হোম গদ্য গল্প বর্ষামাত্রিক

বর্ষামাত্রিক

বর্ষামাত্রিক
528
0

১.
আমরা এখন আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি পুরান ঢাকার দিকে। প্রায় পাঁচ শতকের বলা কিংবা না বলার টুকরো টুকরো ইতিহাস শহরের যে অংশ ধারণ করে আছে, আমাদের গল্পও যে এখানে এসেই, শরীরে লেগে থাকা জটমুক্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে; একদম বোঝা যায় নি। কে ভাবতে পেরেছিল তিন বছরেরও আগে ঘটে যাওয়া দক্ষিণবঙ্গের গহিন চরাঞ্চলের এক ঘটনার রেশ নিয়ে গল্পটা খোদ রাজধানী ঢাকায়, ব্যস্ততায় এসে ভিড়বে!

নানান সাবধানতা মাথায় রেখে চললেও যেমন অনেক আশ্চর্য ঘটেই যায়, তেমনি আনকোরা জেলা সদর, বন্দর এলাকা, অজগ্রাম, নতুন গড়ে ওঠা কিছু নগর আর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গলি-মহল্লার হরেক অজানা অংশে ইঁদুর বিড়াল খেলার শেষ দেখতে বাধ্য হয়েই অনেকটা, আসতে হলো ঢাকায়।

চানখারপুল এলাকা।

খরতপ্ত মধ্যদুপুর।

ঝাঁ ঝাঁ রোদ আগুন ঝরাচ্ছে, প্রখর তাপ সরাসরি আঘাত করছে নগ্ন মস্তকে। পুরান ঢাকার ভাষায় চান্দিছিলা গরমের সময়টাতে স্থবির প্রায় জীবনের প্রদর্শনী চলছে রাস্তাজুড়ে।

এ রাস্তা ইতিহাসের, একদিন এখানেই চলেছে মানুষে টানা রিকশা, ভ্যান, গরুর গাড়ি; ঢাকাই নবাবদের বাবুয়ানা ফিটন বা হাম্বার গাড়ি অথবা তারও আগেকার প্রতাপশালী রাজাদের হস্তিযূথ। আর এখন চলছে টেম্পো, বাস, রিকশা, গাড়ি, সিএনজি, ট্যাক্সি ক্যাব; কালেভদ্রে দু’ চারটে আদ্যিকালের ঘোড়াগাড়ির দেখাও মেলে—সব মিলে হ-য-ব-র-ল দশা একদম। চানখারপুল মোড় থেকে হোসনি দালান বরাবর যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেই আগা সাদেক রোড ধরে লোকটা আগাতে থাকে।

বার দু’ তিন ডানবামে গলি বদল করে সুকু মিয়া লেনে পা ফেললে কিছুদূর বাদে দেখা মেলে বেমক্কা নোংরা এক গলির, নর্দমার পানি উপচে উঠে চারপাশ ভেসে যাওয়া গলিমুখটা এত ছোট যে সিএনজি যেতেও কাঠখড় পোড়াতে হয়। ঢাকা শহরটাকে একটা ইট পাথরের চলমান কারাগার মনে হয় বলে খুব বেশি এখানে আসে না সে, আর পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় আসার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই ঠিকানা জানা থাকলেও খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয় তার।

কাউকে এইসব ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা মানে অনর্থক বিপদ ডেকে আনা, ‘উদ্দেশ্য যথাসম্ভব গোপন রাখা’ এ ধরনের কাজের প্রথম শর্তই এই। যে যত দ্রুত শিখতে পারে, ততই তার মঙ্গল। বেশ অস্থিরতা নিয়ে আশপাশের প্রায় একই রকম আরও দুটো ছোট গলিতে ভুল করে চক্কর মারল সে।

অবশেষে রাস্তার ডান দিকে গণেশের সেলুন আর রাজনের মুদি দোকান পার হয়ে সামনে মিলল একটু বড় গলিটা। গলির শুরুতে দুটো বহু পুরনো বাড়ি দেখে সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।


 ভরা বর্ষার জোগানে নদীতে জেগেছে যৌবন, মাছেরাও পেয়েছে নতুন জলের স্বাদ। 


এলাকার লোকেরা বলে ওদুটো বাড়ি নাকি ব্রিটিশ আমলে তৈরি। হতেও পারে আবার নাও পারে, জানা নেই সালতামামি। তবে এটুকু নিশ্চিত বলা যায় এরা বহু পুরনো, কালের সাক্ষী। ওদের ভগ্নদশা দর্শনার্থীদের আহত করে, খসে খসে পড়ে গেছে কতেক আস্তর, চুনকাম উঠে গেছে, এমনকি কার্নিশের দিকে গজিয়ে গেছে ছোট কিছু গাছ। পুরনো পোড়োবাড়ির মতো বাড়ি দুটোর শেষটায় রয়েছে রজব আলী।

লোকটাকে খুব দরকার মুসা মিয়ার। মুসা মিয়াকে আজকাল লোকে নুলা মুসা বলে জানে।

দুপুর সময়ে রজব আলীর বাড়িতে থাকার কথা না।

এটা তার জানা আর জেনেবুঝেই সময় ঠিক করে নেয়া, তবুও নিশ্চিত হতে দরজায় কড়া নাড়ল। প্রত্যাশা মাফিক মিলল না সাড়া। বন্ধ দরজাকে কী করে সুবিধা মতো খোলতাই করতে হয় ভালোই জানা আছে তার। হাতসাফাইয়ের খেলের মতো ম্যাজিক হল যেন, খট করে শব্দ শোনা গেল আর খুলল দরজাটা।

গাঢ় কাপড়ের পর্দা টানা রয়েছে জানলায়, এত পুরু যে আলোর টিকির দেখাটিও মেলে না ছোট্ট দু’ কামরার ঘরটাতে।

ঘরটা বেশ কিছুকাল ব্যবহার হচ্ছে না, এমন মনে হলো লোকটার। কেমন গুমোট আর বদ্ধ; ভ্যাপসা ভাব, বিছানাপত্র থেকেও আঁশটে গন্ধ বের হচ্ছে। ভেতর থেকে দরজা ভিজিয়ে লোকটা তালা বন্ধ করে দিল।

এরপর শুধুই অপেক্ষা।

দীর্ঘ অপেক্ষা।

রুদ্ধ নীরবতায়। চাপা অন্ধকারে।

অপেক্ষা কিছু রক্তের।

অপেক্ষা আরেকটি খুনের।

আর এ অপেক্ষা মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তির নাম।

হাবিলের জন্যে কাবিলের গুহায় লুকিয়ে থাকার মতোই দীর্ঘ ও অসহ্য।

২.
ছলাৎ ছল।

খেলছে জলের তরঙ্গ চিন্তাহীন শৈশবের মতো।

আরও কিছু জলকাটা ঢেউ ভেসে আসে অকস্মাৎ। ভরা বর্ষার জোগানে নদীতে জেগেছে যৌবন, মাছেরাও পেয়েছে নতুন জলের স্বাদ। কী অদ্ভুত সুন্দর রূপো মাখা জল, সন্ধ্যা নেমে এসেছে বলে বোঝা যাচ্ছে না। দিনের আলো থিতিয়ে এলেই আশ্চর্য এক আভা নিয়ে জ্বলে উঠবে ওরা, চিকচিক করে জানান দেবে—এখন বর্ষা। জল কেটে কেটে কেমন একাকী বয়ে চলছে মাছ ধরা ছোট্ট একটা নৌকো।

খর্বাকার নৌকায় ছাউনি নেই, থাকার কথাও নয় স্বাভাবিকভাবেই। গরিব জেলে হাবিজুলের এ নৌকা যাত্রী পারাপারের জন্য মাঝ নদীতে ভাসছে ব্যাপারটা তেমন নয়, মাছ ধরাই লোকটার জীবিকা।

ছাউনি দেয়া আরও বড় নৌকা হলে সুবিধা হতো বেশ; বড় জাল বাইতে পারত, বেশি মাছের স্থান হতো নৌকোতে—দরকার হলে আরও দূরে, বিষকাঁটালি নদী ছাড়িয়ে দরিয়ার কাছাকাছি চলে যেত। চমকপ্রদ কত কিই না হতো, ভাবতে ভাবতে হাবিজুল দিবাস্বপ্নে ডুবে নাক ডাকতে থাকে…

রাতে কড়কড়ে ইলিশ ভাজার সাথে দুটো মরিচ পোড়া, তেলে টেলে নেয়া একটু পেঁয়াজ আর ঘন করে রাঁধা মুগের ডাল—আহা জম্পেশ এক বেহেশতি খানা খেয়ে ঘুমের ঘোরে পরম সুখের খোয়াব দেখছে হাবিজুল; ওইখানে দারিদ্র্য নেই আর। খোয়াবের হাবিজুল ট্রলার মালিক বলে কথা; সাত চরের লোকেরা আসা-যাওয়া করে তার ইঞ্জিনের সাম্পানে। দিবাস্বপ্ন শেষে হেসে ফেলে সে, এসব শুধুই স্বপ্ন, অলীক—বাস্তব ছোট এই কোষা নৌকাটা, বছর দুয়েক আগে কেনা।

