হোম গদ্য গল্প বই থেকে : আমার মা বেশ্যা ছিলেন

বই থেকে : আমার মা বেশ্যা ছিলেন

বই থেকে : আমার মা বেশ্যা ছিলেন
2.25K
0

‘আমার মা বেশ্যা ছিলেন’ গল্পটি তরুণ কথাশিল্পী মোজাফ্‌ফর হোসেনের পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা বই থেকে নেয়া। এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি অর্জন করেছে ‘আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮’। উল্লেখ্য যে, পুরস্কারটির উদ্যোক্তা অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘পরস্পর’ ও প্রকাশনা সংস্থা ‘অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি’। আর্থিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড।

একুশের গ্রন্থমেলায় পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা বইটি পাওয়া যাবে
অগ্রদূতের ৫৮৮ নম্বর স্টলে।


বিচারকদের বক্তব্য


ভয়াবহতা আর সৌন্দর্য, জীবনের এই দুই মেরুকেই বারবার স্পর্শ ক’রে গেছে এই গ্রন্থের গল্পগুলি। তবু কেবলই জীবনের চলচ্ছবি মাত্র হয়ে উঠতে চায় নি তারা। তাই এই লেখাগুলি পড়তে পড়তে নিছক গল্পপাঠের আনন্দের অতিরিক্ত কিছু পেয়ে যাই আমরা। মনে হয়, একেই বুঝি সাহিত্য বলা হয়ে থাকে। পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা-র রচয়িতা তেমনই একজন সাহিত্যিক, যাঁর জন্য বাংলাভাষার পাঠক অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁকে আমাদের অভিনন্দন।

– গৌতম চৌধুরী

…চ‌রিত্রদের স্থানচ্যু‌তি ও নিরবলম্বতা, ফলে একে ঘিরে প‌রিপার্শ্বের বিকল্প বাস্ত‌বতার উন্মোচন, মানব-অস্তিত্বের অনুত্তরণীয়, অপ‌রিত্রাহী ও অমোঘ এক অবস্থাকে ই‌ঙ্গিত করছে, যা গল্পগুলোকে অব‌চ্ছিন্ন মা‌ত্রিকতা দিয়েছে।

– কুমার চক্রবর্তী

আমার সর্বশেষ পড়া সেরা গ্রন্থের অন্যতম পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা। বাংলা সাহিত্যের গল্পের সমৃদ্ধ সম্ভার বিবেচনায় রেখেও বলা যায়, এই গ্রন্থের গল্পগুলো পাঠককে এক নতুন জগৎ নির্মাণে কিংবা তার পরিচিত জগৎসমূহকে আলাদা করে ভাবতে সহায়তা করবে… এবং একই সঙ্গে আমাদের প্রাত্যহিক বিস্মরণের জগৎকে জাদুবাস্তবতা মিথ ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এমন এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে যে, সত্যিই পাঠক ভাবতে বাধ্য হবে, ‘জ্বিন ও মানুষের সেই যুদ্ধে একজন মানুষও বেঁচে নেই।’

– মজিদ মাহমুদ

পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। রহস্যময়তা সৃষ্টি ও বাস্তবতার বাইরে গিয়ে পরিস্থিতির ওপর গভীর আলো ফেলা এর লেখকের ধরন। পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা তাই কখনও বাস্তবতা ও সাম্প্রতিকতা এবং কখনও প্রতীকী প্রবণতা, অধিবাস্তবতা ও রহস্যময়তাকে অতিক্রম করে আমাদের সময়ের শিল্পভাষ্য হয়ে ওঠে। লেখক ভাষা-সচেতন এবং একইসঙ্গে পাঠকের মাথায় গল্প পড়তে পড়তে যে ছক গড়ে ওঠে তাকে নস্যাৎ করতে জানেন। এমন লেখককে নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়।

– রাশেদুজ্জামান


গল্প


লোকে আমার মাকে বেশ্যা বলে ডাকত। কেন ডাকত জানি না। মাকে কখনো অন্যপুরুষের সঙ্গে শুতে দেখি নি। ভেবেছি অনেক রাত হলে কেউ আসতে পারে। বরাবরই ছিলাম খুব ঘুমকাতুরে। ঘুম আর ক্ষুধা পাল্লা দিয়ে জ্বালায়। যেহেতু অনেক চেষ্টা করেও কোনো রাত আমি জেগে থাকতে পারি নি, আর যেহেতু আমার বাবাটা রোজগেরে ছিল না, তাই মা মধ্যরাতে কিছু একটা করে থাকলেও থাকতে পারে। এ নিয়ে আমাদের বাড়িতে খুব একটা কথা হতো না। একবার বড়বোনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘মা কি বেশ্যা?’

