কয়েল

কয়েল
400
0

১.
বাল! একটা কয়েল খুলতে এতক্ষণ লাগে! মাদারচোদ পুরা দিনটা ফালায় দিতেছে কয়েলের প্যাঁচ খুলতে। এদিকে পেচ্ছাবের প্রেশারে ব্লাডার ফেটে যাইতেছে তার। এত পানি খাওয়া উচিত হয় নাই আশলে। মাইনষে লিটার-লিটার পানি ঢকঢক খেয়ে ফেলে, সে এক গ্লাসের উপর দুই গ্লাস খাইলেই মুতা ধরে দশ মিনিট পরপর। এইটা আগেও খেয়াল করছে সে। বেশি পানি লাগে না তার সারা দিনে। তিন গ্লাস মোর দ্যান ইনাফ; বেশি হইলে চাইর গ্লাস। এর বেশি সে খাইতেই পারে না। শীতকালে তো আরও কম, দুই গ্লাসেই মামলা ফিট। আল্লা বোধহয় আরব দেশের উট বানাইতে গিয়া ভুলে মানুষ বানাই ফেলছে তারে। তারপর সেইখানে জায়গা না পাইয়া টুপ কইরা এইদেশে ফালায় দিছে; মুতার জায়গা পর্যন্ত নাই কোনো খানে!

এতক্ষণে চাচা মিয়া খুলতে পারছে কয়েলটা। এই কারণেই সে বুড়া মাইনষের দোকানে আসে না সচরাচর। মারাত্মক খাঁচড়া হয় এইগুলা। মিনিমাম ইফিসিয়েন্সি নাই কিন্তু একটা পয়সাও ছুটতে দিতে রাজি না। বাইঞ্চোদ সব! সিগারেট দিছে, প্যাকেট দেয় নাই। দুইটা সিগারেটের জন্যে নাকি প্যাকেট হয় না। অথচ, পেছনের পলিথিনে গণ্ডায়-গণ্ডায় খালি প্যাকেট।


বন্ধুর মুখোমুখি বসে তার মনে হইতেছে হাইটও কমে গেছে, এমনকি ওজনও! অথচ, বাথরুমে যখন পেচ্ছাব করতেছিল কিংবা ওই বুইড়া চাচার কাছ থেকে যখন কয়েল কিনতেছিল তখনও ফিলিংটা ছিল না।


কয়েলটা নিয়েই জোরে জোরে হাঁটা দেয় তারেক। একুশে হসপিটালের পাশের গলি দিয়ে ঢোকে। কোথাও নীল রঙের বিল্ডিং দেখা যাইতেছে না। ব্লাডারটা মনে হয় ফেটেই যাবে আজকে। বাইঞ্চোদের শহরে এত মানুষ; কোনো জায়গায় যে জিপার খুলে দাঁড়াইয়া যাবে সেই উপায়ও নাই।

এই প্রথম সুজনের অফিসে যাচ্ছে সে। বলছে একুশে হসপিটালের পাশের গলি দিয়ে শেষ মাথায় নীল বিল্ডিঙের চারতলা। এইটা কোনো ঠিকানা দেয়ার সিস্টেম হইল! বালের হসপিটালের চারপাশে চোদ্দটা গলি আছে। এই মুতভর্তি ব্লাডার নিয়ে সে এখন চোদ্দটা গলি খুঁজে বেড়াবে!

২.
ত্যাগের আনন্দ আশলেই তুলনাহীন। ছড়ছড় করে মুততে মুততে ভাবে তারেক। আবেশে এতটা বেখেয়াল হয়ে পড়ে যে মুতের ছিটকা এসে নিজের পায়ে লাগে। লাগুক গা! নিজেরই মুত, সমস্যা নাই কোনো। কয়েলের গন্ধটা ফাঁকফোকড় দিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢুকে পড়তেছে। নাক জ্বালা করা তীব্র গন্ধ! তবু কেমন জানি একটা শান্তিশান্তি ভাব; একটা নিশ্চয়তা। মশার কামড়ের একটানা অস্বস্তি থেকে বাঁচায় এইটা; একটা আরাম তৈরি করে মাথার ভেতর। কিন্তু কয়েলটা তো এত তাড়াতাড়ি জ্বালাইয়া ফেলার কথা না!  বিকল্প একটা ব্যবহার আছে এইটার, হুট করে সেটা মনে পড়তেই ভ্রু কুঁচকে উঠে তারেকের। তাইলে কি সে যা ভাবতেছিল তা না! স্রেফ মশার কামড় খাইতেছিল বলেই তারে দিয়া কয়েল আনাইয়া নিছে সুজন! বাল! অথচ সে কত কী ভেবে বসে আছে।