নিজাম মোল্লার নৌকায় হাবিজুল বর্গা দিয়েছে কত কাল, দশটা বছর চেয়ে চেয়ে দেখেছে কেমন করে তাকে ঠকানো হচ্ছে মিথ্যের বেসাতি দিয়ে। বর্ষায় যখন মাছের ঝাঁকে থই থই করে নদী, রোদ্দুরে ইলিশের আঁশে সোনা খেলে যায়; নিজাম মোল্লা তখন আশ্চর্য দক্ষতায় কপটতার আশ্রয় নেয়। নির্লজ্জ মিথ্যাচার চলতে থাকে, আগের মৌসুমের চেয়ে মাছ কম ধরা পড়ার আষাঢ়ে গল্প ফাঁদে, অনেক টাকা ক্ষতির অজুহাত দিতে থাকে আর মন ভেজানো অভিনয়ে কামলাদের টাকা কম দেয়ার বায়না ধরে।

নিজাম মোল্লার ঘরে দুপুরে যখন কালিজিরা চালের পোলাও, গরুর সিনার মাংসের ভুনা আর ইলিশ ভাজা হয় তখন হাবিজুলের মাথায় রক্ত চড়ে যায়, প্রবল ঘৃণা ছেয়ে ফেলে ওকে। মনে হতে থাকে, ওই রান্না অপবিত্র; ওতে শরীর থেকে চুষে নেয়া রক্তের দাম লেগে আছে। সত্যিই বোধহয় তাই, হয়তো ওই রান্নায় শ্রমিকের রক্ত ও ঘামের সাথে অনেক প্রতারণার গল্প মিলে মিশে একাকার।

নিত্যদিন মুখ বুজে সয়ে যাওয়া অন্যায়, আর সেই হাবিজুল—এখন নিতান্তই অতীত। ভারবাহী গাধার মতো দশ-দশটা বছর পিঠে চাপানো অসভ্যতার গল্পকে কবর দিয়েছে সে, তাই এখন নিজের নৌকাতেই লিখতে থাকে দিন গুজরানের গল্প। কঠোর শ্রমকেও গায়ে না মেখে লোকটা ফি বছর বর্ষায় পাড় ভাঙানো দেমাগি জলের কাছে জীবন বন্ধক রাখে।

মাছ ধরতে ব্যয় করা দিন ও রাতগুলোর জমাখরচের খাতায় মাছ ও তার দামের হিসেবে মিললেও মেলে না নিয়ম করে চলা যম মানুষে টানাটানির খেলার সংবাদ। শরীর ভেঙে আসে, গা গরম হয়, হাত পা বিষ করতে থাকে; তবুও জীবিকার সন্ধান বন্ধ হয় না। কদিন বিশ্রাম শেষে হাবিজুল আবার নৌকা জলে ভেজায় অনেক আশা নিয়ে।

শাখা নদী পানগুছি গিয়ে ভাটিতে যে বিষকাঁটালি নদীর সাথে মেশে সেখানে জোয়ারের সময় এপার আর ওপার যেন ভুল করে মিশে যায় কূলের আলিঙ্গনে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে পারাপারের দূরত্ব ঠাওর করতে, মনে হয় যেন দরিয়া হা করা কুমিরের মতো এগিয়ে আসছে লোকালয় গ্রাস করতে।

দিন দুয়েক আগে হাবিজুল নতুন আলকাতরা লাগিয়েছে খোলে, নৌকার মেছো গন্ধ ঢেকে দিয়ে সেটা উপস্থিতির জানান দেয়। শহর থেকে একটা কাজে আসা সাংবাদিক রাশেদ সাহেবকে সেই গন্ধ কিছুটা বিরক্ত করছে। অনেকটা সময় অভুক্ত রাশেদ উদ্দিনের মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে আলকাতরার উৎকট গন্ধে। হাবিজুলকে কিছুটা অনুনয় করেই জিজ্ঞেস করে সে—

ও ভাই, ঘাঘরঘাঁটা আর কত…

ওইখানে রাতে কি কোনো থাকার জায়গা আছে?

হাবিজুল মিনিট কয়েক বাদে উত্তর করে রাশেদ সাহেবকে কিছুটা নিরাশ করেই—

আন্ধারে তো দেখতেয়াছি না কিছু, হেয়া মুই কেমনে কমু…

তয় মনডা কইতে আছে আরও ঘণ্টা দুই লাগবে আনে। সামনে তো কোনো নাও ও দ্যাখতে আছি না।

রাইতে থাকনের ব্যবস্থা আছে কিনা এইডা তো মুই কইতে পারমু না।

যাত্রাপথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি বা আরও সমস্ত উৎকণ্ঠা আর রাত্রিযাপনের সম্ভব-অসম্ভবের গল্প, সবই বছর তিনেক আগের কথা। রাশেদ উদ্দিনের এখানে আগমন অফিসের কাজে। বর্ষাটা সে বছর ভালো যায় নি একেবারে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে শোনা জেলায় জেলায় ভারি বন্যার শঙ্কা সত্যি হয়েই দেখা দেয় আর সাগরের খুব কাছে দক্ষিণাঞ্চলের এ এলাকা মোটামুটি নিয়মিতই প্লাবিত হয়। তুমুল বন্যায় বানভাসি লোকেদের অবস্থা, সেখানে ত্রাণ ঠিকঠাক পৌঁছল কিনা এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরিতেই রাশেদের ওখানে যাওয়া।

দুর্গম আর অপ্রতুল যাতায়াত ব্যবস্থার এলাকায় দেরিতে আসা উচিত না হলেও ঢাকা থেকে ফিরোজপুর আসতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। বেলা সাড়ে তিনটেয় জেলার চারপাড়া মোড় থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে নেবার পর ঘাঘরঘাঁটা থেকে ট্রলারে উঠে নাজিরাবাদ ইউনিয়নে; বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি যেখানে পৌঁছায়।

আগে থেকে যোগাযোগ করে রাখায় হাবিজুলের দেখা মেলে, তার নৌকায় করে বন্যার অবস্থা দেখতে যায় আর যে ধারণা নিয়ে সে এসেছিল অবস্থা তার চেয়ে অনেক খারাপ হওয়ায় চিন্তা বাড়ল রাশেদের। স্কুলঘর আর মসজিদ এতদিন লোকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করেছে, এখন ও দুটোতে গেলে দেখা যায় কোমর সমান পানি। সব দেখে শুনে, প্রয়োজনীয় ছবি ও তথ্যাদি নিয়ে ঘাটে ফিরতে দেরি হলো বেশ, ফিরে এসেই বুঝতে পারল ঘটেছে বিপত্তি।

একটু আগেই ছেড়ে গেছে শেষ ট্রলারটা।

সন্ধে তখন ঘোর। চারপাশের বিস্তীর্ণ জলে গুলে গেছে কালি, এক অন্ধরাত…

আজ রাতে আর কোনো ট্রলার নেই। কাল সকালে যেতে হবে। এমন অবস্থায় হাবিজুলকে অনুরোধ করল যদি কষ্ট করে একটু ঘাঘরঘাঁটা পৌঁছে দেয়। হাবিজুল রাজি হয়ে যায়, যদিও বৈঠা বাওয়া এই সামান্য কোষা নৌকার জন্যে এখন বর্ষায় তো বটেই, শুকনোর সময়েও এ এক দীর্ঘযাত্রা—বিশেষ করে যখন ভাটার টান লাগে। বন্যার্ত লোকটার উপর উটকো ঝামেলা হিসেবে চেপে বসায় নিজের কাছেই খারাপ লাগতে থাকে রাশেদ উদ্দিনের।


এখনো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসে নি পুলিশের কাছ থেকে, তাই জোর দিয়ে বলা মুশকিল যে এটা খুন, তাই এখন অব্দি যা প্রচার হয়ে আছে সেটাই আপাত সত্য—এ এক আত্মহত্যাই।


৩.
ডেটলাইন ০৩ জুন, ২০১৭।

রাশেদউদ্দিনের জন্য আজ এক স্মরণীয় দিন।

এদিনটার জন্য সপ্তাহখানেক ধরে অপেক্ষা করছিল। দৈনিক চোখের আলো পত্রিকায় তিন পর্বের ধারাবাহিক হিসেবে তার করা তদন্ত প্রতিবেদনের প্রথম অংশ বের হবার কথা। তদন্তের বিষয়টা মাদক সংক্রান্ত। খোঁজ নিয়ে দেখেছে রাজধানীসহ দেশের সব জায়গাতেই তরুণ যুবকদের হাতে হাতে ইয়াবার জোগান।

ফার্মেসিতে গিয়ে কনডম কিনতে চাইলে বয়সভেদে তবু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় কিন্তু তার চেয়েও সহজে মেলে ইয়াবা; একেবারে প্রশ্নহীন, ঝামেলাহীন। কিনতে হলে বাইরে যাবার দরকার পরে না, ফোন দিলে আশেপাশের দালালরাই ঘরের কাছে চলে আসে, নিচে গিয়ে নিয়ে এলেই হলো। ইয়াবার ব্যাপক বিস্তার, নেশার সহজলভ্যতা, কারা এর মূল হোতা এসব নিয়ে গত দু’ মাস খাটাখাটি করে তৈরি হয়েছে লেখাটা। সকাল হতেই বেশ উত্তেজনা চেপে বসেছে রাশেদের মাথায়।

