হোম গদ্য গল্প নীরার লাল টিপ

নীরার লাল টিপ

নীরার লাল টিপ
318
0

মটকা মেরে বিছানায় শুয়ে আছি। আজকে শুক্রবার। মেসের সবাই ঘুমাচ্ছে। বুয়া আসবে আরো দেরি করে। আমাদের মেসের এই বুয়া খুব ত্যাড়া। রান্না-বান্না, দায়িত্ব পালন সব কিছুই তার ইচ্ছে খুশি মতো করে। কারো কথায় সে খুব একটা গা করে না। নেত্রকোণাতে বাড়ি—এরকম বুয়ারা একরোখা স্বভাবের আর হয়রা কিসিমের হয়। এই বুয়াও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভাবছিলাম একটা কিছু লিখব। কিন্তু এমন সময় দরজায় বেশ কড়া আওয়াজ হলো। এত জোরে আওয়াজ যে মেজাজটাই গরম হয়ে গেল। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। বেশ সাজুগুজু করা কঠিন চেহারার একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল—সরি, এত সকালে বিরক্ত করলাম। আপনি কি হাসান সাহেব? মা মনে হয় আপনার কথাই বলছিল। আমার সঙ্গে এক্ষুনি আপনাকে যেতে হবে। চট করে রেডি হয়ে নিন। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কেউ এভাবে সাত সকালে আমাকে হুকুম করতে পারে আমার জানা ছিল না। তাও কিনা অপরিচিত একজন মেয়ে। এই মেয়েটির সাথে আমার আগে কখনো দেখা বা কথা হয়েছে—এরকম কিছুই মনে পড়ছে না। তবে নিশ্চিত হলাম—বাড়িওয়ালারই মেয়ে।

একটা দৃশ্য আবছা চোখের সামনে ভেসে এল। একবার ভাড়ার টাকা দিতে আমি দোতলায় গিয়েছিলাম। খালাম্মাকে না পেয়ে তার এই মেয়ের হাতে টাকাটা রেখে এসেছিলাম। সামান্য ভদ্রতা করেও সে সেদিন কোনো কথাই বলে নি। ভেবেছে—মেসে থাকে, চাল-চুলা নেই, এলেবেলে মানুষ। টিউশনি বা এই-সেই করে হয়তো ঢাকা শহরে চলে। তাই কথাও বলে নি। তাছাড়া বড়লোকের সুন্দরী মেয়েরা বেশ অহংকারী হয়। এই কারণে আমার মতো মানুষকে নিয়ে তার আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। আমি বিষয়টা সেদিন সহজভাবেই নিয়েছি।

অত সাত-পাঁচ আর না ভেবে পনের মিনিটের মধ্যে নিজেকে তৈরি করে ফেললাম। জিন্সের প্যান্টের উপর কফি কালারের ফুলহাতা শার্ট, চামড়ার স্যান্ডেল পরলাম। হাতে করে রে-ব্যান-এর কালো ফ্রেমের সানগ্লাসটা নিলাম। বাইরে রোদের বেশ কড়া চোখ রাঙানি। অনেকটা এই মেয়েটির চোখের দৃষ্টির মতো।

রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি আগে থেকেই রিকশা ঠিক করে মেয়েটি উঠে বসে আছে। সানগ্লাসটি চোখে লাগিয়ে আমি তার বাম পাশে বসলাম। ভাবছি প্রথমে আমিই কথা বলে নীরবতা ভাঙি। নীরবতা আমার খুব অসহ্য লাগে।

—আপনার নামটা জানা দরকার।

—এটা জানা কি খুব জরুরি?

—এক রিকশায় পাশাপাশি বসে যাচ্ছি অথচ আপনার নাম জানব না তা কেমন করে হয়!

—নীরা, আমার নাম নীরা ফারহানা খান।

—আমার নাম তো আপনি জেনেই গেছেন। তাই কষ্ট করে আর বলছি না। আপনি কী করছেন?

—থার্ড ইয়ারে পড়ছি, ঢাকা মেডিকেল। আর আপনি?

