জুতো

জুতো
191
0

এমন একটি ইচ্ছার কথা শুনে স্বভাবতই আমাদের থমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা থমকে যাই না, যেতে পারি না। আসলে কোনো অঘটন শুনে থমকে যাওয়ার নিয়মের কিছু পরিবর্তন এসেছে বলে আমরা থমকে যাওয়া থেকে সুকৌশলে নিজেদের সরিয়ে রাখা শিখে নিয়েছি। এই যে গত কয়েক দিন আগে ধর্ষিত হলো ছয় বছরের শিশু হিয়া, যৌনাঙ্গ ছিঁড়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মারা গেল এবং মারা যাওয়ার পূর্বে সে তার মাকে বলে গেল, পাশের বাড়ির হাবলু তাকে আখক্ষেতে নিয়ে গিয়েছিল। সম্পর্কে হাবলু হিয়ার কাকা। এমন ঘটনা শুনে আমরা ক্রোধান্বিত হই না, কারণ ক্রোধান্বিত হওয়ামাত্রই সাত বছর বয়সী কারো কথা মনে আসে, আপনার বা আমার মেয়ে, নাদিয়া অথবা জিনিয়া। অতএব আমরা ভুলে যাই, যেতে বাধ্য হই, হিয়া বেঁচে থাকে, আমাদের ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে হানা দেয়, দুঃস্বপ্ন হয়ে। অথবা এই ধরুন, গাড়ি চাপা দেওয়ার ফলে ঘটে যাওয়া নিয়মিত মৃত্যু, বরং এ নিয়ে কথা না বলা ভালো, এটা নৈমিত্তিক, এটা স্বাভাবিক। কিংবা একুশ বছরের তরতাজা সিন্ধু, সকালে ঘুম থেকে উঠে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশে বের হয়, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে, সিন্ধু বাড়ি ফেরে না, স্বভাবতই সিন্ধুর মা দুশ্চিন্তা করেন, সিন্ধুর ফোন বন্ধ, বন্ধুবান্ধবরাও কেউ তার খোঁজ দিতে পারে না। কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না সিন্ধুকে। খুঁজে পাওয়া যায়, সিন্ধুকে আপনিই খুঁজে পান, পরের দিন, দৈনিক হাতে নিয়ে নাস্তার টেবিলে ‘এক অজ্ঞাতনামা যুবকের লাশ’ হয়ে আপনার প্লেটে ঠিক জায়গা করে নেয় সিন্ধু। আপনি থমকে যান? হয়তো থমকে যান না বা গেলেও না যাওয়ার অভিনয় করে যান, নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকেন, কারণ আপনার ছেলেটিও তো প্রতিদিন কলেজে যায়। অতএব আপনি এত দিনে বুঝে গেছেন, গুটিয়ে যাওয়ার চাইতে আর কোনো ভালো বিকল্প আপনার সামনে নেই।

‘মাই লাভলি বেবি, তোর কোন ইচ্ছেটা অপূর্ণ রেখেছি!’ যেহেতু আমরাই থমকে যাই না, তালুকদার ইমরানের থমকে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

‘ওহ ড্যাড, আই নো, বাট…’

‘জাস্ট গিভ মি সাম টাইম, মাই বেবি।’ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার রিঅ্যাকশন দেখার চেষ্টা করেন তালুকদার ইমরান।


একমাত্র মেয়ে মানুষের চামড়ার তৈরি জুতো পরার ইচ্ছা পোষণ করেছে।


আমরা ভাবতে চাই না, তবুও আমাদের ভাবনার মধ্যে ব্যাপারটা চলে আসে, এ রকম চাওয়া কেউ একজন কিভাবে চাইতে পারে, যার বয়স মাত্র উনিশ বছর! কেনই-বা তার ইচ্ছা হয় মানুষের চামড়া দিয়ে বানানো জুতো পরবার? কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বরাবরের মতোই আমাদের পিছু হটতে হয়। তবুও আমরা জনশ্রুতিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকি এবং এর মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে কিছু সত্য, যেগুলোকে আমরা আমাদেরই স্বার্থে মিথ হিশেবে চালিয়ে দিতে চাই, চালিয়ে দেওয়াটাই আমাদের জন্য নিরাপদ, আমরাই সেই মধ্যবিত্ত, যারা বিপদের অগ্ন্যুৎপাতের কেন্দ্রে বাস করে বিপদ এড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টায় নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেই।

‘ডোন্ট ইউ রিমেম্বার? মাই বার্থ ডে?’ মুচকি হাসে কারিনা। হাসিটা মুহূর্তেই তাচ্ছিল্যে রূপান্তরিত হয়।

‘ওহ মাই গড!’ তালুকদার ইমরান উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। সময় খুব কম। মাত্র আট দিন। এর মধ্যেই পার্টি অ্যারেঞ্জ করতে হবে। শহরের সব ভিভিআইপিদের ইনভাইট করতে হবে। ধনাঢ্য বিজনেসম্যান, বর্ষীয়ান নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাকসাইটে আইনজীবী, নামকরা চিকিৎসক, নামিদামি কোম্পানির কর্ণধার, বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার, শ্রদ্ধেয় বিচারপতি—সবাইকেই ডাকতে হবে, দুই একজন রাষ্ট্রদূতও থাকতে পারেন।

‘আই ওয়ান্ট মাই শুজ এট দ্যাট ডে।’

