হোম গদ্য গল্প বই থেকে : প্রজাপতি, খরগোশের বাচ্চা ও কয়েকটা কুত্তা

বই থেকে : প্রজাপতি, খরগোশের বাচ্চা ও কয়েকটা কুত্তা

বই থেকে : প্রজাপতি, খরগোশের বাচ্চা ও কয়েকটা কুত্তা
193
0

এই ঝুলন্ত লাশ দেখে দুয়েকজন হা-হুতাশ করলেও মামলা করার মতো বাদী নাই। কারণ, এই লাশের, মানে জুলেখার বাড়ি কত দূরে, কই জামালপুর আর কই গাজীপুর। নামের শেষ অংশে মিল থাকলে কী হবে সেই জামালপুরে এক চাচা ছাড়া কেউ নাই, সেই চাচা নাকি আবার প্রেসারের রোগী, গাড়িতে উঠতে পারেন না, উঠলেই নাকি শ্বাস ওঠে। তাছাড়া এই খরবটা চাচা পেয়েছেন কি-না কে জানে।

এই লাশ নামানোর সময় ঘরের এক কোনায় বাঁশের খাঁচার মধ্যে ছটফট করে একটা খরগোশের বাচ্চা। দুপুর বারোটা বেজে গেলেও বাচ্চাটাকে খাঁচা থেকে বের করে নাই কেউ। এইসব অবুঝ প্রাণী কী মানুষের মতো কথা বলতে পারে! কথা বলতে পারলে কখন বলত, ‘আমাকে বের করো এখান থেকে’। অথচ এই মাস্টার বাড়িতেই কত আরামে ছিল বাচ্চাটা, জুলেখার সাথে ছিল তার গলায় গলায় পিরিত! জুলেখাও কত সুখে ছিল! সৎ ছেলে ও শ্বশুরকে নিয়ে তার সুখের সীমা ছিল না। সব সময় হাসি লেগে থাকত ঠোঁটে। এই কয়দিনে কী এমন হলো যে তার এই অবস্থা আজ?


চাঁদের চেয়ে বেশ্যাদের কপালের লাল টিপ বেশি সুন্দর।


এই তো কয় দিন আগের কথা, এই বাড়িতে এক কাপড়ে আসে জুলেখা। তকে বিয়ে করার আগে সোজা মাস্টার কথা দেয় যে সৎ ছেলেরা কোনোদিন কোনোভাবে অসম্মান করতে পারবে না তাকে। মাস্টার তার কথা রেখেছে, অথচ বিয়ের তিন মাস না যেতেই বিনা নোটিশে মরে গেল সে। কিন্তু এই তিন মাসে সোজা মাস্টার যেন তিনশ বছর বেঁচে গেছে। কলেজ পড়ুয়া ছোট ছেলে, বৃদ্ধ বাবা ও অল্প বয়সী টগবগে বউকে নিয়ে পাতা নতুন সংসারে বেহেশতের হাওয়া বয়ে যেত। মাস্টারের জীবনের সব সাধ আহ্লাদ যেন জুলেখা বিবি পূরণ করে দিয়েছে, তা না হলে এই রকম সুস্থ মানুষ মারা যাবে কেন, না হয় সে কিছুদিন যাবৎ কবিরাজি ওষুধ খেয়েছে, তাও আবার জুলেখাকে আরো বেশি ভালোবাসতে। এ কেমন কথা, ওষুধ খেলে মানুষ মারা যাবে কেন! মানুষ এত সহজে মরে যায়!

সোজা মাস্টার মারা যাবার পরে তার বৃদ্ধ বাপ, মানে মতি মাস্টার বিধবা জুলেখা ও ছোট নাতির দায়িত্ব নেয়। হাই স্কুলের হেড মাস্টারের চাকরি থেকে এক যুগ আগে রিটায়ার্ড করলে কী হবে, তার শক্তি সামর্থ্য কোনো কোনো যুবকের চেয়েও বেশি; পেটা শরীর, ধবধবে সাদা চামড়া, কথাবার্তার ভঙ্গিতে আভিজাত্য। কিন্তু আজ এই আভিজাত্য কোথায় গেল! পুলিশ দেখে থরথর করে কাঁপছে সে। যে জুলেখাকে সে এত ভালোবাসত এত স্নেহ করত সেই জুলেখাকেই মাথা খারাপ মেয়েছেলে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করছে সকাল থেকে। হাতে ধরে পায়ে পড়ে টাকা দিয়ে মানুষ জোগাড় করেছে। তাছাড়া বড়ো নাতি মেজো নাতি তো আছেই। ছোট নাতি বাড়িতে থাকলে তার এত ঝামেলা হতো না। ছোট নাতি কী এক কাজে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, হাজার বার ফোন করেও পাওয়া গেল না, তাকে নাকি ঢাকাতে থাকতে হতে পারে বেশ কিছু দিন। সামনে নির্বাচন, কত কাজ থাকে এইসব ছাত্র নেতাদের। বড়ো নেতারা তো অর্ডার দিয়েই খালাস, বাকি সব কাজ তার নাতির মতো ছাত্র নেতাদেরই সম্পন্ন করতে হয়।

জুলেখার স্বামী মারা যাবার পরে ছোট ছেলে বা শ্বশুরের সমাদর পেলেও মেজো ছেলে, বড়ো ছেলে ও তাদের বউদের দুই চোখের দুশমন ছিল। তারা কখনো আম্মা, মা, খালা, চাচি বলে ডাকে নাই তাকে, সব সময় বেডি বলে ডেকেছে। বোঝা যাচ্ছে, এই সংসারে জুলেখা বিবি কখনো সামান্য সম্মানটুকু পায় নাই, যা একটু সম্মান পেয়েছে স্বামী ও শ্বশুরের কাছ থেকে। অবশ্য সম্মান-অসম্মানে জুলেখার তেমন যায় বা আসে না অথবা সেই বোধ তার অল্প; ভাত কাপড় পেয়েছে, পরিচয় দেবার মতো পরিচিতি পেয়েছে, মনের মতো কিছু করার সুযোগ পেয়েছে, এতেই রাজ্যের সুখ বিরাজ করে তার জীবনে। তাই স্বামী সংসার হারানোর পরেও জুলেখার জীবন যখন নতুন আনন্দে ভরে ওঠে—নতুন করে আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসে কুড়িয়ে পাওয়া খরগোশের বাচ্চাটা।

