হোম গদ্য গল্প কিছু নিম্নগামিতা

কিছু নিম্নগামিতা

কিছু নিম্নগামিতা
609
0

যেদিন সন্ধ্যাটা সামান্য টলটলে জলের মতো হয়ে উঠেছিল, যেন স্বচ্ছ, তবু কোথাও সামান্য ঢেউয়ের ঝাঁপটা আছে, ঠিক সেই দিনটিতেই ছিল আমার জন্মদিন। কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সবাই মিলে তুমুল উদ্‌যাপন করল সেই জন্মদিন, এবং হুট করে নবনীতা জানাল যে সে আমায় ভালোবাসে। আর সেদিনই অভাবনীয়ভাবে শাহেদ ঘোষণা দিল যে, সে তার মৃত্যুদিন পালন করবে।

শাহেদের সবকিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার বিস্ময়কর এক ক্ষমতা ছিল, আর ছিল হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সেসব সিদ্ধান্তকে ছেলেমানুষি মনে হয়েছে, পাগলামি মনে হয়েছে, কিন্তু কখনোই সেগুলি না করে ছাড়ে নি শাহেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নতুন হল বানানোর কাজ চলছে এবং আমরা কে কতটা উপর থেকে ঝাঁপিয়ে নদীতে নামতাম ছোটবেলায়—সেসব গল্প মারছি, সেসময় আচমকাই শাহেদ ঘোষণা দিল যে তিনতলা থেকে লাফ দেবে। আমরা কেউ সিরিয়াসলি নিই নি বিষয়টা। এমনকি শাহেদকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার সময়েও মনে হচ্ছিল এটা সত্যি সত্যি ঘটে নি। কেউ কেউ তো ব্যান্ডেজে মোড়া শাহেদকে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিল না! অনি মুখে হাত দিয়ে বার বার বলতে লাগল, এটা কিভাবে করলি, শাহেদ! কিভাবে করলি তুই!


নারীকে আমি দূরের নক্ষত্র ভেবে কাছে টানার আকাঙ্ক্ষাই বোধ করি নি


তিনমাস হাসপাতালে পড়ে ছিল সেবার, তবু ঠিক হয় নি। হরহামেশাই এমন কিছু করে বসে সে। তবু শাহেদ যেদিন ঘোষণা দিল যে সে তার মৃত্যুদিন পালন করবে এই এপ্রিলেই, আমরা সবাই ঠা ঠা করে হাসলাম। অনু পর্যন্ত হাসতে লাগল খুব। শুধু বিকারহীন মুখে শাহেদ আমার জন্মদিনের কেক খেতে লাগল।

আমার প্রথম জন্মদিন পালন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পর। অজ পাড়াগাঁর একটা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল, এই জন্মদিন-টিন বুঝি নাটক-সিনেমারই বস্তু। কোনো কল্পিত জগতের মানুষই শুধু এই বিশেষ দিনটি পালন করে। কিংবা সত্যি সত্যিও যদি আদৌ কেউ জন্মদিন পালন করে, সেটা নিশ্চয়ই বিশাল ধনী কিংবা অভিজাত ঘরের কেউ হবে। দুর্ভাগ্য কিংবা সৌভাগ্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর প্রথম জন্মদিন এসে পড়ল আমারটাই। এরপর পর পর তিন বছর আমার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। প্রতিবার নবনীতা চকচকে ব্লু র‌্যাপিং পেপারে মোড়া একটি বইয়ের প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, রাফিন’ না বললে মনেই পড়ে না যে সেদিনটি আমার জন্মদিন। এই তৃতীয় জন্মদিনে নবনীতার হাত থেকে বই নিতে নিতে আমি যখন শুনছি নবনীতার ফিস ফিসে স্বর, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, রাফিন’, তারপর আরও ফিস ফিস করে, কেউ শুনতে না পায়—এমন কোমল স্বরে, ‘অ্যান্ড আই লাভ ইউ’, আমি প্রায় থমকে যাচ্ছিলাম; আস্তে আস্তে র‌্যাপিং পেপার খুলছিলাম, হাত থেমে গেল আমার, বুকের মধ্যে লক্ষ প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে… আর ঠিক সেই মুহূর্তে শাহেদ ঘোষণা দিল তার মৃত্যুদিন পালনের কথা। আমরা এমন হাসতে লাগলাম যে, আশপাশের সবাই বার বার পেছনে ঘুরে তাকাতে লাগল।

