হোম গদ্য গল্প কিড‌স-জোন

কিড‌স-জোন

কিড‌স-জোন
401
0

উল্টোদিক থেকে দ্রুতবেগে আসা ফুটবলটি দুহাত দিয়ে আটকায় নাদিম, মুখে বিজয়ীর হাসি। বাবাকে নাজেহাল করতে না পারলেও তার ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে বেশ মজা পায় আলভি। খিলখিল শব্দে হাসতে হাসতে বাবার উদ্দেশে চিৎকার করে, ‘পাস করো, পাস করো!’ সারি বেঁধে থাকা সেগুনগাছের নিচের ঠান্ডা আর স্নিগ্ধ বিকেল দেখে কে বলবে আজ সারাদিন সূর্য তার সমস্ত ভাণ্ডার উজাড় করে গলন্ত রোদের উদ্‌গীরণ ঘটিয়েছিল পুরো এলাকা জুড়ে! তাদের পায়ে-পায়ে ঘুরছে বল। পাখির কিচিরমিচির আর পিতাপুত্রের কলরোলে জায়গাটা মুখরিত থাকে।

‘বাবা, তোমার চোখে কী হয়েছে?’ উদ্বেগ ঝরে নাদিমের কণ্ঠে।

‘কী হয়েছে?’ বলে টেবিলে রাখা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চেহারা দেখার চেষ্টা করে আলভি, তারপর বলে, ‘কই, কিছু না তো!’

উৎকণ্ঠা কাটে না নাদিমের, শুরু থেকেই ছেলের দুচোখের লালচে ভাব নজরে পড়েছিল তার। ব্যাপারটা তখন পাত্তা না দিলেও আধঘণ্টার মধ্যেই সেটির উত্তরোত্তর বৃদ্ধি চিন্তিত করে তাকে। জবাফুলের মতো টকটকে লাল চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত হয় নাদিম, চোখ ওঠে নি তো! রেস্তোরাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অবস্থার মধ্যেও কেমন হাঁস-ফাঁস লাগে তার। এখন যদি পিংকি এসে দেখে তার আদরের বোনপো-র চোখের এই দশা, কী জবাব দেবে ভেবে পায় না নাদিম। ছেলের দিকে একটু ঝুঁকে আবার জিগ্যেস করে সে, ‘রাহির সাথে বালিশ-বালিশ খেলতে গিয়ে ব্যথা পাও নি তো চোখে!’

‘আমার চোখে কিচ্ছু হয় নি তো বাবা! মাকে কিছু বোলো না, মা জানতে পেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে!’

ছেলের অসহায় ভঙ্গিতে হাসি পায় নাদিমের। একবার আলভির খুব জ্বর। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে দিলে আলভি হাসতে হাসতেই ‘স্যাম্পল কালেকশন’ লেখা কাচঘেরা কক্ষটিতে প্রবেশ করেছিল, তার ধারণা ছিল রক্তপরীক্ষাও মজার এক খেলা। কিন্তু পরীক্ষাগার থেকে তাকে ফিরতে হয়েছিল কান্নার দমক আর ভেজা চোখ নিয়ে। একটু দম নিয়ে মনখারাপের ঢঙে আলভি বলে, ‘রাহি এখন আর আসে না, বিকেলে ও নাচ শিখতে যায়।’


আলভিকে দেখে নাদিম। তার চোখের নিচে আবছায়ায় তাকে মায়াময় আর ক্লান্ত দেখায়।


ওয়েটার এসে খাবারের অর্ডার নিয়ে গেছে বেশ অনেকক্ষণ আগে। চোখ নিয়ে খুঁতখুঁতানি কাটে না নাদিমের। ব্যাপারটা খারাপ কোনো দিকে বাঁক নেওয়ার আগেই তোমার সাবধান হওয়া উচিত, ভেতর থেকে কে যেন উপদেশ দেয় তাকে। মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবে নাদিম, কাকে ফোন দেবে? পিংকিকে না রুমকিকে? অবশ্য ফোন দেওয়া মাত্রই রুমকি কিন্নরকণ্ঠে ‘হ্যালো’ বলে উঠবে, এমন ভাবা অবান্তর। আচ্ছা, রুমকিকে ফোন দেওয়ার কথা ভাবছে কেন সে? ওর তো উচিত এখন ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া। পাশেই ক্লিনিক আছে একটা। ওখানে নিশ্চিত ডাক্তার পাওয়া যাবে এখন। হাতের ফোন পকেটে ঢোকাতে যাবে নাদিম ঠিক তখন সেখানে সুমধুর ঝংকারে ‘Sabina-Dhk’ নামটি ভেসে ওঠে। নামটি এক মুহূর্ত দেখেই রিংটোন বন্ধ করার বোতামে চাপ দিয়ে মোবাইল ফোন টেবিলের এক পাশে রাখে সে। মোবাইলকথন তার অপ্রিয়, তার উপর এখনকার মানসিকতায় তো নয়-ই।

