হোম গদ্য গল্প গোল্ডফিশ

গোল্ডফিশ

গোল্ডফিশ
131
0

বৃষ্টিহীন শহরটা তেতে উঠলে রাস্তার গাড়িগুলো দিগ্বিদিক ছোটে। কেউ কোনো নিয়মের ধার ধারে না। ধরবেই বা কেন! জায়গার অধিক বস্তুর ঠাসাঠাসি নিয়মকে দাবড়িয়ে নিয়ে গেছে অনিয়মের দিকে। নিয়ম নিজেকে গুটিয়ে পালাবার পথ করে এখন দেশান্তর।

অনিয়মের রাস্তা ধরে শহরটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে কার আগে কে পৌঁছাবে গন্তব্যে; যেখানে নাটোরের বনলতা সেনের চোখের মধ্যে আছে দু’দণ্ড শান্তি। অথবা জমে যাওয়া শীতের রাতে মুুরগির পালকের নিচে ডিম ফুটে বের হওয়া ছানাদের ওম।

এসব নিরন্তর ছুটে চলা মানুষদের মধ্যেও শ্রেণিবিভাজন আছে। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত মাড়িয়ে রাস্তায় দলিত মথিত হয় একদল। অন্য দলকে এসব কিছুই স্পর্শ করে না। তাদের চলন-বলন-বাসস্থান সবই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত খাঁচার মধ্যে বন্দি। একই মানচিত্রের মধ্যে থেকেও তারা যেন অন্য জগতের মানুষ। অতিরিক্ত আবেগী ও মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীল। যেন অ্যাকোরিয়ামে রাখা বর্ণিল মাছ বাইরে বের করলেই তড়পাতে তড়পাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে। সেই রকম জীবনে অভ্যস্ত গালিবা বাবার সদ্য কেনা প্রিমিওতে বসে তাপদাহ অনুভব করে না বরং ওভারটেক করতে অস্থির লোকাল বাসের ক্রমাগত হর্নে অস্থির। চোয়াল শক্ত করে ড্রাইভারকে সাইড দিতে বলে।

বিরক্তি মিশিয়ে ড্রাইভার বামদিকে স্টিয়ারিং ঘোরালে বাসের হেলপার ড্রাইভারকে গালাগাল দিয়ে শাঁ করে পরিধি বাড়ায়। গালিবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বাস উপেক্ষা করে বাতাসে আঘাত প্রাপ্ত হলে বৃষ্টির ঘুমভাঙে বোধহয়। ঘাড় ঘুরিয়ে সবেমাত্র মহাখালি দেখে চোখের পাতা বন্ধ করবার চেষ্টা করে। পারছে না। গান শুনতেও বিরক্তি। নিরুপায় চোখ মেলে ধরে ফেসবুক নোটিফিকেশনে ।


পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মহিলা তার রূপ ও কথার সম্মোহনে বাবাকে বাক্সবন্দি করে রাখত।


জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি উপেক্ষা করে প্রতিদিন কয়েক ডজন গাড়ি ফোটাচ্ছে যে শহর সেখানে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের মতো গাড়ি বিস্ফোরণও ক্রমশ ভারি করছিল। গালিবার বাবার কথাই ধরা যাক। সরকারি বিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাই একটির বেশি গাড়ি ব্যবহার করতে পারবে না জেনেও গত মাসে প্রিমিওটি কিনল। পাজেরো, নিশান সানি ও প্রিমিও নিয়ে তাদের গাড়ির সংখ্যা ৩। সৎ বোন রামিসার জন্যও একটা কেনার চিন্তাভাবনা চলছে। গালিবা ভাবল, কিনুক, তাতে আমার কী! চিন্তাকে দূরে ঠেলে আইফোনে মনঃসংযোগ করে। ও লেভেলে ৮টা সাবজেক্টে ‘এ’ স্টার পাবার সুবাদে মামার কাছ থেকে প্রাপ্ত আইফোনের দিকে তাকিয়ে গালিবা স্তব্ধ। তার চৌকোনিক শক্ত চোয়াল ঢিলা হয়ে অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়। মস্তিষ্কের মধ্যে শুরু হয় দপদপানি। কদমফুল!! স্ট্যাটাসটা দেখামাত্র মস্তিষ্ক ঘ্রাণ অনুভব করে নিউরনে খুলে দেয় স্মৃতির দরজা, দরজার পর দরজা।

