হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : হলুদ ট্রেন

পাণ্ডুলিপির গল্প : হলুদ ট্রেন

পাণ্ডুলিপির গল্প : হলুদ ট্রেন
390
0

[যূথচারী অাঁধারের গল্প নাহিদা নাহিদের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী সারাজাত সৌম;  প্রকাশনী জেব্রাক্রসিং। বইটি পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান স্টল নং : ৬৬০-এ।]


মধ্যরাত। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। বসে আছি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর নিচে, অনেকদিন পর। হু, মাঝখানে প্রায় সাড়ে সাত বছর! হাতে লাগেজ থাকার কথা। নেই। কোনদিকে যাব ভাবছি। ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটা চলে গেল। হলুদ রঙের ট্রেন! এ-সময় রোজই যায়। আন্তঃনগর ট্রেন হুশ করে আসে হুশ করে যায়। ট্রেনের চলে যাওয়ার শব্দে আমার নিঃসঙ্গতা বাড়ে, তাকিয়ে থাকি দূরে। ঝিমিয়ে পড়া চাঁদের আলোয় সর্পিল ট্রেনটার কু-ঝিক-ঝিক ডাক কী ভয়ংকর! পেছন থেকে মনে হয় ট্রেনটা একটা বিশাল অজগর, তাড়া খেয়ে ছুটছে এঁকেবেঁকে। এই ট্রেন, এই প্ল্যাটফর্ম; এ ছবিটায় কিছু একটা আছে। মনে করার চেষ্টা করি। অস্পষ্ট-ধোঁয়াশা। আমার স্মরণ প্রচেষ্টায় ট্রেনটার ফোঁসফোঁসানি থেমে যায়। ভুতুড়ে লাগে চারপাশ; সুনসান। আমি আর ঘুমন্ত প্ল্যাটফর্ম বন্ধ ঘড়ির দমহীন কাঁটার মতো থেমে থাকি কিছুক্ষণ। আমাদের পাশে দেয়াল নেই, মাথার ওপরে ছাদ নেই, এমনকি যে আকাশটা আছে, সেটাও ঘোলা। ট্রেনের বুকের নিচে ঢাউস পেট, মাথায় শিকারি বাঘের চোখ। ট্রেনটা রাগী। তার চিৎকার কর্কশ। দীর্ঘদিন ব্রাশ না করা হলুদ দাঁতের এই ট্রেন এদিক-সেদিক তাকায় শুধু। সারা প্ল্যাটফর্মে আর কেউ নেই। ট্রেনটা আমায় খোঁজে। আতঙ্কে আমার শরীর বরফ হয়ে যায়। গন্তব্য ভুলে যাই। আমাকে কোথাও পৌঁছে দেওয়ার মতো একজন মানুষ খুঁজছি। কেউ কি আছে আমার? এখানে অনেক পরিচিত মুখ থাকার কথা। টুনি, বুল্টিদা, মগাই, ফিৎসা, আতিলু আরও কত মুখ মনে পড়ে! ওদের থাকার কথা ছিল। টুনি আর ফিৎসাকে বাদই দিলাম, শুনেছি ওরা আত্মহত্যা করেছে; ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছিল। অনুমান করি, সোডিয়াম আলোয় সে ট্রেনটার রং নিশ্চয়ই হলুদ রঙেরই ছিল। ওদের অনুপস্থিতি আমায় বিভ্রান্ত করে। আমার ভাবনার মাঝে অকস্মাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে হারিকেন হাতে এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ায় সামনে। আগুনের শিখায় কালো হয়ে যাওয়া চিমনির ওপাশে আমি তার রহস্যময় মুখ দেখি। তাকে কি আগে দেখেছি কোথাও? নিশ্চিত নই। বৃদ্ধ আলোটা আমার মুখের দিকে তুলে ধরেন :

—চলুন।

—কোথায়?

—আপনার রাতের খাওয়া হয় নি এখনো।

আমি অবাক, কে এই বৃদ্ধ? তাকে কি আমি চিনি? স্মৃতি হাতড়ে পাই না কিছু!


