হোম গদ্য গল্প প্রিয় গুলমোহর

প্রিয় গুলমোহর

প্রিয় গুলমোহর
231
0

কমল যোগাযোগ করল কত বছর পরে? তা কুড়ি বছর তো হবেই! এতগুলো বছর পরে যৌবনের ঘনিষ্ঠতম সঙ্গ কমলের ফোনকল যে আসবে তা আশাই করে নি তিরা। তিরার বয়স যখন আঠার থেকে চব্বিশ তখন যেসব মানুষের সাথে তার আলাপ হয়েছিল বা ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল তাদের বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে কোথাও। সেই উত্তাল সময় থেকে উঠে এসে, প্রায় কুড়ি বছর পরে, এক সন্ধেবেলায় কমল ফোনে তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাকে আমি যে চিঠিগুলো লিখেছিলাম সেগুলো কি এখনো আছে তোমার কাছে?’

এমন প্রশ্ন শুনে হতবিহ্বল হয় তেতাল্লিশের তিরা। পুরনো দিনগুলোর কথা সে ভাবতে বসে : এই সেই কমল একদা যার সাথে সে জীবনের পথে হাঁটতে চেয়েছিল, বুড়ো হতে চেয়েছিল। তখন তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর তার চাইতে বয়সে বার বছর বড় চারুকলার প্রাক্তন ছাত্র কমল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার নবীন নকশাবিদ। তিরার বাল্যবন্ধু চুমকির ফুফাত ভাই কমল। তিরা আর তার সিদ্ধেশ্বরী-এলাকার পড়শি চুমকি যখন ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ত তখন কমলের সাথে পরিচয় ঘটে তিরার। কালক্রমে তিরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তখন কমল আর তিরা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়। সেই সময়টায় এই কমল তাকে প্রায়শই চিঠি লিখত, কমলের চিঠির উত্তর দিত সে নিজেও! সম্পর্কের শুরুর দিকে তিরাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসার ঠিকানায় ডাকে আসত কমলের চিঠি। মূলত শান্তিনগর অথবা দিলকুশা পোস্ট অফিস থেকে চিঠি ফেলত কমল। তা’ছাড়া এমনো হয়েছে যে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, জিপিও, মিরপুর, কারওয়ানবাজার, গুলশান অথবা খিলগাঁও পোস্ট অফিসের সিলেও কমলের চিঠি এসেছে তিরার ঠিকানায়। কমল তখন তার মা-বাবা’র সাথে থাকত মালিবাগে। লুকিয়ে তিরাদের বাসায় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে হাতে-হাতেও কমল তাকে চিঠি দিয়েছে বিস্তর। চিঠিগুলো পড়ার পরে তিরা তার আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখা শাড়ি আর সালয়োর-কামিজের পেছনে একটা জুতোর বাক্সে সযত্নে লুকিয়ে রেখে দিত চিঠিগুলো। চিঠি জমতে জমতে ভরে গিয়েছিল প্রথম বাক্সটা। তারপর আমদানি করা হ’ল দ্বিতীয় বাক্স, তারপর তৃতীয়, তারপর চতুর্থ…। তিরার যতদূর মনে পড়ে, এখন থেকে বছর পনের আগে একবার শুদ্ধি অভিযান চালানোর সময় সে কমলের চিঠিগুলো সব সুতলি দিয়ে বেঁধেছিল, তারপর একটা ট্রাঙ্কে চিঠিগুলো ভরে রেখেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ের নানান জরুরি জিনিসপত্তরের সাথে। বিবিধ ব্যস্ততার চাপে কমলের চিঠিগুলোর কথা তার যে কখনো মনেই হয় নি, এমনটা নয়! মনে হয়েছে। তবে চিঠিগুলোর প্রসঙ্গ এমন জরুরি হয়ে যে ফিরে আসবে কোনোদিন, তাকে বিদ্ধ করবে বিষণ্নতায়, অস্থিরতায় তা সে মোটেই ভাবে নি।

প্রায় কুড়ি বছর পরে কমল যখন তিরাকে লেখা তার চিঠিগুলোর হদিস জানতে চায় তখন তিরার মনে পয়লাতে ভাবনা আসে : কালো ট্রাঙ্কটা তবে কোথায় যেখানে সে জমিয়ে রেখেছে কমলের চিঠিগুলো? তিরা মনে করতে পারে, তাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় সে যে ঘরটায় একদা থাকত সেখানে সেই কালো ট্রাঙ্কটা পড়ে ছিল অনেকদিন। তারপর ট্রাঙ্কটা সে আর তার প্রাক্তন ঘরে দেখে নি অনেক দিন ধরে! নিশ্চয় সেখান থেকে ট্রাঙ্কটা সরিয়েছে কেউ! দ্বিতীয়ত, তিরার মনে প্রশ্ন জাগে : এতগুলো বছর বাদে চিঠিগুলো দিয়ে কী করতে চায় কমল? নিজের লিখা চিঠি বলে কমল চিঠিগুলো দাবি করবে?

