হোম গদ্য গল্প বই থেকে : অবিশ্বাসীর কবর

বই থেকে : অবিশ্বাসীর কবর

বই থেকে : অবিশ্বাসীর কবর
507
0

এমন সুনসান নিরালায় বিরান একটা মাটির ঘরে নামতেই আবদুল কাদিরের মনটা না-আনন্দ না-দুঃখ এমন একটা অপরিচিত অনুভূতিতে ভরে উঠল। কালো গেরুয়া রঙের মাটি তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। কোনো শক্ত ইট-বালি দিয়ে বানানো বাসা তো নয় এটি। নতুন পেইন্ট বা সেদ্ধ মাংসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। শুধু একটা কাঁচা বাঁশের গন্ধ নাকে এসে ঘুর ঘুর করছে। অনেক দিন আগে এমন গন্ধের চিকন বাঁশের কঞ্চি দিয়ে একটা গুড্ডি তৈরি করেছিল সে। পরক্ষণে মনে হলো টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে কোথাও। তার গন্ধটা বাতাসে ছড়িয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। প্রায় ১২ ঘণ্টার বেশি তো হয়ে গেল। অথচ কেমন করে তার মন সবকিছু মনে রাখছে! সে যে মনে করার বিষয়টি ভুলে নাই, তা পরীক্ষা করার জন্য হাতের চারপাশের সবগুলো জিনিসের নাম মুখে আনল। একটার নামও ভুল হলো না। সাদা কাপড়, আতর, সুরমা, কাঁচা বাঁশ চড়ুই পাখির কিচিরমিচির, আমগাছের পাতা। আসার পথে নতুন নার্সিং হোম,‌ পুরান বাজার, বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার—সবকিছুর নাম মনে আসছে। এমনকি পাশের গাঙে ডুব দেওয়া মাছরাঙা পাখিটার নামটাও কেমনে মনে এল। এ কী করে সম্ভব! প্রায় ১২ ঘণ্টার বেশি তো হয়ে গেল। সুলায়মান আর নুরু কাঁধে করে শুইয়ে দিয়ে গেছে তাকে। তার মানে কী? সবকিছুই তো সে বুঝতে পারছে। তাহলে সে কি মরে নাই? তাহলে এই যে আজ সন্ধ্যায় তার একটা বন্দোবস্ত হলো। বাড়ির উঠোনে জেবুন্নেছা চিৎকার করে কাঁদল, এইগুলো কি সত্যি নয়! ছোট মতো ঘরটার দিকে সে তাকাল। এই সুন্দর নিরালা জায়গাটাকে মানুষ কবর কয়। কবর তো এর বাইরে থাকে। ওই যে বড় বড় গাড়িগুলি, প্রাসাদের মতো বাড়িগুলি, ওইখানে কবর থাকে। মিটিং-মিছিলে, নেতা নির্বাচনে, শপথে, গদিতে, ফাইলে, নথিপত্রে কবর থাকে। আমেরিকার হোয়াইট হাউসে একটা কবর আছে। তারপর দেশে দেশে যে সীমান্ত কাঁটাতার, ওইখানে কবর আছে। তার যেখানে কোনো নির্বাচন নাই, শপথ নাই, গদি দখল নাই, ফাইলপত্র নাই, যেখানে মন মতো থাকা যায়, ঘুমানো যায়, সবকিছু ভাবা যায়, এই জায়গাকে তো কবর বলা যায় না। এটি তো একদম তাদের গ্রামের বাড়ির সেই উত্তরের ঘরটা। ছোটবেলায় যেখানে বসে সে আমির, চান্দু, লতিফা, হারাধনের