হোম গদ্য গল্প গণতন্ত্র অথবা নারায়ণ কাকা

গণতন্ত্র অথবা নারায়ণ কাকা

গণতন্ত্র অথবা নারায়ণ কাকা
322
0

প্যানাসনিকের স্টেরিও ক্যাসেট প্লেয়ার কাঁধে নিয়ে মতিন স্বপ্নের মধ্যে ঘুমায়। ঘুমায় আর দেখে যে সে যথেষ্ট উচ্চস্বরে বাজনা বাজার পরও কানটাকে ক্যাসেট প্লেয়ারের মাইকের মুখে লেপ্টে গান শোনার চেষ্টায় মগ্ন। কী বাজছে সেখানে!

‘এ মেরা দিল পেয়ার কা দিওয়ানা, দিওয়ানা মেরা দিল পেয়ার কা দিওয়ান…’

এত মিষ্টি করে গায় ক্যারে!

আহা মিষ্টিই বটে! পেট ভরাইন্না মিষ্টি।

আচ্ছা মতিন কী করে ঘুমায়, জাইগা জাইগা স্বপন দেখে না স্বপ্ন দেখে দেখে ঘুমায়! আহা মধু! আশা ভোশলে! মধু মাখা গলায় গায়রে। মৌলিক গণতন্ত্রীর দিন শ্যাস কইরা লোকেরা এখন বুকের মইধ্যে বাজায় মৌলিক সমাজতন্ত্রীর গান! আহা মধু! জাপানি জিনিসের মজাই আলাদা, দেখনাই দেখনা কিবা!

বইবাধাই দেখতে দেখতে তাকেও শুনতে হয় এই গান নিত্যদিন। ভালোই লাগে। তবে নারায়ণ কাকাদের গানে অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চার আছে। চুদির ভাই পাবলিকের আর খাই দাই কাজ-কাম নাই খালি বাচ্চা তোলায়। ন্যাশনাল জিডিপি কিয়ের কয় তিন বছরে ২% বাড়ছে আর সেইখানে লোক বাইড়ে ফ্যালছে কিনা ৩%, আরে শালার পুতেরা গণ্ডায় গণ্ডায় ছাও তুইলা ফেলাইতেছে আর অভাবের লাইগা দোষ পাড়ে নয়া সমাজতন্ত্রী গো।


রাজার  ক্লিন অভিযানে নেবে আসে বিভীষিকা, যার থেকে রেহাই পেতে সকলে মিলে ঈশ্বর বন্দনায় মাতে।


মা গো মা কী যুদ্ধটি না হছিল পাকির পুত গো সাথোত। পাকির পুত মরে কী মরে না আর সক্কলে মিলিটারি সাজে লাইন দি দাঁড়ি যায়। সেই লাইন কি আর থামে! থামে না। হাজার বিশ হাজার কি তার ১০ কী ৫০ গুণ তো হবেই দাদি কয় এখনো ঘুম ঘোরে; ভাইডা তার, গেদু, ছোট ভাইরে লাইনে দাঁড়ানো কালোয় ডোরা ছাপানো মিলিটারিরা কী পিডানিই দিছিল যে সে আর উঠেই বসে না, বসে না তো বসেই না; তাই না দেখি আর না শুনিই বাদবাকি ভাই কটা ডরালো। গেল গিয়া সান্দালো কিনা দূর দূর আরও দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের ঘরে প্রাণে বাঁচতে। ৮ মাস ২২ দিন ছিল ডরানো দিন সক্কলের, তারপর উবানের শিক্ষায় শিক্ষিত পুলাপান যায়ে দাঁড়ায় সময়ের পাতায় লিডার সমেত। লিডার বলে ছিল জেলে, সেও নামে সময়ের পাতায় ক্ষমতার ঘাড়ে চড়ে; ভালোবাসার ফুল দূর দূর দিয়া উপচাইয়া পড়ে কেউ দেখে না তারে, কেউ দেখে না তার হাজারে হাজার পুত মরে হেজে খালি কঙ্কালডা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লেকের ওপার ধরে দক্ষিণগঞ্জের দিকে। বাপে দেখে না বাপে শুনে না, বাপে খালি শুনে ‘আপনি হলেন বাপ আর সক্কলে আপনারে থুয়ে মধু খায়-মাখে–চাখে আর ফ্যালে।’  আহা ফ্যালেরে!

