হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম

পাণ্ডুলিপির গল্প : যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম

পাণ্ডুলিপির গল্প : যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতাম
1.46K
0

শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম  মহিউদ্দীন আহ্‌মেদের প্রথম গল্পগ্রন্থ।
প্রকাশ করেছে মুক্তচিন্তা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সারাজাত সৌম।
একটি গল্প, পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


১২ জুন, ২০০৮ বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টা ৪৯ মিনিট।
২৪২ রোকেয়া ভিলা, লেফ্‌ট সাইড, থার্ড ফ্লোর।
কাঁঠালবাগান, ধানমন্ডি, ঢাকা।
.

টিভি নাটকের সিনপ্‌সিস লিখছি। পুরান ঢাকার পটভূমিতে একটি ধারাবাহিক নাটকের গল্প। বেশ কিছুদিন আগে একই পটভূমিতে লেখা আমার আরো একটি ধারাবাহিক নাটক এটিএন বাংলায় প্রচার হয়েছে। নাম ‘বোহেমিয়ান’। টিভি নাটকে আমার শুরুটাও হয়েছিল পুরান ঢাকার গল্প দিয়ে। প্রথম গল্পটি ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘অসুখ বিসুখ’। নাট্যরূপ দিয়ে আমি সেটির নাম দিয়েছিলাম ‘দাওয়াই’। সেটি প্রচার হয়েছিল এনটিভিতে। আর এবার যে গল্পটির সিনপ্‌সিস লিখছি, সেটির নাম মনোরঞ্জন। আসলে আমি পুরান ঢাকার পুরনো আশিক! তাই পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতেও নাটক লেখার বাসনা আছে।

গল্পটি একটু অন্যরকম। পুরোটা বলব না। সাসপেন্স রেখে দিচ্ছি। তবে একটি কথা শুধু বলব—সিনপ্‌সিস লিখতে গিয়ে দৃশ্যকল্পগুলো কল্পনা করে এখনই বেশ মজা পাচ্ছি। দর্শক হাসবে। সম্প্রতি টিভি নাটকে হাসির দমক চলছে। হাসি না পেলে তা যেন নাটকই হচ্ছে না। মান্যবর ডিরেক্টর সাহেবও আমায় বলেছেন, স্ক্রিপ্ট যেন হয় হাস্যরসে টইটম্বুর। মানে যেভাবেই হোক দর্শক হাসানো চাই। আমিও ভাবছি, গতবার যেমন হাসিয়েছি, এবারও তেমন হাসাব। কোনোরকম কার্পণ্য করব না। হাসতে হাসতে দর্শকগণের পেটে খিল লেগে যাবে। তারপরও হাসি থামবে না। অবশ্য, ভয়ও যে একটু একটু হচ্ছে না, তা নয়। কারণ দর্শক হাসানো চাট্টিখানি কথা নয়। যা দিন পড়েছে! কেউ আর হাসতে চায় না। সবাই গম্ভীর হয়ে থাকে। যেন ফিক করে হাসি বের হয়ে গেলেই অঘটন ঘটে যাবে। তাই সবাই যেন মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে!

সে যাই হোক। আসল কথায় যাওয়া যাক।

আমি আপন মনে লিখছি। হঠাৎ কম্পিউটার স্ক্রিন ঝিরঝির করে কেঁপে উঠল। এভাবে কম্পিউটার স্ক্রিন কেঁপে ওঠার কারণ আমি জানি। কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীমাত্রই ব্যাপারটা জানেন—এ ফোনকল ইজ কামিং—সাম বডি উয়ান্টস টু টক টু মি—এ ম্যান অর এ ওম্যান—ইয়াং অ্যান্ড কুল—পারফেক্টলি বিউটিফুল—মিউজিক রিদম—সেন্সেশান—লিরিক্যাল! (মনে হচ্ছে একটি লিরিক লিখে ফেলা যাবে।) এমনসব মুহূর্তে আমি আনন্দিত হয়ে পড়ি। শুধু এমন মুহূর্ত বললে ভুল বলা হবে। সব সময়ই। ফোন কল এলে আমি কখনো বিরক্ত হই না। অপরিচিত নাম্বার দেখলে বুঝে নিই, হয় কোনো ডিরেক্টর নয়তো প্রোডিউসারের ফোন। আমার বেশ লাগে!