একদিন সকালে রাস্তার পাশে এক গাছের গোড়ায় বাচ্চাটা থির থির করে কাঁপছিল, এই বাচ্চা কোথা থেকে কিভাবে এল তা নিয়ে বেশি ভাবে নাই জুলেখা। এমন হতে পারে, রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কোনো খরগোশওয়ালার খাঁচা থেকে লাফ দিয়ে পড়েছে বাচ্চাটা, যাওয়ার জায়গা না পেয়ে গাছের শেকড়ের নিচে লুকাতে চেয়েছে, ভাগ্যক্রমে জুলেখার নজরেই পড়েছে।

জুলেখা ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে চাচার সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করে বড়ো স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায় নাই কখনো। ছোট্ট ছোট্ট সাধ, স্বপ্ন বা শখ একবার উঁকি দিয়েই হারিয়ে যেত। সেইসব শখের মধ্যে অন্যতম ছিল খরগোশের বাচ্চা পালা ও ফুলের গাছ লাগানো।

এই সংসারে এই স্বাধীন জীবনে দুয়েকটি শখ উঁকি দিলে কী এমন ক্ষতি হবে! এত সুখের সংসার ও শখের খরগোশের বাচ্চা পাওয়ার পর আর কী লাগে তার! তারপরও জুলেখার মনে বাগান করার ব্যাপারটাও ঘুরপাক খেত, কিভাবে কী করবে বুঝতে পারত না শুধু। একদিন সুযোগ বুঝে স্বামীর কবর থেকে কয়েকটা ফুলের গাছ নিয়ে আসে। তারপর খুব যত্ন করে গাছগুলো উঠানের এক কোনায় রোপন করে। তার আগে নামার ক্ষেত থেকে মাটি এনে জায়গাটা উঁচু করেছে, মাটি টিপে টিপে ঝুরঝুরে করে। শৈশবের শখের জিনিস পাবার পরে জুলেখার সময় কাটে দ্রুত। গাছের সাথে কথা বলা, খরগোশের বাচ্চার সাথে কথা বলা, একা একা হাসা এত কঠিন কাজ নাকি! কত শখ পূরণ করতে পারছে! এই কয়দিন দুইটা শখ পূরণ করতে পেরেছে, এত সুখ কোথায় রাখবে সে! অবশ্য খরগোশের বাচ্চা, ফুলের বাগান ও জুলেখাকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নাই। শোক ভুলে থাকার একটা অবলম্বন চাই মানুষের, অন্তত এই ব্যাপারটা কেউ কেউ বোঝে। বোঝে না শুধু বড়ো ছেলে, মেজো ছেলে ও তাদের বউরা। তারা তাকে নিয়ে নানা কথা চালাচালি করে। আর করবে না কেন, মতি মাস্টারের টেকে বুক টান করে হেঁটে বেড়ায় জুলেখা। মাথায় ত্যারচা করে ফিতা বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। ড্রেস দিয়ে কাপড় পরে আঁচলটাকে মাটি দিয়ে হেঁচড়িয়ে নিলেও শ্বশুর বলে না : ও বেডি, বেপর্দায় চইল্যো না; খোদায় গজব ঢাইলা দিব।

কিংবা বলে না : হাইট্টা হাইট্টা দাঁত মাইজ্যো না বেডি; লক্ষ্মী  উইড়া যাইব।

কিংবা বলে না : এত জুরে হাইস্যো না; জবান বন্ধ হইয়া যাইব।

কারণ, তাদের তিনজনের সংসারে সুখ আর সুখ। শ্বশুর বউকে নিয়ম করে নামাজ কালাম শেখায়, আলিফ বা তা সা পড়ায়। মাঝে মাঝে নামাজের ফজিলত, আখিরাতের নসিয়ত করে। কিংবা কারবালার বুক ফাঁটা ঘটনা, ইউনুস নবির মাছের পেটে যাবার কাহিনি শোনায়। হয়তো হাসাহাসির শব্দও শোনা যায়।

বউ রাঁধে, বাড়ে, খায়। দাদা ও নাতি খায়। তাদের সুখের সীমা নাই।

একদিন জুলেখার বাগানে ফুল ফুটে, একটা প্রজাপতি উড়ে আসে, ধূসর রঙের প্রজাপতি। জুলেখা বিশ্বাস করে একদিন রঙিন প্রজাপতি আসবে। মাটির মতো প্রজাপতি দেখলে তার গা জ্বলে।

খরগোশের বাচ্চাটা নতুন এক খেলা শিখেছে। বাচ্চাটা যেন জুলেখার সব কথা বুঝতে পারে। তারা খেলাটা খেলে যাচ্ছে। দারুণ এই খেলা।

