জাংড়া

জাংড়া
687
0

নতুন বউ নিয়ে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে সবার মুখ শুকিয়ে গেল। ওই সব শুকনো মুখগুলোর রেখায় রেখায় ফুটে ওঠা স্বার্থপরতা পড়তে আমাকে বেগ পেতে হয় না। এমনটা হবে আগেই জানতাম। তেমন প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। তাই চোখের ইশারায় প্রভা, মানে নতুন বউকে বসতে বললাম। ফরমালিটিজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকলে কতক্ষণ থাকতে হবে তার তো কোনো ঠিক নেই!

ফয়ারে রাখা ছড়ানো ছিটানো সোফাগুলোর একটাতে বসতে যাচ্ছিল প্রভা! আমি বললাম, না, ওখানে না, ভেতরে চলো। আমি জানি ঘটনা এখন বহুদূর গড়াবে। বড়’দা ছাড়া আমার কাছে এ বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করার কেউ নেই। কিন্তু তাকে কাছেপিঠে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হয়তো ঘরে ঘুমোচ্ছেন বা নামাজ পড়ছেন।

বড় ভাবি তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে ছুটেছেন ঘটনাটা চাউর করতে। করুক চাউর, করুক। নইলে বিষয়টা সবাই জানবে কিভাবে!

বড় ভাবি লিভিং রুমে চার্জে থাকা মোবাইলটা তুলে নিয়ে ফোনবুক সার্চ করছেন। আমি তখন দুরুমের মধ্যকার কারুকর্জময় টানা স্টেইনগ্লাসের কেমোফ্লেজ দেখছি আর ভাবছি, মানুষ আসলে ট্রান্সপারেন্ট না, কেমোফ্লেজই বেশি পছন্দ করে। বেলজিয়াম কাট অ্যাম্বুশড স্টেইনগ্লাসে সমুদ্রের তলদেশের চিত্র খোদাই করা। সেখানে সমুদ্রনীল রঙের জলে ফার্ন আর ফাঙ্গাসের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে বেড়াচ্ছে রংবেরঙের মাছ। হঠাৎ দেখলে মনে হবে মাছগুলো বুঝি রিয়েল। গুলশান এক নাম্বারের একটা মার্কেট থেকে গ্লাসটা অর্ডার করেছিল অপলা। তাছাড়া এঘরের দেয়াল জুড়ে ওক কাঠের খোদাই ডেকোরেশন, ফ্লোরে মেপল কাঠের টাইল বা ছাদ ছুঁয়ে ঝুলে থাকা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি এ সব সবকিছুই অপলার পছন্দে কেনা। বনানীর এই দোতলা বড়িটাই তো অপলার।অপলার অভিজাত কেতার সাথে খাপ খাওয়াতে আমার বহু বছর লেগে গিয়েছিল। বেশিরভাগ সময় আমার মনে হতো যেন পরীক্ষা চলছে, রিটেন না, ভাইভা। প্রতি মুহূর্তে নাম্বার কেটে যাওয়ার ভয়।


কথাটা ভাবতেই আমার অস্তিত্বের গভীরে কোথায় যেন এক চিনচিনে গ্লানিবোধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।


আমি তুষার তৌকির, বুদ্ধিমান, স্মার্ট তাই আভিজাত্যের কায়দা-কানুন রপ্ত করতে আমাকে খুব বেগ পেতে হয় নাই। তাছাড়া এসব আয়ত্ত করতে না পারলে আখেরে আমারই ক্ষতি। প্রতি মুহূর্তে ওরা আমার ক্লাসের দিকে আঙুল তুলবে ছাড়াও ব্যবসায়ী হিসেবেও আমি আমার কেতা ঠিক রাখতে পারব না। তাই তো টেবিল ম্যানার থেকে শুরু করে পোশাক-আশাকে ব্র্যান্ড লয়াল হয়ে ওঠাটাও ছিল আমার লার্নিং প্রসেসের মধ্যে। এখন আমি চ্যানেল, বারবেরি, হারমেস, প্রাডা, ক্রোকোডাইল, পিয়ারে কার্ডিয়ান, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সর, রাডো, নাইকি বা নিদেন পক্ষে লিবাইসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। তবে আমার এধরনের পরিবর্তন না হলে অপলার বাবা হয়তো সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়তেন। যদিও তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। অপলাও কি আমাকে ভালোবাসত না, বাসে না এখনো! কথাটা ভাবতেই আমার অস্তিত্বের গভীরে কোথায় যেন এক চিনচিনে গ্লানিবোধ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বলুক ভাবি, যাকে যা ইচ্ছা বলুক। আমার পক্ষে-বিপক্ষে যত এ বিষয়টা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হবে, তত আমি নিজেকে ডিফেন্ড করার সুযোগ পাব।

