হোম গদ্য গল্প নিখোঁজ সংবাদ

নিখোঁজ সংবাদ

নিখোঁজ সংবাদ
517
0

পল্টু হারিয়ে গেছে। হরিণটানা গ্রামের মুরব্বিদের কাছে অবশ্য পল্টু নামের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। তাদের কাছে পল্টু মানে হলো ছিয়ামের ছাওয়াল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় নিম্নের ঘটনায়। পল্টু নিখোঁজ হওয়ার পর ফাতেমা, যে কিনা পল্টুর চাচাত বোন, যার জন্ম পল্টুর জন্মের বছর দুয়েক আগে, সে ছুটে যায় রাস্তায়; যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মকবুলের চায়ের দোকান। রাস্তার এ-মাথা ও-মাথা খুঁজে শেষে চায়ের দোকানের ছাবড়ার নিচে ঢুকে কল চেপে কলের নালায় মুখ লাগিয়ে পানি খায় সে। দোকানের একুশ ইঞ্চি রঙিন টিভিতে তখন স্থানীয় ডিশ চ্যানেলে বাংলা সিনেমা চলছে। ডজনখানেক লোক, তাদের অনেকেই মুরব্বি, কারো হাতে চায়ের কাপ, কারো হাত খালি, তাদের মুগ্ধ নয়ন আটকে আছে টিভির পর্দায়। কিংস্টার শাকিব খান ক্ষেপে গেছে। গুন্ডা মিশা সওদাগর তার মাকে তুলে নিয়ে গেছে কক্সবাজারের এক পাহাড়ি আস্তানায়। ঘটনা কিভাবে যেন জেনে ফেলেছে শাকিব খান। মাকে উদ্ধার করতে সে ছুটে গেছে কক্সবাজার। রূপকথার পঙ্খিরাজের মতো বন্দুকধারী মানবপ্রাচীরের মাথার উপর দিয়ে তার মোটর সাইকেল লাফিয়ে নামে আস্তানার মধ্যখানে, ঠিক তার মা ডলি জহুরের পায়ের কাছে। এমন টানটান উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে ফাতেমার আগমন। সে পানি খাওয়া সতেজ গলায় জিজ্ঞেস করে—আপনেরা পল্টুর দেকেছেন?

প্রথমবারে ফাতেমার কথা কারোর কানেই পৌঁছে না। একে তো ফাতেমা মেয়ে, ছয় বছরের শিশু, গলার স্বর নিচু, তার উপর ঘটনাস্থলে শাকিব খান এসে গেছে। এই তুমুল মারমার কাটকাট সময়ে কেই-বা খেয়াল করে ফ্রক পরা বাচ্চা মেয়ে ফাতেমাকে। ফাতেমা দ্বিতীয়বার কথা তোলে কণ্ঠে, গলায় শান দিয়ে বলে, আপনেরা কেউ আমার পল্টুক দেকেছেন? এইবার কেউ কেউ খেয়াল করে ফাতেমার অস্তিত্ব। স্কুলপাড়ার বহর আলী, উচ্চারণের সুবিধার্থে সবাই যাকে বোরালি ডাকে, সে মুখ ফেরায়। তার গালভর্তি পান। পানের পিক ফাতেমার পায়ের কাছে ফেলে সে চোখ নাচায়—কার কতা কচ্ছিস?


ইমাম সাহেব জানায়—মসজিদের মাইকে গরু-ছাগল হারানোর ঘোষণা দেয়া নিষেধ। কমিটির পক্ষ থেকে নিষেধ আছে।


পল্টু, আমারে পল্টু।

পল্টু কিডা, কার ছাওয়াল?

