হোম গদ্য গল্প দাসমানুষ

দাসমানুষ

দাসমানুষ
750
0

পারুলের নাকের ডগায় ঘাম জমেছিল খুব। শুকিয়ে গেছে কখন? গালের লালচে আভা কালো হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে! আমি আমার নাকটা এগিয়ে আনি পারুলের মুখের কাছে, গা গোলায়! রান্নাঘরে আছে চায়ের পাতা—এদিকে পারুল একা। ওকে একা রেখে যাব? সাহস হয় না। গন্ধ বাড়ছে! ভালো হতো এগুলোর যদি হাত-পা থাকত! প্রয়োজনবোধে গন্ধনাশে এগিয়ে আসত এলাচ, দারুচিনি অথবা লবঙ্গ ফল। কৌটোটা আছে ঘরের কোনায়, পাশে নোনতা বিস্কিটের বয়াম। পারুল বেশিক্ষণ খালি পেটে থাকতে পারত না। রান্না করার সময় কাজের ফাঁকে ফাঁকে কুটকুট করে বিস্কিট কামড়াতো! একটা মাছিকে দেখতে পেলাম। ভনভন করে উড়ছে। এসে বসল পারুলের মুখের কাছে। কেমন বেহায়া মাছি! পারুলের মুখের কাছেই বসতে হবে? আমি পারুলকে রেখে এবার মাছিটার প্রতি মনোযোগী হই! শুনেছি মাছিদের অনেকগুলো চোখ থাকে, সবদিক দেখতে পায়! আমি ঢাউস মাছিটার সবগুলো চোখ খুঁজি। একটাও পাই না। আমি বা মাছি আমাদের কেউ একজন একচোখা হয়তো, অথবা দুজনই দুজনকে ঠিকভাবে দেখছি না। মাছিটা নিশ্চয়ই ঘুরে ঘুরে পারুলকে দেখছে; টিকালো নাক! লম্বাটে শরীর। আমি আগ্রহ নিয়ে মাছির চোখে এবার পারুলকে দেখতে শুরু করি, ওর ফুলে ওঠা পেটে আমার দৃষ্টি আটকে যায়! কেমন বাতাস ভরা থলের মতো গোলগাল পরিপুষ্ট; টান টান চামড়া উজ্জ্বল চকচকে। আমার উশখুশ লাগে, আমি এগিয়ে যাই পারুলের কাছে। হাত রাখি তার নরম তলপেটে! শিরশির করে গা। সন্দেহ হয় কিছু একটা নড়ছে ! নাহ মনের ভুল! মাটির কলসিতে জমিয়ে রাখা নদীর পানির ঠান্ডা শীতলতা এখানে!

এখন পারুলের বাচ্চা হওয়ার কথা ছিল। মেয়ে বাচ্চা। ও পাড়ার বড়চাচি বাচ্চাটার নাম ঠিক করে রেখেছে জান্নাতুল ফেসদৌস। বেহেস্তের নামে নাম। গত সপ্তাহে আমরা প্রথম জেনেছি এ বংশের অনাগত অতিথি কন্যাসন্তান। তাকে নিয়ে আমাদের সবার ভাবনা আলাদা রকম! মা চেয়েছেন ছেলেই হোক, বাবা ভাবলেশহীন। তার কাছে ছেলেও যা মেয়েও তা। তবে এটা সত্য পারুলের ছেলে হওয়াই ভালো, এ-ঘরের মেয়েমানুষেরা একটু বিচিত্র প্রকৃতির, কেউ তালকানা কেউ স্বার্থপর! মেয়েমানুষ হিশেবে এ সংসারে মা আছেন, পারুল আছে। বোন নেই, কন্যা হলে তাকেও মেয়েমানুষ ভাবতে হবে কিনা এটা একটা চিন্তার বিষয়!


আমার বুক ভরা বিষাদ এখন। আমি খুনি, জান্তব পুরুষ এক। রুক্ষ, মমতাহীন। আমি পারুলের একটা হাত তুলে নিয়ে আমার গালে ছোঁয়াই। হোক মৃত; তবুও এ হাত প্রেমের হাত, আমার ভালো লাগে খুব!


মাছিটা ভন ভন করে ডাকছে পারুলের আশেপাশে। ইস কী বিশ্রীভাবে পড়ে আছে মেয়েটা! নরম সুন্দর মুখ থেকে বড় একটা জিহ্বা হ্যাঁ হয়ে বের হয়ে আছে, লালা ঝরে লেপ্টে আছে গাল। জঘন্য! পারুলের বুকের উপর থেকে কাপড়টা সরে গেছে একটু, আমি নামিয়ে দেই, যদিও এখন আর উলঙ্গ তলপেট দেখে আমার কাম জাগছে না, তবুও! আমি নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখতে পাচ্ছি একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে পারুলের শরীর! হাত ,পা, নাক, মুখ, চোখ! আমার মন খারাপ হয়। বুকের ভেতর কেমন লাগে! আমার সুন্দর পারুল গতকাল সকালেও হালকা সবুজ শাড়ির কাঁথায় লাল নকশার ফুল তুলেছে, রোদে বসে দু’ ঠ্যাং ছড়িয়ে জলপাইয়ের আচার খেয়েছে, সন্ধ্যে হতেই কাঁঠাল পাতার উল্টো পিঠে সরিষার তেল মাখিয়ে মাটির প্রদীপ থেকে তুলেছে রাশি রাশি কাজল! আমার সেই পারুল আজ পেটে বাচ্চাসমেত মেঝেতে পরে আছে কেমন চিৎ হয়ে! কী বিস্ময়! মানুষ কত সহজে মরে যায়! মানুষকে মেরে ফেলা কত সহজ!