ছোটবোন নীনা বোধহয় ততক্ষণে ওপাশ থেকে ফোনটা তুলেছে। স্লাইডিং ডোরটা ভেজানো না, তাই কথা ভেসে আসছিল। ভাবি নীনাকে কিঞ্চিৎ চাপা স্বরে বলছে, নীনা শুনতেছ?

হ্যাঁ, বল ভাবি। বড়দা ভাই কেমন আছে?

তোমার বড়’দা ভালো আছে, এদিকে তো কাণ্ড ঘটে গেছে!

কী কাণ্ড?

তুষার বিয়ে করেছে।

ছোড়দা ভাই তো সেই কবে বিয়ে..!

আরে সে বিয়ে না, নতুন একটা বিয়ে করে নিয়ে বাসায় ফিরছে।

বল কী!

উত্তেজনার বসে ভাবি হয়তো লাউড স্পিকারে চাপ দিয়েছেন। নীনা বলেছে, ছি-ছি-ছি ছোড়দা ভাই এটা করতে পারল!

ছি-ছি শব্দগুলো যেন সারা ঘরে অজস্র মাছির মতো ঘুরছে। ঘর জুড়ে যেন নোংরা, দুর্গন্ধময় কিছু ছড়িয়ে পড়েছে এমন অনুভূতি হতে লাগল। আর আমার মস্তিষ্কে ক্রমাগত শব্দ হচ্ছে ছি-ছি-ছি!

নীনার কাছে থেকে অন্তত আমি এধরনের মন্তব্য আশা করি নাই। নীনা যে ছোড়দা ভাই বলতে অজ্ঞান, সে আজ বলছে এ কথা! কিসের ভিত্তিতে সে বলে এ কথা! ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর সে যখন কোথাও ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছিল, তখন তার এই ছোড়দা ভাইই তো তাকে প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা খরচ করে ডাক্তারি পড়িয়ে এনেছে। এখন যে একটা অনামী ক্লিনিকের নামকাওয়াস্তে চাকরি আর একটা সরকারি চাকুরে ঘুসখোর স্বামী জুটেছে কপালে সেও তো তোকে দেখে বিয়ে করে নাই রে। বিয়ে করেছে বিত্তবান তুষারের বোনকে। গরিব ঘরের ছেলে, ঘুসের টাকায় গড়া সম্পদ শশুর পক্ষের দেয়া উপঢৌকন বলে চালাতে হবে না! সে জন্য বিত্তশালী শ্বশুরকুল চাই তো! তুই সন্তান দিতে পারছিস, সংসার দিতে পারছিস তাই স্বামী স্বর্গ মনে হচ্ছে। হয়ে যা জীবন্ত লাশ, দেখ স্বামী কতক্ষণ থাকে!

নীনার সাথে কথা শেষে ভাবি এবার কানাডায় ট্রাই করতে থাকে। স্কাইপে পেয়ে যায় মেজ ভাবিকে।

লুনা কেমন আছো?

কী ব্যাপার ভাবি এত রাতে, সব ঠিক আছে তো?

ওহ্ তোমার ওখানে তো এখন মধ্যরাত, আমার খেয়ালই ছিল না।

হ্যাঁ, বোঝো তো দূরে থাকার যন্ত্রণা আছে, সব সময় মনে হয় দেশে কে কেমন আছে! তাই অসময়ে কেউ ফোন করলেই বুকটা কেঁপে ওঠে।

আরে শোনো না, কি কাণ্ড ঘটেছে।

কী কাণ্ড?

তুষার একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনছে।

বলো কি! ভালো হইছে। এই রাতদুপুরে তাও কোনো দুঃসংবাদ শুনতে হয় নাই।

তোমার কাছে এইটা ভালো খবর মনে হইল লুনা?