ফোনের অপর প্রান্তে তিরার উত্তরের জন্য অপেক্ষরত কমলকে অবশ্য সে সব কিছুই আর জিজ্ঞাসা করা হয় না তিরার। সংক্ষেপে সে বলে, ‘আচ্ছা! খুঁজে দেখব, কেমন?’ তারপর সে কমলের দিনকাল কেমন কাটছে তার কিছু খবরাখবর নেয়। কমল অবশ্য তাকে জিজ্ঞাসা করে না ব্যক্তিগত কোনো কিছুই। সে দিনের মিনিট পাঁচেকের কথোপকথন এভাবেই শেষ হয়ে যায়।


আমরা কোনোদিন পরস্পর পরস্পরকে চুমু খাই নি।


ফোন রেখে দেয়ার পরে তিরার মনে পড়ে যায় বিভিন্ন পোস্ট অফিসের কালো সিল মারা অজস্র হলুদ খামের কথা। ই-মেইল বা ফেইসবুকের মতো তাৎক্ষণিক যোগাযোগের যুগে সেই সব হলুদ খামের কথা ভুলে গেছে সবাই। খামগুলোর ভেতরে অমল-ধবল চিঠি ছিল, চিঠিতে কখনো উচ্চকিত, কখনো ম্রিয়মাণ শব্দাবলি। সাদা অথবা লাইন টানা বিভিন্ন মাপের কাগজে, কখনো সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে উল্টোদিকে বলপয়েন্টে তিরাকে চিঠি লিখছে কমল। শব্দ নিয়ে সেখানে খেলা চলছে এন্তার, পরিচিত শব্দের পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন সব শব্দের, শব্দের পরে শব্দ বসিয়ে বাক্য সাজানো চলছে। চিঠিগুলো থেকে ভেসে উঠছে শব্দগুলোর অন্তর্গত স্বর, রহস্যময় সব চিত্র, চিত্রকল্প। এমনো হচ্ছে, শব্দের ফাঁকে ফাঁকে মূর্ত হয়ে উঠছে কমলের না-বলা সব কথা যেন চিঠির ভেতরে কায়দা করে কমল লুকিয়ে রেখেছিল সেসব অশ্রুত বাণী। লুকিয়ে লুকিয়ে বারবার চিঠিগুলো পড়ছে তিরা। কখনো সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকছে শব্দগুলোর দিকে মমতায়। মনে মনে তখন কমল নামের যুবকের সাথে সে কথা বলছে সারা রাত, সারা দিন আর তার মনেও জন্ম নিচ্ছে অযুত-নিযুত সব শব্দ। শব্দ তো শব্দেরই জন্ম দেয়! শব্দ যেখানে নিষ্ফলা, সম্পর্ক সেখানে মৃত নদী। সেই সব অপরূপ শব্দরাজিকে তিরা নিজেও বন্দি করে ফেলতে চাইছে কাগজে, কলমে; ফেলছেও।

তিরাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসার ঠিকানায় প্রথম প্রথম সপ্তাহে কমপক্ষে তিন-চারটা চিঠি আসছিল কমলের। ক্লাসের ফাঁকে মাঝে মাঝে নিউ মার্কেটের পোস্ট অফিসে গিয়ে কমলের চিঠির উত্তর ছাড়ছিল তিরা। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শ্রাবণ’ রুটের বাসে চেপে বাসায় ফেরার সময় শান্তিনগর পোস্ট অফিসে সে থামছিল কমলের উদ্দেশ্যে চিঠি ফেলার জন্য। আবার এমনো হয়েছে যে কোনো পোস্ট অফিস থেকে খালি খাম কিনে ব্যাগে রেখে দিচ্ছে তিরা এবং পরে কমলকে লিখা চিঠি ভরে সে খাম ফেলছে রেজিস্টার বিল্ডিং বা টিএসসি’র ডাকবাক্সে। তিরা আর কমলের ভেতরে চিঠির এমন আদান-প্রদান চলেছিল বছর পাঁচেকের সম্পর্কের সময়টায়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানত ব্যাপারটা।

কমলকে একদিন তিরা প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা! আপনি তো হাতে-হাতেই চিঠি দিতে পারেন আমাকে! কষ্ট করে পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠি ফেলতে হবে কেন?’

উত্তরে কমল বলেছিল, পোস্ট অফিসে গিয়ে লাল ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার ভেতরে একটা উত্তেজনা আছে। কমল বলেছিল: শান্তিনগর বা তার অফিসের কাছের দিলকুশা পোস্ট অফিসে সুযোগ মতো কমল থামে প্রায়শই; তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে সে একটা হলুদ খাম কেনে; জামার পকেট থেকে চিঠি বের করে খামটার ভেতরে ঢুকিয়ে জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে ফেলে খামের ঢাকনার প্রান্তে মিশিয়ে রাখা গাম; তারপর খামটাকে সে ফেলে দেয় গেটের কাছের লাল ডাকবাক্সটায়। কোনোদিন সে রাত জেগে তিরাকে চিঠি লিখে চিঠিটা হলুদ খামে ভরে পকেটে খামটা নিয়ে অফিসে চলে যায়; অফিস শেষে আড্ডা দেয় এখানে-ওখানে; তারপর কাছের ধারের কোনো ডাকবাক্সে সে ফেলে দেয় খামটা। এই পুরো প্রক্রিয়ার ধাপে ধাপে পত্রপ্রেরকের ব্যক্তিগত উত্তেজনা জড়িয়ে আছে। এটাই আসলে লক্ষ করার ব্যাপার। কমলের যুক্তি শুনে হেসেছিল তিরা এবং সে নিজেও এমন দুর্দমনীয় উত্তেজনা অনুভব করার জন্য শান্তিনগর বা নিউ মার্কেট পোস্ট অফিস অথবা বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসের কোনো ডাকবাক্সে কমলের ঠিকানায় চিঠি ফেলেছে অনেকবার।

তবে ঝামেলা লেগেছিল তিরাদের বাসাতে একদিন। মাস দুয়েক ধরে যখন সপ্তাহে তিন-চারটা করে কমলের চিঠি আসতে শুরু করল তিরাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসার ঠিকানায় তখন তিরার বড় বোন ধরে বসল তিরাকে, ‘আচ্ছা! কে তোকে এত চিঠি পাঠায়, বল তো? খামে একই মানুষের হাতের লেখা! এত চিঠি লিখার কী হ’ল, তা তো বুঝলাম না!’

প্রমাদ গুনেছিল তিরা। সে বুঝে নিয়েছিল যে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে চিঠি আদানপ্রদান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তা না-হলে তাকে বড় আপার অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে বারবার।

ডাকে চিঠি ফেলা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে খুব মন খারাপ করেছিল কমল। তিরাকে সে বলেছিল, ‘এবার?’