স্বামী মারা যাবার পরে জুলেখার জীবনে এত সুখ শান্তি আসবে কে জানত, কত কী করে সে! মাটি কাঁপিয়ে ধপধপ করে হেঁটে বুজানদের বারান্দায় বসে। বুজানের জন্য মিষ্টি জর্দার পান নিয়ে যায়। আলাপ করে ভর দুপুর পর্যন্ত কিংবা শেষ বেইল পর্যন্ত কিংবা রাত দশটা পর্যন্ত। হয়তো ফিরে আসার সময় জেঠির সাথে আসে সমবয়সী শিউলি। জামাইয়ের ঘর থেকে ফেরত আসা শিউলির সাথে আলাপ করে, রাস্তার মানুষ গুনে। হাসাহাসি ডলাডলি করে। ঘরে বাংলা সিনেমা দেখে কান্না করে বাড়ি ভাসায়। হয়তো কোনো ফকির-টকির এলে তাকে খাওয়ায়, খাওয়ানোর পরে চাল দিয়ে দেয় এক সের। আর বিকাল বেলার খেলাটা খেলতে চায় জুলেখা। খোরগোশের বাচ্চা এত দিনে অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে, তারপরও কুত্তার সাথে খেলাটা খেলে। কুত্তাগুলো আরো তৎপর হয়ে গেছে যেন। তখন হয়তো মতি মাস্টার বের হয়। সে হয়তো যাবে মসজিদ ঘরের মোড়ে। জ্ঞান দিবে মানুষকে। হয়তো সামনে পেয়ে যাবে পাতি নেতা কিংবা নেতাগোছের নাতি লাব্লুকে কিংবা কাল্লুকে। আর ছলছল করে বের হবে শ্লেষবাক্য : কিরে কই গেল তগোর সরকার? দ্যাশটা ত অঙ্গার হইয়া যাইতাসে, মানুষ খুন হইতাসে, আর তরা কী করতাসস? কী আর করতারবি তরা!

তখন নাতিরা কী আর বলবে! আরেকটু সামনে গিয়ে হয়তো পেয়ে যাবে সালেহার বাপেরে। দুজনে গিয়ে বসবে কিনু বেপারীর চা স্টলে। তারপর যোগ দিবে মসজিদের ইমাম সাব; হয়তো সাথে থাকব পেট মোটা মোয়াজ্জিন। আরো আসবে খুড়া সোলেমান, জব্বারের বাপ, সইল্যা কাকু, মেন্দি হুজুর। তারা স্মার্টফোন-ইন্টারনেট-ফেসবুক হাতে চেঙরা চেঙরা পোলাপান দেখে সমালোচনার ঝড় তুলবে। আজকালের ডিশ টিভি আর তাদের আতাল-পাতাল চলাফেরা নিয়ে অথবা তাদের এই রকম নাফরমানি আর কুফরি কীর্তিকলাপ শুনে জেহাদি বাণী আওড়াবে। হয়তো একজন বলে ফেলবে : ক্যায়ামতের বেশি দেরি নাই।

আরেক জন হয়তো বলবে : হ, কুরআন হাদিসে উল্লেখ আছে দাজ্জালের কথা, এরাই হেই দাজ্জাল।

শেষে এই কথা সাব্যস্ত হবে : এগুলা কাফের ইহুদিদের কাম, শয়তানের হাতে দ্যাশ রসাতলে যাইতাছে, জেহাদ ছাড়া কোনো উপায় নাই।

এমন সময় তারা হয়তো স্মৃতিচারণ করবে। আফসোস করবে। কেউ একজন হয়তো বলে ফেলবে : কত্ত শান্তিতে ছিলাম আমরা, দুই ভাই মিল্লামিশ্যা ছিলাম, কুনু বালামসিবৎ, শয়তানি, কুফরি আছিন না, আমগোর শক্তিরে বিনাশ করার লাইগা মালাউনরা উইঠা পইরা লাগছিল, একাত্তরে ভারতের ষড়যন্ত্র মানুষ বুঝল না, পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লাইগা মালাউনের বাচ্চাগর তেলেসমাতি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত ছুকরা বুঝল না।

হয়তো একজন প্রতিবাদ করবে : না মিয়া, ঠিক কও নাই; হেরা কী কম অত্যাচার করছে আমগোর ওপর, আরে কী দরকার আছিন দেশভাগের, দেশ ভাগ না হইলে আমেরিকা না ভারতবর্ষ দুনিয়া শাসন করত।

হয়তো তাদের মধ্যে আরেক জন লাল চায়ে চুমুক দিয়ে হাঁকিয়ে উঠবে : পাকিস্তানি ভায়েরা কি খারাপ আছিন নাহি?

আরেক জন হয়তো তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠবে : হ, একাত্তর সালে হ্যারা কি এমনি এমনি আইছিলো নাকি বিবি বাচ্চা ফালাইয়া? দ্বীনের কামে আইছিল।

এইবার হয়তো মতি মাস্টার দাঁড়িয়ে যাবে : হ্যাঁ, ইস্কুল ঘরে পাকিস্তানি ভায়েরা ক্যাম্প করল, কই, আমগো তো কুনো ক্ষতি করল না, আমরা অবাধে গেছি তাগোর হ্যানে, তাগোর খ্যাদমত করছি, তাগোর লগে খাওয়া দাওয়া করছি, নামাজ কালাম পড়ছি।

হয়তো আরেক জন দাঁড়িয়ে যাবে : তারা ইসলামের জন্য এত দূরে আইছিল, তারা তো তহন খাঁটি ইমানদার মুসলমানেরে কিছু করে নাই, কাফের ইহুদি নাসারাদের বিচার করার লাইগাই না তাগোর এই দ্যাশে আসতে হইছিল, তহন তাগো লগে আমরাও ইসলাম রক্ষায় কাম করছি।

এইবার চেঙরা মোয়াজ্জিনেরও জবান খুলে যাবে : হুজুর সাব ঠিক কইছেন, আমি হুনছি গেরামের পুলাপাইন ধইরা নিয়া গ্যালে আপনারা নাকি তাগরে ছাড়াইয়া আনতেন।

কয়েকজনে জবাব দিবে : হ তো, আনতামই তো, কী আনতাম না ইমাম সাব?

সবাই এক বাক্যে বলবে : হ, সত্যি কথা। আমগর একটা দায়িত্ব আছে না !

