হোম গদ্য গল্প চাহিবা মাত্র

চাহিবা মাত্র

চাহিবা মাত্র
321
0

ধারাল নোট! হ্যাঁ, সবচেয়ে বড় নোটটাই পছন্দ তার। কড়কড়ে নতুন নোটের গন্ধ শুকে হান্নান। ভাঁজ করে নৌকা বানায়। এই নোট দিয়েই নৌকা বানাতে ভালো লাগে তার। কখনো বৃষ্টি হলে ভাসিয়ে দেয় ছাদে। এলোজলে। ইদানীং তার কী যে হয়েছে।এমন নির্লিপ্ত আর উদাসীন। আজ অনেকদিন পর এই নদীর ধারে বসে শান্তি লাগে হান্নানের। অনেক বছর পর এসেছে এখানে। টাকাগুলো দুলে দুলে ভেসে যাচ্ছে। ঢেউ তেমন নেই, মাঝে মাঝে আঙুলের ইশারায় পানিতে দোল দেয় সে।

আহা স্কুলে কত কাগজের নৌকা বানিয়েছে হান্নান! একবার অঙ্কের খাতা ছিঁড়তে গিয়ে ভৌমিক স্যারের হাতে মার খেয়েছে খুব। ডাস্টারের আঘাতে হাতের কনুইয়ে ব্যথাটা ছিল এক সপ্তাহেরও বেশি! হায় জীবন!

তবে আজ কোনো ছন্দপতন নয় শুধুই ভেসে যাওয়া। হাজার টাকার নোটগুলো কেমন যে নেচে ওঠে! হান্নান পকেটে হাত দেয়, এখনো আছে কিছু, হয়তো আরো ২০/ ২৫ মিনিট ভাসাবে তার টাকার নৌকা।

কিছু ইটের ভাঙা টুকরা। ছোট মতো একটা ব্যাগ। সেই ব্যাগভর্তি ইটের ভারে কাত হয়ে আছে ছেলেটা। গুলতি হাতে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা সেই কখন থেকেই নদীর পাড়ে ঘুরঘুর করে। হান্নান তাকে দেখে। ইটগুলো একে একে পানিতে আঘাত করলে ছোট ছোট ঢেউ খেলে যায়। আড়চোখে  ছেলেটাও হান্নানকে দেখে। কয়েকবার।

‘শুয়োর’! হঠাৎ চিৎকারে মুখ ফেরায় হান্নান। গালিটা কে দিল, ছেলেটা? হ্যাঁ। সে এগিয়ে আসছে হান্নানের দিকেই।

‘ওই শুয়োরের বাচ্চা, কী করছ তুই ?’

‘তোর কী রে ?’

‘টাকা কী গাছে ধরে?’

‘তোর বাপের টাকা? যা ভাগ !’ হান্নান তেড়ে যায় ছেলেটার দিকে।

ছেলেটা চলে যেতে যেতে বিড় বিড় করে কী যে যেন বলে কিন্তু হান্নানের কান অব্দি কিছুই পৌঁছে না। বসে আছে সে। টাকা ফুরিয়ে এল। খালি পকেটে হাত রেখে আরো কিছুটা সময় নদীর পাড়ে বসে থাকে হান্নান।

বাইরে কাঠফাটা রোদ। মধ্যদুপুরের এই সময়টা রেস্টুরেন্টে লোকজন থাকে বেশ।  হান্নান অপেক্ষা করে। ভিড়ে অস্থির লাগে তার।  সীমা হয়তো যে কোনো মুহূর্তে চলে আসবে। ক্লাসে অনেক ঝামেলা ছিল, আম্মার শরীর ভালো নেই, বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ তারপর আরো কী কী সব বলবে মেয়েটা! হান্নারের কিছুই কানে পৌঁছে না। বরং ও হাসে! সীমা প্রায়ই বলে, ‘তুমি এমন কেন বলো তো? তোমার কি ফিলিংস নাই? ‘

হান্নান আবারও হেসে বলে, ‘না নাই, তো কী হইছে?’

সীমার সঙ্গে তার সম্পর্ক আর অনিশ্চিত একটা জীবনের কথা ভেবে চুপসে যায় হান্নান। কিন্তু কেন, কিসের সমস্যা তার!

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সীমা এসে সামনের চেয়ারটা দখল করে নিয়েছে খেয়াল করে নি হান্নান। ওকে খুব ক্লান্ত দেখায়। তেমন কিছু বলছে না সীমা। হান্নান ওয়েটারকে ডেকে খাবার আনতে বললে, সীমা বারণ করল। শুধু ঠান্ডা পানি চাইল এক গ্লাস।

‘পরীক্ষা কি খারাপ হইছে তোমার ?’

‘না।’

‘তাইলে কি হইছে? বাড়িতে কী হইল আবার?’

‘না কিছু না। বাদ দাও।’


হান্নান পকেট থেকে নোট বের করে। বাতাসে উড়ে যায় সবুজ কিংবা হালকা খয়েরি কাগজের নোট। 


টেবিলে খাবার থাকলেও সীমা পানি ছাড়া আর কিছু ধরে না। বার্গার থেকে লেটুস পাতাটা একটু বেরিয়ে আছে।  হান্নান টান দিয়ে পাতা সরায়। ও খেতে পারে না এইসব পাতা টাতা। এমনকি শশাও না। তবে অনেক টমেটো সস তার চাই। সীমা কিছুই খাচ্ছে না। দুটা সমুচা প্লেটে পড়ে আছে। সীমার দিকে এগিয়ে দিল হান্নান।

‘সমুচা তোমার পছন্দ  না? এটা খাও, আচ্ছা সস দিয়া খাও।’

পকেট থেকে একটা নোট বের করে প্লেটের ওপর রাখে হান্নান। টমেটো সসটা ঢেলে দিল সবুজ নোটটার ওপর। সীমা হাত ধরে ফেললেও হান্নান আরো একটু সস ঢালতে গেলে উঠে দাঁড়ায় সীমা।

‘তোমার কি মাথাটা খারাপ? আজকাল কী সব যে করো তুমি!’

