হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : সমাজ বিবর্তনবাদের প্রবক্তাদের

পাণ্ডুলিপির গল্প : সমাজ বিবর্তনবাদের প্রবক্তাদের

পাণ্ডুলিপির গল্প : সমাজ বিবর্তনবাদের প্রবক্তাদের
289
0

‘ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গম বোনা শুরু করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে
আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক, কে শ্রমিক নয়
নতুন যন্ত্রের যারা মাসমাইনের কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিক গৃহিণী
প্রতিদিন জল তুলে ঘর মোছে খাবার বানায়
হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয়?”

[মল্লিকা সেনগুপ্ত]

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি আক্তার হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা তার বাবা সায়েদ আলী নিজেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে ধর্ষক বাবুল মিয়াকে ফাঁসাতে নিজেই মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। আর এ কাজে তাকে সহযোগিতা করে প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা ময়না মিয়া। ঘটনার সঙ্গে আরো একজন পেশাদার ভাড়াটে খুনি জড়িত। শনিবার বিকালে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার।


হারামজাদার গোষ্ঠী, হাভাইত্যার গোষ্ঠী, শয়তানের গোষ্ঠী খালি টাইলের টাইল খাওন গিলন ছাড়া বাদাইম্যার গোষ্ঠীর আরাদিন আর কোনো কাম নাই।


এই সংবাদে যখন আপনারা নড়েচড়ে বসছেন আমূল বিশ্বাস আর মূল্যবোধের বুকে কুঠারাঘাতের আঘাত সইতে না পেরে, তখন কাঞ্চন বিবি ঘরে ফিরে মাত্র ভাতের হাড়ি চাপিয়েছে চুলায়। ঘর বলতে যেমন বুঝায়, নিত্যপ্রয়োজনের দু-চারটি আসবাব, একটু নিকানো মেঝে, বিনোদনের আবশ্যিক অনুষঙ্গ টিভি আর একই মায়ার চাদরে মুড়ানো কয়েকজন মানুষ। এর সবই আছে এখানে। আর যেটুকু থাকলে পরিপূর্ণ আনন্দে ঝলমল করত সংসার, নেই শুধু সেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। মেসে মেসে রান্না করে কাঞ্চন বিবি যা পায়, তাতেই টিকে আছে ঘরখানা কিংবা সংসারখানা। আপনারা যে নামেই বাইরে থেকে ডাকুন এই প্রক্রিয়াকে, অন্দরে সেই একই প্রয়োজন, টিকে থাকার প্রয়োজন, নিরাপদে বেঁচে থাকার আয়োজন। আদিম প্রবৃত্তি সামাজিক রূপ নিয়ে যা মহিমান্বিত হয়ে আছে আমাদের কাছে।

ঘর লাগোয়া আধখ্যাঁচড়া বেড়ায় ঢাকা রান্নাঘর। এই বৈশাখে এবার প্রতিদিন ঝড়-তুফান। জান-প্রাণ উজাড় করে জ্বালানো আগুন টিমটিম করে তেলহীন কুপির মতো, না জ্বলা কাঠের টুকরোগুলো অবিরাম কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়ে আচ্ছন্ন করে তোলে ঘরসহ চারপাশ। ঘরের ভেতর বসে টিভিতে শাকিব অপুর নাচ দেখতে দেখতে সেই গ্যাসের আক্রমণে খুক খুক কাশে বাচ্চাগুলো।

বাচ্চা, বাচ্চাই তো। জননীর কাছে বুড়ো ধ্যাংড়াও বাচ্চা, কিন্তু এরা সেই আহ্লাদের বাচ্চা নয়। আহ্লাদ বড়লোকের ব্যাপার। ওই যাদের জীবনে ক্ষুৎপিপাসার প্রয়োজন বড়োই তুচ্ছ, বরং নিত্য-নতুন মডেলের গাড়ি কিংবা নিত্য-নতুন দেশ ভ্রমণ যাদের জীবনের প্রয়োজন প্রতিদিন বিলাস-ব্যসনে বদলায় তাদের জন্য। কাঞ্চন বিবির মতো দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের নয়। একটুখানি আর্থিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই বয়সের হিসাবের কত হিসাব-নিকাশ! একটারও বয়স আঠারো পার হয় নি। অথচ এখন মাথার উপর যে সবচে বড়টার দ্রুত আঠারো না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই। কেন? সে উত্তরে পরে আসি।

