জুটমিল

জুটমিল
385
0

ষোলোই ডিসেম্বরের আগের রাতে বেশ বড়সড় ঝামেলা শুরু হলো জুটমিলে। মাদারীপুরের এ আর হাওলাদার জুটমিল পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছে। লতিফ মিয়া বাবার কাছে অনেক গল্প শুনেছে এই জুটমিলের। কত লোকের জমি ক্রোক করা হৈছে, অনেকে সর্বস্বান্ত হৈছে, বাবার এক মামা জমি-জিরাত সব হারাইছে মিল করার সময়, টাকা পাওয়ার কথা ছিল তাও পায় নাই, দিবে দিবে বলে অনেক ঘুরাইছে। লতিফ মিয়া অনেক লোকজন ধরে জুটমিলে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ পায়, এজন্য তার কম খরচ হয় নি। অনুর বাপ, সোলায়মান, ম্যানেজার শ্যামল পোদ্দার সবাই তার কাছ থেকে টাকা খাইছে।

লতিফ মিয়ার সম্পদ বলতে কেন্দুয়ার ওই ভিটাবাড়ি, বাড়ি-লাগোয়া দুই বিঘা কলাবাগান আর বাড়ির সামনে একটা ছোট মনোহারী দোকান। কিন্তু সংসারে লোক বাড়তেছে, খরচ বাড়তেছে। মায়ের হাঁপানির ব্যারামটা দিন দিন গাঢ় হচ্ছে, মাদারীপুর শহরে নিয়ে বড় ডাক্তার না দেখালেই না। জুটমিলের কাজ লতিফ মিয়ার তত পছন্দের না। মায়ের মতো তারও শ্বাসের ব্যারাম। বেশি ধুলা-বালি, পানি-কাদাতে থাকলে শরীর খারাপ করে। তখন টানা বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। রোজিনা সরিষার তেল বুকে মালিশ করতে করতে বুকের চামড়া তুইলা ফেলে, তবু একটু আরাম পায় না লতিফ মিয়া। রাজৈর বাজার থেকে যদু শেখের তেলপড়া এনে বহুবার মালিশ করছে, মোস্তফাপুরের হেলথ কমপ্লেক্স থেকে ভিটামিন আইনা খাইছে, কিন্তু যে কে সেই।


মিলের কিছু পাট সরিয়ে ফেলল সোলায়মানরা, সেই কাজে লতিফ মিয়াকেও সামিল করল।


অনেক ভেবে-চিন্তে এবার মিলের চাকরিটা নিছে সে। সোলায়মান কম খাটনির কামই দিছে তাকে, তবু যেন কেমন পেরেশানি লাগে। আগে কামলা নিয়া দিনরাত কলাবাগানের দেখাশোনা করছে, দোকানে বসে এটা-সেটা বিক্রি করছে, তখন মাথার উপর কেউ ছিল না। কিন্তু মিলে পদে পদে মাতবর। এ বলে এই দলে ভেড়ো, ও বলে ওই দলে ভেড়ো। সবাইকে তো খুশি করা যাবে না। তাই নিমকহারামি না করে দেশি ভাই সোলেমানের পিছন পিছন ঘুরে দিন কাটে।

একবার জুটমিলে খুব বড় গণ্ডগোল হলো বেতনের টাকা নিয়ে। হাওলাদারদের বড় ছেলে বিদেশে অসুখে পড়ল, মরোমরো অবস্থা। তার চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে মিলের কর্মচারীদের বেতনের টাকা আটকে গেল। অনেকের পরিবার নিয়ে পথে বসার অবস্থা। যারা সাপ্তাহিক অথবা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে তাদের কাছে একদিনের বেতন বকেয়া মানে মাথায় বাজ পড়া, না-খেয়ে থাকা। লতিফ মিয়ার ঠিক সেই অবস্থা না। রোজিনা নানা কিছু করে টাকা জমিয়ে রাখে। পুকুরের ধার ধরে বেগুন, চালকুমড়া, লাউ আরো নানা কিছুর ফলন করে, দেবর আসমতকে দিয়ে হাটবারে হাটে পাঠায়। বাড়ির পালা হাঁস-মুরগির ডিম বেচে। এখন আসমতই দোকানটা চালিয়ে নিচ্ছে।