তালুকদার ইমরান, শহরের অন্যতম প্রধান ব্যবসায়ী, তার কথায় এই শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার মার্কেট এমনকি রাজনীতির চাকা পর্যন্ত ঘোরে। তার একমাত্র মেয়ে মানুষের চামড়ার তৈরি জুতো পরার ইচ্ছা পোষণ করেছে, এটা প্রকারান্তরে তার জন্যও বিশাল গর্বের ব্যাপার। এমন একটা ব্যাপার নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোয় হৈহুল্লোড় পড়ে যাবে, পেপার-পত্রিকায় তার মেয়ের ইন্টারভিউ ছাপবে, টিভি চ্যানেল থেকে অনেকেই এসে তার মেয়ের সাক্ষাৎকার নেবে, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তালুকদার সাহেবের শত্রুরা তার ক্ষমতা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাবেন।

তালুকদার সাহেবের প্রায় সব কাজেই ডাক পড়ে কান্তুর। তালুকদার ইমরানের একান্ত মানুষ সে, জন্মের কয়েক দিন পূর্বেই তার বাবা মারা যায়, তালুকদার সাহেবের এলাকায় জমিজমা নিয়ে একটা গণ্ডগোলের জের ধরে এলাকায় খুনখারাবি ঘটে, একটা গলা কাটা লাশ পাওয়া যায় তালুকদার ইমরানের বাড়িসংলগ্ন পুকুর পাড়ে, মুণ্ডহীন দেহে নাভির কিছুটা নিচের জন্মদাগ দেখেই কান্তুর মা স্বামীকে শনাক্ত করেন, কিন্তু এটা যে কান্তুর বাবারই দেহ, তা স্বীকার করে নেন না, কান্তুরও বাবাকে চেনার কথাও না, তখনো সে মায়ের পেটে। কিছুদিনের মধ্যে কান্তুর মারা যান মা। জনশ্রুত, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় মারা যান আদুরী। যারা বালিশচাপা দিয়েছিল, তারা ভেবেই নিয়েছিল পেটের বাচ্চার আর কী এমন শক্তি? কিন্তু কান্তু পেরেছিল, পারতে হয়েছিল, আসলে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা একটা জঘন্য ইচ্ছে, এই ইচ্ছেতে জন্মের পূর্ব থেকেই মানুষ নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলে, কান্তুও তুলেছিল, আলফু ফুফু মৃত্যুরত আদুরীর গোঙানিকে প্রসব বেদনা ভেবে তার ঘরে গিয়ে দেখেন আদুরী নেই, কিন্তু লক্ষ করেন সদ্যমৃত আদুরীর পেট থেকে একটি পা শূন্যে নিজের অস্তিত্বকে ছুড়াছুড়ি করছে। আলফু ফুফু সেই পা ধরে একটা জীবনকে টেনে বের করে আনেন, নাম রাখেন কান্তু। আদুরীর হত্যাকাণ্ড একটা স্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে ঝুলে থাকে মানুষের মনে, কিন্তু আদুরীকে কে বা কারা, কার নির্দেশে, কেন বালিশ চাপা দিয়েছিল—এই ব্যাপারটা জানে শুধুমাত্র আলফু ফুফু, আরও পরে জেনেছে কান্তু। এলাকায় কানাঘুষা আছে কান্তুর বাবা হয়তো কান্তুর বাবা নয়, হ্যাঁ, অন্য যে কেউ হতে পারে, তালুকদার? না এই নাম মুখে আনার সাহস গিলে খেয়ে নেয় এলাকাবাসী। অতএব কান্তুর বাবা কান্তুর বাবা নয় এমন সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়, অসহায় পিতামাতাহীন একজন বাচ্চাকে তালুকদার ইমরান দয়াপরবশ হয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় দেন, তার বোন আলফুকে কান্তুর সকল দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিজেকে একজন মহামানব হিশেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা করেন। আলফুর অধিকারে মানুষ হতে থাকে কান্তু। দেখতে মানুষের মতো হলেও তার আর মানুষ হয়ে ওঠা হয় না, কান্তু নিজেই মানুষ হয়ে উঠতে চায় না, সে যে মানুষ হতে চায় না সেটার প্রমাণ তালুকদার ইমরান নিজেও পেয়েছেন, বছর পাঁচেক আগে তিনি নিজ এলাকায় একটা কোল্ড স্টোরেজ দেওয়ার জন্য জমি পছন্দ করতে গিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাক, ঝামেলা পাকিয়েছিল সুকুদ্দি মিয়া, রাস্তার পাশের জমিটা কিছুতেই বিক্রয় করতে চায় না সে। কান্তু সমাধানের একটা সহজ রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিল। সুকুদ্দির তরতাজা লাশটা তার জমির উপরেই উপুড় হয়ে পড়েছিল। তখন থেকে কান্তুর সামর্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের কোনো সন্দেহই থাকে না তালুকদার সাহেবের। কান্তুকে তিনি ঢাকায় নিয়ে আসেন, ঢাকায় এসে কান্তু আরও বেশি করে ভুলে যেতে থাকে যে সে দেখতে মানুষের মতো হলেও আসলে মানুষ না, শুধু সে-ই নয়, আসলে ঢাকা শহরের মানুষগুলো নিজেদের মানুষ হিশেবে দাবি করলেও কেউই মানুষ না।

‘কাকা, এট্যাঁ কুনু ব্যাপার হোল্যো’, তালুকদার ইমরানকে কাকা বলেই সম্বোধন করে কান্তু, তবে অফিসের নিয়ম ভিন্ন।

‘জানি, একমাত্র তোর পক্ষেই সম্ভব, তাই তো এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারি…’ তালুকদার সাহেবের চোখেমুখে কান্তুর প্রতি অগাধ আস্থা ঝলমল করে ওঠে। তিনি ভালো করেই জানেন কান্তু তার নির্দেশে কতটা আজ্ঞাবহ, এমন কোনো কাজ নেই—যেটা সে তালুকদারের জন্য করতে পারে না।