বাস থেকে নামামাত্রই এক বিশাল চৌম্বকীয় বিকর্ষণ শক্তির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, প্রতিদিনই। অথচ নাদিমকে এখন মিনিট দুই সোজা হেঁটে ডান দিকে মোড় নিতে হবে। কিন্তু পা চলে না তার। চুম্বকের দুই সমমেরুর অনীহার তীব্রতার বিরুদ্ধে যুঝে সে গলি বরাবর প্রায় টেনে নিয়ে চলে পা-দুটোকে। ছোট্ট শিশুটি এখনও তার দীর্ঘ নয় মাসের ভ্রমণক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে পারে নি, প্রায়ই তা ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে এখনও। শিশুটির সুবোধ ঘুমের কারণে বাড়িটি যতটা নিশ্চুপ থাকার কথা ছিল ঠিক তার দ্বিগুণ বিক্ষুব্ধ থাকে। শিশুটির মা এক ডজন শিশুর সমপরিমাণ হল্লা মাতাতে সিদ্ধকণ্ঠ। ভদ্রমহিলার হাসপাতালে থাকাকালীন এক সপ্তাহের অনুপস্থিতিতে নন্দন কাননের ছিমছাম ঘরটিতে যে-নৈঃশব্দ্যরা তাদের প্রভাববিস্তারী জাল বিছিয়েছিল সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তার প্রত্যাবর্তনের প্রথম দিনেই। ভাবনার ফাঁদে পড়ে চলার গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছে টের পায় সে, দ্রুত পা চালায়। যদিও তার মন চায় উল্টো পথে হাঁটতে। ডিসি হিলের প্রায়ান্ধকার সিঁড়িতে চুপচাপ বসে থাকা এখন তার কাছে জগতের মধুরতম বিনোদন।

‘দুলাভাই, আমার আসতে বিশ মিনিট দেরি হবে।’ পিংকি তার নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গলায় অনুরণন তোলে। নাদিম পিংকির উদ্দেশে ফোড়ন কাটে, ‘মাত্র বিশ মিনিট! এতেই খেলা শেষ হয়ে যাবে?’ কথাগুলো অবশ্য মনে মনেই বলে সে, শালি-দুলাভাইজনিত রং-তামাশার সম্পর্ক তাদের তেমন ছিল না কখনও। পিংকি আলভিকে তার কাছে রেখে প্রেমিকের সঙ্গে সময় কাটাতে যায়—এটা জানলে কেমন কাণ্ড করবে রুমকি? রুমকিকে যদ্দূর চেনে তাতে পিংকির উপর আলভিকে এক দণ্ডের জন্যেও চোখের আড়াল না করার নির্দেশ থাকার কথা। কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী পিতাপুত্রের এমন মিলনকে প্রচণ্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়েছে রুমকি, কিন্তু এখন যদি জানে তার ছোট বোন এই মিলনকে মাঝে রেখে ‘গলদ ফায়দা’ লুটছে, কী কাণ্ড করবে রুমকি? ভাবে নাদিম, বাপের বাড়িতে কি এখনও সেই প্রতাপ আছে ওর? ভাবতে ভাবতে আবার আলভির দিকে নজর পড়ে তার। ছেলেটি বাবার মোবাইল ফোনখানি কব্জা করেছিল, কিন্তু কোনো ধরনের গেইম খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে টেবিলে পড়ে থাকা পানি নিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে। অসহায় ফোনটি তার অকর্মণ্য অবস্থা নিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে পড়ে থাকে চকচকে টেবিলে। ছেলেকে নরম গলায় ডাকে নাদিম। চোখ তুলে তাকায় আলভি, নাদিম দেখে আলভির দুই চোখেই লাল টুকটুকে দুটি জবা ফুটে আছে।