সাথে গল্পগুজব করত। পাখি ধরার ফাঁদ তৈরি করত। আবার একটু পরে সে ভাবল, এই একটা জায়গা, যেখানে কোনো ইচ্ছা হয় না, ইচ্ছা থাকলেও পূরণ হয় না। কোনো খাওয়া দাওয়া নাই, হাগা-মুতার চাপ নাই। কোনো সময় কোনো চাওয়া-পাওয়ার কথা মনে আসে না। শুধু মনে আসে, মানে মন এখানে খুবই জিন্দা। যদিও মনের ইশারায় কোনো কিছু আর ঘটে না। কিন্তু মন দিয়ে মিশিয়ে সবকিছু ঘটানো যায়। একটা মন-চালাচালির ম্যাজিক আর কি! যেমন সে এখন এই যে মনে করলেই চলে যেতে পারছে, কত দিন আগে কত কত পুরোনো হারানো জায়গায়। মনটাকে মনে হলো একদম হাওয়াই জাহাজ। যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবে সে চড়ে বেড়াতে পারছে। সে ভাবল, এখানে এই যে সে থাকছে, এই থাকাটা সবটাই তার। কারও কোনো দাবি নাই। বেশ দায়দায়িত্ব ছাড়া। আগে যেখানে সে থাকত সেখানে তার কোনো একার কিছু ছিল না। তার জীবন বলে যা ছিল, সেটি কেবলই অন্যের নামে বিলানো আরও দশজনের নামে লেখা। সে ভেবে দেখতে চাইল যে তার মা যখন বেঁচে ছিল, মা যখন তার পরনের কাপড় থেকে শুরু করে তার শোয়ার বিছানা পর্যন্ত গুছিয়ে দিত, তখন সে কেবলই তার ছিল। তার মাঠ তার নীল ঘুড়ি, খুশি খালাদের ছাদ। ছাদে ওঠার সেই সবুজ দরজাটা। কী রকম সবুজ ছিল এখনো চোখে ভাসে! তারপর চান্দের কান্দির বিশাল ঈদগাহর মাঠে তার একটা জীবন ছিল। স্কুলে যাওয়ার পথে আমির চাচার দোকানে রাংতা মারা একটা লেবুনচুষের প্যাকেটে জীবন ছিল। ঈদগাহ মাঠে যখন শীতের মেলা বসত, মেলার মধ্যে যখন বায়োস্কোপ দেখানোর ভিড় জমত, তখন রঙিন বায়োস্কোপের ছোট ছিদ্র দিয়ে দেখা সুন্দর মুখগুলো চরকির মতো ঘুরত। সেখানে তার একটা জীবন ছিল। মেথিকান্দা স্টেশনে যাওয়ার পথে একটা ছোট ব্রিজ ছিল। ব্রিজের নিচে বসে সে আর বন্ধু দুলাল বা দুলু মাছ ধরত। সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার মধ্যে একটা জীবন ছিল। যখন সে বড় হলো, মা মারা গেল, তার জীবন আর তার একার থাকল না। সে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল। তারপর একা থেকে সকলের হয়ে গেল। তার জীবন তার ভাইবোনের, পাড়া পড়শির, হেডমাস্টারের, সকাল-বিকাল চলে যাওয়া ওই ট্রেনটার, ওই পত্রিকা অফিসের ছোট টেবিলটার, টেবিলের ওপরে ঝিম মেরে বসে থাকা কালো মাছিটার।


মরার আগে যে ধর্ম করত, সেইটাই তার ধর্ম। মুসলমান থাকলে মুসলমান, হিন্দু থাকলে হিন্দু, খ্রিস্টান থাকলে তাই। এখন মিয়া কথা হইল, আমাগো কাদিরের কোনো ধর্ম আছিল কি না? 


