হোম গদ্য গল্প এটিএম ভূত

এটিএম ভূত

এটিএম ভূত
179
0

চকবাজারের মাছহাটার গলিতে লম্বা লাইন। দরকষাকষি আর হাঁকডাকের বিরাম নাই। মস্ত মুগুর দিয়া এক ঘর্মাক্ত লোক নির্মমভাবে বরফ পিটাইতেছে। এত আক্রোশ কোথায় জমা রাখে মানুষ? আতিকের পিঠে অপরিচিত হাতের অঙ্কুশ, সে বিরক্তি নিয়া তাকায় ডানদিকে। এক মাছবিক্রেতা, বয়েস তিরিশের বেশি নয়, নৌকার পাটাতনের রং গায়ে, মোটাসোটা, দুই হাতের দশ আঙুল ঝিলিকবাতির মতো একবার মেলে, আবার বন্ধ করে এবং ‘ওলালা ওলালা’ বইলা কার্পমাছের লালচে পেটি তুইলা দেখায়। তার দুলুনিতে ভুঁড়ির ভাঁজের ঘাম চিকচিক কইরা ওঠে আর আতিকের মনে আসে বিদ্যা বালানের গোখরোভঙ্গিমা। পাশের মাঝবয়েসি লোকটা চাপাতিতে কুটতেছে রুইমাছ। নিখুঁত কোপে মাছটা সমান সাত টুকরো হইয়া যাইতেছে। তার আঁশ ছিটকাইয়া পড়ে আতিকের ছাইরঙা টি শার্টে। সেখানেও হাসি-খুশি কাতলা মাছের ছবি আঁকা। রুই মাছের রক্তমাখা আঁশ জড়াইয়া থাকে কাতলা মাছের রেখাঙ্কিত আঁশে, তাই ফুর্তিতে সে আরও গাল ফুলাইয়া হাসে। আতিক তার হৃৎপিণ্ডে ঘাইয়ের শব্দও শুনতে পায়। মাছহাটার গলির শেষে নালা, তা পার হইয়া সে আইসা পড়ে মুরগিহাটা কিংবা মোরগহাটার গলিতে। নিজের ইচ্ছায় সে আসে নাই, ধাক্কা সামলাইতে সামলাইতে স্বয়ংক্রিয় গতিতে আইসা পড়ছে, অথবা সে ভাবতেছিল তখন নূপুরের কথাই। দেশি মোরগের মাংস নূপুরের খুব পছন্দের, মানে ছিল একসময়, যখন তারা দুই কামরার একটা বাবুই পাখির বাসা ভাড়া নিছিল কাপাসগোলার মুনশি পুকুর পাড়ে। একবার সে দেশি মুরগি কিইনা আনছিল বউয়ের মুখে হাসিচন্দ্রিমা দেখার আশায়। হিতে বিপরীত হইছিল—নূপুর সেই মুরগির নামও জিজ্ঞেস করে নাই। আচ্ছা, ওদের কি নামঠিকানা থাকতে নাই? সাধ-আহ্লাদ নাই? তা নইলে গলার রগ ফুলাইয়া হায়দরি হাঁক দেয় কেন মোরগের পোলা? যখন সে দৌড়ানি দেয় কোনো তন্বী মুরগিরে, মুরগি একলাফে গাছের ডালে উইঠা কেন ভেংচি কাটে? ওরা কি কথা বলে না ককবরক ভাষায় কিংবা হিস্পানি ভাষায়? যা হোক, পাড়া গাঁয়ে দেশি মোরগ চেনা গেলেও শহরের হাটে চেনা খুব সহজ নয়, লাল টুকটুক ঝুঁটি থাকলেও। মুরগিহাটায় বা মোরগহাটায় ঢুকলে তাই দিশামিশা হারাইয়া ফেলে আতিক।