বড় বোন খিস্তি দিয়ে বলেছিল, ‘আচুদা, মা কারু বেশ্যা হয় নাকি?’

‘তালি যে লোকে বলে?’

‘লোকে তো আর তাদের মা-মাগিকে বেশ্যা বলে না। আমাদের মাকে বলে, আমাদের মা তো আর তাদের মা লাগে না।’

খুব গোলমেলে কথা। বড়বোনের এই কথায় মা বেশ্যা কি-না, সেটা বোঝা যায় না। তবে বড়বোন যে বেশ্যা সেটা আমি জানি। কিন্তু বড়বোনকে কেউ কখনো বেশ্যা বলে ডাকে না। যাদের ডাকার কথা, তাদের অনেকের সাথে বড়বোনের খুব ভাব। রাতদুপুরে ডাক পড়ে, আমাকে মাঝে মধ্যে উঠিয়ে নিয়ে যায় সঙ্গে করে। ঘুমের ঘোরে যাই, আসি। সকাল হলে আর মনে পড়ে না কোথায় গিয়েছিলাম, আদৌ গিয়েছিলাম নাকি স্বপ্ন দেখেছি তাও ঠিক বুঝতে পারি না। নিশ্চিত হতে একদিন বড়বোনকে বলেওছিলাম, ‘রাতে আমাকে কি তুই নি যাস কুতাও?’

‘তোর মতো রাতকানাকে নিতি হবে ক্যানে? আমার কি মিনসির অভাব?’ বড়বোন এড়িয়ে যায় এই কথা বলে। স্বপ্ন দেখি বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু একদিন ঘুমের ঘোরটা কাটে। বড়বোন আমাকে বলে মসজিদে ফ্যান চালিয়ে বসতে। ঘুম পেলে ঘুমাতে। এরপর সে মসজিদের পেছনে মোল্লাবাড়ির ভেতর চলে যায়। ইদ্রিস মোল্লার বউ দরজা খোলে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাই আমি। ইদ্রিস মোল্লা চিল্লায় গেছে পাড়ার আরও কয়েকজনকে নিয়ে। আমাকেও নিতে চেয়েছিল, বেশ্যাবাড়ির ছেলে বলে অন্যরা আপত্তি তোলে। স্বপ্ন বলেই মেনে নেওয়া যেত কিন্তু ভোররাতে ফজরের আজান দিতে এসে আমাকে ডেকে উঠায় বিল্লাহ হুজুর। বাড়ি এসে দেখি চৌকিতে বড়বোন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।


‘কে আমার বাপ? আমি যেকুন প্যাটে, বাপ তেকুন জেলে? আমি জানি নি?


২.
মার সঙ্গে খুব বেশি ভাব ছিল না আমার। অভাবের সংসার, তার ওপর আমার ভবঘুরে বাবার মায়ের গর্ভে ঘনঘন বীজ বপন। সংসারের দৈর্ঘ্য বেড়েছে প্রতি বছরে, বেড়েছে খাবারের সংকট। আমি তাদের দশম সন্তান। এগারতম মারা গিয়েছিল জন্মের তিন দিন পরে। দীর্ঘ দশ মাস পেটে থেকেও পুষ্ট হতে পারে নি সে।

বাড়ি বলতে আমাদের যা ছিল তিন খোপযুক্ত একটি কবুতরের খাঁচা। আশেপাশে জায়গার অভাব ছিল না যদিও তবুও স্বপন সাহেবের বাবার এই দয়াটুকুই ছিল আমাদের জন্য উপচে পড়া, যার ঋণ বাবা-মা না পারলেও অনেকখানি পুষিয়ে দিয়েছিল আমার বোনেরা।