ভালো না! অপলাকে কি কখনো তুষারের বউ হিসেবে মানায় বলো? আমার তো কখনো এমন মনে হয় নাই। একটা ফ্যাকাশে, প্রাণহীন! আচ্ছা অপলার কি সম্মতি নিছে?

থামো, অকৃতজ্ঞ! বলে লাইনটা কেটে দেয় বড় ভাবি। এবার নিজে নিজে আওড়ায়—ফ্যাকাশে, প্রাণহীন! এই ফ্যাকাশে প্রাণহীনের জন্যই তুই আজ কানাডার ইমিগ্রান্ট। অকৃতজ্ঞ, অমানুষ কোথাকার। তোর স্বামী যখন কোনো কাজ-কর্ম না পেয়ে কানাডায় অ্যাপ্লাই করল তখন অপলার বাবার অর্ধশত কোটি টাকা অল্প সময়ের জন্য হলেও তো তোর স্বামীর নামে ট্রান্সফার করছিল! ব্যাংক সলভেন্সি না দেখালে আর ভিসা জুটত না দুজনের। ইমিগ্রান্ট হওয়া তো দূরের কথা। আর আজ অপলা হয়ে গেল প্রাণহীন!

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন টনটন করে ওঠে। মুখটা জুড়ে যেন জ্বালা ধরানো মরিচের গুড়ো ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ এমন অনুভূতি হতে থাকে। আমি কি তাহলে অকৃতজ্ঞ, বেইমান! হলে কার প্রতি?


সেক্স জিনিসটা আলাপের। আলাপের একটা মূর্ত রূপ থাকতে হয়। অঙ্কে অঙ্কে তার মিলন। 


তবে ভাবির কথার যুক্তি আছে। ভাবি অপলাকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে। সেই সময়টায় যখন আমাদের পরিবার ডুবতে বসেছিল! বড়দা ভাই রোড অ্যাকসিডেন্টে পা হারানোর পর গোটা পরিবারটা পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। বেসরকারি অফিসে বড়দার চাকরিটা চলে গেল। বাবার তো মৃত্যু হয় সেই আমাদের ছোটবেলায়। তারপর মা আর বড়দাই সংসারটা কোনোভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বড়দার অ্যাকসিডেন্টের পর সবকিছু কেমন স্থবির হয়ে পড়ে। বড়দার তখন ছোট ছোট দুটো বাচ্চা। মেজদা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষের ছাত্র। সে ভালো ছাত্র, তাকে নিয়ে সবার অনেক আশা। এমএ পাশ করে সে এমফিল করবে, পিএইচডি করবে। নীনা তখন স্কুলে পড়ে আর আমি, ইচ্ছে করেই গড়পড়তা। বইয়ে মুখগুজে পড়ে থাকতে পারলে হয়তো ভালো ছাত্রের তকমাটা জুটিয়ে ফেলতে পারতাম, কিন্তু ওটা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ তাই পাসকোর্সে বিএ ক্লাসের ছাত্র। পাশ করে বেরোলেও কোনো ভালো চাকরি পাবার কোনো সম্ভাবনা নাই। ওদিকে এত বড় একটা সংসার চলবে কিভাবে সেই চিন্তায় সবার ঘুম হারাম হবার জোগাড়। এমন সময় বাবার বন্ধু আনিস চাচা আনলেন সম্বন্ধটা। মূলত মেজদার জন্যই। কিন্তু বলাই বাহুল্য মেজদা রাজি হলো না। সে জানাল তার নাকি অ্যাফেয়ার আছে, কোনো কিছুর বিনিময়েই তা ছাড়তে পারবে না। অগত্যা আমাকে রাজি হতে হয়। এটা ছিল মূলত একটা ডিল। একটা ক্ষয়াটে মধ্যবিত্ত পরিবারকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের প্রাথমিক হাতিয়ার।