‘কী আর করা! আমার হাতেই চিঠি দিয়েন!’ সমাধান দিয়েছিল তিরা। কিন্তু প্রেরক এবং প্রাপকের সরাসরি সংযোগ অবিশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠাতে অস্বস্তিতে মিইয়ে গিয়েছিল কমল। তবু সপ্তাহে অন্তত একটা চিঠি কোনো খামে ভরে মতিঝিলের অফিস থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে যেত কমল অথবা সে চলে আসত তিরাদের পড়শি চুমকির বাসায়; আড্ডার কোনো এক ফাঁকে তিরার হাতে চিঠি তুলে দিত সে। অর্পণের সেই ক্ষণগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে তিরার : সংকোচে প্রেরকের মুখটা ঘেমে নেয়ে গেছে! একটু একটু করে কাঁপছে চিঠি ধরে রাখা তার হাতের আঙুলগুলো। হাসতে হাসতে তিরা কমলকে বলছে কখনো কখনো : পারকিনসন নাকি? অস্বস্তিতে কোনো উত্তর করছে না কমল।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে কেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে চিঠি লিখবে। ব্যাপারটা তো এমন নয় যে তারা দু’জনে দুস্তর ভৌগোলিক দূরত্বে বাস করছে যেখান থেকে কথা আদানপ্রদানের জন্য চিঠি লিখা ছাড়া আর কোনো উপায় বাকি নেই। তা’হলে, তারা দু’জনেই যখন একই শহরে থাকছে—বড় জোর এক কিলোমিটার দূরত্বে, মাঝেমাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেখাও হচ্ছে তাদের, নইলে চুমকিদের বাসায় আড্ডা চলছে কখনো কখনো, তিরার উদ্যোগে লুকিয়ে ফোনে কথাও হচ্ছে কালেভদ্রে তবে তিরাকে কমলের চিঠি লিখার কী প্রয়োজন ছিল?

কলাভবনের তিনতলার উত্তরে অর্থনীতি বিভাগের অফিসের পাশে কানু দা’র দোকান ছিল তখন। সেখানে একটা বেঞ্চে বসে আলুর চপ খেতে খেতে অফিস-পালানো কমলকে তিরা জিজ্ঞাসা করেছিল একদিন, ‘আচ্ছা! কেন আপনি আমাকে চিঠি লিখবেন, বলেন তো?’

চা শেষ করে সিগারেট ধরিয়ে, ধুঁয়া ছেড়ে কমল বলেছিল : মেয়েটার সুন্দর চোখে যখন প্রথম চোখ পড়ে আমার তখন কী হ’ল, জান? শব্দে শব্দে ভরে গেল আমার হৃদয়! হাজার হাজার শব্দ কোথাও থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তখন আমাকে আরো নির্জন করে দিল শব্দরা! তাই শব্দগুলোকে মুক্ত করার জন্য চিঠি লিখতে শুরু করতেই হ’ল আমাকে। মানুষের নির্জনতা তো অপরের সাথে যোগাযোগ তৈরি করার জন্য খোঁচাতে থাকে সারাক্ষণ!

‘এত প্রশ্ন কেন গুলমোহর? আমি যে তোমাকে চিঠি লিখি সেটা কি তোমার পছন্দ নয়?’ এই বলে মুচকি হেসেছিল কমল। ‘গুলমোহর’ নামে কমল তাকে ডাকত তখন। কেন? তিরা হাসলে নাকি গুলমোহরের পাতার ঝিরঝির শব্দ উঠত, কমল চোখ বন্ধ করলে নাকি হেসে উঠত রক্তবর্ণের অজস্র গুলমোহর ফুল! তিরা বলত : বদ্ধ উন্মাদ আপনি! তবে বুকের ভেতরে ঠিকই কাঁপন উঠত তার!

‘বেশ! তবে আপনার কথাগুলো তো সামনাসামনি আমাকে বল্লেই হ’ত! হ’ত না? দেখা তো হচ্ছেই!’ প্রশ্ন করেছিল তিরা।

তিরার এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে কী উত্তর আসতে পারত? তিরার মনে হয়েছিল, কিছুটা মুখচোরা কমল নিজেকে প্রকাশের জন্য চিঠি লিখা ছাড়া আর কিইবা করতে পারবে? কিন্তু কমল বলল অন্য কথা। একটা চিঠিতে সে লিখল : কাগজে আমরা যেসব শব্দ লিখি তাদের চরিত্র আলাদা। ঐ একই শব্দ আমরা যখন মুখে বলি; শব্দের পরে শব্দ সাজিয়ে বাক্য বানাই উচ্চারণের পরে তারা হারিয়ে যায় মহাশূন্যের কোথাও—এক সেকেন্ড পরেই তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, স্মৃতি থেকে খুব জলদি মিলিয়ে যেতে থাকে তারা। আর তখন আমাদের মাঝে কেবল জেগে থাকে মোটা দাগে কিছু শব্দ। তাইই সামনাসামনি কথা বলার চাইতে শব্দগুলোকে একটা স্থায়ী ঠিকানা দেয়া ভালো, যেটা চিঠির মাধ্যমেই সম্ভব। তা’ছাড়া কাগজে লিখা শব্দের অন্তর্গত একটা স্বর তো থাকেই, শব্দের বিন্যাস নতুন মাত্রাও তৈরি করে তখন—শব্দগুলোর পিছে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ভিন্ন অর্থ। লিখিত বাক্যের ভেতর থেকে জেগে ওঠে আমাদেরকে অবাক করে দেয়া সেই রহস্যময়তা—হরষে, বিষাদে! তখন পুরো চিঠিটা বারবার পড়ছ তুমি এবং প্রতি পঠনে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন সব অর্থ। চিঠিতে শব্দের এমন বিন্যাস কি অভূতপূর্ব নয়? আবার দেখো গুলমোহর, চিঠিটা পড়া শেষ হলে ভাঁজ করে চিঠিটাকে তুমি নিরাপদে রেখে দিচ্ছ কোথাও আর তখন চিঠির শব্দ আর বাক্যগুলো নিয়ে ভাবতে বসছ তুমি। তখন আবারো অশ্রুতপূর্ব সব মাত্রা যোগ হচ্ছে তোমার মনে। হচ্ছে না? আচ্ছা! এসব গুরুগম্ভীর কথা বাদ দেও তো! এবার ভাব, চিঠির কিন্তু প্রাণ আছে! সারাক্ষণ তোমার বুকে রিনরিন করে বাজছে উচ্চকিত অক্ষরগুলো। তাইই না? অনির্বচনীয় সে আনন্দ!

