হোম গদ্য গল্প প্রস্রাব বিষয়ক

প্রস্রাব বিষয়ক

প্রস্রাব বিষয়ক
515
0

বিকালটা শুরু অইতেই গরমাগরম পুরি ভাজার বয়ের লগে ট্রান্সমিটারের খাম্বার চিপাত থন পুরুষ মাইনষের মুতের বয় বি আইবার লাগে এবং তখন পুরি আর মুতের দুই বয় মিল্লা একখান নয়া বয় তৈরি করে এবং এই নয়া বয় রাহাতন বিবির দিলে একটা নয়া জিগির বি তৈরি করে। মুতের গন্ধ নাকে আইলেই রাহাতন বিবি কইবার পারে এইটা যুয়ান পোলা না বুইড়া মাইনষের মুতের গন্ধ, মনে লয় মুতনেঅলা লোকটার বয়স কত অইবার পারে হেইটাবি রাহাতন বিবি কইবার পারব। হাচা হাচাই রাহাতন বিবি মুত্র-বিশারদ হৈয়া গেছেগা। ক্ষেমতা থাকলে একটা সার্টিফিকেটসহ লেঞ্জাঅলা চাইরকোনা টুপি পড়াইয়া দিত রাহাতন বিবিরে। পক্ষাঘাতে একপাশ অকেজো হয়ে যাওয়ায় খাটে শুইয়া শুইয়া এইটাই ভাবে ডান-পা খোঁড়া ষাটোর্ধ মিয়াজান সগীর, অর্থাৎ রাহাতন বিবির স্বামী। আশ্চর্য, মুত্র-গন্ধ বিশারদ হওনের কথা তো ছিল মিয়াজানের; কেননা সারাদিন সেই তো ঘরে হুুইয়া-বইয়া কাটায় আর ঘন ঘন মুতে আর তার নিজের মুতের গন্ধের লগে জানলা দিয়া বাতাসে ভাইসা আসা বহুরূপী মুতের গন্ধ তার নাককে প্রতিদিন সমৃদ্ধ করে তোলে; অথচ মুত্র-গন্ধ বিশারদ হইল গিয়া তার স্ত্রী রাহাতন বিবি। আল্লার কী বিচার! মুতের উৎকট গন্ধের কারণেই রাহাতন বিবি এই ঘরে একটানা বেশিক্ষণ থাকে না। রাহাতন বিবির নাকটা বড়ই খান্দানি। খান্দানি ঘরের মাইয়া দেইখা না-কি কে জানে—মনে মনে নিজেরে জিগায় স্বামী মিয়াজান। তো, তিন চিপাগলির মোহনায় মজু বকসের বাড়ির দেয়াল ঘেঁইষা সাড়ে-তিনহাত পাশ আর হাত আষ্টেক লম্বা একটা খালি জায়গায় আলাউদ্দির পুরির দোকান। খালি জায়গা পাইয়া রইস বাসিন্দা আলাউদ্দি নিজের টেকায় উপড়ে পুরানা টিন আর দুইপাশে নানাপদের জোড়াতালি দিয়া দোকানটা খাড়া করাইছে। দোকানের পিছনে মজু বকসের বাড়ির ইটের পুরানা দেয়াল আর সামনে কোনো ঝাপটাপ নাই। রাইতে উদলাই পইরা থাকে। স্টোভের চুলা, লোহার কড়াই, একটা টুল, একটা টেবিল আর একজোড়া বেঞ্চরে লম্বা শেকল দিয়া ট্রান্সমিটারের লোহার খাম্বার লগে রাইতে তালা লাগাইয়া রাখে। চুরির ভয় নাইক্কা। মহল্লার ভিতরে কেউ চুরি করতে আইব না, আর কেউ যদি চুরি করেও তো ওই হালার খবর আছে। মহল্লার বেবাকতে আলাউদ্দির পুরির ভক্ত। ধরা পরলে চোরের তক্তা ছুটাইয়া ফেলব। তো, এই তিনকোনা গলির মুখে একটাই দোকান, সেইটা আলাউদ্দির পুরির দোকান। দোকানের দক্ষিণ সাইডে কারেন্টের ট্রান্সমিটারের এক জোড়া খাম্বা। খাম্বা ঘেঁইষাই চিপা ড্রেন আর আরেকটা গলি একসাথে গলাগলি ধইরা পুবে আগাইয়া গিয়া মুন্সিপাড়া হইয়া ভাট্টিখানায় ঢুকছে; ঢুকনের আগে আগেই ওখানে চিপা গলিটা আরো চিপা হইয়া গেছে। আর অন্য গলিটা সোজা কিছুদূর আগাইয়া বদুগো বাড়ির সামনে গিয়া শেষ হইয়া গেছেগা; মানে এইটা হইল কানাগলি। তো, ট্রান্সমিটারের দুই খাম্বার