হোম গদ্য গল্প দ্য লাস্ট রাইড টুগেদার

দ্য লাস্ট রাইড টুগেদার

দ্য লাস্ট রাইড টুগেদার
415
0

বসন্তকাল। ঝিরঝির করে বাতাস বইছে। সূর্য মধ্যগগনে কিন্তু উত্তাপ তেমন একটা নেই। রিনি তাদের ছয় তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক জোড়া চড়ুইয়ের কাণ্ড দেখছিল। চড়ুই দুটো ওদের ফ্ল্যাটের বিপরীত দিকের একটা অ্যাপার্টমেন্টের কার্নিশে বসে সঙ্গম করছিল। সঙ্গম করছিল অবিরাম, ক্লান্তিহীনভাবে। রিনি মনে মনে বলছিল, ‘উফ, পারেও!’ রিনি রহমান সাহেবের বড় মেয়ে। ভার্সিটিতে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। রহমান সাহেব আর তার স্ত্রী জান্নাত দুজনেই ব্যাংকার। বাড়ি ফিরেন সন্ধ্যায়। আর তাদের ছোট মেয়ে রিমা স্কুল থেকে ফিরে বিকেল পাঁচটা নাগাদ। এই সময়টা রিনি একাই বাসায় থাকে। এই সময়টাতেই সে ফাহিমকে তাদের বাসায় আসতে বলেছে। সে ফাহিমকে মাঝে মাঝে এই সময়টাতেই তাদের বাসায় আসতে বলে। যেদিন ফাহিমকে আসতে বলে সেদিন তার মনে উত্তেজনা থাকে। ফাহিমের সাথে ওর প্রেমের সম্পর্ক বছর তিনেক। সে যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখন থেকেই।

সে ব্যালকনি থেকে তার রুমে ঢুকে ছোট্ট বেতের সোফাটায় বসল। এই রুমে আছে একটি বক্সখাট। খাটের বিপরীতে আছে সোফার পাশে একটি ড্রেসিং টেবিল। ওর উপর আছে একটি মেকাপবক্স চিরুনি এবং রিনির সমস্ত সাজবার জিনিস। খাটের পায়ের দিকে আছে একটি ওয়ার্ডরোব যার উপর আছে ওর ছবি লাগানো একটি ছবির ফ্রেম। আর কিছু বই-পুস্তক। দেয়ালে ঝুলছে একটি ডিজিটাল ঘড়ি। খাটের পাশে জানালা। এর উপর দেয়ালে ফিট করা আছে এসি। রুমের মাঝখানে ছাদে ঝুলছে একটি ফ্যান। কিন্তু এটা খুব কমই ঘুরে।

তিনটা বাজে ফাহিমের আসার কথা। তিনটা পনেরো হয়ে গেছে এখনো ওর কোনো খবর নেই। সে সব সময় দেরি করে। রিনির বিরক্ত লাগছে। ঠিক এমন সময় কলিং বেল বাজল। রিনি দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ফাহিম। একটি ফেইড জিন্স আর একটি শার্ট পরা। শার্টের আস্তিন কনুই পর্যন্ত গুটানো। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। রিনি ফাহিমকে ভেতরে আসতে বলল। রিনি পড়ে আছে একটি সিল্কের থ্রিপিস। ওড়না নেই। বুক উঁচু হয়ে আছে।


আশরাফ ওর বন্ধু। সুইসাইড করেছিল। ভালো কবিতা লিখত। কিন্তু কেন সুইসাইড করেছিল তা জানা যায় নাই। 


ফাহিম ভেতরে ঢুকে স্যান্ডেল খুলেই রিনিকে জাপটে ধরল। ঠোঁটে চুমু খেতে লাগল। চুমু খেতে খেতে রিনি ওকে নিজের রুমে নিয়ে এল। ফাহিম শার্ট খুলে ফেলল। রিনি খুলল কামিজ। ফাহিমের আর তর সইছে না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল রিনির উপর।

২.
রিনির জন্য বিয়ের পাত্র আসত সেই সেকেন্ড ইয়ার থেকেই। আগে সে বলত, ‘আগে পড়াশোনা শেষ করে নেই।’ কিন্তু এখন বলে যে সে ফাহিমকে বিয়ে করবে।

তার মা বলে, ‘কিন্তু ওই ছেলের তো চাল-চুলো কিচ্ছু নেই। চাকরি করে একটা অখ্যাত পত্রিকা অফিসে। তোমাকে খাওয়াবে কী?’