পল্টুর আব্বা অর্থাৎ নিজের কাকার নামটা বলতে গিয়ে ফাতেমাকে এক মুহূর্ত ভাবতে হয়। কেননা, পল্টু নামটা তার যত পরিচিত, কাকার নাম অতটা নয়। একটু ভেবে নিয়ে, একবার টিভির পর্দায় চোখ ঘুরিয়ে এনে সে বলে, ছিয়াম কাকার ছাওয়াল।

বোরালি দ্বিতীয়বার পিক ফেলে বলে, ছিয়ামের ছাওয়াল তো পিরাই-ই হারায়। ভালো করে খোঁজেক, পায়ে যাবি। যা যা, ওদিক যা, ছোট মানুষ এসপ জাগায় আসতি হয় না।

বহর আলি ওরফে বোরালির কথায় আমরা নতুন একটা তথ্য পেলাম। ছিয়ামের ছাওয়াল পল্টু সে প্রায়ই হারিয়ে যায় এবং খোঁজাখুঁজি করার পর পাওয়াও যায়। কিন্তু একটু খুঁজলেই পাওয়া যায় সেই ভরসায় বাপ-মা বসে থাকতে পারে না। বিশেষ করে পল্টুর মতো অস্বাভাবিক ছেলে যখন হারায় তখন বাপ-মার চোখের ঘুম উড়ে যায়। জন্মের পর থেকেই পল্টু একটু অন্যরকম। পানি দেখলে সে অন্যরকম হয়ে যায়। হাঁটতে শেখার পর থেকে পানির কাছে গেলেই সে লাফিয়ে পড়ার মতো করে। কখনো কখনো লাফিয়েও পড়ে। গতবছর ছেলেকে জুমারত ফকিরের কাছে নিয়ে গিয়েছিল ছিয়াম। লক্ষণ দেখে ফকির বলেছিল, ছাওয়ালের দোষের ভাব আছে। আমি তাবিজ দিচ্ছি। তাবিজটা সোনার রঙের মাদুলির ভিতর পুরে মোম দিয়ে মুখ বন্ধ করে কালো সুতোয় ছাওয়ালের কোমরে বানতে হবে। তাবিজটা তার মা মর্জিনা খুব যত্ন করে ছেলের কোমরে বেঁধে দিয়েছে। সেই তাবিজ কোমরে নিয়ে পল্টু তৃতীয়বারের মতো নিখোঁজ হয়েছে।

ছিয়ামের যত ভয় কালী নদী নিয়ে। কিশোরীর চুলের ফিতের মতো এক চিতলে নদী মরতে মরতে বেঁচে আছে হরিণটানায়। নদীর পারেই ছিয়ামের বসত। জানলা দিয়ে তাকালে নদীতীরের বাঁশঝাড় দেখা যায়। সেখানে সারাদিন একঝাঁক শালিকের ওড়াউড়ি করে। ছিয়ামের ভয়—কোনোদিন এই নদীতে না লাফ দিয়ে মরে তার কলিজার টুকরো। মনে মনে বহুবার সে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে—কালী গাঙ যেন মরে যায়। গাঙটা মরে গেলেই তার ছাওয়ালটা নিরাপদে থাকবে। কিন্তু শকুনের দোয়ায় যেমন গরু মরে না তেমনি ছিয়ামের দোয়ায় গাঙ শুকায় না। প্রতি বর্ষায় ছিয়ামের বুকের প্রতিটা পার কাঁপিয়ে কানায় কানায় ভরে ওঠে কালী। তখন নদীকে আর নদী মনে হয় না—যুবতী নারী। যুবতীর জল শুকাতে না শুকাতে বছর ঘুরে নতুন করে ফিরে আসে আরেক বর্ষা। কালীগাঙ নদী থেকে আবার হয়ে যায় রূপবতী নারী। আর আমাদের ছিয়ামের দুশ্চিান্তারও শেষ হয় না।