সুজনের অফিসে আজই প্রথম আসছে তারেক। বহুদিন ধরে বলতেছিল। কিন্তু আসব আসব করে আসা হয় নাই। পাথরঘাটা থেকে মুরাদপুর, অনেক দূর। রিকশায় এলে সত্তর-আশি টাকার কম হবে না। সে অবশ্য বাসে আসছে। বাস ভাড়াই দশ টাকা নিছে নিউমার্কেট থেকে। এই টাকাও এখন গায়ে লাগা শুরু হইছে তার। তারেক এমন ভাবতেছে; এইটা যে-কেউ শুনলে অবাক হবে। তার চালচলনে আর যাই হোক দশ টাকার জন্যে সিঁটাইয়া যাওয়ার মানুষ মনে হওয়ার কথা না। এর উপর কয়েলের দশ টাকা, দুইটা সিগারেট ছাব্বিশ টাকা; টোটাল ছেচল্লিশ। ফিরতে আবার পনেরো-বিশ টাকা খরচ আছে। পুরা ইনভেস্টমেন্টটাই লস মনে হইতেছে এখন।

সুজন তার বেশ পুরানো বন্ধু। কত পুরানো? পনেরো-ষোলো বছর তো হবেই। সেই হিশেবে জীবনের অর্ধেক। সেই অর্ধেকের অর্ধেক সময় তারা দুজন ব্যবসার আলাপ করেই কাটাইছে। বিভিন্ন ব্যবসা। মধ্যবিত্তের ইজ্জত মারা খায় না এমন কিছু একটা। যাতে কিছু পয়সাও আসে আবার নিজেদের বন্ধুত্বটাও এঞ্জয় করা যায়। সম্মানের প্রাধান্য এখন দ্রুত কমে আসতে শুরু করছে অবশ্য।

আজকেও একটা ব্যবসার আলাপ করতে আসছে সে। অনলাইন ব্যবসা। সুজন আগেই শুরু করছে। এখন তাকেও পার্টনার করতে চায়। ওয়ার্কিং পার্টনার। ওয়ার্কিং পার্টনার কথাটার মধ্যে একটা প্যাঁচ আছে; একটা খাদের মতো এইটা। সাথে সাথে চলতে থাকা গর্ত। এর আগেও বেশ কয়েকটা ওয়ার্কিং পার্টনার টাইপের কাজ করছে সে, ব্যুরো ভেরিতাসের চাকরিটা চলে যাবার পর। তখনই গর্তটা আবিষ্কার করছে পায়ের তলায়। দেখা যায় না কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায় কবরের খাদের মতো কী একটা চলতেছে পায়ের সাথে। এমনকি তার উচ্চতা পর্যন্ত কমে গেছিল তখন। সুজনের সাথে অবশ্য ব্যাপারটা ভিন্ন হওয়ার কথা; সুজন তার অর্ধেক জীবনের বন্ধু।

বন্ধুত্বের ভাবনাটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন বিশ্বাস থাকলেও এক ধরনের চাপা অস্বস্তি কাজ করতেছে তার মধ্যে। আবার গর্তটাতে পড়তে যাইতেছে এইরকম একটা ফিলিং হইতেছে কেন জানি। যাইতেছে না, অলরেডি পড়েই গেছে এমন। এই যে এইখানে, পাকা ফ্লোরে বন্ধুর মুখোমুখি বসে তার মনে হইতেছে হাইটও কমে গেছে, এমনকি ওজনও! অথচ, বাথরুমে যখন পেচ্ছাব করতেছিল কিংবা ওই বুইড়া চাচার কাছ থেকে যখন কয়েল কিনতেছিল তখনও ফিলিংটা ছিল না। ইনফ্যাক্ট গর্তের তুলনাটাই তার মাথায় আসে নাই। এখন সুজনের সামনে বসে ‘ওয়ার্কিং পার্টনার’ টার্মটার মধ্যে যেন কয়েক ইঞ্চি দেবে গেছে সে!