এমন সময় এই রাস্তা দিয়ে হয়তো মুহম্মদ আব্দুল গফুর ওরফে গফা খলিফা যাবে। তাকে দেখে হয়তো তারা কথা থামিয়ে দিবে। কারণ, গফা খলিফা একাত্তরে মুক্তিবাহিনীদের সাথে ছিল। ক্যাম্পে রান্না করে খাওয়াত, খোঁজ খবর এনে দিত বিহারিদের। নৌকা ডুবাতে, ব্রিজ ভাঙতে গফা খলিফাই নাকি সবার আগে ছিল।

তারপর, গফা খলিফা চলে গেলে হয়তো তারা বলাবলি করবে। তারা মায়া করবে গফা খলিফার জন্য। কারণ, গফা খলিফার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নাই। অথচ এই গ্রামে তিন জন ক্ষমতাবান ব্যক্তি নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছে। কিন্তু সংগ্রামের সময় ওরা নাকি হাফপ্যান্ট পরত। অথচ গফা খলিফা নাকি বলে : সার্টিফিকেটের লাইগা যুদ্ধ করি নাই, দ্যাশের লাইগা যুদ্ধ করছি।

এ জন্যই মতি মাস্টাররা লোকটার জন্য আফসোস করে বলবে : যেইসব পোলাপাইনরে দেখছি ন্যাঙটা হইয়া ঘুরতে হেরা নাকি মুক্তিযোদ্ধা, হেরা সরকারি টিভিতে ইন্টারভিউ দ্যায় হেরা নাকি মুক্তিযোদ্ধা আর আমরা নাকি রাজাকার, কেউ কী কইতে পারব আমরা পাড়ার কারো ক্ষতি করছি কি-না!

তারপর আলাপ চলতে থাকবে। এশার সালাত আদায় করে তারা ঘরে ফিরবে। মতি মাস্টারও ঘরে ফিরে রাতের খাবার খায়। নাতি তাড়াহুড়ো করে। সে এখন ক্ষমতাশীল দলের ছাত্র সংগঠনের উঠতি নেতা। এত উড়ু উড়ু  ভাব কেন? দাদার প্রশ্নের জবাবে সে নানা প্রসঙ্গ টেনে আনে। দাদা কিছু বোঝে কিছু বোঝে না। নাতির মধ্যে পরিবর্তনের একটা ছাপ হয়তো দাদা খেয়াল করে। সে এখন দাড়ি কেটে গোঁফ রেখেছে। লম্বা লম্বা চুল কেটে ভদ্র ছাট দিয়েছে। রঙ-বেরঙের প্যান্টের বদলে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে। ব্লাউজকাটিং শার্টের বদলে প্রায়ই স্যুটকোর্ট পরে। জমি না বেচেই বাইক কিনে। মিটিং-মিছিল করে। দাদা বাধা দিলেও কাজ হয় না। বাইক নিয়ে কলেজে যায়, কলেজ থেকে যায় নানা জায়গায়, যায় বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরিতে। টেন্ডার, কন্ট্রাকটরি, কমিশন চান্দা ইত্যাদি কাজে নাকি তার হাত বেশ ভালো। এমপি সাবের সাথেও নাকি দহরমমহরম সম্পর্ক। মেয়েমানুষের সাথে ডলাডলি করে। হয়তো কোনো মেয়েকে বাইকের পিছনে তুলে সিগাল পার্কে নিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে যায় ক্লাবের দিকে। সেখানে হয়তো তাস খেলে অথবা ক্যারমে টোকাটুকি করে। সে আর ছোট নাই, রাত বারোটার মেলা পরে বাড়ি আসে। তার মনে হয়, আসমানে সূর্যের মতো ফকফকা চাঁদ উঠে কেন? অন্ধকার কত মজার; কত সুবিধার। মরার চাঁদ তোর মরণ নাই নাকি? আছে হয়তো। আর থাকবে না কেন? মনে হয় চাঁদের চেয়ে বেশ্যাদের কপালের লাল টিপ বেশি সুন্দর।

এমন সময় হয়তো ঘরের ভেতর শ্বশুর বউকে কেরাত শেখায়, নামাজ কালামের তালিম দেয়। দ্বিনিকাজে ব্যস্ত থাকে তারা। হয়তো তারা চাঁদের কথা ভুলে যায়। আর কলঙ্কিনী চাঁদ দেখার টাইম কই? এই সময় কুত্তার ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনে মতি মাস্টার নড়েচড়ে বসে। কুত্তাকুত্তির সাথে মানুষের ধাওয়াধাওয়ির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তালিম দেয়া-নেয়ার কাজে ব্যাঘাত ঘটে, গলার আওয়াজ শোনা যায় : হ্যাইত কুত্তা হ্যাইত, ধুচ্চে, ধুচ্চে, হ্যাইত, হ্যাইত, হারামজাদা কুত্তা খায়াল্যোগো, কইগো বউ, তুমগোর কুত্তা সামলাও, ও বাবাগো খাইয়ালছেরে, খাইয়ালছে, ও বউ, দরজা খুলো, আমি লালাজিৎ ম্যাম্বর।

এই এলাকার মেম্বার। তিনবার ফেইল মারার পর গত ইলেকশনে পাত্তি পাত্তি টাকা খরচ করে তিন ভোটে পাস করেছে। মাতব্বর মাতব্বর ভাব চলাফেরায়। এই মেম্বার খুব বেশি ঘোরাঘুরি করছে এদিকে। রাত দুপুরে অথবা দিনের মধ্যে দুই তিন বার পর্যন্ত আসে।


শ্বশুর পিছলা খেয়ে পড়ে যেতে চায়; বউ ধরে ফেলে। খুব ঘন হয়ে আগায় তারা। আবার শুরু হয় জ্ঞানীকাজ।


ঘর থেকে বের হয় অপ্রস্তুত মতি মাস্টার : কী মিয়া, এত রাইতে কইথ্যে?

কথা বলার আগেই মেম্বার লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে। টপ টপ করে রক্ত ঝরতে থাকে তার পা বেয়ে। বউ বিচলিত হয় : দেহি, দেহি, কই কামড়াইছে?