একঘরে আমি, বাবা, মা সঙ্গে আরো দুভাই-বোন থাকতাম। মাঝে মধ্যে মধ্যরাতে মাকে লাথি মেরে উঠে যেত বাবা; আর সব দিন সমঝোতা করত মা। বৈবাহিক সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলেও চলে। বিজ্ঞান বলে সন্তান জন্ম দিতে ভালোবাসা লাগে না। ‘ধর্ষণ করলে কি গর্ভ হয় না?’ আসলে আমরা এক-একজন ছিলাম এক-একটি ধর্ষণের চূড়ান্ত পরিণাম। এই কারণে কেউই সুস্থ ছিলাম না। হয় মনে নয়তো দেহতে, খুঁত একটা ছিলই। না হলে প্রায়ই রাতে ঘুমন্ত মাকে জাগাতে না পেরে বাবা যে মেজো বোনের কাঁথার মধ্যে ঢুকে যেত, কই মেজো বোনকে তো বাধা দিতে কিংবা কিছু বলতে দেখি নি। তালাকপ্রাপ্ত বোনটি যখন প্রেগন্যান্ট হলো, মা তখন বলেছিল, ‘তোর বাপেরও হতি পারে, ফেলি দে।’ বোনটি যখন চিৎকার করে বলেছিল, ‘কে আমার বাপ? আমি যেকুন প্যাটে, বাপ তেকুন জেলে? আমি জানি নি? আমার আসল বাপ কে তুই নিজিও বুলতি পারবি নি।’ এরপর সে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিল, ‘এই প্যাট আমি ফেলবু না। তুই তো আমাকে ফেলিস নি? ফেল্লি বেঁচি যাতাম।’

এরপর সত্যি সত্যি মেজো বোনের ছেলেটা হলো। শ্বশুরবাড়ি থাকতে ওর একটা মেয়ে হয়েছে। পাশের গাঁ থেকে বেঁটে করে মাঝবয়সী এক লোক আসত আমাদের বাড়িতে। মাত্র কদিন আসার পর মেজো বোনকে বিয়ে করে নিয়ে যায়। বছর পেরুতেই সন্তানের মা হওয়ার পর সন্তানটা তার আগের নিঃসন্তান বউয়ের কাছে রেখে আমার মেজো বোনকে বের করে দিল। সেই থেকে ওর সন্তানের নেশা। কিন্তু এবার আর ছেলেটাকে বাঁচাতে পারল না। তিন দিনের মাথায় ঘরের চাটাইয়ের ফাঁক গলিয়ে উঠিয়ে নিয়ে গেল শেয়াল। যতক্ষণে উদ্ধার করা গেল, ততক্ষণে শরীরের অর্ধেকটা নেই। এরপর বোনটা আমার কাঁদতে কাঁদতে পাগল হয়ে গেল। সারারাত জঙ্গলে শেয়াল তাড়া করে বেড়াত। একভোরে জঙ্গলে ওর রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেল, শেয়াল নয় মানুষের কাজ।

সেজো বোনটার বিয়ে হলো না প্রতিবন্ধী বলে। বুদ্ধিশুদ্ধি আছে, তবে সামান্য উঠানামা করে। বেশ্যাবাড়ির মেয়েদের বুদ্ধি কিছু কম থাকলেও চলে। সমস্যা হলো ওর মুখ দিয়ে বেদম লালা পড়ে আর গা দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরোয়। এই কারণে সংসারে ও কোনো কাজে লাগে নি। বাবা নেশার জন্য দুয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কাজ হয় নি। সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে এসেছে। ওর জন্য খুব মায়া হতো আমার। যে বাড়িতে রাতদিন লোকজনের আনাগোনা কেবল শরীরের জন্য। সেই বাড়িতেই আমার আইবুড়ো বোনটি অভুক্ত থেকে গেল। একদিন গোসল করে এসে আর সহ্য করতে না পেরে, আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘দেখ ভাই, বাসনা শাবান ডলিচি মেলাখুন ধরি। না হলি নাকে কাপুড় বেঁধি দিই?’ আমি তার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। ওর শক্তির কাছে আমি পেরে উঠি না। আমার লুঙ্গির গিট্টু খুলেই দেখে সতের আঠার বছরের একটা শরীরে ঝুলে আছে আট নয় বছরের শিশুর যৌনাঙ্গ। যে শরীরে যৌনতা জেগে ওঠে না, তার শরীরে গোপন অঙ্গকে যৌনাঙ্গ বলা যায় কিনা জানি না। এরপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। ‘তুই তাও বেঁচি গিচির। আমার কি হবে? আমারটা তো অচল না। এই বেশ্যাবাড়িতে আমার কেউ জুটলু না রে?’ বলে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে আর মুখের লালায় আমাকে ভিজিয়ে দিয়েছে।