—আমি বাংলায় মাস্টার্স শেষ করলাম লাস্ট টু ইয়ার্স, ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে।

আমার কথা শুনে নীরা আড়চোখে আমার মুখের দিকে চাইল। মুখ ভর্তি দাড়ি দু’গালে লেপটে আছে—এটা দেখছে নাকি আমার বলা কথার সাথে আমাকে মিলিয়ে নিচ্ছে তা বুঝতে পারলাম না। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে রিকশা খুব দ্রুত চলছে। নিউ মার্কেটের এক নম্বর গেটের সামনে এসে রিকশা থামল। বললাম, ভাড়া আমি দিচ্ছি, আমার কাছে ভাংতি আছে। আপনি কেন দিবেন? আমার কাছে কি ভাড়া নেই? এই বলে নীরা পঞ্চাশ টাকার নোটটা রিকশা ড্রাইভারের দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি তার কথা শুনে হালকা মুখ টিপে হাসলাম। বুঝতে পারছি, এই মেয়ে খুব কঠিন স্বভাবের।

রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমরা নিউ মার্কেটের ভিতরে ঢুকলাম। বেশির ভাগ দোকান এখনো খুলে নি। আমি নীরাকে জিগ্যেস করলাম, এখন আমরা কোথায় যাব? আমার কথা শুনে সে খুব শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল—হাসান সাহেব, আপনার কি খুব তাড়া আছে? যদি তাড়া থাকে তাহলে আপনি চলে যান। আমি একাই কাজ সারতে পারব। আমি চোখ থেকে সানগ্লাসটা বুক পকেটে নামিয়ে নিলাম। উত্তরে বললাম—না, না, আমার কোনো তাড়া নেই। আপনার সাথেই আছি সারাদিন। নো প্রবলেম অ্যাট অল।

নীরা তার ব্যাগের ভিতর থেকে একটা লম্বা লিস্টি বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। আমি পাশ থেকে বললাম—চলুন, কোথাও গিয়ে বসে কফি খাই। দোকানপাট খুলতে থাকুক। সে হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। আমি খানিকটা সামনে বাড়িয়ে একটা কফিশপে ঢুকলাম। দুইটা স্যান্ডউইচ আর দু’মগ কফির অর্ডার দিলাম। তারপর একটা খালি টেবিল দেখে আমরা মুখোমুখি বসলাম।

কিছুক্ষণের ভিতর কফি চলে এল। কফিতে একটা ছোট চুমুক দিয়ে নীরা আমাকে জিগ্যেস করল, এখন কী করছেন? কোনো চাকরি? আমি হেসে বললাম—অ্যা কমপ্লিট বেকার। আপনাদের বিল্ডিং-এ মেসে থাকি। খাই-দাই আর লেখালেখি করি টুকটাক। আমার কথা শুনে নীরার হাতে ধরা কফির মগটা কেঁপে উঠল। সে একটা বিষম খেয়ে বলল—আপনি লেখক? ভালোই হলো, আমি আগে কখনো লেখক দেখি নি এত কাছাকাছি বসে।

আমি বললাম, মনে হচ্ছে লেখকদের আপনি খুব অপছন্দ করেন। কারণটা জানতে পারি কি? নীরা ঠোঁটের কোণে একটা অন্যরকম হাসি টেনে বলল—না, না অপছন্দ করব কেন? লেখালেখি করা তো একটা বিশাল গুণ, তাই না? সবার সেই গুণ থাকে না। এরকম কথায় বুঝতে পারি, নীরা আমাকে কিছুটা তাচ্ছিল্য করছে। আমি মনে মনে হাসলাম আর স্যান্ডউইচে আলতো করে কামড় বসালাম। নীরা ঘড়ি দেখে বলল—চলেন। এইবার উঠব। আমিও মাথা নেড়ে বললাম—উঠি তাহলে। নীরাকে সুযোগ না দিয়ে কাউন্টারে গিয়ে খাবারের বিল দিয়ে বেরিয়ে এলাম।


সুন্দরী আর অহংকারী মেয়েদের মুখ দেখে চট করে কিছু বোঝা যায় না। কিছুটা সময় লাগে তাদের বুঝতে। 


এর মধ্যে সব দোকানপাট খুলে ফেলেছে। প্রথমেই নীরা আমাকে নিয়ে মেডিকেলের বইয়ের দোকানে ঢুকল। বেশ মোটা সাইজের তিনটা আর মাঝারি সাইজের দুইটা বই কিনল। জানি তার পক্ষে এই বইগুলো বহন করা কষ্টকর। আমি বললাম—দিন, আমার কাছে দিন। নীরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—আপনার কষ্ট হবে না তো? আমি হেসে বললাম—লেখক মানুষদের কষ্ট থাকতে নেই। আপনি দিন তো বইগুলো। আমার কোনো কষ্ট হবে না।