চিবিটায় বইয়াই তলপেট ভারি হয়ে যাওয়া পুরুষ মাইনষেরা লুঙ্গিটা কায়দা কইরা ধইরা লেওড়াডা একটু বাঁয়ে কান্নি খাওয়াইয়া চনচনাইয়া ছাইড়া দেয়। বাঁয়ের দিকে গলিটার মুখেই একটা দোতলা বাড়ি। দোতলায় মতিঝিলের এক সরকারি অফিসের চাকরিজীবী দুই কন্যা আর স্ত্রীসহ ভাড়া থাকেন। তারা এখানকার না, নর্থবেঙ্গলের। তো দোতলার একটা ঘরেও গলিমুখী একখান জানলা আছে; হগল সময় বন্ধই থাকে, কিন্তু কঅন তো যায় না, আচমকা খুইলা যাইবার পারে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো কারণে খোলেও, আর খুইলা বইলে তো ইজ্জত পাঙ্কে। আর তাই যারা এইখানে মুততে বহে তারা মনে করে লেওড়াডা বাঁয়ে কান্নি খাওয়াইয়া ছাড়ন ভালা। রিক্স নিব ক্যাঠা। যুয়ান কিছু পোলা অবশ্য ডাইনে বাঁয়ে দেইখা খাড়াইয়া খাড়াইয়া মাইরা দেয়। শুধু ইয়াং কোনো মাইয়া আইয়া পড়লে ঝামেলাটা হয়। ওইরকম অবস্থায় পোলারা মাথাডা একটু নিচা কইরা রাখে, য্যান হেয় নিজের পায়ে জুতা না সেন্ডেল পইরা আছে তা দেখবার লাগছে। মাইয়ারা অবশ্য মুখের মইদ্দে চোরা হাসি ফুটাইয়া তুইলা জায়গাটা পার হয় আবার মুখরা কোনো মাইয়া টিজও করে পোলাগো; কাউরে হয়তো কয়, ‘কি রে টোকনা, রাস্তায় মুতোস কেলা? তোগো পায়খানা ভাড়া দিছস নিহি?’ গলির রইস পোলাপানরা সবাইয়ের ভাই-বোনের লগে চিনজান তাই ছোটখাট ইয়ার্কি প্রায় চলে আর এতে তেমন কিছু ঘটে না আর ড্রেনে মুতামুতির ব্যাপারটা এখানকার সব গলিতে নরমেল ব্যাপার। আর এখানে তো খাম্বাজোড়া থাকনের কারণে দুইটা পাশ ঢাইকা থাকে আর তাতে কইরা মুতনেঅলার খোমাটা মানে চেহারাটা পথচারীদের কাছ থেকে কিছুটা আবডাল করা যায়। অবশ্য চেহারা ছুপানোর কোনো জুরুরত নাইক্কা। এই চিপা গলির বেবাকতে বেবাকে চিনে। কী খাড়াইয়া কী বইয়া মুতনের সময় একেকজন না-মুতনেঅলার লগে দেদারসে বাহারি কথা কয়। মুতনেঅলা পুরুষ বা ছোকরাগো লগে কথা কইতে এই গলির মহিলারা কোনো শরমিন্দা বোধ করে না; গলির বাসিন্দাগো কাছে এইটাও নরমেল ব্যাপার। লেইস-ফিতাঅলা ফেরিঅলারা এইখানে চান্সে মুইতা লয়। খিদা লাগলে বা পিপাসায় আলাউদ্দির পুরির দোকান থন পুরি বা পানি খায়। আশেপাশের অনেকে তো বাড়ি থেইকা বাইরাইয়া গিয়া ঐখানে মোতে। যেন খোলা ড্রেনে না মুতলে পেটের ভাত হজম হইব না। তাছাড়া পুরান ঢাকার এই এলাকায় তো ভাড়াইট্টা বেশি, পায়খানা কম। চাপ তো থাকেই। এই চিপাগলিতে কোনোরকম একটা রিকশা আইবার পারে মগর আরেকটা আইলেই পেজগি লাইগা যায়। আর তখন তখনই একটা কেওয়াজ শুরু হয়। পেজগিটা বেশি হইলে পুরির দোকানের মহাজন আলাউদ্দি তখন দোকানে থাইকাই একটা মুখস্থ করা খিস্তি ছাড়ব—‘আবে রেকশাঅলা হুমুন্দির পো, ঢাকা শহরে গরম ভাতের পুটকি মারবার আইছ?’ তিন চিপাগলির এই মোড়টা তাই মুতের গন্ধ আর ডাইলপুরির গন্ধের মিশেলে তৈরি হওয়া এক নয়া গন্ধের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।