লালাজিৎ মেম্বার হাঁটুর উপর লুঙ্গি উঠিয়ে দেয়। পা থেকে এক খাবলা মাংস নিয়ে গেছে জানোয়ারটা। বউ হাত দিয়ে ধরতে চায়, কিন্তু পারে না। শেষে একটা ন্যাকড়া দিয়ে ক্ষতস্থানটা বেঁধে দেয়। শ্বশুরের গায়ে যেন চুতরা পাতা খাবলায়া ধরে।

কিছুক্ষণ পরে মেম্বারকে এগিয়ে দিতে হয় বউ-শ্বশুরকে। শালার মেম্বারের বাচ্চা মেম্বার আসার আর সময় পায় না।

ঘরে ফেরার জন্য তারা হাঁটে। শ্বশুর পিছলা খেয়ে পড়ে যেতে চায়; বউ ধরে ফেলে। খুব ঘন হয়ে আগায় তারা। আবার শুরু হয় জ্ঞানীকাজ।

পরের দিন মতি মাস্টার সিএনজি ভাড়া করে বাজার নিয়ে আসে। গরুর আস্ত রান দেখে জুলেখার ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। শ্বশুর পিঁড়িতে বসে থাকে। তার ঘামের গন্ধে ঝিম মারে বউ। বউয়ের ভালো লাগে না মন্দ লাগে বোঝা যায় না; কিন্তু তাদের আলাপ চলতে থাকে। দক্ষিণের টেক বেচার আলাপ। কারণ, ১৩ হাত লম্বা জিহ্বা আর ঢুলির মতো পেট ভরার জন্য জমি বেচা ছাড়া আর কোনো উপায় আছে কি?

তখন ছোট ছেলে আসে, দাদার কথায় বাধা দিয়ে বলে :  কী কও দাদা, টাকার দরকার হইলে তুমি আমারে কইবা না, জমি বেচনের কী দরকার?

এই কথা বলে এক হাজার টাকার নোটের একটা বান্ডেল দাদার হাতে দিয়ে দৈত্যের মতো হাসে।

জুলেখা চুলায় গোস্ত কষায়; দাদা ও নাতির জিহ্বায় পানি আসে। আম কাঠের আগুনে গোস্ত পোড়ে আর হাঁচি দিতে দিতে জুলেখা কুঁকড়ে যায়, জোঁকের মতো গুটিয়ে নিচু হয়ে জবুথুবু হয়ে যায়। শ্বশুর-ছেলে দেখে কি-না বোঝা যায় না। তবে সে এক পলক ছেলেকে দেখে আবার হাঁচি দিতে থাকে। শ্বশুর আর সইতে পারে না; এগিয়ে যায় : দেহি বউ আমি একটু নাড়া দেই।

বউ হাঁচি দিতে থাকে। শ্বশুর ভাপের চোটে ছেকা খেয়ে সরে আসে; কিন্তু দমে যায় না; নাড়তে থাকে এক টানা। তারপর চামচ দিয়ে একটা গোস্তের টুকরা তুলতে গেলে চিও করে এক ছিলিম লালা পড়ে ডেকচির মধ্যে। বউ নাতি দেখে না।

এমন সময় নাতির মোবাইল বাজতে থাকে। চলে যায় সে। এতে দাদা খুশি হয়।

তারপর মতি মাস্টার গোস্তের টুকরাটা খায় আর বউয়ের দিকে চেয়ে বলে : কাবাব বানাইতানা বউ?

বউ বলে : রাইতে খাওয়াইমুনে।

বউ হাসে। শ্বশুর হাসে। কলপাড় থেকে মেজো ছেলে দেখে। দুয়ারে দাঁড়িয়ে বড় বউ দেখে। বউ শ্বশুরের হাসাহাসি বাড়তে থাকে।

এক সময় খাবার খাইতে বসে দাদা-নাতি-বউ। চ্যাপা-শুটকির ভর্তা কিংবা শাক কিংবা আলুর ভর্তা কিংবা এই রকম কিছু নাতির পছন্দ না কোনো দিন। কিন্তু আজ দাদারও ভলো লাগে না। বউ একটু পাতে তুলে দিলে শ্বশুর বলে : নুন মরিচে হয় নাই বেডি। ভালো লাগে না। তুমার শ্বাশুড়ি কইত, নুন মরিচে চর্তা, তবে খাও ভর্তা।

বউ সহজে বুঝতে পারে আজকের ভর্তার অসারতার কারণ। তাই পাঁচ ছয়টা গোস্তের টুকরা পাতে তুলে দিলে শ্বশুর টুসটুসে গালে হাসে। এই হাসি দুনিয়ার সব জায়গায় মিশে যায় যেন।

দুপুরের পরে ফুলের বাগানে খুঁটিতে গাঁথুনি দেয় জুলেখা। সাথে সাথে লালাজিৎ মেম্বার এসে পিছনে দাঁড়ায়। চোখে-মুখে টনটনে ভাব। জুলেখা দেখে এক সময়। কাপড় সামলায়া নেয়। তাদের চোখে চোখ পড়ে। মেম্বার চেয়ে থাকে, জুলেখা মুচকি হেসে চলে যায় বুজানদের ঘরের দিকে।

মেম্বার হয়তো যাবে গোলাঘাট বাজারে, গিয়ে বসবে পার্টি অফিসে। হয়তো সেখানে যোগ দিবে চান্দু বেপারী, মোশারফ খলিফা, রশীদ চকিদার। কথার তোপ ধ্বনি তুলে গাঙের পানি সাগরের পানি এক করবে। প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ইউরোপ-আমেরিকা, সিরিয়া-মিসর, ফিলিস্তিন-ইসরাইল, রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি ঘুরে আসবে। হয়তো খোশগল্প করবে, কার বউ জামাই বিদেশ যাওয়ার পরে আরেক বেটা নিয়ে ভেগে গেছে, কার বউ ভাশুরের সাথে ধরা খেয়েছে, কার মেয়ে বিয়ের আগে পেট ফেলেছে, কার মেয়ের দেহের গড়ন ভালো।