শরণার্থীর ক্যাম্পের মতো একটা জায়গায় দানা খুঁটতেছে মুরগিগুলো, কেউ-কেউ ঝিমাইতেছে। সবার গায়ের রং একই, যেন কয়েদির পোশাক। এমনও হইতে পারে, এককালে মুরগির মিলন হইছিল কোনো বেপথু বকের সাথে, ঋষি পরাশরের কৃপায়, তাই মুরগিরা পাইছে বকের শুভ্রতা, কিন্তু ক্রমশ হারাইয়া ফেলছে ডানা চঞ্চলতা।

‘ভাই, মাত্র একশো দশ টাকা। পানির দাম।’ মুরগি বিক্রেতা বা মোরগ বিক্রেতাও শাদা স্যান্ডো গেঞ্জি-পরা, তার তাম্বুলরঞ্জিত ঠোঁটে বিজ্ঞাপন-তরঙ্গ।

এক ছোকরা টেবিলে রাখা দুই নিষ্প্রাণ মুরগির নাড়িভুঁড়ি খাবলাইতেছে ক্ষিপ্র হাতে। একটু আগে যে-মুরগি ‘কককক’ কইরা আর্তনাদে কাঁপতেছিল, সে এখন একবাটি মাংসের সন্দেশ। ত্রিকোণ টিনের খোপ থেকে একটার পর একটা মুরগির লাশ উঠতেছে টেবিলে, দেখতে একই চেহারার, একই ওজনের। কার মুরগি কার পলিব্যাগে ঢুকতেছে কে বলতে পারে? মুরগিহাটা বা মোরগহাটা পার হইতে হইতে আতিকের মনে হইল তার ওজন দেড়শো গ্রাম কম কিংবা, সত্যি বলতে কী, তার ওজনই নাই!


কাজলটানা চোখ। এমন চোখের যারা মালকিন, তাদের বেশি কথা বলার দরকার হয় না।


ওজনহীন অবস্থায় মানুষ ভাসতে পারে। আতিক মাছ বিক্রেতার মুদ্রায় মনে-মনে ‘ওলালা-ওলালা’ গাইতে গাইতে সবজিহাটা উজাইয়া বড়ো রাস্তায় ওঠে। নিজেরে ওজনহীন ভাবার আরেকটা কারণ আছে অবশ্য; হঠাৎ পশ্চাদ্দেশে হাত রাইখা মানিব্যাগ স্পর্শ করতেই তার খেয়াল হয় যে সে সকালে কোরবান আলির দোকানে চা-সিঙাড়া খাইয়া বিল দিতে গিয়া দেখছিল তিনশো পঁচাত্তর টাকার বেশি নাই। সে-মুহূর্তে এক তালপাতার সেপাই, হাতে বিশাল রঙিন ছাতা, দোকানে ঢুকতে ঢুকতে, টেবিলে রাখা গরম পিঁয়াজু নিয়া কামড় দিতে দিতে বলছিল :

‘কোরবান আলি

গোষ্ঠীহুদ্ধ চোর বানালি!’

‘আঁই চোর অইলি তুই ত ডেকাইত!’ ছড়া-টিপ্পনীর জবাবে বলে কোরবান আলি।

‘কিয়া রে, বদ্দা?’ তালপাতার সেপাইয়ের মুখে পিঁয়াজুর খচমচ।

ওদের রঙ্গরসিকতায় জানা গেল যে উখিয়া থেকে কাল রাতে ফিরছে তালপাতার সেপাই; রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কোনো রোহিঙ্গার কাছ থেকে সে খরিদ করছে বটপ্রশাখার মতো এই ছাতা, নগদ পাঁচশো টাকা পাইলে বেচতে পারে এখন। ছাতাখানা খুইলাও সে দেখাইল একবার। ছাতা নয়, যেন একটা ক্যাম্প, আতিক ভাবতেছিল, কিনলে মন্দ হয় না, তাইলে শহরের লোকারণ্যে যখন-তখন ডালপালা ছড়াইয়া তার নিচে দুজন চুপচাপ বইসা থাকতে পারত অনেকক্ষণ। দুজন মানে সে আর সায়মা কিংবা লীনা। সায়মার সাথে যোগাযোগ নাই বহুদিন, লীনাও বেখবর ইদানীং। আগে মেসেজ পাঠাইত মাঝেমধ্যে, তারপর ডুব, হঠাৎ একদিন ফোন কইরা বলত, ‘ডিসি হিলে আসো।’ সায়মা চইলা গেছে নেদারল্যান্ড, লীনা শহরে থাইকাও যেন নাই, তবু সে বড়শির ফাতনা ডুবাইয়া টানে আজও।