হাতের উল্টোপিঠে চোখ ঢাকি, ঢাকা চোখেও স্পষ্ট দেখতে পাই কয়েকটা ছায়ামূর্তি।


অবাক হবার বিষয়টা বৃদ্ধকে স্পর্শ করে না। বৃদ্ধ আমাকে টেনে টেনে কোথায় যেন নিয়ে যেতে চান। বাধা দেই না। চলি। সামনে বৃদ্ধ, পেছনে আমি। মূল সড়কপথ ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় নামি। আমার দীর্ঘবিরতিকালে কত কিছু বদলে গেছে, অথবা কিছুই বদলে যায় নি, শুধু বদলে গেছি আমি। তাই হবে হয়তো। অন্ধকারে চোখ কচলে প্রাচীন মিনারটা খুঁজি, পাই না।

—এই যে শুনছেন?

—বলুন।

—দর্জির দোকানের নুরুজ্জামান এখানে ছিল?

—মরে গেছেন তিনি।

—আকবর?

—তিনিও।

—রাহেল?

—মৃত।

যাক, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমাকে দেখবে পরিচিত এমন কেউ আর বেঁচে নেই! সবাই মৃত।

আমার বুকের শীতল বরফ ভাঙে, সহজ হই।

—নুরুজ্জামান মরলো কেমন করে?

—ট্রেনে কাটা পড়েছেন।

—আকবর?

—তিনিও।

—রাহেল?

—সেই ট্রেন।

ভয় কাটে আমার। হলুদ ট্রেন তাদের গলা কেটেছে, মানুষ নয়। ট্রেন বা মানুষ যে-ই তাদের গলা কাটুক, যে কারও তো জেলে যাওয়া জরুরি, কে যাবে এখন?

আমার জেল সংক্রান্ত ভাবনায় বুড়োটা কেমন করেন। করুক। এদিকে আকবর আলীর মৃত্যু সংবাদে আমার ভেতরে স্বস্তির উষ্ণস্রোত বয়ে যায়। তার জন্য কষ্ট হয় না একটুও। মনে পড়ে আতিলু আর মগাইয়ের মুখ। মারমা মেয়ে দুটো যমের মতো ভয় পেত তাকে। তারা তাদের থামির নিচে লুকিয়ে রাখতো চুলের কাঁটা, সুযোগ পেলেই গেলে দেবে তার চোখ। আকবর আলী বলতেই আতিলু মগাই একদলা থুতু ফেলে বলতো, বজ্জাত! হারামজাদা!

—বুল্টিদার কোনো খবর জানেন?

প্রশ্নটা করেই ঘামতে থাকি। লজ্জা, দ্বিধা সব মুখে মেঘের মতো জমা হয়। আতঙ্ক আর ভয়ও লাগে, বলে দিলাম সব এই অচেনা বুড়োকে? বৃদ্ধ হাসে!—আমি জানতাম আপনি আমায় এই প্রশ্নটা করবেন। অনেকদিন তার কোনো খবর নেই। শেষকালে উড়ো খবর এল, তিনি জেলে।

—তারপর?

—মরে গেছেন।

—কেমন করে?

—ওই যে, ট্রেনে কাটা পড়েছেন।

আরও কয়েকটা প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ‘ট্রেন’ শব্দটা শুনতে শুনতে ক্লান্ত, আলসেমি লাগছে। হাঁটতে থাকি অন্ধকার ধরে, হাত পা গুটিয়ে। একসময় একটা গাঢ় টর্চের আলো চোখে পড়ে। হাতের উল্টোপিঠে চোখ ঢাকি, ঢাকা চোখেও স্পষ্ট দেখতে পাই কয়েকটা ছায়ামূর্তি। তারা আমাদের পথ আগলে দাঁড়ায়, আমরা কথার খেই হারিয়ে ফেলি। ছায়ামূর্তিগুলোর মধ্যে নুরুজ্জামান, আকবর, রাহেল, টুনি, ফিৎসা সবাই ছিল। বুল্টিদাও ছিল হয়তো, খেয়াল করি নি। আমি তাদের দেখি, তারাও আমাকে দেখে। ভাবলেশহীন! পরস্পর পরস্পরকে দেখে ছেড়ে দেই পথ।