এ যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া। এখন শুধু স্বীকার করলেই হয়। ব্যস আমিই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান।


যথারীতি আগ্রহ নিয়ে ফোন রিসিভ করি। রিসিভ করার পর প্রথমেই শুনতে পাই, ‘ন্যান কথা বলেন’ বাক্যটি। বোঝা যায়, বাক্যটি কোনো এক ফোনের দোকানদারের। প্রচণ্ডরকম ভিড়ের শব্দ শুনতে পাই। তারপর মানুষের হট্টগোলের বুক চিরে ভেসে আসে চিনচিনে একটা বয়স্ক কণ্ঠ, ‘হ্যালো! ছিলামালাইকুম!’

আমি সপ্রতিভ হয়ে এবং কণ্ঠে বেশ খানিকটা ভাবগম্ভীরতা (সিচুয়েশনস ডিমান্ড) এনে বলি, ‘অলেকুমস্লাম।’

‘ছার, ভালো আছেন?’

আমাকে স্যার বলায় কিঞ্চিৎ হোঁচট খেলেও অভিভূত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে বলি, ‘জ্বি ভালো।’

তারপর নিশ্চুপ।

ওপাশ থেকে বয়স্ক কণ্ঠ বলেন, ‘হ্যালো! ছার, আপনে কি মইনু আহম্মেদ বলতেছেন?’

‘জ্বি বলছি!’

‘আপনি কি সিনাবাহিনীর পুরদান?’

আমি আঁতকে উঠি। সর্বনাশ। আরে! তাহলে তো আমি নই! এবার বুঝতে পারি, তিনি আসলে কাকে ফোন করেছেন। সেনাবাহিনীর প্রধানকে। মইন উ আহমেদকে। মোটেও মহিউদ্দীন আহ্‌মেদকে নয়।

ভুল ফোন জীবনে অনেক পেয়েছি। অনেকেই পায়। কিন্তু এ ফোন যে একেবারেই অন্যরকম! এমন ফোন ক’জনের ভাগ্যে জোটে! আমি ধন্য, আমি পূর্ণ—সার্থক জীবন আমার! মুহূর্তে ভীষণ একটা উত্তেজনা আমার সারা শরীর-মনে বয়ে যায়। আমি পুলকিত। মুগ্ধ। ওপাশ থেকে বয়স্ক-ক্ষীণ কণ্ঠ পুনরায় বলেন, ‘আমি মইনু আহম্মেদের সাথে কথা কমু। আপনে মইনু আহম্মেদ না?’

আমি থ’। কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। এমন একটা মাহেন্দ্রক্ষণ! অথচ না পারছি নিজেকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিশেবে পরিচয় দিতে, না পারছি ভুল নাম্বার বলে ফোনটা রেখে দিতে। কারণ মুহূর্তের মধ্যে আমি অন্য এক মানুষে পরিণত হয়ে গেছি। পদ মর্যাদায় অনেক বড়, অনেক ক্ষমতাবান! এ যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া। এখন শুধু স্বীকার করলেই হয়। ব্যস আমিই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। কিন্তু মনে ভয়। কাজটা ঠিক হবে কি? আমি হলাম এক ছাপোষা নাট্যকার! হুট করে সেনাবাহিনীর প্রধান হয়ে সবকিছু সামাল দিতে পারব তো? মনে পড়ে : পিপীলিকার পাখা হয় মরিবার তরে। তাই নির্মমভাবে লোভ সংবরণ করে বলি, ‘আপনি ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন।’

তো লোকটা আমাকে শুধরে দিয়ে বলেন, ‘না। আমি সঠিক নম্বারেই ফোন দিছি।’

সঙ্গে সঙ্গে আমি আবার জেগে উঠি। ছাপোষা নাট্যকার ‘লেফ্‌ট-রাইট’ নির্দেশ দেওয়ার চিত্রকল্প দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে চোখে সরষে ফুল দেখতে থাকি। আবার দমে যাই। কিন্তু দমে গেলেও ভাবি, তিনি কেন সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছে ফোন করেছেন তা জানা দরকার। তার পরিচয়ই বা কী, সেটাও তো জানা হয় নি।

তাকে বলি, ‘আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?’