মতিলাল কাকুদের কুয়োতলায় একবার সে ঠিক এমন জোড়াজবা তুলে নিলে অনিমাদি বলেছিল, ‘ইশ, ছুঁই দিলি, ইন দি আর ফুজা অইতো ন!’ মনে পড়ে পিঠাপিঠি ছোট বোন নাজনিনের সঙ্গে কী প্রতিযোগিতা ছিল তার—খুব ভোরে উঠে কে আগে শিউলিতলায় দৌড়াবে, কে কত বেশি ফুল কুড়িয়ে মায়ের বাহবা পাবে! একটু দেরি হলেই অনিমাদি, মণিমাসি সব ফুল নিয়ে পেতলের ঠাকুরের সামনে জড়ো করবে। মা শিউলিফুলের কমলা ডাঁটা শুকিয়ে কিভাবে যেন জাফরানি রং বানাত। ইদের দিনে সেই রঙে তৈরি হতো জর্দা। একবার লক্ষ্মীপূজায় অনিমাদি প্রসাদের থালা হাতে ঘরে ঢুকলে নাদিম বলেছিল, ‘জবা লই এত কাণ্ড গরো, পসাদের লগে জবা দিয়ো যে কিল্লাই!’ অনিমাদি তার চিকন-পেড়ে শাড়িতে ঢেউ তুলে নাদিমের গাল টিপে বলেছিল, ‘ঢঙের লাই!’ পাশে দাঁড়ানো মণিমাসি টিপ্পনী কেটেছিল, ‘ঢঙের আর কী দেইক্কুস, ঢং ব্যাগ্গিন তো তোর বউ আইলি দেইক্কুম!’ সেদিন ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল নাদিম। কিন্তু এরপর জবাফুল দেখলেই তার কেমন পুলক জাগত, তার বউ কি অনিমাদির মতো জবা পরবে খোঁপায়? এমন ভাবত সে। কতকাল আগের কথা এগুলো? যেবার সারা গ্রাম খুঁজেও নাজনিনকে পাওয়া যাচ্ছিল না কোথাও, যখন বড় চাচা পুকুরে জাল ফেলাচ্ছিল আর পাড় ভেঙে দাঁড়িয়েছিল সারা গাঁয়ের মানুষ, তখনও সে মতিলাল কাকুদের কুয়োতলায় গিয়েছিল আরেকবার। লুকোচুরি খেলার সময় লুকোনোর জন্য কুয়োর পেছনটা ছিল নাজনিনের প্রিয় জায়গা। সে নিশ্চয়ই সেখানেই লুকিয়েছে আবার, চুপিচুপি। কুয়োর চারপাশটায় চোখ বুলোতে বুলোতেই তার নজর চলে গিয়েছিল জবাগাছে। এত শঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্যেও তিলখানেক ভালো লাগার রেশকে অস্বীকার করতে পারে নি নাদিম। নাজনিন যখন তার দশ বছর বয়সের চাঞ্চল্য নিয়ে জালের মধ্যে নিশ্চুপ এক জলকন্যা হয়ে আটকে ছিল তখন তার ভীষণ অপরাধবোধ হচ্ছিল একটু আগের জাগা গোপন পুলকের জন্য। ‘নাজু রে, এখন খণ্ডে তুই? তুই ফইত্যি দিন হেণ্ডে কী তোয়োস যে? শিউলি, না জবা?’

‘বাবা!’ ছেলের ডাকে সম্বিত ফিরে পায় নাদিম, দেখতে পায় আলভির চোখে অনড় হয়ে আছে জোড়া জবা। মতিলাল কাকুদের জবার চেয়েও গাঢ় আর টুকটুকে লাল। ডান চোখ থেকে একটা জবা টুক করে ঝরে পড়ল টেবিলে। ধীরে-ধীরে সেই চোখটিতে ফুটে উঠল আরেকটি ফুল। আলভির দুচোখই মার্চ করতে করতে ফুল ফোটায় আর ঝরায়। ক্রমে টেবিল উপচে ওঠে ফুলে, গড়াতে থাকে মেঝে বরাবর। সারি সারি টেবিলগুলোর ফাঁক দিয়ে ফুলগুলো লালগালিচা বিছিয়ে যায়। ওয়েটার তার খাবারের থালা নিয়ে এগিয়ে আসে, দুপায়ে মাড়িয়ে চলে অজস্র ফুল, তার পায়ে লেগে ল্যাতলেতে হয়ে যায় ফুলের গালিচা। পেছনে জবার রক্তে নকশা কেটে কেটে দ্রুত এগিয়ে আসে তার জুতো। ‘ঠাস’ শব্দটি বেশ কানে লাগে নাদিমের—টেবিলে খাবার রাখার আওয়াজ। ঝকঝকে কাচের টেবিলে খাবার রেখে মনোযোগ দিয়ে পরিবেশন করে ওয়েটার। আলভিকে দেখে নাদিম। তার চোখের নিচে আবছায়ায় তাকে মায়াময় আর ক্লান্ত দেখায়। আঙুলের ডগায় শুকনো টেবিলে অদৃশ্য নকশা কেটেই যায় আলভি। অযথাই খুকখুক করে একটু কাশে নাদিম, তারপর ছেলেকে শুধায়, ‘তুমি কি সারাদিনই টিভি দেখো বাবা?’

‘না তো!’ চিকেন চিজ বার্গারে কামড় বসাতে বসাতে উত্তর দেয় আলভি।

‘তাহলে নিশ্চয় খালামণির ট্যাবে গেম খেলো সারাক্ষণ, তা-ই না!’

‘খালামণি ট্যাব দিলে তো! আমি মায়ের ফোনে খেলি। মা আরও বেশি বকে, বলে কথা না শুনলে সব খেলা বন্ধ!’

নিদারুণ বিষণ্ণতায় বিমর্ষ হয় আলভি। হাতে ধরা বার্গারকে বাগে আনতে কষ্ট হয় তার, চিজ গলে গলে পড়ছে। ছয় বছরের শিশুর জন্য এমন বার্গারের নিয়ন্ত্রণ দুঃসাধ্য। ছেলের হাত থেকে বার্গার নিয়ে নেয় নাদিম, সাবধানে আলভির মুখে তুলে দিতে দিতে ভার্চুয়াল খেলার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নিয়ে ভাবে।

‘বিকেলে কী করো?’

‘টিভি দেখি, নয়তো খেলনা দিয়ে খেলি। মাঝে-মাঝে সাইকেল চালাই ছাদে।’

‘সাইকেল চালাও!’ অবাক হয় নাদিম, ‘অত ভারী সাইকেলটা কে তুলে দেয় ছাদে?’