শাহেদ মানে আমাদের শাহেদ। পাগলাটে শাহেদ। প্রিয় শাহেদ। সারাদিন হৈ হৈ করা শাহেদ। দলনেতা শাহেদ।

দ্বিতীয়বারে চান্স পাওয়া, সেই সঙ্গে আবারও ফার্স্ট ইয়ারে থেকে যাওয়ার দরুন সে আমাদের দু বছরের সিনিয়র। সবার মাথার উপরে ছড়ি ঘোরাতে পারার বোধ হয় এটা একটা কারণ। তবে অব্যাখ্যেয় অন্য কোনো ব্যাপারও ছিল তার। কথা বলার ভঙ্গিই ছিল কর্তৃত্ব জাগানিয়া। এমনকি শাহেদের চেয়ে বয়সে আমরা যদি দু বছরের বড়ও হতাম, তাও শাহেদই আমাদের নেতা হতো, আমরা জানি—ওই অব্যাখ্যেয় বিষয়টির কারণেই হয়তো।

শাহেদ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। আমাদের মধ্যে একমাত্র সে-ই টেনিস খেলার নিয়মকানুন বোঝে। তার প্রতিটি কথা আমরা সিরিয়াসলি শুনি। শুধু এমন আচমকা একেকটি বোমা আমরা হজম করতে পারি না। খুব হাসি এবং বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, শাহেদ ঠিক ঠিক সে কাজটা করে ফেলেছে। প্রতিবারের আচমকা সিদ্ধান্তগুলি পূর্বেকারটার চেয়ে এতটাই অবাস্তব হয় যে না হেসে ঠিক পারাও যায় না।

এবারের হাসির অবশ্য একটা যৌক্তিক কারণও ছিল। কেউ ঠিক কিভাবে নিজের মৃত্যুদিন ঠিকঠাক করে ফেলতে পারে, সেটা আমাদের বোধগম্য হচ্ছিল না একদম। মৃত্যুদিন পালন করতে গেলে তো আগে মরতে হবে। আর মরলে সে নিজে কিভাবে মৃত্যুদিন পালন করবে? কেউ কি নিজের মৃত্যুদিন জানে?—এসব ছেলেমানুষি চিন্তা খেলে যায় আমাদের প্রত্যেকের মাথায়।

এই কথা শাহেদকে বললে সে জানায়, জানতে হবে কেন? ঠিক করে নিলেই হয়।

অনু জিজ্ঞেস করে, সেটা কিভাবে ঠিক করে?

শাহেদ জানাল সেটা সে ঠিক করেও ফেলেছে অলরেডি। এ-বছর ১৭ এপ্রিল।

নবনীতা জিজ্ঞেস করল, তারপর? তুই জানিস যে তোর মৃত্যু ১৭ এপ্রিলেই হবে?

শাহেদ গম্ভীর মুখে মাথা ঝাঁকায়। জানে সে।

নবনীতাই জিজ্ঞেস করল, কিভাবে?