‘কী করলাম ?’

‘সেদিনও তুমি এস্ট্রেতে নোটের উপর জ্বলন্ত সিগারেট রেখে দিলা! টাকা নষ্ট করছ কেন বলো তো? তাছাড়া নোংরা টাকাতে সস রাখলে কেউ কি খেতে পারে?’

‘টাকা ময়লা লাগে? আমার তো লাগে না সীমা, টাকা দিয়া কী না হয়!’ হাসতে হাসতে বলে হান্নান।

সীমা চুপচাপ বসে থাকে আরো কিছুক্ষণ। নেপাল বেড়াতে যাবার কথা বললেও সীমা বলে, ‘ছুটি নেই আমার, শেষ সেমিস্টারের এসাইনমেন্ট বাকি। তুমি যাও, আমি না  হয় পরে কখনো যাব তোমার সঙ্গে।’

‘নাহ! একা গিয়া কী করুম, তুমি যখন পারবা তখন যামু।’

ওয়েটার বিল দিতে এলে সীমা বলে, ‘ওকে কিছু টিপস দাও।’

‘নাহ, ওরা বেতন পায় আর দরকার কী।’

‘তুমি এত টাকা নষ্ট করো, আর সামান্য কয়টা টাকা এই লোকটাকে দিতে তোমার এত দ্বিধা ? আচ্ছা আমি দিচ্ছি!’

ব্যাগ থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে টেবিলে রেখে বেরিয়ে পরে সীমা।

‘শোনো তুমি আর ফোন করবা না, ইদানীং তোমার এইসব ব্যবহার আমার আর ভালো লাগতেছে না। পাগল একটা!’

হান্নান কিছু বলে না। ওয়েটারকে ইশারা দিয়ে ডাকে হান্নান। সস মাখা টাকাটা কী করবে এই ভেবে অনেকটা সময় টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ওয়েটার।

উত্তরায় নাভিদের বাসায় এসেছিল হান্নান। বন্ধু বলতে একজনই। মাঝে মাঝে আড্ডা হয়। ভ্যানগাড়িটা নাভিদের বাড়ির পাশে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। হান্নান সকালেই ওদের দারোয়ানকে বলেছিল একটা ভ্যানগাড়ি ঠিক করতে কয়েক ঘণ্টার জন্য। নিচে নামতে একটু দেরি হয় হান্নানের। লিফটটা নষ্ট, পাঁচ তলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামাটা কঠিন নয় আদৌ। অনেকটা হেলেদুলে নেমে আসে হান্নান। ভ্যান গাড়িটার একপাশে চাকাটা কাত হয়ে আছে। লোকটা ঝিমাচ্ছে ভ্যানের পাশে বসে। হান্নান কাছে এগিয়ে এলে জানতে চায় গাড়িতে তুলে নেবার মালপত্র কোথায়।

‘তোমার নাম কী ?’

‘সবুর।’

‘আমি যামু একলা, কোন মাল সামান নাই। তিনশ টাকা সন্ধ্যা পর্যন্ত দিম।’

‘হ ঠিক আছে, কোন দিকে যাইবেন স্যার?’ একটু আশ্চর্য হয়েই কথাটা বলে সবুর।

‘যাও বড় রাস্তা পার হয়া আগায়া যাও, কিনার দিয়া চালাও’।

সবুর গাড়ি চালায়। ক্লান্তপ্রায় মানুষটা চলে ধীরে। বিরামহীনশহরের সীমারেখা ছাড়িয়ে। বাতাসটা ভালো লাগে হান্নানের। অনেকদিন পর এমন এক অনুভূতি। ফোনটা বন্ধ করে দেয়। যদি সীমাও ফোন করে সে এখন কথা বলবে না। খালের পাশে বাতাসে গাছগুলো প্রায় কাত হয়ে যায়। হান্নান পকেট থেকে নোট বের করে। বাতাসে উড়ে যায় সবুজ কিংবা হালকা খয়েরি কাগজের নোট। সবুরের ডান হাত ছুঁয়ে একটা নোট উড়ে গেলে হঠাৎ থেমে যায় সে! এটা কী দেখল সবুর, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। থামতে গেলে হান্নান তাকে গাড়ি চালাতে বলে।

কিছু মানুষ ছুটে ভ্যানের পিছনে, টাকার জন্য। কেউ কেউ কুড়িয়ে পায় একটা দুইটা নোট।  কেউ উড়ায় আর কেউ বা কুড়ায়! তালগোল পাকিয়ে ফেলে সবুর, কী দেখছে এসব! সবুর কিছু বলতে চায়, কী বলবে ভাবে, পা কাঁপে তার! কে এই লোক, এইভাবে টাকা ফেলে কী লাভ তার! এই সব ভাবতে ভাবতেই হান্নান গাড়ি থামাতে বলে।

‘সবুর মিয়া থামেন, আমার পিপাসা লাগছে।’

ডাব কিনে খায় হান্নান। স্ট্র-টা সাদা। সবুর দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। তৃষ্ণার্ত কাকের পাশে সেও বসে পরে কলের পাড়ে । পানির ধারে। মিনিট খানেক কলের নিচে মাথা পেতে দেয় সে। আজকের মতো এই পানির তৃপ্তি বুঝি আর কখনও পায় নি সবুর। হান্নান পেছনে দাঁড়িয়ে।

‘এইবার চলেন সবুর মিয়া।’

‘আপনে দুপুরে কিছু খাইবেন না, স্যার? এইখানে হোটেল আছে তো ?’

