হোম গদ্য গল্প জ্ঞানী-গুণী বেগুনি

জ্ঞানী-গুণী বেগুনি

জ্ঞানী-গুণী বেগুনি
965
0

রাজা প্রতিবারের ন্যায় এবারও জ্ঞানী-গুণীদের সম্মানে রাজদরবারের সবুজ লনে অনাড়ম্বর এক প্রীতিভোজসভার আয়োজন করিয়াছিলেন। এবারের আয়োজনটি ছিল অন্যান্য যেকোনো বারের চেয়ে আলাদা। কারণ, এবার রাজা স্বয়ং তাহার সুমিষ্ট কণ্ঠে স্বরচিত একখানি কবিতা পাঠ করিয়াছেন এবং একখানি গানের দুই কলি গাহিয়া শোনাইয়াছেন। তাহার কবিতা ও গান শুনিয়া উপস্থিত দর্শকমণ্ডলী আনন্দে উচ্ছ্বসিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। দর্শক-শ্রোতার করতালিতে কলকাকলিমুখর হয়ে উঠেছিল সেই মুহূর্তটি। কতকাল পরে এমন একটা মাহেন্দ্রক্ষণ জ্ঞানী-গুণীরা উপভোগ করিলেন হিসাব লেখা নাই। সত্যিই অনবদ্য ছিল রাজার কবিতা ও গান। আমাদের রাজা যেমন যোগ্য শাসক তেমনি একজন বড় মাপের শিল্পী।

জ্ঞানী-গুণী যাহারা নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছিলেন, উহাদের বেশির ভাগই খয়ের খাঁ। ভোজপর্ব শেষে অর্থাৎ মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে উহারা উহাদের সেই নজির রাখিয়াছিলেন।


রাজ্যভার গ্রহণ করিবার পর হইতে আমি সুঅভিনয় করিতে পারিতেছি। এ জন্য মহান রাজাকে অশেষ ধন্যবাদ। 


প্রথমেই পক্ব কেশের এক খ্যাতনামা পণ্ডিত অধ্যাপক রাজাকে কুর্নিশ করিয়া বক্তব্য শুরু করিলেন। বলিলেন, রাজ্যে শান্তির সুবাতাস বহিতেছে। প্রমাণ হিসাবে বাহিরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া সবার উদ্দেশ্যে বলিলেন, আপনারা চক্ষু মেলিয়া দেখুন, ইতঃপূর্বে এইরূপ ঝলমলে গগন আপনারা দেখিতে পাইয়াছেন কিনা। কিভাবেই বা দেখিবেন, দুঃশাসনে আমাদের রাজ্য তো মড়ার রাজ্য হইয়া গিয়াছিল। অনিয়ম, লুণ্ঠন, ব্যভিচার এবং অপশাসনের কড়াল গ্রাসে রাজ্যবাসী মুহ্যমান হইয়া পড়িয়াছিল। দেবতাও রাজ্যের উপর ভীষণ রুষ্ট হইয়া পড়িয়াছিলেন। কিন্তু এখন আর সেই দশা নাই। নতুন সূর্য উদিত হইয়াছে। দেবতাও দারুণ খুশি হইয়াছেন। তাই তো আমাদের রাজ্যে এখন আর খরা নাই। ঘূর্ণিঝড় নাই। অতিবৃষ্টি নাই। আছে ঘরে ঘরে ফসল তোলার আনন্দ উৎসব। তামাম জিন্দেগিতে আমরাই একমাত্র জাতি, দেবতা যাহাদের উপর পূর্ণ সন্তুষ্ট। এমন বিরল সৌভাগ্যবান জাতি হইতে পারিয়া আমরা ধন্য। আমরা আর দুঃশাসনের অভিশাপ চাই না। সারাজীবন বর্তমান রাজাকেই পাইয়া যাইতে চাই। সবশেষে তাহাকে ধন্যবাদ জানাইয়া আমি আমার বক্তব্য শেষ করিতেছি যাহার কারণে দেবতা খুশি হইয়াছেন; তিনি আর কেউ নন, আমাদের ভাগ্যনিয়ন্তা মহামান্য রাজাধিরাজ। আপনার জয় হোক! পণ্ডিতের বক্তব্য শেষ হইতেই করতালির খই ফুটিতে লাগিল। রাজাও স্মিত হাসিয়া করতালি দিলেন।