‘ওটা তো ছাদের ঘরেই থাকে। প্রথমবার নানাভাই আর মামা মিলে তুলে দিয়েছিল।’

‘কে তোমাকে বেশি আদর করে? মা, নাকি নানু?’

এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দেয় আলভি, ‘নানাভাই। জানো, নানাভাই না আমাকে অনেক গল্প শোনায়!’ একটু থেমে আবার বলে, ‘আচ্ছা বাবা, তুমি না কি গল্প লেখো? কেন লেখো?’

‘তুমি তাহলে খেলো কেন?’

‘ভালো লাগে তাই।’

‘আমারও ভালো লাগে তাই।’ বলে নাদিম হাসে।

‘আচ্ছা বাবা, তুমি কি নামাজ পড়ো?’

ছেলের হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলানো প্রশ্নে একটু অবাক হয় নাদিম, ‘কেন বলো তো?’

‘নানাভাই বলেছে যারা নামাজ পড়ে না তারা নাকি দোজখে যাবে।’

‘তুমি নামাজ পড়তে পারো?’

‘নাহ, আমি নামাজ পড়তে জানি না। নানু বলেছে হুজুর রাখবে, তখন শিখে যাব।’

‘গতবার যে-বইগুলো দিয়েছিলাম, শেষ করেছিলে?’

‘নানু পড়তে দেয় না। বলে এগুলো নাকি আউট বই। আচ্ছা বাবা, আউট বই কী?’


এখন কম্পিউটারে লেখার ফাইল খুললেই দেখে সংসারজীবনের তিন বছর তার শূন্য গহ্বর নিয়ে হাঁ করে থাকে, এই তিন বছর একটি লাইনও লিখতে পারে নি সে।


উত্তরের অপেক্ষা না করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আলভি, তারপর আবার বলে, ‘জানো বাবা, স্কুলে যেতে আমার একদম ভালো লাগে না। মিসরা অনেক পড়া দেয়, তারপর আবার টিচারের পড়া!’ আলভির কথার অসহায় অথচ আদুরে ভঙ্গিতে নাদিম হাত বাড়িয়ে কাছে টানতে যায় তাকে, কিন্তু ঝকঝকে টেবিলটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হাতে রাখা বেড়ালের বই নামক বইটি এক পাশে সরিয়ে রেখে আবার জিগ্যেস করে, ‘তুমি যে এখানে আসবে আজ, তোমার মা কি সেটা জানে?’

উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে আলভি, ‘মায়ের নাম্বারটা কি আছে তোমার কাছে?’

এবার যারপরনাই বিব্রত হয় নাদিম। এই বয়সেই এমন জটিল প্রশ্নের উদয় হচ্ছে কেন তার মনে! বাবাকে ভ্যাবাচেকা অবস্থায় রেখেই একছুট দেয় আলভি কিডস-জোন বরাবর। খাঁচার মধ্যে শত-শত লাল-নীল-সবুজ বল, তার মধ্যেই হুটোপুটি খাচ্ছে শিশুরা। ছুটন্ত ছেলের পায়ের দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকায় নাদিম। ওর ডান পায়ের গোড়ালি পেছন দিকে খানিকটা উঁচু হয়ে আছে কি? সাইকেল চালাতে গিয়ে ব্যথা পায় নি তো! আলভির আচরণে ব্যথা পাওয়ার কোনো নমুনা নেই। অবশ্য শিশুদের সহ্যশক্তিও অসামান্য। নিজের ছেলেবেলায় একবার পেয়ারা গাছ থেকে পড়ে গেলে মায়ের ছুটে আসার ভঙ্গিতে আতঙ্কিত হয়ে সে-অবস্থাতেই দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল মধ্যদুপুরে ভাতঘুমের শাসন অমান্য করে পেয়ারা গাছে ওঠা এবং বিনা নোটিশে সেখান থেকে পড়ে চিতপটাং হওয়ায় যে-প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে সেই অপরাধের কঠিন শাস্তিদানের উদ্দেশ্যেই মা-জননীর অমন ছুট। সেই আতঙ্কে নাজনিন তাকে খড়ের গাদার পেছন থেকে উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত পায়ের ব্যথা সে টেরই পায় নি।

আলভির ব্যথার অনুসন্ধানে নাদিম রঙিন সুতোর খাঁচাটির সামনে এসে দাঁড়ায়। আলভি এতক্ষণ এই বলগুলোর মধ্যেই হুটোপুটি খেললেও এখন তাকে দেখা যাচ্ছে না। অন্য শিশুদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে আলভি—এমন ভেবে খানিক অপেক্ষা করে নাদিম, এক্ষুনি নিশ্চয় দেখা যাবে আলভিকে।