এরপর যেমনি হাওয়ায় এসেছিল তারা, তেমনি আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ছায়াগুলো চলে গেলে আবার একা হই। বুল্টিদাকে দেখা হলো না। বিষণ্ন লাগে। আমার সঙ্গে সঙ্গে বুড়োটাও বিষণ্ন হয়। একাকিত্বের ভারে পথ ভুলে যাই দুজন। রাস্তাটা দীর্ঘ হয়ে যায়। ঠান্ডা বাতাসে হু হু করে মন। কবি হই, গান গাই একসঙ্গে। কার কথা যেন মনে পড়ে—

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার
তখন হঠাৎ যদি মেঠোপথে পাই আমি তোমারে আবার!

সোনাঝরা রোদ, পাতাঝরা বিকেল, রক্তিম সন্ধ্যা কল্পনায় মন ভালো হয়, খলখল করে হাসি। কল্পনা করি মরা জ্যোৎস্নায় প্রেম করছি দুজন। গাছের ডালে লক্ষ্মীপেঁচা ডাকে অদ্ভুত স্বরে। বুড়োটা হাসে, চোখ পিটপিট করে তাকায়, লজ্জা পাই। এই যাহ্, বুড়োটা কি ভাবছে সব সত্যি? মগাই আর আতিলু সব সময় বলত, আমার প্রেমে পড়ার রোগ আছে, যখন তখন প্রেমে পড়ি। তাই বলে এ বুড়োর সঙ্গে!

—মগাই আর আতিলুর খবর পেয়েছিলেন?

—হু।

—কোথায় আছে তারা, কেমন আছে?

—তারাও মৃত। কাটা পড়েছে ট্রেনে।

নাহ্, আমার আর প্রেম করা হলো না। হলুদ ট্রেনটার ওপর বিরক্ত হই। বিরক্ত হই এই অদ্ভুত বুড়োটার ওপর।

লোকটা আমাকে ডাকে, পেছন ফিরে বলে, এই বাঁশঝাড়টা দেখেছেন? একটু সাবধানে হাঁটবেন, এখানে শঙ্খচূড় থাকে, সুতানালিও থাকে মাঝে মাঝে।

আমি সরে আসি, মনের ভুলে খানিকটা ঝোপে চলে এসেছিলাম।

—ভয় পেয়েছেন?

—একটু।

—অনেকদিন কারাগারে ছিলেন তো, ভুলে গেছেন সব।

আমি চমকে যাই, রাগ হয়, ধমকে উঠি—

—ওটা কারাগার নয়, সংশোধনাগার।

—আপনি খুন করেছেন, জেলে গিয়েছেন, তো লজ্জার কী?


রাত হলে পশুরা মানুষ হয় আর মানুষেরা হয়ে যায় পশু।


বুড়োর চোখে কদর্য চাহনি। কী জঘন্য, অশ্লীল! অসহ্য লাগে, সংশোধনাগারের সেই প্রহরীর মতো কুৎসিত। হলুদ দাঁতের সেই বিশ্রী লোকটা। ঘেন্না! ঘেন্না!

সংশোধনাগার মানেই আমার কাছে একটা হলুদ দাঁতের লোক। তার কিলবিলে হাত। জিভ বের করা চুকচুক শব্দ। খাটাস রাতপ্রহরী।

আমার পা চলে না, বুড়ো আঁচ করে, সহজ হতে চায়।

—জানেন, নায়লার ছেলে এ বছর বৃত্তি পেয়েছে।

—কে নায়লা?

