হোম গদ্য গল্প জ্যাকসন পোলক

জ্যাকসন পোলক

জ্যাকসন পোলক
343
0

গড়পড়তার সব মানুষই মনে করে নীল হলো বেদনার রং। গড়পড়তার সব মানুষই মনে করে লাল হলো বিপ্লবের রং। গড়পড়তার সব মানুষই মনে করে সাদা হলো পবিত্রতার রং। গড়পড়তার সব মানুষই মনে করে কালো হলো অন্ধকারের রং।

এইখান থেকেই শুরু হলো ঝগড়া।

লাল বলল, ‘সম্পূর্ণতই এবং মূলতই এগুলো খুব বাজে আর একঘেয়ে ধারণা। লাল কি কেবল বিপ্লবের ঝান্ডা হয়ে থাকবে? লাল কি কেবল আগুনের প্রতীক? এই যে একটা গ্রহ তার নাম তো মঙ্গল, সে তো লাল, তাই না? লাল গোলাপ কি পৃথিবীর মিষ্টিতম জিনিস নয়? মানুষ নেহাতই নির্বোধ একটা জাত। সব কিছুকে সরল সূত্রে ফেলে দেয়।’


আসলে রঙের ব্যাপারে আমাদের সবারই সীমাবদ্ধতা আছে। এমনকি ঈশ্বরেরও।


কথাটা সবুজের ভালো লাগল না। সে বলল, ‘তুমি নিজে কেমন জাতের বলো হে? তুমি তো এমন ঢালাও মন্তব্য করতে পারো না। অন্য জাতকে ছোট করে দেখা নেহাতই একটা বেয়াদবি। দেখো, আমার বিবেচনায় মানুষ খুবই বিবেচক জাতি। মিষ্টিকুমড়া খেতে মিষ্টি বলেই তারা তাকে মিষ্টিকুমড়া বলে ডাকে, বেগুন দেখতে বেগুনি রঙের বলেই তাকে বেগুন বলে। মানুষের সব কিছুর পিছনেই একটা কার্যকারণ থাকে।’

লাল সত্যিই ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘কী যুক্তির বাহার! করল্লা খেতে তিতা বলেই তা করল্লা! এসব ফালতু বাকোয়াজ ছাগলেও জানে। পাগলেও জানে। ধরো তোমার নাক বন্ধ করে দেয়া হয় যদি, আর ধরো তোমার চোখ বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে আপেল আর আলুর মধ্যে তুমি কী পার্থক্য পাবে? কিন্তু ভেবে দেখো আলুর রং আর আপেলের রং কতই না আলাদা। আসলে আপেলের রং তোমাকে কী বলে? আনন্দ? বেদনা? আলুর রং তোমাকে কী বলে মাটি নাকি একঘেয়ে পাথর?’

হলুদ দেখল পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। লাল সবুজে ঝগড়া লেগে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে। সে সব কিছু সামাল দেয়ার চেষ্টাতেই বলল, ‘দেখো, যারা বর্ণ অন্ধ তারা প্রায়শই হলুদ আর গোলাপির মধ্যে তর্ক জুড়ে দিতে পারে কিংবা বেগুনিকে বাদামি ভাবতেই পারে। কিন্তু বেগুন আর বাদাম এক নয় যেমন সরিষা ফুল আর গোলাপ ফুল এক নয়।’

লাল, হলুদ, সবুজ কথা বললে সাদা কি চুপ করে থাকবে? তারও তো কিছু বলার থাকতে পারে।

সে জ্ঞানী লোকের ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘আসলে রঙের ব্যাপারে আমাদের সবারই সীমাবদ্ধতা আছে। এমনকি ঈশ্বরেরও। নিশ্চয়ই তিনি অন্তত মানুষের রং গুলানো নিয়ে আরেকটু ভাবতে পারতেন। মানে প্রেমিকটি যদি হলুদ হতো, খুনিটি যদি সাদা হতো, কবি যদি লাল হতো, কেরানি যদি বেগুনি হতো, কুমারী যদি নীল হতো, যোদ্ধা যদি সবুজ হতো… মানে এই রকম হতো আর হতোই তাহলে ব্যাপারটা বেশ সৃষ্টিশীল হতে পারত। রং বিষয়ে আমাদের বিচ্ছিন্নতা থাকত না, ভুল ধারণা থাকত না। যে হেঁটে যাচ্ছে, যে ঘুমাচ্ছে, যে জন্মাচ্ছে, যে মারা যাচ্ছে, যে চলে যাচ্ছে, যে সুখে থাকছে তাদের সবাইকে আমরা আলাদা রং দিয়েই চিনে ফেলতে পারতাম।’