‘কদমফুল! বন্যার প্রিয় ছিল। হুমায়ূন আহমেদের নায়িকাদের মতো, সে অসম্ভব জ্যোৎস্না ভালোবাসত, বৃষ্টিতে ভিজতে… মা হিসেবে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ! আজ তার জন্মদিনে একগুচ্ছ কদমফুলের শুভেচ্ছা।’ সিঙ্গাপুর থেকে বাবা-মায়ের ছবিসহ পোস্ট করেছে।

কাঠকাঠ গালিবার ব্যক্তিত্ব হঠাৎ রক্তের উষ্ণতায় গলতে শুরু করলে বদ্ধ গাড়ির স্বচ্ছ জানালা ঘোলাটে হতে থাকে। দ্বিধাহত কম্পিত পাখির মতো সে বসে থাকে। অনুভব করে পাঁজরের মাঝখান থেকে পাখিটা ফুড়ুত করে উড়ে বুকের মাঝখানটাতে টুকটুক করে ঠোকর দিচ্ছে। তখনই আনকন্ট্রোল ইমোশন চোখের কোণ ফুটো করে সাদাকালো স্মৃতির দিকে গড়ায়…

সেসব দিনগুলোর কথা। বর্ষাকালে দেখত নানার বাড়ির সামনের বারান্দায় লাইট পোস্টের আড়ালে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা কদমগাছটাতে ফুল ফুটলে মা বৃষ্টিতে ভিজত। কখনো কখনো আকাশ ভেঙে জ্যোৎস্না নামলে ছাদে বাবা-মা গল্প করত। আজি জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে… গানের সঙ্গে ফুলের ঘ্রাণের মাদকতায় বুঁদ হয়ে সব ভুলে যেত। গালিবা-লাবিবা দুবোন তখন নানা-নানির সঙ্গে মনোপলি খেলত। গালিবা ভাবত, আজ রাতে মা নিশ্চয়ই পরি হবে?

সেদিন তারা বাবা-মাসহ ঝুম বৃষ্টিতে বেরিয়েছিল। ভুবন ভুলানো হাসিমুখ নিয়ে মা বসে ছিল বাবার পাশে। বাবা ড্রাইভ করছে, পেছনে তারা দু’বোন বারবি পুতুলদের পরিপাটি করছে। মা সিডির ভলিউম বাড়িয়ে নিজেও মুখ মিলাচ্ছে, বাদল দিনে প্রথম কদম ফুল…। ভারি বৃষ্টিতে গাড়ি ড্রাইভিং বাবার একটি হবি। মাও খুব এনজয় করত। খাড়া নাক, কাজলের টান, মসৃণ গাল বেয়ে নামা নদীর ঢেউয়ের মতো ওয়েভি চুল, গ্লাসে অনবরত বৃষ্টির ফোঁটা, ওয়াইপারের ডানে-বামের দোল, পিছনের সিট থেকে দেখা মার সাইড ফেস যেন অন্য কোনো জগতের মানুষ। মুহূর্তে মার সাইড ফেস প্রচণ্ড আলোর ঝলকানিতে মনে হলো সাদা হয়ে মিলিয়ে গেল। তারপর সব কিছু অন্ধকার। অনেক পরে জ্ঞান ফিরে নিজেকে হসপিটালে অবিষ্কার করলে মা… মা… বলে কান্না। গালিবার অনুভূতিতে মা সেদিন সত্যিই পরি হয়ে গিয়েছিল।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বাবার অসাবধানতায় বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসটির ধাক্কায় মার মাথা সামনের ড্যাসবোর্ডে প্রচণ্ড আঘাতে ইন্টারনাল হ্যামারেজ। তারপর সব অন্ধকার… বহুদিন স্বপ্নে প্রচণ্ড আলোতে মার মিলিয়ে যাওয়া দৃশ্যটি দেখে ঘামে জবুথবু হয়ে জেগে কাঁদতে কাঁদতে আবার ঘুমিয়ে পড়ত।