পারুলের জন্য আমার বিলাপ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে এখন। আমি সুর তুলি আমার চাঁদকপালি, আমার কঙ্কাবতী, আমার কোহকাফ নগরের পরি! তুমি মরে গেলে কেন!

আমি মনে মনে ভেবে ঠিক করে ফেলি পারুলের মতো, ঠিক পারুলের মতোই আমি একটা মাটির পুতুল বানাব, জোড়-ভ্রু, আদুরে লাল গাল আর কোঁকড়া চুল দেবো সেই পুতুল শরীরে! দেবোই দেবো। হঠাৎ একটা কথা ভেবে আমার অস্থির লাগে! আচ্ছা পারুলটা তো মরেই গেল, অথচ তাকে আমার বলা হয় নি আমার গোপন কথা; বলি নি তাকে এই আমি একটু একটু করে পুরুষ হয়েছি পারুলের জন্য, প্রেমিক হয়েছি পারুলের জন্যে, এমনকি আজ খুনিও হলাম এই এক পারুলের জন্যে!

পারুল!
আমার সুন্দর পারুল!

আমার বুক ভরা বিষাদ এখন। আমি খুনি, জান্তব পুরুষ এক। রুক্ষ, মমতাহীন। আমি পারুলের একটা হাত তুলে নিয়ে আমার গালে ছোঁয়াই। হোক মৃত; তবুও এ হাত প্রেমের হাত, আমার ভালো লাগে খুব!

পারুলের ছুঁয়ে দেয়া মুখের এ অংশটায় গাঢ় কালো জন্মদাগ! কালোর সাথে ধূসর মেশানো! শরীরের দগদগে ঘা দীর্ঘদিন চামড়া জুড়ে থাকলে যেমন হয় তেমন! আমার কালো চামড়াকে আমি ভালোবাসি খুব, যাই হোক নিজের শরীর তো! এই শরীরে, এই চামড়ায় বিলাতি সোয়েটারের মতো পশমি লোম; তবুও ভালোবাসি। নাকের পাশের উঁচু হাড় আমার চেহারা পুরোপুরি বন্য করে দিয়েছে। দিক। আমারই তো শরীর! আমার সন্দেহ হয় টেলিভিশনে দেখা সেই কালো মানুষদের দেশের মানুষেরা ভুল করে আমায় ফেলে রেখে যায় নি তো এই ভুল মানুষদের দেশে! আমার আশা জাগে, এই আশ্রয়হীন আমাকে অনাত্মীয় অস্বজনরা না চিনলেও তারা হয়তো ঠিক চিনবে, চিনবেই চিনবে!

সত্যি আমার আপন কেউ নেই, আমি বহিরাগতও নই। অনাদি বাসস্থ! তবুও কেউ আমার আপন হয় নি, না ঘরের না বাইরের। আমার অপরাধ অনেক। আমার স্থূল শরীর! পরিচয়, বিভ্রাট লোকেদের গায়ে সুড়সুড়ি দেয়, তাদের অনাত্মীয় অস্বজন উপহাস চলে আসে কোনো এক অদৃশ্যলোকের রাস্তা বেয়ে; তরল স্রোতে এসে ছড়িয়ে দেয় বিষাক্ত ফেনা, সে স্রোত আটকায় এ সাধ্য কার!

তাদের ভাষ্যে আমি ‘খালেক মিয়ার জাউরা পোলা’ আধলা! জাউরা শব্দটা প্রথম যখন শুনি, বুঝতে পারি না কিছু। মনে হয়েছিল জাউরা খুব কুৎসিত হাস্যকর একটা প্রাণী; আর তার সন্তানেরা দেখতে ঠিক আমার মতো! আমি সীমাহীন কৌতূহলে আমার আশেপাশে আরও কিছু জাউরা মানুষ খুঁজতাম, নেই কোথাও। কেন নেই? এ প্রশ্ন বাবাকে করলে আমার ভোলাভালা বাবার মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যেত, আর মা নিয়ে আসতেন চেলা কাঠ! এরপর দুদিন তিনদিন বা চারদিন আমি বিছানায় পড়ে থাকতাম লাশ হয়ে! নড়তে পারতাম না, সারাশরীরে বসে যেত আরও চাক চাক অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ!

পারুলের পায়ের পাতায় মাছিটা বসল এবার! এই তো তার চোখ দেখা যাচ্ছে এখন। স্পষ্ট চোখ। মাছিটাকে তাড়াতে মন সায় দেয় না আমার, থাকুক আরও কিছুক্ষণ! জীবন্ত মাছির সঙ্গ খুব একটা খারাপ না।

যাক যেখানে ছিলাম সে প্রসঙ্গে আসি! আমার জীবনে মাকে প্রশ্ন করা, বাবাকে প্রশ্ন করার কাল খুব বেশি দিনের জন্য ছিল না, আমি বড় হয়েছি খুব অল্প সময়ে, গোপন অধ্যায়ের পৃষ্ঠা মুখস্থ না করেও আমি বুঝেছিলাম; আমাকে নিয়ে লোকজনের এই সুড়সুড়ি রোগ খালেক মিয়া বা আমাকে নিয়ে নয়, সকলের মাথাব্যথা জাউরা পোলার জন্মদাত্রী আফসারা বেগমের জন্য!