আমাদের সবার মুখে হাসি। কেউই আমরা সিরিয়াসলি নিতে পারছি না বিষয়টা। সবকিছু এমনিতেও তালগোল পাকানো। সেসব অগ্রাহ্য করে শাহেদ বলল, এ-মাসের ১৭ তারিখে তোদের দাওয়াত। সেটা মাথায় রাখ। কিভাবে জানি—সেসব নিয়ে মাথা ঘামাস না। তোদের ভরপেট খাওয়াব ১৭ তারিখ। কেক তো খাওয়াবই, সাথে লুচি আর চিলি চিকেন।

আমি বললাম, আগে বল কিভাবে মৃত্যুদিন জানলি? যৌক্তিক না-হলে আমি কোনো দাওয়াত নিই না।

শাহেদ গম্ভীরভাবে বলল, সামনের বছর ১৭ এপ্রিল আমি আত্মহত্যা করব।

২.
সত্যি কথা হলো, যে করুণ একটি পরিবারে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, সেখানে কেউ জন্মদিন লিখে রাখে না। বড়জোর শোনা যায়, ‘ওই যে, যে-বছর এরশাদ ক্ষ্যামতা ছাড়ল, তার বছরখানেক আগে, বন্যার পর পর, সারা গেরাম ডুইবে আছে পানিতে, সেরাম এক সময় তোর জন্ম হইয়েছে।… কী ঘুটঘুইটে রাইত। অথচ পূর্ণিমা ছেল। নিচে গেরাম, উপরে সারা আকাশ পানিতে আর মেঘে ডুইবে আছে। একটা কুপির আলোয় এত্তটুকুন একটা দুর্বল বাচ্চা জন্মাইল। সেইডা তুই। সারা গেরাম নিথর। অথচ জন্মের পর ওরে কান্দন তোর! পানি ঠেইলে সকলে তোরে দেখতি আসছিল। সকলের হাতের ছোঁয়া আর দোয়া তোর পিঠে আর মাথায় আছে।…’

এই মহৎ তথ্যটুকু ঘেঁটে জন্মদিন বলে নির্দিষ্ট কোনো দিন আবিষ্কার করা সম্ভব নয়—সেটা ব্যাখ্যা না করলেও চলে। যদিও আমার আগ্রহ জন্মের দিন নিয়ে ছিল না, বরং ছিল জন্মের সময়কার আবহাওয়া, পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে। শুনেছি প্রতিটি মানুষের ভাগ্যের উপরে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রচ্ছন্ন একটা প্রভাব থাকে।

আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে আমার মাতামহী বলেছিলেন, ‘তোর তো চরম হাঁপানির টান। জন্মের দুই দিন পরই টান শুরু হইল। পুরা চেহারা নীল। এমন নীল, যেন সাপে কাটিছে। শ্বাস টাইনে উঠাইতে পারতিছিস না। তোর বাপে বাড়ি নাই। ওয়াজ মাহফিল শুনতি পাড়েরহাট চইলে গেছে। কী কইরব? একজন পুরুষ মানুষ নাই বাড়িত। তখন তোর মা আর আমি রওনা হইলেম হাসপাতালে। নৌকায় করি। একটু পর পর তোর মা নাকের সামনে একখান কাচ রাখে আর হারিকেনের আলোয় পরীক্ষা করে, শ্বাস বাইর হয় কি না। যখন দেখে সামান্য ভাঁপ দেখা যাতিছে, হাঁপ ছাড়ে। আবার একটু পর পরীক্ষা করে—বাঁইচে আছিস কি না। আর খালি মাঝিরে কয়, মাঝি ভাই, একটু জোরে টানেন। আমার পোলাডা বাঁচবিনানে।

আমি তোর মারে বুকের সাথে ঠাইসে রাখি। মাঝি জোরে জোরে দাঁড় বায়।…’

এসব শুনে আর যা-ই বোঝা সম্ভব, জন্ম তারিখ বোঝা সম্ভব না। তবু একটা জন্ম তারিখ পেয়েছি আমি। একটা সার্টিফিকেট থাকলে সবাই যেমন পায়। বৃষ্টিপুর প্রাইমারি স্কুলের সুভাষ স্যার আমার জন্ম তারিখ ঠিক করে দেয়, ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮। সেসব দেখেও আমি ভাবার প্রয়োজন বোধ করি নি, এই দিনটা আমার জন্মদিন, যেটা পালন করা যাবে; কিংবা মসৃণ হলুদ ত্বকের এক নারী প্রতি বছর রঙিন পেপারে মোড়া একটি বই দিয়ে বলবে, ‘হ্যাপি বার্থডে…’