হঠাৎ হার্ডব্রেক করলে গালিবা চমকে নিজেকে স্বপ্ন অথবা ইলুয়েশনের মাঝখানে আবিষ্কার করে পেছনে টিস্যু বক্সের টিস্যুতে ৮ বছর মা ছাড়া থাকার অভিমানকে জমিয়ে রাখে। টিস্যুগুলোও যেন মার মতো নরম হয়ে মিশে একাকার।

রাস্তার শেষপ্রান্তে নানার সম্পত্তিপ্রাপ্ত মার নামে নাম ‘বন্যা’ বাড়িটি এখন নতুন মায়ের মতো চটকদার ছয়তলা ফ্ল্যাট। ৫টা ফ্ল্যাটের দু’টাতে খালা ও মামা। অন্য তিনটার দুটোতে বাবার অফিস ও রোমেনা আন্টির ও অবশিষ্টটা তাদের দুই বোনের। আগে নানা-নানি তাদের সঙ্গে থাকলেও নানার মৃত্যুর পর নানি স্ট্রোকে হাফ প্যারালাইসড হয়ে এখন মামার ঘরে।

চার দেয়ালের মধ্যে গালিবা ও লাবিবার জীবনকাব্য ভালোই চলছিল। কাব্যের ছন্দ পতন ঘটে লাবিবা ক্লাসমেট সাদমানকে বিয়ে করে এমবিএ পড়তে আমেরিকায় যাবার পর। বোনের বিয়ের পর পুরো ফ্ল্যাটে গালিবা থাকত অ্যালিস, লাভবার্ডস আর বাবার দেয়া এক জোড়া গোল্ডফিশ নিয়ে। রাতে অ্যালিস সব সময়ই তার শয্যাসঙ্গী হলেও গোল্ডফিশ থাকত লাবিবার রুমে। অন্য রুমগুলোর কোনায় কোনায় শূন্যতা বিরাজ করত। সৎ বোন রামিসাকে লাবিবার রুম শেয়ার করবার জন্য হরহামেশা বাবার কান ভারি করে আসছিল রোমেনা আন্টি। ফ্ল্যাট বাড়িটাতে মার স্মৃতি হিসাবে বাঁধানো একটি ছবি, কাবার্ডে কয়েকটি শাড়ি ও কিং সাইজ বেডটা অবশিষ্ট ছিল; সেটাও চলে যাবে ভেবে গালিবার সাফ জবাব ছিল ‘না’। ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ করার জন্য মহিলা নানা রকম কথনভঙ্গিমা ব্যবহার করত, এমন সব চলচ্চিত্র করত যেটা সবার চোখে লাগলে, মুহূর্তে চটকদার কোনো গল্প বানিয়ে ফেলত। এমনকি গালিবার গ্রাজুয়েশনের দিন ভাব খান এমন যেন অল ক্রেডিট গোজ টু হার! পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মহিলা তার রূপ ও কথার সম্মোহনে বাবাকে বাক্সবন্দি করে রাখত।

মাঝে মধ্যে বাবা অর্থাৎ খলিল সাহেব সম্মোহন কেটে বেরিয়ে এলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবনা মাথা চাড়া দিত। তখনই গালিবার ব্যারিস্টারি পড়ার সবকিছু সেটেল্ট হয়ে গেলে বছরান্তে ডলারের অ্যামাউন্ট দেখে ব্যাংকে টাকার পরিণাম তলানিতে গিয়ে ঠেকবে ভেবে পুনরায় বাক্সবন্দি। মাঝেমাঝে কুমিরের কান্নার মতো কাঁদত। বলত, মা, মাগো, তুমি চলে গেলে আমাকে কে দেখবে?

তাহলে আবার বিয়ে করলে কেন? কথাটা গালিবার বুকেই রয়ে যেত। কষ্ট ভারাক্রান্ত মনে অ্যালিসকে জড়িয়ে ধরে বোনের রুমে এসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিত। গোল্ডফিশদের মনের কথা বলত। গোপন কষ্টগুলো শেয়ার করত। বলত, বাবা তো এমন ছিল না! হুট করে রোমেনা আন্টিকে বিয়ে করে বাবা থেকে আঙ্কেলে পরিণত হলো। বাবাকে মাঝেমধ্যে আঙ্কেল বলে সম্মোধন করে নিজেই হাসত।