কাঞ্চন বিবি নানা কসরত করেও ভেজা কাঠের সাথে পেরে ওঠে না। ওদিকে বাজার থেকে কিনে আনা ট্যাংরা মাছগুলো পলিথিনের ভেতর ফুলে উঠছে। বাকি তিনটার সাথে ধিঙ্গি আছমাকেও হা করে শাকিব অপুর নাচ গিলতে দেখে মাথা চড়ে যায় কাঞ্চন বিবির, ওই জমিদারের বেডি, বইয়া একটুত্তা মাছলাইনও কাটতে পারছ নানি? আমি একলা বেডি কতখানদি দৌড়াইতাম? তরারে কিতা আল্লায় একটুত্তাও আকল-পছন্দ দিছে নানি বে! কথা থামার আগেই পড়িমরি আছমা বটি নিয়ে মাছ কাটতে বসে যায় সুবিধাজনক জায়গায়। যেন সিনেমা দেখায় বিঘ্ন না ঘটে। মায়ের মারকে বড় ভয় তার। রাগ চড়লে হাতের কাছে যা পায় তাই পিঠে ভাঙে। ভাঙে আর বলে, এই হাতের জোরেই ধইরা রাখছি হাইব্বা গোষ্ঠীরে। কাঞ্চন বিবি রেগে গেলে বাকি ঘর ঠান্ডা। কারো আর কিচ্ছু বলার সাহস জোগায় না। হাতের উল্টো পিঠে চোখ ডলতে ডলতে মাছ কুটে আর সিনেমা দেখে আছমা।

চুলায় চুঙ্গা দিয়ে ফুঁ দিতে দিতে, আগুনটাকে জিইয়ে রাখে কাঞ্চন বিবি, এই অল্প আঁচেই যতক্ষণে ভাত নামে। রশিদ মিয়া চিৎকার করে, ওই হারামজাদার গোষ্ঠী একটুত্তা কাইত কইরা দেসনে! পোকপোলাপানগুলা যেন বধির, নির্বিকার নয় ঠিক। সিনেমার আবেগের সাথে একাত্ম দৃষ্টি ফেরায় না। রশিদ মিয়া পুনঃ হাঁকে ওই হারাম জাদার গোষ্ঠী! হাটকাল হইছস নি? এই ডাকেও বিন্দুমাত্র কাঁপন জাগে না বাচ্চাদের মগ্নতার পানা ডোবায়। কাঞ্চন বিবি চুলার পাশ থেকে নিজেই ওঠে এসে রশিদ মিয়াকে কাত করে শুইয়ে দেয়। পিঠের ঘা থেকে চাটাইয়ে লেগে থাকা কয়েকটা পোকা কিলবিল করে হেঁটে চলে যেতে থাকে দিগ্বিদিক। কাঞ্চন বিবি, হুস হুস করে ভাগায় পোকাগুলা। রশিদ মিয়ার যন্ত্রণার গোঙানি অপু-শাকিবের কান্নার প্যানপ্যানানি অতিক্রম করে এক প্রাগৈতিহাসিক মাতম তুলে ঘরময়। ঘায়ের পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে ঘরময়, কাঁচা মাছের গন্ধের সাথে সে গন্ধ মিশে এক বিবমিষাময় অস্বস্তি চেপে ধরে পুরো পরিবেশকে। কিন্তু এদের কাছে এই নরক যন্ত্রণা প্রাত্যহিক। কারো নৈমিত্তিক কোনো কাজে বিঘ্ন ঘটে না।