আফসারা বেগম! আমার মা!

মোসাম্মৎ আফসারা বেগম বেগমজাদীদের মতো হুলুস্থূল রকম সুন্দরী! এই রমণী কেমন করে আমার মা হলেন এ আমার এক চরম বিস্ময়! আমার বাবার আটপৌরে গেরস্থ ঘরে মাকে কেমন যেন বেখাপ্পা লাগত। সেই ছোটবেলায়ই আমি ঘুরে ঘুরে মাকে দেখতাম শুধু, এখন আর দেখি না! আফসারা বেগমের পয়সাপ্রীতিতে আমার ঘেন্না খুব! বাবার সামর্থ্য কম। মাসে দু একবার আমার মা আমার বাবার সামর্থ্যের যোগান দিতে তার পয়সাওয়ালা আত্মীয় বাড়ি ধরনা দিতেন। এদিক-সেদিক ঘুরে তিনি যখন ফিরে আসতেন, তখন এ শহরের মানুষ দেখত মায়ের পরনের নতুন শাড়ি, নতুন চুড়ি অথবা বাহারি কাটের ব্লাউজ! আমার মায়ের বয়স এখন মধ্য পঞ্চাশ! সময়ের সাথে সাথে এ বাড়ির সকলে বদলেছে এমনকি বাবাও ; বাবা ঝিম রোগে ভুগছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকেন শব্দহীন, আমি বাবাকে আদর করি। বাবা চুপ। এত বদলের মাঝেও আফসারা বেগম বদলায় নি এক চুল! এখনো তার পান খাওয়া ঠোঁট টকটকে লাল!

এ বাড়িতে আমার পড়ে থাকার প্রধান কারণ ছিল বাবা। আফসারা বেগমের মতো রূপনেওয়ালী ছেনাল মায়ের ঘরে জন্মানোর পাপ বয়ে বেড়াতাম শুধু এই এক বাবার জন্য! যদিও লোকের কথায় তিনি আমার আসলি বাবা নন। নকলি বাবা। একটা সময় ছিল আমার যখন খুব মন খারাপ হতো কেমন করে যেন বাবা টের পেতেন সব, রাতের অন্ধকারে আমার কাছে ছুটে আসতেন তিনি। অনেক সময় ধরে আমার পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, এমন করে হাত বুলাতেন যেন তিনিই আমার মা, তিনিই আমার বাবা; আর বাকি সব মিথ্যে। বাবার আদরে আমার খুব ইচ্ছে হতো আমি ছোট হয়ে যাই, একদম ছোট। ছোট হতে হতে আমার বাবার পেটের মধ্যে ঢুকে যাই; কী হয় যদি আরেকবার জন্মাই এই বাবার গর্ভজাত সন্তান হয়ে!

পারুলের ঘরের আয়নায় মাছিটা উড়ে গিয়ে বসল। আয়নায় পারুলের মুখে স্থির অনড়! আমি আয়নার আরও কাছে সরে যাই। অদ্ভুত ব্যাপার অস্বচ্ছ আয়নায় মাছিটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দ্রুত! ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পারুলও, অথবা এমনও হতে পারে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে অস্বচ্ছ হয়ে গেছে সব। চোখ রগড়ে নেই, এই তো মাছিটা দেখছি এখন স্পষ্ট, পাশে পারুল, তার পাশে আমি। অদ্ভুত আবার সব ঘোলা ঘোলা। আমার সময় কাটছে ভালোই আলো আর ছায়ায়, আয়নাটার কারসাজিতে ডুবে ডুবে দেখি অনেক কিছু। আয়না এখন পর্দা, বিরাট এক নাট্যমঞ্চ। এখন আমি একা দেখছি, আয়নার ওপাশে নাটকটা টানটান। গল্প শুরু হয় দ্রুত। গল্পের নায়ক ছোট্ট আমি; নায়িকা পারুল নয় আফসারা বেগম! আমার মা। আমি অবাক হই আয়নায় নাটকে মা এল কেমন করে, আমি এলাম কেমন করে, এত জনতার ভিড় কেন! অবাক হয়ে দেখি। আহা কী বিস্ময় এ যে আমার নিজের জীবন চলছে। এই আমার বাড়ি, এই আমার পুকুর, পাশে আমার স্কুলঘর, পাড়ার নাটকের ক্লাব। আমার মা হাঁটছেন উঠোনে, হাতে তার মাছভাজার চামচ! আমি ছুটে যাই মা ফেলে, ঘর ফেলে। আমার খেলার মাঠে রোদ, আমি দাঁড়াই একটু! পাড়ার নানি-দাদি, ছেলে বুড়ো আসে, তারা ফিসফাস করে, আমি শুনি না, তারা গা টেপাটেপি করে আমি দেখি না। কোনো ডাক্তার আমায় বলে নি তবু আমি জানি তাদের রোগ আছে, ছোঁয়াচ রোগ! এ রোগের নাম সুড়সুড়ি রোগ!

হাতের আয়নাটা অযথা এবার ঘরঘর ঘরঘর শব্দ করছে অনেকটা রেডিওর মতো। কারা যেন আয়েশ করে ছড়া কাঁটছে—

কালা পোলার ডিজাইন দেখ ভাও
ভাল্লুক না উল্লুকের ছাঁও।
বউ পালে মোরগে
চাইট্টা খায় শিয়ালে
কুক্কুরুৎ কু!