২.
মেয়েটা সিভিয়ার ধরনের লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত। বয়স বিশ/একুশ। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আমেরিকায় চিকিৎসা করে আসছে। তখন এদেশে লিউকোমিয়ার ট্রিটমেন্ট ছিল না। তখন স্টেডি অবস্থায় জেনে বাবা তার বিয়ে দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার চাই একটা ভালো ছেলে, ভালো পরিবার। যে রাজি হবে সে পাবে রাজকন্যা সমেত অর্ধেক রাজত্ব। তবে রাজত্বের লোভে বিয়ে করতে এলে হবে না, তাকে হতে হবে উপায়হীন। লোভী না, উপায়হীন। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল আনিস চাচা। ষাটের দশকের বাংলা সিনেমার মতো এত নাটকীয় মুহূর্তে আমাদের পরিবারে এই বিয়ের প্রস্তাবটা এল, একে আর কেউ হাতছাড়া করতে চাইল না। আমিও যেন ডুবতে বসা পরিবারটার হাল ধরার জন্য একটু খড়-কুটো খুঁজে পেলাম।

কিন্তু উপায়হীন কি লোভি হয়ে ওঠে না! একথাটা কি আমার বিচক্ষণ ব্যবসায়ী শ্বশুর বুঝতে পারেন নাই তখন!

এরকম একটা মেয়েকে বিয়ে করেছি সে জন্য যে সবাই আমাকে বাহ বাহ দিয়েছিল তা কিন্তু না। বরং রাতারাতি আমি অন্যের কাছে লোভী, স্বার্থপর ও সুযোসন্ধানী হয়ে উঠলাম। বন্ধুরা আমার সামনে কিছু না বললেও পেছনে এ নিয়ে হাসা-হাসি করত। এক সময় আমি আমার এসব তথাকথিত বন্ধুদেরও ত্যাগ করলাম। সেদিন থেকে আমি হয়ে পড়লাম সবার মাঝে থেকেও একা।আমি দেখতে শুনতে যাকে বলে সুপুরুষ। উচ্চতা ছয় ফুট এক, তামাটে রং, পেটানো স্বাস্থ্য, তাই তো আমাকে দেখামাত্র আমার হবু শ্বশুরের পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু সেদিন অপলার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম ভদ্রমহিলার হবু জামাইকে পছন্দ হয় নাই। এবং আমার এই সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হলো বিয়ের দিন রাতে।

অপলার বাবা বিশাল ধনী হলেও মেয়ের বিয়েতে বেশি হৈ-চৈ উৎসব করেন নাই। মেয়ে উৎসবের ধকল নিতে পারবে না তাই সাদমাটাভাবে বিয়ে হলো। বিয়ের কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাকে যখন স্ত্রীর ঘরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন কথাটা কানে এল। এ যেন আসবারই ছিল। নিয়তি তার ছক বিছিয়েই তো রাখে!

বিয়ে বাড়ি তাই ক্যাসেট প্লেয়ারে কে যেন সানাই ছেড়ে দিয়েছিল। সেই সুর তার করুণ আর্তনাদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। আমার বুকের ভেতরটাও হুহু করে উঠল। এ তো শুধু সানাই না, সুরের মূর্ছনায় ধ্বনিত হচ্ছে কী যেন নাই, কী যেন নাই!

এই একই কথা হয়তো আমার শাশুড়ি মায়েরও মনে হয়ে থাকবে! একই ঘটনার দুটো ভিন্ন ভিন্ন রূপ যে থাকবে না এমন তো কথা নাই। বরং এসব ক্ষেত্রে থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাকে একটা ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে অপলার ছটফটানো কাজিনগুলো কোথায় যেন ছুটল এক সাথে। এমন সময়ই কথাগুলো ভেসে এল কানে। স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমার শাশুড়িমা বলছেন, ‘আবার সানাইও বাজাইতেছে, এত আমোদ! আরে তুমি মেয়েটারে যদি মেরেই ফেলবা তাইলে দেশ-বিদেশে এতদিন চিকিৎসা কেন করাইলা? বিয়ে দেয়ার জন্য আর ছেলে খুঁজে পাইলা না! ছয় ফুট উচা-লম্বা পালোয়ান খুঁইজা আনলা একটা অসুস্থ মেয়ের জন্য! আরে বিয়েটা কি ছেলে খেলা নাকি! ওই জোয়ান মর্দ তোমার মেয়ের সাথে শুতে চাইবে না? তারপর কি ওই মেয়ে আর বাঁচবে!’