লীনার কথা ভাবতেই ওজন আরও কইমা যায় আতিকের। মানিব্যাগ ভারী হইলেই মানুষের ওজন কমে, কিন্তু হাঁসের পালকের মতো হালকা লাগতেছে এখন নিজেরে। লীনা কি ফোন করবে কিছুক্ষণ পর? লালচান্দ রোডে ব্যাংকের সিঁড়ির গোড়ায় এটিএম বুথের সামনে দাঁড়াইয়া আতিক অকারণ ফোন বাইর কইরা কানের কাছে ধরে। লীনার নম্বরে সে ডায়াল করে নাই, ব্যালেন্স চেক করার নম্বরেও না, তবু সে কথা বলে লীনার সাথেই।

‘হ্যালো, আমি তো চকবাজারে।’

‘তোর চকবাজারে আগুন দেবো, শালা! কতক্ষণ দাঁড় করাইয়া রাখবি আমারে?’

‘সরি জান, আর পাঁচ মিনিট!’

পকেটে ফোন ঢুকাইয়া রাখে আতিক। উর্দিপরা দারোয়ান জলপাইহাসি দিয়া এটিএম বুথের দরজা খুলতেই আতিক ঢুইকা পড়ে ভিতরে। ছিমছাম একটা কেবিন। বুথের পর্দার দিকে তাকাইলে নিজেরে কলম্বাস মনে হয়, কার্ড পাঞ্চ করলেই আমেরিকা!

কার্ড ঢুকাইয়া, পিন নম্বর সতর্কভাবে ডায়াল কইরা, ‘নগদ উত্তোলন’ বোতামে চাপ দেয় আতিক, যথারীতি অন্যান্য বোতামেও। একটু পরে কার্ড জিভ বাইর কইরা উদিত হয়, আতিকের মনে পড়ে পেয়ারা গাছের-ডালে-লাফ-দিয়া-ওঠা শিহরিত বাদামি মুরগিটার কথা; কয়েক সেকেন্ড মাত্র, খট কইরা শব্দ হয় আর কার্ডটা মিলাইয়া যায় চোখের পলকে।

২.
আমি, মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান, পিতা : মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, মাতা : নিলুফার বেগম, গ্রাম : মন্দাকিনী, থানা : হাটহাজারী, জেলা : চট্টগ্রাম, ইস্ট হোরাইজন ব্যাংকের দোতলায়, এসি-সিসি-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের সামনে তাঁর টেবিলে রাখা চতুষ্কোণ কার্ডবক্সে হাঁটু মুইড়া বইসা আছি। কাল দুপুর বারোটা চল্লিশ থেকে আমি অন্তরীণ। এটিএম বুথের মেশিনে ভূতের মতো ঢুইকা প্রথমে চোখেমুখে আন্ধার দেখছিলাম, বমি-বমি লাগতেছিল; আরও কয়েকজন বন্দির সাথে, বিকেল না সন্ধ্যা মনে নাই, আইসা পড়লাম এখানে, অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের টেবিলে। ঘন-ঘন চা না পাইলে যার মাথা কাজ করে না, সেই আমি কেবল বোতলের পানিতে তেষ্টা মিটাইলাম। এক বন্দি ভাই, নাম শিহাবউদ্দিন, পটিয়ার ধলঘাটে বাড়ি, তার প্রথম গঞ্জিকা সেবনের কাহিনি শুনাইতেছিল। গাঞ্জা খাইলে না কী ভাতের চিন্তা থাকে না আর, বরং অপার্থিব ঘোর লাগে আপাদশির। খালি পেটে লীনার শরীরই কেবল দোলায়িত মনে হইল গভীর রাতে, তার ওড়নায় চাঁপা ফুলের গন্ধ।

‘কী মিয়া, কেমন লাগতেছে? তোমারে দেইখা তো মনে হয় আরব্য রজনীর জিন!’ হাসতে থাকে লীনা।

‘ফাজলামি কইরো না। খাবার কিছু থাকলে দাও।’

‘চুইংগাম আছে, খাবা?’