৩.
পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে চেয়ারের গদি থেকে নিজের পাছাটা আলগা করে তুলে ধরে তারেক। আলাপ শুরু হবার আগেই যে করে হোক আগের উচ্চতায় ফিরে যাইতে হবে। সুজনকে কিছুতেই বুঝতে দেয়া যাবে না ব্যাপারটা। সুজনের দিকে তাকায় সে। সুজন মনোযোগ দিয়ে গেমস খেলতেছে ল্যাপটপে। উল্টোদিক থেকে যদিও দেখা যাইতেছে না কী গেইম কিন্তু তারেক আন্দাজ করতে পারে এটা সেই বোমা ফুটাবার গেইমটা। একশটা বোম লুকানো থাকে একটা ছক-কাটা বক্সে, তার আশেপাশে কিছু নাম্বার। নাম্বারগুলো দেখে বোমা কোথায় আন্দাজ করতে হয়। একটা ভুল ক্লিক পড়লেই সব বোমা একের পর এক ফাটতে শুরু করে। একারণেই সুজনকে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকাইয়া থাকতে হইতেছে মনোযোগী হয়ে। এ-অবস্থায় কোনো কিছু খেয়াল করার কথা না তার। একটু নিশ্চিন্ত হয় তারেক। তারপরও নিজের কাছে পরিস্থিতি আরেকটু স্বাভাবিক করতে সিগারেট দুইটা টেবিলে ডলতে শুরু করে সে। একটু দ্বিধা নিয়ে জানতে চায়—

—সিগারেট খুলব একটা?

—খুলো। বাড়তি সুগাগুলো রেখে দিইও একটা কাগজে।

যাক। জিনিস আছে ওর কাছে। ভালো পরিমাণেই আছে মনে হচ্ছে। নতুবা সুগা রেখে দিতে বলত না। বেশ টেনশনে ছিল সে। আলাপ শুরুর আগে দু-চার টান না মারলে আড়ষ্টতা কাটবে না তার; ভেবে একটা মানসিক শক্তি পায় তারেক।

তাদের আড্ডার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এইটা। অনেকসময় শুধুমাত্র শালটু খাওয়ার জন্যেই তারা একসাথে হয়েছে কোথাও না কোথাও। তারেকের বাসাতেই খাওয়া হইত বেশিরভাগ সময়। খাওয়ার আগে নিয়ম করে কয়েল জ্বালাইয়া দিত গন্ধটা আড়াল করার জন্য। এইটা তাদের কোড হয়ে গেছিল একপর্যায়ে। একজন অন্যজনকে কয়েল আনতে বলার মানে হইতেছে স্টিক বানাবার মসলা জোগাড় হইছে। এখন অবশ্য পাওয়া যায় না আগের মতো। তাছাড়া খাওয়ার আগ্রহও কমে গেছে দুইজনের। বিশেষ করে সুজন তার ভাইয়ের অফিসে বসা শুরু করবার পর থেকে।

এইখানে আসবার সময় সুজন কয়েল আর সিগারেট আনতে বলাতে তারেক আন্দাজ করছিল সুজন জিনিস জোগাড় করছে কোথাও থেকে। আসামাত্র কয়েলটা জ্বালাইয়া দেয়াতে হালকা টেনশনে পড়ে গেছিল যদিও। নিয়ম হইতেছে স্টিক জ্বালাবার আগের মুহূর্তে কয়েলটা ধরানো। যাই হোক, জিনিস যে আছে তাতেই সে খুশি। আলাপটা ঠিকঠাক চালাই নিতে পারলেই হবে।

—ব্যবসার কথা তো কিছু বললা না?

