হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : হন্তারক

পাণ্ডুলিপির গল্প : হন্তারক

পাণ্ডুলিপির গল্প : হন্তারক
381
0

জীবনের প্রথম সাতাশ-আটাশ বছর পর্যন্ত সে ছিল আপাদমস্তক একজন কবি। সে, রাশিদুল আনোয়ার আমার বন্ধু ছিল। ই-মেইলের যুগে এখনো সে আমাকে মাঝে মাঝে ইনিয়ে-বিনিয়ে চিঠি লিখে থাকে; নিয়ম করে ছমাসে একটা, কুরিয়ার সার্ভিসে। তার চিঠিগুলো থেকে চুরি করেই আমি এই গল্পখানা দাঁড় করালাম কিনা, সেহেতু তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়তোবা দরকার; অবশ্য মাইন্ড করার ব্যাপারটা তার মধ্যে ছিল না। তার চিঠিতে লেখা/ না-লেখার বিষয়গুলো এতখানি জায়গা জুড়ে থাকে যে, তার জবাবে কবিতা লেখার জন্য নিয়মিত প্রেরণা দেওয়া ছাড়া আর বছরে একবার আমার লিটল ম্যাগের জন্য লেখা চেয়ে তাগাদা দেয়া ছাড়া আমিও আর কোনো ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকি। আমার চিঠি পেলে সে এখনো খুব অনুপ্রাণিত হয়, ক্যাম্পাস জীবনের মতো। সে যে আর লেখে না এই কথাটি সে গত দশ বছরে আমার কাছে একবারও কবুল করে নি। আমার কাছে হয়তোবা সে আজীবন কবি হয়েই থাকতে চায়।


আমার জীবনেও এমন কিছু কালো দিক আছে কিংবা এমন কিছু দিক গোপন রাখতে চাই যা আমার একান্ত নিজস্ব।


তো, সাতাশ-আটাশের পর তার অন্য জীবন শুরু হয়েছে, ‘আবার না ভোর হতে/ বাজারের থলি হাতে’। ধীরে ধীরে কিভাবে তার লেখালিখি কমে গেল, সে সম্পর্কে শুভাকাঙ্ক্ষী হিশেবে আমার কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে এখনও নানা রকম জবাব দিয়ে থাকে। সে সব চিঠিতে আবার নতুন ভাবে লেখা শুরু করার অস্পষ্ট একটা ইচ্ছে জানান দিয়ে, পুরনো দু’চার লাইন লেখাকে আট-দশ লাইনের একটা পদ্য বানিয়ে পাঠায়। আমার কাছে এক বছর আগে লেখা চিঠির অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি—

“কয়েক দিন আগে টাইফয়েড থেকে উঠলাম। রোগের কারণেই কিনা জানি না, বিষাদে ভুগছিলাম। পুরনো লেখার একটা লাইন খুঁজে পেলাম, ‘জ্বর খুলে দিল কবিতার চোখ’—লাইনটা কাফকার জামা নামের কাব্যগ্রন্থের ভিতরে শিল্পী খালিদ আহসানের একটা রঙিন ইলাস্ট্রেশনের ওপর লিখে রেখেছিলাম ’৯৪-’৯৫ তে হবে। এর সঙ্গে আরো দু’তিন লাইন লিখলাম :

“কতবার
জ্বর এসে দিয়ে যায় কবিতার চোখ
জ্বরের প্রেরণা নেমে যায়
হেলাফেলায়
এন্টিবায়োটিকে।
আমৃত্যু জ্বর চাই, স্থবিরতা চাই।
‘স্থবিরতা কবে তুমি আসিবে বলো তো’? ”

এই কবিতা লিখে উঠতে পারার পরেও রাশিদুল আনোয়ার স্বস্তি বা তৃপ্তি পায় না। সম্ভবত দশ বছর আগে লিখলে এই কবিতাটি আরো শিল্পমানসম্মত হতো এরকম ধারণা হয় তার। আমি আমার বন্ধুর মন বুঝতে পারি, ওর দুই লাইনের মাঝখানের অনুক্ত কথাও আমি পড়ে ফেলতে পারি। বর্ণাঢ্য ক্যাম্পাস জীবনে সে ছিল আমার প্রিয় কবি, আমি ছিলাম তার প্রিয় সম্পাদক, ডাকত ‘গুরু’! শুনুন, এর পরে কী ভীষণ কথাগুলো অবলীলায় লিখেছিল সে :