কাঞ্চন বিবি আচ্ছন্ন ধোঁয়া ঠেলে চুলার কাছে গিয়ে একটা চ্যালাকাঠ হাতে নেয়, আর এবার প্রবল জোয়ার জাগে স্থির মগ্নতায়। টিভির সুইচ বন্ধ করে তিনটা দৌঁড়ায় তিনদিকে যে দিকে খালি রাস্তা দেখা যায়, দৌড়ে অনেক দূর যাবার বিঘ্নহীন। চ্যালাকাঠ নিয়ে দরজার সামনে গালির বন্যা ছুটায় কাঞ্চন বিবি, হারামজাদার গোষ্ঠী, হাভাইত্যার গোষ্ঠী, শয়তানের গোষ্ঠী খালি টাইলের টাইল খাওন গিলন ছাড়া বাদাইম্যার গোষ্ঠীর আরাদিন আর কোনো কাম নাই। এ গালি তো কেবল গালি নয়, জীবন যাপনের যাবতীয় আক্ষেপ, সংগ্রাম আর ক্লান্তির অনিবার্য অবিশ্রান্ত বর্ষণ। কত আর লড়াই শেষে কেবল পরাজয় নিয়ে নিয়ে ক্লান্ত সৈনিক হয়ে ফিরে ফিরে আসা। একটিবারও যদি জেতা যেত জীবনের যুদ্ধে। ভেতরের তীব্র উত্তাপ তবু একটু শীতল হবার ফাঁকফোকর খুঁজে নিত।

এবার জুয়া খেলতে নেমেছে কাঞ্চন বিবি। ঘরে ফিরে মাছ কাটারত আছমার দিকে তাকায় কাঞ্চন বিবি। গায়ে গতরে আঠারো কেনো বিশ বাইশ বললেও কেউ অবিশ্বাস করবে না মাশাল্লা। ওকে নিয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনা মতো জুয়ার গুটির চাল আগাচ্ছে কাঞ্চন বিবি, সফল হতে হবে। এটাও বড়টার মতো বিগড়ে না গেলে হয়। কী নিপুণ হিসাবের যোগফল মিলে গিয়েছিল বড়টার বেলায়। ভাত চাইবার আগেই পোলাও হাজির! নিজের কপালরে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন।

বাইরে বাহারউদ্দিনের গলা শোনা যায়, আম্মা ঘরে আছুইন? মাথার ঘোমটা টেনে দৌড়ে বাইরে আসে কাঞ্চন বিবি, আও বাজান আও, ঘরের ভিত্রে আও। বাহারউদ্দিন কখনো খালি হাতে আসে না। পোলাপানের পছন্দ মতো চিপ্স, চকলেট, নিমকি, চানাচুর, বিস্কুট হরেকরকম বাজার-সওদা নিয়ে আসে। বাহারউদ্দিন ঘরে ঢুকলে, চেয়ার ঝেড়েমুছে বসতে দিয়ে ঘরের গুমোট গন্ধ দূর করার জন্য আগরবাতি জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু বাহারউদ্দিনের গন্ধ যেন আগরবাতির চেয়ে আরো দ্রুত বাতাসে ছড়ায়, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া পোলাপানগুলা নিমিষে ঘরে জুটে যায় বাহারউদ্দিনের আশেপাশে। কাঞ্চনবিবি যতই চোখ রাঙায়, কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। চিপ্স আর চানাচুরের প্যাকেট নিয়ে কাড়াকাড়ি করে তারা সকল নির্লজ্জতা অস্বীকার করে।


একটা নিশ্চিন্তের শ্বাস দীর্ঘ অথচ শব্দহীন বেরিয়ে এসে মিশে যায় গুমোট ঘরের অস্থির ভবিষ্যৎ আর ক্লান্ত অতীতে।