সাদার উদ্ধত ভঙ্গিটি মোটেই নীলের ভালো লাগল না। সে ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘আসছেন আমার সক্রেটিস! বিরাট জ্ঞানী! শোনো মিয়া, নতুন যখন দাড়িমোছ ওঠে সবাই নিজেরে বড় মনে করে। তুমি হইলা সাদা। সাদা কোনো রং হইল। আইছো পণ্ডিতি করতে। বোঝ না কিছু ওলেরে কও লিচু। নাস্তিকের মতো কইয়া দিলা সৃষ্টিকর্তাও রং বোঝে না। শালা ব্লগার। তোমার মতো রংহীন লোকের পক্ষেই এই সব বলা সম্ভব।’


ক্যানভাসের উপর ক্রমশ গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি ভরে উঠল নক্ষত্র, গ্রহ, ধূমকেতুনিহারিকায় আর রঙেরা পেল তার আদি ভাষা।


‘দেখুন নীল সাহেব, আপনি কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। সবাই জানে সাদা মানেই অত্যন্ত পুত পবিত্র, ঠাস করে আপনি আমাকে নাস্তিক বলতে পারেন না।’

এবার কথা বলে উঠল কালো রং। সে বেশ উঁচু স্বরেই বলল, ‘সাদা রং যদি পবিত্রই হয় তবে সকল ইউরোপীয়, স্ক্যান্ডেনেভীয় লোকেরা পবিত্র আর সুন্দর হতো। আর কালো রং যদি অন্ধকারই হয় অশুভই হয় তাহলে মার্টিন লুথার কিং কিংবা প্যাট্রিস লুলুম্বা কিংবা পল রবসন কিংবা ধরো নেলসন ম্যান্ডেলাকে তুমি কী বলবে?’

জ্যাকসন পোলক তখন বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলেন। তিনি ঘরে ঢুকতেই সব রং চুপ মেরে গেল। বোবা-কালা ভঙ্গিতে তারা কৌটায় শুয়ে রইল চুপচাপ।

জ্যাকসন পোলক একটা বেয়াড়া লোকের মতো সারি সারি রঙের কৌটার কাছে এলেন। মেঝেতে ফেলে রাখা বিশাল ক্যানভাসটায় নীল রঙের কৌটাটা উপুড় করে দিলেন, তার উপরে লাল রঙের কৌটাটা ছুড়ে মারলেন, তার উপর হলুদ রং ফোঁটায় ফোঁটায় ঢালতে লাগলেন। আবার দুইহাতে কালো ও সাদা রং মোটা তুলিতে চুবিয়ে রং ছিটাতে লাগলেন। আপাত এলোপাথারি, কিন্তু আসলে মহাবিশ্বের মতো সেখানে একটা ছন্দ আছে, নিখুঁত বিজ্ঞান আছে। ক্যানভাসের উপর ক্রমশ গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি ভরে উঠল নক্ষত্র, গ্রহ, ধূমকেতু, নিহারিকায় আর রঙেরা পেল তার আদি ভাষা। তারচেয়েও বড় কথা জ্যাকসন পোলকের সামনে সব রং তাদের আঁতলামি ছেড়ে লক্ষ্মীটি হয়ে থাকল।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

উপন্যাস—
মায়াবি মুখোশ
কমৎকার

ছোটগল্প—
অন্ধকারের গল্পগুচ্ছ
ছোট ছোট ছোটগল্প
শতগল্প
হয়তো প্রেমের গল্প

কবিতা—
চার লাইন

চলচ্চিত্র বিষয়ক—
বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র
১০ রকম ১০০ চলচ্চিত্র
বিচিত্র চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র সমগ্র
বিশ্বসেরা শত সিনেমা
অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র

নাটক—
দুইটি ব্রিটিশ নাটক
তিনটি মঞ্চ নাটক

অনুবাদ—
সাদাকো ও সহস্র সারস
বব ডিলান গীতিকা
কাফকা : অণুগল্প
সাফোর কবিতা

শিশুতোষ—
মজার প্রাণীকূল

চিত্রকলা বিষয়ক—
বেদনার রং তুলিতে একটি জীবন

প্রবন্ধ—
বই কেনা, বই পড়া
বই বিশ্ব
কিতাবি কথা

অন্যান্য—
তিতা কথা

সম্পাদনা—
অনির্ণীত হুমায়ূন

ই-মেইল : moomrahaman@gmail.com

Latest posts by মুম রহমান (see all)