হাত বাড়াইতেই লীনা উধাও।

সকাল ন-টা পঁয়তিরিশে অ্যাঞ্জেলা ম্যাডাম আইসা বসলেন চেয়ারে। ছিপছিপে গড়ন, পরনে ঘি-রঙা শাড়ি, কপালে ‍সামুদ্রিক সূর্যাস্তের মতো টিপ, চিবুকের ধারে অবহেলিত অদৃশ্যপ্রায় একটা তিল, কাজলটানা চোখ। এমন চোখের যারা মালকিন, তাদের বেশি কথা বলার দরকার হয় না। অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামও কিছু বললেন না, একবার শুধু তাকাইলেন আড়চোখে, ফোনে ‘জি সার, হাঁ সার’ কইরা কথা কইলেন কিছুক্ষণ, তারপর উইঠা গেলেন বাথরুমের দিকে। আমার সৌভাগ্য যে এখনও বাথরুমের বেগ আসে নাই তেমন। ঘুম ভালো হয় নাই বইলা মাথাটা ঝিমঝিম করতেছিল এবং এতক্ষণে বোঝা গেল যে মিষ্টি কোনো ফুলের সুরভি ছড়াইয়া আছে ঘরে, যা ঘোরে অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের পিছুপিছু।

নীল মলাটের একটা ফাইল নিয়া ব্যস্ত হইয়া পড়লেন অ্যাঞ্জেলা ম্যাডাম। কথা বলার সুযোগই পাইলাম না। ‘আমি আতিক’ বইলা যে-ই পরিচয় দিতে যাই, তখনই জলতরঙ্গের মতো বাইজা ওঠে তাঁর ফোন।

‘হ্যালো, তুমি ফিরছ বাসায়?’

দুই সেকেন্ড।

‘শোনো, ফ্রিজে মাংস নাই। তৃষ্ণা আসবে বলছিল সন্ধ্যায়।’

পাঁচ সেকেন্ড।

‘আচ্ছা, রাখি।’

ফোন নামাইয়া রাখতেই চোখাচোখি হইয়া গেল তাঁর সাথে। খেয়াল কইরা দেখলাম, অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের গায়ের রং খুব ফর্সা নয় আর তাঁকে দেখতে যত স্লিম মনে হয়, তত স্লিম তিনি নন। হইতে পারে, বেশিরভাগ সময় চেয়ারে বইসা থাকতে হয় বইলা তাঁর কোমরে মেদের গুঞ্জন। কিন্তু রূপবিচারে এখন মনোযোগী না হইলেও চলবে, আমার দরকার আপাতত মুক্তি; অবশ্য এ-কথাও ঠিক যে চুপচাপ গালে হাত দিয়া বইসা অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের কর্মতৎপরতা দেখতেও খারাপ লাগতেছে না।

লাঞ্চের আগেই ডাক পড়ল আমার। হ্যান্ডশেক কইরা শিহাবউদ্দিন বলতেছিল, ‘ভালো থাকবেন, ভাই!’