যে নারীকে আমি দূরের নক্ষত্র ভেবে কাছে টানার আকাঙ্ক্ষাই বোধ করি নি, একেক পলক দেখেই স্বর্গ পাওয়ার তৃপ্তি নিয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়ার ভাবনা ছিল আমার, সে নারীর প্রেমে পড়ার সম্ভাবনার কথাও ভাবার প্রয়োজন বোধ করি নি কোনোদিন। এবং সে-ই আমার তৃতীয় জন্মদিনে জানাল ভালোবাসার কথা।

নিয়তি দুয়েকটি মুহূর্ত মানুষকে উপহার দিয়ে দূর থেকে মুচকি হাসে। আমার ক্ষেত্রে আমি সে হাসি দেখতে পেয়েছিলাম। এ নিয়ে আমার কোনো অভিমান কিংবা আক্ষেপ ছিল না নিয়তির প্রতি। নবনীতার প্রেমে আমি পড়তামই। হয়তো একটা উপলক্ষ খুঁজছিলাম মাত্র। ওই হ্যাপি বার্থডেটুকু ছিল সে উপলক্ষ। কিন্তু নবনীতা আমার প্রেমে কেন পড়েছিল, জানা নেই আমার।


আমি মেনেই নিতে পারছিলাম না। শাহেদের মতো একটি ছেলের গল্প এত সাদামাটাভাবে শেষ হবে


নবনীতাকে যে কেউ কোনোদিন টলাতে পারবে না, সে আমাদের জানাই ছিল। তাই কেউ চেষ্টাও করে নি ঘাঁটানোর। মাত্র দু মাসে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে নবনীতা সেধেই কারও প্রেমে পড়বে এবং ঠকবে। আমরা এও জানতাম, একদিন নবনীতা কষ্ট পাবে। নবনীতাকে দেখলেই কিভাবে কিভাবে জানি বোঝা যায় ব্যাপারটা। আমরা সবাই বুঝেছিলাম। প্রতিটি ছেলেই, এমনকি ক্লাসের আঠারো জন মেয়েরও প্রত্যেকে জানত, কোনো অব্যক্ত অবশ্যকষ্টের জন্য অপেক্ষা করছে নবনীতা। আমরা এটা নিয়ে পেছনে বলাবলিই করতাম। কেন যেন, এই ব্যাপারটি ভেবে সবাই এক ধরনের তৃপ্তি পেতাম। যাকে পাব না—তার কষ্ট পাওয়ার ব্যাপারটা আমাদের সব সময়েই আনন্দ দেয়। অবশ্য মেয়েদের চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমি কোনোদিন ক্লিয়ার ছিলাম না। হয়তো স্রেফ ঈর্ষাগত কারণেই তারা নবনীতার কষ্ট চাইত মনে মনে।

সেই নবনীতা শেষমেশ আমার প্রেমে পড়ল। অনেক বিষয়ের মতো এই বিষয়টিও আমার কাছে অব্যাখ্যেয় ছিল। গ্রাম থেকে আসা হাবাগোবা, গায়ের রঙ কালো, রোগা একটি ছেলের প্রেমে পড়ার কোনো কারণ আমি আবিষ্কার করার সুযোগ পাই নি।

র‌্যাপিং পেপারটা খুলে হলুদ মলাটের বইটি ওলটাচ্ছি। সম্ভবত কোনো একটা পারফিউম লাগিয়ে দিয়েছিল মলাটে। খুলতেই গোলাপের ঘ্রাণে ভরে গেল মালিবাগের একটা মেসবাড়ির প্রত্যেক বিন্দু বাতাস আর আমার বুক। দীর্ঘক্ষণ বইটা বুকের সাথে চেপে রাখতে ভালো লাগে আমার। তারপর পাতা ওলটাই। আর টুক করে মনে আসে শাহেদের কথা। শাহেদ পাগলা, আমরা সবাই জানি। সে যে সত্যি সত্যি এই কাজটা করে বসবে, তেমনটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারি না আমি। বুকের মধ্যে আলতো একটা কাঁটা খচ খচ করে। একই সাথে প্রজাপতির ওড়াউড়ি আর কাঁটার খচখচানি বড় অসহনীয় মনে হতে থাকে আমার কাছে।

