হোম গদ্য গল্প নাচের পুতুল

নাচের পুতুল

নাচের পুতুল
145
0

১.
টুকু বলে, জামায় নাকফুল লেগে তার নাক কেটে গেছে। অঘ্রান মাসের দুপুর। বাইরে আম-বউল রং রোদ।

বীরু সামনের রুমে সোফায় বসে বই পড়ছিল। বলে, নাকফুল জামায় কেমনে লাগল?

জামা খুলতে গিয়ে গলার এমবোটারি কাজের সুতা লাগে নাকফুলে। তাতেই নাকফুলে টান খেয়ে নাক কেটে গেছে। বলে টুকু।

টুকুর নাকের ডান পাশ টান খাওয়ায় লালচে। বীরু ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে। টুকুর নাকে লাগায়। ঠান্ডা ছোঁয়ায় টুকুর গা শিরশির করে ওঠে। বীরু নাকফুল খুলে নেয়। খালি নাকে বরফ চেপে ধরে।

ব্যালকনির পাশের জামগাছের পাতা হাওয়ায় ওড়ে।

বরফের হিম লাগিয়ে বীরু পকেট থেকে টিস্যু বের করে। শেফালি ফুলের ঘ্রাণ। টিস্যু দিয়ে নাক মুছে দেয়। টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো চোখ কেড়ে নেওয়া নাক তার। বীরু নাকের ডগা আঙুলে আলতো ছোঁয়। টুকু পুরো চোখ মেলে তার দিকে চায়।


বীরু উঠে গেলে টুকু এবার টুবলার হাত ধরে। বলে, আমার গা গরম। অমনোযোগের ভেতরও বীরুর চোখে পড়ে


বীরু দেখে তার নাকফুলটা পুরনো হয়ে গেছে। পেছনের পুস পড়ে গেছে। টুকুর নাক মুছে দিয়ে আবার নাকফুল পরিয়ে দেয় সে। কিন্তু মনের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তি খচখচ করে। এ নাকফুলটা আড়ং থেকে কিনেছিল সে।

বীরু টুকুকে বলে, আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।

টুকু বলে, এখন আবার বাইরে কেন? বাইরে বাঘের চোখের মতো লাল রোদ। তোমাকে গিলে খাবে।

বীরু টুকুর কথা শুনে হাসে। বলে, যাব আর আসব। এক পাতা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ কিনে চলে আসব। একটু আগে টুকুর কাছে ওষুধ চেয়েছিল। টুকু দিতে পারে নি।

টুকু বলে, যাও, তাড়াতাড়ি এসো।

ঘর থেকে বেরিয়ে বীরু যায় জুয়েলারি দোকানে। ছোট এক পাথরের নাকফুল খোঁজে। টুকুর ছোট নাকফুল পছন্দ। খুঁজে পেতে ঘামের উপর রোদের চিকচিকের মতো এক পাথরের নাকফুল খুঁজে পায়। নাকফুল নিয়ে ঘরে এলে দেখে, টুকু সোফায় বসে আছে মুখ ফুলিয়ে। বীরু বলে, একটু দেরি হয়ে গেল।

টুকু তাকে নিয়ে ব্যালকনিতে যায়। টবে ক্যাকটাসের গোলাপি ফুল দেখায়। দুটো ফুল পাশাপাশি ফুটে আছে।

বীরু একবার ক্যাকটাস, একবার টুকুর মুখের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে নাকফুলটা বের করে টুকুর ডান হাতের তালুতে দেয়। টুকু বীরুর দিকে চোখ লাল করে তাকায়। বলে, তোমাকে কে বলেছে নাকফুল আনতে?

বীরু হাসে। বলে, তোমার নাকফুল ভেঙে গেছে। নাকফুলই বলে দিল আরেকটা আনতে।

ভেতরের ঘরে গিয়ে টুকু পুরনো নাকফুল খুলে নতুন নাকফুল পরে। পাশে এসে বীরু দাঁড়ায়। নাকফুল পরতে পরতে টুকু বলে, আজ টুবলা ফোন করেছিল।

বীরুর হাসিখুশি মুখ কালো হয়ে যায়।

২.
কলকাতা এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে বসলে সবার আগে চোখে পড়ে লাল কৃষ্ণচূড়া। টুকু যাচ্ছে চিকিৎসা করাতে। সাথে বীরু। টুকুর সাথে আরো আছে টুবলা। টুকুর দূর সম্পর্কের ভাই। টুকুর দুপাশে দুজন বসে আছে। ডান পাশে বীরু, বাম পাশে টুবলা।