সে বলে, ‘ভালো চাকরি একটা পেয়ে যাবে, মা।’

তার বাবা মা দু’জনেই চিন্তিত। কিন্তু তারা দমে নেই। পাত্র এলেই রিনিকে গিয়ে পাত্রের কথা বলতে থাকেন। এবারও একটি পাত্র এসেছে। পাত্র পুলিশ কর্মকর্তা। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে দু’টো ফ্ল্যাটও পেয়েছে। রিনিকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন যে এমন ভালো পাত্র সহজে পাওয়া যায় না। রিনিকে বললেন, ‘একটু ভেবে দেখ, মা।’ রিনি কয়েকদিন ভাবল। তারপর দুম করে রাজি হয়ে গেল। সে এত সহজে রাজি হয়ে যাবে এটা তারা ভাবে নি। তাই তারা একটু অবাক হলেন। অবাক তার বন্ধু-বান্ধবও হয়েছিল। আর অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিল ফাহিম। তার কোনো মতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে রিনি এমন কাজ করতে পারে। কিন্তু রিনি সেটাই করেছিল। ফাহিমকে বলেছিল, ‘সরি ফাহিম। আমি আমার বাবা-মার মনে কষ্ট দিতে পারব না।’ দুমদাম করে বিয়ে হয়ে গেল একদিন। ফাহিমকে দাওয়াত করেছিল। কিন্তু ফাহিম যায় নি।

৩.
কয়েক সপ্তাহ পর ফাহিম বসে আছে তার বন্ধু মুরাদদের নয় তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ছাদে একটি চেয়ারে। মুখোমুখি বসে আছে মুরাদ আরেকটি চেয়ারে। তাদের বাসায় যখন কেউ থাকে না তখন সে মাঝে মাঝে ফাহিমকে ডেকে এনে একসঙ্গে বিয়ার খায়। আজ বাসায় কেউ নেই। সবাই গেছে তার খালাত বোনের বিয়েতে ওর খালার বাসায়। ওরা দু’দিন ওই বাসাতেই থাকবে। বাসা খালি। তাই ফাহিম এসেছে। সে আজ রাতে ওদের গেস্ট রুমে ঘুমাবে। মুরাদ কাল যাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে। ছাদের চারিদিকে বাউন্ডারি দেয়াল। দুই কোনায় চারটি করে চেয়ার ও একটি করে টেবিল পাতা আছে। ছাদের ঠিক মাঝখানে জ্বলছে একটি বাতি।

এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট দালান-কোঠা ভেজা ভেজা। তারগাছের আলোয় গলির শেষ প্রান্তে যে দেবদারু গাছটা আছে তার পাতা চকচক করছিল। বিবাগী বাতাসেরা ছুটাছুটি করছিল এদিক-সেদিক। বিষণ্ন চাঁদ বেরিয়ে এল মেঘের আড়াল থেকে। নক্ষত্রদের মন ভালো নেই। তাই তারা লুকিয়ে আছে মেঘের আড়ালে। ওরা দু’জনে বিয়ার খাচ্ছিল। দুজনের মাঝখানে যে ছোট টি টেবিলটা আছে তাতে আছে কাবাব আর পরোটাসহ দুটো প্লেট। মুরাদ বিয়ারের কৌটায় চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘যা হবার তা হয়েছে। সব ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করো বন্ধু।’ ফাহিম কিছু বলছে না। নীরবে বিয়ারের কৌটায় চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। সে কী যেন ভাবছে। তার কাছে সবকিছু শূন্য শূন্য মনে হয়। মনে হয় সে যেন বিরাট কেনোকিছু হারিয়ে ফেলেছে। নিজেকে নিঃস্ব, কপর্দকহীন মনে হয়। মাঝে মাঝে তার অস্থির লাগে।