আমরা প্রত্যেকেই শাহেদকে ভালোবাসি। সব বড় বড় চিত্রশিল্পীদের নাম আমাদের মধ্যে একমাত্র তারই মুখস্থ। সে-ই আমাদের টেনেটুনে এক্সিবিশন দেখাতে নিয়ে যায়, সিনেমা দেখাতে নিয়ে যায়। এমনকি তার সাজেশন ছাড়া আমরা কোনো সিনেমা দেখি না। শাহেদ যদি বলে, এটা দেখা উচিত, আমরা সেই সিনেমাটি দেখতে যাই।

আমার টিকেট কাটার পয়সা থাকে না, শাহেদ জানে। প্রতিবার সে দুইটা টিকেট কাটে। একটা থাকে আমার জন্য। এমনকি আমি যে টিউশনিটি করে ঢাকা শহরে চলতে পারি, সেটাও শাহেদের ঠিক করে দেওয়া। নিজেই পড়াত। আমি টিউশনি খুঁজছি শুনে সেটা আমাকে ছেড়ে দেয়। প্রায় প্রত্যেকের সাথেই শাহেদের এমন কিছু গোপন ঘটনা আছে। সেসব সে কাউকে বলেও বেড়ায় না।

মেয়ে হলে আমি নির্ঘাত শাহেদের প্রেমে পড়তাম!

সুতরাং ১৭ এপ্রিল আত্মহত্যা করার এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তটিকে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না আমার।

সকালবেলা ঘুম ভেঙে অবশ্য বিষয়টিকে অত সিরিয়াস আর মনে হয় না। হালকাই মনে হয়। শাহেদ নিশ্চিত ঠাট্টা করছে। অন্য বন্ধুদের ক্ষেত্রেও অমন কিছুই ঘটেছিল হয়তো। কারণ আমরা কেউই আর প্রসঙ্গ তুলি নি। নানাকিছু নিয়ে আড্ডা হলো। সিনেমা, বই, ক্রিকেট, কিছু স্ক্যান্ডাল। শুধু শাহেদের বিষয়টি এল না। শাহেদও তুলল না। সে বরং সামনে ক্রিস্টোফার নোলানের কী একটা মুভি আসছে, সেটা নিয়ে বড় বক্তৃতা দিল। আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, নোলানের মুভিটা সবাই মিলে দেখতে যাব।

পরের দুমাস তেমন কিছু ঘটে নি। সবকিছু স্বাভাবিক চলছিল। মৃত্যুদিনের বিষয়টা বোধ হয় সবাই ভুলে গিয়েছিলাম। মাঝখানে উত্তমের জন্মদিনেও খুব মজা করলাম সবাই।

পয়লা বৈশাখ চলে আসছিল; আমি আর নবনীতা সারাদিন ঘুরতে যাওয়ার প্লান করলাম। সকালে বের হব এমন সময় শাহেদের ফোন, সে-ও আমাদের সাথে যেতে চায়। যদি আপত্তি না করি।

আমি সামান্য বিরক্ত হয়েছিলাম, সেটির জন্য এক মুহূর্ত অপরাধবোধে ভুগছিলামও অবশ্য, তাই পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে গেলাম।

শাহেদ, আমি আর নবনীতা খুব ঘুরলাম সারাদিন। রাত নটার দিকে ফেরার আগে শাহেদ জানতে চাইল, আমাদের ১৭ তারিখে কোনো আলাদা প্লান আছে কি না।