এইসব ভাবতে ভাবতে আবদুল কাদির বুঝল যে তার চারদিকের দেয়ালে কেমন শীতের ফুরফুরানি বাতাস। কিন্তু সেই বাতাস তার চোখেমুখে লাগছে না। তার শীতও করছে না। যখন ওপরে আমগাছে বসা চড়ুই পাখিটা ফুড়ুত করে বাসার ভেতরে চলে গেল, তখন আবদুল কাদির বুঝল, এখানে শীতকাল আসা শুরু করছে। এই বাঁশ-বেতে মোড়া পাতায় ঢাকা মাটিঘেরা বাসাটি তার মন্দ লাগে না। এর সিঁড়ি ধরে সুলায়মান আর নুরু যখন তাকে নিচে রাখল, তখন তার মনটা একটু খারাপ হলো প্রথমে। তার মনে পড়ল জেবুন্নেছার কথা। মা মরা মেয়েটার এখন কী হবে? তাকে কে দেখবে? মেয়েটার বিয়ে শাদি তো সে দিয়ে যেতে পারল না। একসময় আবদুল কাদির মনে করল, এগুলো তার মনে আসছে কেন। এইগুলো তো মানবিক ব্যাপার। এখন তো তার সাথে মানবিকতার কোনো সম্পর্ক নাই। সে তো মরে গেছে। আবদুল কাদির ভুলতে পারল না যে জেবুন্নেছা বলতে তার কেউ নাই। থেকে থেকে মেয়েটার করুণ মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর কয়েকটা দিন থাকলে তো হয়তো সুলায়মানের হাতে মেয়েটারে তুলে দিতে পারত। সুলায়মান তো এই জন্য আরও বেশি করে তাকে দেখতে আসত। তার কাছ থেকে ফিলোসফির বই নেয়া, কার্ল মার্কসের আইডিয়া নিয়ে তর্ক করা বা আল্লাহর অস্তিত্ব যে একা একাই বোঝা যায়, এইগুলোর চেয়ে জেবুন্নেছার মুখটাই যে তার কাছে বেশি আনন্দের ছিল, সেটি আবদুল কাদির হলফ করে বলতে পারে। ছেলেটার বোঝাশোনা, পড়ালেখা মন্দ না। সবচেয়ে ভালো জিনিস হলো সুলায়মান মিথ্যা কথা বলে না। প্রায় বেকার। গোটা দুই টিউশনি করে ঘর-সংসার চালায়। তবু তো মেয়েটার একটা গতি হতো। এখন তো করার কিছু নাই। এখন তো মন ছাড়া তার কিছুই নাই। মনে মনে জেবুন্নেছার জন্য সে হাজারবার ভালো চাইল। হঠাৎ তার সকালবেলার কথা মনে এল। তাকে কবর দেওয়ার আগে যেসব কাহিনি ঘটল, আবদুল কাদির এখন সেইগুলো ভাবতে লাগল।

আবদুল কাদির যে আর ইহজগতে নাই, এটি সত্যি। কারণ, মরার পর তার জানাজা কারা পড়াবে, কারা তার কবর খুঁড়বে, কোন গোরস্তানে তাকে কবর দেওয়া হবে, এটি নিয়ে প্রথমে হাফিজুর, রহমান আর জয়নালের সাথে সুলায়মানের একটা ছোটখাটো ঝগড়া বেধে যায়। দূরে জেবুন্নেছা চুলার কাছে চুল খুলে পড়ে থাকে। ভাতের ডেকচির ছিদ্র দিয়ে কয়েকটা মাছি ভন ভন করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নাই। সকাল থেকে মেয়েটা কানতেছে। সুলায়মান বলে, হাফিজ চাচা, আপনে বুঝেন না কেন মরার পর মানুষের আর কোনো ধর্মকর্ম থাকে না। সে তো তখন বোবা-কালা একটা লাশ। কিছু দেখে না, বুঝে না। চাচা তো মুসলমানের সন্তান ছিল, নাকি? সে কথা শোনে হাফিজুর হাসে। বলে, বেডা কয় কী। মরার আগে যে ধর্ম করত, সেইটাই তার ধর্ম। মুসলমান থাকলে মুসলমান, হিন্দু থাকলে হিন্দু, খ্রিস্টান থাকলে তাই। এখন মিয়া কথা হইল, আমাগো কাদিরের কোনো ধর্ম আছিল কি না? আমাদের এলাকার সকলেই জানে যে কাদিরের কোনো ধর্ম আছিল না। সত্য তার নামটা মুসলমানের নাম। কেউ শুধু মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই মুসলমান