হোম গদ্য গল্প কালো বুড়ি

কালো বুড়ি

কালো বুড়ি
1.13K
0

টুকটাক কাঁচাবাজার করতে গেছিলাম, নবীনগর আর্মি মার্কেটে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।

বড় বাজার আগেই করে রাখা আছে। দিব্যি এক মাসের বেশি চলে যাবে। চাল কিনেছি ২৫ কেজির দুই বস্তা। এক বস্তা ড্রামে রাখা হয়েছে। আরেক বস্তা আস্ত রাখা আছে মিটশেলফের নিচের তাকে। রিনি বলছিল, এরমধ্যে যদি চালের দাম কমে যায় তো আমরা ধরা খাব। হ্যাঁ, রিনি ঠিকই বলেছে। এরমধ্যে ধরা খেয়ে গেছি কি-না, কে জানে! দুই দিনের ব্যবধানে আগের বস্তা চালের চেয়ে ১৫০ টাকা বেশি দিয়ে কেনা হয়েছে দ্বিতীয় বস্তা। যখন দ্বিতীয় বস্তা কিনি, তখন বাজারে রীতিমতো আগুন লেগে গেছে। মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ফর্দ হাতে ছুটে বেড়াচ্ছে। ব্যাগভর্তি করে মালামাল কিনছে। যেন এই পৃথিবীর আয়ু শেষ। আমরা অন্য কোনো গ্রহে চলে যাচ্ছি। সেখানে সেটেল করা ঝক্কির ব্যাপার হবে তাই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।

বাসার ভেতরে ঢুকলাম না। দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরেই। নিয়ম মেনে দূরত্ব বজায় রাখা। রিনি বাজারের ব্যাগগুলো নিতে লাগল। নিতে নিতে চারটি ব্যাগ দেখে হালকা গজগজও করল। জানি, করোনার দিনে এত বাজার কেন এনেছি, এটাই গজগজ করার কারণ।

আমাদের দুটি ছেলে। কদিন ধরে আমার মা এসেছেন। মা অবশ্য বেশি দিন থাকেন না। এক মাস থাকলেই অস্থির হয়ে ওঠেন বাড়ি যাওয়ার জন্যে। অথচ তিনি অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটকা পড়ে গেছেন।

আমি বাজার থেকে এসেছি। তাই এত সতর্কতা। রিনির ব্যাগ নেওয়া শেষ হলে অন্য দরজা দিয়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম। মোবাইল আর মানিব্যাগটা টেবিলে রেখে সোজা ঢুকে পড়লাম বাথরুমে।

দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো। তারপর রিনির কণ্ঠ :

‘শুনছ!’

‘বলো!’

‘তোমার ওই বুড়িটা তো আজকে মারা গেছে!’

‘কিভাবে? করোনায়?’

‘তা জানি না। তবে শুনলাম প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট ছিল। জ্বরও নাকি ছিল।’

‘তাহলে তো করোনাই মনে হচ্ছে।’

‘কিভাবে বলছ? পরীক্ষা করা তো হয় নি।’

‘হুম… তা ঠিক।’

‘তুমি কি এখন গোসল করবে?’

‘হুম করব।’

‘আচ্ছা। ভালো।’