নানার কাছে বাবা-মার কত গল্প শুনত। লন্ডনে ল’ নিয়ে পড়ার সময় থেকে বাবা-মার প্রেম তারপর দেশে ফিরে বিয়ে। সরকারি চাকরি সঙ্গে দু’জনে চেম্বার নিয়ে প্র্যাকটিস, সোসাইটিতে তাদের বেশ সুনাম ছিল, এরই মাঝে লাবিবা ও গালিবার জন্ম। অন্যদিকে মার খালাত বোন রোমেনা আন্টি এক ধনীকে বিয়ে করে দুবাই পারি জমালেও অ্যাডজাস্ট করতে না পেরে স্বামীকে ডিভোর্স করে রামিসাসহ সোজা দেশে। সেই সময়টাতে মা-ই সহানুভূতি দেখিয়ে তাদের সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে বললে এ বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথ সহজ করেছিল। গালিবা ভাবত, বাবাকে বোধহয় রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার লাবণ্যর চেয়ে কেটি মিত্রের চরিত্র বেশি আকর্ষণ করেছিল। তাই তো মিলনাত্মক গল্পের কাহিনি বিয়োগাত্মকে মোর নিয়েছিল রোমেনা আন্টির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে। মার অপমৃত্যুতে বাবা প্রায়শ্চিত্ত করত সারাদিন অ্যালকোহলের মধ্যে ডুবে, ফলে হার্ট লিভার সব শেষ। সব জেনেও অকৃতজ্ঞ রোমেনা আন্টি দেদারসে টাকা অপচয় করত। সৎ বোন রামিসা গায়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি জড়িয়ে ফেসবুক জালে হাবুডুবু খাচ্ছিল। একমাত্র গালিবাই ছিল তাদের পথের কাঁটা। নানি-মামা এই ফ্ল্যাটে না থাকলে গালিবাকেও তারা বনবাসে দিত, নয়তো বাড়ির চাকরানি বানিয়ে রাখত। ভাগ্যিস তারা ছিল! গালিবা তাই সিন্ডারেলা মন নিয়ে বাড়ির পোষা প্রাণীদের বন্ধু বানিয়ে অপেক্ষায় থাকত কোনো রাজপুত্রের।


ক্ষমতা বাড়ালে গোল্ডফিশরা রক্ষা পেত! শূন্যের কাছে অভিযোগগুলো কান্না হয়ে আকাশ ভেঙে অঝোরে ঝড়তে থাকে।


৪৫ মিনিটের পথ ৩ ঘণ্টায় পারি দিয়ে বাড়ি ফিরে গালিবা গোল্ডি ও সিলভানার কাছে গিয়ে বসল। প্রাণীদের প্রতি তার এই আপত্য স্নেহ নাকি স্বর্গীয় বাবার ভাষ্য ছিল। ৮ বছরের জার্মান সেফার্ডটি অন্য দিনের মতো দু’পায়ের উপর দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল কিন্তু মেঝেতে ফেলে জিভ দিয়ে গাল চেটে দিল না, শুধুমাত্র মাথাটা বুকের সঙ্গে ঘেঁষে রুমের দিকে চলে গেল। অ্যালিসের ব্যবহারে কিছুটা বিস্মিত হলো, হঠাৎ স্যানেলের ঘ্রাণ নাকে গেলে বোনের ঘরের দিকে আগায়। স্যানেল মার প্রিয় ব্র্যান্ড ছিল বলে ওদেরও প্রিয়। দরজা খুলে দৃশ্যত সব কিছু মাথায় রক্ত চড়ার জন্য যথেষ্ট হলেও নিস্তব্ধ হয়ে গেল অ্যাকোরিয়ামের দিকে তাকিয়ে। বিধ্বস্ত রুমে বিছানার উপর স্তূপাকারে মা ও লাবিবার পরিধানের কাপড়, অলংকার ও পারফিউমের বোতল পড়ে আছে। গালিবা পাথরের চোখ দিয়ে দেখল, স্বচ্ছ পানিতে গোল্ডফিশ দু’টোর স্থির হয়ে আসা দৃষ্টি।

বছর কয়েক আগে মায়ের হাতে সাজানো ডাইনিং-লাউঞ্জ-বেড রুম-রিডিং রুম-বারান্দা সব ডেভেলপারদের হাতুড়ির আঘাতে একের পর এক আস্তর খুলে কঙ্কাল বেরিয়ে এলে ছোট গালিবা প্রতিবাদ জানিয়েছিল দু’দিন না খেয়ে থেকে। অধ্যাপক নানা-নানি কষ্টকে সহজ করার জন্য কত প্রলোভন দেখাত। বলত, চারিদিকে দেখ, সবার বাড়ি কত ঝকঝক করছে! তোমারটাও ওদেরটা চেয়ে বেশি সাইনি হবে। রিয়েলি উই মিন ইট!