টুকুর গায়ে জ্বর। বীরুকে টুকু কপালে হাত দিতে বলে। বীরু দেখে গায়ে জ্বর। বীরু হাঁটতে বের হয়। কলকাতা এয়ারপোর্ট তার কাছে নতুন।

বীরু উঠে গেলে টুকু এবার টুবলার হাত ধরে। বলে, আমার গা গরম। অমনোযোগের ভেতরও বীরুর চোখে পড়ে টুকু তার ভাই টুবলার হাত ধরে আছে।

বীরুর মন খারাপ হয়। বীরু নিজেও জানে না তার কেন মন খারাপ। তার কেবল মনে পড়ে, বাংলাদশ থেকে প্লেনে উঠার সময়ও টুকু টুবলার হাত ধরেছে।

তার মনে পড়ে, আসবার আগের দিন ভোরবেলা টুকু তার পাশে সোফায় এসে বসেছিল। অনেক ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বীরুর। শেষ রাতে বৃষ্টি ছিল। বসবার ঘরের জানলার একপাট ছিল খোলা। তাতে বিদ্যুৎ চমকের আলো এসে চোখে লাগলে ঘুম ভেঙে যায়। বীরু বিছানা ছেড়ে সোফায় এসে বসে।

টুকু আসে আরো পরে। তখন ভোরের আলো ভালো করে ফুটেছে। এসে বীরুর পাশে সোফায় বসে। তখনো বাইরে বৃষ্টি, হাওয়া। বসবার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে মেঘ দেখা যাচ্ছে।

টুকু পাশে বসলে বীরু বলে, ডাক্তার দেখাতে চেন্নাই গেলে তুমি সুযোগ পেলে আমার হাত ধরো।

বীরুর কথাটা মনে পড়ে। বীরু চায় টুকু তার হাতটা ধরুক। সে কলকাতা এয়ারপোর্টে হেঁটে হেঁটে খাবারের দোকান দেখে। টয়লেটে যায়। ফিরে এসে পাশে না বসে টুকুর সামনে বসে।

টুকু বীরুর পাশে এসে হাত ঘেঁষে বসে। বীরু হাত সরিয়ে নেয়। টুকু বলে, হাত সরিয়ে নিলে কেন?

বীরু বলে, খেয়াল করি নি। মিথ্যা বলতে তার কষ্ট হয়।

কলকাতা এয়ারপোর্টে নানা রঙের যাত্রী দেখে সে। তাদের প্লেন ৮.৫০-এ। বিশতারা এয়ারওয়েজ। এখন সবে বিকেল। টুবলা বীরুর পাশে এসে দাঁড়ায়। সে বীরুর প্রায় দশ বছরের ছোট। বলে, চলেন কিছু কিনি। দুপুরে সামান্য খাওয়া হয়েছে। ময়দার হালুয়া আর বন।

বীরু উঠে দাঁড়ায়। বলে, চলেন। একদম শেষ মাথায় গিয়ে তারা আলু পরোটা আর চিকেন কেনে।

তাদের পেছন পেছন আসে টুকু। টুকু বলে, দুটো পানিও নিও। খাবার প্যাকেট করতে করতে তারা টেবিলে এসে বসে। টুকুর দু পাশে টুবলা আর বীরু। বীরুর মুখে কালো মেঘের ছায়া। টুকুকে সে বুঝতে পারছে না। তার চোখে বিভ্রম। টুকুর শরীর খারাপ। পেটে ব্যথা। খেলেই বমি করে ফেলে।

বীরু ভাবে, হয়তো অসুখের জন্য এ বিভ্রম।


টুবলাকে টুকুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বীরু। বীরু তখন চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করছে। মেঘনার পাশে ভৈরব থেকে কয়লা কিনতে গিয়ে পরিচয় তার সাথে। বীরুদের পাশের গ্রামে বাড়ি। টুবলাও গিয়েছিল কয়লা কিনতে। সুনামগঞ্জ থেকে নৌকায় কয়লা আসে ভৈরবে। সেখান থেকে ট্রাকে সারা দেশে যায়।