বিছানায় প্রতিরাতেই সে দেখতে পাইত থোকা-থোকা রক্তজবা, চিনচিনে এক যন্ত্রণায় লাল হইয়া যাইত তার শিশ্নমুণ্ড।


বাসের সহযাত্রী হইলে যেমন একধরনের ক্ষণিক আত্মীয়তার ধোঁয়ার গন্ধ নেয় অচেনা মানুষ, জেলখানার সহবন্দি হইলেও তেমন শুভেচ্ছা জানায়, বাড়ির ঠিকানা দেয়। টেবিল থেকে নাইমা—অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের ঈষদুষ্ণ করস্পর্শ তখনও আমার হাতে—একটা রেজিস্টারে দস্তখত দিয়া, ধন্যবাদ জানাইয়া বললাম, ‘আসি ম্যাডাম।’

‘হাঁ, শুনুন, কার্ড বেরিয়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে নিয়ে ফেলতে হয়, দেরি করা চলবে না।’

‘আচ্ছা।’

অ্যাঞ্জেলা ম্যাডাম কী কইরা জানবেন যে আমার দেরিতেই হয় সবকিছু? আমার ঘুমাইতে দেরি, ঘুম ভাঙতেও দেরি, খবরের ইনট্রো লিখতে দেরি, গ্যাস বিলের লাইনে দাঁড়াইতে দেরি, এমনকি বিয়ে বাড়ির খানার টেবিলে হামলাইয়া পড়তেও দেরি হইয়া যায়। আমার নাম হওয়া উচিত আশলে দেরিদা!

৩.
মুক্তির পর মন ভালো না খারাপ বুঝতে পারতেছে না আতিক। তবে নিজের উপর নিজেই যে কিঞ্চিৎ বিরক্ত তা পরিষ্কার। আশৈশব উঁচু গলায় কথা না বলতে বলতে তার স্বর চিকন হইয়া গেছে, দশ হাত দূরের কাউরে ডাকতে গেলেও তার গলা শুকাইয়া যায়। এর পিছনে টেস্টোস্টেরনের প্রভাব কিংবা অভাবও দায়ী হইতে পারে। মুদির দোকানে একটা সাবান কিনতে গেলেও তার দেরি হইয়া যায়, তারে দাঁড় করাইয়া মোড়ের রামধন মুচি আরও পাঁচজন পথচারীর জুতা সারাইয়া দেয়, ভাবখানা এমন যে কোনো তাড়াহুড়া নাই আতিকের—ধীরে-ধীরে, রসাইয়া কষাইয়া তার কাজ সারলেই হইল। এসব কারণেই, কখনও-কখনও তার সন্দেহ হয়, সে কি আশলেই যথেষ্ট পুরুষ? তার ভাবে-চেহারায় কি আছে হুকুমদারির বলিষ্ঠতা? একদা এই অভিযোগই তো তুলছিল নূপুর, বিয়ের বছর না ঘুরতেই, যখন সে পিত্রালয়ে ছিল টানা চার মাস। কথা কাটাকাটির জেরে কিংবা কোনো গূঢ় সন্দেহে, রাতে যেন চড়া পইড়া যাইত শরীরে, সাড়া দিতে পারত না আতিক, যদিও নূপুর ছিল ঢেউ ছলছল নদী।

ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া গালে হাত বোলায় আতিক। খোঁচাখোঁচা দাড়ি। নূপুরের বড়ো শখের এই আয়না। ঘুরাইয়া দিলে মনে হয় এখনও উল্টোপিঠে দেখা যাইবে নূপুরের মুখ। টেবিলের তাকে ক্রিম-পাউডার-লিপস্টিকের বদলে আছে কয়েকটা বই, বাসি পত্রিকার স্তূপ। একদিন দুপুরে ফোন করছিল সায়মা, বিদেশ থেকেই; সেই ক্ষণস্থায়ী ফোনালাপ কালসাপ হইয়া ছোবল মারল সাজানো সংসারে। কোনো ব্যাখ্যা মানতে চায় নাই নূপুর।