মুরাদটা টানে তাড়াতাড়ি। এগারোটা বাজতেই দু’টো কৌটা শেষ করে ফেলল। তার নেশা ধরে গেছে। আর নেশা ধরে গেলে ওর ভীষণ ঘুম পায়। তাই সে বলল, ‘আমার হয়ে গেছে। আমি চললাম। তুই শেষ করে চলে আসিস।’ বলে সে বাসায় গিয়ে নিজের রুমে ঢুকে শুয়ে পড়ল। ফাহিম মাত্র দ্বিতীয় কৌটায় চুমুক দিচ্ছে। আকাশে চলছে চাঁদের লুকোচুরি খেলা। সে এখন একা। সে যখন একা থাকে তখন তাকে আশরাফের সাথে কথা বলতে দেখা যায় প্রায়ই। আশরাফ ওর বন্ধু। সুইসাইড করেছিল। ভালো কবিতা লিখত। কিন্তু কেন সুইসাইড করেছিল তা জানা যায় নাই। হয়তো মাঝরাতে উটের গ্রীবার মতো গলা এসে কানে কানে বলেছিল কিছু কথা। কিন্তু কী কথা বলেছিল তা কেউ বলতে পারে না। আশরাফের গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি। সে কবিতা পড়ছে ফাহিমের পাশের চেয়ারে বসে। আর ফাহিম শুনছে । আশরাফ আবৃত্তি করছে—

Let us go hence, my songs; she will not hear.
Let us go hence together without fear;
Keep silence now, for singing time is over,
And over all old things and all things dear.
She loves not you nor me as all we love her.
Yea, though we sang as angels in her ear,
She would not hear.

ফাহিম শুনছে আর বিয়ারের কৌটায় চুমুক দিচ্ছে।

৪.
সূর্য প্রখরভাবে আলো দিচ্ছে। হালকা বাতাস আছে। শহরের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। গলির ভিতরে রিকশা টুংটাং শব্দ করে চলে যাচ্ছে মূল সড়কের দিকে। ফাহিম ঘুম থেকে উঠে দেখে তার ডান হাত ব্যথায় অবশ হয়ে আছে। সে আর সাদেক ভাই মিলে এই বাসায় থাকে। সাদেক ভাই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। তার পরিবার থাকে গ্রামে। ফাহিমের ঘরে আসবাবপত্র বলতে একটি সিঙ্গেল খাট, একটি আলনা ও একটি চেয়ারসহ পড়ার টেবিল। সে ভাবল বেকায়দায় শোয়ার কারণে এমনটা ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে যাবে। বিকেল হয়ে গেল কিন্তু হাত ঠিক হলো না। তাই সে সন্ধের পর ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার ওষুধ দিল আর বলল কিছু পরীক্ষা করাতে। সে পরীক্ষাগুলো করে রিপোর্ট নিয়ে আবার ডাক্তারের কাছে গেল। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার গম্ভীর হয়ে গেলেন এবং বললেন আরে দু’একটি পরীক্ষা একটি বিশেষ হাসপাতালে করাতে। কিন্তু সেই বিশেষ হাসপাতাল তো ক্যান্সার রোগীদের জন্য। তাই ফাহিমের মনে একটু সন্দেহ হলো। তবে কি ডাক্তার ক্যান্সার সন্দেহ করছেন? যাই হোক ফাহিম সেই বিশেষ হাসপাতালে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আবার ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার প্রথমে বলতে চায় নি। পরে যখন জানল যে ঢাকায় ওর কোনো অভিভাবক নেই তখন ওকেই সব কথা বলল। ওর বোন ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তারের কথা শুনে ফাহিম একটুও বিচলিত হলো না, চিন্তিত হলো না। মৃত্যুকে ও ভয় পায় না। বলল শুধু, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’


আজ জীবনের সমান দীর্ঘ চুমুক দিবে। রিনিকে আজ সে নিঃস্ব, রিক্ত করে দিয়ে যাবে। আজকের আনন্দকে সে করে ফেলবে শাশ্বত, চিরন্তন।