আমার কথায় নীরা কোনো খোঁচা অনুভব করল কিনা বুঝতে পারলাম না। সুন্দরী আর অহংকারী মেয়েদের মুখ দেখে চট করে কিছু বোঝা যায় না। কিছুটা সময় লাগে তাদের বুঝতে। নীরা একটা করে জিনিস কিনছে আর লিস্টি দেখে টিক মার্ক দিচ্ছে। আমার পরিচিত এক দোকানে ঢুকে কেনা জিনিসগুলো রেখে আসলাম। বুঝতে পারছি, তার আরো কিছু কেনাকাটা করা লাগবে। কেবল অর্ধেক হয়েছে। নীরা এদিক-সেদিক কিছু একটা খুঁজছে। এমন সময় আমাকে জিগ্যেস করল—হাসান সাহেব, আপনার কি কোনো বই-টই বেরিয়েছে?

আমি কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম। বুঝতে না পেরে জিগ্যেস করলাম—আমাকে কিছু বলছেন নাকি? আমার কথায় নীরা কিছুটা রেগে গেছে। আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে আমার পাশে আর কে আছে? হ্যাঁ, আপনাকেই জিগ্যেস করছিলাম—কোনো বই বেরিয়েছে আপনার? আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম—গত বইমেলায় আমার দুইটা বই বেরিয়েছে—একটা ছোট গল্প আর একটা উপন্যাস। আমার কথা নীরার বিশ্বাস হচ্ছে না। তার মুখ দেখে একজন অন্ধ মানুষও তা বলে দিতে পারবে।

আমি নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম—চলুন, ঠান্ডা কিছু দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নেয়া যাক। খুব গরম পড়েছে আজকে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, নীরা কিছু একটা ভাবছে হাঁটতে হাঁটতে। লিস্টির ভেতর থেকে কোনো কিছু কেনাকাটায় বাদ পড়েছে নাকি আমার মতো অখ্যাত লেখকের বই বের হবার কথাটা ভাবছে কে জানে!

নীরার সব কেনাকাটা শেষ করতে করতে দুপুর হয়ে গেল।

দুপুরের আজান ভেসে আসছে মসজিদ থেকে। আমি তাকে বললাম—আজ শুক্রবার। জুম্মার নামাজ মিস করা যাবে না।

চলুন, এইবার বাসায় ফেরা যাক। নীরা সাথে সাথে বলল—শিওর, চলেন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরি। দুজনের হাতে এক গাদা ব্যাগ ভর্তি জিনিসপত্র আর বই। এইসব নিয়ে রিকশায় চড়ে বসলাম। রাস্তায় তেমন জ্যাম নেই। আধাঘণ্টার ভেতর আমাদের রিকশা নীরাদের বাসা পরীবাগের সামনে এসে থামল।

তারপর সব জিনিসপত্র বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি ঝটপট গোসল সেরে মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষ করে বাসায় যখন ফিরে এলাম তখন খুব খিদে পেয়েছে। মেসে আমার বাজার করার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয় নি সঙ্গত কারণেই। বুয়া ডিম ভাজি আর আলু ভর্তা করে চলে গেছে। তা দেখে এখলাস ভাই খুব চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। সে মেসের সবচেয়ে সিনিয়র মেম্বার। আজিজ সুপার মার্কেটে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। রাগে চোখমুখ কঠিন করে আমাকে পুলিশের মতো জেরা শুরু করেছে।

—হাসান, তুমি যে বাজার করতে পারবা না সেই কথা আগে বলো নি কেন?

—ভাই, আমি ভাবছি ঘণ্টা খানেকের ভেতর ফিরতে পারব।

—কই গেছিলা তুমি? কার সাথে?

—নিউ মার্কেটে গেছিলাম। এই বাড়ির মালিকের মেয়ের সাথে।

—কী কইলা? কার সাথে?

—আরে ভাই, আপনি কি হাটকালা? কানে কম শোনেন?