সিগারেট থেকে সুগা বের করতে করতে জিজ্ঞেস করে তারেক। ইচ্ছে করেই গলার স্বরে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিটা মিশিয়ে রাখে সে।

—কাজ ফেলে আসছ নাকি কোনো?

সুজনেরও ক্যাজুয়াল উত্তর। আক্রমণে ধার নাই, কিন্তু জানাইয়া দেওয়া, সেও প্রস্তুত। এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। অনেকটা যুদ্ধ শুরুর আগে বিউগল বেজে উঠবার মতো। তারেক একটা পজ দেয়। নিজের সাথে বোঝাপড়া করে নিতে চায় আরেকটু। সুজনের গলার স্বর কি কর্কশ শুনাইল কানে? নাকি ওভারথিংক করতেছে সে? আগে কিন্তু এমন পাল্টা প্রশ্ন করত না সুজন। আগে বলতে সাত-আট মাস আগে পর্যন্ত। যখন তারা শুধু বন্ধু ছিল। তখন সুজনের চাকরি ছিল না। দুঃসময়ের সঙ্গী ছিল সে। এখন গলায় হালকা চাপ দিয়ে দিয়ে কথা বলা শুরু করছে। এইটা সে ফোনেও খেয়াল করছে। এমনও হইতে পারে, পুরাটাই তার ভুল ধারণা। আদতে এমন কিছুই হইতেছে না। নিজের অবস্থার কারণে একটা সন্দেহের বেড় তৈরি করে নিতেছে সে। হঠাৎ মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে তার  নিজের উপর। চারপাশে সন্দেহের বেড়, পায়ের নিচে হীনম্মন্যতার গর্ত; যত ভাবতেছে তত বড় হইতে শুরু করতেছে সব।


কতল করব সবগুলোরে; সাঁড়াশি দিয়া গলা টিইপা ধরব। নিভা খানকির পোলারা আমারে; যদি পারোস।


৪.
কয়েলটা জ্বলতেছে। এইমাত্র দপ করে উঠল ছাই ঝড়ে পড়ে। কী সুন্দর টকটকা আলো! কেমন যেন একটা প্রচ্ছন্ন দেমাগ, একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব আছে ওর মধ্যে। বিকালের আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট এইটার আভা দেখা যাইতেছে। জানালার পর্দাগুলো খোলা থাকলে কি এতটা জ্বলজ্বল করতে পারত ফুসকুড়িটা! তারেক ভাবে। না পারলেও অবশ্য কোনো সমস্যা ছিল না, নিজের কাজটা তো ঠিকই করে যাইতেছে মাদারচোদ! আলোটা বরং তার শোভা। দুনিয়াকে লাল চোখ দেখাইয়া দেয়া; তার নিজস্ব ভাষায় চিৎকার—‘কতল করব সবগুলোরে; সাঁড়াশি দিয়া গলা টিইপা ধরব। নিভা খানকির পোলারা আমারে; যদি পারোস।’

সেও এরকম ভেবেছে সবসময়। এই ছোট্ট আলোর টুকরাটার মতো। দেখা যাবে কি যাবে না। মাঝেমধ্যে ছাই ঝেড়ে ফেলে নিজের উত্তাপ জানান দিয়ে যাওয়া। বুঝাইয়া দেওয়া একবার জ্বলে উঠলে আর নিভবে না সহজে। আগুনের মতো মোচড়ামোচড়ি করবে না, নিভে যাওয়ার আতংক ছড়াবে না বাতাসে। এদিকে মশার মতো শত্রুরা মরতে থাকবে আনাচেকানাচে, ঠা ঠা ঠা ঠা…! একটা মোক্ষম সুযোগ লাগবে তার, জায়গা মতো একটা হাতুড়ির বাড়ি। এবার আর কোনো ভুল না। ছাইকে সোনা বানাবে সে এবার। কয়েলটার মতো শেষ দম পর্যন্ত জ্বলেই নিভবে…