হয় না। তাকে রীতিমতো আল্লাহরে স্মরণ করতে হয়, মসজিদে যাইতে হয়। সত্য কেউ কোনো দিন কাদিররে দেখে নাই কোনোদিন মসজিদে যাইতে। কোনোদিন এক ওয়াক্ত নামাজ পড়তে। তার কোনো ধর্মই ছিল না। সুলায়মান বলে, ভুল কইলেন, চাচা। মানুষের বাইরেরটা দেইখা কিছু চেনা যায় না। ভেতরটাই আসল। আমার আর নুরুর লগে তার যে কথাবার্তা হইত, তার থেইকা বোঝা যায় যে তার একটা ধর্ম ছিল। সে তো কোনো দিন আল্লাহ তালারে অবিশ্বাসের কিছু কয় নাই। নুরুরে সে একদিন কোরান শরিফ খুইলা মানুষের ধর্ম, মানুষের আসল পরিচয় দেখাইছে। আল্লাহরে কিভাবে ডাকতে অইবো, দেখাইয়া দিছে। এতে মুখে পান দেওয়া আবদুর রহমান চিৎকার করে ওঠে, কাদির যে পত্রিকাতে কাজ করত, সেটা তো নাস্তিকদের পত্রিকা। জানো না তোমরা। কাদির কোরান শরিফ ঘাঁইটা ঘাঁইটা আমাগো নবী-রাসুল আর ইসলামরে নিয়া উল্টাপাল্টা গবেষণা করত। একবার তো তার একটা লেখার কারণে বায়তুল মোকাররম মসজিদে অই পত্রিকা অফিস পুড়ানোর সিন্ধান্ত হইছিল। কিন্তু পুলিশে আটকানোর কারণে মুসলিমরা এই পবিত্র কাজটি করতে পারে নাই। নু্রুর দোকান আজ তাড়াতাড়ি বন্ধ করছে। সকালেই সে খবর পায় যে আবদুল কাদির চাচা ইন্তেকাল করছে। কয়দিন ধরেই চাচার শরীরটা খারাপ। মরার আগে প্রায়ই দোকানে এসে আবদুল কাদির বসে থাকত। আগে খালি পত্রিকা-ম্যাগাজিন-বইপত্রের খোঁজ রাখত। কিন্তু মাসখানেক হলো চাচা আর এইগুলোর কোনো খবর রাখে না। ফ্যালফ্যাল করে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকত। আর যদি কথা বলত, তাহলে তার মেয়েটার কথা, মানে জেবুন্নেছার কথা বলত। মেয়েটা কবে বিএ পাস করে বাসায় বসে আছে। মাঝখানে একটা এনজিওতে চাকরি করত। অফিস এখন গাজীপুরে নিয়ে যাওয়ার কারণে জেবু সেখানে যায়নি। আর গায়ের রঙটা একটু ময়লা দেখে বিয়ে শাদির প্রস্তাবও আসে না। লাশের পাশে বসে আছে নুরু। এসব কথা শুনে তার মন বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। বলে, চাচা তো কোনো খারাপ কাজ করে নাই। নামাজ পড়ে নাই, রোজা রাখে নাই, এটা সত্য। তবে কারোর পয়সাকড়ি তো উনি চুরি করে নাই। জমিজমা বেদখল করে নাই, কোনো দিন হারামের পয়সা খাইছে বইলা শুনি নাই। উঠোনের এক কোনায় দাঁড়ানো জয়নাল আবেদীন একরকমের উদাসীনই ছিল। নুরুর কথা শুনে সে এদিকটায় এগিয়ে এল। নতুন পার্টিতে সেক্রেটারির পদ পাওয়ার পর তার গায়ের রঙ আরও ফরসা হয়ে উঠেছে। মনে হয় ইরান আফগানিস্তানের কোনো পাঠান। ঠিক সুলায়মানের বাপের বয়সী। বলে, তুমি কিছু বুঝবা না, সুলায়মান। কাদিরের মতো তুমিও একটা খবিশ হইছ। নাস্তিক হইছ। কাদির তো সারা দিন ধর্মের নামে উল্টাপাল্টা কথা কইত। আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়া লেখালেখি করছে। আরে মিয়া, আল্লাহরে নিয়া কোনো প্রশ্ন চলে? যত সব ফাজিল লোকজন, জাহান্নামের কীট। শোনো মিয়া, এই গ্রামে কাদিরের কোনো জানাজা হইব না। তার লাশ এই সিরাজনগরের গোরস্তানে কবর দেওয়া যাইব না। তোমরা যদি পারো, অন্যদিকে নিয়া যাও। নাইলে পারলে নদীতে ভাসাইয়া দিয়া আসো। এ কথা শুনে উঠোনের দক্ষিণে চুলার পাশে মাটিতে শোয়া জেবু চিৎকার করে ওঠে। বাবা গো… তুমি কই গেলা। বাবা গো…তুমি কই গেলা। এইভাবে সে একবার ধপাস করে পড়ে বেহুঁশ। সুলায়মান কুয়া থেকে পানি ঢালে। জেবুর হুঁশ এলে আবারও বলে, বাবা গো, কই গেলা…