ধারণার বীজ পুতছিলাম, চারা গজাবে, অপেক্ষা; লক্ষ পুত্রের লক্ষ্য একটাই ধারণার চারা গজাবে, ডালপালা মেলবে, পাখি এসে বসবে, গানও গাইবে। গাবে না যে বড়!  তবে বৃক্ষ না হলে কিন্তু বেয়োনেট দিয়ে খুঁচাবে সকলে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চারা বসাবে, ডালপালা গুঁজে দেবে, পাখি এনে বসাবে, স্টেরিও দিয়ে গানও বাজাবে। সব, সব করবে। তাই ব্যাংক লুট হয় লুট হয় সম্পদ যা কিছু ছিল অবশেষ হয়ে যায় লুটের মাল, কোনো এককালে গিয়ে কারো ঘরে থাকবে না এই লুটের মাল স্বমহিমায় একটা সোনালি পয়সা হয়ে!

নির্দেশ আসে জমা দাও বেয়নেট সকল। যে বধিছে এতকাল দেখা শত্রুকে সে আজ অভ্যাসের বশে পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জের আওতায়  নিয়ে  আসতেও পারে  অদেখা  শত্রুকে  তার। তাই জমা দাও হাতিয়ার সকল, তা ধাতব আর ধারণা হোক। ঝুপ ঝুপ করে পড়ে না নির্দেশ্য কণ্ঠ অনুসারে হাতিয়ার সকল। বরং আকাঙ্ক্ষার-স্বপ্নের-সম্ভাবনার  সূত্র সমেত সকলে  চলে যায় দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে নবদৃষ্টি সমেত অন্ধকারের হাতড়ে ফেরা সুড়ঙ্গ ধরে, পথ কিন্তু জানাই ছিল, যে পথ তার পরিত্যাজ্য হলো মুহূর্তের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে।

নারায়ণ কাকাদের পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জের আওতায় পড়ে বাপের ব্যাটারা সব ৮ মাস ২২ দিনের তাণ্ডব ভুলে যায়, তখন ঘোর লাগা মানুষের চোখ  দ্যাখে আবার দেখতেও পারে না কালোয় ধূসরবাদামি নাকি ঘোর লাগা সবুজ দূত, সাক্ষাৎ মৃত্যু দূতেরা এসে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় ‘গণকণ্ঠের মন্ত্রের ছোমকি দাঁড়ায়।’ মামুদকে নাকি তুলে নিয়ে গিইছিল ‘সুংবাদে কয়, স্টেরিও প্লেয়ারির মদ্যি রেডিও শুনি কছালে সকলে।’

কন্যার আবাদি দিনে আবার সকলের বাপের কথা খানা মনে পড়ে যায়।

‘মেয়িডা ফিরল মানষি মরলি পরে।’

আর সেই মানুষ যে কিনা থামাইছিল গণ্ডায় গণ্ডায় বাচ্চা জন্ম দেয়া।

‘গ্রামের মানুষ গো কাজ দি, উন্নয়ন করি আর খুলা বাজার বসায়ি।’

তো মানষি আর নাই, গণতন্ত্রীর সুবাতাস আবার করে বয় খোলা হাওয়ার পথ বেয়ে একাকী কেউ তারে ছোঁয় না, পায়ও না, আসলে ছুবার পারে না। ঘন ঠান্ডা কাঁচের আবদ্ধ চেম্বারে গণতন্ত্র ঘুমায় যে কিনা আবার নিজে নিজেরে ঠান্ডা করতে বাড়ায় বাইরের উত্তাপ। দূর দূর আর দূরান্তের মানুষেরা চাইতে আসে সে তন্ত্র, হাতে লোষ্ট্র ছুড়ে দেবে তা কাঁচ বরাবর তারপর ফুটো হওয়া কাঁচের ছিদ্র পথ দিয়ে গড়িয়ে আসবে গৃহের ছায়া, নদীর পানি, পাশের বাড়ির মেয়েটি, ওমুকের ছোট ছেলেটা, জনতা যারা  ছিল  শ্রমিক-কৃষক আর মেহনতি সক্কলেই বেরুবে ত্রস্ত পায়ে পিছনে যে তাদের অঢেল সাথি—পেটে তাদের ক্ষুধা। এসে ছড়িয়ে পড়ে দখলীকৃত মাঠে-ময়দানে-ফুটপাতে-পার্কে-রেস্তোরাঁর সামনে; উপকণ্ঠ থেকে ক্রমশ অভিজাতের কণ্ঠে। পরে সময়ে সময়ে এই একই দখলী কায়েম করে লোষ্ট্র হাতে মানুষদের উত্তর প্রজন্ম। রাজার ক্লিন অভিযানে নেবে আসে বিভীষিকা, যার থেকে রেহাই পেতে সকলে মিলে ঈশ্বর বন্দনায় মাতে।

‘খোদা খাদ্য দাও নয়তো তুলে নাও।’