বাবার জানাজা হতে সমস্যা হয় নি। পুরুষ মানুষ বেশ্যা হয় না। 


৩.
প্রায়ই মনে হয়, এই তো সেদিন। আমার ছোট বোন, তার বয়স তখন বার কি তেরো, যে বাড়িতে কাজ করত সেই বাড়ির লেখাপড়া শেষ করে ফেরা স্বপন সাহেব, আমি কত গর্ব করেছি যার নামে আমার নাম হওয়াতে, বিশ টাকার লোভ দেখিয়ে আমার বোনকে নিয়ে গেল বিছানাতে। আমি দরজার এপাশ থেকে বিশ টাকায় কী কী কিনতে পারি সেই হিসাব করতে করতে আমার পাগল হওয়ার অবস্থা। তারপর সে যখন ঘর থেকে বের হলো, তার পায়জামা রক্তে ভিজে একাকার। ঐ রক্ত নিয়েই ছুটে গেছি আমরা বটতলার মোড়ের বাজারে। রক্ত ঝরতে ঝরতে সাত দিনের মাথায় মারা গেল সে। মনে পড়ে, বিশ টাকায় মন ভরে অনেক কিছু খেয়েছিলাম সেদিন। আমি একটা লাটিম কিনেছিলাম। ও কিনেছিল শাড়িপরা পুতুল। পুতুলটা আমি ওর কবরে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সাহস করে কাউকে বলতে পারি নি। তিন দিনের মাথায় আমি নিজে গিয়ে কবরের এক কোনায় মাটি সরিয়ে পুঁতে রেখে এসেছিলাম। সে নিয়ে এক কাণ্ড ঘটে। কয়দিন পর শেয়ালের আঁচড়ে সেটি উঠে আসে। পুতুলটা যে আমার ছোটবোনটা কবর থেকে রাতে উঠে এসে নিজে নিয়ে গেছে এমন খবর রটে যায়। আমার মাও নাকি কয়েকদিন রাতে ওর ছায়া ঘুরঘুর করতে দেখেছে। এরপর কয়েক রাতের জন্য আমাদের বাড়িতে কাস্টমার আসা কমে গেল। কাউকে আর সাহস করে সত্যটা বলতে পারি নি। বললে কেউ আর বিশ্বাস করত বলে মনেও হয় নি। তবে সবচেয়ে মজা পেয়েছিলাম ওর কবর থেকে উঠে আসার কথা রটে গেলে ভয়ে ভয়ে কিছুদিনের জন্য গ্রামছাড়া হয় স্বপন সাহেব।

ভাই বোনের অভাব আমার ছিল না। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অভাবটাই সব অভাবকে ছাড়িয়ে যায়। প্রতিবন্ধী বোনটা আত্মহত্যা করল। আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করার দিন পনের পর। বাড়িতে দিনে-রাতে এত মানুষজনের আসা-যাওয়া যে আত্মহত্যা করারও উপায় ছিল না, তাই রাতে বাড়ির পেছনের আমবাগানের একটা গাছে পরনের শাড়ি পেঁচিয়ে ঝুলে গিয়েছিল। কেবল সায়াটা পরনে ছিল। সকালে লাশটি নামানোর সময় উদোম বুক দেখে দুয়েকজন লোক ফিসফিস করে ওর বুক নিয়ে কথা বলছিল। দুজনের কথা কানে গেল :