কাঞ্চন বিবি অনুসরণ করে বাহারউদ্দিনের দৃষ্টি। ঠিকই আছমার দিকে ফিরে ফিরে উস্টা খায়। যতই লুকাবার চেষ্টা করুক সে কাঞ্চন বিবির পাক্কা নজর, বুঝতে কষ্ট হয় না। আছমাকে দ্রুত মাছ রেখে ওঠার তাড়া দেয় সে। উঁচু তাক থেকে নামিয়ে সাবান হাতে দেয়, জলদি কইরা ধুইয়া আয়। আছমার দৃষ্টিতে চলনে কোনো বাড়তি তাড়া না দেখে ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হয় কাঞ্চন বিবি। ইচ্ছে করে মেয়ের ঘাড়ে ধরে পিঠে কয়েক ঘা বসায়, কিন্তু না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাহারউদ্দিনের সামনে তো আর নিজের চাল মেজাজ দেখানো যাবে না। মেয়ে হাত ধুয়ে ফিরে এলে তারে দিয়ে চা আর বাহারউদ্দিনের আনা বিস্কুট সাজিয়ে পাঠায় কাঞ্চন বিবি। চায়ের কাপ নিতে নিতে বাহারউদ্দিন যে আছমার হাতটায় একটু চেপে ধরে তাও দৃষ্টি এড়ায় না তার। এই দৃশ্যটি দেখারই আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল ভেতরে। একটা নিশ্চিন্তের শ্বাস দীর্ঘ অথচ শব্দহীন বেরিয়ে এসে মিশে যায় গুমোট ঘরের অস্থির ভবিষ্যৎ আর ক্লান্ত অতীতে। কাঞ্চনবিবি ভাবে কোনো ভুলে না আবার জুয়ার গুটিচালে ভুল হয়ে যায়।

প্রসঙ্গটা নিজেই উঠায় বাহারউদ্দিন। আম্মা, উকিল কইছে কোনো ফ্যাক্টর না। চরিত্রহীন কইয়া একখান নালিশ সাজাইলে ওই মামলা খালাস। কী কন আপনে? কাঞ্চন বিবি আর কী বলে! এই বাহারউদ্দিনের কী তার মেয়েরে বিয়ে করার কথা। শহরে যার বাপের তো বটেই, বাপের একমাত্র পোলা হিসাবে নিজেরও নাম ডাক আছে। নিজের বাড়ি ঘর, ব্যবসা সবই আছে। যে কোনো কন্যাপক্ষ যেচে কন্যা দিয়ে কৃতার্থ হবে এর কাছে। আর সেই বাহারউদ্দিনের কিনা চোখে লাগল তার বড় মেয়ে সালমারে! মেসে মেসে ভাত রাঁধা পেশা তার, বিনিময়ে ছয় ছয়টা পেট আর ঘরভাড়া চলে। পোলাপানগুলোর বাপ অ্যাক্সিডেন্টে লুলা হয়ে আজ বছর কয় ধরে উপার্জনহীন বিছানায়। ওষুধহীন, পথ্যহীন, যত্নহীন আদিম বেঁচে থাকা শুধু। শুয়ে থাকতে থাকতে সারা পিঠে ঘা, সেখানে কিলবিল কিলবিল পোকা। উটকো গন্ধে কাছে ভিড়া যায় না। উপার্জন যখন করত, নিজের মদগাঞ্জা মাইয়া মানুষ নিয়ে ফুর্তির পেছনেই ওড়াত সিংহভাগ। সংসারের দায় সবসময় ষোল আনাই কাঞ্চনবিবির ঘাড়ে।

কাঞ্চনবিবির দিন তাই দয়ামায়াহীন যুদ্ধক্লান্ত। সে মনে মনে চায় ব্যাটা এইবার মরে মুক্তি দিক। সেও মুক্তি পাক, কাঞ্চনবিবিও মুক্তি পাক, পরিবারটাও মুক্তি পাক। কিন্তু তার মুক্তির হিসাবে তো আর আল্লার দুনিয়ার হিসাব মিলে না। ঠিক তিনবেলা পেট ঠেসে ভাত খায়। কোত্থেকে জোগান হয় সে ভাবনা নাই, দুমুঠো কম হলে কাঞ্চনবিবির বাপদাদা চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে গালাগাল করে। তারপর পায়খানা করে চাটাই কাঁথা সব চটচট! ব্যাটার খাবারের জোগান দিতে গিয়ে কত যে না খেয়ে থাকতে হয় কাঞ্চনবিবির নিজের। তার উপর নিত্য এসব পরিষ্কার করার ঝক্কি!

