হেলান দিয়া টেলিভিশন দেখে আর দুমদুম কইরা এইঘর ওইঘর করে।

ইব্রাহিম এমন কষ্টের কথা কাউরে বলতেও পারতেছে না। পাড়ায় মুখ দেখার আর কোনো অবস্থা থাকল না। কেবল তার একটা হিরো ইমেজ তৈরি হচ্ছিল সালেহার সামনে ঠিক এমন সময় তার বাপ একটা আকাম করল! বন্ধুমহলে তারে নিয়া এখন তামাশা চলতেছে। সালেহার কলেজের সামনে যাইতে না পারায় রাগে দুখে কষ্টে তার মাথা হ্যাং করার দশা।

২.
ইব্রাহিমের মা এত সহজে মাইনা নেওয়ার মানুষ না। একবার বলল, কেস কইরা দেই তোর বাপের নামে। এতদিন জেলখানায় চোর পাহারা দিছে এখন নিজে কয়দিন আসামি হয়া জেল খাইটা আসুক। জেল-দারোগার বউয়ের সাথে তার খায়-খাতির আছে। আগে যখন কোয়ার্টারে থাকছে তখন একসাথে জেলের কয়েদির রুটি হাঁস মুরগিরে খাওয়াইতো। সেই জেল-দারোগার বউরে দিয়া সুপারিশ করায়া তোর বাপের পাছায় কয়টা বাড়ি দেওয়ামু আর ইলিশ ফাইলে রাইতে শোওয়ামু। তাইলে তার ভীমরতি ছাড়ব। আরেকবার বলে, তোর আপারে আসতে কইছি। সে আসলেই মা-বেটি মিলা এই মাগির চুলের মুঠি ধইরা একখান তব্দামারা আছাড় দিমু।

এই কথা শোনার পর ইব্রাহিম তার আম্মারে থামায়া থুমায়া বলছিল, দুইটা দিন দেখো কী হয়! এখন সে দেখতেছে তার আম্মার ওই অ্যাকশন আর নাই। আম্মারে চুপিচাপি ডাক দিয়া সে বলে, তুমি তো এক্কেবারে পানি হয়া গেলা, কাহিনি কী? তখন ইব্রাহিমের আম্মা বলে, মহল্লার চারজন মহিলারে সে ডাকছিল, যাতে এই বেটির চুল ধরি ছেচা দিয়া বাড়ি থাকি বাহির করি দেওন যায়। অ্যাকশনে যাওয়ার আগে আগে ওই বেটি একটা কাগজ বাহির কইরা বলল, সে এইখানে আসার আগে থানায় জিডি কইরা আসছে। তার কিছু হইলে খবর আছে।

তারপর থাকি ইব্রাহিমের আব্বার জন্য ওয়েট করতেছে তার আম্মা। কিন্তু দুই নম্বর বউ যেদিন থাকি আসছে সেদিন থাকি তার আব্বা আর বাড়ি আসে না। চার দিন হইল তার বাড়ি আসার কোনো নামগন্ধ নাই। এইটা নিয়া ইব্রাহিমের আম্মা আরো রাগে।

দুই নম্বর বউ যেদিন বাড়ি আসছে তখন বেলা দুপুর। ইয়াকুব পুলিশ দুপুরের খাওয়া শেষ করি তার কচু কালারের পুলিশের ড্রেসটা যখন চাপাইতেছে এমন সময় দরজায় কেউ খটখটানি দিলে ইব্রাহিম আগায়া যায়। দরজা খোলার পর দেখে, এক মহিলারে নিয়া জব্বার চৌকিদার খাড়ায়া আছে। জব্বার চৌকিদার বলে, তোমার আব্বারে খুঁজতাছিল তাই নিয়া আসলাম।


দুই নম্বর বউ বলে, ঠিক আছে, টাকা না দিলে স্বামী দেন।


তখন মহিলা বলে, ইয়াকুব বাসায় আছে?

তিরিশ বছর বয়সী সমান এক মহিলার মুখে নিজের আব্বার নাম শোনার পর ইব্রাহিমের প্রেস্টিজে লাগে। তখন ইব্রাহিম বলে, আপনি কে? কই থাকি আসছেন?