উঠোনে দীর্ঘ সময় পল্টুকে দেখা না গেলে তেমন কিছু হয় নি, একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে এমন ভঙ্গিতে তার মা মর্জিনা তাকে খুঁজতে যায় আব্দুল কুদ্দুসের বাগানে। পল্টু এই বাগানে আব্দুল কুদ্দুসের পোষা কুকুর ডনের সাথে মাঝে মাঝে খেলা করে। ফাতেমাও সঙ্গে থাকে কোনো কোনো দিন। মর্জিনা আমবাগানে গিয়ে দেখে খাঁ খাঁ করছে বাগান। পল্টু নেই, অন্য কোনো মানুষও নেই। কেবল ডন একটা মরা শালিকের বাচ্চা মুখে নিয়ে বসার মতো জুতসই জায়গা খুঁজছে। মর্জিনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মরা শালিকের বাচ্চাটার দিকে। তার বুকটা কেমন কেমন করে ওঠে। এরপর দ্রুত সে পা চালায় নদীর উদ্দেশে। নদীতীরেও পল্টুকে পাওয়া না গেলে মর্জিনার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়। সে ফাতেমাকে পাঠায় রাস্তার দিকে। ফাতেমা হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসে রাস্তা থেকে। চোখমুখ উল্টেপাল্টে জানায়—পল্টুক নাস্তায়ও পাওয়া যায় নি। মর্জিনা খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ে বারান্দায়। ছিয়াম মাঠে গেছে ঝাল তুলতে। এই মোবাইল ফোনের যুগে তার একটা মোবাইলও নেই যে বিপদের কালে সে ফোন করে স্বামীকে বাড়ি আসতে বলবে। চতুর ফাতেমা অবশ্য মাঠে কাকার কাছে খবর পাঠানোর একটা ব্যবস্থা করে ফেলে। সে দেখে, মতিন দাদা হাতে কাচি, মাথায় মাথাল নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। কণ্ঠে তার গুনগুনে গান। ফাতেমা ছুটে গিয়ে জানায়—ও দাদা, পল্টু না হারা গেছে! আমার কাকার ইট্টু খবর দিতি পারবেন?

মতিন দাদার গলায় আটকে যায় গান। মাঠে যাওয়ার এই সময়ে পল্টুকে সে প্রায়ই বাগানের মধ্যে খেলতে দেখে। দেখতে দেখতেই কেমন মায়া পড়ে গেছে অসুস্থ ছেলেটার উপর। তারও টেনশন হয়— তুরা ভালো করে খোঁজ, আমি মাটে যায়েই ছিয়ামেক পাঠা দিচ্ছি। গাঙের ওইদিক দেখিছিস তো! পল্টুর তো আবার দোষের ভাব আছে। পানি দেকলি লাপ মারে। যা যা, গাঙের ধারে দেকেক গা। আমি ছিয়ামেক খবর পাঠাচ্ছি।

এবার ছিয়ামের সাত কাঠা ভুঁই ঝাল নিয়ে কৃষকদের সবারই আলোচনা। অত ভালো ঝাল আর কারুরই ধরে নি। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছে—এবছর ছিয়ামের ঝালই মাঠের সেরা। চমৎকার ঝাঁকড়া সবুজ গাছ। দেখলে পরাণ জুড়ায়ে যায়। ঝালের সাইজও তেমন। মধ্যমা আঙুলের মতো মোটা আর লম্বা লম্বা। ঝুমঝুম করছে গাছ। একটু হামু দিয়ে নিচ থেকে দেখলে মনে হয় গাছের শাখায় শাখায় ঝুলে আছে স্বর্ণে গড়া কানের দুল। প্রত্যেক সপ্তাই ছিয়াম এক মণ করে ঝাল বেচতে পারছে। বন্যার কারণে ঝালের দামও এবার বেশি। ছিয়াম টাকা জমাচ্ছে। হাজার দুয়েক টাকা জমাতে পারলেই সে পল্টুকে শহরের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। ছাওয়ালটা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। ছিয়াম ক্ষেতের এক কোণায় ঝালের স্তূপ সাজায় আর ঘন সবুজ সেই স্তূপের ভেতর পল্টুর মুখটা দেখতে পায়।

ঘোরগ্রস্ত ছিয়ামের মগ্নতা ভাঙে মতিন মণ্ডলের ডাকে। পল্টুকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে তার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যায়। ঝালের দায়িত্ব সে মতিন মণ্ডলের উপর ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পথে ছোটে। মর্জিনার উদ্‌ভ্রান্ত চেহারা দেখে তার ভয়টা আরো বেড়ে যায়। প্রথমেই সে রাগ উগরে দেয় বউয়ের উপর—তোক কতবার কইছি পল্টুক চোকে চোকে রাকবি! এট্টা ছাওয়াল কনটোল কত্তি পারিস নে, তুই কেমুন মা! আমার ছাওয়ালের যদি কিছু হয় তোকও বাড়ি ছাড়া করব কয়ে দিলাম।

মর্জিনাও কম যায় না। কথার প্রতিবাদ জানায় সে উল্টো কথার ছুরি দিয়ে—পারো তো খালি আমার উপর রাগ ঝাড়তি। ক্যাঁ, আমার কি কাজকাম নি, রান্নাধুয়া নি, সারাদিন ছাওয়ালের পিছনে ঘুরলি তুমার ভাত রানদে দিবিন কোন বউ!