দরজার নিচে আজকের কাগজটা পড়ে আছে কিনা, বেশ ক’বার দেখে যায় রাশেদ, যদিও তখনো পত্রিকাওয়ালার আসবার সময় হয় নি। বারান্দায় বসে অস্থির চিত্তে লোকের চলাফেরা দেখতে থাকে রাশেদ। সকালের স্নিগ্ধতা আস্তে আস্তে মলিন হচ্ছে, ধুলো আর ধোঁয়া কথা বলে উঠছে; বিবিধ লেনদেনে সরব হয়ে উঠছে মহল্লাগুলো। বাড়ির সামনে শাকসবজির ভ্যানগাড়ি বেশ কয়েকটা আর একটিতে সাজানো রয়েছে মুরগির ঝাঁক। মুরগিওয়ালা কিছুক্ষণ পরপর হাঁক ছাড়ছে এই মুরগি মুরগি, মুরগিইইই মুরগগগ…

ভ্যানে করে নিয়ে আসা তরতাজা তরিতরকারি দেখে রাশেদের হুট করেই ছেলেবেলার কথা মনে আসে, মাঠ ভর্তি সবুজের মিছিল।

এত রকম সবুজের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কাঁদা মাখা পা, চিত্রা নদীতে আদুল গায়ে লাফিয়ে পড়া, বাড়ি থেকে একটু দূরে জোড়পুকুরের ধারে গোসলের সময়ে লুঙ্গি দিয়ে বন্ধুদের সাথে বেলুন ফোলানো খেলা—কত শত স্মৃতি মনে আসতে থাকে একটা অব্যক্ত বেদনা সঙ্গী করে। ওরা মনে করিয়ে দেয় বিশ বছর হয়েছে প্রায়, গ্রাম ছেড়েছে তার পরিবার। গত পাঁচ বছরে একবারও যাওয়া হয় নি চিত্রার বুকে। অথচ সাংবাদিক হিসেবে দেশে ও দেশের বাইরে কত জায়গাতেই না তাকে যেতে হয়েছে।

‘ভাইজান পেপার দিয়া গেছে’—কাজের বুয়ার ডাকে বুকটা যেন কেঁপে উঠল রাশেদের। প্রতিটি রিপোর্ট কিংবা সম্পাদকীয় নিবন্ধ ছাপা হলেই মনে হয় পরীক্ষা দিচ্ছে—নিজের কাছে, প্রতিষ্ঠানের কাছে। লেখাটা কেমন হলো, লোকে কী বলল, এ নিয়ে চিন্তা সবসময়। অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল পুরো লেখাটা। এরপরে তুষ্ট মন নিয়েই পাতা উল্টাতে শেষ পাতায় ছোট্ট করে লেখা এক সংবাদে চোখ আটকে যায়। শিরোনামটা এমন ‘ইউ পি চেয়ারম্যানের আত্মহত্যা: নাজিরাবাদে আতঙ্ক’।

নাজিরাবাদ নামটা চেনা চেনা মনে হয় কেমন। ওই এলাকার কথা আগে কোথায় শুনেছে মনে করার চেষ্টা করতেই একটু পরে স্মরণে এল ঘাঘরঘাঁটা, ফিরোজপুর থেকে দুর্গম চরাঞ্চল নাজিরাবাদ ইউনিয়নে যাবার কথা। সেখানে বন্যার্তদের নিয়ে রিপোর্ট করেছে দৈনিক মতান্তরে বছর তিনেক আগে। চেয়ারম্যান জয়নাল মাহতাব এলাকায় ছিল না তখন। তার লোকেরাই নিয়ে যাবার জন্য মাঝি হিসেবে হাবিজুলকে ঠিক করে রেখেছিল।

আচ্ছা, চেয়ারম্যান কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছে? অন্ধরাত যে আশ্চর্য সব উপাখ্যান লেখার পক্ষে খুব ভালো একটা সময়, সে কথা জানা আছে রাশেদের, এখনো সে রকম দু’একটা ঘটনা জ্বলজ্বল করছে স্মৃতিতে। রহস্যের গন্ধ পেলেই শিকারি কুকুর হয়ে ওঠার পুরনো শখটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে রাশেদের।

খোঁজ লাগানো দরকার ভাবতে ভাবতেই দৈনিক চোখের আলো থেকে ফোন। সম্পাদক অভিনন্দন জানিয়ে বলল, রিপোর্টটা খুব দরকারি ছিল। পুলিশ কমিশনার ফোন করে জানিয়েছে ব্যবস্থা নেবে তারা। সাঁড়াশি অভিযান চলবে নাকি আগামী দিন দশেক। কিন্তু অভিনন্দনের বিষয়টা নিয়ে কথা দীর্ঘ না করে রাশেদ প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল—

আচ্ছা নাজিরাবাদের ইউপি চেয়ারম্যানের আত্মহত্যার রিপোর্টটা কে করেছে বলতে পারেন?

—ওই যে মোশতাক জহির। কেন বলুন তো?

না, মানে… আসলে ওর সাথে কথা বলা গেলে একটু ভালো হতো।

—আচ্ছা, বলবেন। কী বিষয়?

আসলে, বছর কয়েক আগে নাজিরাবাদে বন্যার উপরে রিপোর্ট করতে গেছিলাম। জায়গাটার কথা শুনে তাই স্বাভাবিক কৌতূহল হলো…

আরও মিনিট পাঁচেক কথা হলো সম্পাদকের সাথে। কথায় কথায় রাশেদের মনে সুঁই হয়ে বিঁধতে থাকা সন্দেহের কথা জানায় তাকে। যদিও বন্যার সেই রিপোর্ট করতে গিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ হয় নি তখন, তাই বলা মুশকিল লোকটা কেমন; কিন্তু তবুও ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে, যে লোকের সংসারে নতুন বউ আছে, আছে দু’টো মেয়ে—তার আত্মহত্যা, তাও নিজের গলা কেটে; কেমন অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা পুরো ব্যাপারটা। বিশ্বাস করা একটা বালকের জন্যেও কঠিন।

সম্পাদক ভদ্রলোক অফিসে মোশতাক ফিরলেই তাকে রাশেদের সাথে যোগাযোগ করবার কথা জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। সমস্ত ঘটনাটা ভাবার জন্যে হাতে বেশ কিছু সময় আছে। এখনো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসে নি পুলিশের কাছ থেকে, তাই জোর দিয়ে বলা মুশকিল যে এটা খুন, তাই এখন অব্দি যা প্রচার হয়ে আছে সেটাই আপাত সত্য—এ এক আত্মহত্যাই।

অস্থির পায়চারি করা রাশেদ জহিরের ফোনের অপেক্ষায় থাকে আর একথা ভেবে সাময়িক স্বস্তি পায়—দিন দুয়েকের মাঝেই জানা যাবে, এটা আত্মহত্যা নাকি খুন। যদিও দশজনের নয়জনই বিষয়টাকে সাধারণ বলে উড়িয়ে দিত, ঘটনাটা একেবারে হেলদোল বিহীন রোজকেরে সংবাদে পরিণত হতো বাকিদের বেলায় কিন্তু রাশেদের জন্য তা নয়, আর তাই তার ভ্রু কুঁচকেই থাকে, সোজা হয় না এই সুন্দর সকালে…

৪.
মেঘ গুড়গুড় শোনা যাচ্ছে প্রবল আড়ম্বরে, কী প্রচণ্ড হুঙ্কার তার বজ্রনির্ঘোষে! সমস্ত আকাশ এখন কালিময় আঁধারে ঢেকে রেখেছে নিজস্ব নগ্নতা।

রাত্রি দশটা।

ঘুটঘুটে অন্ধকার।

বিকেলের মেঘগুলো ছিল ঠিক পেঁজাতুলার মতো মিহি, দেখে রাশেদউদ্দিনের মনে হচ্ছিল বিশাল ক্যানভাসে আঁকা ভ্যানঘগের তুলিতে সদ্য শেষ করা কোনো তৈলচিত্র, ঝুলে আছে আকাশের ওপাশে। রাত নামায় দেখতে না পেলেও রাশেদ উদ্দিন ধারণা করতে পারে ওগুলো জীবনের শেষ পর্যায়ে এখন—প্রভূত শ্রম দিয়ে একটু একটু করে পোয়াতি নারীর মতো বাড়িয়ে তোলা ওদের পেটের ‘পরে জমে থাকা আগ্রাসী জল আর উগ্র বিদ্যুৎ ছড়িয়ে যাবে সর্বত্র। যারা বহু দূর থেকে ভেসে ভেসে এসেছিল এই রূপোজল পানগুছির ঠিক উপরে, ওরা খুব ভালো জায়গা বেছে নিয়েছে, শেষ হয়ে মিলিয়ে যাবার উৎসবটুকু বৈচিত্র্যপূর্ণ করার জন্যে।

মেঘগুলোর শেষ প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল কিছুক্ষণের মাঝেই। হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে আসা চারপাশে বড় বড় ফোঁটায় ঝরতে শুরু করল বৃষ্টিধারা। বৃষ্টির সময়টাতে নদীর বুকে প্রবল উথালিয়া নৃত্য যে কারো বুকে কাঁপন ধরাতে যথেষ্ট। এই অসময়ে নদীতে থাকা কোনো দুঃসাহস নয় বরং বোকামি। এই বোকাটে দশায় আবিষ্কার করা গেল একটা ছোট কোষা নৌকায় সাংবাদিক রাশেদ আর তার মাঝি হাবিজুলকে।

দুজনেই জবুথবু হয়ে এক ছাতির নিচে আশ্রয় নিয়েছে। ছাতিটি তত বড় নয় যাতে বৃষ্টিজলের ছোঁয়াচ থেকে দু’জনেই বাঁচতে পারে। তবু যা হচ্ছে তাও ঢের; গায়ে বৃষ্টিছাঁট গড়িয়ে পড়লেও মাথা বেঁচে যাচ্ছে এও কম নয়। তাদের নৌকো অবশ্য ভেজানো আছে বড়সড় এক বালু বোঝাই জাহাজের পাশ ঘেঁষে। ওটার জন্য বৃষ্টির একেবারে ভিজিয়ে দেয়া মুষলধারাটা ওদের গায়ে কমই লাগছে।

জাহাজটা হঠাৎ চরায় আটকে গেছে। ছাড়তে জোয়ার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জাহাজের লোকেরা ভাটার সময় বলে ছেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। নিস্তব্ধ জাহাজে কাকপক্ষীরও রা নেই, শুধু আছে নদীর আছড়ে পড়ার শব্দ। জাহাজের সারেং বা অন্যান্যরা হয়তোবা আশ্রয় নিয়েছে চরের কোনো এক গেরস্ত বাড়িতে। রাশেদ সাহেব হাবিজুলের কাছে এরকম ভয়ংকর বৃষ্টিতে মাছ ধরার কথা শুনে চোখ কপালে তুলে বলল—

এই অবস্থায় আপনি মাছ ধরেন? কেমনে পারেন ভাই!