—কানে আমি ঠিকই শুনি। কিন্তু এইরকম কথা আগে শুনি নাই যে, এত মানুষ থাকতে বাড়িওয়ালার সুন্দরী মেয়ে তোমারে নিয়া নিউমার্কেট গেছে।

আমি কিছু একটা বলতে যাব, এখলাস ভাইয়ের কথার উত্তরে এমন সময় দরজায় কড়া নড়ে উঠল। এখলাস ভাই গিয়ে দরজা খুলে দিল। এক ঝটকায় দরজা ঠেলে নীরা ভেতরে ঢুকল। সে সবুজ কালারের উপর প্রিন্টের কাজ করা ড্রেস পরেছে। চুল খোলা। কিছুক্ষণ আগে গোসল করেছে বোঝাই যাচ্ছে। চুলে কন্ডিশনার ইউজ করেছে। একটা মাতাল করা ঘ্রাণ খোলা চুল থেকে ভেসে আসছে।

এখলাস ভাই এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নীরা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বলল—জলদি চলে আসুন উপরে। মা টেবিলে ভাত দিয়েছে। আপনি আমাদের সাথে খাবেন। আমি লজ্জায় কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। আমতা-আমতা করে বললাম—প্লিজ, আজকে না। আরেকদিন খাব। তাছাড়া মেসে বুয়া আমার জন্য রান্না করেছে। সেই খাবার নষ্ট হবে। ‘নষ্ট হোক সেই খাবার। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আমি উপরে গেলাম’—এই কথা বলে নীরা চলে গেল। এখলাস ভাই কিছুক্ষণ আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল—হাসান সাহেব, আজকে থেকে আপনি হলেন এই বাড়ির জামাই। বাড়িওয়ালার মেয়ের জামাই। যান, পোলাও মাংস খেয়ে আসুন। আর আমরা গরিব কাঙাল, আলুভর্তা আর ডাইল দিয়েই সারা জীবন খেয়ে গেলাম। আমি আর কথা না বাড়িয়ে এখলাস ভাইয়ের দিকে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে নীরাদের বাসার দিকে রওনা দিলাম।

দরজা হালকা ভেজানো ছিল। আমি দুইবার নক করলাম। ভিতর থেকে নীরা চেঁচিয়ে বলল—এত ফর্মালিটি লাগবে না। চলে আসুন। আমি লজ্জায় একেবারে মরে যাচ্ছি। এভাবে নীরার বাসায় খাওয়ার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। টেবিল ভর্তি নানারকম খাবারের আয়োজন। বড়লোক মানুষের ডাইনিং টেবিল যেমন হওয়ার কথা তা ঠিক তেমনি। মেস-জীবনে আমাদের এত খাবার খাওয়ার সুযোগ কই? ইচ্ছে করছিল, এখলাস ভাইকে ডেকে নিয়ে আসি। আহা, বেচারা শুক্রবার দিন আলু ভর্তা দিয়ে খাচ্ছে—এটা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগছিল।

আমি চেয়ার টেনে এক পাশে বসলাম। কিছুক্ষণ পর খালাম্মা আসলেন। আমি উনাকে সালাম দিলাম। উনি খুব আন্তরিক একটা হাসি দিয়ে বললেন—বসো বাবা। তোমরা এতদিন ধরে আছ এখানে অথচ সময়-সুযোগের অভাবে তোমার সাথে কথাই হয় না। ভালোই হলো, আজকে তোমার সাথে খেতে খেতে গল্প করব। আমি লাজুক ভঙ্গিতে বললাম—জি খালাম্মা, অবশ্যই।

এক সাথে তিনজন খেতে বসলাম। আমি, খালাম্মা আর নীরা। নীরা আমার প্লেটে আস্ত দুইটা কৈ মাছ তুলে দিয়েছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম—আপনার দিতে হবে না, প্লিজ। আমি নিজের হাতে তুলে নিব। খালাম্মা আমাকে জিগ্যেস করলেন—হাসান, তোমার দেশের বাড়ি যেন কোথায়? আমি খাবার মুখে নিয়ে উত্তর দিলাম—নেত্রকোণা, খালাম্মা। ফ্যামিলিতে কে কে আছেন তোমার? খালাম্মা জানতে চাইলেন। আমি খাবার হাতে নিয়ে বললাম—এখন কেউ নেই। আমি একাই আছি।


নীরা গল্প শুনছে খুব আগ্রহ নিয়ে। হঠাৎ ও আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে আমাকে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিল।


আমার কথায় নীরা খুব অবাক হয়ে গেল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার তাই মনে হলো। সে বলল—মানে? আমি মা আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম—আমার মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। স্কুল কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এলাকার প্রভাবশালী এক রাজাকার আমার বাবাকে খুন করে। আর অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় মা মারা যান। খাবার টেবিলের পরিবেশটা আমার কথা শুনে ভারি হয়ে গেছে। সবাই চুপচাপ। খালাম্মার চোখে পানি টলমল করছে। নীরা মাথা নিচু করে আছে।