দাড়ি কামাইবে কী না ভাবতেছিল আতিক। আজ তার ডে অফ। আচ্ছা, ইন্টারনেটে ঢুঁ মাইরা দেখলে কেমন হয়? ভাবল সে। দশটা বাইজা গেছে, কোরবান আলির চা-সিঙাড়ার ঘ্রাণ টানতেছে খুব, তাছাড়া কপর্দকশূন্য হইয়া কতক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘরে থাকা সম্ভব? ব্যাংকে যাওয়া দরকার, তার আগে গুগলের সার্চবক্সে ‘হাউ টু উইথড্র মানি ফ্রম দ্য এটিএম বুথ’ লেইখা একবার খোঁজ নেওয়া যাইতে পারে। ল্যাপটপ চালু করল সে। প্রথমেই যে-লিংক দেখা গেল, ছবিসুদ্ধ সে-লিংকের লেখা খুঁটাইয়া খুঁটাইয়া পড়ল। এত সহজ একটা তরিকা আর সে কিনা গুলাইয়া ফেলতেছে!

আরও দু-একটা লিংকের লেখা পইড়া আত্মবিশ্বাস বোধহয় বাড়ল আতিকের, কিন্তু এখনই ব্যাংকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। ব্যাংকে ঢুকবে সে সন্ধ্যার দিকে, যখন তা থাকবে নিরিবিলি, সিঁড়ির মুখে মোলায়েম আলোয় মোলাকাত হইবে উর্দিপরা দারোয়ানের সাথে, যার নাম কাশেম কিংবা মং হ্লা প্রু।

‘আচ্ছা ভাই, একটু হেল্প করবেন?’

কাশেম কিংবা মং হ্লা প্রু আগাইয়া আসবে, ‘বলেন!’

নিতান্ত অনিচ্ছার ভাব নিয়া আতিক তখন এটিএম কার্ড বাইর করবে মানিব্যাগ থেকে, ‘না, বারবার একই সমস্যা হয় তো, মানে কার্ড আটকে যায় আর কী!’

‘ও আচ্ছা।’ কাশেম কিংবা মং হ্লা প্রু কার্ডখানা নিয়া মেশিনের হাঁ-করা মুখে ঢুকাইতে যাইবে, কিন্তু, হাঁ, যা ভাবছিল ঠিক তা-ই ঘটবে; আতিক না বইলা আর পারবে না তখন, ‘ভাই রে, আপনি তো উল্টা ধরছেন, দাঁড়ান, আমি দেখতেছি।’

আবারও সাহস হারাইয়া ফেলতেছে আতিক। একবার ভাবল, সুজনের কাছে পাওনা টাকাটা চাইতে পারে এখন। সুজন তার সহকর্মী। ফোন হাতে নিতেই মনে পড়ল, আজ মঙ্গলবার বা সুজনবার, ফোনে তারে দিনভর পাওয়া অসম্ভব, সন্ধ্যার পরও সে বারে বইসা থাকবে একা। আলো কইমা যাইতেছে বাইরে আর বাড়তেছে বাতাসের ঝাপটা এবং খিদা, দরজার তালা নেওয়ার আগেই ঝমঝমাইয়া নামল বৃষ্টি। ফ্রিজ খুইলা দেখল তেলাপিয়া মাছের অল্প ঝোল আছে বাটিতে, একটা ডিমভাজি হইলে দিবাহারের দুশ্চিন্তা খতম। ফোনের ঘড়ির দিকে তাকাইল সে। নানা রকমের অফারমণ্ডিত মেসেজ আসে, কিন্তু তিন দিন হইল, ‘লিমন’ নামটা ভাইসা ওঠে না ফোনের পর্দায়। ফাহিমের মোটরবাইকে লীনারে দেখছিল ওয়াসার মোড়ে, সেদিন থেকেই ওয়াটার লু কিংবা পানিপথের জঙ্গ চলতেছে। এ-সময় নূপুর আসে তার শুচিবাইসহ। গোসল করতে তার ঘণ্টা খানেক পার হইত, আতিকরেও চুবাইয়া ছাড়ত শাওয়ারের নিচে। ভালোই তো লাগত আতিকের, তবু মনে হইত শাওয়ারে রক্তধারা ঝরতেছে কোনো ধারালো ব্লেডের উপর দিয়া। বিছানায় প্রতিরাতেই সে দেখতে পাইত থোকা-থোকা রক্তজবা, চিনচিনে এক যন্ত্রণায় লাল হইয়া যাইত তার শিশ্নমুণ্ড। এই দেড় আঙুলে কোপন স্বভাব মুনির সাথে সে যেন যুগ-যুগ ধইরা হাঁটতেছে বন-বনান্তের পথে, সেখানে কোথাও হয়তো আছে একটা নিরালা কুটির আর খরস্রোতা খালের পাড়ে আইসা দেখত জবুথবু হইয়া কোঁকাইতেছে পূজা নামের বছর পাঁচেকের এক মেয়ে, পাশে ঘাসের উপর একটা ব্লেড।