স্বপ্নের নায়িকাগো মুতের গন্ধের লগে নিজেগো মুতের গন্ধেরও একটা অদ্ভুত অপার্থিব আত্মীয়তা ঘটায়। 


ডাইলপুরির দোকানের একবারের উল্টা দিকের বাড়িটাই মিয়াজান সগীর আর রাহাতন বিবি দম্পতির। বাড়িটা অবশ্য মিয়াজানের বাপের আছিল। বাপ মইরা যাওনের পর দুই ভাই ভাগীদার হইছে। মিয়াজান বড় পোলা। সামনের অংশে মিয়াজান থাকে আর পেছন অংশে পরিবারসহ তার ছোট ভাই। মিয়াজান যেই ঘরে থাকে সেই ঘরে একটা জানলা আছে গলি লাগোয়া। এই জানলা দিয়াই পুব-পশ্চিমের গলিটা যেটা শেষমেশ ভাট্টিখানায় গিয়ায় ঢুকছে সেটা আর ট্রান্সমিটারের দুই খাম্বা আর পুরির দোকানের একটু কোনা দেখা যায়। জানলা দিয়াই মাঝেমইদ্দে লেইস-ফিতাঅলাগো কাছ থন জিনিসপত্তর কেনে রাহাতন বিবি। আর পুরির কথা জানলা দিয়া কাউরে কইলেই অয়। কেউ না কেউ হাত বাড়াইয়া দিয়া যায়; কখনো দিয়া যাইব দোকানের কর্মচারী কাম পুরি বানানোর কারিগর বরিশালের লোকমান, যার লুঙ্গিটা সবসময় অর্ধেক উল্টানো অবস্থায় একটা বিশেষ কায়দায় বাইন্দা রাখা থাকব আর উল্টানো লুঙ্গিটার উপরে জড়ানো থাকব একটা লাল চেকের গামছা। কখনো দোকানের কাস্টমার বি হাত বাড়াইয়া দিয়া যাইব; আর দিল খোশ থাকলে দোকানের মহাজন আলাউদ্দি বি পুরি আইনা জানলায় খারাইব। হাঁক দিব, ‘ভাবিসাব কই? পুরি লন ভাবিসাব।’ রাহাতন বিবি হাত বাড়াইয়া পুরি নেওনের সময় আবারও আলাউদ্দি কইব, ‘খালি পুরিই খাইবেন ভাবিসাব। বাইগুনি লইবেন না? ভালা বাইগুন আছিল আইজকা।’ রাহাতন বিবির কাছে এই ইঙ্গিত পুরানা। রাহাতন বিবি তখন জবাব দিব, মানে জবাবটা মুখস্থই থাকে আলউদ্দির প্রশ্নের মতোই: ‘ওইটা তোমার বিবিরে খাওয়াইও।’ পুরি-পিঁয়াজু-আলুচপ সব ভালা লাগলেও কোনো এক অজানা কারণে রাহাতন বিবির কাছে বাইগুনি কখনোই ভালা লাগে না, তাই সে ওইটা খায়ও না।