‘কাকা, হ্যামাকে আপনিই তো বাঁচিয়্যা থুয়্যাছেন, খাওয়াইয়্যা, পরহিয়্যা’ কান্তু নিজেকে অভিশাপ দেয়, নিজেকে নিজের প্রতি অভিশাপ দিলেই সে তার কাজটা ঠিকঠাক মতো করতে পারে।

‘একটু কারিনার সাথে কথা বলে নিস।’ তালুকদার সাহেব ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজের কাজে মনোনিবেশ করে কান্তু। কারিনার সাথে কথা হয় তার। কথা হয় বিবেক মুচির সাথেও। বিবেক মুচি বলেছে, মর্গে পড়ে থাকা লাশের চামড়া দিয়ে কাজ হবে না। কান্তু বুঝতে পারে, বুঝতে পারে আসলে কী করতে হবে তাকে।

কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে দেখতে গাইবান্ধার শফিক গাজী আসেন মানুষের চিড়িয়াখানা, অচেনা এই শহরে। এ শহরের চিড়িয়ারা বন্দি থাকে না, তা শফিক গাজীর অল্প বিস্তর জানা থাকলেও বিস্তারিত জানা ছিল না। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে নেমে তিনি ছেলের সাথে মোবাইলে কথা বলেন, কথা শেষ হলে মেইন রোডে এসে একটা সিএনজি ডেকে দর কষাকষি করার সময় একটা প্রাইভেট কার তার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং এর ড্রাইভার কারের গ্লাস নামিয়ে মাথা বের করে শফিক গাজীকে জিজ্ঞেস করে, তিনি কোথায় যাবেন। শফিক গাজী সহজ মানুষ, কঠিন কথা সহজ করে বলাতে কথাগুলোকে তার কাছেও সহজই মনে হয়। ড্রাইভিং সিটে বসা কান্তুর চোখ চকচক করে ওঠে।

রাত পেরুনোর পূর্বেই হালকা জ্যামের মতো একটা খবরে কিছু সময়ের জন্য আটকে যায় শহরবাসী। বসিলা বেড়িবাঁধের অদূরে একজন মানুষের একটা মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা—কিন্তু এই ঘটনায় কিছুটা রঙ চড়িয়েছে খুনি নিজেই, এই কারণেই হয়তো কিঞ্চিৎ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে খবরটি। খুন হওয়া মানুষটির শরীর থেকে চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছিল, খুনের মোটিভ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সম্ভাবনা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দৈনিকের ভেতরের পাতার কোনো এক জায়গায় ডালপালা ছড়িয়েছে। যেহেতু সারা শরীরে চামড়া ছিল না, তাই খুন হওয়া মানুষটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি, আর যে মানুষকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি, ধরে নেওয়া যেতে পারে, হয়তো মানুষটির অস্তিত্বই ছিল না। আসলে এসব খবরে এখন আর কারও কিছু যায় আসে না, তবে এই খবরটা শোনার পর শহরের অনেকেই, এমনকি আমরাও নিজেদের চামড়ায় চিমটি কেটে দেখেছি এবং নিশ্চিত হয়েছি আমাদের চামড়া এখনো যথাস্থানে আছে। শফিক গাজীর এই অনস্তিত্ব তার জন্য নয়, বরং তার কলেজপড়ুয়া ছেলে এবং পরিবারের জন্য ঠিক কী ধরনের দুঃসংবাদ বয়ে এনেছিল, তা অবশ্য আর ঘেঁটে দেখার সময় আমাদের হয় নি। শফিক গাজী-বিষয়ক খবরটা নিয়ে কিছুটা সময় পার করা যেতে পারত, কিন্তু তা হয় নি, কারণ আরও একটা সংবাদ শফিক গাজীর সংবাদ হয়ে ওঠাকে খুব দক্ষতার সাথে সামলে নিয়েছিল। শহরবাসী, মানে আমরা, যারা এই সংবাদটা ঠিকমতো উদ্‌যাপন করতে পারি নি, তারা কিছুটা বিরক্ত বোধ করি নি—এ কথাও ঠিক না, তবে এই বিরক্তিবোধ দ্রুতই কেটে যায়। ঠিক পরের দিন রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্র মুহূর্তেই ‘অভাগা’ হয়ে যান, নিউজ পোর্টালগুলো খুব সহজেই মেধাবীর তালিকা থেকে তাকে নামিয়ে আনে অভাগার দলে। ঘটনা অতি সামান্য, পদার্থবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আর তারই ইয়ারমেটকে সাথে নিয়ে একটা হুডতোলা রিকশায় চড়ে রাত সোয়া এগারটার দিকে হাতিরপুল বাজার নিকটবর্তী শর্মা হাউস থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরছিল। কাঁটাবন থেকে নীলক্ষেতের মাঝামাঝি জায়গায়, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের সামনে, গাউসুল আজম মার্কেটের কিছুটা ডান পাশে অথবা থানা থেকে দুই শ বাইশ মিটার দূরে, ছেলেটির রিকশা আটকিয়ে দাঁড়ায় দু-তিন জন অচেনা যুবক। ওরা আমাদের কাছে অচেনা—তবে পরস্পরের চেনা। অমার্জনীয় অপরাধ করেছে ছেলেটি। ছেলেটির মেয়েবন্ধুকে পছন্দ করত তারই হলের এক বড় ভাই, যিনি আবার উঠতি নেতাও; কোন সাহসে মেয়েটির প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে ছেলেটি, এ-ই ছিল অপরাধ। রিকশা আটকে দাঁড়ানো অচেনা যুবক তিনজনের দুজন কিচ্ছু করে নি, শুধু একজন পকেটে থাকা পিস্তল বের করে সকলের সামনেই ঠান্ডা মাথায় ছেলেটির মাথা বরাবর একটা, মাত্র একটা গুলি করেছিল। ব্যাপারটা অনেকের সামনেই ঘটেছে বিধায় কেউ কেউ পুরো ঘটনার ভিডিও করার সুযোগ পর্যন্ত পেয়েছে, সেটা ইতিমধ্যেই এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া দখল করে রেখেছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল দুইটা কুত্তার তাজা রক্ত চেটে দেখার স্বাদ পেয়ে তারা নিজেদের ভাগ্যবান ভেবেছিল এবং ভাবাটাই স্বাভাবিক। ঘটনার খুব কাছাকাছি থানা হলেও দূরত্বটা প্রায় পঁচিশ মিনিটের রাস্তায় ঠেকেছিল। ইতিমধ্যেই অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর মুহূর্তেই খবরে পরিণত হয় ছেলেটি, ‘অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীর গুলিতে নিহত হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাগা ছাত্র।’ বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের সাংবাদিকগণ সদ্য অভাগা হয়ে যাওয়া ছেলেটির সাথে থাকা তার প্রেমিকার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে, এক সাংবাদিক মেয়েটিকে জিজ্ঞেসও করেছে, ‘সরাসরি মানুষের মাথা বরাবর গুলি চালানো তিনি এর আগে কখনো দেখেছেন কি না; এবং যদি না দেখে থাকেন, তবে প্রথমবারের মতো এত কাছ থেকে কাউকে গুলি করতে দেখে তার অনুভূতি কী?’ এমন একটা অঘটন ঘটার পর স্বভাবতই চামড়া ছাড়া মৃতদেহটি; যাকে শফিক গাজী বলাও যাচ্ছে না, অখবরে পরিণত হয়ে যায়।