রিনি হয়তো মুচকি হাসল। এমনিতে আমি অগোছাল, অসচেতন, বেখেয়ালি ও অলস। অথচ আজ বাইরে থেকে এসেই সরাসরি গোসলে ঢুকেছি। এটা আমার সাথে একেবারেই যায় না। আমি শেষ বিকেলে গোসল করে বাইরে গেছি। বাইরে থেকে এসে আবারও গোসলে ঢুকেছি। এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। রিনি মুচকি হাসলেও আমি নিশ্চিত, আমার এই সচেতনতা দেখে ওর ভালোলাগছে। আমি পরিবারের কেয়ার নিলে ও খুব খুশি হয়। খুঁটিনাটি কাজ যেমন—ছেলেদের গোসল করানো, ছোটছেলেকে খাওয়ানো, পড়ানো, টবে পানি দেওয়া, বেসিন পরিষ্কার করা, গোসল শেষে নিজের গামছাটা ভালো করে ধোয়া, ঘুম থেকে উঠে মশারি খুলে বেড পরিপাটি করা—এই জাতীয় কাজ করলে রিনি খুব খুশি হয়। যদি কখনো এক কাপ চা করে দিই কিংবা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো মিউজিক প্লে করি তাহলে ওর খুব ভালোলাগে। রিনি চায়, আমি প্রতিদিন ওর আগে ঘুম থেকে উঠি এবং উঠে রবীন্দ্র সংগীত বা ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল জাতীয় কিছু একটা প্লে করি। যাতে ঘুম ভেঙেই ও মিউজিক শুনতে পারে বা মিউজিক শুনতে শুনতেই ওর ঘুম ভাঙে।


ছাদে যখনই যাই, মনে মনে প্রার্থনা করতে করতে যাই, হে আল্লাহ, ওই কালো বুড়ির সাথে যেন দেখা না হয়।


প্যান্ট-শার্ট ইত্যাদি সাবান পানিতে ভিজিয়ে রেখে দাঁত ব্রাশ করতে লাগলাম। আয়নায় দেখতে লাগলাম নিজেকে। এই কদিনে দাড়ি-গোঁফ বেশ বড় হয়ে গেছে। যতটা না বড় হয়েছে তার চেয়ে বেশি পাকা দেখা যাচ্ছে। দাড়ি কাটা দরকার। কিন্তু ব্লেড শেষ। কেনার উপায় নেই। দোকান বন্ধ। একটু কি অপরিচিত লাগছে নিজেকে? হ্যাঁ, পাকা দাড়িগুলো বেরিয়ে পড়েছে। থুতনির দিকের পাকা দাড়িগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভালোই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। এই চেহারার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করলে বন্ধুরা মামা-চাচা সম্বোধন করে ইয়ার্কি-ব্যঙ্গ করবে। দুষ্টু বান্ধবীরা বলবে, আরে, তুই দেখি শেষ! না, এ-রকম বুড়ো বেশ শো করা যাবে না। এখনো মাশাল্লা মাথাভর্তি চুল আছে। মেদভুঁড়িটুড়িও হয় নি যে নিজেকে একেবারে বুড়ো দেখাবে। বরং ব্যায়াম করে পেটের হালকা মেদটা ফেলে দিতে পারলে নিজেকে এখনো ইয়ং হিসেবে প্রেজেন্ট করা সম্ভব। নিজের মনটা এখনো ইয়ং-ই আছে। তরতাজা ও ফ্রেশ। যারা ১০-১৫ বছরের জুনিয়র তাদের সাথেও দেদারসে আড্ডা মারতে পারি। চা-সিগ্রেট খেতে খেতে হাল-আমলের যেকোনো সেনসেটিভ বিষয় নিয়েও আলাপ চালাতে পারি। কোনো অসুবিধা তো হয় না। জুনিয়ররাও বেশ রিসিভ করে। এনজয় করে। ফলে অযথা পাকা দাড়ি শো করার কোনো মানে হয় না।

শাওয়ার ছেড়ে দিতেই প্রকৃত ঝরনার বেগে পানি পড়তে লাগল। আমরা থাকি সরকারি কোয়ার্টারে। রিনির চাকরির সুবাদে পাওয়া কোয়ার্টার। শুনেছি এই বিল্ডিংটা ৭২ সালের। শাওয়ারগুলোও সেই আমলের। সূর্যমুখী ফুলের মতো বড়। কল ছাড়তেই ঝুপ করে পানি পড়া শুরু করে বন্যার বেগে। পানিতে থই থই করতে থাকে গোসলখানা।

গরমের সিজনে আমি প্রায়ই ছাদে গোসল করি। গোসল করতে করতে টবে পানি দিই। চারটা টব রেখেছি ছাদে। ইন্ডিয়ান মরিচ গাছ একটা টবে। আরেকটাতে ক্যাপসিকাম। আর আছে—বেলিফুল ও হাসনুহানা।

প্রচুর মরিচ ধরেছে। দেখতে দারুণ লাগে। মরিচ কখনো ছিঁড়ি না। কিন্তু প্রায়ই দেখি, মরিচ একটা দুটো করে কমে যাচ্ছে। ক্যাপসিকামের বেলাতেও একই কথা। কে নেয়?