আমি যেন মরমে মরে গেলাম। আমার পায়ের তলার মাটি যেন চোরাবালির মতো দেবে যাচ্ছিল। সত্যিই তো বিয়ে মানে তো একটা বিজনেস ডিল না শুধু। আক্ষরিক অর্থেই দুজন মানুষের যৌন জীবনও। এখানে ফিজিক্যাল ফিটনেস মুখ্য বিষয় বৈকি। তিনি কী করে নিশ্চিত হবেন যে আমি আমার পৌরুষ নিয়ে তার কন্যার ওপর উপগত হব না!

ঠিক ওই সময় আমার মনে হলো আমি যেন এক জাংড়া। সবাই আমাকে এক রেসের ঘোড়ায় তুলে দিয়ে ধুয়ো তুলছে। পান থেকে চুন খসলেই…! আর তখন থেকে আমি আমার সব কামনা-বাসনার জলাঞ্জলি দিয়ে দিলাম।

ঘরে ঢোকার পর দেখলাম অপলাকে সত্যিই খুব ক্লান্ত আর মলিন দেখাচ্ছে। বিয়ের পোশাক, জড়োয়া গয়না আর প্রসাধনের ভারে সে যেন আরো ক্লান্ত। আগে একদিন যখন অপলাকে দেখেছিলাম, তখন তাকে এতটা অসুস্থ মনে হয় নাই।

সেই থেকে আমাদের এক বিছানায় পৃথক বাস। অনেকদিন পর্যন্ত আমি কখনো অপলার সাথে শারীরিক মিলনে আগ্রহ দেখাই নাই; এমন কি অপলাও চায় নাই।

কিন্তু জীবন যেমন গতিময় একটা প্রবাহ শরীরও তেমনি। সময়ের সাথে সাথে শরীর জাগে। পূর্ণ যৌবনে সে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো লাগামহীন হয়ে ওঠে কখনো কখনো। তখন কোনো এক সময়ে নিজেকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ব্যাপারটা একটা নিঃসঙ্গ শব্দের মতোই তার গতি হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। একবার প্রচণ্ড রকম রিপু তাড়িত হয়ে আমি ঘুমে কাতর অপলার স্তন স্পর্শ করি। আমার জমে থাকা সকল তরল উদ্‌গিরণে ব্যাকুল হয়ে পড়ি। আমার মন না, শরীর শুধু শরীর যন্ত্রের মতো আছড়ে পড়ে অপলায়। কিন্তু অপলা তখনো উত্তাপহীন, অনিচ্ছায় সমর্পিত। যেন এ এক দায়! প্রেম না, শরীর না বিবাহ সম্পর্কিত দায়। যা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিকেও বহন করে যেতে হবে! অথচ অপলা কি জানে না, শারীরিক মিলনে দুজনকেই সমানভাবে সাড়া দিতে হয়। সেক্স জিনিসটা আলাপের। আলাপের একটা মূর্ত রূপ থাকতে হয়। অঙ্কে অঙ্কে তার মিলন। নিমেষে সম্বিত ফেরে আমার। আমি তৎক্ষণাৎ উঠে পড়ি। ছুটে যাই বাথরুমে। মাস্টারবেশনে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা রেতঃপতনের পর কান্নায় ভেঙে পড়ি। ওই আমার প্রথম ও শেষ কান্না।

আমার শরীর যে কিনা প্রেমের কাছে সমর্পিত শুধুমাত্র শরীরের নিয়মে জাগে না, তাকে আর আমি ঘাটাতে যাই নি। আমি এর পর কাজের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছি, শুধুই কাজ। আমি এ ক’বছর যেন টাকা উৎপাদনের একটা মেশিনে পরিণত হয়েছি।

৩.
অন্যদিকে অপলা থাকে অপলার মতো, কখনো দেশে, কখনো স্টেটসে। অপলা কিন্তু নির্বোধ না। স্বার্থপরও না। আমি যেমন অবিশ্বাসী না! সে যেন এতদিন কিসের অপেক্ষাতে ছিল। আমার শ্বশুর সাহেবের মৃত্যুর মাস খানিক পর অপলা আমাকে একদিন বলল, ‘তুমি এবার একটা বিয়ে কর’।