এত কথার প্রয়োজনটা কী, শুনি? চিঠির উত্তরে তিরা লিখে : এত কথা না-বলে সোজাসুজি বলতেন যে আমার সাথে সামনাসামনি কথা বলতে গেলে কথা আটকে যায় আপনার। এমনই মুখচোরা আপনি!

তিরার কৌতুকের উত্তরে কমল লিখে : তুমি আমাকে যতটা মুখচোরা ভাবছ ততটা মুখচোরা আমি মোটেই নই! বাজে কথা!

সামনাসামনি কমল লাজুক হলেও এলেবেলে কথায় ঠিকই অংশ নিচ্ছে সে। তিরা যদি জিজ্ঞাসা করছে—কাল সন্ধ্যেবেলায় কী করলেন আপনি অথবা আজও কি মালিবাগ মোড়ে বিরিয়ানি খেতে গিয়েছিলেন বা পেয়ারাবাগের খালার শরীর কেমন এখন, তখন ঠিকঠাক উত্তর করছে কমল। কিন্তু সে কখনই মুখোমুখি বসে খুব একটা অন্তরঙ্গ কথা বলছে না তিরাকে। অন্তরঙ্গ কথা যত তার বেশির ভাগই চিঠিতেই লিখছে কমল। চিঠিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ সে। যেন দু’জন ভিন্ন মানুষের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে তিরা—একজন মুখোমুখি মুখচোরা, আরেকজন প্রগল্‌ভ চিঠিতে!

তার অর্থ এই নয় যে চারুকলার পেছনের মাঠে বা মলচত্বরে বসে তিরাকে অন্তরঙ্গ কোনো কথা বলছে না কমল। বলছে। তবে তখন ঠিকঠাক প্রসঙ্গের ভেতরে ঢুকতে পারছে না কমল। এসব নিয়ে তিরার জানে জিগার দোস্ত চুমকি হাসতে হাসতে তিরাকে বলছে : শেষে কিনা কমল ভাইয়ের মতো একটা কলাগাছের প্রেমে পড়লি তুই? আমার ফুফাত ভাই হলে কী হবে কমল ভাই ভীষণ অ্যানোয়িং! কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে সহজে উত্তরই করবে না; চুপ করে থাকবে ভ্যাবলার মতো! এই জন্যে তো আমরা ভাইবোনেরা তার সাথে কথাই বলতে চাই না পারতপক্ষে!

সেই কমলই পরদিন তিরার হাতে তুলে দিচ্ছে খামে ভরা চিঠি। কমল লিখছে : প্রিয় গুলমোহর! ভালোবাসা জেন। ভোরে ঘুম ভেঙে গেল অনেকদিন পরে। বারিন্দায় গেলাম। শীতল একটা হাওয়া জড়িয়ে ধরল আমাকে—প্রভাতের প্রথম চুম্বন। বিনিদ্র রজনীর গাঁদ মিলিয়ে গেল কোথাও, এমনই আপন সেই হাওয়া! মনে হ’ল, আমার জীবনটা আসলে ততটা মন্দ নয়! তখন যদি তুমি আমাকে একটা চুমু খেতে তবে আরো ভানো লাগত, জান?

চিঠিটা চুমকিকে দেখাচ্ছে তিরা; দেখিয়ে বলছে: পড়ে দেখ, তোর ভাই কী লিখেছে!

চিঠি পড়ে হাসিতে ভেঙে যাচ্ছে চুমকি। সে মন্তব্য করছে : কে বলবে যে কমল ভাই মেনিমুখো মানুষ?

এভাবে শব্দে-শব্দে এবং শব্দহীনতায় কেটে যাচ্ছিল তাদের দিনগুলো। একদিন কমলকে প্রশ্ন করেছিল তিরা সামনাসামনি : তবে বলেন, আপনি ছাড়া আমার চলে না কেন?

সেই মুহূর্তে প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারে নি কমল। তবে সেদিন রাতে গুছিয়ে কথা বলেছিল কমল একটা চিঠিতে : গুলমোহর শোনো, আমার মনে হয়, প্রতিটি মানুষের মনে বিশাল একটা শূন্যস্থান থেকে যায়। আমাদের মনে চেনাজানা সব শব্দের ফাঁকে ফাঁকে তৈরি হয় সেই শূন্যস্থান। কেন তৈরি হয় সেই শূন্যস্থান, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমি তোমাকে যে সব শব্দ লিখে পাঠাই তা দিয়ে তুমি তোমার মনের শূন্যস্থান ভরে নিচ্ছ, তুমি বিনির্মাণ করছ নিজেকে। হয়তো সে জন্যই আমি তোমার কাছে জরুরি। যে দিন তোমার জগতে শব্দের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে সে দিন তুমি আর আমাকে খুঁজবে না, আমি সুদূরে মিলিয়ে যাব।


আমার ঠোঁটে দিনের পর দিন চুমু খেয়েছে তস্কর। আমি তা মেনে নিয়েছি প্রথায়, গ্লানিতে।


এটাকে কি তবে প্রেম বলব? কলাভবন এবং রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের মাঝের শিরিষের ছায়ায় বসে এক দুপুরে কমলকে প্রশ্ন করেছিল তিরা।

দার্শনিকের প্রজ্ঞায় কমল উত্তর করেছিল : এখনো বোঝা যাচ্ছে না আসলে! তবে এটা ঠিক যে আমরা দু’জনে ঘনিষ্ঠতা তৈরির ক্ষেত্রে একটা সীমা বেঁধে দিয়েছি। আমি যতটুকু বুঝি, সাধারণত প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষ অনেকখানি সহজ হয়। তুমি আর আমি ওতটা সহজ নই!