ইটের পর ইটের গাঁথুনি, পলেস্তারা, ঝকঝকে ইটালিয়ান টাইলসের নিচে চাপা পড়ে গেল বনানীতে শুয়ে থাকা মার কবরের মতো বাড়িটিও। সেদিন প্রতিবাদের ভাষা না খেয়ে থাকা হলেও এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত? গালিবা ধীর পায়ে অ্যাকোরিয়ামের সামনে এসে সাইড টুলে বসে গ্লাসে টোকা দিলে ঠোঁট এগিয়ে কিস করবে ভেবে অপেক্ষা করল। না দু’জনের কেউই এল না, শুধু একটু লেজ নেড়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করে ডাস মেরে রইল। অজানা ভয়ে অস্থির গালিবার চিৎকারে সমস্ত বাড়ির ভিত কেঁপে উঠল। সৎ বোন রামিসা ড্রেসিংরুম থেকে তীব্র পারফিউমের ঘ্রাণে বাতাস ভারি করে, হাই হিলের টকটক শব্দে গালিবার হৃদয় গুঁড়িয়ে দৌড়। ছয়ে পা রাখার পর থেকে রামিসা এই বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। ১৪ বছর বয়সে প্রত্যাশার অধিক প্রাপ্তি তাকে বিগড়ে দিয়েছিল। রোমেনা আন্টির প্রশ্রয়ে বাড়ির সবকিছুর উপর তার অনধিকার চর্চা বাবা দেখেও না দেখার ভান করত। শুধু বলত, সম্পর্কে এখন সে তোমার ছোটবোন। একটু অ্যাডজাস্ট ক্ষমতা বাড়াও দেখবে সব ঠিক।’

আর কত অ্যাডজাস্ট ক্ষমতা বাড়ালে গোল্ডফিশরা রক্ষা পেত! শূন্যের কাছে অভিযোগগুলো কান্না হয়ে আকাশ ভেঙে অঝোরে ঝড়তে থাকে। মাছেরা অসুস্থ হলে কী করা উচিত! এমন সময় ল্যান্ড ফোন বেজে উঠলে অবচেতন মনে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ওয়াট ডু উই ডু হোয়েন দ্য ফিশ ইজ ইল!

—হোয়াট! রোমেনা আন্টি কৌতূহল নিয়ে বলে, হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট! আর ইউ ওকে!

—প্লিজ হেল্প মি, সেভ মাই গোল্ডফিশ!

—ডোন্ট ওয়ারি! ইট জাস্ট এ ফিশ! এভরিথিং উইল বি ওকে। নাউ জাস্ট প্রে ফর ইউর ফাদার। ডাক্তার বলেছে আজ রাতেই ওপেন হার্ট হবে। সবাইকে দোয়া করতে বলো। টেক কেয়ার।

টেলিফোন রেখে পৃথিবীতে ফেরত এলে একটু আগে শোনা কথাগুলো ধাতস্থ করতে কষ্ট হলেও দৃষ্টি পুনরায় অ্যাকোরিয়ামে। মাছের ব্যাপারে কে তথ্য দিতে পারবে ভাবতে গিয়ে প্রথমেই বাবার মুখটা ভেসে ওঠে। ‘গোল্ডফিশ সৌভাগ্যের প্রতীক’ বিশ্বাস করে বাবা তাদের গিফট করেছিল। বলেছিল, শুধু সৌভাগ্য না তোমাদের উপর কারো নজর লাগার আগে যেন এই মাছেদের উপর দিয়ে যায়।’

সেদিন গালিবার অসহায় গোল্ডফিশ দুটোকে বলির পাঠা মনে হলেও লাবিবা তাদের দুটো সুন্দর নাম দিয়েছিল। জনপ্রিয় ফেন্সি জাতের সাদা ও কমলা কম্বিনেশনের মধ্যে আংশিক সাদার পরিমাণ বেশিটা ‘সিলভানা’। অন্যটার মধ্যে সোনালি রঙের প্রভাব বেশি বলে ‘গোল্ডি’।