‘মালটার এই জিনিস আছে জানলে তো দম বন্ধ করে মেরে দিতাম।’ একজন বলে।

‘এখনো চান্স আছে। লাশটা ধোয়াতে দেয় নি কিনা দেখ।’ অন্যজন যোগ করে।

মেজো বোনের আত্মহত্যায় আমার কোনো হাত ছিল না। তবুও নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো। বড় দুই ভাই ডাকাত দলে নাম লেখানোর মাস ছয়েকের মধ্যে মারা পড়ল। বড়ভাই গেল গণপিটুনিতে। ডাকাতি করতে গিয়ে ধরাপড়ার পর লোকজন পিটিয়ে আর চেনার মতো রাখে নি। আমার এখনো মনে হয়, তিনজনের মধ্য থেকে যাকে আমরা বড়ভাই বলে থানা থেকে তুলে এনে মাটি দিয়েছিলাম সে আমাদের ভাই ছিল না। ভাইয়ের ঊরুতে কাটা দাগ ছিল, যেটা আমি অন্য একটা লাশে দেখেছিলাম। কিন্তু মা প্রথমেই যে লাশটা ধরে কান্না শুরু করে দিল পুলিশ সেটাই তড়িঘড়ি করে গরুর গাড়িতে উঠিয়ে দিল। ভাগের লাশ একটা নিলেই হলো, এই কারণে আমি আর কথা ব লিনি। মেজো ভাইটাকে মারল দলের লোকেই। ডাকাতির মাল ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। কেউ বলে সে নাকি বড়ভাইয়ের মৃত্যুর পর ডাকাতি ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ওরা ভাগাভাগির নাটক সাজিয়ে মেরে দিয়েছে।

সেজো ভাইটা জেলে। বর্ডার দিয়ে গরু পাচার করে আনত। এরপর গরু বাদ দিয়ে বোতল আনতে থাকে। ছোট জিনিসে রিস্ক ও লাভ দুটোই বেশি। বিএসএফের গুলি খেয়েছে দুবার—একবার কানে লেগেছে আর একবার দাবনার মাংসে। একদিন ভোরে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি এল। শুনি মা কান্নাকাটি করছে। উঠে দেখি ওর একটা কান ঝুলে আছে। ‘জীবনের মাক্কে চুদি’ বলে ও নিজেই একটানে ছিঁড়ে ফেলল। মা কানটা হাতে নিয়ে কাঁদতে থাকল আর ও হাঁড়িধরা তেনাটা রক্তাক্ত কানে চেপে ধরে চলে গেল চালানের খোঁজ নিতে। এর পরেরবার আমরা কিছুই জানতাম না। কয়দিন পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে বলল পায়ে গুলি খেয়েছে। এরপর থানা থেকে ডাক এল—দু তিন জনকে ধরে দেখাতে হবে। উপর থেকে চাপ এসেছে। কিন্তু থানার ভেতরে থেকেই কিভাবে যেন খুনের দায়ে ফেঁসে গেল। একমাত্র ছোটভাইটা আমাদের বেঁচে গেল। পড়ালেখায় ভালো ছিল। এর-ওর বাড়িতে থেকে গাঁয়ের স্কুল শেষ করে চলে গেল শহরে। আর ফেরে নি।

আর রইলাম আমি।

মা মারা গেলেন পেটের ব্যথায়। জানাজা হলো না তার। নতুন হুজুর বলল, বেশ্যার জানাজায় যে দাঁড়াবে সে বিনা বিচারে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। কেউ আর এল না। সমাজের গোরস্থানে কবর দেওয়ার অনুমতি চাইতে গিয়ে ফিরে এল বাবা। মায়ের লাশের পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মায়ের মৃত্যু সহ্য করতে পারলেও আমার পাষণ্ড বাবার সেই কান্না আমি সহ্য করতে পারি নি।