আমি বললাম—সরি, আমার কথায় আপনাদের খাওয়ার মুড নষ্ট হয়ে গেছে। খালাম্মা চোখ মুছে আমার পাতে আরো কিছু খাবার তুলে দিলেন। নীরা হঠাৎ তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলল—মা, ইনি কিন্তু লেখক মানুষ। গত বইমেলায় তার দুইটা বই বেরিয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছে। খালাম্মা হাসিমুখে বললেন—তাই নাকি? তাহলে তো বিশাল ব্যাপার। সবাই লেখালেখি করতে পারে না। কিছু কিছু মানুষের এই গুণটা থাকে। সবার এই গুণ থাকে না। দোয়া করি, তুমি একজন বড় লেখক হও। নীরা পাশ থেকে টিপ্পনি কেটে জিগ্যেস করল—আচ্ছা, আপনি কী লেখেন? প্রেমের গল্প, উপন্যাস নাকি অন্য কিছু? আমি অবশ্য গল্পের বই-টই বেশি পড়ি না। তবে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ চার দিনে শেষ করেছিলাম। এখন তো মেডিকেলের বই পড়তে পড়তেই আধমরা হয়ে যাচ্ছি।

খালাম্মার খাওয়া আগেই শেষ হয়ে গেছে। তিনি রান্নাঘরে কাজ করছেন। আমি আর নীরা এখনো টেবিলে বসে আছি। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম—আপনি কি প্রেমের গল্প-উপন্যাস পছন্দ করেন না? সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল—না, মানে সব লেখকরাই তো প্রথমে প্রেম-ট্রেম নিয়ে লেখে। তাই বললাম আর কি। আমি হাসতে হাসতে বললাম—আগে প্রেমের উপন্যাস লিখি নি। তবে এইবার লিখব ভাবছি।

নীরাদের বাসা থেকে বিদায় নিয়ে নিচে নেমে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখি এখলাস ভাই বিছানায় শুয়ে পেপার পড়ছে। আমাকে দেখে পেপারটা একপাশে রেখে শূন্য দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার তাকানোর এই ভঙ্গিটা দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল।

—কী ব্যাপার এখলাস ভাই, এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?
—কোনো ব্যাপার-ট্যাপার না ছোট ভাই। তোমার দিকে কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করছে।

—ফাইজলামি রাখেন তো ভাই। খাবার টেবিলে আমি আপনাকে খুব মিস করেছি। কী এলাহি খানাপিনা। এক্কেবারে বিয়ে বাড়ির আয়োজন।

—তাই নাকি? তা কী বুঝলা? কোনো চান্স আছে?

—মানে? কিসের চান্সের কথা বলছেন?

—আরে মিয়া, মাইয়ার সাথে কোনো ভাব-ভালোবাসা অইব নি?

—উফ, এখলাস ভাই। আপনি আসলেও একটা ফাউল।  মাথার ঘিলু আপনার শুকিয়ে গেছে। ঠিক কী কারণে নীরা আমার সাথে প্রেম করবে? আমি আপনার মতো অত ফাউল চিন্তা করি না।

—ঠিক আছে, দেখা যাক। টাইম উইল সে এভরিথিং।

এখলাস ভাইয়ের সাথে আর কথা না বাড়িয়ে একটা ঘুম দেয়ার পরিকল্পনা করলাম। আয়েশ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের ভেতর ঘুম নেমে এল দুই চোখে। ঘুমের ঘোরে একটা স্বপ্ন দেখলাম—ছাদের এক কোনায় আমি আর নীরা বসে আছি। নীরার হাতে আমার লেখা গল্পের বই। সে জোরে জোরে বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছে আমাকে। মাঝে মাঝে পড়া থামিয়ে আমাকে বলছে—হাসান, তোমার পছন্দের একটা গল্প আমাকে পড়ে শোনাও না। আমি তার হাত থেকে বই নিয়ে একটার পর একটা গল্প পড়ে যাচ্ছি।

নীরা গল্প শুনছে খুব আগ্রহ নিয়ে। হঠাৎ ও আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে আমাকে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিল। আমি পাখির পালকের মতো ভাসতে ভাসতে ছয় তলার ছাদ থেকে নিচে পড়ছি।

