হোম গদ্য গল্প তুষ্টি ও আয়না…

তুষ্টি ও আয়না…

তুষ্টি ও আয়না…
274
0

আজকের সূর্যের রং অন্যান্য দিনের মতো নয়। তীব্র সোনালি। ঝকঝকে এই সকালে অনেক কিছু মনে পড়ে। দাদাদাদি, মেজো কাকা। মৃতদের তালিকাটা বাড়াতে চাইলে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়। তুষ্টিও তেমনি এক নাম। যাকে সময় কিংবা অসময় গলা টিপে হত্যা করেছিল। এই মৃত্যু প্রাকৃতিক নয়। একজন বিশ্বাসঘাতক এসে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তুষ্টিকে। ছেলেটির নাম রাজু। এসব ছদ্মনামের ভিড়ে আসল নামটি না হয় হারিয়ে যাক। তাতে যদি কিছুটা ক্ষরণ কমে। যখন সত্যিকারের মানুষটিই মৃত তখন নকল নামটিতে কী যায় আসে।


আঠার বছরের আয়নার ভাঙন আমার তরফ থেকে নয়। হয়তো তুষ্টির তরফ থেকেও নয়।


ওই যে চট্টগ্রাম কলেজ গেট। এই গেটের সামনে একদিন দুই প্রহর দাঁড়িয়েছিলামমামুনের জন্য। মামুন আমার বন্ধুসখা কিংবা প্রেমিক টাইপের কিছু হবে। আজকালকার প্রেম বলতে যেমন ছোঁয়াছুঁয়িহাত ধরাধরিনা হলেও কিছুটা নৈকট্য বোঝায় আমাদের মধ্যে তেমন কোনো আবেশ ছিল না। শুধু মন দেওয়া-নেওয়া। সেটাও হয়তো বয়সের দোষ। আর মামুনকে ঘিরে আবর্তিত হতো না বিয়ে-শাদির মতো ব্যক্তিগত স্বপ্ন কিংবা তেমন কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকলেও এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণ ও রাজনীতি করত। ক্যারিয়ারের বিষয়ে কোনো সচেতনতা ছিল না। এমনকি মাস্টার্স ড্রপ দেয়ার খবরটুকু পেয়েছিলাম জ্যোতির কাছ থেকে। সেদিন প্রচণ্ড কষ্ট। বৃষ্টি, দমকা বাতাস। জানি নাজ্যোতির কাছে পাহাড়সম কষ্টটাকে লুকাতে পেরেছিলাম কিনা কিন্তু একটা অপমানবোধ ভেতরটাকে দুমড়েমুচড়ে ফেলেছিল। এরকম আরও অনেক ঘটনা রটনায় সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েনের শুরু। এসব অবশ্য অনেক পরের গল্প।

চট্টগ্রাম কলেজের গেট বলতে আমার চোখের রেটিনায় সেই দাঁড়িয়ে থাকার চিত্রটিই দীপ্তমানউজ্জ্বল। কারণ সেই সারাদিনের অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল একটা অধ্যায়। মামুনের সাথে সম্পর্কের সমাপ্তি আমাকে আহত করে নি। কিন্তু তুষ্টি এমন এক নাম যার আঘাতে ভেঙে খান খান হয়ে গেছে খুব শখের বেলজিয়ামের আয়না। এরপর কোনোদিন আর সেই আয়নায় মুখ দেখি নি। তবে স্বীকার করতে দোষ নেইতুষ্টি এক আয়নারই নাম।

এই আঠার বছরের আয়নার ভাঙন আমার তরফ থেকে নয়। হয়তো তুষ্টির তরফ থেকেও নয়। নিজের অজান্তেই হয়তো এই বিভাজন। আমিও কম বিকর্ষণ করি নি আত্মার সম্পর্ক!

ওই যে রাজু। হ্যাংলা পাতলা গড়নের। রাজুর সাথে তুষ্টির গভীর সম্পর্ক। যদিও সমাজ জানে না। অনেকটা প্রণয় পর্যায়ের সম্পর্ক, প্রতিদিন কথা হয়। দেখা হয়। একজন আরেকজনের হাঁড়িপাতিলের খবর জানে এই জানানৈকট্য আমাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু সেসব কষ্টকে অর্থহীন ভেবে হারিকেন জ্বেলে যখনি খুঁজতে গিয়েছিদেখেছিওরা একসাথে গল্পে মশগুল। খুনসুটি। রাজুর এক রুমের সংসারে অবাধ হরিণীর মতো তুষ্টির যাতায়াত। একজন প্রেমিকা যেমন অধিকার নিয়ে আগলে রাখে প্রেমিককে ঠিক তেমনি মমতা ওর চোখ এবং দেহের ভাষায়।


ধীরেঅতি ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নীলিমা নামের মেয়েটি ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না এ শহরের ঘুমন্ত মানুষজন


সেসব দেখতে পেয়েও আঙুল তুলি নি। কারণ আমার তো একটাই আয়না। অনেকদিনের অভ্যাস তাতে মুখ দেখার। সেই বদভ্যাস হুট করে পরিবর্তন করা সহজ নয়। কিন্তু পরিবর্তনটা অবশ্যম্ভাবী। ভেতর থেকে কে যেন তাগাদা দেয়। একজন কেউ ভাঙনের সুর তোলে। অনেকদিন ধরে বয়ে চলা  বিন্দু বিন্দু কষ্টগুলো জমাট বাঁধে। বরফ হয়। একটু সময় পেলে গলেও যায়। গোপন নদী কেবলি যন্ত্রণাদায়ক। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত গড়ায়। ভিজে যায় বুক। তবুও একটি ফোনের অপেক্ষা। তখন দেশে মোবাইল নামের যন্ত্রটি মোটামুটি সহজলভ্য। তুষ্টি চাকরিও করে এবং ফোন করা তেমন খরচের ব্যাপার নয়। তবুও ফোন আসে না। যাও-বা আসে ব্যস্ততার অজুহাতে কেটে যায় যখন-তখন।

আসলে তখন নীলিমার সময় থমকে আছে ঘড়ির কাঁটায় কিংবা চার দেয়ালের মাঝে একটি মেয়ে ভ্যানতাড়া গোছের কিছু আঁকার চেষ্টা করছে মাত্র। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে সেসব মুছেও দিচ্ছে সচেতন হাতে। এদিকে তুষ্টির সব সময় রাজুর নামে বিক্রি হতে দেখে কোথায় যেন একটা অভিমানী পাহাড় মাথা তোলে। এই পাথর চোখের সামনে দখল হয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আত্মপ্রকাশ ঘটছে নতুন এক জাতিসত্তার। ধীরেঅতি ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নীলিমা নামের মেয়েটি। ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না এ শহরের ঘুমন্ত মানুষজন

রোমেনা আফরোজ

কবি ও কথাসাহিত্যিক।
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; চট্টগ্রাম। পলিটিক্যাল সায়েন্স-এ এমএ করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং-এ এমবিএ করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম থেকে। পেশায় ব্যবসায়ী।

প্রকাশিত বই—
হরিণ কাঠের নৌকা [কবিতা, ঘাসফুল, ২০১৪]

ই-মেইল : afroze.romana@yahoo.com

Latest posts by রোমেনা আফরোজ (see all)