তিনি বলেন, ‘পাইছি এক জায়গা থিকা।’

‘তা আপনি কী ব্যাপারে ফোন করেছেন?’

‘আমি ছার খুব গরিব মানুষ। বিপদে পইড়া ফোন করছি।’

‘কী বিপদ?’

‘জমি-জমা হাঙ্গামার বিপদ।’

‘আপনার নাম কী?’

আমার নাম আজিজ। আব্দুল আজিজ মিয়া। বাড়ি সাতক্ষীরা জিলা।

‘আপনি এখন কোত্থেকে ফোন করছেন?’

‘আমি এখন হাইকোর্টে আছি। ইখান থিকাই আপনেরে ফোন করতেছি। ছার, আমি খুব বিপদে আছি। আপনে আমারে সাহায্য করেন। আপনার সাহায্য ছাড়া আমার চলতেছে না।’

‘সেটা বুঝলাম। কিন্তু আমি তো সেনাবাহিনীর প্রধান না। আমি এ ব্যাপারে আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না।’ আব্দুল আজিজ মিয়া বলতেই থাকেন, ‘ছার, আমি একজন গরিব মানুষ। আপনার সাহায্য আমার লাগবই। আমি খুব বিপদে আছি। আমার পাঁচজন সন্তান। দুইজন বিএ পাশ করছে। মেয়েটা ইন্টার পড়তেছে। ভালো ভালো বিয়ের সম্বন্ধ আসে। এই অবস্থায়—এই বয়সে আমি যে বিপদে পড়ছি, আপনে ছাড়া এই বিপদ থিকা আমারে আর কেউ উদ্ধার করবার পারব না…’

এরপর ফোনের দোকানদার রং নাম্বার বলে আব্দুল আজিজ মিয়ার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে লাইন কেটে দেয়। ফলে এ পর্যন্তই আমাদের অসমাপ্ত ফোনালাপ।


ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। গা এলিয়ে দেই। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে মনে হয়, আমি যদি মঈন উ আহমেদ হতে পারতাম!


অদ্ভুত ফোনটা রাখার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। হাসির নাটকের চিন্তায় আর ফেরা হয় না। এইসব নিয়ে চিন্তা করার মতো অনেক নাট্যকার আছেন ঢাকা শহরে। বরং নিশ্চুপ বসে থাকি কিছুক্ষণ। আজিজ মিয়ার চেহারাটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ভীষণ মায়া হয় তার জন্য। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি তো সঠিক জায়গায়ই ফোন করেছেন। তার কাছে হয়তো মনে হয়েছে, এসব সমস্যার সমাধান মঈন উ আহমেদই দিতে পারবেন। সে-কারণে মঈন উ আহমেদ অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। সব ভালো। কিন্তু আমি কেন?

যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন অন্যান্য বন্ধুদের মতো আমিও সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। একদিন আমার নামে ডাক আসে। সেদিনও আমি ছিলাম পুলকিত। ভবিষ্যতে মেজর হচ্ছি, কর্নেল হচ্ছি এই ভেবে। কিন্তু বিধি বাম! আমি খুব লাজুক ছেলে। বন্ধুর কাছে সেনাবাহিনীর ফিজিক্যাল টেস্টের ধরন শুনে দে চম্পট! ঢাকা থেকে সোজা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আর সেই চলে যাওয়াই আমাকে বানিয়েছে নাট্যকার। না হলে কে জানে, হয়তো এই আমিই আজ মেজর হতাম। হতাম কর্নেল… ব্রিগেডিয়ার। একদিন হয়তোবা সেনাপ্রধানও হয়ে যেতে পারতাম… মঈন উ আহমেদ… কী জানি!…

আব্দুল আজিজ মিয়ার কথা মাথা থেকে সরছে না। লোকটা আমাকে একেবারে নাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। লেখালেখিতে আর মন বসাতে পারছি না। অথচ আমি তার কোনো উপকারেই আসতে পারলাম না। এসব ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। গা এলিয়ে দেই। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে মনে হয়, আমি যদি মঈন উ আহমেদ হতে পারতাম!

.
১২ জুন, ২০০৮

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com