বুয়ার ডাকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। মাথাটা কেমন জানি ভার ভার লাগছে। স্বপ্নের বিষয়টা আমার মাথায় গেঁথে আছে। এরকম স্বপ্ন কেন দেখলাম? পরক্ষণেই নিজেকে বললাম—স্বপ্ন আসলে দুর্বল কিংবা উত্তেজিত মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। আজ দুপুরে যেহেতু রিচ ফুড খেয়েছি তাই এসব খাবার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তাই উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখেছি।

বাজারের ব্যাগ আমার সামনে এনে বুয়া বলল—ভাইজান,  ছালাইয়া বাজার কইরা আনেন। রান্দনের কিছু নাই। এখলাস মামা দেশি মুরগি আনবার কইছে। পাশের বিছানা থেকে এখলাস ভাই বলল—হাসান, এক কেজি পোলাও’র চাল আইনো। রাতে মুরগির মাংস আর খিচুড়ি খাব। আমি এখলাস ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম—আহা বেচারা, এখলাস ভাই! তবুও এই লোকটাকে আমি বেশি পছন্দ করি মেসের অন্য সদস্যদের চেয়ে। তার ভেতরে কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই। ঘোরপ্যাঁচের মানুষ আমার দুই চোখের বিষ, একদম সহ্য করতে পারি না।

দুই বছর হলো মাস্টার্স শেষ করেছি। বন্ধুদের অনেকেই চাকরিতে ঢুকে গেছে। কেউ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টায় আছে। আমার ভিতর এই ব্যাপারে অত তাড়া নেই। একা মানুষ, কোনো পিছুটান নেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে কেউ আমার জন্য কোথাও অপেক্ষা করে নেই। আর এটা যখন ভাবি তখন নিজেকে পাখির পালকের মতন হালকা লাগে।

আমার একটাই স্বপ্ন—সারা জীবন লেখালেখি করব। গল্প লিখব, উপন্যাস লিখব—এই করে আমি বিখ্যাত হব। আমি জানি, আমার ভেতর সেই শক্তি আছে। তারপরও এই ঢাকা শহরে জীবনটাকে সহজ করে চালাতে হলে মোটামুটি একটা সম্মানজনক চাকরি দরকার। লেখালেখির ফাঁকে আমি সেই চেষ্টাই করছি। দুই জায়গায় কথা চলছে। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভি জমা দিয়েছিলাম তারা আমার রেজাল্ট দেখে শিক্ষক হিসাবে নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে তবে লেকচারার হিসাবে সেখানে কাজ শুরু করব। এতে আমার লেখালেখিতে সময় পাওয়া যাবে। অপেক্ষায় আছি, দেখি কী হয়।

নীরার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়, কথা হয়। বিকেলে ছাদে উঠে তার হাতে বানানো চা-নাশতা খাওয়া হয়। সে খুব আগ্রহ নিয়ে আমার লেখালেখির খোঁজ-খবর করে। অনুভব করি, তার উৎসাহ পেয়ে ভেতরে একটা অন্যরকম অনুভূতি খেলা করে। তারপর একটা সময়ের পর তার দেখা পাবার জন্য আমার ভেতরের কেউ একজন ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আর যখন তার দেখা পাই না তখন ভাবি—মেডিকেলের পড়াশোনায় সময় পাওয়া খুব কঠিন। তার সাথে যে আমার প্রতিদিন দেখা হতেই হবে—এমন তো কথা নেই। তবে দেখা হলে একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করবে—এটা বুঝি। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে যে, আমি যখন তার কথা ভাবছি তখন সে তার ভালোবাসার মানুষের পিঠে হেলান দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করে গাইছে। যদিও নীরাকে প্রথম দেখায় আমার কাছে খুব কঠিন হৃদয়ের মানুষ বলে মনে হয়েছে। এরকম কঠিন স্বভাবের মেডিকেল পড়ুয়া একটা মেয়ে তার প্রেমিকের পিঠে হেলান দিয়ে আছে—এইরকম একটা দৃশ্য আমার কেন জানি মানতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে এসবই অর্থহীন ভাবনা।


মা-বাবা চলে যাওয়ার পর যে নিঃসীম শূন্যতা আমাকে গ্রাস করেছিল, আজ আবার সেই ভয়ানক শূন্যতা আমাকে শেষ করে দিয়েছে।