‘খামু , এখন খিদা নাই। চলেন দেখি।’

ভ্যানে বসতেই হান্নান নোটের বান্ডিল খুলে। এই টাকাগুলো নতুন। বামদিকে ফেলে দিতে দিতে হান্নান দেখে সবুর পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে।

‘সবুর মিয়া তুমি কি দ্যাখো? গাড়ি  চালাও, আমার দিকে দেইখো না।’ রাগান্বিত কন্ঠে বলে হান্নান।

সবুর হাত পা কাঁপে, কে এই লোক! এগুলো কী টাকা, নাকি ভুল দেখছে সে!

বিকাল হয়ে আসে প্রায়। বাড়ির দিকেই যাচ্ছে সবুর, তাকে কিছু বলতে হয় নি হান্নানের। নাভিদের বাড়ির গেটের কাছেই থামে ভ্যানটা। তিনশো টাকা হাতে দেয় হান্নান।

‘আরো কিছু টাকা দেন না স্যার। ‘

‘ক্যান তোমার সাথে এই কথাই হইছিল না ?’

‘আমরা গরিব মানুষ, চাইর পোলাপাইন আর মায়েরে নিয়া কষ্ট কইরা বস্তিতে থাকি, আপনার অনেক টেকা আছে স্যার, কিছু দেন না স্যার!’

‘নাহ, আমার টাকা আমি এইভাবে দেই না। যাও।’

সবুর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মাটির দিকে, চোখ টলটল করে। গামছা দিয়ে চোখ মুছে বার কয়েক। হান্নান তাকে লক্ষ করলেও এড়িয়ে যায়। ভ্যানগাড়িটা চলে গেলেও আরো কিছুটা সময় গেটের কাছেই দাড়িয়ে থাকে হান্নান। এসেই নাভিদের বাড়িতে খেতে বসে সে।

‘তুই কই গেসিলি রে? গাড়ি নিয়া গেলি না ক্যান।’

‘নারে ভালো লাগে না, ভ্যানগাড়িতে ঘুরলাম সারাদিন, তুই তো এগুলি লাইক করছ না, নাইলে তোরেও নিতাম ।’

‘তুই অনেক বদলায়া গেসছ হান্নান, কী যে হইসে তোর!’

অনেক রাতে ধানমন্ডিতে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসে হান্নান। তখন রাজ্যের ঘুম চোখে তার।

সকালেই উঠে পরে আজ। জানালা খুলে দেয়। রাস্তাটা বেশ প্রশস্ত, এলাকা ভালোই,  মানুষের আনাগোনা তেমন একটা নেই। হান্নানের এখানেই ভালো লাগে। নিচে নামে হান্নান। লিফটটের কাছে দুই তিন জন দাঁড়িয়ে। একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চেনা চেনা লাগে যদিও কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না তার নাম।

‘স্যার আসালামুআইলাইকুম, আপনি ভালো আছেন? চিনতে পেরেছেন স্যার?’

‘নাহ  ঠিক মনে নাই।’ মৃদু হাসে হান্নান।

‘আমি রিনি তৈয়ব, আপনাদের অফিসে একবার ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম।’

‘বেশ আগের কথা মনে হয়।’

‘আপনাদের অফিসটা কি গুলশানেই আছে?’

‘হ্যাঁ, নিকেতনেও আরেকটা অফিস নিছি, আপনি কী করেন এখন?’

‘আমি চিটাগাং-এ চাকরি পেয়েছি, বিজনেস এনালিস্ট। ঢাকায় এক মাসের জন্য এলাম। হেড অফিসে কাজ। ফুফু আম্মার বাসায় উঠেছি এই চারতলায়।’

‘আমি থাকি তিন তলায়।’

‘আসি।’

‘দেখা হবে আবার।’

হান্নানের মনে পড়ে। মনে পড়ে মেয়েটার চাকরিটা দরকার ছিল, অনেকটা আকুতি করেছিল ইন্টারভিউর সময়। এই রকম ক্যান্ডিডেট খুবই অপছন্দ হান্নানের। তাছাড়া  মালিক হিসাবে এইসব দয়ামায়া তার মধ্যে কখনও কাজ করে নি।কিন্তু আজকে মেয়েটাকে ভালো লাগে তার। দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী। হয়তো চাকরিটাই তাকে এমনভাবে তৈরি করে দিয়েছে! মেয়েটাকে পছন্দ হয় হান্নানের।

ঘরে দরজা খুলতেই সীমার কথা মনে পড়ে। একটা বার ফোন করল না মেয়েটা। থাক। ফোনটা কয়েকবার হাতে নিয়েও রেখে দেয় হান্নান। এই সন্ধ্যাবেলা ঘুম আসে। অফিসের এতগুলো মিসকল! দুইটা ফোন হান্নানের। সীমা আর আম্মা ছাড়া এই নম্বরটা কেউই জানে না। অফিস যেতে ভালো লাগে না আজকাল তার। মফিজ আর শারমিন আপাই ব্যবসাটা দেখে রাখে। শারমিন আপা তাদের পাড়ার মেয়ে, ছোটবেলা থেকে চেনা। বছর তিনেক আগে চাকরি দেয় হান্নান, তবে কোনো সুপারিশে নয়। নিজ যোগ্যতাতেই চাকরিটা পেয়েছে সে।

সন্ধ্যা সাতটায় ঘুম ভাঙে। বাড়িতে কাজের মানুষ দুজন। কিছু একটা খেতে হবে। নিয়মিত রান্না হয় বাড়িতে কিন্তু নাস্তা ছাড়া কিছুই খায় না হান্নান। ডাইনিং রুমে বাতি জ্বলে। রুমের এক কোনায় টুলে বসে আছে হাবিব ড্রাইভার। ও এখানে কী করে? হাবিবকে ছুটি দিয়েছে সে গত মাসে। না ডাকলে ফিরে আসার তো কথা না।

‘স্যার ভালো আছেন? একটা কথা আছে।’

‘বলো হাবিব।’

‘আমার কিছু টাকা দরকার স্যার, হাজার দশেক।’

‘ঠিক আছে নিতে পারো কিন্তু সামনে মাসের বেতন থেকা কাটা যাইব, মনে রাইখো তুমি।’

হাবিব টাকাটা  হাতে নিয়ে মাথা নাড়ে।

সাড়ে আটটা নাগাদ হান্নান বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। লিফট থেকে নামতেই আবার দেখা হয় রিনির সঙ্গে। সে বাড়িতে ফিরল কেবল।

‘কাজ থেকে ফিরলেন ?’