ছিয়াম এবার ফনা নামায়। বুঝতে পারে এটা ঝগড়ার সময় নয়। ঝগড়ার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। এখন পল্টুকে খোঁজাটাই প্রধান কর্তব্য। পল্টু কোথায় কোথায় যায় আর মর্জিনা কোথায় কোথায় খুঁজেছে জেনে নেয় ছিয়াম। বউয়ের খোঁজা জায়গাগুলোয় সে দ্বিতীয়বার খুঁজতে যায়। কারণ, নারী জাতির কোনো কাজের উপরই তার আস্থা নেই।

বারান্দার খুটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মর্জিনা, অপেক্ষা করছিল স্বামীর, ভালো খবরের। কিন্তু বিধ্বস্ত চেহারায় স্বামীর ফিরে আসা মর্জিনার আশার টিমটিমে বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়। সে ছুটে যায় দেউড়ির মুখে—পাও নি?

ততক্ষণে পাড়ার সবাই জেনে গেছে পল্টুর নিখোঁজ হওয়ার খবর। সমবেদনা জানাতে সবাই ঝাঁক বেঁধে  ছুটে আসে মর্জিনার কাছে। সমবেদনা সকলেই জানায়, কিন্তু সময় নষ্ট করে পল্টুকে খুঁজতে যাওয়া লোকের বড় আকাল। এই দুঃসময়ে, যখন ছিয়াম এবং মর্জিনা দুজনের কারুর মাথাই সচল নেই, কাজ করছে না, তখন বোরালি একটা বুদ্ধির কথা বলে। জনে জনে সবার কাছে জিজ্ঞেস না করে মাইকে ঘোষণা দিয়ে দিলেই পুরো হরিণটানার মানুষ জেনে যাবে ঘটনা আর তাদের কেউ পল্টুকে দেখে থাকলে খবর দেবে ছিয়ামের বাড়ি। কিন্তু মাইক কোনে পাব? আশপাশে তো মাইকির দুকান নি। জিজ্ঞেস করে ছিয়াম। ভিড়ের ভেতর কেউ একজন বলে—মরজিদিই তো মাইক আছে। পোতিদিন পাঁচবার আজান হয় মাইকি।


যেন এতক্ষণও তার পল্টু বেঁচে ছিল। গাঙে জাল নামানোর সাথে সাথে ছেলে তার মারা গেছে।


ছিয়াম তখনই ছোটে মসজিদে, ইমাম সাহেবের কাছে। তিনি যেন অনুগ্রহ করে তার ছেলে হারানোর ঘোষণা মাইকে দিয়ে দেন। ঘোষণা দেয়ার অভ্যাস কিংবা অবস্থা কোনোটাই ছিয়ামের নেই।

ইমাম সাহেব জানায়—মসজিদের মাইকে গরু-ছাগল হারানোর ঘোষণা দেয়া নিষেধ। কমিটির পক্ষ থেকে নিষেধ আছে।

কিন্তু পল্টু তো গরু-ছাগল নয়। পল্টু মানুষ এবং অসুস্থ মানুষ।

হোক মানুষ। কিন্তু ঘোষণাটা তো হবে নিখোঁজ সংবাদের। এই জাতীয় ঘোষণা দেয়া যাবে না।

ততক্ষণে মসজিদের সামনে লোক জড়ো হয়ে গেছে। ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ একজন যুক্তিবাদী মানুষ জানতে চায়—কিন্তু মসজিদের মাইকে তো অনেক রকম ঘোষণাই দেয়া হয়। সরকারের টিকা কর্মসূচির ঘোষণা, কেউ মারা গেলে তার ঘোষণা, গ্রামের মাতব্বরদের মিটিঙের ঘোষণা—সবই তো দেন। এইটা কেন দেবেন না?