নেই জানাতে বলল, আমরা যেন সন্ধ্যায় হাতিরঝিল থাকি সবাই।

আর তখনই আমাদের মনে পড়ে যায় শাহেদের মৃত্যুদিন পালনের কথা। বিষয়টি যে আমাদের কেউই আর সিরিয়াসলি নেয় নি সেটা বোঝা গেল দুদিন পর সবাইকে হাতিরঝিলে দেখে। আমি ভাবছিলাম, তবু কোনো একটা বানানো উপলক্ষের ছুতোয় সবাই এক হচ্ছি, খাচ্ছি—এটা ভালো। শাহেদও নিশ্চয়ই খাওয়ানোর জন্যই এই গল্প ফেঁদেছে। এভাবে সামান্য ছুতোয় খাওয়ানোর রেকর্ড আগেও আছে তার।

সবাই খুব খেলাম পেট ভরে। খেতে খেতে আমরা প্রত্যেকে শাহেদকে ‘হ্যাপি ডেথ অ্যানিভারসারি’ জানালাম। সবাই না ঠিক। নবনীতা চুপ করে ছিল। সেদিন কিছু খায়ও নি সে।

হাসতে হাসতে শাহেদ একবার জিজ্ঞেস করল, ঠিক কিভাবে তার মারা যাওয়া উচিত? একেকজন একেকটা আইডিয়া দিই আমরা। শাহেদ এমন ভাব করছে যেন আইডিয়াগুলো যাচাই করছে সে। মনমতো হলেই লুফে নেবে। আমি খুব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মরতে পারলে ভালো হতো। নবনীতার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলাম। তার মুখ থমথমে।

কেন জানি মনে হচ্ছিল, এই বুদ্ধি দিলেই শাহেদ বলবে, ‘এটা খুব ভালো আইডিয়া। খুবই ভালো… আচ্ছা নবনীতা, তুমি কি আমাকে ল্যাব থেকে একটু পটাশিয়াম সায়ানাইড এনে দেবে? সামান্য?’

আমি নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম, নবনীতাকেই বলত এটা। এটাও মনে হচ্ছিল, সত্যি সত্যি ঠিক এক বছর পর শাহেদ আত্মহত্যা করবে।

৩.
টানা তিনমাস শাহেদ এল না ক্যাম্পাসে। মোবাইলও বন্ধ। প্রথম একটি সপ্তাহ সেভাবে গা করি নি কেউ। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে উদ্বিগ্নতা টের পাওয়া গেল একেকজনের। এমন আগে কখনো হয় নি!

কেমন একটা পরিবর্তন আসছিল শাহেদের ভেতর, আমরা ঠিক টের পাচ্ছিলাম না। এই এক সপ্তাহ শাহেদের অনুপস্থিতিই তার উপস্থিতির সেই সময় এবং পরিবর্তনগুলোকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করছে আমাদের। শাহেদের চঞ্চলতা কেন যেন ঠিক স্বাভাবিকভাবে নেই। তাছাড়া কদিন সুইসাইডের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমরা যতই হাসাহাসি করছিলাম, উড়িয়ে দিচ্ছিলাম, শাহেদ সিরিয়াস ছিল প্রতিবার।

সুতরাং খোঁজ লাগানো শুরু করলাম। ফোন বন্ধ। যে ফ্ল্যাটে থাকত, সেটাও নাকি ছেড়ে দিয়েছে হুট করে। শাহেদ উধাও।

আশ্চর্য হয়ে দেখি, শাহেদের বাবা-মা কিংবা আর কারও নম্বর আমাদের কাছে নেই। প্রত্যেকে আমরা তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছি, অথচ কখনো সেসব শোনার প্রয়োজনও বোধ করি নি। শুধু জানি তার বাবা সচিবালয়ে কিছু একটা চাকরি করে। এটুকুই। নামধাম কিছু জানি না। প্রত্যেকের স্বার্থপরতা নিজের নিজের আয়নার সামনে ক্রমশ স্পষ্টতর হওয়ার একটা প্রক্রিয়ায় ফেলে দিয়ে শাহেদ উধাও হয়ে গেল।