‘হ্যাঁ , হেড অফিস থেকে ফিরলাম, আপনি ?’

‘কফি খেতে যাব, এই তো কাছেই। আপনি যাবেন ?’

‘হুম যেতে পারি।’ কিছুটা ইতস্ত হলেও রাজি হয় রিনি।

ওরা দুজন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

‘রিকশা না গাড়িতে যাবেন? ড্রাইভার ছুটিতে যদিও, আমিও চালাই মাঝে মধ্যে।’

এরি মাঝে একটা রিকশা এসে থামে গেটে। হয়তো ওদের দেখেই থামে এখানে। উঠে পরে রিনি আর হান্নান। রিনি আড়ষ্ট হয়ে এক পাশে বসে। ধানমন্ডিতে এই কফির দোকানটা ভালো। অনেক রাত অব্দি খোলা থাকে। সে প্রায় আসে।

হান্নান মেনুটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে। রিনি জানালার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

‘কী খাবেন? এখানে কিন্তু কফি চা ছাড়া অনেক কিছুই আছে।’

‘দেখছি, আসলে ফুফু আম্মা রাতে খাবার টেবিলে অপেক্ষা করবেন তো, দেখি এখানে হালকা কিছু খাব।’

‘আপনার যা ভালো লাগে।’

কফি খেতে খেতে কথা হয়। তবে দুজনই খেই হারিয়ে ফেলে বারবার। একটা ফোন আসে রিনির। ফোনে কথা বলে রিনি, ‘হ্যাঁ, আমি তো অপেক্ষায় ছিলাম, আপনি আমাকে ইনফরমেশনটা আবার দেন। এসএমএসটা পাই নি কিন্তু এখনো।’

‘হুম বলেন, আচ্ছা লিখে নিচ্ছি।’  রিনি কিছুটা থেমে একটা কাগজ খুঁজে ব্যাগে, না পেয়ে হান্নানকে ইশারা করে।

একটা নোট সামনে এগিয়ে দেয়, রিনি প্রথমে লিখতে না চাইলেও পরে লিখে নেয়। যদিও খুব ছোট করে টাকার নোটে লিখে রিনি।

‘স্যরি আমার খুব জরুরি ছিল ইনফরমেশনটা। কোনো কাগজই খুঁজে পাওয়া গেল না? টাকাতে লিখি না কখনও আমি! ওয়েটারদের কাছেও তো চাওয়া যেত!’

‘তাতে কী হয়েছে ?’

‘তাই বলে একটা পাঁচশো টাকার নোটে! আমার কেমন যেন লাগছে।’

‘আচ্ছা আপনে লিখে নেন অন্য কোনো কাগজে, তারপর না হয় দিয়েন, তাছাড়া এমনিতেও আমি টাকাটা নষ্ট করে ফেলব।’

‘কী বল্লেন? বুঝি নি।’

‘না কিছু না’ হান্নান কথাটা বলে ওয়েটারকে একটা কাগজ এনে দিতে বলে।

রিনি লিখে নিলে কলম দিয়ে লেখাগুলো কেটে দেয় বার বার।

‘এবার হলো? ‘ হান্নান হেসে বলে।

‘ঠিক আছে কিন্তু টাকাটা নষ্ট ?”

কথাগুলো আর বলতে দেয় না হান্নান, হঠাৎ থামিয়ে বলে—

‘আচ্ছা কাল কি আপনার সঙ্গে আবার দেখা হতে পারে ?’

‘হয়তো’ ছোট্ট এ উত্তর দেয়ার পর রিনির বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে কোন এক অজানা কারণে।

কফি শপ থেকে বেরিয়ে রিকশায় বাড়ি ফেরে ওরা। হান্নান টাকাটা পকেট থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে দিলে অন্ধকারেও চোখ এড়ায় না রিনির! অনুভূতির আড়ালে দ্বিধান্বিত রিনি কী যেন ভাবছে। লিফটে তেমন কোন কথা না হলেও রিনির মোবাইল নম্বরটা  হান্নান চেয়ে নেয়।

‘ফোন করতে পারি? মাঝে মাঝে?’

‘হুম, ফোন না ধরলে এসএমএসও করা যেতে পারে।’ মৃদু হেসে বলে রিনি।

হান্নান লোকটাকে কেমন যেন মনে হলেও কিছু একটা টানছে রিনিকে, সেইদিন থেকেই।

‘পাঠাও’ তে কখনো ওঠে নি হান্নান। আজ তাই ইচ্ছা হলো ব্যাংক থেকে বেরিয়েই পাঠাও নেবে একটা। হাবিব ড্রাইভার ছুটি শেষে ফিরে এসেছে। সকাল সকাল বেরিয়ে পরে হান্নান। উত্তরায় একটা মিটিং শেষ করে তারপর ব্যাংকে যায়। মিটিং এ কেন যে বার বার রিনির কথা মনে পড়ে হান্নানের। ওখানে বসেই একটা এসএমএম করে।

‘আজ দেখা হবে গ্লোরিয়া জিনসে? সাড়ে সাতটায় ?’