কাজ শেষে লতিফ মিয়া বাসে করে বাড়ি ফিরে আসে। বড় ব্রিজে নেমেও দুই কিলো হাঁটতে হয়। রাতের খাওয়া-দাওয়া করে সবাই মিলে উঠানে বসে পান-বিড়ি খায়। রোজিনা এই সময়টাতে বিড়ি বাঁধে। মাদারীপুরের অনেক গ্রামেই মেয়েরা বিড়ি বাঁধার কাজ করে। লতিফ মিয়া একদিন দেখে রোজিনা রান্নাঘরে বসে মনের সুখে বিড়ি টানতেছে, সাথে পাশের বাড়ির চান্দুর মা। লতিফ মিয়া ওদেরকে কিছু বলে না। ভাবে রোজিনা সারাদিন খাইট্টা খাইট্টা মরতেছে, তারও যদি দুই-একটা বদখেয়াল থাকে থাকুক, তাতে দোষের কী? কিন্তু রাগ উঠলে তার হুঁশ থাকে না। সামান্য ভাত রান্না দেরি হয়ে গেলে সারা বাড়ি মাথায় করে নেয়। ছোট ছেলে-মেয়ে দুটোকে চড়-থাপ্পড় দিতে থাকে, রোজিনার দিকে পিঁড়ি ছুড়ে মারে, দা নিয়ে তাড়া করে। একবার পিঁড়ির আঘাতে রোজিনার কপাল ফেটে রক্তের ধারা কিছুতেই বন্ধ হয় না। লতিফ মিয়া শেষে ভয় পেয়ে যায়। দৌড়ে হরিপদ কবিরাজকে রাত-দুপুরে ফিস দিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। ব্যান্ডেজ, ওষুধপত্র। ওইবার লতিফ মিয়ার মা ছেলেকে মাথার কিরা কাটায়ে বলে আর কোনোদিন যদি সে বউয়ের গায়ে হাত তোলে তাহলে দুচোখ যেদিকে যায় চলে যাবে।

বৈশাখ মাসে মিলের গ্যাঞ্জামের সময় দুটো বোমা ফাটল মিলের ভেতর, তাই নিয়ে দারুণ হইচই, মামলা পর্যন্ত গড়াল। অনেকের নামে মামলা দেয়া হলো, লতিফ মিয়াও বাদ পড়ল না। কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হলো। এ-বাড়ি সে-বাড়ি করে শেষে হাউসদিতে গিয়ে হাজির হলো। ওখানে খাঁ-বাড়ির সাথে লতিফ মিয়ার মায়ের দিকের কুটুম্বিতা। তারা এসব ঘটনার কিছুই জানে না। সেখানে কয়েকদিন থাকল। শেষে সোলায়মান খবর দিল কোনো ভয় নাই, বাড়ি ফিরে আসো, দু’পক্ষের সালিশ-মীমাংসা হয়েছে।

লতিফ মিয়া সারাদিন মিলের কাজ করে রাতে নিথর দেহে বাড়ি ফিরে আসে। রোজিনা সংসারের হাল ধরে আছে, খাটতে খাটতে হাড্ডি-চামড়া সার হচ্ছে। লতিফ মিয়ার এইসব দিকে কোনো খেয়াল নাই। শুধুই মনে হয় কেমন করে আরো দু-পয়সা রোজগার করা যায়। মিলের কিছু পাট সরিয়ে ফেলল সোলায়মানরা, সেই কাজে লতিফ মিয়াকেও সামিল করল। তার মনে একটা চাপা ভয়, যদি কোনো বিপদ হয়, বিরোধী পক্ষের কেউ জানতে পারে! কিন্তু সোলায়মানের লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার শক্তি তার নাই। দিনদিন আরো কিছু বিপদজনক কাজে জড়িয়ে ফেলল নিজেকে। ঘরের টিনবদল, ছেলে-মেয়েদের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি, মাকে নিয়ে শহরে বড় ডাক্তার দেখাল, ওষুধ-পত্র কত কী! নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে সুখে মাঝে মাঝে লতিফ মিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আবার পরক্ষণেই মনে হয়, যদি কোনো বিপদ আসে, মামলায় পড়তে হয়, জেল-জুলুম? তখন কিভাবে সব সামাল দেবে?