আমি নিশ্চিত, এটা অথৈয়ের দাদির কাজ। সে ছাড়া এ কাজ আর কেউ করতে আসবে না। ছাদে সে ছাড়া আর কেউ আসেও না। অথৈরা থাকে চারতলায় আর আমরা তিনতলায়। চারতলায় থাকে বলে এই মহিলা মনে করে পুরো ছাদটাই তাদের। কিন্তু ব্যাপার কি আসলে তাই? মোটেও না, এই ছাদে সবারই কিছু না কিছু অংশ রয়েছে। অন্তত তিনতলার বাসিন্দাদের তো রয়েছেই।

গ্রাম্য, অশিক্ষিত, অভদ্র আর বাজে প্রকৃতির এই মহিলা। পেঁচার মতো আড়চোখে তাকায়। ছাদে যখনই যাই, মনে মনে প্রার্থনা করতে করতে যাই, হে আল্লাহ, ওই কালো বুড়ির সাথে যেন দেখা না হয়। কিন্তু আমার প্রার্থনা কখনোই কাজে লাগে না। গিয়ে দেখি, বুড়িটা ছাদে রয়েছে। হয় টবে পানি দিচ্ছে নয়তো রোদ পোহাচ্ছে। নয়তো চাল-ডাল-আচার বা শুঁটকি মাছ এই জাতীয় কিছু একটা রোদে দিয়ে বসে আছে। কখনো কখনো দেখি কুলা দিয়ে চাল ঝাড়ছে। অথবা শাক বাছছে। তরকারি কাটছে। অথবা নির্বিকারভাবে বসে মাথায় তেল দিচ্ছে। যেন ছাদটা তার রান্নাঘর-লাগোয়া উঠান। আমি যেতেই তটস্থ হয়ে ঘোমটা টেনে দেবে। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকাবে রাগী পেঁচার মতো। ভীষণ বিরক্তিকর তার তাকানো। সহ্য করা খুব কঠিন। ইনাকে দেখামাত্র আমি নিচে নেমে আসি।

কিন্তু আমি কেন ছাদে যাই? খোলাসা করি। মূল উপলক্ষ্য সিগারেট খাওয়া। বাসায় সিগারেট খাই না। এমনকি বড় ছেলেটার কাছে এখনো অফিসিয়ালি স্বীকার করি নি যে, আমি স্মোক করি। যদিও সে ধারণা করে, তার বাবা একজন বাজে স্মোকার। তো এই স্মোকিং জোন হিসেবে ছাদকে জায়েজ করার জন্য আমি চারটি টব রেখেছি ছাদের এক কোনায়। কাজটা করেছি বউয়ের অনুমোদর নিয়েই।

এরমধ্যে একদিন দেখি, আমার দেখাদেখি কালো বুড়িটা কোত্থেকে একটা মরিচ গাছ এনে রোপন করেছে, যেটাতে অসংখ্য মরিচও ধরে আছে। দেখে আমার চোখ ছানাবড়া। এ-রকম মরিচ ধরন্ত গাছ সে কোথায় পেল? কালো জাতের মরিচ। ঠিক বুড়ির মতোই দেখতে। গবদা গবদা।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে করেই হোক এই গাছ ছাদ থেকে বিদায় করতে হবে। হয় ছাদ থেকে টব ফেলে দেবো। নয়তো টবে ফুটন্ত পানি ঢালব। কিন্তু চট করে পরিকল্পনা করে ফেললেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতার কাছে আটকা পড়ে গেলাম। কাজটা আর করা হয়ে উঠল না।