জুলাইয়ের শেষের দিকে নবনীতা ফোন দিল, কিছু জিজ্ঞেস না করে আমি যেন দ্রুত হাতিরঝিল চলে আসি, যে রেস্টুরেন্টে আমরা ১৭ তারিখ খেয়েছিলাম, সেটাতেই।

আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে দেখি নবনীতা দাঁড়িয়ে আছে। উদ্বিগ্ন। আমাকে দেখেই দৌড়ে এল। বলল, শাহেদের খোঁজ পেয়েছ কোনো?

না তো! কেন?

আমি পেয়েছি। আমার সাথে চলো।

কোথায়?

চলো। নবনীতা আমাকে টেনে নিয়ে যায়।

আমরা উত্তরায় রেড লিফ থ্যালাসেমিয়া হসপিটালে যাই। আমার তখন বুক কাঁপছে। আসতে আসতে পথে নবনীতা জানায় শাহেদের বিটা থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়েছে। মাস দুয়েক আগে। এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে ডাক্তার বলছে, মাস ছয়েক বাঁচবে আর শাহেদ।

আমি মেনেই নিতে পারছিলাম না। শাহেদের মতো একটি ছেলের গল্প এত সাদামাটাভাবে শেষ হবে, ভাবাটা কষ্টকর। তার সবকিছুতেই যেন নায়কোচিত কিছু মানায়। এমনকি তাকে নিয়ে বলা প্রতিটি কথা যখন আমরা উচ্চারণ করি, সেটিতেও একটা নায়কোচিত ভাব থাকে। সেই শাহেদ আর ছ মাস বাঁচবে! মাত্র ছ মাস। দৈবের কাছে পরাজিত হবে!

পাগলাটে শাহেদ আমাদের। প্রিয় শাহেদ। মাস তিনেক আগে যে ঘোষণা দিয়েছিল, এক বছর পরে আত্মহত্যা করবে। দৈব তাকে একটি নায়কোচিত মৃত্যুও দেবে না!

সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারি, আমি তার পরাজয়ই চাইছিলাম, যেকোনো প্রকারেই। কিন্তু এমন পরাজয় কক্ষনো চাই নি।

একটা ধবধবে সাদা বিছানায় শাহেদ শুয়ে আছে। মুখভর্তি দাড়ি। উস্কোখুস্কো চুল। পাশেই বসে আছে উত্তম, রূপক, অনু, জাহিদ, রিমি, সজল। নবনীতা সবাইকে ফোন দিয়েছে। আমাদের দেখে শাহেদ হাসল। সেই হাসিও পরাজিত মানুষের হাসি। আশ্চর্য ব্যাপার, শাহেদকে এই হাসি মানিয়ে গেছে। মাস তিনেক আগে হলেও এই হাসি আমরা কেউ মেনে নিতে পারতাম না।

দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম আমরা। কোনো কথা নেই। শাহেদের মা এসেছিলেন এর মধ্যে, আবার কই যেন গেছেন। কম বয়সী এক মহিলা। চেহারায় শুধু বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। হয়তো পুত্রের এই দুঃসংবাদ তাকে বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত করেছে।


আমি প্রার্থনা করি, ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত শাহেদ নবনীতাকে ভালোবাসুক।


শাহেদের একটা হাত ধরে বসে আছে নবনীতা। তার চোখ ভরাট। আশ্চর্য ব্যাপার, এই অবস্থায়ও আমার চরম ঈর্ষাবোধ হতে লাগল। হয়তো অমূলক, অযৌক্তিক, তবু সন্দেহ হতে লাগল। কেমন একটা নিশ্চয়তা উঁকি দিয়ে যায় আমার ভেতরে, একটা ঝলকের মতো, শাহেদ বুঝি নবনীতাকে ভালোবাসে! বুঝি কী! সত্যিই বাসে। তার চোখ স্পষ্ট বলছে। সন্দেহ নেই আর। রাগ হয় আমার। মনে হয় যেন ইচ্ছা করেই বিটা থ্যালাসেমিয়া নামের অদ্ভুত এই অসুখ বাঁধিয়েছে শাহেদ!