পুরির দোকানদার আলাউদ্দির একটা শখ হইল রেডিও হোনা; তার একটা ২ ব্যাটারিঅলা রেডিও আছে; হেইটা হেয় দোকানের দেয়ালে লাগানো চুবির লগে রশি দিয়া ঝুলায় রাখে। যতক্ষণ দোকান খোলা ততক্ষণ রেডিও খোলা। রেডিওর শব্দ মিয়াজানের ঘর থেকে বেশ ভালোভাবেই শোনা যায়। মিয়াজানের কানে আসে, চলাফেরা নাই বইলা মিয়াজানের কানটা খাড়াই থাকে। রেডিওতে তখন গান হয় ‘তোর ছোঁয়ায় যৌবনে মোর লাগল যে কাঁপন।’ মিয়াজানের শরীরে তখন সত্যি সত্যি একটা কাঁপন লাগে। সেই কাঁপনের লগে লগে তার নিজের যৌবনের কথা বি মনে আহে।

তো, জুয়ান কালে এইবার একটা কিছু করন লাগে এই ব্যাপারে যখন পরিবার থন ক্রমাগত কথা উঠতে থাকে তখন কেমতে কেমতে জানি মিয়াজান সগীর ফিলিমের লাইনে ঢুইকা পরে। কুলুটোলার ধীরেন আছিল ফিলিমের ম্যাকাপমেন; ধীরেনের বয়স মিয়াজানের চেয়ে একটু বেশি হইলেও সে আবার বন্ধুর বন্ধু আছিল মিয়াজানের। ধীরেনের লগে এফডিসিতে মিয়াজান শুটিং দেখবার গেছে কয়েকদিন। নায়িকা দেখার শখ অইছিল মিয়াজানের। পরে অবশ্য ধীরেনের লগে থাইকা কোনো কামউম পাওন যায় কিনা সে খেয়ালও করছিল। কাম একটা জুইটাও যায়। সিনেমায় লাগে এমন নানান জিনিস সাপ্লাই দেওনের কাজ। প্রথম সাপ্লাইটা আছিল একটা অদ্ভুত মেশিনের। তখন দেশ স্বাধীন হইছে। দেশ স্বাধীনের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বানানের একটা হিড়িক লাগল। এইরকম একটা সিনেমায় পাকিস্তানি সৈন্যরা একজন আহত মুক্তিযোদ্ধার হাতের পাঞ্জা কাটব। পাঞ্জা কাটনের দৃশ্যের জন্য একটা ছোট কিন্তু দেখতে অদ্ভুত মেশিন দরকার। কিন্তু সেইরকম মেশিন কেউ খুঁইজা পাইতাছে না। মিয়াজানের মনে হইল তাগো মহল্লায় বইয়ের বাইন্ডিং কারখানায় একটা এইরকম মেশিন ব্যবহার হয়। যেইটা দিয়া পাঞ্জা কাটনের দৃশ্যটা ভালোই ফুটান যাইব। মিয়াজান মেশিনটা নিয়া দেখাইলে পরিচালক জব্বর খুশি হন। এই রকমই একটা মেশিন এই সিনেমার জন্য দরকার আছিল। তো সেই থেইকা সিনেমায় মিয়াজানের সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু। তয় এই কাজটা সবসময় থাকে না বিধায় এবং বেশি বেশি কাজ পাওনের আশায় পরে নওগাঁর এক বন্ধুরে লইয়া একটা শুটিং ইউনিট চালু করে; কিন্তু তাতে তারা খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না; না পারলেও নিজের যুয়ান বয়স আর সিনেমার রঙিন আকর্ষণে ফিলিম লাইনেই আইটকা যায় মিয়াজান ।