সেই পরিবারে ফেরেশতার মতো আবির্ভাব ঘটেছিল বাহারউদ্দিনের। স্কুলে যাওয়া আসার পথে সালমাকে নজরে লাগলে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল সে। না চাইতে আসমানের চাঁদ হাতে পেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে নি সে। ঘটনা ঘটিয়ে দিতেও সময় নেয় নি। নিজের পেটের মেয়ে হলে হবে কী, এর মতিগতির উপর বিন্দুমাত্র ভরসা ছিল না কাঞ্চনবিবির। তাই সপ্তাহ সময়ও নেয় নি কবুল পড়িয়ে দিতে। বাহারউদ্দিনের ইচ্ছে ছিল সোনাদানা দিয়ে, ময়মুরুব্বি পাড়া পড়শি দাওয়াত দিয়ে বউ ঘরে নেবে সে। কিন্তু কাঞ্চনবিবিই ঝুঁকি নিল না, আগে কবুল পইড়া কাবিন কইরা লও। বউ ঘরে তুইল্লনে ফুসরত কইরা। বাহারউদ্দিন আপত্তি করে নি।

তারপর মাস ছয়েক, আহা যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কয়টা দিন। চাল-ডাল-মাছ-মাংস-ঘরভাড়া কিছুর জন্যই ভাবতে হয় নি কাঞ্চনবিবির। চাইবার আগেই নিয়ে হাজির হতো বাহারউদ্দিন। ঘরের ভেতর বেড়া দিয়ে আরেকটা আলগা কোঠাঘর তৈরি করিয়ে নিয়েছিল কাঞ্চনবিবি সালমা আর বাহারউদ্দিনের জন্য। বাহারউদ্দিন যেদিন রাতে থাকত, মায়ের খোলস ছিঁড়ে খানিক নির্লজ্জের মতো রং ঢং শিখিয়ে দিত মেয়েরে, দ্যাহস না সিনেমায়। মেয়ে মাথা নিচু করে সব মেনে নিলেও আশঙ্কা ঘুচত না কাঞ্চনবিবির। মেয়েটা যেন কেমন কাঠখোট্টা তার। রং ঢং কম জানে। আরে বাবা বয়সের ওতো একটা জোয়ার থাকে গতরে, সেইটাই কামে লাগা!

মেয়ে কামে লাগাত কী লাগাত না বেড়ার পাশে কান খাড়া করে রেখেও ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারে নি কাঞ্চনবিবি। তবে বাহারউদ্দিনের আসার ক্লান্তি ছিল না। দুদিন একদিন পরপরই আসত।আর আহারে! এই ছয়মাসে নিজের জীবনের যুদ্ধ ঘুচাতে কত নীল নকশাই না সে এঁকেছে মনে মনে। মেয়ের প্রতি জামাইয়ের এই অপ্রতিরোধ্য টান কাজে লাগিয়ে গুছিয়ে ফেলতে হবে আখের। বাকি চারটার গতি করে ফেলতে হবে। ধীরে ধীরে সে প্রক্রিয়ার কথাবার্তাও শুরু করেছিল কাঞ্চনবিবি। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে বড় ছেলেটারে নিজের দোকানে কর্মচারী হিসাবেও নিয়ে গিয়েছিল বাহারউদ্দিন।

আর এইসময়ে সালমা কিনা সব পরিকল্পনার কাঁচামাটির দেয়াল ধাক্কা দিয়ে ভেঙে পালিয়ে গেল স্কুলের সামনে বসা চানাচুরওয়ালার সাথে! খালি আকাশ না পুরো সৌরজগৎ-টাই চোখের সামনে আছড়ে পড়ে তৎক্ষণাৎ অন্ধ করে দিয়েছিল কাঞ্চনবিবিকে। সামনে পিছনে ডাইনে বায়ে কোনোদিকেই আর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না সে। পরামর্শ করবে এমন সুহৃদ ও কেউ নেই তার। নিজের বুদ্ধিতে ভরসা করেই খুঁজে পেতে ঠিকানা বের করে গিয়েছিল মেয়েরে ফিরিয়ে আনতে। বাহারউদ্দিন বলেছিল লোক জানাজানির আগে ফিরে এলে সে ঠিক ঘরে তুলবে। কিন্তু মেয়ে ফিরবে কী উলটা প্রথম মায়ের চোখের উপর চোখ রাঙিয়ে জবাব দিয়েছিল, বেটি আমার সুখের লাইগ্যা বিয়া দিছস? দিছস ত নিজের হিসাবে। আমার হাউশ আহ্লাদ নাই?