রাত একটু বাড়লে তারা হয়তো বসবে জামতলায় অথবা আনু দর্জির দোকানে; সারা রাত প্যাকেটের পর প্যাকেট চুরুট শেষ করবে আর জুয়া খেলায় মাতবে। মাঝে মাঝে মদ নিয়ে আসবে;  হয়তো বাজারের ফাটকান্নিরে টাকার বিনিময়ে নিয়ে আসবে সারা রাতের জন্য। তাদেরকে কিছু বলার কেউ নাই। কারণ, তারা ক্ষমতাশীল দলের লোক। তাদের মজা দেখে কে? কেউ না; মনে হয় আল্লাহ্ও না।

বিকালের নোনতা রোদে পশ্চিমের ক্ষেতে ফুটবল খেলে মরদা মরদা পোলারা। ছোট ছেলেও যোগ দিয়েছে খেলায়। জুলেখা আর শিউলি বসে বসে পান চিবায় আর চেয়ে থাকে। খোরগোশের বাচ্চাটা কোল থেকে নেমে যেতে চায়, কুয়েকটা কুত্তা ওত পেতে বসে থাকে। বেডি সেই খেলাটা খেলে। আজকাল বেশ জমছে খেলাটা। খরগোশের বাচ্চাটাকে একবার ছাড়ে তো আরেক বার ধরে। জুলেখা যখন খরগোশের বাচ্চাটাকে কোল থেকে মাটিতে ছাড়ে তখনই একটা কুত্তা লাফায়া আসে আর সাথে সাথে জুলেখা বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। খরগোশের বাচ্চাটাও ভয় পায় না, কারণ, সে জানে কুত্তাটা আসার আগেই তার মালিক তাকে কোলে তুলে নিবে। দারুণ খেলা; খেলোয়াড় তিন জন, জুলেখা, খরগোশের বাচ্চা ও কুত্তা।

এমন সময় হয়তো কালুদের শিক্ষিত ছেলে শিউলিদের বাড়ির দিকে তিরতির করে আগায়। তখন শিউলিকে কাছি দিয়েও বেঁধে রাখা যায় না। তখন জুলেখা তার বাগানের কাছে যায় এবং প্রজাপতিটাকে ধরার চেষ্টা করে, হয়তো তার অন্তরে টান পড়ে; অজানা টান।

বাতির আজানের পরে বারান্দায় হাঁস মুরগির খোয়াড় লাগায় জুলেখা। খোয়াড়ের মুখ লাগাতে গিয়ে উপুড় হলে মেম্বার আবার আসে। মেম্বার এক ঠ্যাঙ মুরগির খোয়াড়ের উপর তুলে কাতি মাইস্যা কুত্তার মতো হাঁপায়।

জুলেখা রাগের দৃষ্টিতে তাকায় এবং যাবার সময় মুচকি হেসে ঘরে ডাকে মেম্বারকে। খাটের কোনায় গেড়ে বসে মেম্বার। কথা চলে তাদের আর মেম্বারের চোখ গিয়ে পড়ে জুলেখার বাম আঁচলের নিচে। জুলেখা দেখে, হয়তো দেখে না। পান খাওয়া চলে আর চলে আলাপ : বউ শরীল বালানি? ছ্যারাডা গ্যাছে কই?

ক্যাডা জানে? কত্ত কামকাজ তার, কত্ত দৌড়াদৌড়ি, সামনে ইলেকশন, আমার চে ত আপনেই ভালা জানেন। মেম্বার বলে : অকালে ব্যাডা গ্যালোগা মইর‌্যা, তা কিচু ভাবছো টাপছো নাহি?

কী আর ভাববো ভাইজান? শ্বশুর আছে, প্যাটের না হোক একটা ছ্যারা আছে, বাড়ি ভরা মাইনষে।

মেম্বার বলে : হ, তা তো আছেই।

হ, আপনারা আছেন।

এই কথা শুনে মেম্বারের মুখের তলে খুশি খুশি ভাব দেখা যায়। হঠাৎ মানুষেররা! বিচলিত হয় মেম্বার। তার মনে হয় : হালার বুইড়া আসার আর সময় পাইলো না, বদের বাচ্চা বদ।

শ্বশুরের অচেনা আগমন আজ। ঘরে ঢুকে তার পিত্তি যায় জ্বলে। এই বেইমানের বাচ্চাটা যে কী চায়! বউটাও জানি কেমন : কী ম্যাম্বর? কী হাল আলামত? যখন তখন তুমার দেহা পাই। কী ! খরব টবর কী?

—বালাই, আপনে ক্যামন?

—এই আছি, বউডার দ্যাখভালে বালাই চলতাছে, তা তুমি তো মিয়া বয়স্ক ভাতায় আমার নামটা ঢুকাইয়া দিলা না।

—কী যে কইন ম্যাসাব? আপনেগর আবার অ্যাগুলার দরকার আছে? এত্ত জমিজমা ক্যাডা খাইবো?

—হ মিয়া, সব তো তুমরাই খায়ালতাছো, গরিবরে আর কয় দানা দেও, এইতা আমরা সবই জানি।

মেম্বার ঢেঁকুর খায়। কথা বের হতে চায় না আর। জোর করে হেসে বলে : পঞ্চাশ লাখ টাকা খরচ কইরা ম্যাম্বরি পাস করছি, টাকা তো উডান লাগবো নাকি?

—হ, তা ঠিক আছে, কিন্তু এত টাকা তো খরচ কর নাই ম্যাম্বর।

—পঞ্চাশ না গ্যালেও চল্লিশ তো গ্যাছেই।

—তাও যায় নাই, ধরো গ্যাছে, কিন্তু এই-সেই তো কম খাও নাই, হুনছি বিচার শালিসেও নাকি পকেট ভারি করো, এট্টু দ্বীনের রাস্তায় আসো মিয়া, আল্লায় তো সইবো না।

লালাজিৎ মেম্বার কথা খুঁজে পায় না আর। নয় ছয় করে উঠে পড়ে। মতি মাস্টার বিড় বিড় করে : শালার ম্যাম্বর যহন তহন আসে, এমনকি রাইত বিরাইতেও মাইনষের বাড়িতে আইসা বইসা থাকে। কুত্তার কামুড় খায়াও লাল্লৎ হয় নাই জালিমডার।