এ কথার অর্থ কী?

ব্যাপারটা হ’ল যে আমরা কোনোদিন পরস্পর পরস্পরকে চুমু খাই নি।

ও! এই কথা? ধ্যাত্তেরি! বলে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু করেছিল তিরা।

সে দিন রাতে তিরাকে চিঠি লিখে কমল : সুন্দর মেয়েটার রক্তলাল সালওয়ার-কামিজ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি, ঝকঝকে মোহরের মতো! শত সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে তার হালকা বাদামি চোখে। জ্বলজ্বল করছে তার চোখ! আর তখন কী হ’ল জান? তার চোখের সৌন্দর্যে ধাঁ-ধাঁ লেগে গেল আমার! সেখানে খেলা করছে অজস্র শব্দ—অফুরান। তাদেরকে আমি চিনি না! মনোযোগ দিয়ে তাদেরকে পড়ার চেষ্টা করছি আমি, কিন্তু বুঝতে পারছি না কিছুই, এমনই রহস্যময়! তার চোখ আমার কাছে অনিঃশেষ একটা চিঠি হয়ে গেল তখন! এই অনুভূতিকে প্রেম বলে কিনা আমি জানি না তিরা, সত্যিই জানি না।

তারপর এক সন্ধ্যায় শাহ্জাহানপুর রেলওয়ে কলোনির সামনে দিয়ে শান্তিনগর যাওয়ার পথে ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল, হুড তুলে দিয়ে পর্দা টাঙাতে হয়েছিল এবং তখন পর্দার আড়ালে কমলকে প্রথম চুমু খেয়েছিল তিরা।

এই হচ্ছে কমল! অন্তরতম কথা সে সামনাসামনি বলতে পারে নি কখনো, তিরার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলেও নয়, তিরা যখন অন্যত্র চলে গেল তখনো নয়! হ্যাঁ! একটা চিঠি লিখেছিল বটে কমল ‘প্রিয় গুলমোহর’ সম্ভাষণে, আগের মতো করেই। সেই চিঠির সারমর্ম, যতটুকু মনে পড়ে তিরার, এমনটা ছিল : আমরা পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারতাম তিরা! সম্পর্কের ভাষা নির্মাণের মতো বোধ হয়তো আমার জানা নেই! হয়তো আরেকটু সময় দিতে পারতে তুমি, সাহস করতে পারতে! হয়তো ভালো কিছু তৈরি করতে পারতাম আমরা দু’জনে মিলে—এক সাথে থাকাথাকি, কাচ্চি বিরিয়ানি-ফুচকা, মটর সাইকেল, ঝগড়াঝাটি, ভারত মহাসাগরের বুকে একটা দ্বীপ কিনে ফেলা, চার-পাঁচ জন সন্তান, পাহাড়ের ওপরে শুয়ে শুয়ে আকাশের রহস্যময় সব তারার দিকে চেয়ে থাকা…। এসব কিছুই হ’ল না আমাদের! কেন? তার কারণটা আমি জানি : বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার নকশাবিদের কাজটায় আসলে কোনো আয়-উন্নতি নেই। মাস গেলে সরকারি বেতনস্কেলে যা বেতন পাই আমি তাকে সবাই যথসামান্যই বলে থাকে। কিন্তু ডিজাইনিংয়ের এই কাজটা আমার ভীষণ পছন্দের। আর এই বেতনে সাদামাটাভাবে জীবন চলছে আমার, চলবেও। মন্দ কী?

তিরা উত্তর করেছিল : এটা আমার সমস্যা নয়—আমার পরিবারের মানুষজনদের সমস্যা। সেটা আপনি জানেন। তবে খোঁচা মারছেন কেন?

তখন কোনো বিতর্কে না-জড়িয়ে বলেছিল কমল : পরিবারের কথা মতো সেই আর্কিটেক্টকেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাও তুমি। সেটাই ভালো। যুদ্ধ করো না আর। এবার আমার দূরে চলে যাওয়ার সময় এসেছে! তোমার-আমার কথা কেবল জানুক আমাদের পৃথিবীর অজস্র নিষ্ফলা রাতেরা! ভালো থেক তুমি, তিরা!

চুমকিদের বাসার ছাদে সেই চিঠিটা গুলমোহরের হাতে তুলে দেয়ার পরে হারিয়ে গেল অভিমানী কমল। তাকে আর ফেরানো গেল না। মাস ছয়েক কমলের প্রতীক্ষায় বসে থেকে থেকে অবশেষে বড় ভাইয়ের পছন্দে টিপু সুলতান রোডের আর্কিটেক্টকে বিয়ে করল তিরা। বিয়ের পরে তিরা যখন মাস্টার্সপর্বের ক্লাস করছে নিয়মিত তখনো আর কমলকে দেখা গেল না। পরে জানা গিয়েছিল যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার খুলনা-শাখায় বদলি নিয়ে চলে গেছে কমল। সেই হারিয়ে যাওয়া কমল তিরার সাথে যোগাযোগ করল কত বছর পরে? তা কুড়ি বছর তো হবেই!