সোলায়মান দুটো চটের ব্যাগ রেখে গেছে, বলল দুই-সপ্তাহ লুকিয়ে রাখতে হবে। লতিফ মিয়া সোলায়মানের কোনো কথা না-শুনে পারে না। সে এত উপকার করল, তার কথায় না করা যায় না। একদিন ব্যাগ খুলে চমকে উঠল, ছোট-বড় নানা অস্ত্র। এগুলো কি বন্দুক? কালো চকচকে দুটো পিস্তল। বাপের কাছে শুনেছে যুদ্ধের সময় ইয়া বড় বড় সব অস্ত্র আসত ভারত থেকে। বাপ-চাচারা মিলে পাঁচ জন যশোর বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে আসছিল। তারপর কত মাস খালি যুদ্ধ আর যুদ্ধ। রক্ত, লাশ, আগুন, গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছিল। মুন্সিদের বাড়ির দুই বউকে নিয়ে গিয়েছিল আল-বদর বাহিনী। ছোট চাচাকে খন্দের মধ্যে ফেলে দুটুকরো করা হয়েছে। ছোটবেলায় এসব শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত, হাতে গাছের বাঁকানো ডাল নিয়ে খেলতে খেলতে নিজেকে মুক্তিসেনা মনে হতো।


আগুন লাগার দুদিন পর ভেতর থেকে কয়েকজনের কয়লা-পোড়া লাশ বের করে আনা হয়।


লতিফ মিয়ার জন্ম যুদ্ধের পাঁচ বছর পর। তখন শুনেছে খুব অভাব ছিল। মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছিল। একরকম আধপেটা খেয়েই বড় হতে হয়েছে তাকে। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বাবা কোনো কাজে তেমন মন বসাতে পারে নি, নানারা তখন অনেক সাহায্য করেছে।

ব্যাগের উপর হাত বোলাতে বোলাতে শিহরন জাগে, কলিজার ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে যায় আবার। কেমন এক অস্থিরতা, একটা অস্ত্র হাতে নিয়ে বুকে চেপে ধরে। রোজিনা এসব দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। লতিফ মিয়াকে বলে আপনি আর বিপদ ডাইকা আইনেন না, দুইটা পোলা-মাইয়া নিয়া দুই বেলা খাইয়া-পইড়া দিন যাইতেছিল। মিলের কাজে ঢোকার পর থিকা আপনার ভাব-গতিক বদলাইয়া গেছে। ওই সোলায়মানই তার কপাল পোড়াইছে। এই বলে রোজিনা চিৎকার করতে লাগল। লতিফ মিয়া রোজিনার মুখ চেপে ধরে বলে—চুপ হারামি, একটা শব্দ করবি না! এই যে সক্কলে মিলা খাইতে পড়তে আছিস এইগুলান আসে কোনখান থিকা, এখন রিস্ক নেওন ছাড়া আর উপায় নাই। একবার হাত কালো করলে তা আর সাদা বানানো যায় না। কাউরে এইসব কথা কবি না, খবরদার একদম মাটিতে পুঁইতা ফালামু। রোজিনা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে স্বামীকে দেখতে থাকে। বুক থেকে কাপড় সরে গিয়ে রোজিনার কালো উন্নত স্তনযুগল ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে দেখা যেতে থাকে। লতিফ মিয়া একবার সেদিকে তাকিয়ে আবার ব্যাগ দুটোকে ভালো করে বাঁধতে থাকে।

রোজিনা চুলায় জ্বাল ধরিয়ে চাক চাক করে কেটে রাখা বেগুনগুলো কড়াইতে দিতেই পাশের বাড়ির রমজানের ছেলে মোবারক দৌড়ে আসে—চাচি চাচি খবর শুনছেন, মিলে আগুন লাগছে, সবাই সেইখানে যাইতেছে। শুনে রোজিনার হাত থেকে বেগুনের বাটি পড়ে যায়, অমঙ্গলের বার্তা তার মনে কু দিয়ে যায়, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে  ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পড়ে, পুকুরপাড়ে আসমত কাজ করছিল, চিৎকার করতে করতে আসমতকে ডাকতে থাকে, আমার সর্বনাশ হৈছে আসমত সর্বনাশ হৈছে, মিলে আগুন লাগছে, আহারে এখন কী হইব! গ্রামের পথে অসংখ্য মানুষ, জুটমিলে আগুন লাগার খবর পেয়ে সবাই সেদিকেই ছুটছে। গ্রামের পথে শোরগোল পড়ে যায়। হাতে বালতি, মগ, হাড়ি-পাতিল নিয়ে সবাই ছুটছে। মিলের আরো অনেকে আসছে, সবার মুখে উদ্বিগ্নতা, ভয়। গ্রামের অনেকের রুটি-রুজির সাথে জড়িয়ে আছে এই মিল। আজ যদি মিল পুড়ে ছারখার হয়ে যায় তাহলে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে। পাটে আগুন ধরে যাওয়াতে ধোঁয়ায় সমস্ত আকাশ ছেয়ে গেছে। আশেপাশের গাছ থেকে পাখিরা উড়ে ডাকাডাকি করছে। কালো ধোঁয়ার সাথে পাখিরা মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। আগুন লাগার পর অনেকেই মিল থেকে বের হয়ে আসে, কিন্তু পাটে আগুন ধরাতে ভেতরের আবদ্ধ জায়গায় ধোঁয়া তৈরি হয়, কিছু শ্রমিক ভেতর থেকে বের হতে পারে না। আরো অনেকের সাথে লতিফ মিয়া মিলের ভেতর আটকা পড়ে। মাদারীপুর শহর থেকে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি আসে। পুকুর থেকে পানি নিয়ে দশ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নেভাতে পারে। স্থানীয় লোকজন আগুন নেভাতে অনেক সহায়তা করে। ফরিদপুর থেকে, ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলতে থাকে।