—মনে করুন।

মনে করার চেষ্টা করি, মাথায় যন্ত্রণা হয়। আয়নায় ভাসে একটা কাজল পরা মুখ। নায়লা আপা! কার সঙ্গে যেন তার খুব কলঙ্ক হয়েছিল, কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, নিশুরে, যার সঙ্গে কলঙ্ক হলো, তার সঙ্গে পালঙ্ক হলো না। এ জীবন রেখে কী লাভ!

আচ্ছা, নায়লা আপা কি বেঁচে আছেন এখনো? নাকি তিনিও সবার মতো ট্রেনে কাটা পড়েছেন?

একটা রাতজাগা পাখি থেকে থেকে কাঁদছে। পাখি না তক্ষক? তক্ষক হবে হয়তো, কাঁদতে কাঁদতে পাখি হয়ে গেছে। কারাগারের এক কোনায় ছিল তক্ষকটার বাস। মধ্যরাতে ডাকত। মানুষের মতো কারও শোকে কাঁদত। রাত হলে পশুরা মানুষ হয় আর মানুষেরা হয়ে যায় পশু। আমি দেখেছিলাম সেই মানুষমুখী পশুর দল। দিনের আলোয় যাদের গায়ে উর্দি থাকে, রাত হলেই উলঙ্গ! সেইসব লোকেরা আমার গায়ে হাত চালাত, ময়দা মাখার মতো ডলে দিত বুক, তাদের শরীরে জন্ডিস! চোখে-মুখে সবখানে হলুদ প্রস্রাব গন্ধ। আমি জানি আমার গায়ের নরম মাংসে এখনো সেইসব হলুদ দাঁতের কামড় লেগে আছে কোথাও।

সামনে এগোলেই ফজু মোল্লার মাঠ। অন্ধকার! এই মাঠে তো থকথকে আলো থাকার কথা ছিল! ছিল তো! পৃথিবী এখন ভেসে যাচ্ছে গাঢ় অন্ধকারে। অন্ধকার সবখানে সমান। কারাগারের ভেতরে, কারাগারের বাইরে। সমান সমান। ভেবে অবাক হই, কেন আমি মাঠের সঙ্গে কারাগারের তুলনা করছি? এ মাঠ তো আলোর মাঠ! কত আলো ছিল সেদিন, চলছিল সীতার বনবাস। মাঠের আকাশ ঢেকে রেখেছিল মস্ত শামিয়ানা। হ্যাজাক বাতির আলোর ফোয়ারায় রঙিন হয়েছিল রূপকথার সব মানুষ! রাম, লক্ষ্মণ, সীতা।

রাজা দশরথ কেঁদেছিল, রাম কেঁদেছিল, কেঁদেছিল লক্ষ্মণ। বলেছিল, আশীর্বাদ করো পিতা আমি স্বেচ্ছায় বনচারী হইব, সর্বসুখ ত্যাজি পিতৃতুল্য অগ্রজের সঙ্গে বনচারী হইবই আজ, আজ্ঞা করো পিতা, আজ্ঞা করো।

সীতার বনবাস পর্বে নিমগ্ন জনতার মাঝে এক বুক দুঃখ তখন। মুখ গড়িয়ে হাঁটুতে পড়ছে অশ্রু ফোঁটা ফোঁটা।

এরপর মঞ্চ কাঁপিয়ে হা হা হাসি! কে হাসছিল? কৈকেয়ী নাকি মন্থরা? ঠিক মনে করতে পারি নি। মনে করতে সচেষ্ট হই। মনে হয়, সেদিন হাসছিল নায়লা আপা।

ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। বাবা আমার জন্য একফাঁকে খাবার কিনতে গিয়েছিলেন। তার সেটুকু অনুপস্থিতিতে আমি হেলান দিয়ে পড়লাম কারও ওপর। কে ছিল? তারপর কী হলো? কী হলো তারপর! রাম-রাবণের বিশাল এক যুদ্ধ হলো। ঝন ঝন ঝনাৎ! সীতা হরণ করলো রাবণ। অসতী সীতা! কলঙ্ক কলঙ্ক! এই ভিড়ের মাঝে হঠাৎ করে আমি সীতা হয়ে গেলাম! নাকি দ্রৌপদী? যার বস্ত্রহরণ করল হলুদ দাঁতের বুড়ো। দুর্যোধন নাকি রাবণ কে আমায় টেনে নিয়ে গেল প্ল্যাটফর্মের কোনায়? বুড়ো স্টেশন মাস্টারের ঘর। ওইদিকে ফজু মোল্লার মাঠ জনারণ্য। এইদিকে অন্ধকার! জনমানবশূন্য! ট্রেন আসতে তখনো দেরি। মাঝরাতে কে নামবে আজ এ ভুতুড়ে স্টেশনে। গোঙাই, হলুদ দাঁতে আমার হাত কাটে, পা কাটে। তারপর কী যেন হয়! সীতা মহামায়া হয়ে যায়, রুদ্রচণ্ডী হয়ে যায় দ্রৌপদী। শক্তির মহাবলয়ে ঘটে যায় প্রলয়। তাণ্ডব শেষে দেখলাম বুড়োটার মাথা থেঁতলে আছে ট্রেনের চাকায়, মগজ ছিটকে গ’লে পড়ে আছে রাস্তায়। প্ল্যাটফর্মে হলুদ নেই। সব লাল হয়ে যায়, লাল আর লাল।

—আপনার ছবি পেপারে দেখেছি।

বুড়োর কথায় বিরক্ত হই। এসময় এসব প্রসঙ্গ তুলতে হবে কেন! হয়তো রোজই তোলে, আমার মনে থাকে না। আমি মনোযোগ দিয়ে ফজু মোল্লার মাঠ দেখি। চাঁদের আলো দেখি। এই সেই মাঠ! মগাই আর আতিলুর সঙ্গে আমি প্রতি সপ্তাহে আসতাম এ মাঠে। সংগঠনের সাপ্তাহিক মিটিং হতো। আমার কাজ ছিল না, তবু আসতাম। বুল্টিদার কথা শুনতাম। বুল্টিদা! মরে যাওয়ার পর বুল্টিদা কেমন আছে এখন? বুল্টিদার মুখের গাম্ভীর্য ছিল সরল সরল। বিপ্লবী কঠোর চোখ; তবু। কোনো এক আদিবাসীদের কেন্দ্রীয় সংগঠনের মাথা তিনি, লোকে বলত কমরেড! বেশ লাগত শুনতে। বুল্টিদার কাছে থেকে-থেকেই ইচ্ছে হতো, আমিও কমরেড হই। স্বাধীন মাটির জন্য লড়াই করি পাহাড়ে-পাহাড়ে। হলো না!

বুল্টিদার ছবি আসতো কাগজে। বুল্টিদা ফাইটার! ও হ্যাঁ, আমিও তো ফাইটার। আমারও তো ছবি এসেছিল কাগজে, বড় করে। সেখানে তারা লিখেছে আমি ফাইট করেছি জীবনের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে!

ঘটনাটা আবছা মনে পড়ে। কাগজওয়ালারা রোজ আসতো। কারাভ্যন্তরে যৌন নির্যাতন; দেশ তোলপাড়। আমার যেন কী হয়েছিল। মনে নেই। মানবাধিকার সংগঠনের সুন্দর সুন্দর মেয়েরা বলত কত কী! একদিন দেখি টিভিতেও কথা বলছি, আমার আশপাশে অনেক মানুষ!