সুলায়মান আর নুরুর লাশটারে তাড়াহুড়া করে একরকমের ধোয়ানোর ব্যবস্থা করে। নুরু কুয়া থেকে বালতি বালতি পানি তোলে। শীতের রাত, সমস্ত হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। তবু হাত চলে। বাড়ির ভেতর একটা সাদা চাদর ছিল। ওইটা দিয়েই সুলায়মান কাদিরকে ঢেকে দেয়ার ব্যবস্থা করে। চোখে সুরমা লাগায়, সুগন্ধি পানি কাপড়ের ওপর ছিটিয়ে দেয়। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে পড়েছে। আশপাশের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠছে। কিন্তু আশ্চর্য, কোনো মানুষজন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সুলায়মান উঠোনের উত্তর-দক্ষিণ সবদিকের বাড়িগুলোর দরজার মধ্যে টোকা দেয়। ভাই, একটু আসেন। জানাজা পড়তে হইব। কেউ বেরিয়ে এল না। আবার বলে, ভাই, একটু বার হইয়া আসেন। ভেতর থেকে প্রথমে মেয়েলোকের শব্দ বের হয়ে আসে। যাও। বেডাটা তো মইরা গেছে। এতে পুরুষমানুষের গলা অনেক ওপরে ওঠে। যাও মিয়া, অবিশ্বাসীর আবার জানাজা কী? সুলায়মান নুরুকে নিয়ে একটা লাইন করে দাঁড়িয়ে গেল। জানাজা শেষ হলে নুরু বলে, বাস ডিপোর পাশে একটা গোরস্তান আছে না। চাচারে ওইখানেই কবর দিয়া আসি চল। রাত হইলে সবকিছু উল্টাপাল্টা হইয়া যাইব। চোখে কিছু দেখুম না। আমার তো আবার রাতকানা রোগ আছে। সুলায়মান লাশের চারদিকে একটা চটির মতো কিছু বিছিয়ে দিল। তারপর দুইজনে ধরে চটি দিয়ে লাশটাকে মুড়িয়ে দিল। না এত তো ভারী লাগে না। সুলায়মান বলে, সাবধানে নুরু। সদর রাস্তা দিয়ে না গিয়ে ওরা পেয়ারাবাগান, নতুন নার্সিং হোম, পুরান বাজারের মধ্য দিয়ে লাশটাকে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে লাগল। বাস ডিপোর পাশে এই কবরস্থানটা এত বড় কিছু না। কয়েকটা কবর ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে আছে। বোঝা যায় যে কেউ যত্ন করে না খুব একটা। ওরা যখন কবরস্থানের গেট খুলে ঢুকল, তখন প্রায় রাত হয়ে গেছে। সদর রাস্তায় দাঁড়ানো স্ট্রিট খাম্বা থেকে আলো এসে পড়ছিল। সাঁই সাঁই করে ট্রাক-বাস গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে। সেদিকে কারও খেয়াল নেই। সুলায়মান যখন মাটিতে শেষবারের মতো কোদাল চালাল, তখন বেশ একটা মানুষ রাখার গর্ত হয়ে গেছে। একেবারে আবদুল কাদির সাইজের।


শালা, এবার মজা বুঝবি। একটু পর যখন মাটি দুই দিক দিয়া চাপা দিব, নাক দিয়া মায়ের দুধ বাইর করব, তখন বুঝবি কী মজা।


কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর আবদুল কাদির তিনজন মানুষের কথা শুনতে পায়। প্রথমটা হাফিজের গলা। শালা, এবার মজা বুঝবি। একটু পর যখন মাটি দুই দিক দিয়া চাপা দিব, নাক দিয়া মায়ের দুধ বাইর করব, তখন বুঝবি কী মজা। কত কইলাম, মসজিদে আয়, আমাগো লগে নামাজ পড়। মজলিশে আয়, বিভিন্ন জায়গা থাইকা আসা মওলানা গো লগে কথা চালাচালি কর। দ্বিতীয় গলা আবদুর রহমানের। লেখালেখির সবই আল্লাহ, রসুলের বিরুদ্ধে। ধর্মকর্মের বিরুদ্ধে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে। এবার বুঝ হালার পো। গুয়া দিয়া যখন গরম শিক হান্দাইব, তখন আব্বা আব্বা কইয়া কূলকিনারা পাইবা না। তোর দর্শনবিদ্যা, তোর দেশপ্রেম, তোর লেখালেখিরে এখন ডাক দে। দেখ এইগুলান তোরে উদ্ধার করতে পারে কি না। তৃতীয় গলা জয়নালের। মুরদাদটারে কত বুঝাইলাম। আমাদের সাথে আয় আর দ্বীনের খিদমত কর। মায়াটা তো জোয়ান হইছে। সেদিকে কোনো খেয়াল নাই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি-বাকরিতে পাঠাইয়া মাইয়া ছাওয়ালটার লজ্জার মাথা খাইছে। কবরের ফেরেশতারা যখন সেই পাপের কথা জিগাইব, কী উত্তর দিবা। আগুন আর সাপের ছোবল খাও এহন।

আমগাছ থেকে একটি পাতা পড়ল। ছোট গাঙে একটা ব্যাঙ ডেকে উঠল ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ…। হাফিজুর, আবদুর রহমান, জয়নাল এখন অনেক দূরে চলে গেছে। ওরা আর আবদুল কাদিরকে কিছু করতে পারবে না। কাদির এখন তাদের সমালোচনার বাইরে, বিচারের বাইরে। সে এবার মনটাকে আবার চালান দেয়। জানালা খুললেই দেখা যাবে সামনের মাঠ থেকে হু হু করে বাতাস আসছে। একটু একটু করে সকাল হয়ে উঠছে। জেবু চুল বেঁধে রান্নার ঘরে ঢুকছে অথবা কুয়া থেকে পানি উঠাচ্ছে। দূরে মন খারাপ করা ট্রেনের হুইসেল। কোথাকার কোন যাত্রী বিনা টিকিটে উঠে যাচ্ছে রেলের কামরায়। পাশে নার্সিং হোম, পুরান বাজারের মাছের দোকান, বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। কাচের ওপরে হাজার হাজার মাছি। সেলুন থেকে গান বাজছে… খাঁচার ভিতর অচিন পাখি। মা ধোয়া শার্ট তুলে রেখেছে আলমারিতে। এ রকম ভাবতে ভাবতে আবারও কাদিরের মনে হলো, সে এগুলো ভাবছে কিভাবে। সে না মৃত! পনেরো-বিশ ঘণ্টা আগে সুলায়মান আর নু্রু তাকে এখানে এই মাটির ঘরে শুইয়ে দিয়ে গেছে। এখন তো অনেকক্ষণ হয়ে গেল। এখনই বুঝি প্রশ্নকর্তারা আসবে। তাকে তিনটি প্রশ্ন করবে। তাই সে মনে মনে একটা প্রস্তুতি নেয়। তাকে তিনটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। তিনটা প্রশ্নের যে উত্তর দিতে হয়, আগে এ রকম কথা সে ছোটবেলায় মায়ের কাছে শুনছিল। তিনটা প্রশ্ন তার মনে থাকলেও এর সঠিক উত্তর তার মনে আসছে না। তার ক্রমশ দুই চোখ জড়িয়ে আসছে। তার মানে সত্যি সত্যি সে কি মরে যাচ্ছে! আমগাছের গর্তে লুকানো চড়ুই পাখিটা আবারও বাইরে এল। চিড়িং করে একটা শব্দ হলো। রাত মনে হয় অনেক হয়ে গেছে। কোনো সাড়াশব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। এতক্ষণ  সাঁই সাঁই করে যে গাড়িগুলোর চলার শব্দ আসছিল, সেগুলোও আর নাই। দুই পথিক বাজারদরের কথা বলতে বলতে চলে গেল। এর মধ্যে একটি মেয়ের কথাও শোনা গেল। বলে, বস খালি আমারে রুমে ডাক দেয়। কাজ নাই, কাম