আসলে হাদিসে নিষেধ আছে। একবার এক সাহাবি নামাজ শেষে মসজিদে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার উট হারিয়ে গেছে। কেউ পেয়ে থাকলে খোঁজ দিবেন। সেখানে স্বয়ং রসুল সা. ছিলেন। তিনি মসজিদে উট হারানোর ঘোষণা দেয়া অপছন্দ করলেন। বললেন, তোমার উট যেন আর পাওয়া না যায়।

কিন্তু পল্টু তো উট না, মানুষ। অসুস্থ শিশু।

আপনারা মসজিদ কমিটির কাছে যান। কমিটি ইজাজত দিলে আমার ঘোষণা দিতে আপত্তি নেই।

ছিয়াম এতক্ষণ ধৈর্য ধরে শুনছিল কথোপকথন। এতক্ষণে তার ধৈর্যের শিকল ছিঁড়ে গেছে। সে কান্না বিজড়িত গলায় চেঁচিয়ে বলে, ও ভাইরা, আপনেরা বাড়ি যান। আমার মাইকির দরকার নি। আর অনুরোধ করেন না উনারে। আমার ছাওয়ালেক আমি একাই খোঁজব। কারুর দরকার নি। মরজিদির মাইক আমার লাগবিনানে।

ইমাম সাহেব ছিয়ামের হাত ধরে—আপনি আমারে ভুল বুঝবেন না। আমার উপর অডার আছে। আমি অপারগ। ছিয়ামের হাত ছেড়ে দিয়ে জোহরের আজান দিতে ইমাম সাহেব মসজিদে ঢোকে।

দুপুর বিকেলের গায়ে হেলান দিলে এলাকার কয়েকজন যুবক কালী গাঙে জাল ফেলে পল্টুকে খোঁজার উদ্যোগ নেয়। হরিণটানার কোথাও যেহেতু তাকে পাওয়া যায় নি, এবং পানি দেখলে সে লাফিয়ে পড়তে চায়; অতএব সবার ধারণা পল্টু পানিতেই ডুবেছে। যুবকেরা জাল ফেলে। ছিয়াম মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে নদীতীরে। মর্জিনা এতক্ষণ বেশ চুপচাপই ছিল। কিন্তু গাঙে জাল ফেলতে দেখেই সে আছাড়ি-বিছাড়ি কান্না শুরু করে। যেন এতক্ষণও তার পল্টু বেঁচে ছিল। গাঙে জাল নামানোর সাথে সাথে ছেলে তার মারা গেছে।

খবর পেয়েই ছুটে এসেছে নবিসন বুড়ি, পাশের গ্রাম বেলঘরিয়া থেকে। যে কিনা একাধারে পল্টুর নানি আবার মর্জিনার মা। একই সাথে তার দুই শোক। নাতির জন্য এক শোক। আরেক শোক তার মেয়ের জন্য। দ্বিগুণ শোকের কারণেই হয়তো নবিসন বুড়ির চামড়া কুচকানো গালের এবড়ো-থেবড়ো জমিনে আটকে যায় না চোখের জল। বরং তা ছোট ছোট ঢেউ তৈরি করে ক্রমাগত নিচের দিকে নামতে থাকে। সেই গাল ভাসানো কান্নার ভেতরেই নবিসন বুড়ি নদীতীর থেকে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ঘরে তোলে। কারণ, হারানো সন্তান খোঁজা জাল বাহ্যিক চোখে দেখা যায় পানিতে পড়ছে বটে। আসলে পানিতে পড়ে না। পড়ে মায়ের কলিজার উপর। এই দৃশ্য কোনো মায়ের পক্ষেই হজম করা সহজ নয়।

যুবকদের জালটানা অভিযানও ব্যর্থ হয়। পল্টুকে পাওয়া যায় না। মর্জিনা এবার একটু প্রসন্ন হয়ে ওঠে। তার মনে হয়, পল্টু জলে ডোবে নি। সে হাঁটতে হাঁটতে দূরে কোথাও চলে গেছে। আজ হোক বা কাল, নিশ্চয় তাকে পাওয়া যাবে। মর্জিনার মনে তখন নতুন ভাবনা উদয় হয়। সকাল থেকে না খাওয়া রয়েছে পল্টু। যখন পাওয়া যাবে তাকে, নিশ্চয় খুব ক্ষুধার্ত থাকবে। তার জন্য তো খাবার রেডি রাখতে হবে ঘরে। মর্জিনা মায়ের কাছে বলে, মা, ইট্টু যাও রানদো না! পল্টুর যাও খুব পছন্দ। সেই সকালে বারাইছে ছাওয়ালডা। না জানি কত খিদে লাগেছে ওর! বাড়ি আসলিই যাতে থাল ভরে যাও দিয়া যায় ওর সামনে, তুমি এক হাঁড়ি যাও রানদো না মা!