দরজা খুলেই পিংকি তার স্বভাবসুলভ ঢঙে রসিয়ে রসিয়ে বলে, ‘দুলাভাই, আজ আপনার খবর আছে!’ নাদিমের জিজ্ঞাসু চোখের প্রত্ত্যুত্তরে সে এবার ব্যাপারটা খোলাশা করে, ‘বাবুর কাঁথা বারান্দায় পড়ে ছিল, আপনি নাকি ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে না রেখে আবার বারান্দার দড়িতে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন? পরে ওই কাঁথার আশেপাশের কাপড়ও ধুতে হয়েছিল আপাকে।’ ঢোক গেলে নাদিম। বারান্দা ঝকঝকে পরিষ্কার ছিল। ছোট্ট কাঁথাটিও শুকনো ছিল, ময়লা লাগার প্রশ্নই নেই। কিন্তু রুমকির স্বভাব জানে বলেই সে ঝুঁকি নেয় না কখনও। আজ কী ভুতে ধরেছিল কে জানে! ভেবেছিল, রুমকির চোখে নিশ্চয় পড়ে নি কাঁথাটি, টুক করে তুলে দিলেই হয়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে একদল কৌতূহলী শিক্ষার্থীকে দীর্ঘক্ষণ মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারলেও ঘরের ঝড়ো হাওয়া সামলানোর ক্ষমতা তার নেই।

কিডস-জোনের দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে নাদিম। আলভি এখনও অন্তরালে, স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মায়ের মুখ। মা বলেছিল, ‘বউ যেত্তে চায়, হেত্তে তোরা আলাদাই বাসা ল।’ আজ এই রঙিন খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আফসোস হয় তার, হারাধনের একটি ছেলে হয়ে একা মাকে গ্রামে রেখে আসা কল্পনাতীত ছিল নাদিমের, বাবা তার আজীবন প্রবাসী। তুচ্ছ-তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড হয়েছে নাসিরাবাদ আবাসিক সোসাইটির ফ্ল্যাটে। এত প্রতিহিংসা কেন জমে ছিল রুমকির? শুধুই কি নিজের আলাদা সংসারের জন্য, নাকি তাকে ভালো লাগত না রুমকির? শেষ দিনের কথা মনে পড়ে তার। কলেজ থেকে ফিরেই সে আবিষ্কার করে থম মেরে আছে ঘরখানি। রুমকি আলভিকে নিয়ে ঘুমালেও এমন নিশ্চুপ থাকে না বাড়িটা। গৃহকর্মী সালমা চুপিচুপি জি বাংলা দেখে তখন। সেদিন মা-ই খুলে দিয়েছিল দরজা। মায়ের মুখের সেই নিষ্প্রভ ভঙ্গি আজও ভুলতে পারে না নাদিম। সালমার সঙ্গে রুমকির কথাকাটাকাটি হয়েছিল দুপুরে। মা সামাল দিতে এলে মায়ের উদ্দেশে অকহতব্য সব মন্তব্য ছুড়ে বরাবরের মতো সন্তানসমেত গৃহত্যাগ করেছিল রুমকি। তারপর তার বাপের বাড়ি থেকে ফোনে জানিয়েছিল অপশনগুলো:

১। আলাদা বাসা নাও।
২। স্ত্রী-পুত্রের চেহারা ভুলে যাও।

একটু আগে আসা, মায়ের পরামর্শ না শুনে ভুল করেছে টাইপ ভাবনায় শিউরে ওঠে নাদিম! এখন ভাবছে কী করে রুমকির সঙ্গে এতগুলো দিন কাটিয়েছিল সে? প্রায় প্রতিটি দিন চিতার আগুনে দগ্ধ হতে হয়েছিল তাকে। প্রতি মুহূর্তে ভাবত একদিন নিশ্চয় সব কাঠ আর চর্বি ফুরোবে, নয়তো অঝোরধারায় বৃষ্টি নামবে। নাদিমের সংসারজীবনে তখনই বৃষ্টি নামত যখন মা গ্রামে যেত। একটু আগের হওয়া আফসোসে নাদিম নিজের উপর বিরক্ত হয়। যে নারী তার মন বোঝার এতটুকুও চেষ্টা করে নি, এত-এত ছাড় দিয়েও কতদিন তার সাহচর্য সহ্য করা যেত? এখন কম্পিউটারে লেখার ফাইল খুললেই দেখে সংসারজীবনের তিন বছর তার শূন্য গহ্বর নিয়ে হাঁ করে থাকে, এই তিন বছর একটি লাইনও লিখতে পারে নি সে। রুমকি চলে গেলে মাকে বাড়িতে রেখে এসেছিল সে নাসিরাবাদের পাট চুকিয়ে। বন্ধু হারুনের চিলেকোঠার একটা কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল। অবশ্য রুমকিদের হুমকিতে সেই আবাসও ছাড়তে হয়েছিল তাকে। নাদিম তার পণে অটুট থাকবে—এটা ভাবতেই পারে নি তারা, এরপর তারা মামলা ঠুকে দিলে নাদিমের পাঠানো তালাকের নোটিশ ছিল তাদের পুরো পরিবারের জন্য বিশাল এক থাপ্পড়। তবে নোটিশ সে রুমকিদের অপমান করা কিংবা মামলার শোধ নেওয়ার জন্য দেয় নি, তার মনে হয়েছিল এটাই সবচেয়ে স্বস্তিকর সমাধান। পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে থাকা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তার, সেই বিশৃঙ্খল জীবনকে আজ শৃঙ্খলা-সহিস বাগে আনলেও নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্ণতার পিঠে চাবুক মারা যাচ্ছে না কিছুতেই। চেরাগির আড্ডা কিংবা প্রীতি-আঞ্জুম-সাবিনাদের ছলাকলাও পানসে লাগে ইদানীং। শুধু আলভিসঙ্গই তার কাছে শ্রেষ্ঠসঙ্গ। কিন্তু আইনের হাতে বন্দি সে—আলভিকে পেতে হয় কোর্টের বেঁধে দেওয়া নিয়মে। বুক থেকে দলা পাকিয়ে কী যেন ওঠে আসে গলা দিয়ে। প্রকৃতির নির্মমতায় এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে নি নাদিম। কেমন আছে রুমকি এখন? ভাবে সে। রুমকিদের উকিলের মাধ্যমে কিছুদিন আগে পুনর্মিলনের প্রস্তাব এসেছিল। রুমকির মুখ তখন আবছা মনে পড়ছিল তার, প্রস্তাবের প্রত্ত্যুত্তরে তার নির্লিপ্ততায় আর কথা এগোয় নি। সংসার নামক অগ্নিগিরির জ্বালামুখ থেকে ফিরে আসতে পারায় তৃপ্তি জাগে তার, শুধু আলভির নামটিই যুগপৎ হতাশা আর আনন্দ দেয়—আলভির শৈশব কি কাটবে কিডস-জোনের কিম্ভূতকিমাকার খাঁচার মধ্যেই? ছেলেটি তার কাছে থাকলে অন্তত খোলা মাঠে খেলতে পারত মাঝে-মাঝে। আলভির নানার বাড়িও আরেক বিশাল কিড‌স-জোন।