আমি যেন আমূল কেঁপে উঠলাম! অপলা কি তাহলে সব বুঝতে পেরে গেছে! তাহলে কি ও কোনোভাবে জানে আমার মনের ভেতরে কী চলছে! শুনেছি প্রেম আর পয়সা কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না। তবে আমি যে প্রেমে পড়তে পারি বা আমার শরীর-মন জুড়ে যে অন্য কারো বাস থাকতে পারে সে কথাটা আমি অপলাকে জানতে দিতে চাই নি। তবে এর পেছনে কোনো বৈষয়িক স্বার্থ নেই। কারণ অপলার বাবার ব্যবসা বাদ দিয়েও ব্যক্তি আমি এখন একজন সফল মানুষ। অপলার প্রতি আমার প্রেম ছিল না একথা ঠিক, তবে একটা মায়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সম্পর্কটা ধরে কেউ যেন আচমকা টান মারল একটা এমন অনুভূতি হলো আমার। সত্যি বলতে কী আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল। শরীরকে এভাবে পরাজিত হতে দেখে আমার সত্যি খুব গ্লানি হতে লাগল।


অপলা যে আমার সাথে এই খেলাটা খেলবে আমি জানতাম।


দীর্ঘদিন ধরে আমি কাজ নামের যে উটের পিঠে চড়েছিলাম সেখান থেকে আমাকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিল প্রভা। আমি প্রায়ই সন্ধ্যার পর যে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম সেখানে গান করত সে। আমি হয়তো প্রভার জন্যই বার বার ওখানে যেতাম। কি এক আশ্চর্য সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল ওর সুরে। সত্যিই কি তাই! নাকি আমার বঞ্চিত শরীর মনের ভেতরে প্রেম নামের এক মূর্তি তৈরি করতে চাইছিল! প্রভার ব্যাকগ্রাউন্ডটার জন্যও এমন হতে পারে। প্রভা সংগ্রামী এক নারী। তার কাঁধে দৈব বিপাকে পড়া এক সংসারের ভার। প্রভার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে আমাকে দেখতে পেতাম এ কথা সত্যি। সে যেন আমারই প্রতিরূপ। আর সে জন্যই কি তবে সে হয়ে উঠেছিল আমার প্রেম! প্রভাকে আসলে কি আমি ভালোবাসি! নাকি শুধুই কামাকাঙ্ক্ষা!

সম্পর্ক যাই হোক, প্রভা যে আমার প্রেম সে কথা আমি অপলাকে বুঝতে দিতে চাই না। অপলার সাথে আমার যে মায়ার সম্পর্ক সেখানে প্রভার প্রতি প্রেম এক ঘাতিনীর মতো হয়ে আসতে পারে। আমি কিছুতেই অপলাকেও হারাতে চাই না।

আমার দেনামোনা দেখে বংশ রক্ষার দিব্যি দিয়ে অপলা যখন নিজেই আমার জন্য মেয়ে দেখতে চাইল তখন একদিন আমি তাকে প্রভার কথা জানালাম। তবে ওই প্রেমটুকু বাদ দিয়ে।

তারপরও অপলা কি বুঝল জানি না। তার চোখ দেখে মনের কথা বোঝার সাধ্য আমার ছিল না। তবে সে সাথে সাথে এক শর্তও আরোপ করল। বলল, যখন আমি বিয়ে করব তখন সে এখানে থাকতে চায় না।

বিয়েটা যেন আমি একা একাই করি।

একথা শুনে আমি মনে মনে হো হো করে হেসে উঠলাম। দীর্ঘকাল পর আমি এমন প্রাণখোলা একটা হাসির চান্স পেয়েও প্রকাশ্যে হাসতে পারলাম না। পাছে অপলা আবার কিছু মনে করে! সে শারীরিকভাবে অসুস্থ, সেক্সুয়ালি ফ্রিজ। তা বলে কি তার মন নাই, প্রেম বা ঈর্ষা নাই!

অপলা যে আমার সাথে এই খেলাটা খেলবে আমি জানতাম। আমাকে সুযোগসন্ধানী, স্বার্থপর প্রমাণের এই সুযোগ অপলাই বা হাতছাড়া করে কিভাবে!

(687)

Latest posts by গাজী তানজিয়া (see all)