মহিলা বলে, আমি কে সেইটা জানার আগে নিজের পরিচয় দেন?

তখন ইব্রাহিম আবার একটা হিট খায়। তারপর বলে, ইয়াকুব আমার আব্বা।

আর তখন মহিলা বলে, ইয়াকুব আমার হাজব্যান্ড।

তখন ইব্রাহিম বড় একটা হিট খায় আর মহিলার দিকে পিটপিটায়া তাকায়া বলে, আপনি কী বলতেছেন এইসব, কোন ইয়াকুব আপনার হাজব্যান্ড!

তখন মহিলা বলে, জেল-পুলিশ ইয়াকুব।

এতক্ষণ চুপচাপ খাড়ায়া খাড়ায়া জব্বার চৌকিদার মজা নিচ্ছিল, সে তখন বলে, তোমার আব্বা বাসায় থাকলে তারে ডাক দেও। সে দেখি যাক।

তখন মহিলা বলে, হ হ ডাক দেন না ক্যান, ডাকেন।

জব্বার চৌকিদারের দিক কটমট চায়া ইব্রাহিম বলে, আপনি কারে ধরি আনছেন?

ইব্রাহিমের গলার আওয়াজে ইয়াকুব পুলিশ দরজায় আগায়া আসে আর তাকে দেখে ওই মহিলা হুড়মুড়ায়া বাসায় ঢোকে। ওই মহিলা বাসায় ঢোকার পর ইব্রাহিমের আব্বা আর আম্মার হুড়াহুড়ি লাগে। আর তখন ইব্রাহিমের আম্মা তার আব্বারে বাড়ি থাকি বাহির করি দেয়। ওই যে ইব্রাহিমের আব্বা তার কচুরঙা পুলিশের ড্রেসটা গায়ে দিয়া বাড়ির বাহির হয়া গেল আর তার বাড়ি আসার কোনো নামগন্ধ নাই। ইব্রাহিমকে কয়েকবার তার আম্মা বলছে তার আব্বারে জেলখানা থাকি ডাক দিয়া আনার জন্য কিন্তু ইব্রাহিম যাইতে রাজি হয় নাই। আর যদিও দুয়েকবার গোপনে ইচ্ছা করছে তাতে জব্বার চৌকিদারের ছোবলে সব আউলায়া গেছে।

এমনভাবে দিন কাটতে থাকলে ইব্রাহিম সালেহার দেখা পায় না। তার আব্বার দুই নম্বর বউ আসার পর পুরা রুটিনে গ্যাঞ্জাম লাগছে। আগে সালেহার কলেজের সামনে যাইত দুপুর বারোটার দিকে একবার আর বিকালে আরেকবার যাইত বাড়ির সামনে। সালেহাকে সে এখনও পায় নাই কিন্তু একটা পাওয়া পাওয়া ভাব যখন তৈরি হইছিল ঠিক সেই সময় তার আব্বা আকামটা করল। সে এখন সালেহাকে মুখ দেখায় ক্যামনে? এই ঘটনার পর যে-কয়টা বন্ধুর মুখোমুখি হইছে কেউ তারে কিছু কয় নাই কিন্তু মিটমিটায়া হাসে। সালেহার কথা সে কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারে না আবার নিজেও যাইতে পারে না। এইরকম একটা আঁকু-পাঁকু দশার মধ্যে যখন ইব্রাহিম দিন কাটায় তখন তার আম্মা জানতে পারে যে, তার আব্বার দুই নম্বর বউটা একটা মেসে বুয়ার কাম করত। মানে যেই সময় ইব্রাহিমের আব্বার জয়পুরহাটে বদলি হয় সেই সময় ইব্রাহিমরা কেউ যায় নাই। তখন তার আব্বা আর কয়েকজন জেল-পুলিশ মিলা যে-মেস বানায়া থাকত সেইখানে এই দুই নম্বর বউ রান্নাবাড়ার কাম করত। রান্নাবাড়ার কাম করতে করতে সে ইয়াকুব পুলিশের সাথে সংসারের কামটাও সারে। তারপর ইয়াকুব পুলিশ যখন জয়পুরহাট থাকি বদলি হয়া আবার এইখানে চইলা আসে তখন সে নাকি এই দুই নম্বর বউকে বলছিল, এক মাসের মাথায় সে সবকিছু ঠিক করি তাকে নিয়া আসবে। কিন্তু দিন মাস বছর পার হয়াও ইয়াকুব পুলিশের খবর যখন নাই তখন সে ঠিকানা জোগাড় করি স্ত্রীর অধিকার আদায় করতে চইলা আসছে। এইরকম একটা কাহিনি বলার পর ইব্রাহিমের আম্মা আরও বলে, দুই নম্বর নাকি বিয়ার কাবিননামাও দেখাইছে। এইসব কথার পর ইব্রাহিমের আম্মা এক্কেবারে ঠান্ডা হয়া গেছে। আর তখন ইব্রাহিম বলে, সে বাড়ি ছাড়ি যাবে। এইখানে থাকলে তার মান সম্মান আর থাকে না।