কমল ফোন রেখে দিলে অনেকদিন পরে কোথাও থেকে ঝেঁপে নামল স্মৃতির দল; স্মৃতিদের সাথে ধেয়ে এল মনঃব্যথা আর অনুশোচনা। কোনো কোনো স্মৃতি, তা যতই দুঃখের হোক না কেন, জ্বলজ্বল করতে থাকে মানুষের মনের গভীরে। প্রাত্যহিকে কষ্ট করেই মানুষ তাদের সাথে চলতে শেখে; কালে কালে তৈরি করে নেয় আপাত একটা স্বস্তি বা অব্যহত থাকে স্বস্তিবিধানের প্রচেষ্টা। কমলের ফোনে তিরার সেই আপাত স্বস্তি অন্তর্হিত হয়ে গেল এক লহমায়।

বনানীর লেকের ধারের কোনো এক ফ্লাটের বারান্দার অন্ধকারে বসে এই মুহূর্তে এ সবই ভাবছে তেতাল্লিশের তিরা। বিপন্ন তিরা স্থির করছে : বেশ! তবে সে কাল সময় করে একবার সিদ্ধেশ্বরীতে নিজেদের বাসায় যাবে; খুঁজে দেখবে, চিঠিগুলো আদৌ আছে কিনা সেখানে যে চিঠিগুলোতে একদা শব্দগুচ্ছ রচনা করেছিল তার প্রেমিক কমল। শব্দগুলো ছিল মেঘের মতো নরম, প্রজাপতির পাখনার মতোই চঞ্চল, শ্রাবণধারার মতো উদ্বেলিত, খরস্রোতা নদীর মতো প্রবহমান সাগর অবধি…। আর শব্দের ফাঁকে ফাঁকে সেখানে কমল ভরে দিয়েছিল সীমাহীন নীরবতা।

তিরার জগৎ থেকে হারিয়ে যাওয়া একটা নাম এভাবে ফিরে আসে আবার। কমলের চিঠিগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিরা ফোন করে তার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের সহপাঠী রাজুকে। এটাসেটা আলাপের পরে আনমনে তিরা রাজুকে বলে : বুঝলি তো, কমল ভাই ফোন করল একটু আগে। আমি তো থ!

‘বলিস কী?’ উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে রাজু এবং সে তিরাকে কমলবৃত্তান্ত বলতে শুরু করে। গল্পটা তিরার জানা। তবে সে আর আটকায় না রাজুকে। রাজু বলে চলে বছর চারেক আগেকার গল্পটা। তিরা তখন কলোম্বোতে থাকে। সেখানে তার স্বামী ভারত মহাসাগরের ধারের একটা পাঁচ তারা হোটেলের ডিজাইনের কাজ করছিল। ফার্মগেট-এলাকাতে এক সন্ধ্যায় কমলকে পথে পেয়ে যায় রাজু। আলাপের ফাঁকে রাজু জানতে পারে, পঁয়তাল্লিশ পার হলে বিয়ে করেছে কমল। একটাই মাত্র ছানা তখন পর্যন্ত। ছানাটা তখনো মাটির সাথে কথা বলে। সেদিন রাজু আর কমলের ভেতরে ফোন নম্বর আদানপ্রদানও হয়েছিল। তবে যেটা হ’ল, কমল যোগাযোগ রাখল না রাজুর চেষ্টা সত্ত্বেও!

রাজুর সাথে কথা শেষ হলে তিরা ভাইবারে কল করে ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেবাসী চুমকিকে। সব শুনে চুমকি বলে : আমি তো সাদিকের সাথে বিয়ের আগে পিন্টুর চিঠিগুলো সব পুুড়িয়ে ফেলেছি। তুই কিনা রেখে দিলি কমল ভাইয়ের চিঠিগুলো! কত্ত বড় উল্লুক তুই! এবার বোঝ ঠ্যালা! চিঠিগুলো হয়তো তোর স্বামীপ্রবরের হাতেই পড়েছে, দেখ গিয়ে!

‘আরে ধুর! আমার স্বামী সহজ-সরল মানুষ। তার হাতে কমলের চিঠি পড়লে এতক্ষণে দক্ষযজ্ঞ লাগিয়ে দিত ও! খুঁজে দেখি আগে! কিন্তু এই বছর কুড়ি পরে কেন যে চিঠিগুলো খুঁজছে কমল সেটা বুঝতে পারছি না!’

চুমকি একটা সম্ভাবনার কথা তোলে তখন, ‘হয়তো আবার তোর সাথে যোগাযোগ শুরু করতে চায় কমল ভাই! সে তার বউকে তেমন একটা ভালোবাসে বলে মনে হয় নি আমার কাছে।’

‘উফ! বাজে কথা বন্ধ কর তো এবার! ফিরে আসার বান্দা নয় কমল! ও তো বলত : চুলের খুশকির মতো পুরনো প্রেমিক বা প্রেমিকা ফিরে ফিরে আসে! বন্ধুগণ, সেই সব তরলমতিদেরকে চিহ্নিত করুন! মনে নেই তোর?’

ধানমন্ডিনিবাসী পুতুলকে ফোন করলে পুতুল অবশ্য সম্পূর্ন ভিন্ন কথা বলে, ‘কী পেলাম আমরা জীবনে, বল তো? একটু সাহস করলেই হ’ত না কি? আব্বার ওপরে রাগ করে সবুজের মতো উষ্ণ মানুষকে পায়ে ঠেলেছি আমি!’