কিন্তু নবনীতা তো আমাকে ভালোবাসে।

কী সব চিন্তা আসছে এই করুণ অবস্থায়। নিজের প্রতি ঘৃণা বোধ হয় আমার। এসব ভাবার সময় কি এখন? যে মানুষটাকে ডাক্তার ছ মাস সময় বেঁধে দিয়েছে, তাকে নিয়ে ঠিক কী ভাবা যেতে পারে, সে ধারণাও তো নেই।

যন্ত্রণাদায়ক একটা নীরবতা বিরাজ করছে হাসপাতালে। সেই নীরবতা খান খান করে দূরে কেউ কেঁদে উঠল। সে কান্না আমাদের সবার বুকেই আঘাত করে। শাহেদ আবার হাসে, সেই করুণ হাসি। আমাকে বলে, আমার মৃত্যুদিন পালনটা বোধ হয় জলেই গেল। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তো বাঁচব না!

উত্তম বলে, চুপ কর শাহেদ।

নবনীতার গাল ভেজা। অনুরও।

শাহেদ সেসব কানে নেয় না। আবারও বলে, মরে যেতে আপত্তি নেই আমার। সে তো যেতামও! কিন্তু এমন হেলায় একটি দিন গেল! ১৭ তারিখ। আমি তো মাত্র ১৭ তারিখ পর্যন্ত বাঁচতে চেয়েছি।

আমি বলি, ১৭ তারিখ না। তুই আরও বাঁচবি।

শাহেদ থামিয়ে দেয়, আর বাঁচতে হবে না। ১৭ তারিখ পর্যন্ত বাঁচব কি না, বল?

যেন আমিই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা—কাউকে চাইলেই বাঁচিয়ে রাখতে পারি। শাহেদ বড় আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে তাকে আমার দিকে। তার দিকে তীব্র দৃষ্টি ফেলে বলি, বাঁচবি।

তাহলে নবনীতাকে বল, ১৬ তারিখ যেন সামান্য পটাশিয়াম সায়ানাইড এনে দেয় আমায়। বল।

এমন ভঙ্গিতে শাহেদ বলে কথাগুলো, যেন সে সত্যি বিশ্বাস করে বসে আছে যে ১৭ তারিখ পর্যন্ত বাঁচবে সে। আরও চমকে উঠি, আমি তাকে পটাশিয়াম সায়ানাইডের কথা বলি নি কখনো, তবু কেন সে পটাশিয়াম সায়ানাইডের কথাই বলল?

নবনীতার দিকে তাকাই। তার চোখ জলে ভর্তি।

কী বলা উচিত, বুঝতে পারি না আমি। কী করা উচিত, তাও বুঝতে পারি না। ১০২ নম্বর কেবিন থেকে বের হয়ে আসি আমি।

পরিচ্ছন্ন আবহাওয়া। বিকেল নেমে এসেছে, মিইয়ে আসা ফুলের মতো। যেন ঘ্রাণও ছড়াচ্ছে। আমি প্রার্থনা করি, ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত শাহেদ নবনীতাকে ভালোবাসুক। নবনীতাও বাসুক।

না, নবনীতা তাকে ভালোবাসবে অনন্তকাল। যে যুবক মাত্র কিছুদিন পরেই আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার চোখে বাঁচার এই আকুতি অসহনীয়। নিজের প্রেয়সীকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া সে তুলনায় কিচ্ছু না।

বিকেল আরও নেমে আসে। নেমে আসতে থাকে ১৭ এপ্রিল।

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

প্রকাশিত বই:
সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬]
বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬]

ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com
রাসেল রায়হান