এমনই ঘটছে ইদানীং, একটা অঘটনের খবরে চাপা পড়ে যাচ্ছে আরেকটা অঘটনের খবর। মানুষ, মানে আমরা, তাতেও খুশি, যতক্ষণ পর্যন্ত না খবরের হেড নিউজে আমার নাম আসে। এমন একটা অবস্থা হয়েছে, সর্বশেষ মানুষটিও চুপচাপ থাকতে প্রস্তুত, কারণ এখনো তো সে খবর হয়ে ওঠে নি। দারুণ একটা সমঝোতা, আসলে সকলেই এই বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

নিজেকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে সামলে নেয় বিবেক মুচি, তবে এটা ঠিক, এমন সুন্দর জুতো সে এর আগে আর কখনোই তৈরি করতে পারে নি। সদ্য খুন হওয়া একজন মানুষের চামড়া দিয়ে জুতা বানানো মোটেও সহজ কাজ নয়, ভয় হচ্ছিল তার। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কথা বলে উঠল চামড়া, যদিও চামড়ার সাথে কথা বলা তার অভ্যাস, কিন্তু জীবিত চামড়ার সাথে কথা বলা? বিবেক মুচি পারে, পারতে হয়, টাকার সামনে সে ভয়কেও গিলে খেতে পারে। টাকা ছাড়া জীবন মৃতেরও অধম।

‘দ্যাট মাস্ট বি আ ব্লাডি পুওর, না হলে এই জুতা এত রাফ হবে কেন?’ কয়েক ধাপ হাঁটার পরই কারিনা বুঝতে পারে, তার পা খুব ব্যথা পাচ্ছে। কারিনা নিজের পা দুটোকে জুতো জোড়ার খপ্পর থেকে মুক্ত করে। রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় কান্তুর দিকে।

‘মানে তোমার পসন্দ হয় নি, তাই তো?’ কান্তু মোটেও বিরক্ত বোধ করে না, বিচলিত হওয়ার প্রশ্নই নেই। শান্ত মেজাজে জোড়া জুতোকে কারিনার পা থেকে খুলে সরিয়ে রেখে সে কারিনাকে জিজ্ঞেস করে, ঠিক কেমন মানুষের চামড়া দিয়ে বানানো জুতো হলে কারিনার পা খুশি হবে।

‘আই ডোন্ট নো।’

‘তবুও, যদি কোঁহিত্যা… আচ্ছা কোঁহিতে হোব্যে না, হামি বুঝ্যা লিয়াছি।’

কান্তু? তোমাকে কতবার বলেছি, এমন গেঁয়ো ল্যাংগুয়েজে আমার সাথে কথা বলবে না। বাট ইউ স্টিল… এনি ওয়ে ডু ইয়োর জব।’

‘আচ্ছা, অস্থির হোয়য়ো নাখো, হামি তোমার পসন্দমতন জুতার ব্যবস্থা করছি।’


প্রফেসরের চামড়া দিয়ে বানানো জুতা ভারী হবে, এটাই কি স্বাভাবিক?


কারিনার পায়ের চাহিদা অনুযায়ী আরেক জোড়া জুতোর চামড়ার খোঁজে নেমে পড়ে কান্তু। এবারের চামড়াটা হাতে নিয়ে বিবেক মুচি খুব খুশি হয়। কান্তুও কিছুটা আশ্বস্ত হয়। এবার যে জুতোটা বানিয়ে দেবে বিবেক মুচি, সেটা নিশ্চয় পছন্দ হবে কারিনার পায়ের। সে খুব খোশমেজাজে তালুকদার কাকার কাছে যায়। ‘কাকা, এব্যারকার যে মানুষের চামড়াটা জোগাড় করিয়াছি, সেটা খুব ভালো মানুষের চামড়া, জ্বী কাকা… বলেই কান্তু তার প্যান্টের পকেট থেকে এক টুকরো চামড়া বের করে মেলে ধরে, নাক চেপে ধরেন তালুকদার ইমরান।