‘বিষণ্নতায় ঘুমুতে পারছিলাম না। ঘুরে ফিরে একটি কথাই মনে হচ্ছিল আমি একজন প্রতিবন্ধী …আমি প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছি। মেটামরফোসিসের গ্রেগর সমস্যার কথা মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম, আমি জগতের সবচেয়ে সুখী লোক—এই কথাটি উপজীব্য করে অনেক বড় একটা লেখা লিখে ফেলা যায়; কোনো মিথ্যাচার হবে না। তারপরেই ভাবছিলাম—আমি জগতের সবচেয়ে দুঃখী মানুষ—এই কথাটিকে স্ফটিক করে অনেক বড় একটা হীরে-মানিকের খনি পাওয়া সম্ভব—এই লেখাতেও কোনো মিথ্যা কথা লিখতে হবে না। …কিন্তু তা কী করে যুক্তিপূর্ণ হয়! দুটো কথাই তো আর একসঙ্গে সত্যি হতে পারে না। একটাকে সত্যি হতে হবে। এ যে ভীষণ সঙ্কট! আমার কাছে দুটো চিন্তাই সঠিক মনে হচ্ছে। এ কী তবে মনোবিকলন? মনের কোনো জটিল অসুখের সূত্রপাত হচ্ছে আমার? তখন আবারও চিন্তার শুরুটা মাথায় এল, আমি প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছি। এ যে বিরাট সঙ্কট! মাথায় হঠাৎ আলোর ঝলকানি খেলে গেল। লিখতে হবে। অন্তত লিখতে শুরু করার চেষ্টা করতে হবে। লেখালেখি করাটা ছিল আমার জীবনযাপনের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে সে অঙ্গের হানি হয়েছে। তাই সম্ভবত অবচেতন মন জ্বরের সুযোগে আমার সচেতন মনে বার্তাটুকু পৌঁছে দিচ্ছে যে, তুমি প্রতিবন্ধী ছাড়া আর কী! আমার বিশ্বাস জন্মাল, লিখতে শুরু করলেই এইসব ভাবনা থেকে মুক্ত থাকতে পারব। এই সিদ্ধান্তে আসার পরই আমি বিপদমুক্ত হলাম এবং পরের রাতটুকু ঘুমাতে পারলাম।’

রাশিদুল আনোয়ারের চিঠিগুলো এ রকমেরই হয়ে থাকে। তার সঙ্গিনী বা সন্তানের কথা অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী কুশল সংবাদ থাকে না। ‘কুশল সংবাদ’ জানার ব্যাপারেও তার বিশেষ আগ্রহ দেখি না, কেবল পত্রের শেষ লাইনে ‘আমরা সবাই ভালো আছি, তোমরা সবাই কেমন আছো’ জাতীয় একটা স্লোগানের মতো উঠে চিঠি শেষ হয়ে যায়। নিচে তার যত্নচর্চিত, এখনও সুরক্ষিত, চমৎকার মেধাবী একটা সাক্ষর ও তারিখ, কখনো-বা সময় উল্লেখ থাকে—দুপুর ৩ টা বা রাত ২ টা। এই চিঠি হাতে পাওয়ার পর ভাবলাম, আমি যেহেতু সামনের মাসে বাসা বদলাচ্ছি, রাশিদুলকে নতুন ঠিকানাটা জানিয়ে সংক্ষেপে একটা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র গোছের চিঠি লেখা যাক। চিঠি পাওয়ার পাঁচদিনের মাথায় অফিস থেকে ফিরে বিস্মিত হয়ে দেখি ওর আরেকটি চিঠি আমার জন্য অপেক্ষমাণ! এ রকম ফ্রিকোয়েন্সিতে কোনোদিনই তার চিঠি পাওয়ার ইতিহাস নেই। জরুরি ও জটিল কিছু সমস্যার কথাই জানতে পারলাম চিঠিতে। আপনারাও শুনুন, তাকে যখন অনাবৃতই করে দিয়েছি।