উত্তর আসে নি। বারবার ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে সে।

ঘণ্টা খানেক পর উত্তর আসে রিনির, ‘আজ না কাল হতে পারে। আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হবে।’

হান্নানের উত্তর, ‘অপেক্ষায় রইলাম।’


দ্যাখো সীমা, আমি কোনো কিছু লুকাইতে পারি না। রিনিরে আমার কেন ভালো লাগতেছে জানি না আমি।


ব্যাংক থেকে বেরিয়ে হাবিবকে ছুটি দিয়ে দেয় হান্নান। পাঠাও কল করলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে আসে মোটর সাইকেল।  নীলরং এর হেলমেটাটা পুরোনো। রং নষ্ট হয়ে গেছে। যাক তাও হেলমেট তো আছে। তিনশো ফিটের ঐদিকটা যাবে। সময় যে একেবারে কম লাগবে  তা নয়। তাছাড়া রাস্তায় কিছুটা জ্যাম তো আছেই। রবিউল নামের বাইকারের পেছনে বসে পড়ে হান্নান।

আজ পকেট ভর্তি করে নিয়েছে হান্নান। মোটর সাইকেলটা খুব দ্রুত চলছে, বছর পনেরো আগে এইভাবে সেও চালাত। হান্নান একবার চিটাগং রোডে এক্সিডেন্টও করেছিল। আম্মার সে কি কান্না! আজকে মনটা ফুরফুরে। রিনির কথা মনে পড়ছে বারবার।দ্রুত ঘোড়ার মতো চালায় লোকটা। বাতাসে শব্দ হয়। হান্নান একটা একটা করে টাকা ছুড়ে ফেলে বাতাসে। কখনও ডানে, কখনও বায়ে। রবিউল ব্রেক করে হঠাৎ।

‘আপনার ব্যাগ থেকে কি কাগজপত্র উড়ে যাচ্ছে?  ঠিক করে বসেন।’

‘না ও কিছু না , আপনে চালান তো।’

আবার মোড় না ঘুরতেই থেমে যায় রবিউল।

‘এই সব কী হইতেছে আমি তো কিছুই বুঝতেছি না, আপনে কি করতেছেন?’

‘আমি টাকা ফেলতেছি, কোন সমস্যা?’

‘কী যা তা বলতেছেন, আপনার কি মাথা নষ্ট নাকি? এগুলা কি কাগজ না টাকা? ‘ রবিউল রেগে যায় খুব! মোটরসাইকেল থেমে যায় রাস্তার পাশে।

‘আমার নিজের টাকা ব্যাটা, তুমি গেলে যাইবা, না হইলে আমি অন্য পাঠাও নিব!’ হান্নানও রেগে গিয়ে বলে।

‘আপনি ফাইজলামি পাইছেন? দেখি আপনার কত টাকা আছে? কখন থেকা দেখতেসি নোটগুলি ফালাইতেছেন রাস্তায় এদিক ওদিক।’

‘আমার খুশি আমি কী করি! যা খুশি করুম।’

‘নাহ এইটা কোনো আল্লাদ না, কয়টা টাকা ভাড়া দিবেন বইলা আমি এই অত্যাচার সহ্য করতে পারুম না ভাই জানেন কত কষ্ট হয় দুইটা টাকা কামাইতে? দিবেন আমারে দুইলাখ টাকা? একটা ভালো মোটরসাইকেল কিনুম?’

‘আমি টাকা দিমু ক্যান? টাকা আমি বিলাই না, নষ্ট করি!’

মাথায় রক্ত চড়ে যায় রবিউলের। মনে হয় এখনই লোকটার ব্যাগ ছিনতাই করে নেবে সে!  কিছুটা এগিয়ে এলেও হান্নান বুঝতে পেরে দ্রুত হাটে।

‘আমার টাকাটা দিয়া যান সাহেব, আমার পাওনা টাকাটা।’

হান্নান একটা নোট রবিউলের দিকে  ছুড়ে দিলেও বাতাসে কোথায় উড়ে যায়, দৌড়েও আর ধরতে পারে না রবিউল!

অলস দুপুর, হান্নানের জ্বর জ্বর লাগে, সেই সকাল থেকেই। আজকে রিনির সঙ্গে দেখা হবে। একটা কল করবে কি রিনিকে? ও যদি বাড়িতেই থাকে তাহলে হয়তো বলবে তিনতলায় চলে আসতে!

এসএমএস করে সে।

‘কোথায় তুমি অফিসে ?’

এসএমএস এর উত্তর আসে না তবে ফোন আসে। চোখ বন্ধ করে ফোনটা কানে কাছে ধরে হান্নান।

হ্যালোটা খুব পরিচিত মনে হয় ওর।

‘বলো রিনি।’

‘কী? রিনি কে? তুমি কার কথা বলছ?’ সীমার কন্ঠ।

‘রিনি একটা মেয়ে, বলো তুমি কেন ফোন করছ?’

‘আমি কী ফোন করতে পারি না?’

‘দ্যাখো আমার খুব জ্বর, চিৎকার কইরো না তো’

‘রিনি না কে যেন? এ আবার কে বলো তো? কথা আছে আমার, জরুরি! দেখা করব আজই তোমার সঙ্গে, এখনি!’

‘এখনই পারব না, বলছি তো জ্বর আমার, তুমি আসো আমার বাসায় এত কথা থাকলে।’

‘না পারব না, বিকালে আসব কিন্তু তোমার বাসায় না রেস্টুরেন্টে, বলেছি তো জরুরি কথা আছে।’

ফোনটা কেটে দেয় হান্নান। ভালো লাগে না কিছুই! সীমার এই সব অভিমান আর ভালো লাগে না তার। কী যে চায় মেয়েটা!

শারমিন আপার তিনটা মিসকল, মফিজও কাল রাতে ফোন করেছিল। অফিসে কোনো সমস্যা হয়তো। আজকে কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না আর। ঘুম আসে। চোখ ভর্তি ঘুম।

চারটার দিকে সীমার ফোনে ঘুম ভাঙে হান্নানের। ঘেমে গেছে সে। তাহলে জ্বরটা ছেড়ে গেছে!  শরীরটা হালকা লাগে খুব।

এসএমএস এ কথা হয় রিনির সঙ্গে টুকটাক। কী সব কথা। জ্বরের কথা বলতেই মেয়েটা লিখেছে, ‘সেবা করতে হবে নাকি ?’