ভাবনাটা এক ধরনের তৃপ্তি দেয় তাকে, সাহস আসে বুকের মধ্যে। যদিও এমন কিছু ভেবে আসে নাই সে সুজনের কাছে। বরং একটা খাদে পড়বার ভয় পেয়ে বসছিল বন্ধুর মুখোমুখি বসে। আবার এইটাও ঠিক যে বিপরীতে একটা মরিয়াপনা টেনে নিতে চাইছে সে কলিজার ভেতর। কিন্তু জুত মতো বাঁধতে পারতেছিল না শক্তিটাকে। কয়েলটা দেখেই ভাবনাগুলো মাথায় এসে গেছে আপনাআপনি। কোথাও হয়তো ছিল ভেতরে। মরে পড়ে ছিল। কয়েলের লাল আলোয় আর শালটুতে জুত মতো টান পড়তেই মাতালের মতো টলতে টলতে দাঁড়াই পড়ছে ভুলে। যেভাবেই দাঁড়াক, শুইয়ে পড়তে দেয়া যাবে না একে আর। প্লিজ! দাঁড়াই থাকো বাবা, প্রয়োজনে হড়হড় করে বমি করে দাও। তবু ঝুলে থাকো কিছু একটা ধরে। বাকিটা আমি সামলাইতেছি…

সবকিছু কেঁপে-কেঁপে উঠতেছে তারেকের চারপাশে। গলা কাঠ হয়ে আছে শুকাইয়া। বোতলে পানি নাই। আগেই বোতল খালি করে ফেলছে সুজন। মাথা ফিরাইয়া ঘরের কোনার পানির জারটার দিকে তাকায় সে। বোতলটা ভরে নিয়ে আসবে কি না ভাবে, পরক্ষণেই বাদ দেয় চিন্তাটা। তৃষ্ণাটা আরেকটু জমুক গলার মধ্যে। টেবিলের কোণটা বেশ শক্ত করে ধরে রাখে সে। তারপরও তার মনে হয়, আরেকটু শক্ত করে ধরা যাবে বোধহয়। এই মনে হওয়াটা আজীবন জ্বালাইছে তারে। কখনোই আন্দাজ বুঝে উঠতে পারে নাই, বালটার!

সুগার চাইতে শালটু বেশি হয়ে গেছে। দেশাল বোধহয়। এত দ্রুত হিট করত না নাইলে। নাকি বহুদিন পরে খাইতেছে বলে এমন মনে হইতেছে? কতদিন পরে টানতেছে? ছয় মাস? আরও বেশি হবে। চাকরি পাওয়ার পর তো একসাথে বসাই হয় নাই সুজনের সাথে। তারও এক দেড়মাস আগে শেষ খাইছিল। এই মাল কই পাইল সুজন কে জানে!

তারেক টেবিলের উল্টাপাশে বসা বন্ধুর চোখের দিকে তাকাইতে চায়। চেহারা দেখা যাইতেছে না। ল্যাপটপটার স্ক্রিনের পেছনে হারাইয়া গেছে যেন।

—কয়েলটা নিভাইয়া দেই? নীরবতা ভাঙে তারেক।

—না, থাকুক আরও কিছুক্ষণ।

স্বস্তি পায় সে। তারমানে আরেক দফা চললেও চলতে পারে।

এই সিগারেটটাও খুলব নাকি?

সুজন স্ক্রিনের উপরে মাথা তোলে। ঘোলা-ঘোলা লাল চোখ। এমনভাবে তাকাই আছে যেন কথাটা এখনও তার কান পর্যন্ত পৌঁছায় নাই। নাও পৌঁছাইতে পারে। তারেক আরেকবার বলবে কি না ভাবে। নাকি অপেক্ষা করবে আগেরবারের বাক্যটা সুজনের কান পর্যন্ত পৌঁছাবার জন্যে? ভাবনাটা বাদ দেয় পরমুহূর্তে, ট্র্যাপও হইতে পারে। সুজন মাথাটা আবার স্ক্রিনের পেছনে ঢুকায় নিলে স্বস্তি পায় সে। নিজের উপর রাগ হয় তার, এত তোয়াজ করার কী আছে ওকে!

—এই জিনিস কই পাইলা?