আপনে কি পাগল নাকি। হোলি শিট!

হাবিজুল হাসতে থাকে, মুচকি হাসি। হাসিতে লজ্জার ছাপ ফুটে উঠতে থাকে। রাশেদ ওর হাসি অগ্রাহ্য করে ফের প্রশ্ন করে—

আপনার নৌকায় তো চালা নাই। আপনের ঠান্ডা লাগে না?

এইরকম বিচ্ছিরি বৃষ্টিতে দুইদিন ভিজলে তো নিউমোনিয়া হয়ে যাবে।

—মোর নাওতে তো আগে চালা আছেলে। এই নাওখান তো বেশিদিন অয় নাই, আগে তো মোল্লা সাবের বান্ধা কামলা আছেলাম। সন্ধ্যার সময় আজান দেওনের পর অইতে হারা রাইত মাছ ধইররা বেইন্যা কালে ফেরতাম।

সারারাইত মাছ ধরতেন? কন কি ভাই আপনে, সবসময়?

—হ। মাইঝ রাত্তিরে নাও বাইলে জালে মাছ ওডে বেশি। হের লাইগা মোল্লা সাইবে রাইতেই যাইতে কইতে। মাঝে মইধ্যে আচুক্কা বৃষ্টি নামলে চালার তলে বইয়া রইতাম। তয় ঝপঝপাইয়া পড়তে থাকলে কিচ্ছু হরার থাকতে না, জাল তো বাইতেই অইবে।

কিন্তু এখন তো আর উনার হয়ে কাজ করছেন না, এখনো কি রাতে মাছ ধরেন?

—এহন রাইতে আর মাছ ধরি না। চোহেও তো দেহি না ভাল কইররা। গেরামের মানুরা মোরে দেখলেই জম্মের প্যানা পোডে, পোডতেই থাহে। ডাইক্কা কইতে থাহে ‘ওই হাবিজুইল্লা, চোহে চশমা লাগাও না ক্যা, আ? চশমা লাগা হালার পো হালা। ফুট্টুত কইররা কোনদিন আন্ধা হইয়া যাবা, হেইদিন বোঝবা আনে’।

এহ চশমা লাগামু, ডাক্তারের টাহা, রুপাকাঠি হাডে যাওনের ভাড়া কি তুমি দেবা আনে চোদনার পো।

গালির বিপরীতে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় গালি দিয়ে বসে হাবিজুল। আর গালিটা দিয়েই বেশ লজ্জা পেয়ে ইতস্তত কণ্ঠে বলে উঠল—

মাফ কইররেন স্যার। গাইয়া মানু তো, গাইল বাইরাইয়া গেছে। নিজ গুনে মাফ কইররেন।

না না ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নাই।

হেসে বলে রাশেদ উদ্দিন। তারপর কণ্ঠে গুরুত্ব ঢেলে বলে ওঠে—

কিন্তু আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত আসলেই। শেষে চোখ নষ্ট হইলে কেমনে হবে। মাছ ধরবেন কেমন করে?

প্রশ্নের উত্তর এক কথায় শেষ হয় না, যে দীর্ঘ উত্তর আসে তার প্রতিউত্তর করা খুব সহজ ব্যাপার হয় না তার জন্যে।

টাহা পামু কই কন, মাস ছয় আগে ফট কইররা একদিন চশমাডা গেল ভাইঙা। মুই দিন আইন্না দিন খাওইন্না মানু।

এউক্কা চশমা কেনতে লাগবে মনে করেন কম কইররা হইলেও আড়াইশোউগগা টাহা। ঘরের মাতারিগো, বালবাচ্চার প্যাড ভরাইতে পারি না, আবার চশমা! গরিবের ঘোড়ারোগ।

মুখ ভেংচি দিয়ে হাবিজুল কথা চালিয়ে যায়—

গেল দুইবার জোগার পানি ঘরে আইতে আইতেও আহে নাই। এইবার রেহাই নাই, নিজেই তো দেইক্কা গেলেন। ঘরে নতুন দেইখ্যা চাল ছামু, না  চশমা কিনমু?

হাবিজুলর দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অবশ্য রাশেদের কানে পৌঁছায় না।

নিচ থেকে যে জলের নাচন চলছে তাতে দুলে দুলে উঠছে নৌকাটা। আর বর্ষাধারা বয়ে চলেছে অশেষের সংগীতে। সমুদ্র গভীর তার শব্দ। ভুলিয়ে দেয় জাগতিক যাপনের সমস্তটুকু।


সালাম রজব সাব, ওঠেন, ঘুম থেইকা ওঠেন। অহন আর লোহাগড়ায় গ্রামের বাড়িতে নাই আপনে। আপনের লাইগা কব্বরের আজাবের দিন আইজ।


৫.
খুটখাট শব্দ।

দরজার তালা খুলছে কেউ একজন।

মাথাটা কোনোমতে ঢোকাতেই নেমে এল ত্বরিত আঘাত, পেছনের দিকেই। তেমন ভারি কিছু নয়, সাধারণ একটা খোন্তা, রান্নাঘর থেকেই নিয়েছে মুসা মিয়া। বেশ ক’বার উপর্যুপরি আঘাতের পর জ্ঞান হারাল রজব আলী।

পুরোটা সময় অদ্ভুত সাবধানতায় ছিল লোকটা। সিঁড়িতে পদশব্দ শোনা গেলেই যেন রক্তে ছিলকে উঠছিল উত্তেজনা, দমক মেরে যাচ্ছিল পাশবিকতা। যে ঘরের বাসিন্দা একজন মাত্র, সেখানে চাবি মেরে খুটখাট শব্দেই দরজা খোলে সবাই। রোজকার অভিজ্ঞতায় কারো আশ্চর্য হবার কথা নয়, ভেতরে সমস্যা ওত পাতা এমন বিষম ধারণা মনেও আসে না; বাইরে থেকে যখন সব ঠিকঠাক। কিন্তু দরজা খুলে এই যে শেষবারের মতো রজব আলীর সাত রওজা রোডের তিনতলা বাড়িটার বদ্ধ খুপরিতে প্রবেশ, ভাবে নি হয়তোবা মহাকালও।

দীর্ঘ আট ঘণ্টা তেইশ মিনিটের অপেক্ষার অন্তিমে মোক্ষম সময় এল। একটানা অপেক্ষায় মুসার শরীরে ঝিম ধরে যায়, তবুও তার মন ছিল পাথরের মতো ঋজু। অদ্ভুত স্থৈর্য নিয়ে বুকের গহিনে লুকানো বিষের চাষ করছিল লোকটা। কম তো নয়, তিনটে বছর ধরে চাষ করা বিষ। এতদিনের সাধনা বিফলে গেলে আসলে কিছু বলার থাকবে না তার।

সাধনা মানে শুধু আজকের এই সময়টুকু নয়। আট ঘণ্টা তো আজ, এই বখাটে দুর্গন্ধময় জঞ্জালখানায় অপেক্ষা। এর আগে প্রায় তিনটে বছর ধরে চলেছে ইঁদুর বিড়ালে খেলা। রজব আলীকে দেখে নেবার পরীক্ষায়, আজ পাশ করবেই করবে নুলা মুসা।

ধূর্ত মুসার চেয়ে রজব আলীও চালবাজিতে পিছিয়ে ছিল না। বারবার পিচ্ছিল বাইম মাছের মতো হাত ফসকে গেছে লোকটা। হিলি বন্দর থেকে রজব ওপারের দিনাজপুরে চলে গেল যেবার, সেবার অল্পের জন্য ধরতে পারে নি মুসা মিয়া। গত তিনমাসের মোটামুটি নিখুঁত পরিকল্পনার কথা ভেবে মুসা নিজেই আনন্দে গদগদ হয়ে যায়।

রজব আলীর মতো জাঁদরেল লোকের পিছে ভাড়াটে ছুঁচো লাগিয়ে রাখা, চাট্টিখানি কথা নয়। সাবধানী হরিণের মতো লোকটা জায়গা বদলায় আর খোলস পাল্টায়। গত ক’মাস সরাসরি তাড়া না করে পিছে টিকটিকি লেলিয়ে দেয়ার বুদ্ধিটা যে একটা মাস্টারপিস হয়েছে, সেটা বুঝতে পেরে সুখ সুখ অনুভূতি হয় মুসার।