কিন্তু বেশিদিন নিজের শরীরটারে আগের মতো আর আটকাইয়া রাখেতে পারে না মিয়াজান। শরীরের কাছে ধরা খাইয়া এখন খাটে শুইয়া শুইয়া মিয়াজানের মনে পড়ে সাদাকালো ফিলিম জগতে তার রঙিন দিনকালের কথা। তখন তারা প্রায় যাইত মানিকগঞ্জে সিংগাইরে, দোহার নবাবগঞ্জের আশেপাশে শুটিংয়ে। ঢাকার কাছে বইলা এই জায়গাগুলা ফিলিম লাইনের লোকেগো কাছে বেশ পছন্দের লোকেশন। মিয়াজানকে মালসামানা লইয়া এইসব জায়গায় গ্রুপের লগে যাইতে হইত। প্রয়োজনে দূরের জেলাতেও যাওয়া লাগত। তো এইসব জায়গায় খোলা প্রান্তরে বা বিল বা চরে শুটিং-এর সময় মূলত নাইকাগো লাইগা কোনোমতে টেম্পোরারি পায়খানা বানাইতে হইত। শুটিং প্যাক হইলেও সবকিছুর মতো পায়খানা আর প্যাক হইত না। পায়খানাটা অমনিই যতদিন যায় পইড়া থাকত। তো, এক শুটিংকালে এইরকমই একটা পায়খানা বানান লাগে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে। ওই গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের যুয়ান পোলাপানরা ওই পায়খানায় মাঝে-মইদ্দে আইত যাইত। অনেকদিন পর্যন্ত এই ব্যাপারটা মিয়াজানের মাথায় ঢোকে নাই; আসলে সে বিষয়টারে আমলেও নেয় নাই। ম্যালাদিন পরে কিভাবে কিভাবে যেন মিয়াজান বিষয়টা জানতে পারে। কেউ একজন তারে বিষয়টা কয় মগর কেউগা কয় তার নামটা এখন মিয়াজানের স্মরণে আইতাছে না। গ্রামের পোলাপানরা তো ডাইনে বাঁয়ে পেছাব-পায়খানা করতে পারে; ওগো অভ্যাস আছে; তো অতদূরে ওই বাতিল পায়খানায় যাওনের কী দরকার! ওইহানে তো পানি বি নাই, বদনা বি নাই, মগর যায় কেলা? এই রহস্য বহুদিন তারে পেরেশানে রাখে। পরে হুনবার পারে, যেই পায়খানায় কবরী শাবানা ববিতারা মুইতা গেছে ওই পায়খানায় গিয়া পোলাপানরা কুত্তাগো চাইয়া বেশি ঘ্রাণশক্তি লইয়া নায়িকাগো মুতের গন্ধে বিভোর হইয়া নিবিষ্ট মনে হাত মারে আর অবশেষে স্বপ্নের নায়িকাগো মুতের গন্ধের লগে নিজেগো মুতের গন্ধেরও একটা অদ্ভুত অপার্থিব আত্মীয়তা ঘটায়। এই বিষয়টা মিয়াজানের ফিলিম জগতের দিনের বড় বিস্ময় হিসাবে জীবনখাতায় ঠাঁই নিয়াছে।

এইদিকে মিয়াজানের গতরে ঠাঁই হয় ডায়াবেটিক রোগের, সেই সাথে প্রথমবারের মতো স্ট্রোকের বাড়ি খায়। আর এতেই সে বুঝবার পারে এখন থেইকা তার লৌড়ালৌড়ির দিন শেষ। সে ফিলিম লাইন ছাইড়া দিয়া মুরগিটোলা বাজারে মুদি দোকানের ব্যবসা চালু করে। তো দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হইয়া শরীরটা একপাশ অকেজো হইবার আগ পর্যন্ত সেই দোকানই চালাইছে ছোট ভাইয়ের বড় পোলারে লগে কইরা। যেহেতু তার নিজের কোনো সন্তানাদি ছিল না তাই সে ছোট ভাইয়ের বড় পোলারেই মনে মনে তার সবকিছুর জিম্মাদার বানাইয়া রাখছে। এখন স্ট্রোকে মিয়াজানের একপাশ অকেজো হইয়া যাওয়ায় তার মনে হয় জীবনটাই বুঝি অর্ধেক হইয়া গেল।