মাছ দুটির সুন্দর নাম দিয়ে বেশ গর্বিত হয়ে বাবার কাছে নিয়ে গেলে সে বলল, আমার কাছে তো এ দুটোকে মনে হচ্ছে লাবিবা ও গালিবা। সিলভানাকে দেখিয়ে বলল, দেখ লাবিবার মতো শান্ত। গোল্ডিকে দেখিয়ে বলল, একদম গালিবার মতো গাল ফোলান।’

গালিবা মুখ গম্ভীর করে বলেছিল, এই দু’টো হচ্ছে, তুমি আর মা।’ বাবার মন তাতে ক্ষণিকের জন্য নস্টালজিক হলেও বাবা মেয়েদের আহ্লাদে আড়ালে কোথাও হৃদয় পোড়া গন্ধ গালিবার নাক ঠিকই স্পর্শ করেছিল।

লাবিবা চলে যাবার পর প্রতিদিন গালিবা গুগলে দেখত, হাউ টু লুক আফটার অ্যা গোল্ডফিশ। সেভাবে গোল্ডফিশ দু’টোকে বেশি অক্সিজেন পাবার জন্য রাউন্ড বোল থেকে ফ্ল্যাট অ্যাকোরিয়ামে আনার আগে ২ থেকে ৩ দিন ধরে পানিতে মেডিসিন মিশিয়ে প্রস্তুত করে তারপর বাহিরের টেম্পারেচারের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে রুম অন্ধকার করে ছেড়ে দিয়েছিল। প্রতিদিন দু’বেলা দুটো করে ফিশফুড দিত সঙ্গে মাছদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, সপ্তাহান্তে একবার পানি চেঞ্জ ও অ্যাকোরয়াম ক্লিন করত। ফেন্সি জাতের মধ্যে মুরস, অরানডাস, ফানটেইলস, র‌্যানছুস, বাবল-আইস, সেলিসটেইলস ও লায়নহেডস নানা প্রজাতির গোল্ডফিশের ছবি দেখে বের করেছিল তাদেরটা ফানটেইল প্রজাতির। ডিম্বাকৃতি দেহ, ফাঁপানো চোখ, পৃষ্ঠদেশে উঁচু একটা ডানা, ঘারে কুঁজ ছাড়া সিলভানা ও গোল্ডি ছিল লম্বা ঝুলে পড়া লেজের অধিকারী। পানির রসায়ন প্রিয় পানির মধ্যে গোল্ডফিশদের নিরাপদে বিচরণ করার সৌন্দর্য ছিল অবর্ণনীয়। মনে হতো স্বর্গীয় দূতেরা মাছের রূপ নিয়ে তাদের আলগে রাখছে; সৌভাগ্য বিতরণ করছিল বলে গালিবা ও লেভেল, এ লেভেলে অল এ পেয়েছিল। রোমেনা আন্টির কুনজর ডিঙ্গিয়ে গালিবার পড়ার সব খরচ বাবা তার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছিল। অন্যদিকে গোল্ডি ও সিলভানাকে দেখভালের উছিলায় গালিবার ক্ষত হৃদয়ে মলমের প্রলেপ দিত।

বাবা তো চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেদ হসপিটালে মনে হতে গালিবার গোল্ডফিসদের বাঁচাতে মামার কাছে দৌড়ায়… বুয়ার মামা হসপিটালে খবরটা দিলে হাতে সময় কম ভেবে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে শোনে ভেতর থেকে নানি বলছে, বাবার জন্য দোয়া কর..,’ গালিবার নানির কথা শোনার সময় কই! সে কম্পিউটারে ফেসবুক স্ট্যাটাটে কমেন্টস লেখে, প্লিজ হেল্প মি সেভ মাই গোল্ডফিশ!