দুপুরে মুসা মিয়া হাতসাফাইয়ের খেল দিয়ে ঘরে ঢোকার পর ঘরের বোটকা গন্ধে বমির উদ্রেক হয়। বিশ্রীরকমভাবে চারপাশ বদ্ধ করে রাখা ঘরটায় অপেক্ষা করা দুষ্কর সে বুঝতে পারে। সে জানত, রাতের আগে রজব আলীর ফেরবার কথা নয়। তাই ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিটা আটকে দেয়, আর তারপর ডান পা সোজা করে প্যান্টটা হাঁটুর অনেক উপরে তুলে আনে। প্রস্থেটিক লেগটা খুলে নেবার পর সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এতগুলো বছর হয়ে গেছে, তবু এই কৃত্রিম পা ব্যবহারে সে এখনো অভ্যস্ত হতে শেখে নি। পা টা খুলে রাখার পর সে আস্তে আস্তে জানলার দিকে যায়, পর্দাটা সাবধানে সরায়; ছিঁড়ে যাবার ভয় আছে। এরপর জানলাটা খুলে দেবার মিনিট পাঁচেক পর ঘরটা একটু শ্বাস নেবার মতো হয়। নুলা মুসা বাইরের দিকে সাবধানে নজর দেয়।

‘শালার বাইনচোত খবিশ’ এই বলে রজব আলীকে কষে গাল দেয় মুসা মিয়া। ঘরের নোংরা অবস্থা, নাকি প্রস্থেটিক লেগ লাগানোয় পায়ের মালাই চাকতির কাছে সৃষ্ট কুটকুটে অভ্যস্ত হতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে গালিবর্ষণ, একদম বোঝা যায় না। অপেক্ষার আটঘণ্টা তেইশ মিনিট সময়টাতে প্রায় আড়াই প্যাকেট গোল্ডলিফ শেষ করে নুলা মুসা, তার ক্রোধ আর অপেক্ষাজনিত ক্ষোভ সমস্ত যেন অনুবাদ হতে থাকে সিগারেটের সাথে।

সমস্তকিছুর সমাপ্তি রজব আলীর ঘরে প্রবেশের সাথে সাথে আঘাতে অজ্ঞান হওয়ায়। মুসা মিয়া করিতকর্মা লোক, সে জানে, সময় নষ্টের সময় নেই একদম। বিছানায় শুইয়ে রজব আলীর হাত, পা আর মুখ বেঁধে নেয়। পাংশুমুখো লোকটা দেখতেও কেমন বেঁটেখাটো। মুসার করুণার চোখ নেমে আসে শায়িত দেহে আর দেখা যায় চাউনিতে পরিমাণ মতো বিদ্বেষও লুকানো আছে।

মানুষকে নগ্ন করা মানেই সমস্ত মুখোশ খুলে ফেলা। সমস্ত অহংকার, আভিজাত্য ধুলোয় উড়িয়ে দেয়া। ন্যাংটা রজব আলীর অসহায়ত্ব দেখে মুসা হাসে। ভাবে এই অবস্থায় দেখে কে বলবে একসময় পুরো উত্তরবঙ্গ দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই পাগলাচোদা শালা। মোরশেদ শিকদারের খাসচামচা ছিল যে লোক, তাকে মারার কথা ভাবা! কোথাকার কোন এক মুসা মিয়ার! এও কি সম্ভব?

‘সময় কেমন কইরা কামড় খেলে, কেউ কইবার পারে না।

ওর হাতেই আমার মরণের কথা তিন বচ্ছর আগে আর আইজ ও মরতেছে আমারই হাতে। হা হা হা।

আল্লাহ্‌ বইলা কেউ আছে তাহলে সত্যিই। নাইলে মোরশেদ শিকদারের ফাঁসি হয়?’

মুসা ভাবে আর হাসে। হাসতে হাসতে তার হেঁচকি উঠে যায়। হেঁচকির শব্দে আরও হাসি আসে। যেন সুখে পাগল হয়ে গেছে।

সিগারেট ধরায় মুসা মিয়া। ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে যায়। আজ সে নুলা মুসা এই বাঞ্চত রজব আলীর জন্যে। পা কেটে ফেলতে হয়েছে, না হয় মরতে হতো অকালে।

কী শাস্তি দিয়ে মারা উচিত ভেবে পায় না, তবে মারার আগে খেলা করা দরকার, এ নিয়ে মনে প্রশ্ন নেই। ভাবতে ভাবতেই আরেকটা সিগারেট ধরায়, সাথে এক ছিলিম গাঁজা মিশিয়ে নেয়। ধোঁয়াটা ছাড়ে নগ্ন বন্দির ঠিক মুখের উপরে, বেশ কয়েকবার। কাশি দিয়ে জেগে ওঠে রজব আলী। হাত পা ছাড়ানোর চেষ্টার সাথে বদ্ধ মুখের গোঙানি চলতে থাকে সমান তালে। এর মাঝে শুরু হয় নুলা মুসার অট্টহাসিময় অপলাপ—

সালাম রজব সাব, ওঠেন, ঘুম থেইকা ওঠেন। অহন আর লোহাগড়ায় গ্রামের বাড়িতে নাই আপনে। আপনের লাইগা কব্বরের আজাবের দিন আইজ।

আরে আরে… চুপ করেন মেয়াভাই।

উহুহু উহুম… কথা কওনের চেষ্টা কইরেন না, আইজ খালি শুনবেন। আপনের ছবক লওনের দিন এইটা।

রজব সাব, আপনে কি জানেন মানুষের হাতের চামড়া সবচাইয়া পাতল। এই চামড়ায় যদি আগুনের ছ্যাঁক লাগে, এক্কেরে হগল শ্যাষ। মনডায় চায় হাতখান কাইটা ফালাই।

আপনে কি জানেন এইটা? মনে অয় না।

আহেন আপনেরে একটু জানাইয়া দেই। এইসব বিষয়ে জ্ঞান থাকন ভালা…

বলতে বলতেই রজব আলীর ডান হাতটা চিত করে সিগারেটটা চেপে ধরল সে। একের পর এক দাগ পরতে শুরু করল আর শুরু হলো চাপা গোঙানি। কিচ্ছু করার নেই রজব আলীর। চেয়ে চেয়ে দেখছে সমস্ত হাতের চামড়া থেকে গোল গোল ধোঁয়া উঠছে আর দাগ বসে যাচ্ছে বাটিক প্রিন্টের মতো। আর শুনতে পাচ্ছে নুলা মুসার আক্রোশ ভরা কথাগুলো—

শালা খানকির নাতি, তুই আমারে নুলা বানাইছস। মারতে চাইছিলি না? এখন দেখ কে কারে মারে। কে কারে বামন বানায় দেখ…

কয়েক ঘণ্টা ধরে নানান রকম নির্যাতন চালিয়েছে মুসা মিয়া। জীবনীশক্তি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে তার। ইতিমধ্যে বাম পায়ের হাঁটুর চাকতিটা নিপুণ দক্ষতায় কেটে নিয়ে পিটিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ভাঙা হয়েছে।

রাত তিনটে বাজতে চললে মুসা মিয়া সিদ্ধান্ত নেয় রাস্তা মাপার। যাবার আগে আরও মজা করতে ইচ্ছে করছে তার, মনে হয় জমছে খেলাটা, এমন আনন্দ বহুদিন মেলে নি। বাথরুমে এক বোতল হারপিক দেখেছিল আগেই, সেটা ব্যবহারের সময় এসেছে এখন। কাটাকুটি করা পা আর শরীরের বিভিন্ন অংশে ঢেলে দিল সমস্ত বোতল। রক্তের ভেতরে কেউ যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মনে হয় রজব আলীর। গোঙানোর শক্তি হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে সে।

মৃত্যু তার অপেক্ষাকৃত সহজ। এত এত নির্যাতনের পরে আসলে অবশিষ্ট ছিল না কিছু আর। তাই বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ তাকে মুক্তি দিল দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে। দু’কামরার বদ্ধ ঘরে প্রায় আটদিন নিথর হয়ে পড়ে থাকল লাশটা, গন্ধ ছড়ানোর পর মহল্লাবাসীর অভিযোগে পুলিশ এসে তদন্তের আগ অব্দি।

এককালে মোরশেদ শিকদারের বহু অপকর্মের সঙ্গী—খুলনা, যশোর ও নড়াইল অঞ্চলের ত্রাস রজব আলীর শেষটা এত সাদামাটা আর করুণ হলো যে, হয়তো অন্যলোকে বসে প্রিয় শিষ্যের অধঃপতন দেখতে দেখতে লোকটা খুব আফসোস করছে।

৬.
বছর তিনেক আগে ঘটে যাওয়া সেই মাতাল রাতের বেখাপ্পা ধরনের সাহসী অভিযানের কথা মনে করতে চেষ্টা করে রাশেদ উদ্দিন। তা সে মনে করতে থাকুক, পাঠক আসুন এই ফাঁকে জেনে নেই আমরা, সে রাতে ঠিক কী হয়েছিল। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না যে বর্ষার গাথা, অন্ধকারের গান আর স্রোতের পিরামিডের থেকে আরো বড় কিছু হয়েছিল সেদিন।