নাই, খালি বসাইয়া রাখে। কী করুম। চাকরিটা তো ছাড়তে পারি না। ছোট ছোট পোলাপান লইয়া না খাইয়া মরতে অইব। আস্তে আস্তে এইগুলোও আর শোনা যায় না। আমগাছ থেকে দুটো-একটা পাতা উড়ে পড়ে ঘরের চালে। একদম কাদিরের বুকের কাছে পাতাগুলো। সবুজ পাতার স্পর্শে কাঁচা মাটির গন্ধটা আরও বাড়ে। এতে সে আরও নিশ্চিত হয় যে কেউ হয়তো এখনই আসবে। আবদুল কাদির সেই তিনটা প্রশ্নের জবাব খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তার কিছুই মনে পড়ে না। তাহলে সে কী জবাব দেবে? কী বলবে সে? সে ভাবে, তার মনের ওপর তার কোনো জোর নাই। মন তো জন্মের আগেই তৈরি হয়ে গেছে। মনটাকে এই রকম উত্তরহীনভাবে কেউ তো সৃষ্টি করে দিছে। তার মানে তাহলে উত্তর তো ইতিমধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে। এখন তার পারা আর না পারার মধ্যে কোনো ফলাফল নির্ভর করতেছে না। সে আবার মনে করে প্রশ্নের উত্তর আগেই দেওয়া হয়ে গেছে, যেদিন সে মায়ের পেটে ভ্রূণ হিসেবে এসেছিল। সে উত্তর দেবে কি দেবে না বা মানুষ হিসেবে তার বিকল্প কিছুর চিন্তা করা কোথাও ভাষা হয়ে লেখা আছে। তাহলে তার কথা বলতে হবে কেন? এ রকম একটা অবস্থায় তার হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল। মা তাকে বলছিল, বাবা, আল্লাহ মেহেরবান। সব সময় সোজা পথে চলবা আর অসৎ কাজের বিরুদ্ধে কাজ করবা। তাইলে দেখবা তোমার কোনো বিপদ হইব না। আবদুল কাদির ভাবল, মায়ের কথাটা তার মন থেইকা কখনো সরে নাই। তাইলে এইগুলো কি প্রশ্নের উত্তর? কেউ এসে প্রশ্ন করলে এই কথাই কি সে বলে দেবে? এসব ভাবতে ভাবতে তার গলাটা একটু শুকিয়ে যায়। কিন্তু গলা ভেজানোর কাতরতা সে খুঁজে পায় না। কারণ, সে ভাবে সে মৃত। মৃতের তো কোনো পিপাসা লাগে না। একসময় তার ঘুমানোর চিন্তা মাথায় আসে। কাল তার অনেক কাজ বাকি। কতগুলো লেখা শেষ করতে হবে। মিজানের কাছ থেকে আনা বইগুলো ফেরত দিতে হবে। চোখ বন্ধ হওয়ার আগে সে ভাবল, একটু পরেই জানালা খুলে প্রথমে উঠোনে জেবুর ছায়াটা আর চুলায় গনগনে আগুনের উড়াল দেখা যাবে। সকালের ট্রেনটা সিরাজনগর স্টেশনে আসতে এখনো প্রায় চার ঘণ্টা বাকি।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ।

পেশা : ইংরেজির শিক্ষক, নাভিটাস ইংলিশ ফেয়ারফিল্ড কলেজ, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সিজদা ও অন্যান্য ইসরা [চৈতন্য, ২০১৬]
ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে [চৈতন্য, ২০১৫]
নো ম্যানস জোন পেরিয়ে [শুদ্ধস্বর, ২০১২]
জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি [নিসর্গ, ২০১২]
শাদা সন্ত মেঘদল [নিসর্গ, ২০১১]
গানের বাহিরে কবিতাগুচ্ছ [নিসর্গ, ২০১০]
পলাশী ও পানিপথ [নিসর্গ, ২০০৯]
বাল্মীকির মৌনকথন [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৬]
শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৫]

গদ্য—
কবিতার ভাষা [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : abusayeedobaidullah@gamail.com