বীরুর সাথে সেবারের পরিচয়ের পর টুবলা তাকে জমি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। বীরুর হাতে তখন একর একর জমি। টুবলা তার এক পরিচিতজনের জন্য জমি খুঁজছিল। চটপটে হিসাবি ছেলেটাকে তার ভালো লাগে।

বীরু ভাবে, এ ছেলের কাছে জমি বেচবে সে। বীরুর হাতে জমি থাকলেও তাতে একটা কারখানা হওয়ার মতো জমি নেই। টুবলা বলে, আসেন আমরা একসাথে কাজ করি। টুবলার পরিচিতজনকে বীরুও চেনে। টুবলা বীরুর কথা বললে কারখানা মালিক বীরুকে পর দিন ফোন দেয়। তিনি আছেন লন্ডনে। মালিকের নাম জিবরান। চাকরির শুরুর দিকে জিবরান ব্যবসা করত বীরুদের কারখানায়। বীরু তখন ছোট অফিসার। মাত্র চাকরিতে ঢুকেছে। বহুদিন জিবরান আড্ডা মেরেছে বীরুর চেয়ারের সামনে।


সেই টুবলা ফোন করেছে শুনে বীরু মুখ কালো করে ফেলে। বীরুর মুখ কালো করা টুকুর চোখ এড়ায় না।


জিবরান ফোন করে বলে, জমি যদি আপনার থাকে, আমি কারখানা করব ওখানে। আপনি বাকি জমি জোগাড় করার দায়িত্ব নেন। টুবলা বলে, কোনো ভয় নাই। আমি দায়িত্ব নিলাম বাকি জমি জোগাড়ের। আপনি থাকলে চলবে।

এভাবেই বীরুর সাথে টুবলা জড়িয়ে যায়। বীরু থাকে দূরে। টুবলাকে নিয়ে টুকুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কোনো বিপদ হলে যাতে টুকুর বাসায় আসতে পারে।


কলকাতা থেকে চেন্নাইয়ের বিমানে উঠলে টুবলা আর টুকুর সিট পড়ে পাশাপাশি। বীরু পেছনে। টুকু টুবলার পাশে বসে।

বীরু পেছনে একা বসে মন খারাপ করে। দেশ থেকে আসার সময় বীরু টুবলাকে সাথে আনতে চায় নি। সে চাইছিল, টুকুর শরীর খারাপ, তাকে একাই সে ডাক্তার দেখিয়ে আনবে।

সে রকম ভিসাও করে নিয়েছিল। পরে টুবলা বলে, আপনারা যাচ্ছেন যখন, আমিও গিয়ে চেকআপ করিয়ে আসি।

বীরু সরাসরি না বলতে পারে নি। তারপরও বলেছিল, আগে আমি গিয়ে দেখি আপনার আপার সব ঠিক আছে কি না। আপনি পরে আইসেন। এদিকে জমির ঝামেলা। বীরুর চাকরিতেও তখন চাপ।

টুকুর বাসায় টুবলা তখন প্রতিদিন যায়। প্রায় দুপুরে খায়। যাওয়ার আগে আগে টুকু বলে, টুবলাও তাদের সাথে যাবে। বীরু বলে, তার ভিসা তো হয় নি। টুকু বলে, ভিসা সে কাল পেয়ে যাবে। বীরুর কপালে ভাঁজ পড়ে।

ফোনে টুকু বীরুর চেহারা দেখে না। টুকু বলে, গেলে আমরা সবাই একসাথে যাব।

বীরু কিছু না বলে ফোন রেখে দেয়। সে একবার ভাবে, সে যাবে, আবার ভাবে যাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাবে ঠিক করে। টুকুর অসুখ। তার মন টুকুর সাথে যেতে না করতে পারে না।

সেই টুবলা ফোন করেছে শুনে বীরু মুখ কালো করে ফেলে। বীরুর মুখ কালো করা টুকুর চোখ এড়ায় না। সে হেসে ফেলে। বলে, কালো মুখের দরকার নাই। হাসো। আমি তার ফোন ধরি নাই।

বাইরে তখন টুকুর হাসির মতো উজ্জ্বল রোদ।

শোয়ায়েব মুহামদ

জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯৭৬; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশা হিশেবে বসায়ন শিল্পসংস্থায় চাকরি করছেন।

প্রকাশিত বই—
ঘুড়িযাত্রা [পাঠসূত্র, ২০১৫]

ই মেইল : mohammed.shoayeb@gmail.com

Latest posts by শোয়ায়েব মুহামদ (see all)