অতীত-সমুদ্রের ঢেউ আবার তাকে আছড়ে ফেলে বর্তমানে। আলভি লুকিয়ে আছে হয়তো। কিন্তু এতক্ষণে তো তার বেরিয়ে আসার কথা! নাদিম আলভির নাম ধরে আস্তে-আস্তে ডাকে, কিন্তু সাড়া না পেয়ে জোরে চিৎকার শুরু করলে সেই ওয়েটার এগিয়ে আসে, আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে, ‘স্যার, এখানেই থাকবে আপনার বাচ্চা, পার্টিশনের ওপারে আছে নিশ্চয়ই।’ উদ্যোগী হয়ে নিজেই আবার কিডস-জোনের খেলতে থাকা শিশুদের জিগ্যেস করে ওদিকে আর কেউ আছে কি না। শিশুরা সমবেতভাবে ডানে-বামে মাথা দোলায়। নাদিমের ফ্যাকাশে হয়ে আসা চেহারা দেখে ওয়েটার এবার বলে, ‘স্যার, এটার একটা অংশ নিচতলায়। ওই দেখুন টানেল। বাচ্চারা টানেলটাকে স্লিপারের মতো কাজে লাগিয়ে নিচে নেমে যায়। ওই দেখুন সিঁড়ি। ওটা দিয়েও ওঠানামা করা যায়। নিচতলার অংশেও বাচ্চারা খেলছে, আপনি নিচে নামলেই আপনার ছেলেকে পাবেন।’ বলে সে আর দাঁড়ায় না। তার হাতের খাবার ঠান্ডা হচ্ছে, পরিবেশন করার সময় গত হচ্ছে মনে হয়। নাদিমের ‘আলভি আলভি’ ডাকে তার দিকে আগ্রহী হওয়া মানুষজন যারা কিডস-জোনের ঠিক পাশের টেবিলে বসে খাচ্ছিল কিংবা খাবারের জন্য অপেক্ষায় ছিল এবার তারা যার-যার কাজে মনোনিবেশ করে। তারা কেউ-কেউ তার উদ্বিগ্নতায় হাসে, এই রেস্তোরাঁয় সংঘটিত অতীতের কথা তাদের মনে পড়ে যায়। কোনো একদিন তাদের শিশুটিও এভাবে তাদের ভয় দেখিয়েছিল হারিয়ে যাওয়ার ভান করে। তবে অধিকাংশই তার উদ্বেগকে সমর্থন করে নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করে, ‘বাপ না! টেনশন তো হবেই!’ অবশ্য এসব দর্শন কিংবা শ্রবণ করার সৌভাগ্য হয় না নাদিমের। সে ততক্ষণে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে মূল সিঁড়ি ভাঙছে। সিঁড়ি দিয়ে তানপুরার মতো পশ্চাদ্দেশ-বিশিষ্ট এক আহ্লাদী তরুণী তার ছেলেবন্ধুর হাত ধরে নামছিল। নাদিমের হুড়মুড়ে ভঙ্গিতে মেয়েটি আঁতকে ওঠে পথ ছেড়ে দেয়। অন্য সময় হলে নাদিম চোরা চোখে এক ঝলক দেখত মেয়েটিকে, কিন্তু আজ তার সেই মন নেই। আপাতত পিংকি, রুমকি, থানা-পুলিশ এসব কিছু তার চোখে ভাসে না, তার মাথায়ও কিছু নেই, সে শুধু দেখে চকচকে টাইলসে মোড়ানো সিঁড়ির ধাপগুলো শেষ হয় না। বড় বড় বিপণিকেন্দ্রগুলোর পেট চিরে চলা চলন্ত সিঁড়ির মতো প্রতি মুহূর্তেই এটির নতুন-নতুন ধাপ গজায়। একটার পর একটা। নিরবচ্ছিন্নভাবে। ক্লান্তিহীন। এখনই ধাপ শেষ হয়ে মেঝে স্পর্শ করবে তার পা—এমন ভাবনার মধ্যেই গজিয়ে যায় নতুন ধাপ। পৌনঃপুনিক আর অসহ্য এই ক্রীড়ায় অধৈর্য আর অসহায় বোধ করে নাদিম। পেছন ফিরে সে জিন্স-পরা জুটিকে দেখে। সিঁড়ির ধাপের এই ক্রমবর্ধমানতায় তাদের কোনো বিকার নেই। তারা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে সিঁড়ি ভাঙে। নাদিমের আঁটোসাঁটো ফুসফুস পর্যাপ্ত বাতাসের অভাবে খাবি খায়, আঁকুপাঁকু করে। আলভিকে খুঁজে পাবে কি পাবে না তা নিয়ে ভাবার সাহস তার নেই। তার মনে হয় অনন্তকাল ধরে ভাঙতে থাকা এই ধাপগুলো থেকে তার নিষ্কৃতি নেই। আলভির মুখ তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়, এই জীবনে ছেলের মুখ আর দেখতে পাবে কি পাবে না—এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব তাকে ভীষণভাবে কাবু করে। সে ঈর্ষান্বিত হয় এমন দুর্দিনেও জিন্স-জুটির এমন প্রাণ খুলে হাসতে পারার ক্ষমতায়।