নিশ্বাস ফেলার চাইতেও দ্রুত পৌঁছে যায় গালিবার বন্ধু মহলে। অপেক্ষার প্রহরে সেকেন্ড ঘণ্টায় পরিণত হলে পুনরায় মাছদের কাছে বসে। বন্ধুপ্রিয় গোল্ডফিশদের স্মৃতি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি আলাদাভাবে গালিবাকে চিহ্নিত করতে পারত বারবার দেখে। গলার স্বর ও শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে তারা তাকে বন্ধুর মতো আপন করেছিল।

এই মুহূর্তে গোল্ডফিশ দু’টো বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে পারছে না বলে নিজেদের অপরাধী মনে করে। তারা ঈশ্বরের কাছে মানুষের ভাষায় কথা বলার জন্য প্রার্থনা করল। গালিবাকে বলতে চাইল, পরজন্মে তুমি মাছ হয়ে জন্ম নিও। তোমার দুঃখ ভোলাব।’

গ্লাসে আঙুল দিয়ে গালিবা অনবরত টোকা দেয়। নাহ! নড়ছে খুব আস্তে। পানির মধ্যে মেলে ধরা তাদের লেজ, ডানা ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছে। সিলভানার দেহ হাফ সার্কেল হয়ে নিচে গিয়ে কুচিকুচি পাথরে আঘাত প্রাপ্ত হলে কিছুটা নড়ল কিন্তু উপরে উঠার চেষ্টা করল না।

চোখের সামনে গোল্ডি নিস্তেজ হয়ে গেল। সিলভানা কিছুটা শক্তি সঞ্চার করে নড়ল, ডানা দুটো দিয়ে সাঁতরে আগাল, লেজ লেড়ে ঠোঁট ফাঁক করে গ্লাসে মুখ লাগিয়ে গালিবাকে স্পর্শ করল।

গালিবা ভালো করে তাদের পর্যপেক্ষণ করল; কোনো সাদা চিহ্ন কিংবা ফিন রট আছে কিনা। এর আগেও অসুস্থতা দেখা দিলে একটি মগে অল্প পানিতে মেডিসিন মিলিয়ে পুরো অ্যাকোরিয়ামে আস্তে আস্তে ঢেলে দিলে কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে যেত। আজও তেমন করলে কিছুই হলো না। হঠাৎ খেয়াল হলো ঘরে এসির টেম্পারেচার রামিসা ১৭তে নামিয়েছিল। এসি বন্ধ করে দরজা-জানালা খুলে দিল ।


আবেগী কষ্টগুলো মনের হ্রদে অসহায় মাছ হয়ে সাঁতার কাটে যেন দুটি গোল্ডফিশের একটি মরে যাবার পর আরেকটি মরার অপেক্ষায়।


ফেসবুকে লাইকিং এসেছে পাঁচটা। আশ্চর্য! ‘মাছকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন’ এতে লাইকিং দেবার কী আছে? অস্ট্রেলিয়া থেকে মামাত ভাই ফাহাদ মন্তব্য করেছে, এদের রাখতে হয় রেকট্যাঙ্গেল কাচের জারে।’ কানাডা থেকে অরাত্রিকা ‘রাপিড চেঞ্জেস ইন টেম্পারেচার ক্যান কিল দেম।’ সাকিব লিখেছে, মোস্ট গোল্ডফিশ ইলনেসেস ক্যান বি ট্রিটেড উইথ মেডিকেশন।’

‘আশ্চর্য! সব জানা তথ্যগুলো। নতুন কিছু বল।’  গালিবা চিৎকার করে। মামাকে ফোন করল, হ্যালো মামা, মাছদের বাঁচাতে কী করা উচিত? তুমি তো ডাক্তার, প্লিজ হেল্প মি!

—মি. দত্তকে ফোন করেছ?

—করেছিলাম, সেভাবেই করলাম, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

—কাঁটাবনের রাজ্জাক মিয়াকে ফোন কর, নয়তো ইউটিউবে দেখ। আশ্চর্য! তুমি একদম বন্যা আপার মতো করছ! অনেক বছর আগের কথা, তোমার বাবা এক কাণ্ড করল। আগে ইউরোপে এক সনাতন নিয়ম ছিল বিয়ের প্রথম অ্যানিভারসারিতে ভালোবেসে স্বামী স্ত্রীকে একজোড়া গোল্ডফিশ উপহার দিলে পরবর্তী বছরগুলো শুভান্বিত ও সমৃদ্ধশালী হয়। প্রচণ্ড ইউরোপ ভক্ত তোমার বাবা তাদের প্রথম বিয়ে বার্ষিকীতে আপাকে একজোড়া গোল্ডফিশ দিল। আপাও তাদের নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকত। গোল্ডফিশ বেশি দিন বাঁচে না, কিন্তু সেগুলো অনেকদিন বেঁচেছিল।