ঘুম ভাঙল প্রায় চারটায়। ফোন হাতে নিয়া আতিক অবাক! লিঙ্গান্তরকামী লীনা ওরফে লিমনের মেসেজ : ‘পাঁচটায় শিল্পকলায় আসবা?’ আরও কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিয়া, বিতৃষ্ণা ও পুলকের আশ্চর্য জয়তুন তেলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে সে তালা লাগাইল দরজায়। কোরবান আলির দোকানে এককাপ কড়া চা খাইয়া, হাঁটতে হাঁটতে গুলজার মোড়ে আইসা পায়চারি করল মিনিট বিশেক, তারপর গেল ইস্ট হোরাইজন ব্যাংকের দিকে। পাঁচটার কথা সে ভুলে নাই, কিন্তু শিল্পকলা একাডেমিতে যাওয়ার উদ্যমও পাইতেছে না শরীরে। সিঁড়ির কাছে উর্দিপরা মং হ্লা প্রু, মুখে সৌজন্যের হাসি। বুথে ঢুইকা, কার্ড বাইর কইরা ভাবতেছে দেড় হাজার টাকা নিতে হইলে কোন বোতামে চাপ দিতে হয়; মং হ্লা প্রুরে ডাকবে কি না সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছে না, ঠিক তখনই আলতোভাবে দরজা খোলে মং হ্লা প্রু, ‘ভাই, এত দেরি! কোনো সমস্যা?’

‘না না, সমস্যা নাই।’ মুখে বললেও আতিকের মনে হইল সে তার গুগলজাত আত্মবিশ্বাস হারাইয়া ফেলতেছে আবার। খুঁটিবাঁধা গরুর মুখে যেভাবে খড় তুইলা দেয় রাখাল, আতিকও সেভাবেই কার্ডখানা ধরে মেশিনের মুখে। পিন নম্বর দিয়া, ‘নগদ উত্তোলন’ বোতাম চাইপা, টাকার অঙ্কে বোধহয় গোলমাল কইরা ফেলছে, অনাকাক্ষিত এক বার্তা ভাইসা ওঠে সবুজাভ পর্দায়, আবারও ভেংচি-কাটা জিভের মতো খানিকটা বাইর হয় কার্ড; বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর যৌথ প্রয়াসেও তারে ডাঙায় টাইনা তোলা যায় না। খট কইরা শব্দ হয়, আতিক আবারও তলাইয়া যায় খাদে।


পিরামিডের অন্ধকারাচ্ছন্ন টানেলের মুখে, যেখানে নেফারতিতির মমি আছে থোকা-থোকা রক্তজবার মাঝে, আর একটা ব্লেড।


৪.
মশার কামড়ে কিংবা শিহাব উদ্দিনের নাক ডাকার শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভাইঙা গেল আমার। সন্ধ্যার পর তাসের আড্ডায় মশগুল শিহাবউদ্দিন হাসাইতেছিল নানা কৌতুকে, গালগল্পে। চুপ কইরা বইসাছিলাম কার্ডবক্সের এক কোনায়। কাল জন্মাষ্টমীর ছুটি, ব্যাংকে কোনো মাছিও আসবে না। পরদিন সকাল ন-টা তিরিশে হয়তো আসবেন অ্যাঞ্জেলা ম্যাডাম। পরনে হালকা নীল সুতির শাড়ি, জুঁইফুলের গন্ধ আসবে আঁচলের দোলায়, তাঁর চিকন নাকের ডগায় দু-বিন্দু ঘাম, ফোনের পর্দায় কপালের দিকের চুল ঠিক কইরা নিতে নিতে হঠাৎ দেখতে পাইবেন আমারে, ‘কী ব্যাপার, আপনি!’