তারপর একদিন শেষ-বিকেলের কনেদেখা আলোয় আমি নীরাকে বললাম—যেহেতু আমি আপনাকে মনেপ্রাণে চাই এবং ভালোবাসি তাই আজ থেকে আপনাকে তুমি করেই বলব। আশা করি তুমি আমাকে ফেরাবে না। সে আমার কথায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বলল—আমিও তোমাকে ভালোবাসি, হাসান। সারাজীবনের জন্য আমি তোমাকে আমার পাশে চাই। এরপর থেকেই আমরা দুজন প্রেমিক-প্রেমিকায় রূপান্তরিত হলাম। গভীর প্রেম আমাদের ভেতর-বাহির, সর্বস্ব ভাসিয়ে নিলো প্রবল বেগে।

তিন মাস পর নীরা একদিন জানাল, তার মেডিকেল কলেজ থেকে একটা সেমিনারে অ্যাটেন্ড করতে নেপাল যাবে। চারদিনের প্রোগ্রাম। আমাকেও তার সাথে যেতে খুব জোর করল। কিন্তু আমার অফিস থেকে ছুটি না পাওয়ায় যেতে পারি নি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের টিকিট কনফার্ম করা থেকে শুরু করে অন্যসব কাজ আমিই তার সাথে থেকে করে দিয়েছি।

সকাল দশটায় নীরার ফ্লাইট। দোতলা থেকে লাগেজসহ নিচে নেমে সে আমার রুমে ঢুকল। মেসে কেউ নেই। সকাল আটটার ভিতর সবাই যার যার অফিসে চলে গেছে। আমি অপেক্ষা করছি তাকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাব। রুমে ঢুকে সে আমাকে বলল—হাসান, আমার দিকে তাকিয়ে দেখো তো, টিপটা কপালের মাঝখানে আছে নাকি সরে গেছে। আমি হেসে বললাম—তোমাকে দেবীর মতো অপরূপ লাগছে। তবে লাল টিপটা চেঞ্জ করে অন্য কালারের একটা টিপ পরো। তাতে আরো পারফেক্ট লাগবে।

সে আমার ছোট ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লাল টিপটা খুলে একটা খয়েরি কালারের টিপ পরে নিল। সেই লাল টিপটা আয়নার এক কোনায় গেঁথে দিল। হাসতে হাসতে বলল—আমি না ফেরা পর্যন্ত এই লাল টিপটাই হচ্ছি আমি। যখনই আমার কথা মনে পড়বে তখন এই টিপের দিকে তাকিয়ে থেকো। টের পাবে আমি তোমার হাত ধরে আছি। তারপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখল অনেকক্ষণ।

দুপুর বারোটায় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট-২১১ কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টে নামার সময় ছিয়াশি জন যাত্রীসহ বিধ্বস্ত হয়। পাঁচজন আহত আর সবাই নিহত। আহত পাঁচ জনের ভিতর নীরা নেই। এই খবর নিশ্চিত হওয়ার পর নীরার বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। তার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আমার কোনো সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই। কেবল বুঝতে পারছি মা-বাবা চলে যাওয়ার পর যে নিঃসীম শূন্যতা আমাকে গ্রাস করেছিল, আজ আবার সেই ভয়ানক শূন্যতা আমাকে শেষ করে দিয়েছে।

ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম নিশ্চুপ হয়ে। নীরার রেখে যাওয়া লাল টিপের উপর একটা গভীর চুম্বন এঁকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই। আছে কেবল আমার একমাত্র আপন জন—নীরার লাল টিপ!

ইভান অনিরুদ্ধ

জন্ম ২৬ জানুয়ারি; শুনই, আটপাড়া, নেত্রকোণা। বর্তমানে আছেন : বাড়ি- ১৯, রোড- ৯/ সি, সেক্টর- ৫, উত্তরা, ঢাকা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বিএ [অনার্স], ইংরেজি সাহিত্য [জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়]

পেশা : ব্যবস্থাপক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ঢাকা।

প্রকাশিত বই—

বিরহজোছনা [উপন্যাস, প্রতিভা প্রকাশ, ২০১৮]
রিনির হাতদেখার পর [গল্প, প্রতিভা প্রকাশ, ২০১৮]
যে যায় সব ছিন্ন করে যায় [কবিতা, বেহুলাবাংলা, ২০১৮]

ই-মেইল : shamim250208@yahoo.com

Latest posts by ইভান অনিরুদ্ধ (see all)