মামার কথায় বিব্রত গালিবার স্মৃতিতে মায়ের অ্যাকোরিয়াম ক্লিন করার দৃশ্যটা কিছুটা স্পষ্ট হয়। শুনেছিল আমাদের দু’বোনকে আয়ার কাছে বসিয়ে প্রতিটা পাথর কুচি, প্লাস্টিকের লতা-গুল্মগুলো, অক্সিজেনের নল পর্যন্ত পরিষ্কার করত। হঠাৎ করে সেই মাছ দুটোর ভাবনাও গালিবাকে বিচলিত করে। ফ্ল্যাটে ওঠবার পর তাদের আর দেখা যায় নি।

—মন খারাপ করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। দুলা ভাইয়ের বাইপাস লাগবে। কেয়ারটেকার মজিদ মসজিদে বাদ মাগরিব মিলাদে আপার জন্মদিনের সঙ্গে দুলাভাইয়ের জন্যও দোয়া করতে বলবে। অপারেশন সাকসেসফুল হলে একটা কেক নিয়ে আসব।’

মামা ফোন রাখলে দরজা ঠেলে অ্যালিস এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। গালিবা কি মনে করে বারান্দায় গিয়ে লাভ-বার্ডদের মুক্ত করে দিল। অনেকদিন বন্দি থেকে উড়তে ভুলে যাওয়া পাখিগুলো কোথাও গেল না। ঘরে ঢুকে পুনরায় অ্যাকোরিয়ামের পাশে বসে মোবাইল থেকে কাঁটাবনের ফোন নাম্বার খোঁজে। বাবার কথা মনে হতে ফিলিং এসে নিয়মমাফিক তার শক্ত চোয়ালকে ধাক্কা মেরে, অহংকার ভেঙে দাঁড় করিয়ে দেয় প্রচণ্ড আবেগের সামনাসামনি। আবেগী কষ্টগুলো মনের হ্রদে অসহায় মাছ হয়ে সাঁতার কাটে যেন দুটি গোল্ডফিশের একটি মরে যাবার পর আরেকটি মরার অপেক্ষায়।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

জেসমিন মুন্‌নী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ঢাকা। রক্তের গ্রুপ ‘বি’ নেগেটিভ।

শিক্ষা : বিএ [অনার্স], এমএ [বাংলা], চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই—

মৌ [আন্দরকিল্লাহ পাবলিকেশন]
শামুক রাজা ঝিনুক রাণী [নওরোজ পাবলিকেশন]
মানুষ ও মানুষের গল্প [শ্রাবণ প্রকাশনী]
কুয়াশা ও দীঘশ্বাসের দিন [শুদ্ধস্বর প্রকাশনী]
লেখক ও নায়িকার দ্বিতীয় পর্ব [জয়তী প্রকাশনী]
ইস্তাম্বুল উপাখ্যান [ভ্রমণ গদ্য, শ্রেষ্ঠ প্রকাশনী]
জীবনানন্দ দাশের লক্ষ্মীপেঁচা উপন্যাস, মেঘ প্রকাশনী]
সুখী মানুষের দেশে [ভ্রমণ গদ্য, তিউরি প্রকাশনী]
সোনার হরিণ [গল্প, শ্রাবণ মেম্বার উত্তরা ক্লাব]


সম্পাদনা—

‘দ্রাঘিমা’ গল্প বিষয়ক অনলাইন পত্রিকা।

পুরস্কার ও সম্মাননা—

‘ইস্তাম্বুল উপাখ্যান’ গ্রন্থের জন্য সৈয়দ মুজতবা আলী পুরস্কার, ২০১৭ অর্জন।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক [ইন্টারন্যশনাল টার্কিশ হোপ স্কুল, ঢাকা, ২০১৬]

অন্যান্য—

বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পতে গল্পের উপর কাজ করেছেন।
এম. এম. নুরুল হক ফাউন্ডেশনের মেম্বার।
পলাশডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপদেষ্টা।
উত্তরা লেডিস ক্লাব ও লায়ন্স ক্লাবের মেম্বার।

ই-মেইল : jasminmunni70@gmail.com