নবিসন বুড়ি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, তুই শুয়ে থাক। আমি যাও রানছি।

নবিসন বুড়ি যাও রান্নার উপাদান গুছিয়ে চুলার পিঠে বসে। মর্জিনা শুয়ে থাকতে পারে না। বিছানায় যেন সজারুর কাঁটা। এপাশ-ওপাশ করে সে মায়ের রান্নার কাছে যায়। মা, লাভলি কি বাড়িত আছে?

বিয়ের আগে লাভলিদের বাড়ি কাজ করত মর্জিনা। একই গ্রামে পাশাপাশি বাড়ি দুজনের। মর্জিনা লাভলিদের কাজের মেয়ে হলেও লাভলি ছিল তার বান্ধবীর মতো। মর্জিনার গায়ের কালো রঙ নিয়ে মাঝে মাঝে খোঁচা দিত লাভলি। মর্জিনার কষ্ট লাগত। কখনো মজাও পেত। তখন পর্যন্ত সে জানত, গরিব ঘরের মেয়ের গায়ের রঙ কালো হওয়াটাই নিয়ম। কলেজ পাশ করার পর ঢাকায় চাকরি করা এক সুন্দর ছেলের সাথে লাভলির বিয়ে হয়ে যায়। এখন স্বামীর সাথে সে ঢাকাই থাকে। সন্তান হবে উপলক্ষে কিছুদিন ধরে সে বাবার বাড়িতে আছে। গতমাসে বাপের বাড়ি গিয়েছিল মর্জিনা। নবিসন বুড়ির হঠাৎ অসুস্থতার খবর শুনে এক বেলার জন্য একাই ছুটে গিয়েছিল সে। তারপর হঠাৎ করেই লাভলির সাথে দেখা। অনেক বছর পরের দেখা বলেই হয়তো গল্পরা ছুটাছুটি করছিল বুকের ভেতর। কিন্তু বেশি কথা বলতে পারে নি মর্জিনা। লাভলি আগের থেকে আরো সুন্দর হয়েছে। মাতৃত্বের সুধা সেই সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। লাভলিকে তার কেমন অচেনা লাগছিল। কথা প্রসঙ্গে পল্টুর কথা জিজ্ঞেস করেছিল লাভলি। মর্জিনা লজ্জায় নুয়ে পড়েছিল পুঁইয়ের ডগার মতো। কিন্তু লাভলি যখন বলল, তোর ছেলেও নিশ্চয় তোর মতোই কালো, তখন সে আর পুঁইয়ের ডগা থাকে নি। বটের মতো মাথা তুলে প্রতিবাদ করেছিল। বলেছিল, পল্টু খুপ সোন্দর, পাকা চালকুমড়োর চামড়ার মতো ফসসা। লাভলি চোখ উল্টে বলেছিল, যাহ! তোর পেটের ছেলে অত ফর্সা কিভাবে হয়! মর্জিনার তখন খুব রাগ হয়েছিল। আফসোসও হচ্ছিল শতগুণকেন সে পল্টুকে রেখে একাই বাপের বাড়িতে এসেছে। ছাওয়ালডা সাথে থাকলে হাতেনাতে সে প্রমাণ দিতে পারত। তার জিদ চেপে গিয়েছিল। তখনই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলকিছুদিনের ভেতরেই সে আবার বাপের বাড়িতে আসবে। একা নয়, পল্টুকে সাথে নিয়ে আসবে। লাভলিকে দেখিয়ে ছাড়বে কালোর পেটেও ফসসা ছাওয়াল হতে পারে। মানুষের রঙ নিয়ে তাচ্ছিল্য করার মজা সে দেখাবে। কিন্তু সেই পল্টুই তো হারিয়ে গেছে। তাকে ফিরে পাওয়া না গেলে কিভাবে সে প্রমাণ করবে পল্টু পাকা চালকুমড়োর চামড়ার মতো ফসসা!