হাজার রাগ উঠলেও জুলেখাকে কথা শোনানোর ক্ষমতা মতি মাস্টারের নাই।

ভরা রাতে ছেলে ঘরে ফিরে জুলেখাকে ডাকতে ডাকতে বিছানায় ঢলে পড়ে। আজ মনে হয় মাল বেশি গিলেছে। আন্দাজ ঠিক, ছেলের মুখ থেকে পঁচা ভাতের গন্ধ বের হচ্ছে। ওয়াক করে বমি করতে করতে আত বের হয়ে আসবে যেন তার। ব্যথার যন্ত্রণায় মাথাটা ছিঁড়ে যাবে যেন।

মতি মাস্টার পানি পড়া দেয়, ঝাড়ফুঁক করে। জুলেখা মাথায় পানি ঢালে, মাথা টিপে; ভেজা গামছা দিয়ে সমস্ত গা মুছে। পরে, রাত গভীর হয়। মাস্টারের চোখ লেগে আসে; কিন্তু সারারাত জুলেখার সেবার হাত বন্ধ থাকে না। ভোরের দিকে ছেলের অসুখ কমে যেতে থাকে।

এই রাতের পর থেকে প্রায়ই ছেলের অসুখ হয়। সেবাযত্নে যথারীতি জুলেখা বিবি। এক বিন্দুও এদিক-সেদিক হয় না। কিন্তু সকাল হতে না হতে মেম্বার উপস্থিত হয়। জুলেখাকে খুঁজে। কিন্তু জুলেখা কই? জুলেখা তো নাই, এখানেও নাই সেখানেও নাই, কোনোখানে নাই।

এক কথা দুই কথা বলতে বলতে সময় গড়িয়ে যায়, মরার বউ তো এখনো আসে না। মেম্বার কথা খুঁজে পায় না। তাই সে খাজুরে আলাপ করে মাস্টারের সাথে। সামনে নির্বাচন। বহু আগেই দল পাল্টিয়ে সরকারি দলে যোগ দিয়েছে সে। তার কোনো ভয় নাই, সে এখন সরকারি দলের লোক !

মেম্বার আবারো কথা খুঁজে পায় না। কই যে গেল বউটা? আবার আলাপ শুরু হয়। দেশ-বিদেশের আলাপ। সময় গড়ালে মেম্বারের মন ভেঙে যায়। তাই সে বিদায় চায় : যাইগা ম্যাসাব, বহুত কাম আছে, কাঁঠালীতে একটা শালিসে যান লাগব, আর কয়েন না, পাপে দ্যাশটা ভইর‌্যা গ্যাছে গা, বাওরের লগে ছুডু ভাইয়ের বউ ধরা খাইছে, ওয়াস্তাফিরুল্লা, এমন নাফরমানি কাম মাইনষে করে নাহি!

মতি মাস্টারও ওয়াস্তাগফিরুল্লা পড়ে নাক ফুলিয়ে রাখে অথবা ঘেমে যায় সে।

যাবার জন্য পা বাড়িয়ে বামে ঘুরে মেম্বার মুচকি হাসে : যাইগা বউ, এট্টু দরকার আছে।

বউ এক গালে হেসে দুনিয়া জুড়ে তাচ্ছিল্যের ভাব ছড়িয়ে দিয়ে বলে : কুত্তার কামুড়ের কথা মনে আছে নি ম্যাম্বর সাব?

কথার চাবুক সহ্য করতে না পেরে মেম্বার কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। শ্বশুর ছোট চোখে তাকায়। তার মনের অবস্থা উদ্ধার করা যায় না।


কুনু গুরুস্থানে এরে কবর দিলে হেই গুরুস্থান নাপাক হইয়া যাইবো, হের জানাজা গুসল দেওয়ার বিধান নাই।


এভাবে কিছু দিন যায়। তবে মাস্টার বাড়ির পরিবেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে। জুলেখার মুখে হাসি নাই। বাগানের প্রতি তার টান নাই, প্রজাপতির জন্য আকুল হয় না, খোরগোশের বাচ্চাকে খাওয়াতে ভুল হচ্ছে। খেলাটা খেলে না। সারাদিন থুম মেরে বসে থাকে। মাথা ঘুরে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। থমথম করে আত্মা। খাওয়ায় অরুচি। চোখে যেন অমাবস্যা নেমে আসে। মাথার ভেতরে ঝিমঝিম করে; লুকিয়ে লুকিয়ে বমিও করে।

জুলেখার পেটের জ্বালাপোড়া কমলেও বাড়ন্ত পেট ঢাকবার উপায় জানে না। কিন্তু আজ তো ঘুম থেকেই ওঠে না। কেন ওঠে না? কেউ জানে না। আকাশ জানে না। বাতাস জানে না। ফুলের বাগান জানে না। বনের পাখি জানে না। হালের বলদও জানে না। মনে হয় ফেরেশতারাও জানে না।

শ্বশুর কিংবা ছেলে কিংবা লালাজিৎ মেম্বার খোঁজ করে না। তবে মানুষ এক সময় খোঁজ পায়। পুলিশ আসার আগে অনেকে দেখে জুলেখা নতুন সিলিং ফ্যানের সাথে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে। তার পেটিকোট শক্ত করে কোমরে বাঁধা আছে। ব্লাউজের বোতামগুলো এলোমেলোভাবে লাগানো। জিহ্বা একটু হয়তো বের হয়েছে; কিন্ত মলমূত্রের চিহ্নটুকু নাই। ঠোঁটের কোনায় থোকা থোকা রক্ত। চোখ আধা মেলানো। দেহে ভনভন করছে মাছি। বিছানার বালিশ, চাদর কোঁকড়ানো, বাসি ফুলের ভাঙা পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, নাকি প্রজাপতির পাখনাকে ফুলের মতো দেখায়?