এসব হুতাশনের কীইবা উত্তর দেয়া যাবে এত দিন পরে? আর এও ঠিক যে কমলের প্রতি পুতুলের পক্ষপাত কোনোদিন যাবে না! পুতুল বরাবরই মনে করে যে তার দেখা শ্রেষ্ঠ প্রেমিক ছিল কমল! কমলকে বিয়ে করলেই পারত তিরা! না-হয় মানুষটা একটু অগোছালোই ছিল! না-হয় মানুষটার কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না! পুতুলের অভিযোগের কোনোই প্রতিবাদ করে না তিরা। কমলের জন্য পুতুলের টানকে পছন্দ করে সে। তার মনে হয় : এক বর্ণও ভুল বলে না পুতুল।

কেমন একটা অস্বস্তিতে রাত কাটে তিরার! ঘুম আসে না। তার মহাব্যস্ত এবং মহাক্লান্ত স্বামী রাতের খানা শেষ হলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে ধুম করে ঘুমিয়ে যায়। যাক! ভালোই হ’ল! তবে কথাটথা বলতে হ’ল না! আজ সব স্তব্ধ। তার তেতাল্লিশ বছরের জীবনে এমন স্তব্ধতা এসেছিল মাত্র একবার—যেদিন সে দাঁড়িয়েছিল নিজের বিরুদ্ধে, পরিবারের সপক্ষে। শূন্যমন নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে ফিরে পরিবারের চাপেই তাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত দিতে হয়েছিল সেদিন। স্তব্ধতা খুব অন্য রকমের একটা অনুভূতি। হঠাৎ করে মন থেকে মুছে যায় স্বরচিত সব শব্দ। তারপর স্তব্ধতা নামে। তখন আর নিজেকে চেনাই যায় না! কমলের ফোন আজ মুছে দিয়েছে পরিচিত সবকিছু; নামিয়েছে তেমনই স্তব্ধতা চরাচর জুড়ে।

পরদিন শুক্রবার। সন্তানদের স্কুল-কলেজের চাপ নেই। দু’জনেই গেছে বসুন্ধরা সিটি’র ফান ফ্যাক্টরিতে বোলিং খেলতে। দুপুরে খাবারের পরে তাই সিদ্ধেশ্বরী জামে মসজিদের পশ্চিম মহল্লায় নিজেদের বাসায় যায় তিরা। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে তার যে ঘরটা ছিল সেখানে এখন তার বড় ভাইয়ের কলেজগামী ছেলে থাকে। পুরনো আসবাব বলতে সেখানে কিচ্ছু নেই। জানা গেল, তার কালো রঙের ট্রাঙ্কটা সেই ঘর থেকে দো’তলার স্টোররুমে সরানো হয়েছিল। জং ধরেছিল ট্রাঙ্কটায়। সেটাও দশ-এগার বছর আগের কথা। কালো ট্রাঙ্কটার ভেতরেই তিরা তার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের স্মৃতিবাহক জিনিসপত্তর রেখেছিল। সেই ট্রাঙ্কটা তবে কোথায় রাখা হয়েছে শেষপর্যন্ত? এ বিষয়ে ঠিক করে কিছুই বলতে পারল না ভাবি। স্টোররুম আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও পাওয়া গেল না ট্রাঙ্কটা শেষপর্যন্ত। ক্ষিপ্ত হয়ে গেল তিরা তখন। বড় ভাইকে সে অভিযোগ জানাল, ‘আমার ট্রাঙ্কটা ফেলে দিলে তোমরা? আশ্চর্য!’ এই বলে সে প্রতিবাদে গম্ভীরমুখে বসে থাকল গিয়ে দো’তলার বারান্দার অন্ধকারে।

এই মুহূর্তে বারান্দার চেয়ারে বসা তিরার সঙ্গে কথা বলে চলেছে প্রায় কুড়ি বছর আগের চিঠিগুলোর বিস্মৃত শব্দরা। শব্দ তবে এত শক্তিময়! চিঠি হারিয়ে যায়, পুড়ে যায়, ছিঁড়ে যায় আথবা জীর্ণ হতে হতে মুছে যায় ‘তোমার আখরগুলি’। তবু একদা কাগজ-কলমে লিখা শব্দগুলোর ধ্বংস নেই কোনো! কী আশ্চর্য এই ধ্রুবতা! মনে হচ্ছে : এই তো! শান্তিনগর বা দিলকুশা বা এই শহরের অন্য কোনো পোস্ট অফিসের সিল মারা চিঠি এসে বসে আছে তার জন্য। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে তার পড়ার টেবিলে রাখা হলুদ রঙের খামটা সে ছিঁড়ে ফেলছে দ্রুত। খুলতেই চোখে পড়ছে কমলের পেঁচানো হাতের লেখা। প্রথম পাতার পয়লাতে মার্জিন থেকে শুরু হচ্ছে কমলের সম্ভাষণ—‘প্রিয় গুলমোহর’। গেল কুড়ি বছর ধরে কেউ আর তাকে আদর করে ‘গুলমোহর’ নামে ডাকে নি, কেউ তাকে বলে নি : তুমি হাসলে গুলমোহর ঝরে পড়ে চৌদিকে, বুঝলে তো তিরা! তবে তোমাকে বলে রাখি কমল : ফের যদি তুমি আমাকে ‘গুলমোহর’ বলে ডাক, আমি তোমার ঠোঁটে আবারো হাজারটা চুমু খাব। প্রিয় রাজপুত্র! তোমাকে ছাড়া জীবন ব্যর্থ হয়েছে আমার! আর আমার ঠোঁটে দিনের পর দিন চুমু খেয়েছে তস্কর। আমি তা মেনে নিয়েছি প্রথায়, গ্লানিতে।

এসব কত কিছুই না নিভৃতে ভাবে আহত এক হৃদয়! আর তখন আনুশোচনায়, বেদনায় আরো বিদ্ধ করার জন্য জীর্ণ হৃদয়কে স্মৃতিভূমে নিয়ে যেতে হয়। চোখের জল ঝরে, ঝরুক। অপরিণামদর্শী কাজের শাস্তি তো আর সারা জীবনে ফুরোয় না! কাজেই সিদ্ধেশ্বরী থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসের হাকিম চত্বরে গিয়ে তিরা এক কাপ চা খায়, আকাশছোয়া শিরিষের নিচে, অন্ধকারে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে, ফেলে আসা দিনগুলোকে সে চুমু খায় বারবার। সেই মুহূর্তে চোখের জল লুকোনো গেলেও মিরপুর অভিমুখী কারে বসে তিরা আর তার অশ্রুরোধ করতে পারে না কোনোমতেই।