নবিসন বুড়ি জানায়লাভলি এখনো তার বাপের বাড়িতেই আছে। সন্তান হওয়া পর্যন্ত সে মায়ের কাছেই থাকবে।

মর্জিনা দোয়া করেপল্টুকে যেন শিগগির ফিরে পাওয়া যায়। লাভলির কথার প্রতিবাদের জন্য হলেও পল্টুর ফিরে আসা দরকার।


এক কান দুই কান হতে হতে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামে। অতঃপর সবার গন্তব্য হয় হাশমতের কাঁঠাল বাগান।


সে রাতে ছিয়াম, মর্জিনা কিংবা নবিসন বুড়ি কারোরই ঘুম হয় না। ছিয়াম অর্ধরাত পর্যন্ত বারান্দায় বসে থাকে। মর্জিনা মাঝে মাঝে বিলাপ করে ওঠে। নবিসন একবার মেয়ের কাছে একবার জামাইর কাছে গিয়ে বৃথা সান্ত্বনা দেয়। পল্টুর জন্য রান্না করা যাও হাঁড়ির তলায় পড়ে থাকে। মর্জিনা স্বামীর কাছে এসে বলে, একটা মাইক ভাড়া করে কয়েক গিরামে মাইকিং কল্লি হতো না? হতি পারে মানিক আমার অন্য গাঁয় চলে গেছে।

কিন্তু কাছেকোলে তো মাইক ভাড়া দিয়া দুকান নি। শ্যাকপাড়া বাজারেরতে আনা লাগবি। খরচও মনে কয় ম্যালা পড়বিনি। তাও দেখি, সকাল হোক, শ্যাকপাড়ারতেই মাইক আনব।

পয়সা খরচ করে মাইক ভাড়া করতে হয় না ছিয়ামের। পরদিন সকাল সোয়া আটটায় পল্টুকে পাওয়া যায় হাশমতের কাঁঠাল বাগানে। ছাগলের পাতা পাড়ার জন্য কাঁঠাল গাছে উঠেছিল হাশমত। দেখে, গাছের ঝুপড়ির মধ্যে, তিন ডালের ফাঁকে আটকে আছে পল্টু। প্রথমে ভেবেছিল বড় আকারের কোনো মরা চিল। কৌতূহলী হাশমত আরেকটু কাছে যেতেই বুঝতে পারে, চিল নয়, ডালের ফাঁকে আটকে আছে ছিয়ামের ছাওয়াল পল্টু। থমথমে সকালের এই ঘটনা। কাঁঠাল বাগানে হাশমত একা। তার গা ছমছম করে ওঠে। ভয় পেয়ে সে লাফ দিয়ে নেমে ছুটে আসে লোকলয়ে। এক কান দুই কান হতে হতে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামে। অতঃপর সবার গন্তব্য হয় হাশমতের কাঁঠাল বাগান।

ছিয়াম লাফ দিয়ে গাছে উঠতে গেলে অন্যরা তাকে থামিয়ে দেয়। যুবকেরা, গতকাল যারা গাঙে জাল টেনেছিল তাদের দুইজন গাছে ওঠে। লাশের কাছে যেতেই প্রথম যুবক নাকে হাত দিলে অপেক্ষমাণ গ্রামবাসী বুঝে যায় পল্টু বেঁচে নেই। তার লাশ ইতোমধ্যে পচা শুরু করেছে। সেই দৃশ্য দেখে ‘ও আমার পল্টুরে’ বলে ছিয়াম চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। মর্জিনা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যুবকেরা ধরাধরি করে লাশ নামায় গাছ থেকে। ছিয়াম পল্টুর শরীরখানা নিতে চাইলে কেউ তার হাতে দেয়ার সাহস পায় না। লাশ নিয়ে যুবকেরা ছিয়ামের বাড়ির দিকে যাত্রা করে। মহিলারা মর্জিনাকে আর পুরুষেরা ছিয়ামকে ধরাধরি করে হাঁটতে থাকে। তখন মসজিদের মাইকে ইমাম সাহেবের গলা শোনা যায় : একটি শোক সংবাদ! একটি শোক সংবাদ!! হরিণটানা গ্রামের পূর্বপাড়ার ছিয়াম মিয়ার ছেলে ইন্তেকাল করিয়াছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ —
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)