গলায় জোর আনে তারেক।

উত্তর নাই। সুজনের মাথাটা স্ক্রিনের পেছনে আরও দেবে গেছে। ঘুমাচ্ছে নাকি ও! স্ক্রিনটায় হালকা ধাক্কা দেয় তারেক।

—ওই মিয়া। ঘুমাই গেলা নাকি!

—তুমি মিয়া বাল ফিলটাই নিতে দিতেছ না! চুপ থাকো না কিছুক্ষণ!

বিরক্তিতে সুজনের চোখগুলো জ্বলে ওঠে মুহূর্তের জন্যে, আবার দপ করে নিভে যায়। চালে ভুল করে ফেলছে তারেক। মাল খাইলে বাল চাল ঠিক থাকে নাকি! তাছাড়া এত মেপে চাল দেয়ারই বা দরকার কী! সে কি কথার দাবা খেলতে আসছে এইখানে! ব্যবসার আলাপ নিয়ে আসছে। হইলে হবে, না হইলে নাই।

অনলাইন ব্যবসাটা প্রায় একবছর ধরে নিজে দাঁড় করাইছে সুজন। তখন একবার বলছিল তারেককে। কিন্তু তারেক কী কী নিয়ে যেন অ্যাঙ্গেইজড ছিল সেইসময়। তাছাড়া ভরসাও করে উঠতে পারে নাই সুজনের উপর। কত কত ব্যবসার প্ল্যান করছে তারা একসাথে, একটাও হয় নাই শেষপর্যন্ত। এদিকে হরেদরে সবাই অনলাইন ব্যবসা শুরু করে দিছিল তখন। এখনও করতেছে অবশ্য। কিছু একটার ঝোঁক উঠলেই কাছা খুলে নেমে যায় সবাই, আজব এক দেশ! তাই দেনোমনো করে পাশ কাটায় গেছিল সে বন্ধুকে। সলিড কিছু খুঁজতেছিল সে আশলে তখন। যা তাকে নিশ্চয়তা দিবে, মনোযোগী করে তুলবে।

সুজন কিন্তু এই একবছরে ভালোই গুছাই নিছে। অলরেডি বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা প্রফিট আসতে শুরু করছে মান্থলি, সুজনই বলছে তাকে। তার উপর ভাইয়ের অফিসে চাকরি, একেবারে সোনায় সোহাগা যাকে বলে। এটা নিয়ে তারেকের ঈর্ষা নাই কিছু। সুজন তার ভালো বন্ধু; সত্যিকারের বন্ধু।

পঁচিশ হাজার নেহাত খারাপ অ্যামাউন্ট না। প্রায় কোনো কিছু না করেই যদি সে পঁচিশ হাজার কামায় তবে এটাকে পঞ্চাশ হাজারে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না তারেকের পক্ষে। সেক্ষত্রে পঁচিশ হাজার সে নিজেও পাবে। এই সিচুয়েশনে একবারে ছোট না অঙ্কটা।

৫.
‘বি পজেটিভ তারেক, বি কুল।’ নিজেকে বলতে থাকে সে। যদিও স্পষ্ট বুঝতে পারতেছে আগুনটা জ্বলতে শুরু করেই নিভে গেছে। অথচ এই অল্পক্ষণের মধ্যেই কয়েলটাকে সত্য ভাবতে শুরু করছিল। মরিয়া হয়ে উঠছিল জ্বলে থাকবার জন্যে। গর্তটাকেও প্রাণপণে সরাই দিছিল ঠেলে। কে জানত সুজন প্রথম থেকেই কোদাল হাতে প্রস্তুত থাকবে! তারেকের আগেই মেপে রাখবে তারেকের গর্তটা! এতক্ষণ চুপ করে থাকা, এই দেশাল খাওয়ানো; এইগুলা সবই প্রস্তুতির পার্ট আশলে।