বিবেক মুচি পূর্বের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে খুব যত্ন করে বানিয়ে নিয়ে আসে দ্বিতীয় জোড়া জুতো। কান্তুরও পছন্দ হয়, কিন্তু তার পছন্দ হলে তো আর হবে না, কারিনার পছন্দ হতে হবে। কারিনার কাছে এসে তাকে জুতো জোড়া দেখায় কান্তু, ‘বাবু, এই দ্যাখো তোমার ল্যাগ্যা আরাক জোড়া জুতো চোল্যা অ্যাস্যাছে, এব্যারকার জুতো জোড়া নিশ্চয় পছন্দ হোব্যে তোমার।’ কান্তু নিজের সক্ষমতাকে সাধুবাদ জানায়।

‘গ্রেট, খুব সুন্দর হয়েছে, আ’ লাইক ইট। বাবাকে বলে দিও, আ’ লাভ হিম ভেরি মাচ।’

কান্তু ভেতরে ভেতরে কিছুটা বিরক্ত হয়, এই যে সে দুজন মানুষকে খুন করে তাদের চামড়া এনে জুতো বানিয়ে দিল, তার কি একটা ধন্যবাদও প্রাপ্য ছিল না? বিরক্ত ভাবটাকে নিজের গোপনেই হত্যা করে কান্তু, ঠিক মানুষ হত্যা করার মতোই।

জুতো পরার পর কারিনার বেডরুমে রাখা দোল চেয়ারটায় বসে নিজের পা দুটোকে এদিক-ওদিক দোলাতে থাকে। কয়েক ধাপ হাঁটেও। পরক্ষণে সজোরে ছুড়ে মারে জুতো জোড়াকে, ‘ইটস ইম্পসিবল, এত ভারী শু, কান্তু, আমার বার্থডেটা রুইন করবে তুমি? শুজ না পেলে, ইউ নো? আ’ ইল সুইসাইড, আন্ডারস্টান্ড?’

দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ফিজিক্সের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর জনাব হামিদুল মাহবুব মৃধা সেদিন একটু আগেই কলেজ থেকে বেরিয়েছিলেন, মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে তাঁর স্ত্রী ভর্তি, জরায়ুর ক্যান্সার, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়েছে, চিকিৎসক বলেছেন কেমোথেরাপি দিয়ে কোনো লাভ নেই, বেশি দিন বাঁচবেন না। জনাব মৃধা বসে থাকেন নি, তাঁর সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেছেন। সামর্থ্য শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন সরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার যা অবস্থা, তাতে স্ত্রীর দ্রুত মৃত্যু কামনা করে দোয়া করা উচিত। কিন্তু মৃধা তা করেন না, করতে পারেন না। গুলিস্তান থেকে সমারোহ পরিবহনের একটা বাসের বাম সারির পেছনের দিকে জানালার পাশের একটা সিটে বসে তিনি ভাবছিলেন স্ত্রী লুতফুনের কথা, না ক্যান্সারে আক্রান্ত লুতফুনের কথা নয়, একুশ বছর বয়সী লুতফুনের কথা। আহা কী মায়ামোহ সেই মুখ! সব মায়া সংসারের জন্য ঢেলে আজ শুকনো গমের রুটির মতো হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। মরতে আপত্তি নেই তার, শুধু যমজ মেয়ে দুইটার কথা ভাবে, সবে ইন্টার পড়ছে। জনাব মৃধাও ভাবেন, স্ত্রী লুতফুন মরে গেলে মেয়ে দুইটার কী হবে? বাসের জানালা দিয়ে বারডেম হাসপাতালের শরীর দেখা যাচ্ছে, দেখতে দেখতে তিনি ভাবেন, মানুষ মরে গেলেই বুঝি বেঁচে যায়। তিনি মরে গেলেও কি বেঁচে যাবেন? না, কিছুতেই না। তাকে বাঁচতে হবে, লুতফুনের জন্য, মেয়ে দুইটার জন্য, তাকে বাঁচতেই হবে। কিন্তু তিনি চাইলে কী হবে? তিনজন কুকুর-মানুষ বাসে উঠে জনাব মৃধার পাশে বসে। বাসে বসে তারা জিরাপানি খাচ্ছিল, তাদের মধ্য থেকে একজন মৃধার দিকে একটা বোতল বাড়িয়ে দিয়ে তাকেও জিরাপানি খেতে বলে। স্ত্রী লুতফুন আর মেয়েদের কথা ভাবতে ভাবতে এমনিতেই কণ্ঠনালী শুকিয়ে হাঁ হয়ে ছিল মৃধার। তিনি হাত বাড়িয়ে বোতলটা নেন। তার আর ক্যান্সার হাসপাতালে পৌঁছানো হয় না, জানতে পারেন নি তাঁর স্ত্রী লুতফুন আর কদিন বেঁচে ছিল, মেয়ে দুইটা কেমন করে বেঁচে আছে! জানবেন কিভাবে? কান্তুর পোষা কুত্তার দেওয়া জিরাপানি খেয়ে খুব ঘুম পেয়েছিল প্রফেসর মৃধার, সেই ঘুম তাকে উত্তরা পেরিয়ে আশুলিয়া কামারপাড়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল, হয়তো তিনি সেখান থেকে ঘুরে আসতে পারতেন, পারেন নি। পরের দিন সকালে তুরাগে পুঁইশাক ধোয়ার সময় দু-তিনজন সবজি বিক্রেতা একটা লাশ ভাসতে দেখে, আঁতকে ওঠে তারা, ওঠারই কথা। এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মতো কিছু মানুষের মনে কিছুটা উৎসাহের সঞ্চার করে, মানুষ আনন্দিত হয়, নিশ্চয় কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ, দারুণ ব্যাপার, তিন দিনের ব্যবধানে দুইটা চামড়াহীন লাশ। পুলিশের কাজও কিছুটা হালকা করে দিয়ে গেছে খুনি। লাশের শরীরে চামড়া নেই, তাই কার লাশ তা শনাক্ত করার খুব একটা তাড়াও তাদের মধ্যে নেই, নেই বলাটা একদম ভুল। তারাও কি বসে আছে? তাদেরকেও ব্যস্ত থাকতে হয়, ছিনতাই, রাহাজানি, খুনোখুনি যেভাবে বেড়েছে, প্রায় প্রতিদিন খবর আসছে এখান-ওখান থেকে। জনাব মৃধার মৃতদেহটা থেকে গেলেও তিনি হারিয়ে যান; নতুন উঠতি সুন্দরী এক নায়িকার একটা ভিডিও ইন্টারনেটে খুব বাজার পেয়েছে। প্রায় সব বয়সী পুরুষের মোবাইলের মেমোরি কার্ডে জায়গা করে নিয়েছে সেই নায়িকা, খুব কাটতি এই ক্লিপের। কাটতি হবেই বা না কেন? একুশ বছর বয়সী নায়িকার প্রায় সাতাশ মিনিটব্যাপী যৌন অভিসারের লীলাখেলা, এই শহর তো বেঁচেই আছে এসব খেয়ে, এসব এই শহরের জন্য ভালো অ্যাপেটাইজারের কাজ করে। অতএব ‘মৃধা’, ‘তার ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রী’ বা ‘ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া দুই মেয়ে’র কথা মনে থাকার কথাও না এই শহরের মানুষদের।