ছড়া শুনতে ভালো লাগে না, বন্ধ করে দিতে চাই। অদ্ভুত আয়নাটা বড় হয়ে যাচ্ছে, ঘরের মেঝে ছেড়ে কার্নিশ ছুয়ে যায়! আয়না রেডিও হয়, আয়না সিনেমার পর্দা হয়। আয়না হেঁটে যায়, আয়নার সাথে সাথে কার্নিশ ঘেঁষে দৌড়ে যাই আমি!

এই তো এইখানে আমায় থামিয়ে দিল এ পাড়ার ল্যাংড়া মেম্বারের বখাটে ছেলে, সাথে তার বিশাল জনতার বহর, পোলা তর বাপের নাম কী?

আমি সুবোধ ভালো ছেলের মতো উত্তর দিয়ে যাচ্ছি মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান মিয়া, আমার উত্তরে হাসছে সবাই। হো হো হো! তাদের হাসিতে গালের লোল ছিটকে যাচ্ছে, আমি সরে যাই, তারা কাছে টানে, আমি গন্ধ পাই।তাদের ঠোঁটের গন্ধ, চোখের গন্ধে আমার ঘেন্না হয়। তারা হাসে ফিক ফিক করে, তাদের ঠোঁট গড়িয়ে পড়ে যায় অবদমিত কামরস, আমি পারুলের আঁচলে আয়নাটা মুছে দেই।

বিশাল পর্দায় এখন আমি একটু সাহসী, ফুঁসে উঠি একটু। জনতার মধ্য থেকে কেউ একজন আমার ঘাড়ে হাত রাখে, টনটন করে ঘাড় ব্যথায়। আমি চুপসে যাই। আমার স্থূল পুরুষ শরীর বিকৃত নারী শরীর হয়ে যায়। মানুষগুলো হাসে; তাদের উত্তেজনা ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শার্টের হাতা, প্যান্টের পকেট!

পোলা তর মায়ের নাম?

আফসারা বেগম!


মানু করাতি তোর বাপ, আর মানু করাতি হইল গিয়া এক আধপাগলা বুইড়া, বুঝছস পোলা? এবার শোন মানু করাতি মানুষটা কেডা? 


—ও আপছ্যাড়া! হ হ আপচারা বেগমই তো! মায়ের প্রসঙ্গে ছেলেছোকরার দল আমার উপর অসীম উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমার ঘনিষ্ঠ হয় তারা! রমণীয় অথবা পুরুষালি ঘনিষ্ঠতা। কেউ আসে আমার বুকের কাছে, কেউ পেছনে, অতি উৎসাহীদের কেউ আবার আমায় জড়িয়ে ধরার চেষ্টাও করে, আমার ঝুলে পড়া মাংসল শরীরে তারা হাত লাগায়, মৈথুনের হাত। আমার কিছু করার নেই জানি, কী করব আমি? আমি তো জানি এ শরীর আমার নয়, আমার মা আফসারা বেগমের, আফসোস তাকে শুধু এমনি করে খোলা মাঠে পাওয়া যায় না কখনো!

ঘরে একটা বিড়াল ঢুকেছে। এত নিঃশব্দে ঢুকেছে যে আমি টেরই পাই নি। বিড়ালটা পারুলের পেটের কাছেই বসে। আমি বিড়ালটাকে ডাকি, শোনে না, ঘাপটি মেরে বসেই থাকে। ঘরে এখন আমি, বিড়াল, মাছি আর পারুল এই চারজন। না ভুল বললাম আরও একজন আছে পারুলের পেটের বাচ্চাটা! আমি বিড়ালটাকে সরিয়ে পারুলের পেটে কান লাগাই, শব্দ খুঁজি।

প্রথমে কিছুক্ষণ নষ্ট হয়ে যাওয়া টিভির গোলযোগের শব্দ! এরপর কিছু বিকৃত মানুষের স্থূল হাততালি। নিষিদ্ধ হাসি, খ্যাক খ্যাক শব্দ!

আমি আমার কান সরিয়ে আনতে চাই, অসচেতনে বিড়ালের মুখে লেগে যায় আমার মাথা। বিড়ালটা রাগে গরগর করে শব্দ করে, আমার চোখের সামনে চলে এসে আমাকে শাসায়। আমি বিড়ালের চোখে পর্দার সেই কৌতূহলী জনতার হিংস্রতা দেখতে পাই, খলবল করে বিড়াল! আমি অপরাধী—
আমার অনেক পাপ!

ওহ আমি ভুলে গিয়েছিলাম জনতা আমার মায়ের নাম জানতে চেয়েছে, আমি বলেছি আফসারা বেগম। এরপরের নাটকটুকু দেখার জন্য আয়নাটা খুঁজি,পাশেই পড়ে আছে। হাতে নেই—

জাউরা পোলা, তুই তর মায়ের নামটাও ঠিকঠাক জানস না, কী অইব তর! ক কী অইব? অই পোলা তুই সব জানস না কেন, তর তো সব জানতে অইব, জানতে অইব তর মায়ের আশনাই!

আমি দেখতে পাই সমবেত জনতা একসাথে ঘাড়ে পুতুলের মতো মস্তক নাড়াচ্ছে, তারা সম্মত, তারা একমত আমাকে জানতে হবে আমার মায়ের আশনাই!

শোন পোলা শোন, তর মায়ের নাম শুইন্যা রাখ! তর মায়ের নাম রঙিলা বিটি বিউটি বানু, থাকত টান বাজারে, তর বাপ ভাগায়া নিয়া আসছে তারে! আইনা লাভ কী হইল তার! তর মায়ে তো নটিমাগি, ছেনাল! স্বভাব কি আর যায়? আহা তর মা কি আর যেই সেই মাল!