এক বিকেলে ছাদে গিয়ে সিগারেটে আগুন সংযোগ করে একটা মাত্র টান দিয়েছি তো দেখি চিলেকোঠার ভেজানো দরজাটি খুলে গেল। যথারীতি কালো বুড়ি। আমি সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট ফেলে দিলাম। সিগারেটের ধোঁয়াকে পাশ কাটিয়ে বুড়ি গুটিগুটি পায়ে হেঁটে তার টবের কাছে চলে গেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মরিচ গাছটি দেখতে লাগল। হঠাৎ আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল, ‘আমার গাছের মরিচ নিলো কেডায়? কার এত মরিচ খাওয়ার শখ? জীবনে সে মরিচ খায় নাই?’—বলতে বলতে সে নিচে নেমে গেল।

বুড়িটা এমনভাবে কথা বলল যেন আমিই তার গাছের মরিচ নিয়েছি। আমার খুব গায়ে লাগল ব্যাপারটা। না, এটা বরদাস্ত করা যায় না। ফলে ভাবতে লাগলাম, কিভাবে এই মহিলার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আমরা এই কোয়ার্টায়ে উঠেছি তিন/চার মাস হলো। চারতলার মানুষের সাথে এখনো ভালো পরিচয় বা জানাশোনা হয়ে ওঠে নি। আমার বড় ছেলে এই মহিলার নাতি অথৈয়ের সাথে কোয়ার্টারের মাঠে খেলে। আর বুড়ির ছেলে মানে অথৈয়ের বাবার সাথে কখনো দেখা হলে সালাম আদান-প্রদান হয়। এখন পর্যন্ত, মানে এ টুকুই সম্পর্ক। কিন্তু কালো বুড়িটা আমাকে যে মরিচ চোর হিসেবে সাব্যস্ত করে গেল এটা ন্যাক্কারজনক। এই টাইপের মহিলাদের যা স্বভাব, কথাটি ঢোল পিটিয়ে বলতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না। রসিয়ে বলবে, অমুক ফ্ল্যাটের অমুক তার গাছের মরিচ চুরি করেছে।

ফলে ব্যাপারটা নিয়ে রিনির সাথে আলাপে বসলাম।

‘তুমি বুড়িকে বলো যে, আমি তার মরিচ চুরি করি নি।’

‘কথাটা তুমি সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেই পারতে। ঝামেলা চুকে যেত।’

‘কিভাবে বলি? বুড়িটার কথা শুনে আমি একেবারে বেকুব হয়ে গেছিলাম।’

‘কিন্তু আমি যদি এখন বলতে যাই ব্যাপারটা আরো খারাপ হতে পারে।’

‘কিরকম?’

‘মানে তুমি ছেলে মানুষ। তোমাকে সামনাসামনি কিছু বলতে পারে নি। আমাকে পেলে খুব করে বলতে পারবে।’

‘তার মানে তুমি কিছু বলতে চাইছ না?’

‘হ্যাঁ। তোমার ভালোর জন্যই চাইছি না।’

‘আচ্ছা। ঠিক আছে। কিন্তু তুমি আমাকে বুদ্ধি দাও, আমি এই বুড়ির হাত থেকে কিভাবে রক্ষা পেতে পারি?’

‘দিনের বেলা ছাদে যাওয়া বন্ধ করো।’

‘বলছ?’

‘হুম।’

‘ওকে বন্ধ।’


আমার পরিকল্পনা মারণাস্ত্র হয়ে এসেছে আমারই ঘরে।


এরপর দিনের বেলা পারতপক্ষে আর কখনো ছাদে যাই নি। অবশ্য রাতে গিয়ে দেখেছি কালো বুড়িটা কী পরিমাণ বিধ্বংসী। আমার ক্যামসিকাম ও মরিচ গাছ ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। লজ্জাবতীর মতো এভাবে গাছগুলোর নুয়ে পড়ার মানে একটাই, গোড়ায় গরম পানি দেওয়া। বেলি আর হাসনুহানা গাছ দুটোও টইটই করছে। অর্থাৎ তারাও বুড়ির হাত থেকে রক্ষা পায় নি। মৃত্যু তাদের অনিবার্য। এ যে দেখছি আমার পরিকল্পনা মারণাস্ত্র হয়ে এসেছে আমারই ঘরে।