বাচ্চাদেরকে সাথে নিয়ে মিলের বাইরে হাজার জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে রোজিনা। সারাদিন না খাওয়া, বুকের নালি পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে! দুচোখে অন্ধকার দেখে রোজিনা। ছেলে-মেয়ে দুটিকে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখে। আগুন নেভাতে নেভাতে রাত হয়ে যায়। লতিফ মিয়াসহ যারা মিলের ভেতরে ছিল তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। পাঁচ জনের শরীর ঝলসে গেছে। টেনে-হিঁচড়ে তাদের বের করে আনা হয়। রোজিনা অপেক্ষা করতেই থাকে। মিলের সামনে মাটিতে বসে বসে ঝিমাতে থাকে। চোখের সামনে পুড়ে যাওয়া মিল আর হাহাকার। কত লোক আসতেছে-যাইতেছে, কত কথা বলতেছে, কিছুই রোজিনার কানে যায় না। বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকে। অপেক্ষার শেষ হয় না। মনে হয়, অনন্তকাল ধরে সে হাশরের ময়দানে অপেক্ষা করছে। তার বিচার এখনো শুরু হয় নাই। খোদা-তালা কঠিন এক শাস্তির জন্য অপেক্ষা করাইয়া রাখছে তাকে। বাড়ির লোকেরা রোজিনাকে বাড়ি নিয়ে যায়। মুখে একফোঁটা পানিও দিতে পারে না সে। আগুনে পোড়া কয়েক জনের লাশ দেখার পর থেকে বমি শুরু হয়েছে। ঘরে রাখা চটের ব্যাগ দুটোর কথা মনে হলে আবার ভয় তাকে ঘিরে ধরে। হাত-পা সব সিঁথিয়ে আসতে থাকে। চোখ বন্ধ করে আল্লাহ-খোদার নাম নিতে থাকে রোজিনা। মরা বাড়িতে বাচ্চারা না খেয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে, বাড়ির চুলা জ্বলে না, রোজিনার বাপের বাড়ি থেকে ভাত আসে অনেক দেরিতে, রোজিনা মূর্তির মতো বসে থাকে। চান্দুর মা বাচ্চাদের খাবার দেয়।

আগুন লাগার দুদিন পর ভেতর থেকে কয়েকজনের কয়লা-পোড়া লাশ বের করে আনা হয়। চামড়া সম্পূর্ণ পুড়ে হাড়েও আগুন ধরে গিয়েছিল। সেজন্য শরীরগুলোর হাড়ের ভেতর গর্ত হয়ে গেছে। লতিফ মিয়ার ডান হাতের মধ্যমায় একটা পিতলের আংটি পুড়ে কালো হয়ে গেছে। সেটা দেখে সবাই লাশ শনাক্ত করে। বাড়িতে যখন লতিফ মিয়ার লাশ নিয়ে আসা হয় সারা গ্রাম ভেঙে পড়ে। রোজিনা কয়েকবার মূর্ছা যায়। কাউকে লাশের মুখ দেখানো হয় না। কিছু পোড়া হাড়কে গোসল করিয়ে সাদা কাফন পরিয়ে খাটে শুইয়ে রাখা হয়। রোজিনা ঘর থেকে বের হয় না। সবাই তাকে স্বামীকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য অনুরোধ করে, কিন্তু সে ঘর থেকে বের হয় না। চটের ব্যাগ দুটো বুকে চেপে বসে থাকে। তার দৃষ্টি স্থির। জানালা দিয়ে রোজিনা স্বামীর মরদেহ নিয়ে যেতে দেখে। একদিকে স্বামীর শোক, অন্যদিকে ভয়, তাকে বোবা বানিয়ে রাখে। সবাই দেখে দুটো চটের ব্যাগ বুকে চেপে রোজিনা চকির উপর বসে থাকে। ছেলেমেয়ে দুটি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে।