সত্যি বলতে কি, তারেক অনেক কিছু ভেবে এইখানে আসছে, ঠিক তা না। তার আর উপায় ছিল না, না এসে। কিন্তু আসতে আসতেই ভাবনাটাকে বিশ্বাস বানাই নিছিল। সুজন নিজের অনলাইন ব্যবসার পার্টনার করে নিবে তাকে। সেও সুজনের মুখোমুখি চেয়ারে বসে সুজনের মধ্যে কিভাবে পজিটিভ ফিলিং দিবে তার রূপরেখা তৈরি করতেছিল। কিন্তু এভাবে রাজা চেক হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবে নাই তারেক।


নিজের মধ্যে কোণঠাসা বাঘটাকে টের পায় তারেক। বাঘ না বিলাই কার চ্যাটে জানে! তবে লাফাইতেসে কিছু একটা, এইটা ঠিক।


আশলে সাতমাস আগেই তার মন্ত্রী কাটা গেছে, যখন সুজনের প্রস্তাব ফিরাইয়া দিছিল সে। ভাবছিল খেলা শেষ। মনে মনে হার তো মেনেই নিছিল। পরে যখন সুজন ডাকছে; ভাবছে আবার নতুন খেলা শুরু হবে। এবার তারা একজোট, দুনিয়া অপোনেন্ট। কিন্তু সুজন যে পুরানো দাবার বোর্ড এতদিন বিছাই রাখবে এইটা মাথায়ই আসে নাই তার। এইটা কি প্রতিশোধ তাইলে! নইলে কোন সাহসে সুজন তাকে চাকরির প্রস্তাব দেয়! তাও মাত্র দশ হাজার টাকা বেতনে! বলছে, প্রফিট হইলে বাড়াইয়া দিবে। মাদারচোদ! তারেক বন্ধুর চোখে চোখ রাখে। সুজনের চোখগুলো কি হাসতেছে? বলবার চেষ্টা করতেছে, খেলতে আসছ সোনা! ভাবছ ভুলে গেছি সব!

এটা সত্যি যে তারেক দীর্ঘদিনের বন্ধুর উপর বিশ্বাস রাখে নাই প্রথমে। পরে যখন ব্যবসা হিট করছে তখন পার্টনার হইতে আসছে। কিন্তু বন্ধু তো নিজেই ডাকছে তাকে। স্বাভাবিকভাবেই সে ভাবছে এই ডাক পার্টনারশিপের। তার মাথায় যদি ঘুণাক্ষরেও আসত বন্ধু তারে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে বুকের উপর পা তুলে পাড়াবে, তাইলে সে আসত না মোটেই। তার টাকার দরকার এইটা ঠিক, তাই বলে বন্ধুর কর্মচারী হয়ে বেতন নিবে এতটা ছোট এখনও হয় নাই সে।

—বাদ দাও। তুমি এর কমেই মানুষ পাইয়া যাবা খুঁজলে।

প্রায় নির্বিকার ভঙ্গিতে শব্দ কয়টা উগড়ে দেয় তারেক। বলতে পেরে কিছুটা আরাম লাগে তার। আরেকটু উঁচু গলায় বলতে পারলে আরও ভালো লাগত, তারপরও খারাপ না একেবারে। আগুনটা নিভে গেছে। কিন্তু ছ্যাঁকটা পোড়াইতেসে ভেতরে। ব্যাপার না! আগুন যে জ্বলছিল এইটা তার প্রমাণ। নিজের মধ্যে কোণঠাসা বাঘটাকে টের পায় তারেক। বাঘ না বিলাই কার চ্যাটে জানে! তবে লাফাইতেসে কিছু একটা, এইটা ঠিক।

উঠে দাঁড়ায় তারেক। নেশাটা আর নাই। কোন ফাঁকে ল্যাং মারছে কে জানে! বোর্ডটা বিছানোই থাকুক কিছুদিন। পরে সুযোগ এলে খেলা যাবে।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

কামরুন নাহার শীলা

জন্ম ২৯ জুন, ১৯৮১; সোনাগাজী, ফেনী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

লালবেজি [গল্প; বাতিঘর, ফেব্রুয়ারি, ২০১৯]
শালবনের গান [কবিতা সংকলন; কবিতাভবন, আগস্ট, ২০১৯]

ই-মেইল : shilabrishty18@gmail.com

Latest posts by কামরুন নাহার শীলা (see all)