তারপর মঞ্চে আসিলেন বিশ্বজয়ী এক চিত্রশিল্পী। বলিলেন, কিছু দিন পূর্বেও আমি ছবি আঁকিতে গেলে কে যেন আমার হস্ত টানিয়া ধরিত। বলিত, ছবি আঁকিয়ো না, ওরা তোমার ছবি ছিঁড়িয়া ফেলিবে, তোমাকে কারাগারে পাঠাইবে। তাই আমি চুপচাপ বসিয়া থাকিতাম আর ফুল, পাখি, ঝরনা, ভেড়া, গরু, বকরি, প্রজাপতি ইত্যাদি দেখিয়া সময় কাটাইতাম। এভাবে কিছুদিন কাটাইবার পর আমি অসুস্থ হইয়া পড়িলাম। আমার চোখ গর্তে পড়িয়া গেল। চোয়াল ভাঙিয়া যাইতে লাগিল। ঠোঁট কালো হইয়া গেল। মনে হইতে লাগিল ছবি আঁকিতে না পারিলে আমি মরিয়া যাইব।

এরই মাঝে অকস্মাৎ দিন বদলাইয়া গেল। আমাদের প্রিয় রাজা মসনদে আসীন হইলেন। যেন অতি দূর সমুদ্রের ওপার হইতে শীতল হাওয়া আসিয়া পরশ বোলাইতে শুরু করিল। আমার ঘর সেই হাওয়ায় ভরিয়া গেল। মনে হইল, হাওয়ার সাথে একজন জাদুকর আসিয়াছেন। তিনি আসিয়াই আদেশ করিলেন, আঁকো। যত ইচ্ছা আঁকিয়া যাও। তিনি চোখের পলকে আমাকে দিয়া একটার পর একটা ছবি আঁকাইয়া নিলেন। একটা দুইটা তিনটা করিয়া সেই রাতে আমি একশত ছবি আঁকিলাম। আমার আর কোনো বাধা রইল না। মুক্ত হইয়া গেলাম। এখন আমি যেমন খুশি তেমন আঁকিতে পারি। আমি পূর্ণ, স্বাধীন।

চিত্রশিল্পীর বক্তব্যের পর আবার করতালির খই ফুটিল। রাজা স্মিত হাসি হাসিলেন।

ইহার পর একজন সাহিত্যিক আসিলেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। জন্ম থেকেই ইহা খোঁড়া। কিন্তু অনেক বড় সাহিত্যিক। সবাই বলিয়া থাকেন, তিনি ইশ্বরপ্রদত্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি শাদা পৃষ্ঠায় মুক্তো ফলান। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পাঠক তাহার বই কিনিয়া ধন্য হয়। সাহিত্যিক মঞ্চে আসিয়া রাজাকে কুর্নিশ করিয়া বলিলেন, আমার সাহিত্যের রূপ-রস-গন্ধ এবং তথ্য-ভাণ্ডার হইল রাজদরবার। দখিন হাওয়া যেমন সমুদ্র থেকে শীতল পরশ নিয়ে আসে তেমনি মহৎ সাহিত্যের সমস্ত রসদ পাওয়া যায় রাজদরবারের আশেপাশে হাঁটহাঁটি করলে। তাই তো আমি চুপিসারে নিয়মিত রাজদরবারের আশেপাশে ঘুরঘুর করি। হাঁটিলেই সুধা পাই। পাই প্লট, কাহিনি, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমাদের রাজা স্বয়ং দেবদূত। তাহাকে দেখিলে আমার ভেতর থেকে সাহিত্য বেরিয়ে আসে। তাহাকে ভাবিলে আমার ভেতর থেকে সাহিত্য বেরিয়ে আসে। আমি ধন্য রাজার ধন্য লেখক। তিনি একটি ছড়াপাঠ করিয়া তাহার বক্তব্য শেষ করিলেন—

হাঁটুভাঙার লেখক আমি
হাঁটুভাঙা বাড়ি—
ভেঙে ভেঙে লিখি আমি
ভেঙে ভেঙে পড়ি।

সাহিত্যিকের ছড়া শুনিয়া রাজার হাসিটা কিঞ্চিৎ প্রসারিত হইল। করতালিরও একই অবস্থা।

একজন অভিনেতা বলিলেন, পূর্বে অভিনয় করিয়া বিশেষ আরাম পাইতাম না। কিন্তু আমাদের বর্তমান রাজা তাহার স্বীয় স্কন্ধে রাজ্যভার গ্রহণ করিবার পর হইতে আমি সুঅভিনয় করিতে পারিতেছি। এ জন্য মহান রাজাকে অশেষ ধন্যবাদ। আপনি দীর্ঘজীবী হউন।