সে রাতে হাবিজুলর সাথে মাছ ধরা নিয়ে কথা হচ্ছিল। একসময় রাশেদ ও হাবিজুলের খুচরো কথা, যাপিত জীবনের লেনদেনের আলোচনায় ভাটা নামে। বলবার কথা ফুরিয়ে আসে কিন্তু বিষকাঁটালি নদীতে বৃষ্টির বিরাম হয় না। ঝির-ঝির-ঝির-ঝির, ঝম-ঝম-ঝম-ঝম ওঠানামার নানান খেলা নিয়ে চলতে থাকা বৃষ্টির এক পর্যায়ে মনে হয়, আকাশের এই কাঁদন খেলা শেষ হতে হতে কেয়ামত লেগে যাবে। কিংবা এমন হতে পারে যে আকাশ শুষ্ক হতে হতে নুহের মহাপ্লাবনের মতো সমস্ত পৃথিবী ঢেকে যাবে জলের আচ্ছাদনে। এসময়ে উপরের বালু বোঝাই জাহাজটাতে কী হচ্ছে জানার কথা না নিচে নৌকোর আশ্রয় নেয়া লোক দুটোর।

হঠাৎ শোনা যায় গুলির শব্দ আর তারস্বরে চিৎকার।

ওরা বিস্ময়ে স্তব্ধ।

এই অন্ধরাত্রি যতটা শব্দ করছে তা থেকে একচুল বেশি শব্দ যেন না আসে তার চেষ্টা চালাতে থাকে। সে অবস্থাতেই শুনতে পায় ঝুপ করে জলে একজন মানুষের ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ। না পড়ে যায় নি, তাকে ধাক্কা মেরে ফেলা হয়েছে। উপর থেকে চলছে নিচে ফেলা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে খিস্তি খেউরের বন্যা—

হালা বেশ্যা মাগির ছাওয়াল, খুন চোদাতি গিছিলে না?

জাইন্যা টাহা খাতিস জয়নাল চেয়ারম্যান ক্যাডা ।

শয়তানের বাচ্ছা। পাখনা খুব বাড়িছে, একাবারে ভাইঙ্গে দিছি। এখন নদীতে ভাইসে ভাইসে চোদা খাতি থাক, যা। দেহি তোর কেমন মুরোদ, পারলি আসিস আমাক খুঁজতি। লোহাগড়ার রজব আলী আমি, তোর মতো একশ মুসারে আমি বিয়ান বেলা থাকি চুদতি চুদতি ন্যাদা বানাতি পারি।

আরেকটি শব্দ হলো নদীতে। ধাতব কোনো কিছু ফেলার শব্দ। এই সময়ে নৌকাটা বেশ জোরে দুলে উঠল ঢেউয়ের তোড়ে আর তাতেই শব্দ করে বাড়ি খেল জাহাজটার সাথে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবুদ্ধি হয়ে চিৎকার দিতে গেল রাশেদ উদ্দিন, বুঝতে পেরেই লোকটার তার মুখ চেপে ধরল হাবিজুল। ওদিকে শব্দ পেয়ে লোকটা উল্টো দিকে টর্চ ফেলে বলে উঠল—

কেডারে, কেডা কতা কতিছে এখানে, শব্দ হতিছে কিসের?

দাঁতে দাঁত লাগিয়ে জাহাজের গায়ে হেলান দিয়ে থাকল ওরা। মিনিটপাঁচেক সাড়া শব্দ না পেয়ে গান ধরে উল্টো দিকে হাঁটা দিল সে। লোকটা চলে গেছে নিশ্চিত হবার পরে কথা বলে উঠল রাশেদ—

ভাই লোকটা তো মারা যাবে মনে হচ্ছে। ওকে উদ্ধার করতে হবে। আপনে নৌকা আগান। খোঁজ লাগান।

আমনে কি পাগল হইছেন মেয়া। ও ব্যাডারে মউতের ঘরে হান্দাইয়া দেছে কিনা কেডা কবে। আর কতকুন আগে ধপ্পাস কইররা ফালাইছে চিন্তা কইররা দেহেন। আধাঘণ্টা প্রায় অইছে নাহি ঠিক নাই। আর এই তুফাইন্না নদীতে আমনে মানুডারে খুঁইজা পাইবেন কোম্মে।

কী বলেন ভাই, আপনি কি মানুষ? একটা লোক মরে গেছে না বেঁচে আছে ঠিক নেই, বাঁচানোর চেষ্টা করব না? আসেন, নৌকা আগান।

নৌকা নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগিয়ে গেল হাবিজুল, জোরে জোরে দাড় বাইতে শুরু করল। তার অনিচ্ছার কারণ এই নয় যে লোকটাকে বাঁচানোর ইচ্ছে নেই বরং আসল কারণ ভয়।

খুন হতে যাওয়া একটা লোককে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার যথেষ্ট কষ্টসাপেক্ষ সন্দেহ নেই এরপর আবার আছে উটকো যন্ত্রণা, থানা পুলিশ। মরে গেলে তো কথাই নেই, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা এইটা একেবারে মুখস্ত করিয়ে ছাড়বে। জাহাজের উল্টো দিকে নিয়ে নৌকাটা মাঝ নদীর দিকে এগিয়ে যেতেই চিৎকার দিয়ে রাশেদ বলে উঠল—

এই যে ভাই, আপনে কই? আপনারে যে ফালাইল। আপনে কই আছেন সাড়া দেন ভাই। হ্যালো…

কিন্তু এদিকে কোনো জনমানবের ছায়া নেই। বৃষ্টি তখনো ঝরছে তবে বেগ কিছুটা কমতির দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই নৌকা নিয়ে খোঁজা হচ্ছে বেঁচে থাকা কিংবা মেরে ফেলা অজ্ঞাত লোকটাকে।

আধঘণ্টা ধরে চলল সেই আহত অথবা নিহত লোকটির খোঁজ। মাঝনদীতে দু’জন লোকের উদ্‌ভ্রান্ত চিৎকার পর অবশেষে শোনা গেল ক্ষীণ এক আওয়াজ। মৃদু সে শব্দটা কাছেই মনে হলো রাশেদের। জীবনের সঙ্কেত পাওয়া সে শব্দকে উদ্ধারের আশায় আরও জোরে চিৎকার দিয়ে বলল—

ভাই আপনে কই, আপনারে খুঁজতেছি। শব্দ করেন জোরে।


একটা জীবন তৈরির পেছনে প্রকৃতির নিবিড় আয়োজন; আর তাকে এত সহজে শেষ করে ফেলার চেষ্টা!


লোকটা সাড়া দেয় প্রাণশক্তির সমস্ত এক করে। নৌকার যাত্রীরা ওকে দেখতে না পেলেও অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। রাশেদের মনে হয় নৌকা আর লোকটার মাঝে ব্যবধান দেড়-দু শ ফুটের মতো হবে। পরিস্থিতির উন্নতিতে হাবিজুল মাঝির মধ্যেও এক ধরনের চাঞ্চল্যের জন্ম হয়, লোকটা জীবিত আছে; এর চেয়ে ভালো সংবাদ আর কী হতে পারে।

এমন সময় সাংবাদিক রাশেদ উদ্দিন এক উদ্ভট কাজ করে বসল। নদীর এই তুমুল স্রোতের মাঝে কোথায় রয়েছে সে না ভেবেই দিল এক লাফ। লোকটাকে উদ্ধারের বাসনায় ভুলে বসল নিজের পেশাগত শিক্ষা, সামনে মৃত্যু হলেও সাংবাদিকের কাজ সংবাদ সংগ্রহ, মৃত্যুপথযাত্রীকে বাঁচানো নয়। গ্রামে বড় হওয়া আর ডানপিটে বালক হিসেবে নদীতে সাঁতরে বেড়ানো রাশেদ এ কাজে বেশ দক্ষ হলেও এ নদী প্রমত্তা, বর্ষার ক্রোধোন্মত্ত দরিয়া। যার একূল-ওকূলের ঠিকুজির খোঁজ পাওয়া খোদ দরিয়াপারের লোকের জন্যেও প্রায় দুঃসাধ্য।

রাশেদ কোনো মতে লোকটার কাছে পৌঁছায় কিন্তু লোকটাকে টেনে ধরবার বা তাকে সাহায্য করবার মতো কোনো অবস্থায় সে ছিল না। উল্টো দুজনেই ভেসে যাচ্ছিল স্রোতের তোড়ে, ঠিক মাঝনদীতে নয় বলে রক্ষা ওদের। এদিকে নৌকা নিয়ে আগাতে থাকা হাবিজুল গলা চড়িয়ে জানান দিল ‘আপনেরা ওইখানেই থাহেন, ভাইসা যাইয়েন না। আমি আইতে আছি। একটু খাঁড়ায়া থাহেন।’

বিরুদ্ধ স্রোতের সাথে এতটা সময় সংগ্রামের পরেও প্রাণবায়ু যমের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে নি জাহাজের ডেকের উপর থেকে ফেলে দেয়া লোকটার। তাকে ধরে নিয়ে আগানোর চেষ্টার মতো কাজটা নির্বুদ্ধিতা হবে বুঝতে পেরে রাশেদ লোকটাকে নিয়ে এক জায়গাতেই স্থির থাকার চেষ্টা করে। মিনিট কয়েক পরে হাবিজুল এসে নৌকার বৈঠাটা বাড়িয়ে দেয় ওদের দিকে।

মহৎ কোনো কাজ সম্পাদনের নেশায় পেয়ে বসা রাশেদ যথারীতি লোকটাকে আগে ঠেলে উঠিয়ে দেয়। লোকটা তখন জ্ঞান হারিয়েছে। হাবিজুল ধরাধরি করে নৌকায় লোকটাকে শুইয়ে দেবার পর রাশেদ উদ্দিনের দিকে হাত বাড়ায়। লোকটাকে তোলার পর কোনো মতে নৌকায় উঠে সটান হয়ে শুয়ে পরে রাশেদ। তার বুকের ছাতির নিচে যেটা ডিবডিব করে লাফিয়ে চলছে ওটা যেন এখনি ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। হাবিজুলের নৌকায় হেলান দিয়ে স্থির হতেই সটান শুয়ে থাকা শহুরে লোকটাকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে—

এইডা কোনো কাম হরলেন আপনে। এইভাবে ঝপ্পাত কইররা নদীর মইধ্যে লাফ দেয় কোনো সুস্থ মানু? আপনে ভাইসা গেলে কেমন হইত কতাডা? মোরে বদনামের ভাগিদার বানাইতেন।

এই অভিযোগ সত্য জেনেও, হাবিজুল মাঝির ভীষণ বিরক্ত চাউনি দেখেও হেসে ওঠে রাশেদ, একটা প্রাণ হয়তো সে রক্ষা করেছে। পুরোটা এখনই বলা না গেলেও ওর মন বলছে লোকটা বেঁচে যাবে। কী অমূল্য মানব জীবন, একটা জীবন তৈরির পেছনে প্রকৃতির নিবিড় আয়োজন; আর তাকে এত সহজে শেষ করে ফেলার চেষ্টা!