বাড়িটুকু ছাড়া আমাদের কোনো জায়গা ছিল না যে আমরা তাকে মাটি দেবো। দূরে এক নদী আছে তাও শুকনো, না হলে ভাসিয়ে দেওয়া যেত। লাশ গন্ধ হয়ে যাচ্ছিল দেখে বাবা রাতে উঠোন খোঁড়া শুরু করল। আমিও হাত দিলাম আরেকটা কোদালে। গর্ত অনেক গভীর করে পুঁতে রাখা হলো মাকে। আমার বয়স তখন বিশ কি একুশ। বাবা ফের বিয়ে করলেন। সংসারের এত ঘাটতি সহ্য হলেও এই একটি ঘাটতি তিনি কিছুতেই মানতে পারলেন না। প্রায় আমার বয়সী একটি মেয়েকে ঘরে তুললেন। আয়-রোজগার বলতে কিছুই ছিল না বাবার। নেশা করে করে শরীরটাও গেছে। সৎ মা যখন বুঝে গেলেন শরীরে থেকেও আমি অক্ষম, তখন আর আমার বাড়িতে থাকা হলো না। পেছনেই ছিল দাদির ঘর। আমি উঠে গেলাম সেখানে। আশি বছরের বৃদ্ধা, অভাবের সংসারে তার এই অনর্থক দীর্ঘজীবীতে আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পেতাম না। মাঝে মধ্যে মনে হতো বালিশ চাপা দিয়ে মেরে দিই বুড়িকে। না মেরে অবশ্য ভালোই হয়েছে। আমার একটা আশ্রয় জুটেছে। দাদি মারা যাওয়ার আগে পোলাও খেতে চেয়েছিলেন। বাবা গা করেন নি। প্রায়ই দাদি স্বপন সাহেবদের রান্নাঘরের পিছনে গিয়ে বসে থাকতেন পোলাওয়ের ঘ্রাণ নেবেন বলে। বসে থাকতে থাকতেই একদিন আর ওঠেন নি।


বেশ্যাবাড়ির মেয়ে হওয়ার চেয়ে পুরুষত্বহীন পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করা অনেক ভালো।


দাদির মৃত্যুর পর বাবাও চলে গেলেন। বয়সে অসুখে সব মিলেই। বাবার জানাজা হতে সমস্যা হয় নি। পুরুষ মানুষ বেশ্যা হয় না। হলে আমাকে একাই উঠোনে মাটি খুঁড়তে হতো। চাচ্ছিলাম জানাজা হোক না-হোক, দশে মিলে মাটিটা দিক। আনন্দের বিষয় সব ভালোমতোই হলো, আমাকে কিছুই করতে হয় নি।

একটা এতবড় পরিবার চোখের সামনে কেমন শূন্য হয়ে গেল। আমার বেঁচে থাকা, না-থাকার কোনো মানে হয় না। আমাকে দিয়ে পরিবার বৃদ্ধি হবে না। তবে এটুকু বুঝেছি, বেশ্যাবাড়ির মেয়ে হওয়ার চেয়ে পুরুষত্বহীন পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করা অনেক ভালো। অনেক অসুবিধার মাঝেও সুবিধা তাতে। অন্তত বেঁচে থাকা যায়। মৃত্যুর পর জানাজা মিস যায় না।

উঠোনজুড়ে শুয়ে আছে মা। একটা ঘরে আমি, বাকিগুলো পড়ে থাকে খালি। রাত গভীর হলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি, আমার খুব শুতে ইচ্ছা করে, একা মার পাশে। খুব পাপ করতে ইচ্ছা করে—বেশ্যার পাপ।

মোজাফ্‌ফর হোসেন

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৮৬। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক (গল্পগ্রন্থ, অন্যপ্রকাশ)
দ্বিধা [অন্বেষা, ২০১১]
আদিম বুদবুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ [রাত্রি, ২০১২]
অতীত একটা ভিনদেশ [বেহুলা বাংলা, ২০১৬]
পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা [অগ্রদূত, ২০১৯]

প্রবন্ধ—
বিশ্বগল্পের বহুমাত্রিক পাঠ [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
আলোচনা-সমালোচনা [অনুপ্রাণন, ২০১৪]
বাংলা সাহিত্যের নানাদিক [গ্রন্থকুটির প্রকাশনী]
বিশ্বসাহিত্যের কথা [বেঙ্গল পাবলিকেশন]

সাক্ষাৎকার—
প্রশ্নের বিপরীতে [অনিন্দ্য প্রকাশ]

সম্পাদনা—
বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ [দেশ, ২০১৭]
নির্বাচিত হেমিংওয়ে [আলোঘর প্রকাশিত]
কল্পে-গল্পে ইলিশ [গল্পসংকলন, সহ-সম্পাদনা, মূর্ধন্য প্রকাশনী]

প্রকাশিতব্য—
দক্ষিণ এশিয়ার ডায়াসপোরা সাহিত্য [গবেষণা, পাঞ্জেরী প্রকাশনী]
পাঠে-বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প [ছোটগল্পের তাত্ত্বিক গ্রন্থ, পাঞ্জেরী প্রকাশনী]

ই-মেইল : mjafor@gmail.com