সকলের জিভে পানি, আলজিভও ভেজা।

—মনে রাখিস পোলা, তর মা কিম্তু এই গেরামের গনিমতের মাল, সবাই বোঝে শুধু তোর ঝুম ধরা বাপে বোঝে না! মানুষ এত বলদ হয়!

বিড়ালটা এখনো রাগে গজরাচ্ছে, আমিই শুধু চুপ।

পোলা তুই জানস তর বাপ কেডা ? খবরদার খালেক কইস না পোলা।খবরদার! তারা চোখ নাড়ায়, চোখ পাকায় আমি দেখি। ভয়ও লাগে না, ঘেন্নাও না।

শোন পোলা শোন, তর আসলি বাপের নাম শোন। তর বাপের নাম মানু করাতি! শুনছস এই নাম জীবনে?

ততক্ষণে আমি আর বেড়াল আয়নার সাথে পুরোপুরি মিশে গেছি, এই তো আমার চিবুক এখন বুকে। বিড়ালও শুনছে আয়নার কথা আমিও শুনছি আয়নার কথা, জনতা সক্রিয়!

তারা কাহিনি বলে পুরোনো দিনের নিষিদ্ধ সময়ের কাহিনি—

আহারে পোলা এই জেবনে তুই তোর বাপ চিনলি না, আহারে বাপ! সমবেত জনতার ঠোঁটে চুক চুক শব্দ। হতাশা, আমি দেখতে পাই বেড়ালটা মাথা নিচু করে আছে। লজ্জা পাচ্ছে। আহা কেন আমি আমার বাপ চিনি না। আমি বেড়ালটার দুঃখে দুঃখিত হই। ঘরে মাছিটা খুঁজি দুঃখের ভাগ দেয়ার জন্য, নেই উড়ে গেছে কোথাও। জনতা এবার মুখ এগিয়ে আনে আমার কাছে ষড়যন্ত্রকারীদের মতো ফিসফিস করে বলে—

মানু করাতি তোর বাপ, আর মানু করাতি হইল গিয়া এক আধপাগলা বুইড়া, বুঝছস পোলা? এবার শোন মানু করাতি মানুষটা কেডা? মানু করাতির পরথম পরিচয় জোয়ান কালে তগোর বাড়ির কামলা ছিল, খালেক মিয়ার কামলা। তয় হের চাইয়াও বড় পরিচয় হের আছে। হেই বেডা তর মায়ের নাঙ ছিল পোলা! লাঙ্গ! নাঙ খুব শরমের কতা, খুব শরমের কতা। ও পোলা তুই বোঝস নি নাঙ কি?

আমি মাথা নাড়াই; না আমি বুঝি না।

নাঙ হইল ভাতারের মতন আত্মীয়! তর মায়ের তো আবার তের ভাতার না হইলে চলত না! তাই ঘরেরও নাঙ লাগে বাইরেরও নাঙ লাগে।

সমবেত জনতা এরপর একসাথে হাসে, খিকখিক কুৎসিত!

তাদের সে হাসিতে আমি বেড়ালটাকে ভুলে যাই, মাছিটাকে ভুলে যাই, এমন কি পারুলকেও ভুলে যাই। আমি আবার একলা হয়ে যাই! জেদ চাপে আয়নার উপর আরও কিছু শুনব এবার। আরও—

—পোলা তুই কি জানস হিজড়া কি? আমি মাথা নাড়ি জানি না। শোন রে পোলা শোন, মন দিয়া শোন, দুনিয়ায় হিজড়া দুই প্রকার, এক হইছে বাজারের হিজড়া আরেক হইছে ঘরের হিজড়া, যারে তুই বাপ কস হেয় কিন্তু কিন্তু দুই নম্বরডা! আফসোস তোর মায়ে এই মাইয়া বেডার রূপ দেইখ্যা ভুলছিল, কয়দিন আর ভুলে ক? শেষতক কিনা ভাড়া খাটাইল মানু করাতিরে, তগো বাড়ির কাইল্যা কামলা, তর মায়ের আর কোনো উপায় ছিল না রে পোলা, আর কোনো উপায়ই ছিল না।

জনতা আফসোসে হতাশায় গড়িয়ে পড়ে একে অন্যের গায়; আমি পালাই আয়না থেকে পর্দা থেকে।

তাহলে বোঝা যায় আমার এই পালানো রোগ আজকের নয়, সেই শৈশব থেকে আমি পালিয়ে ফিরছি। আমি পালিয়েছি সব সুন্দরের পাঠশালা থেকে, যেদিন জেনেছি আমি অচ্ছুৎ, আমি অবাঞ্ছিত, আমি জারজ! সেদিন থেকেই আমি ফেরারি।

বেড়ালটা রাগ করে সত্যি সত্যি চলে গেছে ঘর ছেড়ে, আমার পাশে এখন কেউ নেই। আমার শূন্য লাগে। আমার ভালো লাগে না কিছুই ,আয়নার জনতার জানানো প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ, অনেক তো জেনেছি। জনতা আমায় জানাতে ভালোবাসে খুব। এই জেনে জেনেই তো সেই ছোট থেকে আমি বড় হয়েছি, বুড়ো হয়েছি । এত জেনে জেনেই আমার মাথা ঝুলে পড়েছে, পিঠ গেছে বেঁকে। কুজো বুড়োর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছি আজও খেলার মাঠ, স্কুলঘর আর আত্মীয় বাড়ি থেকে! তাড়া খাওয়া পথের কুকুরের সাথে সেই থেকে আমার সখ্য! আফসোস বিড়ালের সাথে ভাব হলো না কোনো কালে।