ধ্বংসের কাছে সঁপে দেয়া একটি প্রাণ ফিরিয়ে আনায় অসম্ভব গর্বে রাশেদ ভুলে যায় তার রাত্রিবাসের স্থান ঠিক না করা বিষয়ক সমস্যা কিংবা আরও অনেক বিষয় আসয়। তার চিন্তা এখন শুধুই যেকোনো ভাবে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে প্রাণে বাঁচানোর দিকেই আটকে আছে। হাবিজুল মাঝিও বুঝতে পারে রাশেদকে ঘাঘরঘাঁটা পৌঁছে দিলেই তার দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না, আরও অনেক কাজ বাকি আজকের রাত্রে।

৭.
আকাশ জুড়ে অগুনতি নক্ষত্র।

অপার বিস্ময়ে শতসহস্র চোখ নিয়ে ওরা চেয়ে আছে নিচের দিকে।

সম্ভবত দেখে দেখে অবাক হচ্ছে কী আশ্চর্যের নিয়মে এখানে তাবৎ কুৎসিত বাসা বেধে আছে। রোদ ফুরাতেই লিখে যাচ্ছে কত শত টুকরো স্বপ্নের অলিখিত মৃত্যু কিন্তু তবুও যাপন কী এক অগোছালো আনন্দে হেসে ওঠে। ওপরের তারাদের যেমন আরও ওপরে তাকাবার সুযোগ নেই তেমনি নিচের মানুষদের সুযোগ নেই আরও নিচে তাকানোর।

স্বর্গ ও নরক বোধহয় চিরকালই তাই মানুষের চেতনার বাইরের কিছু। চির অচলের বিধিবদ্ধ নিয়মেই একটু আগে খুন করে আসা নুলা মুসা এখন তারা দেখছে। খুনে চোখদুটোও এখন বিস্ময় নিয়ে দেখছে অপার্থিব আকাশের ফুল।

নীলফামারী যাবার জন্যে সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠেছে। ক’দিন একদম গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। ভারত চলে যাবে নাকি ছিটমহল এলাকার কোনো এক গ্রামের দিক ধরে, ভাবছে সে। ওদিকটায় এখনো আসা যাওয়া  তুলনামূলক সহজ, সীমান্তের কড়াকড়ি ততটা বসে নি শুনেছে। ঠিক বা ভুল সে-সবের হিসেব নেয়া বা চিন্তা করার মতো অযথা সময় এখন একেবারেই নেই লোকটার।

বড় ভাইকে এসব ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে ঠিকঠাক। সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা লোকটা এতকাল যখন মাখনের মতো মসৃণ করে রেখেছে, এখনো তাই হবে। বাস ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দিনের তাপে ক্লান্ত লোকগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে সব। উৎফুল্ল চিত্ত নুলা মুসার মাথায় হঠাৎ ভর করে এক চিন্তা, ভাবতে থাকে, বেঁচে থাকার কি কথা ছিল এইভাবে এখন অব্দি?

বর্ষায় উত্তাল বিষকাঁটালি, অমন বিপুলধারা স্রোত, একেকটা ঢেউ কেমন উপরে তুলে আছাড় মারে, মনে হয় যেন আজরাইলের হাত ভর করেছে পানিতে। এমন মাতাল নদীতে পায়ে গুলি খাওয়া মুসা মিয়া, মৃত্যুকে একেবারে সামনে দাঁড়ানো দেখেছে। দোজখের দুয়ার খুলে চুম্বক দিয়ে যেন টানছিল মৃত্যু, এমন অবস্থা থেকে তাকে টেনে বের করে আনল কিনা একজন সাংবাদিক, কী যেন নাম ভাবতে থাকে। বারবার মনে করার চেষ্টাও কাজে না এলে সে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

মাথা চুলকে চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে আর তাই বিষম উত্তেজনায় সামনের সিটের পেছনটাতে একটা লাথি মারে। সেখানে বসা বাচ্চা ছেলেটা ঘুম ভেঙে উঠে মুসার দিকে চোখটা একটু ফিরিয়েই আবার ঘুমিয়ে যায়। এসব করেও লোকটা মনে করতে পারে না মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনা সাংবাদিকটার নাম। হঠাৎ চোখ থেকে এক ফোঁটা জল নামে। এ জল কি কৃতজ্ঞতা থেকেই, নাকি ধুলো বালির কিছু একটা চোখে যাওয়া দায়ী বোঝা মুশকিল।

মুসার মনে পড়ে দু’দিন পরে হাসপাতালে জ্ঞান ফিরল। রোগীর ভর্তির সময় কী একটা নাম দেয়া হয়েছে সেটাও মনে পড়ছে না তার। ডাক্তার জানাল, সাংবাদিক সাহেব নিয়ে এসেছেন। পায়ের বাটি বরাবর গুলি লাগায় একেবারে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে, তাই বাম পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ডাক্তার দুঃখপ্রকাশ করে জানালেন, ‘আর ভয় নেই’।

কাল সকালে পুলিশ এসে তাকে কে মেরেছে এই নিয়ে জবানবন্দি নেবে। যদিও জানে না ডাক্তার, মুসা মিয়া যে আজ থেকে নুলা মুসা হলো; সে কিছুতেই ভয় পায় না আর। আগে পেলেও এখন সে মৃত্যু দেখে আসা লোক। ভয় তার দিনতিনেক আগেই ডুবে গেছে জলে। রাত নামতেই ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ও হাসপাতালে ভর্তির কাগজগুলো সব নিয়ে হাসপাতাল থেকে এক ফাঁকে পালিয়ে যায় দূরে কোথাও।

৮.
পেঁয়াজ কাটার সময় একের পর এক স্তর আলাদা করে ফেলার পরও যেমন দেখা যায় শেষের বাকি থেকে যায় কিছু অংশ, তেমনি জয়নাল চেয়ারম্যানের আত্মহত্যা অথবা খুনের ঘটনা, বেশ কয়েকটি দৈনিকে যা এসেছিল—শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। যদিও ঘটনাগুলোর কয়েকটি ঘটবার কথা ছিল না আদৌ। মর্মান্তিক এই ঘটনাগুলো ঘটে যাবার পেছনে রাশেদ অনেকাংশেই দায়ী এই ভাবনা তাকে এক ধরনের চাপা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

একটি জীবন বাঁচিয়ে যে অনন্যসাধারণ কীর্তির জন্ম দিয়ে রাশেদ বিগত তিনটে বছর মনে মনে গর্ব করে এসেছে, গত তিন সপ্তাহে তা ফিকে যায়; বরং গৌরবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দুশ্চিন্তা নিয়ে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।

একটি প্রাণ রক্ষা করে, পৃথিবীর প্রাণস্পন্দনে একটি পালক যোগ করে যে পুণ্য এনেছিল, সেটিই আরও কয়েকটি প্রাণঘাতী হয়ে পাপের জন্ম দিল কিনা এই চিন্তাই রাশেদের মাথায় ঘুরঘুর করছিল সপ্তাতিনেক আগে সংবাদটা শোনার পর থেকেই। চেয়েছিল মনে-প্রাণে ঘটনাগুলো যাতে পরস্পরের পরিপূরক না হয়।

পুরো বিষয়টা ঠান্ডা মাথায় ভেবে রাশেদ ঘটনার মোটামুটি একটা সমাধানের কাছে পৌঁছে যায়, সপ্তাহতিনেক ধরে তথ্য সংগ্রহে তার বেশ ধকল যায়। অনুমিতভাবেই পুলিশের তরফ থেকে ময়নাতদন্তের ফলাফল নিশ্চিত করে—এ আসলে খুন, কোনোমতেই আত্মহত্যা নয়। ধারাল ছুরি দিয়ে কেউ একজন আঘাত করেছে লোকটার কণ্ঠনালিতে। মৃত্যু বলতে গেলে সাথে সাথেই। আশ্চর্য ব্যাপার, ছুরিতে পাওয়া হাতের ছাপ অন্য কোনো লোকের নয়, মৃত জয়নাল চেয়ারম্যানের। এমনকি আত্মহত্যার সময় যে চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল সেটাও মৃতব্যক্তির নিজের হাতেই লেখা।