পরিচিত কচি-কণ্ঠটি কানে প্রবেশ করলে নাদিম নিজেকে নিচতলার কিডস-জোনের সামনে আবিষ্কার করে। একটা নীল বলের অধিকার নিয়ে তারই সমবয়সী আরেকটি শিশুর সঙ্গে ঝগড়া চলছে আলভির। সে লাল-নীল খাঁচাটির দিকে এগোয়। খাঁচার ভেতরে হুটোপুটি খাওয়া শিশুদের দেখে চিড়িয়াখানায় আটকানো বানর আর লেমুরের কথা মনে পড়ে তার। ঝগড়া শেষ হওয়ার আগেই আলভি বাবাকে দেখে নীল বলের স্বত্ব ত্যাগ করে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাদিম কণ্ঠে শাসনের সুর আনতে গিয়েও পারে না। কোমল স্বরে বলে, ‘তুমি কিভাবে নিচে নামলে বাবা?’

‘কেন, ওই যে ওই টানেল! ওটা দিয়ে। তুমি বাবা কিচ্ছু জানো না!’ বাবার অজ্ঞতা আনন্দের জোগান দেয় ছেলেকে।

‘কেমন দেখতে টানেলের ভেতরটা?’

‘অনেক সুন্দর! একটু পর পর ভেতরের স্লিপার শেষ হয়, রেস্ট নেওয়ার জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে ছোট-ছোট গাছ আছে ক্রিসমাস ট্রির মতো। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে হলুদ আর সবুজ লাইট জ্বলে। জানো বাবা, লাইটগুলোয় কোনো কারেন্ট নেই, চাইলেই হাত দিয়ে ধরা যায়, খোলা যায়।’ এক নিশ্বাসে বলা বাক্যগুলোয় ঝকঝকে প্রিজমের বিচ্ছুরণ ঘটায় আলভি, সীমাহীন তার উচ্ছ্বাস।

‘গাছগুলো কি সত্যিকারের?’ বাবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আলভি অতি আগ্রহে বাবাকে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘তুমি সেখানে যাবে, বাবা?’

‘আমি ঢুকতে পারব ওখানে?’ নাদিমের প্রশ্নে আলভি বিচারকের চোখ দিয়ে বাবার শরীরের আয়তন পরখ করে একবার, তারপর বলে, ‘একটু কষ্ট হবে, তবে পারবে। চলো না বাবা, আমার সাথে খেলবে ওখানে!’ আলভির কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ে, ‘একটু উপরে একটা কমলা লাইট আছে, আমি কোনোদিন সেটার নাগাল পাই না। আজ তুমি আমায় উঁচু করে ধরলে আমি সেটা খুলে নিতে পারব।’


‘সারাজীবন এখানে খেলতে চাও?’ বাবার প্রশ্নে অবাক হয় আলভি। সারাজীবন এখানে খেলাটা যে বিরক্তিকর ব্যাপার হবে তা তার ছোট্ট মাথায় আসে না। 