আয়নাটাকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখি এবার! আর দেখব না এই অপয়া আয়না! এখন আমি পারুলকে দেখব, জনতার কথা ভাবব না, পারুল আর পারুলের না হওয়া বাচ্চাটার কথা ভাবব, ভেবে ভেবে তাদের জন্য কাঁদব, অনেক সময় নিয়ে কাঁদব আমি।

পারুল! টুলুর বউ! আমার সহোদর ভাই টুলু! বয়সে আমার বছর দশেক ছোট। আমাদের পিতৃত্বের প্রসঙ্গ প্রশ্নাত্মক হলেও মাতৃত্বে আমরা একই উদরজাত। মায়ের শেষকালের পুত্র টুলু! ঐ সময়টা মায়ের বৈধ গর্ভকাল ছিল কানাঘুষায় শুনেছিলাম! গর্ভকাল! আহা পারুল মরে পরে আছে মেঝেতে, তারও গর্ভকাল চলছিল।

টুলু বড় সাধ করে পারুলকে ঘরে এনেছিল। আমাদের পরিবার অনেকটা একঘরে, এ ঘরে কারও মেয়ে দেয়ার কথা না। পারুলই সাধ করে এসেছে! আমাদের পারুল। আমাদের চোখের সামনে বড় হওয়া পারুল এখন আমাদের ঘরের বউ, বউ তবে আমার নয় টুলুর!

আমি পারুলকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম সেই কোনকাল থেকেই, কোলেও নিয়েছি শৈশবে, একই পাড়ায় বড় হলে সুযোগ থাকে কিছু লুকিয়ে-চুড়িয়ে ঘনিষ্ঠ হবার। পারুলকে কাতুকুতু দিলে কলের পুতুলের মতো হাসত ফিক ফিক। কোকড়া চুল গোলগোল ঠোঁট। সেই পারুল বড় হয়েছে, আমাদের ঘরের বউ হয়েছে কিন্তু আমার নয়। টুলুর বউ। আমি এই মৃত পারুলের ঠোঁটের উপর থেকে মাছি সরিয়ে দেই। অবাক হই মাছিটা আবার এল কখন?

আমার মনে পড়ে পারুল খুব আদুরে ছিল। আহা সেই আদুরে ঠোঁটে মাছি উড়ছে এখন! কষ্ট হয় আমার। আচ্ছা তার পেটের বাচ্চাটাও কি এমন আদুরে হতো? ঠোঁটগুলো গোল হতো? হঠাৎ আমার বুক ফেঁটে কান্না আসে, পারুলের জন্য নয়, আদুরে ঠোঁটের পারুলের না হওয়া বাচ্চাটার জন্য।

প্রথম প্রথম পারুল আর টুলুকে একসাথে দেখলে আমার কেমন জানি অস্বস্তি হতো, ভেবেছিলাম এটা স্বাভাবিক অস্বস্তি, কিন্তু কিছু সময় পার হলে আমি টের পাই এই অস্বস্তির ভয়ংকর কারণ। পারুল আমার কাছে কখনোই বোন নয়, অনুজ সহোদরের স্ত্রীও নয়, পারুল আমার প্রথম নারী, আমার পুরুষ সত্তায় প্রথম সুন্দর! আমি পুরুষ হয়ে জন্মেছি এই বোধ টের পেতাম শুধু পারুলকে দেখলে। সেই ছোট্ট পারুলের স্পর্শও আমার জন্য সুখকর ছিল। এখন আমি অনুভব করি পারুল আদতে সব সময়ের জন্য আমার কাছে নারী। যোনি সর্বস্ব মেয়েমানুষ নয়! আমি অবচেতনে অপেক্ষা করতাম পারুল নামক এক বালিকার নিত্য নতুন রমণী কুশল হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। পারুল আর টুলুুর ঘরটা ঠিক আমার ঘরের পাশেই, মাঝখানে লম্বা কাঠের পেরেক মারা টিনের দেয়াল। রাতের অন্ধকারে আমি পারুলের রিনঝিন হাসির শব্দ শুনতে পেতাম, কানে বালিশচাপা দিলেও থামত না সে শব্দ! টুলুর দীর্ঘ শ্বাসটানা সুখের বাতাসে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেত, আমি পরাজিত ক্লান্ত হয়ে এপাশ-ওপাশ করতাম সারারাত। ভোরের আলো ফুটবার আগেই কলতলায় যেতাম, লুকিয়ে দেখতাম সদ্য স্নান শেষের স্নিগ্ধ পারুলকে। এ পারুল রাতের টুলুর পারুল নয়, একেবারে আমার নিজের পারুল।


আমি প্রস্তুত ছিলাম অনেক কিছুর জন্যই, কিন্তু কিছুই হলো না, পারুল আশ্চর্য শীতলতায় সেদিন প্রত্যুষেও কলতলায় যায়, ঘষে ঘষে তুলে ফেলে পূর্বরাত্রির বলাৎকারের সকল চিহ্ন, আমার জান্তব পাপ!