ডাক্তার বলেছে তাড়াতাড়ি ক্যামোথেরাপি শুরু করতে। কিন্তু ফাহিমের কোনো তাড়া নেই। তাছাড়া ওগুলো করতে অনেক পয়সা লাগে। সে অত পয়সা পাবে কোত্থেকে। তাই তার কোনো গরজ নেই। যা হবার হবে। ওসব ভাববার সময় নেই। সে এখন অন্য কিছু ভাবছে। রিনির কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সে-সব দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। রিনি তার স্বামীসহ ওদের মগবাজারের ফ্ল্যাটে থাকে। একদিন মোবাইলটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রিনিকে কল দিয়ে ফেলল। আর বলল, ‘শেষবারের মতো আরেকবার।’

রিনি বলল, ‘এখন আমি অন্যের বিবাহিতা স্ত্রী। সম্ভব না।’

‘শুনেছ বোধহয় যে আমার…’

‘হ্যাঁ, শুনেছি। মুরাদ ভাইয়ের কাছে শুনেছি। তোমার জন্য আমি সরি ফিল করি। কিন্তু আমি কিছু করতে পারছি না। সরি।’ বলে ফোন রেখে দিল। পরদিন ফাহিম আবার ফোন দিল। এবার রিনি মানা করল না। কী যেন ভাবল। বলল, ‘শেষবার তো?’

ফাহিম বলল, ‘হ্যাঁ শেষবার।’

‘ঠিক আছে। বুধবার বিকেল তিনটায়। ওইদিন আমি আমার মা’র বাড়িতে থাকব।’

বুধবার বিকেল ঠিক তিনটায় ফাহিম গিয়ে হাজির হলো রিনির বাবার ফ্ল্যাটে। আজ সে একটুও দেরি করল না। তার পরনে একটি টি-শার্ট ও জিন্স প্যান্ট। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। রিনি পরে আছে একটি ম্যাক্সি। আজ ফাহিম খুবই ধীর স্থির। সে সবকিছুই করছে খুব ধীরে ধীরে, আস্তে আস্তে। আজ সে রিনির সমস্ত থেকে নিংড়ে নিবে আনন্দ, উদ্দীপনা, বেঁচে থাকার সুখ, সমস্ত কামনা। সে আজ জীবনের সমান দীর্ঘ চুমুক দিবে। রিনিকে আজ সে নিঃস্ব, রিক্ত করে দিয়ে যাবে। আজকের আনন্দকে সে করে ফেলবে শাশ্বত, চিরন্তন। অনন্তকাল ধরে সে ভোগ করতে থাকবে এই সুখ। তাই সে তাড়াহুড়ো করছে না। রিনি কাছে আসতেই সে ধীরে, অতি ধীরে মুখ গুজল রিনির গভীরে।

‘কামসূত্র’ ছবিতে দেখা একটি বিশেষ ভঙ্গিকে বাস্তব করল ধীরে ধীরে, অনেকক্ষণ ধরে। তারপর এক কাপ চা খেয়ে চলে গেল।

সেদিনই রাত ন’টার দিকে ফাহিমকে দেখা গেল মুরাদদের বাসার দিকে যেতে। সাথে আশরাফকেও দেখা গেল। ফাহিম সোজা মুরাদদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ছাদে উঠে গেল। মুরাদকে খুঁজল না। ছাদে গিয়ে উঠে পড়ল বাউন্ডারি দেয়ালের উপর। নিচের দিকে তাকাল। মানুষজন, গাড়িঘোড়া সব কিছুকে অনেক ছোট দেখাচ্ছিল। তারা ভরা আকাশে এক ফালি চাঁদ ঝুলছিল পূর্ব দিকে। ফাহিম নিচে ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফের মুখের দিকে তাকাল। আশরাফ বলল : Life is a dream within dream. তাই নয় কি বন্ধু’? ফাহিম কোনো জবাব দিল না। সে চোখ বন্ধ করল।

(415)

Latest posts by কায়সার আহমদ (see all)