সেই রাতেই ফোন আসে তার বন্ধু পুতুলের : কাল বিকেলে একবার বাসায় আসতে পারবি তিরা? জরুরি কাজ আছে।

ফোন করে ভালোই করেছে পুতুল! এই দমবন্ধ পরিবেশে ভালো লাগছে না তিরার। মনকে স্থির করতে হলে তাকে বেরুতে হবে এখান থেকে। কাজেই সাগ্রহে পুতুলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় তিরা। পুতুল বলে : রাতে খেয়ে যাবি। আসবি একা। পোলাপাইন বা জামাই সাথে করে আনলে আমার বাসায় ঢুকতে দেয়া হবে না—মনে রাখিস!


চিঠির মালিকানা কেবল কারো একার হতে পারে না।


পরদিন বিকেলে পুতুলদের বসার ঘরে ঢুকতেই স্থানু হয়ে যায় তিরা কেননা সেখানে, সোফায়, বসে আছে কমল! গল্প করছে সে পুতুলের সাথে। তার প্রিয় রাজপুত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে আরো আকর্ষণীয় হয়েছে দেখতে—টিঙটিঙে শরীরে মাংস ধরেছে কিছুটা, খোলতাই হয়েছে তার গায়ের শ্যামল রঙ, ঘন কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ জমেছে মুখমণ্ডল জুড়ে, সহজেই দেখা যাচ্ছে তার একমুখ ভরা হাসিটাও। মাথার সামনের দিকে চুল কমেছে খানিকটা—এই যা! এসব সৌন্দর্য তাকিয়ে দেখতে দেখতে থমকে গেছে তিরা। পুতুল তাকে বসতে না-বললে সে নিশ্চয় দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকত মুগ্ধতায়, বিস্ময়ে!

সোফায় কমলের সামনাসামনি বসে আর কোনো কথা না-পেয়ে পয়লাতেই তিরা বলে ওঠে কমলকে লক্ষ করে, ‘আপনার লিখা চিঠিগুলো সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় খুঁজে পেলাম না, জানেন!’

মুচকি হাসিটা উবে যায় কমলের মুখমণ্ডল থেকে এবং সে মাথা নিচু করে একটু চুপ থেকে বলে, ‘আমারো তেমনটাই আশঙ্কা হচ্ছিল! তোমার চিঠিগুলো আমার কাছে আছে। পড়ি মাঝেমাঝে।’

তারপর থমথমে হয়ে যায় পুতুলের বসার ঘরের আবহাওয়াটা। চা বানানোর ছলে কিচেনে ঢোকে পুতুল। শেষ বিকেলের আলোতে রাঙানো লেকের ধারের একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিরা কমলকে প্রশ্ন করে, ‘এত দিন পরে চিঠিগুলো কেন খুঁজছেন আপনি, বলবেন আমাকে?’

এমনতরো প্রশ্নের তো একটা সহজ উত্তর হতেই পারে : আমার চিঠিগুলো সব ফেরত চাই আমি। প্রাক্তন প্রেমিকরা নাকি অনেকদিন পরে এসে এমন কথা বলে থাকে কখনো কখনো। হয়তো তারা মনে করে, তাদের লেখা চিঠিগুলো একান্তই তাদের নিজস্ব সম্পত্তি। কিন্তু কমল একদা বলত, কোনো কোনো সময়ে চিঠির মালিকানার ধরন কিন্তু যৌথ হতে পারে। দু’জন মানুষ মিলেই তো তৈরি করে ঘনিষ্ঠতা! মুখের কথা বাদেও তারা শব্দ বিনিময় করে থাকে কাগজ-কলমে। শব্দে শব্দে পুনর্জন্ম ঘটে দু’জন মানুষের। কাজেই চিঠির মালিকানা কেবল কারো একার হতে পারে না। সেটা অবশ্যই দু’জনারই সম্পত্তি। এত দিন পরে কমল সেই ধারণা পোষণ করে কিনা তা জানে না তিরা।

কমল তিরাকে তেমনই কথা বলে : একদা যৌবনে তারা দু’জনে মিলে চিঠির পাতায় পাতায় শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে পরস্পরকে বিনির্মাণ করেছিল। জীবনে চলতে চলতে, যেভাবেই হোক না কেন, সেইসব প্রিয়তম যৌথ শব্দগুলো হারিয়ে ফেলেছে কমল! শব্দগুলো খুঁজে পেলে হয়তো নিজেকে সে ফিরে পেতে পারবে আবার। নিজেকে সে হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই! অনেকদিন ধরেই তাই তিরার সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছে সে। দ্বিধার বশেই তিরার সাথে আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠে নি তার।

এবার তো গুলমোহরের চোখ ফেটে জল নামবেই!


ঈদসংখ্যা ২০১৯

ফয়জুল ইসলাম

জন্ম ২৪ নভেম্বর, ১৯৬৩; সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা।

শিক্ষা : এম.এ (অর্থনীতি); এম.এ (উন্নয়ন অর্থনীতি)

পেশা : উপ-প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ সরকার।

প্রকাশিত বই :

নক্ষত্রের ঘোড়া (১৯৯৮) [গল্পগ্রন্থ, বিদ্যাপ্রকাশ, ১৯৯৮]
খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক[ গল্পগ্রন্থ, সমগ্র প্রকাশন, ২০১৬]
আয়না [গল্পগ্রন্থ, পার্ল পাবলিশার, ২০১৭]
নীলক্ষেতে কেন যাই [গল্পগ্রন্থ, যুক্ত, ২০১৭]

ই-মেইল : faizulbd@gmail.com

Latest posts by ফয়জুল ইসলাম (see all)