মিয়াজানের ঘরের গলিমুখী জানলাটা সবসময় খোলাই থাকে। ছোট্ট এই জানলাটা দিয়াই মিয়াজান এখন বাইরের বড় জগৎটারে ছোট কইরা দেখে। আর শরীরের অক্ষমতার জন্যই নামাজটা কায়দা কইরা পড়ে; এর বাদে পুরির দোকানের মহাজন আলাউদ্দির রেডিওর শব্দ, গলি দিয়া কে আইল আর কে গেল, কারা দুই খাম্বার মাঝখানে খাড়াইয়া আর বইয়া মুতে; এই সব; যেন এইটাই মিয়াজানের এখনকার প্রতিদিনের ফিলিম; অর্ধেক জীবনের বায়স্কোপ। জানলাটাই সিনেমা হলের পর্দা। জানলা খুললেই ফিলিম শুরু, আবার জানলা বন্ধ করলে ফিলিম শেষ। তখন মিয়াজান সগীর ভাবে, তয় এই ফিলিমের ডাইরেক্টার কে? ফিলিমের তো একজন ডাইরেক্টার থাকনই লাগব, না কি?


শুটিংয়ের সময় টেম্পোরারি বানানো সেই পায়খানার অদ্ভুত অচেনা মুতের গন্ধে ঘরটা ক্রমশ ভইরা যাইতাছে।


স্ট্রোকের আগেই যখন মিয়াজানের বহুমূত্র রোগ ধরা পড়ে তখন সে শুনছে এই রোগে মুতের লগে নাকি চিনি যায়। মুতের লগে চিনি কেমনে যায় এইটা মিয়াজানের বুজে তখন ধরে না। পোলাপানকালে একবার সে নিজের মুত খাইয়া দেখছিল। আবার এই বহুমূত্র রোগ হওনের পরেও কৌতূহলের বশে একবার সে নিজের মুত খাইয়া টেস্ট করছে; ছোটবেলার মুতের মতোই তার কাছে মনে হইল। সেই ঝাঁঝ ঝাঁঝ গন্ধ আর লবণকাটা লবণকাটা। মিষ্টির কোনো বালাই নাই। তয় মিয়াজানের মনে হয় সেক্সও একটা প্রস্রাবের মতো বিষয়। চাপ আইলে ছাড়তে হয়। আর ছাড়নটাই ভালা। এই বয়সে আইসা বলতে গেলে মিয়াজানের এখন আর সেক্স জাগে না । আর জাগলেই-বা কতদূর; একপাশ অকেজো শরীরে কেমনে কী; ঠ্যাংয়ের লগে ঠ্যাং পেজগি না খাইলে কি সেক্স হয়; সেক্স কি আর ডায়াবেটিকের ইনসুলিন—পুশ করলাম, আর হইয়া গেল। ইনসুলিনের কথা মনে হওয়াতে মিয়াজানের মনে পড়ে শান্তিরঞ্জন শীলের কথা। শান্তিরও ডায়াবেটিস রোগ ছিল। শান্তি আর মিয়াজান প্রতিদিন একবেলা দুইজনে একসাথে কুলুটোলা ধইরা শ্যামবাজার পর্যন্ত হাঁটত। শান্তি ছিল মিয়াজানের বন্ধু। মহল্লার নাপিত শান্তিরঞ্জন শীলের কাছে সেই ইয়াংকাল থেইকা মিয়াজান চুল-দাড়ি কাটে। শান্তির হাত চুলদাড়ি কাটতে কাটতে কখন যে তারা পরস্পরের বন্ধু হইয়া গেছেগা তা আজ আর কারো মনে নাই। শান্তির মুখেই মিয়াজান শুনছিল আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় কোনো এক হিন্দু দেবতার এক ফোঁটা বীর্য ঢাকার কাছের শীতলক্ষা নদীতে পড়ছিল। সেই থেইকা ওই নদীর পানি পবিত্র। সেই নদীতে স্নান করলে পাপমোচন হয়। যেই জায়গাটায় লোকেরা স্নান করে সেই জায়গাটার নাম লাঙ্গলবন্দ্। বেশি দূরে না; কাঁচপুর ব্রিজ পার হইলেই লাঙ্গলবন্দ্। তো, বছরের বিশেষ দিনে লাঙ্গলবন্দের স্নানে হিন্দুরা দল বাইন্দা যায় পাপমোচনের আশায়। মিয়াজানের মনে পড়ে ফিলিম লাইন ছাড়নের পরপরই এমন এক দিনে বন্ধু শান্তিরঞ্জনসহ কয়েকজন হিন্দুর লগে সেও একবার লাঙ্গলবন্দে গেছিল। শান্তিরঞ্জনের দেখাদেখি একলগে স্নানও করছে। কিন্তু মিয়াজানের পাপমোচন হইছে কি না কে কইব। মিয়াজান মনে করে, এক পানিতে যদি অজু আর শুচি হইবার পারে তাইলে তো হওনের কথা।