প্রফেসরের চামড়া দিয়ে বানানো জুতা ভারী হবে, এটাই কি স্বাভাবিক? অবশ্য কান্তু ভেবেছিল অন্য কথা, সে তো আর ভাবে নি, শিক্ষিত মানুষের চামড়া কারিনার পছন্দ হবে না।

তৃতীয় জোড়া জুতোর চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়েও কোনো বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয় নি কান্তু। ঘাড়ের ওপর তালুকদারের মাথা থাকলে এগুলো দু টাকার মামলা। এবারের খুনটা কান্তু নিজে করে না। এমন অসম্ভব সুন্দর চামড়ার মেয়ে সে কখনোই দেখে নি, কখনও কী, আসলে সে তো কোনোদিন কোনো মেয়ের কাছাকাছি হয় নি, তার নিজের বয়স, সেও তো পঁয়ত্রিশ ছাড়িয়ে গেছে, এই অবধি সে আলফু আম্মা ছাড়া কোনো নারীর সান্নিধ্যে আসে নি, হ্যাঁ, আদুরীর পেটে সে ছিল বটে, কিন্তু আলফুই ছিল তার আম্মা, কান্তুর বয়স যখন এগারো, তখনই মারা যান আলফু, এই পর্যন্ত সে যে দুইজন নারীর ছায়া পেতে চেষ্টা করেছে, তারাই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। অতএব; নারী; না। মেয়েটার বয়স বিশের নিচে, এটা নিশ্চিত। মেয়েটিকে কিডন্যাপ করে নিয়ে আসা হয় তালুকদারের বাগানবাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুরে। প্রায় একাশি বিঘার বিশাল বাগান, অসংখ্য গাছগাছালিতে ভরা, গাছগাছালির ছায়ার আড়ালে একটা দুইতলা বাড়ি, বাড়ির তিন দিক কৃত্রিম লেক দিয়ে ঘেরা। শুনশান, কারও ঢোকার পারমিশন নেই, তালুকদার কাকা মাঝে মাঝে আসেন, তবে তিনি একা আসেন না, কখনো কখনো তার রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধবেরা আসেন, দু-তিনজন মেয়ে মানুষও আসে, সস্তার মেয়ে মানুষ না, তাই এদের মেয়েমানুষ বলা ঠিক কি না, কান্তু জানে না। এরা নাকি ক্লাস ওয়ান প্রস। তালুকদার কাকা একাও আসে, সে-সময় তালুকদার কাকার সাথে থাকে স্পেশাল একজন, এমনই স্পেশাল যে তার নাম মুখে নেওয়াও মানা, এটা অবশ্য কান্তুর জন্য প্রযোজ্য নয়, কারণ প্রত্যেক সময় কান্তুর উপস্থিতি আবশ্যক, তালুকদার কাকা তাকে ছাড়া এক পা-ও কোথাও নড়ে না। মেয়েটির শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে এই বাগানবাড়ির তেঁতুলতলায় পুঁতে ফেলা হয়। কেসটা একটু স্পর্শকাতর, তাই এই বিশেষ ব্যবস্থা। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, ক্লাস করে ফিরছিল, দুপুর দুইটার দিকে, হ্যাঁ, নিজেদের প্রাইভেট কারে ওঠার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মেয়েটিকে কিডন্যাপ করে সোজা নিয়ে আসা হয় এই বাগানবাড়িতে। মেয়েটি তালুকদার কাকার পূর্বপরিচিত, তবে কান্তু কাকাকে এসব কথা বলতে চায় না। কাকার বিজনেস প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বাস সাহেবের একমাত্র মেয়ে, প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে হলে তার মূল শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিতে হয়। অতএব ধরে নেওয়া যায়, কাকা শুনলে হয়তো খুশিও হতে পারেন।

বিবেক মুচিরই বা কী আসে যায়, সে অর্ডার পাবে, গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী মাল বানিয়ে দেবে, এ-ই তো তার কাজ, বিনিময়ে কয়েক গুণ বেশি মজুরি, কার চামড়া, কোথা থেকে এল, এগুলো নিয়ে তার না ভাবলেও চলবে।