‘হুম, আমার বাসায় চলে এসো, অফিস থেকে সরাসরি।’

‘ঠিক আছে, লিফটের কাছে এসে দাড়ালে ভালো হয়।’

‘অপেক্ষা করব সাড়ে সাতটায়।লিফটের পাশে।’

সীমার ফোন।

‘আমি অপেক্ষা করছি, তুমি কই।’

‘আসতেছি।’ বিকাল পাঁচটার দিকে দেখা হয় সীমার সঙ্গে। হান্নানকে অনেক ফ্রেশ দেখালেও সীমার মুখটা মলিন।

‘তোমার আবার কি হইল সীমা ?’

‘নতুন বিয়ের প্রস্তাব, কি করব বলো তো ?’

‘আমি তো বলেই দিছি, আমি এখনো বিয়ে টিয়ে নিয়া ভাবতেছি না  সীমা!’

‘নাকি অন্য কিছু ? রিনি কে বলো তো? তোমার কাছে কখনো এই নাম তো শুনি নি।’

‘সীমা, তুমি জানো আমি মিথ্যা বলি না, ওর সঙ্গে পরিচয় কয়দিন আগে, আমার ভালো লাগে মেয়েটারে।’

‘কী ? তুমি আমাকে বলো নি কেন?’

‘বলার সময় কোথায় পাইলাম, তুমি চলে যাওয়ার পর আর কথা কি হইছে তোমার সাথে আমার? আচ্ছা বাদ দাও কী খাবা, স্যুপ? তোমার প্রিয় তম-ইয়াম স্যুপ?’

সীমা কিছু খেতে পারে না, স্যুপের বাটিটা ঠান্ডা হয় গেছে প্রায়।

‘সীমা, তুমি জানো তো আমি কেমন, আমার কাছে সুখী হবা না কোনোদিন তুমি, তাছাড়া তুমি তো অনেক ছোট আমার। জীবনে অন্য কেউ হয়তো আসবে আবার। দ্যাখো সীমা, আমি কোনো কিছু লুকাইতে পারি না। রিনিরে আমার কেন ভালো লাগতেছে জানি না আমি। তবে হইতে পারে ও আমার মতোই। কথা বলে কম কিন্তু ওরে আমি বুঝি।’

‘আর কিছু বলো না তুমি।’ সীমা থামিয়ে দেয় হান্নানকে।

‘না বইলা কি লাভ? ও আজ রাতে আসবে আমার বাসায়, জ্বর শুনে আমাকে দেখতে চায়। সীমা তুমি কোনোদিন একবারও আসছো আমার অসুখ হইলে? কতবার ডাকছি তোমারে!’

সীমা ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরে রেস্টুরেন্ট থেকে। পাশের জানালা দিয়ে নিচে একটা ডাস্টবিন দেখা যায়।ডাস্টবিন ও তার আশেপাশে কিছু নতুন-পুরানো নোট এসে পরে রেস্টুরেন্টের জানালা বেয়ে।

রিনি আসবে সাড়ে সাতটায়। ওর জন্য কিছু কিনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কী কিনবে হান্নান!

মেয়েদের পছন্দের জিনিষপত্র ভালো বোঝে না সে। দোকানটা ছোট তবে ভালো। পারফিউম কিনতে গিয়েও থেমে যায়। এটা তো সীমার পছন্দের। না থাক। এই সুরভি শুধু ওরই থাকুক।

একটা ছোট লকেট আর চেইন কিনে হান্নান। রিনির পছন্দ হবে তো? শাড়ির দোকানের পাশে দুবার ঘুরে আসে সে।

এক্সেলেটরে আবার উঠে আসে হান্নান। নীলাভ শাড়িটা প্যাকেটে ভরে দিতে দিতে দোকানি মেয়েটা বলে, ‘এই প্রথম শাড়ি কিনলেন বুঝি ?’

‘একা এই প্রথম।’

প্রায় সাতটা। সাওয়ারে ঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুটা সময়। আবার জ্বর আসবে না তো হান্নানের? হলে হোক। রিনি তো পাশেই থাকে ডেকে নেবে বেলা-অবেলায়।

লিফটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা কেমন যেন লাগে। তাও সে অপেক্ষা করে। মোবাইলে চার্জ ফুরিয়ে যাচ্ছে। রিনিকে কি একটা ফোন করবে? প্রায় পৌনে আটটা।

রিনি হঠাৎ এসে হান্নানকে হাত ধরে টেনে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যায়!

‘ফুফাকে দেখলাম এই দিকে আসতে , উনি তো লিফটে উঠবেন। চলেন আমরা সিঁড়িতে যাই।’

‘আর যদি নষ্ট থাকে লিফ্ট? তাইলে উনি এদিকেই আসবেন।’ হান্নান একথা বলতেই দুজন একসঙ্গে হেসে ওঠে।

ডাইনিং টেবিলে অনেক খাবার। মেহমান আসবে শুনে অনেক রান্না হয়েছে আজ। কাজের মানুষ দুজন অনেক পুরানো, তেমন কিছু বলাও লাগে না হান্নানের।

গিফটের প্যাকেটটা ঘরেই ছিল। রিনি এসে ওর ঘরের সোফায় বসে।

‘তোমার কি পছন্দ হবে আমি জানি না, এইটা খুলে দেখো।’

‘শাড়ি তো অনেক সুন্দর, কী মিষ্টি রঙ! আচ্ছা এই চেইন লকেট আবার কেন, আমার জন্য এত কিছু কেন?

‘এমনি ভালো লাগল দেখতে, তাই কিনলাম। এই প্রথম কিন্তু, আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের জন্য কিন্তু আমি একা কিছুই কিনতাম  না, ওর পছন্দে হইত না।’

‘ওহ, হতেই পারে, কী নাম ছিল ওর?’