খুব বেশি দিন নয়, এই দিনরাত্রির হিশেব-নিকেষ অল্প সময়েই থেমে যায়। টুলুকে আমি দুবাই পাঠিয়ে দেই, জোর করে পাঠাই নি টুলু নিজেই যেতে চেয়েছিল। বেকারত্ব ঘোচানোর প্রয়াস। আমি জীবনকে বেচে এখন অর্থের দাসত্ব করি, জীবন থেকে এটা বুঝেছি আর্থিক স্বচ্ছলতায় বিকৃত বা অবিকৃত সব সুখ কেনা সম্ভব।

পারুল অন্তঃসত্ত্বা! এ সংবাদ আমি কেমন করে টুলুকে দেই! ফোনে সংবাদটা শোনার পর টুলু কিছুক্ষণ থ মেরে ছিল, বার বার প্রশ্ন করছিল “ভাইজান, তুমি ঠিক কইছ তো ?”

এত বড় একটা সংবাদে আনন্দের চেয়ে ভীতিই বেশি আমাদের। আমি পারুল আর টুলুু কেউ আর ভালো নেই এ চরম সুসংবাদে। টুলু বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায়, এ সন্তান তার তো! তবুও সন্তান আগমনে চারপাশের বাতাস বদলায়, এমনকি পারুলও চায় সন্তান আসুক!

টুলুর প্রবাস যাত্রার সপ্তাহ খানেক পরের ঘটনা, বাড়িটা একলা ছিল, একলা ছিল পারুল। মা গিয়েছিলেন সদরে তার এক কোনো এক আত্মীয় বাড়ি, বাবাও ইদানীং একেবারে অথর্ব! কোথায় থাকেন! কি করেন ঠিক নেই। এ পরিবারটা যেহেতু এখন আমিই দেখছি তাই পারুলকেও দেখে রাখার দায়িত্ব ছিল আমার, আমি যত্ন নিয়ে সে দায়িত্ব পালনও করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা রাত আসে অস্থির রাত, আমার প্রয়োজন হয় বিশেষ কোনো নারীর। আমি ঘরের বাইরে যেতে চাই, পারুল কিছু বোঝে না, অযথা বাঁধা দেয় আমায়। একা থাকা তার সম্ভব না! পারুলের বাঁধায় দাঁত কামড়ে পড়ে রই ঘরে। এদিকে রাত বাড়ে, বেড়ে যায় পারুলের আঁচলের খসখস শব্দ! পারুল নির্ঘুম টের পাই! সে রাতে কোথাও কিছু একটা ভেঙে পড়ে আমার, আমি পারি না আর। এবং সে রাতেই হু সে রাতেই আমি প্রথম বারের মতো অবিশ্বাসী হই, মানু করাতির রক্ত কথা বলে শরীরে!

আমি প্রস্তুত ছিলাম অনেক কিছুর জন্যই, কিন্তু কিছুই হলো না, পারুল আশ্চর্য শীতলতায় সেদিন প্রত্যুষেও কলতলায় যায়, ঘষে ঘষে তুলে ফেলে পূর্বরাত্রির বলাৎকারের সকল চিহ্ন, আমার জান্তব পাপ!

নিজের কুৎসিত পরিচয়ে নিজেই হতবাক হই । এই আমি! আয়নায় বার বার নিজেকে দেখি। কৃতদাসের ঔরসজাত সন্তান! প্রবৃত্তির দাস! দাসমানুষ এক! চোরাপথে হরণ করার সুখ রক্তেই আছে আমার! চোর আমি! আমার পাপ ঘুমায় নি সব প্রমাণ দিলাম আজ একসাথে! আশৈশব যে নিঃসঙ্গ আমি খেলার মাঠ, পাঠশালা বা বন্ধুদের আড্ডাস্থল থেকে পালিয়ে বেরিয়েছি সেই আমিই আমার আবেগ ভালোবাসা আর যৌবনের দাম দিলাম এভাবে! পাপের আকস্কিক তাণ্ডবে আমি বিপর্যস্ত, নিজেকে ঘৃণা করার মতো শক্তিটুকুও আমার অবশিষ্ট ছিল না; অথচ বিপরীত দিক থেকে পারুল ছিল একদম স্বাভাবিক। নিরুত্তাপ। কারণ বুঝতে কষ্ট হয়। কেন? কী চায় সে। হয় এটা তার সমাজের চোখে অসৎ হওয়ার দায় এড়ানোর চেষ্টা নয় ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের কৌশল আবিষ্কারে কালক্ষেপণ। অথবা আমার প্রতি তার অনুকম্পা হতে পারে? কোনটা জানি না। আমি শুধু অস্থির হয়ে পালিয়ে বেড়াই পারুলের দৃষ্টিসীমার বাইরে। রাতের অন্ধকারে মুগদা পাড়ায় আমার সমিল আঁকড়ে পড়ে থাকি, নিজেই রাঁধি নিজেই খাই। শুরু হয় আমার নারী বর্জিত নতুন সংসার! যাক আমার লোভী সাপের ঝাঁ চকচকে চোখের চাহনি পারুলকে আর দেখাতে হবে না। কখনো না। আমি স্বস্তি বোধ করি । নিশ্বাস ফেলি সুখের।

বেশিদিন পারলাম না। ডাক পড়ল, পারুলই ডাকল। পারুলের চোখের নিচে জমে উঠেছে কালি, গাঢ় জমাট অন্ধকার, জানলাম পারুল অন্তঃসত্ত্বা।

তবুও সব ঠিক ছিল, সন্তান আগমনের সংবাদ এ পরিবার এবং এই সমাজ কর্তৃক সুসংবাদ বলেই গৃহীত হলো, মাত্র কদিন আগেই তো টুলু ছিল। কে করবে অবিশ্বাস! টুলুর বীজ রোপনের দক্ষতায় পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন সকলেই খুশি! আমার ভয় কাটে ডুবে যাই স্বাভাবিক গৃহকর্মে। দোকানে যাই, ঘরে ফিরি, ঘটনাহীন একঘেয়ে!