মাঝখানে আরো অনেকের বক্তব্য থাকিলেও সাংবাদিকের বক্তব্য সবার শেষে রাখা হইয়াছিল। কারণ তিনি ছিলেন সবার আকর্ষণ।

বিশিষ্ট সাংবাদিক লাগামহীনভাবে বলিতে লাগিলেন, আমাদের রাজ্য এখন প্রশান্ত মহাসাগরের ন্যায় শান্ত। কোথাও কোনো দুঃসংবাদ নাই। দুর্ঘটনা নাই। অপরাধ নাই। পুরো রাজ্য ঝকঝকে তকতকে। চারিদিকে শুধু সুসংবাদ আর সুসংবাদ। এই রাজ্যে হাঁটিয়া আরাম। দৌড়ায়া আরাম। এই রাজ্যে রহিয়াছে সীমাহীন নিরাপত্তা। নাই দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, হত্যা। নাই পুলিশি নির্যাতন। নাই হিংসা, বিদ্বেষ, হঠকারিতা। এ যেন রূপকথার রাজ্য। এমন রাজ্য ত্রিভুবনে নাই। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়াছি, আমাদের সংবাদপত্রের নাম দৈনিক প্রভাত আলো পাল্টাইয়া দৈনিক সুসংবাদ রাখিব। রাজাধিরাজ যদি অনুমতি করেন তাহলে আর একটি কথা বলিতে চাই, সেটা হইল, আগের রাজার আশীর্বাদপুষ্ট একটি খবরের কাগজ এখনো প্রকাশ হইতেছে। আমি মনে করি, সেই খবরের কাগজখানা অনতি বিলম্বে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা উচিত। কারণ ওই কাগজে মাঝে মাঝে বানোয়াট দুঃসংবাদ ছাপা হইয়া থাকে—যা রাজ্যের জন্য হিতকর নহে।


আগের রাজার ভোজসভায় বক্তারা একই বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। জ্ঞানী-গুণীদের নাক কাটা গেল। 


সবশেষে মহান রাজাধিরাজের সুস্বাস্থ্য কামনা করিয়া আমি আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এখানেই শেষ করিতেছি।

সাংবাদিকের বক্তব্য শেষ হইতে যথারীতি করতালির খই ফুটিল। পাশপাশি কয়েকজন জ্ঞানী-গুণী সাংবাদিকের বক্তব্যকে স্বাগত জানাইলেন এবং আগের রাজার খবরের কাগজটি বন্ধ করিবার জন্য স্লোগান দিলেন—

নিকুচি করি নিকুচি করি
আগের কাগজের নিকুচি করি।

আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্য শেষে রাজা আনন্দিত হইয়া বলিলেন, এই দিনটি আমার স্মৃতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকিবে। আপনারা হইলেন রাজ্যের সম্পদ কারণ যেকোনো রাজ্যের প্রাণশক্তি সেই রাজ্যের জ্ঞানী-গুণীজন। তাই আপনাদের সাথে সময় কাটাইতে পারিয়া আমি আনন্দিত, অভিভূত!

রাজার বক্তব্য শেষ হইতেই রাজার ব্যক্তিগত সহকারী একটি বিশেষ রেকর্ড বাজাইয়া দিলেন। আমন্ত্রিত জ্ঞানী-গুণীদের বক্তব্য ভাসিয়া আসিল। প্রথমে মনে হইল, একটু আগে তাহারা যেই বক্তব্য প্রদান করিয়াছেন তাহাই বাজিতেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিষয়টি স্পষ্ট হইল—না, ইহা বেশ কিছুকাল আগের রেকর্ড। রাজার ব্যক্তিগত সহকারী বিষয়টি আরো স্পষ্ট করিয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, আগের রাজার ভোজসভায় বক্তারা একই বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। জ্ঞানী-গুণীদের নাক কাটা গেল। তাহারা ভয়ে ও লজ্জায় বেগুনি হইয়া পড়িলেন।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com