ইদানীং কিছুই মনে রাখতে পারি না, সব ভুলে যাই। সেই যখন কারাগার থেকে সরিয়ে এনে একটা হোমে রাখা হলো, সে সময় থেকে শুরু। পেপারে ছবি ছাপানো বন্ধ হলো একসময়। টেলিভিশনও আর বলে না কিছু, বললেও কেউ আমাকে বসিয়ে দেয় না পর্দার সামনে। আমার হাত ফুটো করে শাদা পোশাকের মানুষেরা বড় বড় স্যালাইন লাগায়। মস্ত মস্ত ক্যাপসুল দেয়। টুপ করে গিলে ফেলি সেসব, খারাপ লাগে না। তারপর দীর্ঘ ঘুম, একসময় ঘুম ভাঙে; ঘুমের আগের পরের কিছুই আর আমার মনে থাকে না। ঘরের দেয়াল দেখি, কোনায় একটা মাকড়শা ঝুলছে সেটাও দেখি। পেটমোটা মাকড়শা! মাকড়শার পেটের ভেতরের শাদা ডিম আকৃষ্ট করে আমায়, খুলে আনতে ইচ্ছে হয়। কল্পনা করি হাজার হাজার মাকড়শা বীজে কিলবিল করছে পৃথিবী! ভাবতে ভাবতে আমি নিজেই একটা বিশাল মাকড়শা হয়ে যাই। থেঁতলানো মাথা নিয়ে মরে পড়ে থাকি জালে।


কিশোরকালে চে গুয়েভারার চোখ কার মতো ছিল? বুল্টিদার মতো? আমার জানালা শূন্য!


আমার আরও একটা বিষয় হয়। যখন তখন নায়লা আপা হয়ে যাই, তার সেই প্রেম প্রেম মুখটা আমার হয়ে যায়। বুক কাঁপে, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে কোনো এক স্বজন পুরুষের দিকে। এইতো নায়লা আপার জানালায় একটা আবছা মুখ। তার নিজের পুরুষের মুখ। আচ্ছা, কিশোরকালে চে গুয়েভারার চোখ কার মতো ছিল? বুল্টিদার মতো? আমার জানালা শূন্য!

না, এ জানালায় এমন কেউ নেই, ছিল না কখনো।

আঠারোর নিচে বয়স হওয়ায় আমার শাস্তির মেয়াদ কমেছিল কিছুটা। বাবা আমাকে নিয়ে আসেন এখানে। ঘরের ভেতর আটকে রাখেন। আটকে থাকি, ঘরের সঙ্গে লাগানো নষ্ট ট্যাপ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ে, শুনি আর ঘুমোই। একসময় ঘুম ভাঙে, চোখ কচলে স্মৃতি খুঁজি। পাই না। অপেক্ষা করি কিছু একটার, কিসের অপেক্ষা? ট্রেনের হুইসিল বাজে, মনে পড়ে হলুদ ট্রেনটার কথা। পা বাড়াই। এখন আর আমাকে কেউ জোর করে প্ল্যাটফর্মে নেয় না। ঘরের দরজাও খোলে না কেউ গোপনে। তবু আমি রোজ আসি। স্টেশন মাস্টারের ঘরটায় উঁকি দেই, কেউ নেই, শূন্য ঘর।

রাত বাড়ে। ঠিক মধ্যরাতে হারিকেন হাতে আসে এক বুড়ো। কখনো চেনা লাগে তাকে, কখনো অচেনা। আমরা দীর্ঘ রাস্তা হেঁটে হেঁটে পার হই। অনেক কিছু ভুল হয়ে যায়, দীর্ঘবিরতিতে পথ-ঘাট পাল্টে গেছে কত! ভাবি আর ভাবি। বুড়োকে প্রশ্ন করে যাই অন্তহীন। বুড়োর উত্তর মনে করিয়ে দেয় সব। কথার ফাঁকে একসময় তার হলুদ দাঁত বের হয়ে যায়, আঁতকে উঠি, কে এই বুড়ো?

কে সে?

ঝিকঝিক করে ট্রেন আসে, হলুদ ট্রেন। এরপর আর আমরা কেউ কাউকে খুঁজে পাই না।

নাহিদা নাহিদ

কবি ও কথাসাহিত্যিক।
জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৩; চাঁদপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে "কথাসাহিত্যে" পিএইচডি করছেন। পেশায় শিক্ষক। প্রভাষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
অলকার ফুল [গল্পগ্রন্থ, বাঙালি, ২০১৭]
যূথচারী অাঁধারের গল্প [গল্পগ্রন্থ, জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : nahid.oprotim13@gmail.com

Latest posts by নাহিদা নাহিদ (see all)