এর মাঝেই দুম করে উড়ে আসে অঘটন এক বিকেলে!

সেদিন সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরেছিলাম। বাড়ির পরিবেশ কেমন যেন। থমথমে! মা লাঠি নিয়ে এক আধপাগলা বুড়োকে তাড়াচ্ছেন, মায়ের বেশবাস আলুথালু, চিৎকার করছেন খুব। যার সাথে চিৎকার করছেন সে একজন পাগল। গায়ের রং কুচকুচে কালো, গা ভর্তি লোম, লোকটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কাকে যেন দেখতে চায়, কাঁদছে আর মাকে বলছে আমার পুত কই, পুত দেও, আমার সোনা মানিকরে দেও, ডাইনি আমার পুতরে খাইছে! মাইরা ফেলছে! আমার পুত! আমার পুত!

আমার বুক ধড়াস করে ওঠে, মাটির সাথে গেঁথে যায় পা। কেউ বলে না দিলেও আমি জানি কে এই বুড়ো! কার সন্ধানে এসেছে সে? আমার মায়ের একসময়ের আগুন পুরুষ, জীবনে ঠকতে ঠকতে আজ পাগল ভিক্ষুক!

মানু করাতি!
এ-বাড়ির পুরনো কামলা!
আমার বাবা!

মস্তিষ্ক বিকৃত এই লোকটাকে দেখে মা থরথর করে কাঁপছেন, মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে পারুল, পারুল তাকিয়ে আছে সোজা আমার চোখের দিকে আর আমি তাকাই পারুলের পেটের দিকে, আমি ভয় পাই, আমার পরিণতিও কি এই বৃদ্ধ পাগল মানুষটার মতোই হবে! আর পারুলের সন্তান?

—কালো কুচকুচে, মুখে জন্মদাগ, লোমশ হাত, লোমশ পা। এরপর খেলার মাঠে টিপ্পনি, বখাটেদের উৎপাত, পারুল নামে একে অপরের গা টেপাটেপি! টুলু পরিচিত হবে আমার বর্তমান ভালোমানুষ বাবার মতো নপুংসক পরিচয়ে।

—আমি অস্থির হয়ে উঠি, আর কত? মাথার মধ্যে চক্রাকারে ঘোরে দাসমানুষের তালিকা—
মানু করাতি
আমি
এরপর আমাদের অনাগত সন্তান।

মানু করাতির জীবন নাট্যের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনায় আমি হাঁস-ফাঁস করি, অস্থির যন্ত্রণায় চিৎকার করি একলা ঘরে। চোখ বন্ধ করলেই মানু করাতির চিৎকার “আমার পুত কই, পুত দেও”!

পারুলের গর্ভকাল শেষের দিকে, মুখোমুখি হতে চাই না, তবুও এসে যায় সময়টা! আজও বাড়ি খালি। পারুলের গোঙানির শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। কাছে যাই পারুলের! বিছানায় ক্লান্ত পারুল,আমাকে আকড়ে ধরে, আমি পারুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ঠিক তখনই তার ফুলে ওঠা পেট ভয়ংকর হয়ে চিৎকার করতে থাকে, আমি দেখতে পাই তার পেট থেকে বের হয়ে আসছে দুটি রক্তাক্ত হাত, আমার গলা চেপে ধরতে এগিয়ে আসে সে হাত ,আমি পাপী! আর সহ্য করতে পারলাম না, বালিশ চাপা দিলাম, কিছুক্ষণ কী বীভৎস রকম তড়পানি! এর পর সব নিঃশব্দ!

আমার লোমশ হাত, পেশিবহুল শরীরের কাছে সে রাতে যেমন পারে নি পারুল, আজও তেমন!

অনেকক্ষণ হলো পারুলের পাশে বসে আছি আমি, এর মাঝে আসরের আজান হলো, মায়ের আজ ফেরার কথা ফিরবেন হয়তো, বাবার ফেরার কোনো দিন তারিখ নেই । ফিরুক যে যখন খুশি, আমি পারুলের গায়ে যত্নে কাঁথা টেনে দেই, হাঁ করা মুখ থেকে মাছি তাড়াই, আমাকে কাজে যেতে হবে, দুদিন হয় দোকানে কর্মচারী নেই, আমাকেই সামলাতে হবে সব। শেষবারের মতো আমি পারুলের গালে হাত রাখি। আদর করি। বাঁধা দেয়ার মতো কেউ নেই, কতদিন পর পারুলকে আমি আবার ছুঁয়েছি, আমার চোখ ভিজে যায় জলে। আমি জানি শুধু আমিই জানি পারুলকে আমি কতটা ভালোবাসি।

নাহিদা নাহিদ

কবি ও কথাসাহিত্যিক।
জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৩; চাঁদপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে "কথাসাহিত্যে" পিএইচডি করছেন। পেশায় শিক্ষক। প্রভাষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
অলকার ফুল [গল্পগ্রন্থ, বাঙালি, ২০১৭]
যূথচারী অাঁধারের গল্প [গল্পগ্রন্থ, জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : nahid.oprotim13@gmail.com

Latest posts by নাহিদা নাহিদ (see all)