পরপর তিনটা খুন, অবশ্য এ নিয়ে শহরবাসী মোটেও চিন্তিত না, এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক, এগুলো ঘটবে, প্রতিটা খবর শোনার পর এরা নিজেদের চেহারাটা আয়নায় দেখে, দেখে নিশ্চিত হয়, এই খবরের শিরোনাম অন্তত সে না, এতেই স্বস্তি বোধ করে, কে মরল তাতে তাদের কী যায় আসে? সে নিজে যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ কোনো সমস্যা নেই, অবশ্য মরে গেলেও সমস্যা নেই, মরে গেলে সে নয়, হয়তো তার পরিবার কিছুদিন শোক শরীরে জড়িয়ে ঘুরবে, তারপর সব স্বাভাবিক, মধ্যবিত্তের পেট এক অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়, ক্ষুধা তাদের সমস্ত স্মৃতিকে হজম করে ফেলতে সক্ষম হয়।

এই জুতো জোড়াও অপছন্দ করে বসে কারিনা, মানে ওর পা। এই জোড়া জুতো নাকি তার দিকে তাকিয়ে থাকে, খুব অস্বস্তি হয় কারিনার।

তিন জোড়া জুতোই এভাবে এক এক করে রিজেক্ট হয়। তালুকদার খুব বিরক্ত হন এবার। মেয়ের অস্থিরতা তাকেও অস্থির করে তোলে। হাতে আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা সময়। দমে যাওয়ার জন্য জন্ম হয় নি কান্তুর।

এবারের চামড়া হাতে নিয়েই অবাক হয় বিবেক মুচি। মানুষের চামড়া এমনও হয়। সে ভাবে এবার তার অনেক নামডাক হবে, সম্ভবত মুচি-জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জুতো বানাতে যাচ্ছে সে, খুব দ্রুত কাজে লেগে পড়ে বিবেক মুচি, হাতে সময় মাত্র দুই তিন ঘণ্টা…

এবারের জুতো জোড়া খুব পছন্দ করেন তালুকদার। ‘কান্তু এবার একটা কাজের কাজ করেছিস, এই জুতো জোড়া কারিনা অবশ্যই পছন্দ করবে, আমি ওর পছন্দ জানি, আমার মেয়ে না! আমারও খুব পছন্দ হয়েছে, তোকে কি আমি এমনি এত পছন্দ করি, তোর উপর এতটা নির্ভর কি আর এমনিই করি? বল? তোর তো একটা বোনাস পাওনা হয়ে গেল রে…’

কান্তু হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানায়।

কিছুক্ষণ পরেই জন্মদিনের পার্টি। তালুকদার সাহেব টেনশনমুক্ত। শহরের বিখ্যাত মানুষদের কমবেশি সকলেই উপস্থিত। দেশি-বিদেশি সকল প্রেস ও মিডিয়াকে খবর দেওয়া হয়েছে। আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থার কোনো কমতি নেই। যে যার মতো আনন্দ-ফুর্তি করছে, সব ধরনের ড্রিংক্সের ব্যবস্থা আছে, আছে দেশি-বিদেশি খাবারও। আলোয় ঝলমল করছে শহরের সবচেয়ে অভিজাত হোটেলের বল রুমটা। তালুকদার সাহেবের একমাত্র কন্যার জন্মদিন, একটা বিশেষ আকর্ষণ। অন্য রকম একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে। তালুকদার ইমরান কিছুক্ষণ পরে এমন একটা ঘোষণা দেবেন, যা নিয়ে ভেতরে ভেতরে তিনি নিজেও উত্তেজনা বোধ করছেন।

তালুকদার ইমরানের আর তর সইছে না। এতক্ষণে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। হল রুমটায় একেবারে পিনপতন নীরবতা খেলা করছে। ক্যামেরাগুলো জ্বলে উঠবার জন্য একদম প্রস্তুত। ‘সম্মানিত সুধী, শুভ সন্ধ্যা, এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে জানাই আন্তরিক অভিবাদন—আজ আপনারা আমার মেয়ের জন্মদিনের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আপনাদের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। আপনারা উপভোগ করুন, আর কিছুক্ষণের ভেতর আমরা মূল অনুষ্ঠান আরম্ভ করতে যাচ্ছি, আর হ্যাঁ, আজকের জন্মদিনের এই অনুষ্ঠানে আপনাদের জন্য আছে এক বিশেষ চমক।’

একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে ফিসফাস করে আলোচনা করতে লাগল, সবার প্রশ্ন, ‘কী এমন চমক?’

তালুকদার সাহেব এই ফিসফাস করতে থাকা হল রুমটাকে আরও কিছুক্ষণ সময় দিলেন, এরপর বললেন, ‘ক্যান ইউ গেজ এনিথিং?’

শহরের সবচেয়ে বড় মদের ব্যবসায়ী চিৎকার করে বললেন, ‘আপনার একমাত্র মেয়ে আজ টিনএজ শেষ করল… আমার ছেলে ইউএসএ প্রবাসী, বয়স ২৫ বছর…’

‘নো, নো, ইউ আর রং’ তালুকদার সাহেব হো হো করে হেসে এই উত্তেজিত উপস্থিতির শরীরে একটা স্বল্পমেয়াদী ঢেউ তুলে দিয়ে বললেন, ‘এনি ওয়ান? বলতে পারলে এক্সক্লুসিভ গিফট আছে।’ বিখ্যাত আর্কিটেক্ট মিস্টার খান বললেন, ‘এনি নিউ মেগা প্রজেক্ট ফরম ইয়োর ডেভেলপার হাউস?’

‘নো, নো মিস্টার খান, ইউ অলসো ফেইলড।’

শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত চিকিৎসক ডা. ইব্রাহীম বললেন, ‘প্রবাবলি আপনি একটা কর্পোরেট হাসপাতাল স্থাপনের অ্যানাউন্সমেন্ট করছেন?’