সৃষ্টিকর্তা তাকে বলতে পারবে না, তুই তোর স্বামীর ইজ্জত বাঁচাইতে পারলি না।


রাত বাড়ার পর লোকজন ঘুমিয়ে পড়লে এক ফাঁকে চটের ব্যাগ দুটোকে নিয়ে পুকুর পাড়ে যায় রোজিনা। শীতের রাত, কুয়াশায় কিছু দেখা যায় না, দুই হাত দূরের দৃশ্যও ঝাপসা। পুকুরের চারপাশে কলাগাছের সারি। একটা সারির ফাঁক দিয়ে চটের ব্যাগ দুটোকে পুকুরের ঠান্ডা জলে ছুড়ে ফেলে। জোরে একটা শব্দ হয়। পানি চারদিকে ছড়িয়ে তরঙ্গের মতো সৃষ্টি হয়। রোজিনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মনে হয় আজ স্বামীর সাথে সাথে তার সমস্ত পাপকেও যেন কবর দেয়া হলো। হাশরের ময়দানে তার কোনো দায় থাকবে না। সৃষ্টিকর্তা তাকে বলতে পারবে না, তুই তোর স্বামীর ইজ্জত বাঁচাইতে পারলি না। লতিফ মিয়ার লোভের চোখ যেন রোজিনাকে গিলে খায়। কাদামাখা পায়ে রোজিনা পুকুরে নেমে পৌষের ঠান্ডা জলে ডুব দেয়। সারা শরীর কাঁপতে থাকে।

পুকুর থেকে ঘরে আসার পথটুকু রোজিনার কাছে দীর্ঘ মনে হয়। ঘরে এসে কাপড় ছেড়ে রান্নাঘরে বসে হাড়িতে পড়ে থাকা ভাত খায়, আর ভাবতে থাকে—লতিফ মিয়া এমনভাবে কয়লা হইয়া পুইড়া মরল! তার মরণটা যেন আজরাইলরেও হার মানাইল। চটের ব্যাগের অস্ত্রগুলো সারা জীবনের জন্য তার সাথি হয়ে পুকুরের মিশমিশে কালো পানিতে হারায়া গেল, যেমনভাবে লতিফ মিয়াও হারায়া গেল। লতিফ মিয়া দুনিয়াতেই যেন বিচার পাইয়া গেল! তার আর অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হবে না। পোড়া মরিচ ঠান্ডা ভাতে মেখে খেতে খেতে রোজিনা এইসব কথা ভাবতে থাকে। শীতের রাতে দলা পাকানো ভাত আর পোড়া মরিচ তার কাছে অমৃতের মতো লাগে।

নভেরা হোসেন

জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; মাদারীপুর শহরে নানাবাড়িতে। শৈশব হতেই ঢাকায় বেড়ে ওঠা। তিনি নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে। লিটল ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করেছেন ২০০০ সালের পর থেকে। বিশেষত কবিতা, গল্প ও নৃবৈজ্ঞানিক লেখালেখি করেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—

হারানো দোকান এল দরাদো [জনান্তিক, ২০০৯]
একজন আঙুল শুধু হেঁটে বেড়ায় [সংবেদ, ২০১০]
আর কারনেশন ফুটলো থরে থরে [শুদ্ধস্বর, ২০১৩]
একটু একটু করে বোবা হয়ে যাচ্ছ তুমি [অ্যাডর্ন, ২০১৫]
বারুদ লোবানের গন্ধ [চৈতন্য, ২০১৭]
জলে ডোবা চাঁদ [ঐহিক,২০২০]

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ—

পেন্ডুলাম ও শিশুর দোলনা [শুদ্ধস্বর, ২০১১]
জৌলুসী বেওয়া [দেশ, ২০১৬]

এছাড়া পিয়াস মজিদের সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন নির্বাচিত কবিতা : শামীম কবীর [A¨vWb©, ২০১০]

তিনি কিছুদিন নৃবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিন, জার্নাল ও দৈনিক পত্রিকায় লেখেন।

ই-মেইল : noverahossain@gmail.com

Latest posts by নভেরা হোসেন (see all)