স্টেরিও ক্যাসেট প্লেয়ারের গান কিন্তু বন্ধ হয় না বরং নতুন উদ্যমে তা বাজে, বাজে মানুষের কানে কানে; উচ্চ ভল্যুমে বেজেও তাকে তুলে ধরতে হয় মাইক বরাবর মানুষের কানকে ঢেকে দিতে সকল বিভ্রান্তি থেকে যা দিকে দিকে ছড়িয়ে যায় আবেগি পিতার মুখ নিঃসৃত বাণী হয়ে।

এবং সাথিহারা একজন ছিল যে কিনা ছিল পথের ধারে ফুটপাতে ঘুমিয়ে, সাকুরায় আকুণ্ঠ মদ গিলে মাঝরাতে কল্যাণপুরের সিনড্রেলার অপেক্ষায় থাকা রুমের পানে চলতে গিয়ে বেহুঁশ রাতে ঘুমিয়েই গিয়েছিল শেষপর্যন্ত। সিনড্রেলা তার চলে গিয়েছিল ধাবমান কুয়াশায় ঢেকে আসা এক গোধূলি বেলায়। ফেরে নি, ফেরে না সময়ের সিন্ড্রেলারা ফেরে না। বহু বছর পর কিছুক্ষণের জন্য মুখটা না দেখিয়েই উঁচিয়ে শব্দটাকে শুধু বাইরে ঠেলে দেয়, ‘কখনোই ভালোবাসি নি তোমাকে।’


ধরণার শরীরের কাপড় সরে যায়, খুনি পুত্র খুন চায়, টাটকা টকটকে লাল খুন চায়। 


নারায়ণ কাকারা গায়ের জামা খুলে সক্কলে পরে নেয় এক বসন। পিতার পুত্র, পুত্র ধরিত্রীর, রক্ত দিয়েছে মা’টাকে তার কণ্ঠ নিঃসৃত হাজার বছরের ভাষাটাকে সমেত বাঁচাতে। কিন্তু পুত্র এখন কার, সে কথা কয় কার ভাষায়! কেউ কি বোঝে তার ভাষা?

‘যদি বোঝেই তো পুত্রের এত কসরত কেন সগলিক সেই ভাষা বুঝাবার, এই ভাষা না তার মা পাছিল তার পিতা-মাতার কাছ থ্যাকে তারাও কিনা পাছিল তাগের পিতা-মাতা থ্যাকেই।’

পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জের মধ্যে ঠান্ডা নল, বুকে ঠেকানো ঠান্ডা নল। যার পেটে কিনা ধাতব ভাষা যা মুহূর্তেই পারে মানব শরীরের ভাষাটাকে বদলে দিতে । তো ভাষা বদলাবার কারিগর বনে যায় পুত্রেরা আর দেরি না করেই বদলে দিতে থাকে হাজার মানুষের শরীরের একান্ত আপন ভাষা।ধরণার শরীরের কাপড় সরে যায়, খুনি পুত্র খুন চায়, টাটকা টকটকে লাল খুন চায়।  দাঁড়ান পুত্রের হাতের চেটোয় উঠে যায় ছিটকে যাওয়া খুনের স্রোত বহমান স্রোতের বিপরীতে, সন্তুষ্ট  হয় না  তারা। তাই বদলে দিতে হয় খুনের ভাষাকেও। স্বর্গ-সঙ্গীরাই হয়ে ওঠে অদৃশ্য শত্রু। তারপর নাবে খুন, পিতার সাথে পুত্রের খুন মিলিয়ে দিতে নাবে পিতার গা থেকে। হারিয়ে জান পুত্র সমেত পিতা, প্রয়োজনের ঈশ্বর ছেয়ে যায় চৌদিক তার ঐশ্বরিক ভাষা সমেত।

মক্তবে মক্তবে ওঠে কলরোল। সিঙ্গেল এন্ট্রিটি ঐশ্বরিক ক্ষমতা থেকেও বেশি ক্ষমতা রাখে। তাই নারায়ণ কাকারা যায় পীর সাহেবের খানকায়। আটরশির পীরের খানকায়। বন্ধ থাকা চোখের পাতায় ছায়া পড়ে, দশটাকার একটা কড়কড়া নোটের ইমেজ দেখা দেয় আর ততসঙ্গে শব্দহীন জোড়া চোখের হয়ে রুমে ভরে যায়।

রুবাইয়াৎ সিমিন

জন্ম ২৯ আগস্ট, ১৯৮৩; চুয়াডাঙ্গা।

শিক্ষা : বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : প্রভাষক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

ই-মেইল : ru.simin@yahoo.co.nz

Latest posts by রুবাইয়াৎ সিমিন (see all)