কাঞ্চনবিবি চুপসে যায়, নিজের পেটের মেয়েরে অচেনা লাগে তার, যার লাগি করি চুরি হে কয় চোর! পেটের মেয়েটা চোখের সামনে বড় হতে হতে কবে এভাবে ভাবতে শিখল! বিষণ্ন, নিরানন্দ হতাশ ভবিষ্যৎহীন জীবনে ফিরতে ফিরতে কাঞ্চনবিবির সেদিন সাধ হয়েছিল রেলগাড়ির নিচে ঝাঁপ দেয়!

সেদিনই আবার এসেছিল বাহারউদ্দিন। খবর জানতে। কিছুই আশার খবর জানাতে না পেরে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল সে। নিত্য যার বেদনার সাথে বসবাস, তার চোখে অভিমানী অশ্রুরা বেশিদিন বাস করে না। কিন্তু সেদিন কোথা থেকে এত কান্না এসেছিল তার বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো। সেই কান্নায় আর্দ্র হয়ে হোক কিংবা অজানা কোনো অন্তর্নিহিত কারণে বাহারউদ্দিন সেদিন কাঞ্চনবিবির মাথায় হাত রেখে আশ্বাস দিয়েছিল, কাইন্দেন না আম্মা, একবার আম্মা কইয়া ডাকছি, জী আপনেরে ছাড়তে পারে, পুত আপনেরে ছাইড়া যাইতাম না। কী কয় পোলায়? কাঞ্চনবিবির স্বপ্ন আর আশা যতদূর পাখা মেলতে পারে, এ যে তারচেয়েও বেশি! বাহারউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে যায় সে।

তাইলে আম্মা কথা ইডাওঈ থাকল। সামনের হপ্তার মইধ্যে তালাকের কাগজপত্র ক্লিয়ার কইরা, পরের হপ্তায় কাজিরে খবর করি। কথা পরিষ্কার করে বাহারউদ্দিন। কাঞ্চনবিবির আপত্তির কোনোই কারণ নেই। যত তাড়াতাড়ি কাজটা সম্পন্ন হয় ততোই তার দুশ্চিন্তার ভার হালকা হয়।


ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা মেয়েটাকে তিনি চুল ধরে টানতে টানতে বাড়ির সীমানা ডিঙিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসেন। শেয়াল, কুত্তায় ছিঁড়ে খাক তোরে।


বাহারউদ্দিন বেরিয়ে গেলে, নরম মাতৃমূর্তি ঝেড়ে ফেলে স্বমূর্তিতে ফেরে কাঞ্চনবিবি। ভেতরে স্বস্তির সমাহিত আনন্দ। মানে মানে কাজটুকু হয়ে গেলেই বুঝি জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় প্রাণ পাবে সেই আপাত স্বস্তি। এবার আর ভুল করবে না কাঞ্চনবিবি। একবারে ঘরে তুলে দেবে মেয়েকে। নিজের ঘাড়ে রেখে আর মাশুল—গোনার বোকামি নয়। পোলাপানরে ডাকেন, আইন ইবলিশের গোষ্ঠী। খাইয়া ক্ষেমা দেন একবার। কিন্তু কারো খাওয়ার তেমন তাড়া নেই। বাহারউদ্দিনের আনা চিপ্স চানাচুর খেয়ে সবার ভাতের ক্ষুধা মরে গেছে। তারা উঠানে ডাংগুলি খেলে। কেবল রশিদ মিয়া হাবলে তাবলে বারবার বলতে থাকে—আমারে খাওন দে… আমারে খাওন দে…। কাঞ্চনবিবি বিড়বিড় করে, আল্লারে আল্লাহ, কত্ত ভালা বান্দারে যহন তহন উডাইয়া নেয়, এই পাপীরে চোক্ষে দেহে না! রশিদ মিয়া কিছু শুনে কী শুনে না, জানতে চায়—আমারে কিছু কছ? কাঞ্চনবিবি ঝাঁঝে উত্তর দেয়, না আফনেরে কী কমু, কই আমার কপাল রে। ফাডা কপাল আমার।