‘ডা. ইব্রাহীম, আপনি আছেন আপনার তালে…’ বিদ্রূপের সুরে কথা কয়টা বললেন তালুকদার ইমরান।

একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ইলিয়াস বললেন, ‘নতুন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ আরম্ভ হচ্ছে?’

‘নো, নো।’

‘স্যার ইউ আর গোয়িং টু প্রোমোট দ্য নিউ ফিল্ম!’ উঠতি নায়িকার চোখেমুখে সাজানো হাসি।

স্টক মার্কেটের এক বড় এজেন্ট চিৎকার করে বলে, ‘বুঝেছি, আপনি শেয়ার মার্কেট নিয়ে আরেকটা খেলা খেলতে যাচ্ছেন, স্যার।’

‘নো বডি ক্যান গেইজ! ইভেন…’ একথা বলেই তিনি কান্তুর হাত থেকে সুন্দর কাগজ দিয়ে মোড়ানো প্যাকেটটা নিয়ে খুলতে খুলতে লাগলেন।

হলরুমের ভেতর তখন নিস্তব্ধতা ব্যতীত আর কারও শ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না, সকলেই উৎসুক, প্রত্যেকের নজর তালুকদার ইমরানের হাতের প্যাকেটটার দিকে।

তালুকদার ইমরান প্যাকেটটির ভেতর থেকে একজোড়া জুতো বের করে সকল উপস্থিতির উদ্দেশ্যে উঁচিয়ে ধরলেন।


হাসতে থাকে বিগত দিনের সকল অপমৃত্যুগুলো, হাসতে থাকে এই মৃত শহর।


পুরো উপস্থিতির চোয়ালে এতক্ষণ ধরে ঝুলে থাকা আগ্রহটা নিমিষেই মিইয়ে গেল। সামান্য একজোড়া জুতো নিয়ে তালুকদার সাহেব এমন রহস্য করছিলেন? অবশ্য এটা তার পুরনো অভ্যাস, তিনি যখন কথা বলেন তখন পুরো পরিস্থিতিকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখেন, মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেন পুরো পরিবেশটাকে, আবার এমনও হয়েছে খুব সিরিয়াস অনেক ব্যাপারকেও তার কথার চালে হালকা করে ফেলতে পারেন।

পুরো উপস্থিতির মনোযোগের এই শিথিলতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করলেন জনাব তালুকদার, পুনরায় বললেন, ‘লেটস সি, ডিয়ার অডিয়েন্স, এই যে জুতো জোড়া, দ্য সুজ, আমার হাতের এই জুতো জোড়া দেখছেন, দেখছেন তো?’

আবারও পুরো জমায়েত তাদের সমস্ত মনোযোগ তালুকদার ইমরানের উপর লগ্নি করল। তাদের এই লগ্নি পূর্বে কখনো লসের মুখ দেখে নি, তাই নিঃসন্দেহে নির্ভর করা যায় তালুকদার ইমরানের প্রতি, কিন্তু সামান্য এক জোড়া জুতো নিয়ে তিনি এমন হেঁয়ালিপনা করবেন?

তালুকদার ইমরান বললেন, ‘এই যে জুতোজোড়া, একজন মানুষকে হত্যা করে তার শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে সেই চামড়া দিয়ে বানানো হয়েছে এই জুতো জোড়া। ইটস আ বার্থডে গিফট ফর মাই অনলি ডটার। এখুনি আমার কারিনা এই হল রুমে প্রবেশ করবে এবং এই জুতো জোড়া পরবে।’

পুরো উপস্থিতির মধ্যে অবিশ্বাস্য রকমের চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেল। অসংখ্য ক্যামেরার লেন্স এখন জুতো জোড়ার দিকে তাকিয়ে। উপস্থিতি প্রায় সবাই হুড়মুড় করে তালুকদার ইমরানের হাতে থাকা জুতো জোড়ার দিকে হামলে পড়ছে। এক নজর দেখবার জন্য সকলেই উদ্‌গ্রীব; তালুকদার ইমরান নয়, যেন তারা কথা বলতে চায় জুতো জোড়ার সাথে এবং এই ফাঁকে সকলেই নিজের শরীরে চিমটি কেটে নিশ্চিত হলো তাদের নিজেদের শরীরের চামড়া ঠিক আছে কি না?

‘হোয়ার ইজ শি? তাড়াতাড়ি আসতে বল ওকে, বিউটিপার্লারে এত সময় লাগে? সেই সকালে বেরিয়েছে, ডাক ডাক, ওর জুতো তো এখুনি লাইভে যাবে, কুইক…? কান্তুর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে স্বল্প স্বরে কথাগুলো ছুড়ে মারেন তালুকদার ইমরান।

তালুকদারের কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করে না কান্তু, সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জুতো জোড়ার দিকে, কান্তুর চোখাচোখি হওয়ামাত্রই খিলখিল করে হেসে ওঠে জুতোজোড়া, হাসতে থাকে বিগত দিনের সকল অপমৃত্যুগুলো, হাসতে থাকে এই মৃত শহর।

Ashraf Jewel

আশরাফ জুয়েল

জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কবি, কথাসাহিত্যিক।

এম বি বি এস, ডিপ্লোমা ইন এনেসথেসিয়া (ঢাকা ইউনিভার্সিটি)।
পেশা : চিকিৎসক, স্পেশালিস্ট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ইউনাটেড হসপিটাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
অতীতা দুঃখরা পাখি হয়ে গেল [প্রিয়মুখ প্রকাশন, ২০১৪]
অনুজ্জ্বল চোখের রাত [নন্দিতা, ২০১৬]

ই-মেইল : ashrafjewel78@gmail.com
Ashraf Jewel