ছেলের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইতিউতি তাকানো শুরু করে নাদিম। জিন্স-জুটিকে কোথাও দেখা যায় না, নিচতলায় ভিড় কম। এটা রেস্তারাঁর কনফেশনারি সেকশন, এই এলাকার বড় লোকেরা বাড়ি ফেরার পথে এখান থেকে পাউরুটি বা বিস্কুট কিনে নিয়ে যায়। কাউন্টারের ওপারের সবাই প্যাকেট করা আর টাকা গোনায় ব্যস্ত, এপারের মানুষ ব্যস্ত তাদের হিশেব বুঝে নিতে। সেই শিশুটিও উল্টোদিকের দোলনায় দোল খাচ্ছে। নাদিমদের কেউ খেয়াল করছে না নিশ্চিত হয়ে নাদিম টুক করে ঢুকে যায় কিডস-জোনে। বাবার হাত ধরে টানেলের কাছে নিয়ে যায় আলভি, কাজটি যে খুব ন্যায়সঙ্গত হচ্ছে না তা তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কও অনুধাবন করে নেয় আর তাই সে অতি সন্তর্পণে পথ চলে। নিজে টানেলের ভেতর ঢুকে বাবার দিকে পেছন ফিরে তাড়া দেয়। খুব চমৎকার ব্যবস্থা ভেতরে, শিশুরা নামার সময় টানেলকে স্লিপারের কাজে ব্যবহার করবে, আবার একই পথে ওঠার চিন্তা মাথায় রেখে স্লিপারের পাশেই সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে। তারা সিঁড়ি বেয়ে মাথা নিচু করে চলে। নাদিমের শরীরের তুলনায় টানেলটি নিতান্তই অপরিসর বলে তাকে বিশেষ বেগ পেতে হয়। প্রথম সিঁড়ি শেষ হলে একটু জায়গা পাওয়া যায় বসার। বিভিন্ন আলোর সুসমন্বয়ে এক মিশ্র আলোয় আলোকিত জায়াগাটি। আলভি এর মধ্যেই হলুদ একটা লাইট খোলার জন্য কসরত করতে থাকে।

নরম কার্পেট-বিছানো জায়গাটায় বসার আগে নাদিম পকেটে হাতে দেয়, মোবাইল ফোনটি উপরেই ফেলে এসেছে। পিংকি কি এতক্ষণে চলে এসেছে, না ফোন করে করে পাগল হয়ে আছে? ফোনের চিন্তা বাদ দিয়ে জায়গাটা দেখে নাদিম। রংধনু-আলো উধাও হয়ে জায়গাটা উজ্জ্বল হয়ে আছে ঝকঝকে দিনের আলোয়। অপ্রশস্ত টানেলের বিশ্রামের জায়গা এখানে ছোটখাটো এক মাঠে পরিণত। রাশি-রাশি জবাগাছে ভরা এই মাঠ, জবাগাছের পীতাভ পাতা চিকচিক করছে অদৃশ্য আলোয়। পায়ের নিচের ঘাসে পড়ে আছে টুকটুকে লাল ফুল। এত সুন্দর একটা জায়গা এরা এভাবে লুকিয়ে রেখেছে দেখে ভীষণ রাগ হয় নাদিমের। একটা ছোট্ট প্রজাপতি দেখাতে আলভিকে ডাকে সে, আলভি ছুটে আসে একটি জবাও না মাড়িয়ে। বাবার কোলে মুখ গুঁজে খিলখিল করে হাসতে হাসতে সে বলতে চায় যে এভাবে লুকিয়ে খেলছে তারা, অথচ কেউ কিছু টের পাচ্ছে না। নাদিম জিগ্যেস করে, ‘সারাজীবন এখানে খেলতে চাও?’ বাবার প্রশ্নে অবাক হয় আলভি। সারাজীবন এখানে খেলাটা যে বিরক্তিকর ব্যাপার হবে তা তার ছোট্ট মাথায় আসে না। বাবাকে সারাজীবন খেলার সাথি হিশেবে পাশে পাবে—আপাতত এই আনন্দেই সে আহ্লাদিত হয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায় প্রবল বেগে। টানেলের ভেতরের সমস্যাবিহীন এই মনোরম পরিবেশে ছেলেসহ বাকিজীবন কাটানোর আনন্দ নিয়ে সে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে যাবে ঠিক তখনই তীব্র বাঁশির শব্দে কান ঝালাপালা হয় তাদের। মিশ্র সেই আলোর ফাঁক গলে ছোট-ছোট ক্রিসমাস ট্রির আড়াল ভেদ করে অপরিসর টানেলের গায়ে বাড়ি খেয়ে উপর থেকে গমগমে কণ্ঠটি ভেসে আসে। কিডস-জোনের টহলদার তার রুটিন চেক দিতে এসেছে। টর্চ হাতে টানেলের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ছিপছিপে তরুণ বলতে থাকে, ‘বাচ্চারা, রাত দশটা বাজে। বের হয়ে এসো। এখন ঘরে ফেরার সময়!’

শীলা বৃষ্টি

জন্ম ২৯ জুন ১৯৮১; সোনাগাজী, ফেনী। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: shilabristhy18@gmail.com

Latest posts by শীলা বৃষ্টি (see all)