পুলিশ সব নোট করছে। মেম্বার ও রশীদ চৌকিদারকে তৎপর দেখাচ্ছে। সকলেরই এক দফা এক দাবি : মা-বাপ নাই, স্বামী-সন্তান নাই; তাই দুঃখে গলায় দড়ি দিছে।

সবাই আরো বলে : মাথায় গণ্ডগোল আছিন, কারো লগে কথা কইতো না, ফুল গাছ আর খোরগোশের সাথে কথা কইতো।

পেট মোটা দারোগা হাঁক দিয়ে ওঠে : হুঁওঁ, একটা মানুষ এমনি এমনি আত্মহত্যা করে নাকি? পোস্টমর্টেম করলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে আর কয়েকটারে ধরে হুগাডার মধ্যে দুইডা গরম ডিম ঢুকায়া দিলে ফরফর করে সব বের হয়ে যাবে।

মানুষ থরথর করে কাঁপতে থাকে। মতি মাস্টার ভয়ে কুকড়ে যায়; দমটম বন্ধ হয়ে আসে তার। ছোট নাতি থাকলে পুলিশ কিছুই করতে পারত না, গতকাল রাতের ট্রেনে সে নাকি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেছে।

মতি মাস্টার মেম্বারকে ডেকে আলাপ করে। তার মুখের কথা শুনে তো মেম্বারের সুখের সীমা নাই। উত্তেজিত কণ্ঠে সে বলে : কুনু চিন্তা নাই ম্যাসাব, আমি বাইচ্যা থাকতে লাশ নিতে দিতাম না, আপনে মাল রেডি করেন।

তখন মেম্বার দারোগার কানে কানে কথা বলে।

দারোগার মনে একটু মায়া জন্ম নেয়; দারুণ মায়া : আচ্ছা ঠিক আছে, আপনারা যেহেতু বলতাছেন, মৃত নারীর মাথায় গণ্ডগোল আছে, তাছাড়া আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নাই, এক শ্বশুর ছাড়া তেমন কেউ নাই, কী আর করার? আপনাদের দিকে চায়া লাশ আর নিয়া গ্যালাম না, কিন্তু বেশি সময় নেয়ার দরকার নাই, তাড়াতাড়ি লাশ কবর দেন।

অল্প সময়ের মধ্যে উত্তরের টেকে মাটি চাপা দেয়া হয় লাশটা। তখন জনতার উদ্দেশ্যে মতি মাস্টার ভাষণ দেয় : এই বেডির লগে পিশাচ ভর করছে, শয়তান হইয়া গ্যাছে এইডা, কুনু গুরুস্থানে এরে কবর দিলে হেই গুরুস্থান নাপাক হইয়া যাইবো, হের জানাজা গুসল দেওয়ার বিধান নাই।

লালাজিৎ মেম্বার মাথা নেড়ে হা বলে।

মসজিদের ইমাম সাব বলে : মুরদা ব্যক্তি জানাজা গুসল না পাইলেও কুনু সমস্যা নাই, তিন দিনের মাথায় একটা মিল্লাত মাহফিল এবং দোয়া দুরুদ পাঠ করলে ঐ ব্যক্তির আত্মা শান্তি পাইবে, মাস্টার সাব ঘুষণা দিছেন যে, উনা যেহেতু উনার ছেলের বউকে আপন মেয়ের মতন স্নেহ করতেন সেহেতু আগামী বাদ জুম্মা উনি মিলাত মাহফিলের আয়োজন করবেন এবং আপনাদের সবার দাওয়াত রইল।

সবাই মতি মাস্টারকে বাহবা দেয়। জয় হোক মাস্টারের। মহান এই মাস্টার।

সন্ধ্যার আগে আগে দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টাররা এলে মতি মাস্টারকে আবারো গাঁটের পয়সা খরচ করতে হয়।

মেম্বারের চোখেমুখেও খইফোটা আনন্দ খেলা করে। বড়ো ছেলে মেজো ছেলে বাঁকাভাবে হাসে। তাদের বউরা নতুন নতুন তথ্য জাহির করে।

জুম্মার দিন। মানুষের ব্যস্ততার শেষ নাই। মাস্টার বাড়িতে যেন একটু বেশিই। পাঁচশ মানুষের জন্য বিরিয়ানি রান্নার আয়োজন কম ঝামেলার কাজ না। বেহায়া মেঘের কারণে উঠানের বেশির ভাগ মাটিই স্যাঁতসেঁতে, যা একটু শুকনা আছে ওই ফুলের বাগানটায়; কী আর করবে বাবুর্চিরা, শেষমেশ জুলেখার বাগানের আগাছা উপড়ে ফেলে সেখানে বসানো হয় বিশাল বিশাল শসপ্যান।

মুসল্লিরা সুরে সুরে আল্লাহুম্মা সল্লিয়ালা পড়ে। গোস্তের গন্ধ তাদের পরকালের কাজে বাধা দেয় যেন। সময় গড়াতে থাকলে তাদের আমলের গতি বাড়তে থাকে। তারা বারবার থুতু ফেলে অথবা ঢেঁকুর তোলে কিংবা ঢোক গিলে। এক সময় গরুর গোস্তের টুকরায় কামড় দেয় তারা আর তাদের চোখ গিয়ে পড়ে তেরছা করে।

তখন জুলেখার খরগোশের বাচ্চাটাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করে কয়েকটা কুত্তা।


[‘প্রজাপতি, খরগোশের বাচ্চা ও কয়েকটা কুত্তা’ গল্পটি মেঘ ও মানুষের গল্প গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী রাজিব দত্ত। ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে বইটি মুদ্রিত হয়েছে। বইটি পাওয়া যাবে ৬ নম্বর প্যাভিলিয়ন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, একুশে বইমেলা ২০১৯।]

মেহেদী ধ্রুব

কথাসাহিত্যিক। জন্ম ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯; বালিয়াপাড়া, শ্রীপুর, গাজীপুর, ঢাকা।

শিক্ষা : বিএ (অনার্স), এমএ (বাংলা), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

পেশা : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সিলেট ক্যাডেট কলেজ। ৩৬তম বিসিএস থেকে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।

ইমেইল : mhdhruboknu1989@gmail.com