তো, বিকাল হইলেই মুতের গন্ধের ভেতর গরম গরম পুরি খাওনের মজাই আলাদা। অন্তত আলাউদ্দির পুরির দোকানের কাস্টমারগো কাছে বিষয়টা এইরকমই। তারা এই গন্ধের মইদ্দে দেদারসে পুরিউরি খায়, গল্প করে, ইয়াং পোলাপানরা উজিরনাজির মারে। মুতের গন্ধ নিয়া কারো কোনো অভিযোগ প্রকাশ পায় না। আর বিকাল অইলেই মিয়াজান একটা বড় মগে দুধ চা নিয়া সেই চায়ে ডুবাইয়া ডুবাইয়া গইনা গইনা ৩টা ডাইলপুরি খাইব। প্যারালাইজড হওনের পর এইটা তার নিত্য-বিকালের অভ্যাস। আর আরেকটা অভ্যাস ঠেকায় পইড়াই তার হইয়া গেছে। সেইটা হইল ঘরে বইয়া চিলমচিতে মুতনের। মিয়াজানের ঘরে সবসময়ের জন্য এখন একটা বড় সাইজের এলমুনিয়ামের চিলমচি থাকে। দিনে রাইতে ওইটাতেই মিয়াজান মুতে। এজমালি জোড়া পায়খানা বাড়ির পেছন দিকের শেষ মাথায়। পায়খানা করন ছাড়া অতদূর যাওয়া মিয়াজানের জন্য রিস্ক। তাই নিজের এই ঘরটাতে সবসময় পেছাবের একটা গন্ধ বিরাজ করে। আর গন্ধটা ঘরের মইদ্দে দিনের পর দিন থাকতে থাকতে একটা নতুন গন্ধের জন্ম দেয়। এই গন্ধটা অন্য কোনো গন্ধের লগে যেন মিল খায়, আবার খায় না। মিয়াজান কোনোদিন ঠিক ধরবার পারে না। আইজ তার স্ত্রী রাহাতন বিবিসহ বাড়ির সবাই গেছে বড় ভাতিজার শালির বিয়া খাইতে বংশাল। জলদি আয়া পড়ব কয়া গেছে। তো ওইদিন বিকালবেলা পুরা বাড়িতে নিজের ঘরে মিয়াজান একলা। ঘুম আহে আবার আহে না এমন একটা অবস্থা। এমন অবস্থায় হয়তো সে তন্দ্রায় চলে গেছিল। হঠাৎ তন্দ্রা ছুটে গেলে কোনো কারণ ছাড়াই সহসা মিয়াজানের মনে হয় ঘরের এই মুতের গন্ধটার লগে শুটিং প্যাক হওয়ার পর পইড়া থাকা পায়খানাগুলার  মুতের গন্ধের অদ্ভুতরকম মিল আছে। কিন্তু এইটা কেমনে সম্ভব তাও ঠিক বুঝবার পারতাছে না। অনেক রকম যোগবিয়োগ করবার লাগছে মিয়াজান সগীর। কিন্তু এই মুহূর্তে ঘরের মুতের গন্ধটা ঠিক ঠিক সেইরকম গন্ধের মতোই তীব্র, স্নিগ্ধ আর বিস্ময়-রকমের উত্তেজক মনে হইতাছে। আর তখন তখনই মিয়াজান টের পাইল তার শরীরেও এক উত্তেজক ঘোর তৈরি