‘সীমা, মিষ্টি একটা মেয়ে, আমার চেয়ে কত ছোট জানো? প্রায় দশ বছর! কেন যে ও আমার প্রেমে পড়ছিল!”

‘আর আপনি ? “

‘আমি পড়ছিলাম নাকি, জানি না তো! ওর ছবি দেখবা? ‘ উচ্চস্বরে হাসে হান্নান।

‘হুম দেখি!’ মোবাইল থেকে সীমার একটা ছবি রিনিকে দেখায়।

‘বাহ, ভারি সুন্দর তো!’

‘কী জানি !’

‘লুকিয়ে রাখা কি যায় প্রেম? এই যে আমি, কী জানেন আমার সম্পর্কে ?’

‘জানতে চাই না কিছুই, তোমারে চিনি আমি।’

এমনিতে সিগারেট তেমন খায় না হান্নান। আজকে ধরাল একটা। তবে রিনির চোখ পড়ল এস্ট্রের দিকে। একটা আধপোড়া একশো টাকার নোটও ক্রিস্টালের এস্ট্রেতে জায়গা করে নিয়েছে।

‘এটা কি টাকা? পোড়ালেন কেন? আর এস্ট্রেতেই বা কেন?’

‘একদিন মনে হইল টাকা পোড়া গন্ধটা কেমন দেখি , তারপর সিগারেট নিভানের মতো টাকাটাও ওখানেই নিভাইছি আমি।’

‘আপনি এমন কেন? সেদিন আমাকে টাকা দিলেন লিখতে, এখানে পুড়ছে টাকা? এত ক্ষোভ কেন টাকার ওপর?’ হাসতে হাসতে বলে রিনি।

‘তোমার খারাপ লাগছে?’ মৃদু হেসে হান্নান বলে।

‘নাহ, কিছুই না, আমি আমার মতো বুঝে নিয়েছি, আপনি অদ্ভুত!’

‘আমি অদ্ভুত? আর তুমি? তোমার কথা বলো।’

‘আমার আর কী আছে বলার!  চাকরি নিয়ে ব্যস্ত জীবন। বাবা মা নেই, একা থাকি চিটাগং-এ। আমার ডিভোর্স হয়েছে দুবছর আগে, তারপর আর।” রিনি কথাটা শেষ না করতেই থামিয়ে দেয়  হান্নান।

‘তাতে কী রিনি? মানুষের জীবন কখন কোথায় নিয়া যায় কেউ জানে না।’

হান্নান রিনির হাতে হাত রাখে। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় রিনি, বুকভরে নিশ্বাস নিতে পেরে স্বস্তি পায় সে। বৃষ্টি হবে বলে মেঘের কিনারে চাঁদ লুকায়, আকাশের হাসিকান্নার আড়ালে থেকে যায় এক ফালি চাঁদ।

রিনিকে চারতলায় লিফটের দরজা পর্যন্ত দিয়ে আসে হান্নান। রিনির হাসি পায়। লোকটা কেমন যেন পাগলাটে!

অল্প নয় অনেকটাই। রিনি নিজেও কি তাই, হয়তো। কতদিন এভাবে নিজের কথা ভাবে নি। ছোট্ট একটা এসএমএস, ‘তোমাকে সুন্দর লাগছিল আজকে,  অনেক।’

এর কী উত্তর হতে পারে ভেবে পায় না রিনি। থাক। এভাবেই থাকুক।

হান্নান নিকেতনের অফিসে যাবে আজ। সকাল সকাল তৈরি হয়। কোনো কাজ নেই তেমন তবুও মনে হলো বেশ কদিন ধরে অফিসের হালহকিকত জানে না সে। গেটের পাশে সীমাকে দেখে অবাক না হয়ে পারে না হান্নান।

সীমার চোখ ছলছল, হান্নানের কেবিনের সোফায়  চুপ চাপ বসে আছে।

‘বল কী বলবা সীমা।’

‘তুমি কি সেই মেয়েটার সঙ্গে ?’

‘হ্যাঁ, ওরে খুব ভালো লাগে, অনেক পছন্দ আমার, ইনফেক্ট ও আমার খুব কেয়ার করে। জ্বর ছিল বইলা আমার বাসায় আসছিল আমারে দেখতে।’

‘তোমার বাসায়? কেন?’

‘আর কিছু জানতে চেও না সীমা। আমি প্রায় তিনবছর তোমারে জানার ও বুঝার চেষ্টা করছি! আর তুমি?’

সীমা উঠে পরে। চলে যাচ্ছে সীমা বিনতে হাসান। হান্নান একবারও থামায় না। কাউকে পিছু ডাকা ভালো লাগে না হান্নানের।

রিনি আজকাল অফিসের কনফারেন্সে ব্যস্ত, গত তিনদিন দেখা হয় নি ওদের। তবে ফোনে কথা হয়েছে। অনেক কথা। রিনি আরও বলেছে হান্নানের এস্ট্রেটা জাদুঘরে দিয়ে লিখে দেবে  ‘পৃথিবীর একমাত্র টাকার ছাই।’ হান্নানের ভালো লাগে রিনির এসব কথা।


হান্নান নেমে পরে কাদার গভীরে। রিনি পাশে থাকলে কী বলত? ‘কী অদ্ভুত আপনি!’ আর সীমা, কী বলত সীমা? ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’ 


আজ আর আফিসের দিকে যাবে না।  ঘুম ভাঙে দেরিতে। ড্রাইভার হাবিবকে ডেকে পাঠায় হান্নান।

‘তুমি জানি কই থাকো?’

‘শনির আখড়া স্যার।’

‘চলো তোমাদের ওইদিকে যাই, তোমারে তোমার বাড়িতে নামায় দিয়া, আমি গাড়ি নিয়া চইলা আসুম।’

‘কোন কাজ আছে স্যার ওইখানে ?’