ঠিক তখন বাইরে থেকে হঠাৎ চিৎকার করে মাইজ্যা পোলা—আম্মাগো দেইখ্যা যান। তার গলার স্বরে এমন এক ভয়াবহ আর্তনাদ ছিল, কাঞ্চনবিবির অন্তরাত্মা অবধি কেঁপে ওঠে। না দেখেই সে বুঝতে পারে এমন কিছু ঘটেছে যা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, তার জন্য ভয়াবহ। দৌড়ে বাইরে আসে সে। যা দেখে তার জন্য মোটেই প্রস্তুতি ছিল না কাঞ্চনবিবি। মাইজ্যা পোলার ডাক আর ঘর থেকে দৌড়ে বের হওয়া এই সেকেন্ড কয়ের মধ্যে কত অমঙ্গল আশঙ্কা করেছে সে, হাত পা ভাঙা, পালা মোরগ-মুরগির মৃত্যু, এমনকি সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা দ্বিতীয় কইন্যা আছমার কারো সাথে ভেগে যাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু চোখের সামনে যা সে দেখছে এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। মোটেও না।

বড় কইন্যা সালমা ফিরে এসেছে। কোঁচড়ে একটা পুটুলি, চোখ দুটি গর্তের ভেতরে, উশকোখুশকো চুল, ভালো করে লক্ষ করলে বাহু কিংবা গালে কালাশিটে দাগও দেখা যায়। কাঞ্চনবিবিকে দেখেই আহাজারিতে ফেটে পড়ে সালমা, আম্মাগো বড় ভুল করছি গ আম্মা। আমারে মাফ কইরা দেইন গ আম্মা। অপত্য ছাপিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার আদিম প্রবৃত্তি তীব্র হয়ে ওঠে তখন কাঞ্চনবিবির। ধীরে ধীরে হঠাৎ ছুটে যাওয়া বিছানো জালের রশি গুটিয়ে এনেছেন তিনি। এখন এই মানবিক অপত্য প্রশ্রয় দিলে উলটেপালটে যাবে সব হিসাব-নিকাশ। ভূত-ভবিষ্যৎ। না এ হতে দেয়া যায় না। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা মেয়েটাকে তিনি চুল ধরে টানতে টানতে বাড়ির সীমানা ডিঙিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসেন। শেয়াল, কুত্তায় ছিঁড়ে খাক তোরে। আমার হিসাবে আর গণ্ডগোল লাগাইতে দিমু না কাউরে। আর পারি না। আর পারি না। সেই পনেরো বছর বয়স থিক্কা ঘানি টানতে টানতে সংসারে এককুড়ি বছর পার করছি। আর পারি না…। নিজেও আহাজারি করতে করতে বাকি পোলাপান নিয়ে ঘরে ঢুকে খিল লাগিয়ে দেয় কাঞ্চনবিবি।


[নদীর নাম ভেড়ামোহনা—রুমা মোদক—পেন্সিল প্রকাশনী—৩১৪ নং স্টল—সোহরাওয়ার্দী উদ্যান]

Ruma Modak

রুমা মোদক

জন্ম ৭ মে ১৯৭০, হবিগঞ্জ। এমএ (বাংলা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বি.এড.।

প্রকাশিত বই—

নির্বিশঙ্ক অভিলাষ [বিশাকা, ২০০০]
ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি [ঐতিহ্য, ২০১৫]
প্রসঙ্গটি বিব্রতকর [অনুপ্রাণন, ২০১৬]
গোল [জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]
মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক [চৈতন্য, ২০১৮]
অন্তর্গত [দেশ, ২০১৯]

ই-মেইল : kabbyapaddya@gmail.com
Ruma Modak