চোখের আলোর রিপোর্টার মোশতাক জহিরের সাথে কথা বলে রাশেদ জানতে পারে জয়নাল চেয়ারম্যান আর এলাকার আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আজগর চাকলাদারের দ্বন্দ্বের কথা। এলাকার লোকের কাছেই জহির শুনেছে, চেয়ারম্যানের চ্যালা চামুণ্ডাদের সাথে দু’বার চর দখলের লড়াইয়ে হেরে গিয়েছিল চাকলাদারের লোকেরা। এমনকি চাকলাদারকে গুম করে ফেলার হুমকিও দেয়া হয়েছিল চেয়ারম্যানের তরফ থেকে একবার, হাট ভরা লোকের সামনে। তথ্যটা রাশেদের মনে জমে থাকা সন্দেহকে প্রায় সত্যি করে তোলে, অন্তত কার্যকারণ তাই বলে।

অদ্ভুত এক অস্থিরতা ঘিরে ধরে রাশেদকে, নিজের মনেই সাজায় যুক্তিজাল। সেই বর্ষারাত, আকাশ থেকে অঝোর বর্ষণ আর উপর থেকে রজব আলীর তর্জন গর্জন। নুলা মুসাকে মেরে ফেলতে চাওয়া রজব আলী চাইছিল লাশ ভেসে চলে যাক সর্বনাশা বিষকাঁটালিতে।

তাই প্রাণে না মেরে পায়ে গুলি করে ফেলে দ্যায় উত্তাল নদীতে। হত্যা চেষ্টার পেছনে যদি চাকলাদারের হাত থেকে থাকে, তবে অর্থ দাঁড়ায় একটাই, চেয়ারম্যান হত্যার জন্য মুসাকে ভাড়া করেছিল চাকলাদার। কোনোভাবে আগেই টের পেয়ে যায় চেয়ারম্যানের লোকেরা আর তাই পোষা গুণ্ডা রজব আলীর মুসা মিয়াকে হত্যাচেষ্টা।

ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকা রাশেদের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা চোরাস্রোত বয়ে যায়। সমস্তই পরিষ্কার এখন তার কাছে; পুরান ঢাকায় পচে যেতে শুরু করা লাশটা শীর্ষসন্ত্রাসী রজব আলীর, যে কিনা ছিল সেই রাতের লোকটা, আটকে পড়া জাহাজের উপর থেকে ইচ্ছেমতন খিস্তি আওড়াচ্ছিল আর নিচে ফেলে দিয়েছিল আরেক সন্ত্রাসী মুসা মিয়াকে। আরও আগে কেন বিষয়টার দিকে নজর দেয় নি ভেবে নিজেকে ধিক্কার দিল রাশেদ।

তিন বছর আগে বন্যাপর্বের নদীতে পার করা রাতে যাকে জীবনবাজি রেখে উদ্ধার করেছিল কালক্রমে সে যে শীর্ষ সন্ত্রাসী নুলা মুসা হয়ে উঠবে কল্পনায়ও আসে নি রাশেদের। নুলা মুসা যদি জয়নাল সাবকে নাও খুন করে, রজব আলীর খুন হবার পেছনে এর চেয়ে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।

আততায়ীর মতো একটি রাত অনেক প্রশ্নের উত্তর আর কিছু মৌলিক অন্ধকার দিয়ে গেল স্বাপ্নিক রাশেদকে। এতদিনের গর্বের অনুভূতি আজ চূর্ণ মুহূর্তেমাত্রের অন্ধকারে। না জেনে করা ভুল কিংবা ঘটমান পরিস্থিতির শিকার হয়ে নির্ঘুম রাত পার করা লোকটা এখনো জানে না কী করে পার করবে আরও দীর্ঘ দুটো ঘণ্টা।

শেকল পরা এই প্রহরের অপেক্ষা শেষ হলে রাশেদ মুক্ত হবার প্রত্যাশা করে, সকাল আটটা বাজতেই সে বেরিয়ে যায় নিজের জবানবন্দি দিতে। পুলিশের কাছে গিয়ে সব খুলে না বলা পর্যন্ত জলপানও তার কাছে বিষাক্ত মনে হচ্ছে। এমনতরো মহৎ কাজের সাথেও যে জগৎ সংসার এহেন পাপ মিহি সুতোয় বোনা জালের মতো মিশিয়ে দেবে একদম জানা ছিল না রাশেদের।

৯.
রাত এগারোটা।

মাত্র একজন যাত্রী অপেক্ষা করছে বাসের।

দুটো টিকেট কাটা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে বেতদিঘি বাসস্ট্যান্ড থেকে। টিকেটের গায়ে যাত্রীর নামের জায়গায় লেখা হয়েছে মো. গফুর মিয়া। বাসের গন্তব্য ফুলবাড়ি থেকে ঢাকা। অমাবস্যার ঘোর অন্ধরাতে শহর বা তার বাইরের অন্যান্য জায়গা থেকে আরও যারা বাসে উঠেছেন তারা জানেন না কে এই গফুর মিয়া, কী তার আসল পরিচয়।

যারা জানে অথবা শনাক্ত করতে পারত লোকটাকে তারা দুটো দলে বিভক্ত—একদলের বেশিরভাগ বেঁচে নেই যে অন্যদের সাবধান করবে আর আরেকদল তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিলে বা কোনো সংবাদ দিতে পারলেই পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবার কথা ঘোষণা করেছে।

রাতের বাস, ঘুটঘুটে অন্ধকারে চলতে শুরু করে। বেশ খালি খালি থাকতেই বাস শহরতলি ছেড়ে মহাসড়কে ওঠে গেছে। জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখতে পায় নিচের দিকটা একটু ফাটা, বেশ বাতাস আসতে থাকে ফুটো দিয়ে।


চাকলাদার সাব জয়নাইল্যার খুনে জড়িত থাকতে পারে এইসব কথাবার্তা কইত্থিকা যে পাইল পাগলাচোদায়, কে কইবার পারে।


লোকটার আরও কয়েকটা দিন বিশ্রামের ইচ্ছে ছিল। মালদায় গিয়ে বেশ আরামেই কেটেছে তার গত দিনগুলো। ওপারে মদের দাম বাংলাদেশের তুলনায় পানির মতো, সোনাগাছির মতো জায়গার মেয়েছেলে, আর মাঝে সাঝে জুয়ার আসর কোনোকিছুরই কমতি ছিল না—একদম যাকে বলে পরিপূর্ণ উপভোগ। ভেবেই পুলক পায় লোকটা হঠাৎ করেই খবর আসে তার কাছে, আরেকটি কাজ নাকি এসেছে সামনে। এবারের কাজটা করার বেলায় খুব সাবধানে থাকতে হবে, মনে মনে কথা চলে হুঁশিয়ার আততায়ীর। সে ভাবনায় অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায় খুন হবার অপেক্ষায় থাকা লোকটিকে নিয়ে।

‘এবারের বাছাধনের কাজকাম নাকি আবার ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং। এই সাংবাদিকগুলা বহুত খতরনাক আছে। একটা মরলে ঝাঁক ধরে আসে। শালার বেক্কেল রাস্কেল টের পায় নাই মরণ চইলা আসছে ইনভেস্টিগেশন চোদাইতে চোদাইতে।’

ভাবতে ভাবতে অট্টহাসি দেয় চারপাশ কাঁপিয়ে। বাসের পাঁচজন যাত্রীর মাঝে যে দুজন ঘুমে ঢলে পরে নি তারা নতুন নাম নেয়া গফুর মিয়ার দিকে ফিরে তাকায়, মিনিট দুয়েক দেখার পর আবার গতানুগতিক নিদ্রাচ্ছন্নতার প্রস্তুতি নেয়। তার হাতে এখন দিনতিনেক আগের পত্রিকা দৈনিক চোখের আলো, সে খুলে আছে তৃতীয় পাতা। সাংবাদিক রাশেদ উদ্দিনের করা রিপোর্টটা কাগজে ভাসছে—‘জয়নাল চেয়ারম্যানের খুনি কে?’

‘রিপোর্টটা যে শালা করছে, ওর মাথায় মাল আছে ভালা।’

মনে মনে প্রশংসা করে নুলা মুসা। চাকলাদার সাব জয়নাইল্যার খুনে জড়িত থাকতে পারে এইসব কথাবার্তা কইত্থিকা যে পাইল পাগলাচোদায়, কে কইবার পারে।’ নিজের সাথেই বলতে থাকে খুনে লোকটা। ‘পরাণ পাখিটা উইড়া গেলে শালার গোয়া দিয়া সাংবাদিক বাইরাইব’।

পেছনের ঢালা সিটের দু সিট আগে বসে আছে অদ্ভুত লোকটা। কাঁথা মুড়ি দিয়ে আয়েশ করে দুটো সিট নিয়ে গা এলিয়ে দেয়। গত মাস দেড়েকের নির্ভাবনার দিনগুলো শেষ হলো ভেবে মুখটা একটু শক্ত হয়ে আসে তার।

বাস ছুটতে থাকে মসৃণ রাস্তায়।

ফাঁকা রাস্তা।

সুনসান নীরবতা।

বাতাস নেমেছে দৃশ্যপটে।

দুপাশে মৃত্যুময় স্তব্ধতা অথচ মাথা দোলাচ্ছে গাছগুলো।

স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ দ্রুতই ছুটছে বাসটা…


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

(528)

রেজওয়ান তানিম