ইব্রাহিমের আম্মা দুই নম্বর বউয়ের কাছে শান্তি চুক্তির মতন কোনো একটা প্রস্তাব রাখতে চাইছিল। কিন্তু উলটা দুই নম্বর বউ বলছে, আপনি তো পুলিশের সাথে ত্রিশ বছর ধইরা সংসার করতেছেন এখন বাকি সময়টা আমি করি। তার চেয়ে ভালো হয়, আমি পুলিশরে নিয়া আবার জয়পুরহাট যাই আর আপনি এইখানে থাকেন। দূরে দূরে থাকলে দেখা সাক্ষাৎ কম হইলে সম্পর্ক গাঢ় থাকব।

দুই নম্বর বউয়ের এমন কথায় ইব্রাহিমের আম্মা হকচকায়া যায়। তার ব্রেন আর কাজ করে না। তখন ইব্রাহিম বলে, তাইলে এখন কী করবা? তার আম্মা বলে, তোর আব্বা এমন একটা কাম করব এইটা স্বপ্নেও ভাবি নাই। তারপর সে উ উ করে কান্না শুরু করে। দজ্জাল স্বভাবের হওয়ায় পাড়ায় ইব্রাহিমের আম্মার একটা নামডাক আছিল কিন্তু আজ তার আম্মার কান্না দেইখা মনটা মোচড়ায়া যায়। আর তখন সে বাপের দুই নম্বর বউকে বলে, আপনি কী চান?

দুই নম্বর বউ বলে, সে তার স্বামীর অধিকার চায়।

তখন ইব্রাহিম বলে, এইটা ক্যামনে হয়? আমার আম্মা থাকতে আপনি সেইটা ক্যামনে পাইবেন?

দুই নম্বর বউ বলে, আমি অত কিছু জানি না।

ইব্রাহিম বলে, আপনারে কিছু টাকা দেই, আপনি চইলা যান।

তখন দুই নম্বর বলে, কিছু টাকা মানে কী? ইয়াকুবের সব টাকা তো আমার। যা কিছু আছে সব আমার, পুরা ইয়াকুবও তো আমার।

এতক্ষণ ইব্রাহিমের আম্মা আড়ালে খাড়ায়া সবকিছু শুনতেছিল, এইবার সামনে আইসা হাউমাউ কান্দোন দিয়া বলে, তোমার কী লাগে নেও কিন্তু আমার সংসারে অশান্তি আর বাড়াইও না।

তখন দুই নম্বর বউ একটু ভাব নেয় তারপর বলে, ঠিক আছে তিন লাখ টাকা দিয়েন।

তিন লাখ টাকার কথা শুইনা ইব্রাহিমের আম্মার জবান বন্ধ হয়া যায়। আর তখন ইব্রাহিম ফোঁপায়া ফোঁপায়া বলে, এত টাকা চান ক্যা, কই পামু এত টাকা?