‘হুম চলো’।

ব্যাংকে গিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় হান্নানের। ব্যাগটা বাসায় ফেলে এসেছে সে। এতগুলো টাকা কিভাবে নেবে সে! গাড়িতে ফিরে আসে আবার। হাবিবের কাছে ব্যাগ চাইলে একটা ছালার ব্যাগ এগিয়ে দেয়।

‘এইটা আমার বাজারের ব্যাগ স্যার, গাড়িতেই রাখি, রাস্তায় সস্তা কিছু পাইলে কিনা ফালাই।’

‘দাও , এইটাই দরকার এখন।’

টাকাগুলো ভরে ফেলে হান্নান। হাতলটা ভালো। এমন একটা ছালার ব্যাগ নিয়ে আব্বা বাজারে যেত রোজ। অতীতের কথা মনে পরে হান্নানের। ব্যাগের হাতলটা সত্যিই ভালো, ধরতে সহজ। হাবিবের হাতে দেয় সে।

‘স্যার, একটা কথা কইতাম।’

‘বলো।’

‘আমারে কিছু টাকা দিবেন স্যার, দুই হাজারের মত, আম্মার শরীর ভালো না তো।’

‘এডভান্স নিতাছ আবার?’

‘তাই দেন স্যার।’

হাবিবের বাসাটা গলির ভিতর। একটার বেশি গাড়ি চলে না এই সরু গলিতে। বাসার গেট পর্যন্ত যায় গাড়িটা।

হাবিব নেমে পরে, দুই হাজার টাকা পকেটে গুঁজে বাসায় ঢুকে পরে সে।

এই রাস্তা কেমন চেনা চেনা লাগে। এটা কী শৈশবের কোনো স্মৃতি না অন্য কিছু হান্নানের ঠিক মনে পড়ে না।

কিছু ভালো হলেও ভাঙা রাস্তাই বেশি এই এলাকায়। দুপাশে ময়লার স্তূপ, পাশেই একটা স্কুল। বন্ধের দিন বলে রাস্তায় মানুষের ভিড় কম। রিকশার স্ট্যান্ডের পাশে গাড়ি থামায় হান্নান। থালা হাতে বাচ্চাটা ওর পিছু পিছু দোকান পর্যন্ত যায়।

‘যা ভাগ! ভিক্ষা করছ ক্যান?’

বাচ্চাটার হাতে দোকানি একটা মিষ্টি দিয়ে দেয়। পুরো একটা লাড্ডু মুখে পুরে নেয় ছেলেটা।

আবারও হান্নানের দিকে হাতটা বাড়ায় সে।

‘দিমু না ভিক্ষা, যা এইখান থেকা।’

গাড়িতে উঠে বসে হান্নান। কাদায় চাকা আটকে গেছে। এ কোথায় এসে গেছে হান্নান! ময়লার স্তূপ আর পানি জমে আছে এখানে সেখানে। গত রাতে কী বৃষ্টি হলো! একটা খালের পাশে এসে থামে হান্নান। পানির বোতল খুলে গলা ভিজিয়ে নেয়। ভাঙা ইটের স্তূপের ওপর গিয়ে বসে সে। কেউ নেই এখানে। কেউ না। গন্ধটা চেনা লাগে। এই উৎকট গন্ধটা এত যে চেনা লাগে তার। ছালার ব্যাগটা খুলে ফেলে হান্নান। কালো পানিতে ভাসে পলিথিন, বোতল, ছেঁড়া সেন্ডেল। এই রকম একটা বাটার সেন্ডল ছিল হান্নানের। ওটা ঈদে আব্বা কিনে আনে। ঈদের দিনই চুরি হয়ে যায়। ভাসে ছেঁড়া সেন্ডেল, কচুরিপানা আর সবুজ গামছা। সেই সঙ্গে ভাসে টাকার নোট, পঞ্চাশ, একশো, পাঁচশো , মাঝে মাঝে এক হাজারও। আরো এগিয়ে যায় হান্নান, ওপাশে খাল, পানি তো নয়, শুধু ময়লা কাদার ঘরবাড়ি। ছালাটা এখনো ভারী হয়ে আছে, হয়তো অর্ধেকেও খালি হয় নি। হান্নান নেমে পরে কাদার গভীরে। রিনি পাশে থাকলে কী বলত? ‘কী অদ্ভুত আপনি!’ আর সীমা, কী বলত সীমা? ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’ মোবাইলটা পকেটেই ছিল, বেজে উঠে একবার। আরেকবার। ধরে না হান্নান। টাকা ফুরাচ্ছে না তো। কোমর পর্যন্ত নেমেছে হান্নান। এত চেনা অথচ উৎকট গন্ধটাই ভালো লাগে। এখানেই যেতে চায় সে। ডুবে যেতে যেতে শৈশবের ছেঁড়া সেন্ডলটা গলার পাশে এসে থামে। টাকার নোট আরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় সে। এ যেন ফুলের পাপড়ি, ভোরের আলো ফোটার আগেই মাটির শরীরে এলিয়ে পড়ছে শুধু। আরো দূরে আরো গভীরে নেমে যায় হান্নান। টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে, যেই সঙ্গে হান্নানের বেঁচে থাকাও। একটা দাঁড়কাক দূরে কোথাও সেন্ডেলে আটকে পড়া ভেজা টাকাটা ঠুকরে ঠুকরে খায়।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

ফারাহ্ সাঈদ

জন্ম ঢাকায়। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় সরকারি প্রসাশনে কর্মরত। লেখালেখির শুরু ঢাকায় স্কুলজীবনে। কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করেছেন ইংল্যান্ড থেকে।

প্রকাশিত বই :
একগোছা নদী [গল্প; ২০১১)
ফ্রেঞ্চ খোঁপায় শ্বাসরুদ্ধ চুলের জোছনা [কবিতা; ২০১৩]
পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম [কবিতা; ২০১৬]

ই-মেইল : sayeedfarah@gmail.com

Latest posts by ফারাহ্ সাঈদ (see all)