‘কিন্তু কী লিখব? কবিতা? সম্ভবত না। কারণ আমার বিচারে আমার প্রতিভা তুঙ্গ-স্পর্শ করার পর থেকেই লেখাও কমে গেছে, মানও গেছে নেমে। আগের মান রক্ষা করতে পারি নি এমন কোনো লেখা আমি আর ছাপি নি, রাখতেও উৎসাহ পাই না। লেখার পুনরাবৃত্তি আমার না-পছন্দ। বর্তমানেও পঠন-পাঠন কম, কবি-লেখক-সম্পাদকদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন আমি। এতসব নেগেটিভ ফ্যাক্টর থাকলে এবং সর্বোপরি কবিতা লেখার ইচ্ছে না থাকলে আর কবিতা হয় না। তাহলে কী লিখব? ‘যখন আমি কবি ছিলাম’ অর্থাৎ আত্মজীবনী? না। আত্মজীবনী লেখার মতো যোগ্যতা অর্জন করি নি। তাছাড়া সাহসও নেই। আমি মোটামুটি সৎ জীবনযাপন করলেও আমার জীবনেও এমন কিছু কালো দিক আছে কিংবা এমন কিছু দিক গোপন রাখতে চাই যা আমার একান্ত নিজস্ব। অর্ধসত্য অর্ধগোপন কাহিনি তো আর আত্মজীবনী হয় না। সেটা যা হয় তা আমি নিজের সঙ্গে করতে চাই না।’


মাঝে-মধ্যে অপরাধবোধে ভুগব, সেই সময়টাও তো আমার এই ব্যস্ত নাগরিক জীবনে নেই।


চিঠি পড়তে পড়তে দেখতে পাচ্ছিলাম অপ্রকাশের ভার নিয়ে কেমন ছটফট করছে রাশিদুল আনোয়ার। পরের অংশটুকু পড়ে করুণা নয়, বড় মায়া হলো একসময়ের উজ্জ্বল তরুণ কবির জন্য। আকস্মিকভাবে লিখেছে—‘জার্নাল’ লেখা যায়। দু বছর আগে একবার শুরু করেছিলাম। একাধিকবার ডায়েরি রাখতে আরম্ভ করে ব্যর্থ, জার্নাল লেখার চেষ্টাও ব্যর্থতার মুখ দেখেছিল। তখন জার্নাল লেখার খাতাটিতে বরং বেশি তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি গত পাঁচ বছরে টুকটাক কোথায় কী লিখেছি, সেগুলোকে সুন্দর করে জড়ো করায়। যেন-বা ‘ছিন্নপত্রের’ পাণ্ডুলিপি হচ্ছে কিংবা যেন-বা ওই কাজটি করতে পারলেই আবার কবিজীবন শুরু করা যাবে। কতটা সার্বক্ষণিকতা দাবি করে কবিতা সেটা তো আমার জীবনের মূল্যবান বছরগুলোর বিনিময়ে বুঝতে পেরেছি।’

পাঠক, তাহলে কী লিখবে আমার বন্ধু রাশিদুল? না লিখলে তো সে অসুস্থ হয়ে পড়বে; আমার সন্দেহ এতে সে মারাও যেতে পারে। নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য তাকে লিখতে হবে—এ কথা আমিই তাকে বারবার মনে করিয়ে দিই। নাকি আমার তাগাদাগুলো বিশাল এক প্রত্যাশার চাপ হয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের মতো ভেঙে যাচ্ছে রা-শি-দু-ল-আ-নো-য়া-র! আমি কোনো দিক নির্দেশনা দিতে পারলাম না। তাকে চিঠি লেখা বন্ধ করে এক রকম পালিয়েই গেলাম তার জীবন থেকে। আমার নতুন ঠিকানাটা তাকে আর দেওয়া হয় নি। বন্ধু-পরম্পরা খুঁজে সে আমার ঠিকানা বের করে ফেলবে অতটা উদ্যমী হতে পারবে না ছা-পোষা বন্ধুটা। মাঝে-মধ্যে অপরাধবোধে ভুগব, সেই সময়টাও তো আমার এই ব্যস্ত নাগরিক জীবনে নেই।

বছর ঘুরতে খবর পাওয়া গেল, রাশিদুল আর নেই। ‘মরিবার হলো তার সাধ!’ হ্যাঁ, অস্বাভাবিক মৃত্যু। বন্ধুর অস্বাভাবিক মৃত্যু বিষয়ে আপনাদেরকে বেশি তথ্য জানাতে চাচ্ছি না; এ জন্যে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আপনাদের জানবার প্রয়োজনটাই বা কী?

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

গল্প—
স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প [চৈতন্য, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com