‘আবার আসতে হলো।’

‘আবারও ভুল করলেন না কি?’

‘না, আপনাকে দেখতে এলাম।’ বইলা মুখ ঘুরাইয়া ফেলব কিংবা কথাটা সৌজন্যসম্মত হয় নাই মনে কইরা তৎক্ষণাৎ শুধরাইয়া নিব, ‘মজা করলাম। আশলে নূপুরের যন্ত্রণায় আবারও আসতে হলো।’

‘নূপুর!’ অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের ডাগর চোখজোড়া আরও ডাগর হইবে।

‘আমার এক্স-ওয়াইফ। দেখতে আপনার মতো!’ বলতে গিয়া কি নূপুররে এক্স ওয়াই জেড মনে হইবে আমার!

‘তা-ই না কি!’ কমলাঠোঁটে মৃদু হাসি অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের, তখনই হয়তো বাইজা উঠবে বেরসিক ল্যান্ডফোন।

‘জি সার, পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ রিসিভার নামাইয়া রাখতে রাখতে তিনখানা সই করবেন অ্যাঞ্জেলা ম্যাডাম, পিয়ন মোবারকরে ডাইকা একটা ফাইল বুঝাইয়া দিয়া নিচু গলায় আবার আমারে জিগাইবেন, ‘তো, আতিক শাহেব, আপনাদের ডিভোর্স কেন হলো জানতে পারি?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকব আমি। এত কথা কি বলা যায় অ্যাঞ্জেলা ম্যাডামের বটাচ্ছাদিত দিঘির মতো চোখের দিকে তাকাইয়া? বলাও কি সঙ্গত?

ডা. পূরবী পালের চেম্বারে গেছিলাম নূপুররে নিয়া। পূরবী পালের মুখখানা যেমন মায়াবী, ব্যবহারও তেমনি অমায়িক। সবকিছু শুইনা, পরীক্ষানিরীক্ষা কইরা, ওষুধপত্র লেইখা দিলেন। বাসায় ফেরার পর, রাতে, সরু আইসক্রিমের মতো শাদা একটা ওষুধের অ্যাম্পুল আমার হাতে দিয়া নূপুর বলছিল, ‘দেখি পারো কি না!’ ঠোঁটে বাঁকাহাসি।

হাঁটু ভাঁজ কইরা চিত হইয়া শুইয়া পড়ল নূপুর, অবলীলায়। ইস্ট হোরাইজন ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে যেন আমি দাঁড়াইয়া আছি। দরজার বাইরে হয়তো অপেক্ষমাণ কাশেম কিংবা মং হ্লা প্রু, কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চাইবে একটু পরেই। আমি বাম হাতে টর্চ আর ডান হাতে খোলা অ্যাম্পুল নিয়া পায়রা ধরার ভঙ্গিতে উঁকি দিলাম পিরামিডের অন্ধকারাচ্ছন্ন টানেলের মুখে, যেখানে নেফারতিতির মমি আছে থোকা-থোকা রক্তজবার মাঝে, আর একটা ব্লেড।

মুয়িন পারভেজ

জন্ম ২৬ আগস্ট, ১৯৭৬; পশ্চিম আঁধারমানিক, ভুজপুর, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালত।

প্রকাশিত বই—
'মর্গে ও নিসর্গে' [কবিতা; ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০১১]
সঞ্জয় উবাচ [কবিতা; বাতিঘর, ফেব্রুয়ারি ২০১৯]

ই-মেইল : muyinparvez@gmail.com

Latest posts by মুয়িন পারভেজ (see all)