হইতাছে। প্রথমে তার মনে হইল পায়ের আঙুলে একটা হুল ফুটল আর তাতেই শরীরে একটা উত্তেজনা বোধ করল মিয়াজান। আর এর পরপরই তার মনে হইল উত্তেজনাটা প্রথমে তার পায়ের আঙুল থেইকা গোড়ালি এবং গোড়ালি থেইকা এরপর হাঁটু হইয়া ক্রমশ উপরের দিকে উইঠা আইবার লাগতাছে। আর তখন তখনই মিয়াজানের খুব প্রস্রাবের বেগ পাইতে লাগল, কিন্তু সে বিছানা থেইকা উইঠা গিয়া চিলমচিতে প্রশ্রাব করার মতো শক্তি আর সাহস পাইল না। মিয়াজানের কেবলই মনে হইতে লাগল শুটিংয়ের সময় টেম্পোরারি বানানো সেই পায়খানার অদ্ভুত অচেনা মুতের গন্ধে ঘরটা ক্রমশ ভইরা যাইতাছে। আর এই রহস্যময় গন্ধের কারণেই হয়তো-বা মিয়াজানের মনে হইতাছে তার খুব খুব ঘুম পাইতাছে, কিন্তু সে অনবরত চেষ্টা করতাছে জাইগা থাকনের লাইগা, কেননা তার প্রস্রাবের যে বেগ হইতাছে তাতে যেকোনো সময়ে মুতে তার বিছানা ভাইসা যাইতে পারে; কিন্তু আজকের এই ঘুমটাকে মিয়াজান সগীরের কাছে সেই অভিশপ্ত পায়খানার প্রস্রাবের গন্ধের মতোই অদ্ভুত আর রহস্যময় মনে হইতে লাগল। আর ঘুমের মধ্যেই সে দেখতে পাইল একটা লোক ডাইনে-বাঁয়ে তাকাইয়া ধীরে ধীরে নীরবে সেইরকম একটা পায়খানার দিকে যাইতাছে এবং তার এও মনে হইল যে ওই একই লোকটিকে সে এইসব পায়খানায় আগেও বহুবার যাইবার দেখছে, কিন্তু লোকটিকে সে এখন ঠিক চিনবার পারতাছে না, তয় হালকার উপর ঝাপসা সে যা দেখল তাতে মনে হইল, লোকটি হাঁটার সময় একটু ডান দিকে কাত হইয়া হাঁটতাছে আর তখন তখনই মিয়াজানের মনে হইল প্রস্রাবের বেগে তার বিচি-জোড়া  ট্রান্সমিটার বাস্ট হওনের শব্দের মতো কইরা বাস্ট হইয়া গেল।


ঈদসংখ্যা ২০১৮
অস্ট্রিক আর্যু

অস্ট্রিক আর্যু

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩; গেন্ডারিয়া, ঢাকা। পেশা প্রকাশনা ব্যবসায় এবং শিশুদের স্কুল পরিচালনা। শিশুকিশোরদের জন্য প্রায় ২৫টি বই লিখেছেন ও সম্পাদনা করেছেন।

ই-মেইল : austrik.aarzu@gmail.com
অস্ট্রিক আর্যু

Latest posts by অস্ট্রিক আর্যু (see all)