দুই নম্বর বউ বলে, ঠিক আছে, টাকা না দিলে স্বামী দেন।

টাকা দেন স্বামী নেন, টাকা না স্বামী, স্বামী না টাকা—এমন একটা চক্করের মধ্যে ইব্রাহিমের আম্মার ব্রেন হিট খায়। তখন সে ইব্রাহিমকে বলে, সে জেলখানায় যাবে ইব্রাহিমের আব্বার সাথে দেখা করতে।

তখন ইব্রাহিম তার আম্মাকে বলে, সে ব্যাপারটা দেখতেছে।


বাপের সিনার সাথে সিনা লাগায়া শক্ত হয়া বুকের ডিবডিব আওয়াজটা শুনে। আন্ধার আরও গাঢ় হয়া নামে। এত গাঢ় হয়া নামে যে, সালেহার বাড়ির রাস্তা আর দেখা যায় না।


তারপর আবার তার আব্বার দুই নম্বর বউয়ের সাথে দর কশাকশি শুরু করে।

তখন ইব্রাাহিম বলে, কিছু কম করলে হয় না। এই মনে করেন এক লাখ টাকা নেন।

তখন দুই নম্বর বলে, তুমি ক্যামন পোলা? পোলা হইয়া বাপের দাম কমাইতেছ? আমি হইলে তো ৫ লাখ ১০ লাখ টাকা বাপের দাম নিতাম। শোনো, তোমার কাছে বাপের দাম কম, কিন্তু আমার কাছে স্বামীর দাম বেশি।

এই কথা শুইনা ইব্রাহিম কাছুমাছু খায়। আর তখন আবার তার আম্মা সামনে আইসা বলে, কিছু কমান, কিছু কমান।

তখন দুই নম্বর বউ বলে, যে-স্বামী এতদিন আপনারে এতকিছু দিছে আপনি সেই স্বামী নিয়া দর কশাকশি করেন! ঠিক আছে, আপনার কান্নাকাটির জন্য এক লাখ ছাড় দিলাম। কিন্তু দুই লাখ টাকার এক পয়সা কম দিলে আমি স্বামী নিমু।

তখন ইব্রাহিম আর তার আম্মা টাকার চিন্তায় পড়ে। ইব্রাহিম বলে, তোমার একটা ডিপিএস আছে না, সেই টাকা উঠাও। ডিপিএসের কথায় ইব্রাহিমের আম্মা খ্যাক কইরা ওঠে।

তখন ইব্রাহিম বলে, পরে আম ছালা দুইটাই হারাবা। আব্বা তো কয়বছর পর পেনশন পাইব, তখন ওই টাকা দিয়া পোষায়া নিও। এইসব কান্নাকাটি বাদ দিয়া, তারে টাকা দিয়া, সাইন টাইন নিয়া তালাকের ব্যবস্থা কইরা ভাগায়া দেও। আর না হইলে সারা জীবন পস্তাবা।

তখন ইব্রাহিমের আম্মা তার ডিপিএস ভাইঙা দুই লাখ টাকায় দফারফা কইরা দুই নম্বররে ভাগায়।

দুই নম্বর বউ যাওয়ার এক সপ্তাহ পর ইয়াকুব পুলিশ বাড়ি আসে।

৩.
ইয়াকুব পুলিশ যেন ভিনগ্রহের জীব। একলা একলা থাকে, কী যেন ভাবে। তার সাথে বউ কথা কয় না, ব্যাটা কথা কয় না। দিন যায় রাত যায়। এমন একরাতে ইয়াকুব পুলিশ ডিউটি দিয়া বাড়ি আসে। তখন দেখে, ইব্রাহিম ঘরের ভেতর হাউমাউ করে কান্দে। ইয়াকুব ব্যাটার কাছে যায়, ব্যাটারে জিগায়, ক্যান কান্দো? এইবার ইব্রাহিম বাপের ওপর ঝাল ঝাড়ে, মনের খেদে বলে, তোমার জন্য আজ আমার এই দশা। তুমি আকাম কইরা বেড়াও আর আমি দেই তার খেসারত। ইয়াকুব স্থির চোখে ব্যাটার দিকে চায়, আবার জিগায়, কিসের অভিমান, কিসের দুখ? ব্যাটা কিছু বলে না। তখন ইয়াকুব ব্যাটার হাত ধরে আর তখন ব্যাটা ইব্রাহিম অভিমানে ভেসে যায় আর বলে, আব্বা আজ রাইতে সালেহারে বরপক্ষ দেখতে আসবে। ইয়াকুব স্থির চোখে ব্যাটারে দ্যাখে তারপর বলে, তুই কি সালেহারে চাস? ইব্রাহিম স্থির চোখে বাপরে দ্যাখে। ইয়াকুব বলে, চল তয় সালেহার বাড়ি।