রাগে, ক্ষোভে, উত্তেজনায় আমার মাথায় খুন চেপে বসল। সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির মরিচ গাছের টবটি ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিলাম। কয়েক সেকেন্ড পর ঠাশ করে টব ভাঙার শব্দ হলো। চারতলার ছাদ থেকে শুনতে পেলাম শব্দটি। সঙ্গে সঙ্গে ছাদ থেকে নেমে গেলাম।

পরদিন ভোরবেলা ভাঙা মরিচ গাছের ডাল ও টবের অংশবিশেষ নিয়ে কালা হাজির।

দরজা খুলে দিয়েছিল রিনি। আমি ভেতর থেকে বুড়ির চিল্লাপাল্লা শুনতে লাগলাম।

: ডাকেন! আপনার স্বামীরে ডাকেন! জিগাই কী অরফাদ করছিল আমার ধরন্ত মরিচ গাছটা। কেমন স্বামী আপনার? সেকি মানুষ নাকি দেওভূত? কেমনে কইরা সে আমার টব নিচে ফালায়া দিলো, হ্যাঁ?

রিনি কিছু বলার সুযোগই পেল না। যা বলার সেই বলে চলল। বলতে বলতে উপরে উঠে গেল।

ব্যাপারটা নিয়ে আর বাতচিত হয় নি। পরিবেশও ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমি ছাদে যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।

অনেক দিন কেটে গেছে।

হঠাৎ একদিন দেখি বাসার নিচে একটা অ্যাম্বুলেন্স। কী ব্যাপার? একটু পরে দেখি কালো বুড়িকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। আমার দেখাদেখি রিনিও এল জানালায়। নিচের দিকে ঝুঁকে তাকাল।

‘কী দেখো?’

‘অথৈয়ের দাদির কী হয়েছে?’

‘কই, কিছু জানি না তো।’

ততক্ষণে বুড়িকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়ে গেছে।

আমরা পরে জেনেছি, বুড়ি স্ট্রোক করেছিল। টানা পাঁচ দিন হাসপাতালে থেকে মোটামুটি সুস্থ হয়ে সরাসরি গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছে, শরিয়তপুর। এরপর থেকে আমরা অথৈ বা ওর মা-বাবার কাছে নিয়মিত তার খোঁজ নিতাম।

একটু আগে রিনি জানাল বুড়িটা মারা গেছে।

স্বাভাবিক মৃত্যুই বলা চলে। পরিণত বয়স। স্ট্রোক। কিন্তু কেন জানি না আমার চোখ ভিজে এল। চোখের জল মিশে গেল শাওয়ারের জলে। কালো বুড়ির শখের মরিচ গাছটা নিচে ফেলে দেওয়ার জন্য নিজেকে খুব ছোট মনে হলো। কাজটা না-করলেও তো পারতাম!

তখন অনেক রাত। এক ফাঁকে ছাদে গেলাম। কালা বুড়ি যেখানটাতে বসে চাল ঝাড়ত বা মাথায় তেল দিত সেখানটাতে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম চুপচাপ। মনে মনে ভাবলাম, আমি অপরাধী। বুড়ির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। সুযোগ ছিল। আমি সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাই নি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। অগুনতি তারা জ্বলছে আকাশে। সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল একটা মরিচ গাছের টব কিনে আনব। কালো মরিচ। গবদা গবদা। প্রতিদিন টবে পানি দেবো। যত্ন নেব। একদিন অনেক মরিচ ধরবে। কালো বুড়ি দেখে হয়তো খুশি হবে! খুশি হলে হয়তো আমাকে মাফ করে দেবে!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com

Latest posts by মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ (see all)