পিতা-পুত্র মিলে রাতের আন্ধারে রাস্তা ধরে হাঁটা দেয়। তখন বাপ চুপ ব্যাটা চুপ। কেবল ঝিঁঝিঁ সরব। তখন বাপ বলে, জীবনে কেউ তার বন্ধু হয় নাই। এমনকি কর্মজীবনেও নাই। ক্যান হয় নাই তা সে জানে না। তয় বছর কয়েক আগে জেলখানায় এক কয়েদির সাথে তার দোস্তালি হয়। যে-কয়েদি তারে জীবনে প্রথম বন্ধু বানায় সে মার্ডার কেসের আসামি হয়া খাটতেছে যাবজ্জীবন সাজা। চর দখলের মারামরিতে তার সাজা হয়। খুন সে করে নাই। কেবল লম্বা শরীরটা তার সবার আগে দেখা যায়। আর সেটাই তার কাল হয়। সাজা হয় যাবজ্জীবন। জেলে যখন আসে তখন তার বাড়িতে ছিল এক ছেলে বয়স যার চার। তারপর দিন যায় মাস যায় বছর যায় সে ছাড়া পায় না। ছাড়া আর পাবেও না। তখন তার বউ আরেক জায়গায় বিয়া বসে। কিন্তু নতুন ঘরে ওই ছেলেটার জায়গা হয় না। সে থাকে তার দাদা দাদির ঘরে। তারপর দিন যায় মাস যায় বছর যায় ছেলেটার বয়স বারো বছরে পড়ে। আর তখনই একদিন জেলে খবর আসে ছেলেটার হার্টে একটা ফুটা আছে। এইবার চিকিৎসা না হইলে জীবন বাঁচানো দায়। টাকা দরকার দুই লাখ। কই পাবে এত টাকা? মার্ডার কেসের আসাসির ছেলের জীবন বাঁচাইতে কে দেয় এত টাকা! তখন ইব্রাহিমের আব্বা আরও বলে, জীবনে কেউ তারে কোনোদিন ডাক দিয়া সুখ-দুখের গল্প শোনায় নাই। সেও কোনোদিন কাউরে নিজের সুখ দুখের গল্প শোনাতে পারে নাই। আর তখন ওই আসামি তারে বলে, আমার পোলাটা মইরা গেলে দুনিয়ায় আর তার কোনো ওয়ারিশ থাকবো না। দুনিয়া তারে ছাড়ল না, আর মরণ তার পোলাটারে ছাড়তেছে না। দোস্তর সাথে এমন সুখ-দুখের আলাপে তার বুকটা মোচড়ায়। তার মন চায় দোস্তর ছেলেটারে বাঁচাইতে। আর তখন সে অসহায় হয়া পড়ে দুই লাখ টাকার কাছে। তারপর চোখ মুছে বলে, ছেলেটা এখন ভালো আছে। তখন ইব্রাহিম হাঁটা থামায় আর বাপের হাতটা ধরে। চারপাশ আন্ধার। আর খানিকপথ গেলে সালেহার বাড়ি। ইব্রাহিম বাপের চোখের দিকে তাকায়। আন্ধারে ঢাকা থাকে চোখ। তখন সে বাপের সিনার সাথে সিনা লাগায়া শক্ত হয়া বুকের ডিবডিব আওয়াজটা শুনে। আন্ধার আরও গাঢ় হয়া নামে। এত গাঢ় হয়া নামে যে, সালেহার বাড়ির রাস্তা আর দেখা যায় না।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj