হোম গদ্য গল্প একান্ত ব্যক্তিগত বিধায় এটি আর বলা যাবে না

একান্ত ব্যক্তিগত বিধায় এটি আর বলা যাবে না

একান্ত ব্যক্তিগত বিধায় এটি আর বলা যাবে না
270
0

আবিদাকে নিয়ে তাবাসসুম বিপদে নয়, চিন্তায় আছে, তবে, ঠিক চিন্তাও বলা যাবে না, মাঝেমধ্যে ভাবনা হয় আরকি। গায়ে-গতরে এত সুন্দরী বোন তার! আপন বোন হলেও কথা ছিল। খালাতো বোন। বছর দুয়েক আগে এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যখন কোথাও থাকার জায়গা হচ্ছিল না, তখন মেজখালা এসে ইখতেখারকে ধরলেন; সঙ্গে তাকেও। বললেন, ‘বাবারে-মারে, কোথায় যাই বলতো। আবিদার কি পড়ালেখা হবে না?’ বলতে বলতে মেজখালা কেঁদে ফেলেছিলেন। আর না কেঁদে উপায়ও ছিল না। সেই কবে মেজখালু হারিয়ে গেছেন! খোঁজটা পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। সেই থেকে মেজখালার কঠিন জীবনসংগ্রাম চলছে। এতগুলো ছেলে-মেয়ে নিয়ে কিভাবে যে কী করছেন, ভাবলে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না। সবগুলো আবার পড়াশোনা করছে। তবে, রোজগেরে মনে হয় আরবাবটাকে। এবার যেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে। মাসে একবার-দুবার খালাতো বোনের বাসায় আসে। এসে ঢু মেরে যায়, বেশিক্ষণ বসেও না। বলে, ‘আপা, টিউশনি করি। চলতে তো হবে। সবকিছু মিলিয়ে সময় তেমন একটা হাতে থাকে না।’ আবিদা ওর কথা বলে; প্রশংসা করে। বলে, ‘মাসে হাজার পাঁচেক টাকা বাড়িতে পাঠায় আরবাব, আপা।’

আবিদাও পাঠাচ্ছে। এখানে এসে উঠার পর বলা যায়, মাস দুয়েক ও বসে ছিল, তারপর দুটো টিউশনি জোগাড় হয়ে গেছে। এই পাড়ায় একটি টিউশনি, আর শ্যামলীতে আরেকটি। এই পাড়ার টিউশনিটা তাবাসসুমই জোগাড় করে দিয়েছে। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া স্টুডেন্টগুলো মেয়ে, ইংলিশ মিডিয়ামের। মেয়ে তো, তাই গার্ডিয়ানরা মহিলা প্রাইভেট টিউটরকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আবিদাও সপ্তাহে তিনদিন যাচ্ছে।

নাফিস সোনাকেও আবিদা সময় দেয়; পড়ায়। সন্ধ্যার পর শনি, সোম, বুধ এই তিনদিন দুই ঘণ্টা করে। তাবাসসুমই ঠিক করে দিয়েছে। বাদবাকি দিন তাবাসসুম পড়ায়। এইজন্যে হাজার খানেক টাকা লুকিয়ে সম্মানীও দেয়।

মা তো সেই কবে আবিদা যখন ক্লাস সিক্সে অথবা সেভেনে পড়ত, তখন মেজখালার সঙ্গে কথা পাকাপাকি করে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘রেহেনারে, আবিদার জন্য চিন্তা করিস না। আবিদাকে আমার তমালের জন্যে নিয়ে আসব।’


বিড়াল মারতে হয় প্রথম রাতেই। কেয়ারটেকার সাহেব টের পেয়েছেন। এখন আজকে কাজের এই প্রথম দিনে বুইড়া মাগিরে সাইজ করতে হবে। মাগি নাকি ভয়ংকর, বেশুমার জাদরেল।


সেই তমাল এখন ফিজিক্সে মাস্টার্স দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে। কী জানি, তমাল আর আবিদার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? থাকলে অবশ্য টের পাওয়া যেত। যে কোনো ওছিলায় তমাল বোনের বাড়িতে আসত-যেত। আসে, তবে ওই আরবাবটার মতো। মাসে একবার-দুবার বড়বোনের বাড়িতে এসে ঢু মেরে যায়। আর ও এলে আবিদাটা কেমন যেন গুটিয়ে যায়। কী জানি, আজকালকার ছেলে-মেয়েদের কাজ-কারবার বাপু!

মাস্টার আসার সময় হয়ে এল। মাস্টার আসে কাটায় কাটায় ঠিক সোয়া চারটায়। ঘণ্টা দেড়েক আঞ্জুমকে পড়িয়ে তারপর যায়। আঞ্জুমের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পিইসি পরীক্ষার্থিনী, চাপ না বাড়িয়ে কি উপায় আছে? এ প্লাস মিস হয়ে যাবে। ইফতেখার বলেছে, ‘তার মেয়ের এ প্লাস দরকার; গোল্ডেন এ প্লাস। গোল্ডেন এ প্লাস যে কী জিনিস, তা তাবাসসুমের কাছে বোধগম্য নয়। বছর চারেক তো একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছে, সেই সুবাদে সে জানে এ প্লাস আছে, কিন্তু গোল্ডেন এ প্লাস নেই। এগুলো সব অভিভাবক আর মিডিয়ার বানানো। গোল্ডেন এ প্লাস অর্থাৎ সকল সাবজেক্টে এ প্লাস না পেলে ইফতেখার ওর ওপর সব দোষ চাপাবে। বলবে, ‘তাবাসসুম, তুমি ভালো করে মেয়ের যত্ন নাও নি।’ আরে, পরীক্ষা তো মেয়ে ওর হাত দিয়ে দেবে, নাকি মায়ের হাত দিয়ে! যতসব ফাজলামি। কোনো কিছু হলে মায়ের দোষ। আর উনি ফেরেশতা! ভালো কিছু হলে সব তার, আর মন্দ কিছু হলে মায়ের! মাঝেমধ্যে মনে হয় সংসারধর্ম সবকিছু ছেড়েছুড়ে পালিয়ে যাই।

ড্রাইভার কাম কেয়ারটেকার হারিসের গলা নিচের তলায় ড্রইংরুমে শোনা যাচ্ছে। কার সঙ্গে যেন জোরেশোরে কথা বলছে। বেটা একটা গাধা। এই যে বলা হয়, ‘বাসায় জোরে কথা বলিস না,’ কে শোনে কার কথা! বললে বলে, ‘আমি তো ঘরে আস্তে কথা কই, ম্যাডাম।’ এই হচ্ছে আস্তের নমুনা! আপদটা আছে বছর পাঁচেক ধরে। যায়ও না। আর যাবেই বা কোথায়! সবকিছু হারিয়ে যে বসে আছে। তিনকুলে এখন আর তার কেউ নেই। নিজ থেকেই বলে, ‘এক পেট, এক চেট। যেন রাইত, হেন কাইত।’ গ্যারেজে ডেরা বেঁধেছে। ইফতেখারই ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

হারিস মনে হয় তার কুলসুমাকে নিয়ে এসেছে।

ইফতেখার নিত্যদিনের মতো দুপুরে ফোন করে অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে হারিস-কুলসুমার প্রসঙ্গও বিস্তারিত বলেছে। বলেছে, ‘বুঝেছ তাবাসসুম, গাধাটা এবার আরেক গাধীকে জুটিয়েছে।’

‘গাধী বলছ কেন?’

‘চালচুলোহীন লোকের ঘাড়ে উঠেছে, গাধী বলব না তো কী বলব?’

ইফতেখারের এইসব কথাবার্তা তাবাসসুমের একদমই পছন্দ না। কখন যে কার ভাগ্যে কী ঘটে যায়, কেউ তা বলতে পারে না। এই তো পাশের বাসার জিহানরা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তিনপুরুষ ধরে ওরা গৃহহীন। ভাড়া বাসায় থাকে। ওই বাসায়ই আছে সতেরো বছর ধরে। ওদের চাল-চলন, কথাবার্তা, শিক্ষা সবকিছু এই বার্তা দেয় যে, ওরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। দেশটা ভাগ না হলে আজ হয়তো ওদের এই পরিণতি হতো না।

ইফতেখারের অনেক কাজ-কারবারও তাবাসসুমের পছন্দ না। এই যে বাসাটাকে লঙ্গরখানা বানাতে চলেছে, তারপর দুদিন পর বাচ্চা-কাচ্চা, হাগু-মুতু, ওয়াও-ওয়া। অসহ্য। কিন্তু, কিছু বলা যাবে না। আবিদার কারণে বললেই বলবে, ‘লঙ্গরখানা তুমি বানিয়েছ, তাবাসসুম; আমি না। কোনো দিকে না তাকিয়ে স্রেফ মুখের ওপর স্বাভাবিকভাবে কথা বলে দিতে ইফতেখার বেশ ওস্তাদ।

তাবাসসুমের সব মনে আছে। ও তখন হাজী আমির আলী কলেজের ননএমপিও-ভুক্ত লেকচারার। অনার্স চালু হয়েছে ওরই বাংলা ডিপার্টমেন্টে। প্রতিদিন যেতে-আসতে হয়; ক্লাস নিতে হয়। ফিরে এসে আবার আঞ্জুমকে সামলাতে হয়। বৃদ্ধা শাশুড়ির যত্ন-আত্তিও নিতে হয়। একেবারে লেজে-গোবরে অবস্থা। তারওপর ননদ নিম্মির বিয়ে-শাদি তখনও হয় নি। মা-মেয়ে মিলে হায়রে কী মানসিক নির্যাতন! রাগের চোটে একদিন যখন মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, ‘আমি আর চাকরি করছি না, ইফতেখার; আমার চাকরির দরকার নেই।’ ইফতেখার যেন এই কথার অপেক্ষায় বসেই ছিল। বলল, ‘কে তোমাকে চাকরি করতে বলেছে, তাবাসসুম! তোমার চাকরির দরকার নেই। এই পাঁচ-সাত বছরে কন্ট্রাকটরি করে মোটামুটি ভালো পয়সাই তো কামিয়েছি। চাকরি ছেড়ে দাও। যা বেতন পাও, তার থেকে বেশি হাতখরচা পাবে। ছেড়ে দাও। ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে সামলাও।

কথাটা তো ঠিক। ম্যালা পয়সাই তো কামিয়েছে ইফতেখার। আর না হলে বাবার আমলের আসাম প্যাটার্ন ঘর ভেঙে এই পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের দোতলা উঠল কিভাবে?

তাবাসসুম চাকরি ছেড়ে দিল।

‘এই কুলসুমা, ম্যাডামরে পায়ে ধরে সালাম কর।’

বাহ! বেশ সুন্দরী মেয়ে তো পটিয়েছে, হারিস! বয়সও কম। কুড়ির নিচে। কথা একটা বলতে তো হবে, তাবাসসুম তাই নাম জানা সত্ত্বেও খামাখা আবার নাম জিজ্ঞেস করল।

‘এই তোমার নাম কী?’

‘জে, কুলসুমা।’

‘চোখে গগল্স কেন?’

কুলসুমা কোনো উত্তর করল না। মাথা নিচু করে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর তর্জনী উঠিয়ে খোঁচাতে লাগল। আর এই সময় অনভ্যাস বশত চোখ থেকে গগল্স নিচে পড়ে গিয়ে ওর দুচোখই উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। ডান চোখ যে নষ্ট, তা স্পষ্ট বোঝা গেল।

ওয়ার্ডরোবে রাখা তাবাসসুমের মোবাইলের বিশেষ রিংটোন যেটি মাঝেমধ্যে তাবাসসুম ইচ্ছে করেই চেঞ্জ করে, বেজেই চলেছে। মাস্টারের ফোন। মাস্টার মাসে বারো দিন পড়ায়, আর চৌদ্দ দিন ফোন করে। প্রথম প্রথম দুএকদিন বিব্রত হলেও তাবাসসুম এখন আর বিব্রত-বিরক্ত কিছুই হয় না, বরং অনেকটা এনজয় করে। বোঝে…। তাছাড়া করবেটাই বা কী? সময় তো কাটাতে হবে। শাশুড়ি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তাও কথা বলার মানুষ ছিল। এখন আর বলতে গেলে কেউ নেই। ছুটির দিন ছাড়া ইফতেখার প্রতিদিন দশটা সাড়ে-দশটার দিকে বেরিয়ে যায়, আর ফেরে সন্ধ্যারাতে। সারাদিনে ঐ একবারই দুপুরে ফোন-টোন করে।

মাস্টার মনে হয় আসবে না। তাবাসসুম ইচ্ছে করে মাস্টারের ফোন ধরল না।

এক ফারুককেই সামলানো যাচ্ছে না, আর মাস্টার! এই তো গত রোববার বাসায় যখন নাসিমার মা ছাড়া আর কেউ ছিল না, আঞ্জুম আর নাফিস সোনা যথারীতি যখন স্কুলে, সেই সময়ে ফারুক ফোন দিয়ে বলল, ‘এই তোমাকে দেখতে মন চাচ্ছে। আসব?’ ‘পারলে ঘণ্টা খানেকের ভেতর এসো।’ বলে তাবাসসুম ফোন রেখে দিয়ে নাসিমার মাকে গিয়ে বলল, ‘কালকে কোথায় যেতে চাচ্ছিলে নাসিমার মা। কালকে আমার সময় হবে না। পারলে আজকে যাও, এবং আসরের আগে ফিরে এসো’ বলে নাসিমার মাকে বিদায় করে একটু সাজগোজ করতে না করতেই ফারুক এসে হাজির। বেটা একটা আস্ত উম্মাদ। পাক্কা দুবার খেলল। তারপর, তাবাসসুমই একরকম জোর করে বিদায় করল।

২.
নাসিমার মা খ্যাঁকখ্যাঁকিয়ে উঠল। তার রাজ্যে এ আবার কে জনমানুষ্যি! বছর দুয়েক ধরে তো সেই হেঁশেল সামলাচ্ছে। কোনো খুঁত নেই। মাঝে দু-চারটা ছুটা বান্দি এসে লাফালাফি শুরু করেছিল, দিন সাতেক বাদে ঝেটিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। হাতটানের অভ্যেস। বিদায় না করে কি উপায় ছিল? উপায় ছিল না।

‘এই ছেমরি, গগস(গগল্স) খুল। এই ছেমরি, এই হারিচ্চার বউ! কানে হুনে না ক্যা! কালা নিহি!’

কুলসুমা কোনো ছাড় দিল না। বিড়াল মারতে হয় প্রথম রাতেই। কেয়ারটেকার সাহেব টের পেয়েছেন। এখন আজকে কাজের এই প্রথম দিনে বুইড়া মাগিরে সাইজ করতে হবে। মাগি নাকি ভয়ংকর, বেশুমার জাদরেল।

বাসায় কেউ না থাকায় কুলসুমা আর নাসিমার মার মধ্যে একপ্রস্থ ঝগড়া হয়ে গেল।

সন্ধ্যারাতে ইফতেখার যখন চা-টা সেরে বেডরুমে বিছানায় শুয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে একটু-আধটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল, নাসিমার মা গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরে ঢুকে কোনোরূপ ভণিতা না করে সরাসরি ইফতেখারের দিকে তাকিয়ে বেশ রুক্ষ মেজাজ নিয়েই বলল, ‘দুইদিনের যুগি, ভাতরে কয় অন্ন! আমি আর নাই, মিয়াভাই! হয় আমারে রাহেন, আর না হয় কুলসুমারে।’ বলে সে চুপচাপ হেঁটে হেঁশেলের দিকে চলে গেল।

ইফতেখার কোনো উত্তর করল না। তাবাসসুমও না।

আজ তাবাসসুম বলতে গেলে কিছুটা ফ্রি। আবিদা নাফিস সোনাকে পড়াচ্ছে। আঞ্জুমকে হোমটাস্ক শেষ করতে বলা হয়েছে।

দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিয়ে নিউজ চ্যানেলে মুভ করল ইফতেখার। স্ক্রলিং এ ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। এত ব্রেকিং নিউজ! সারাদিনই ব্রেকিং নিউজ দেখায়। দর্শক ধরে রাখার কৌশল আরকি।

ইফতেখার মুখ খুলল। বলল, ‘ও তোমাকে বলা হয় নি। তমালের ব্যাংকে চাকরি হয়েছে। ওকে জয়েন করতে বলা হয়েছে। আমি জানিয়ে দিয়েছি।’

তাবাসসুম ভেতরে রাগ চেপে ধরে, ‘ভালো, হু-হ্যাঁ’ ছাড়া কিছুই বলল না। একে তো ইফতেখারের গোপনে ফ্ল্যাটবাড়ি কেনার খবর আজ পেয়েছে, তারওপর, ভাই একটা তার অসামাজিক জীব। চাকরি হয়েছে, ভালো কথা, আনন্দের কথা। তা বোনকে তো অবহিত করবি। না উনার বোনকে অবহিত করার দরকার নেই।


আশে-পাশের এবং অতি কাছের যারা প্রায়ই নিকটে অবস্থান করে, সেইসব যুবতীকে সন্দেহ, অতি সন্দেহ লাগে। তখন দুইয়ে দুইয়ে ভাবনা চার মেলায়।


৩.
তাবাসসুমের ভাবনা বেড়েছে। মাস খানেক আগে ইফতেখার তাকে না জানিয়ে কেনই-বা, কী উদ্দেশ্যে ১৩৫০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটবাড়ি প্যারাগন সিটিতে খরিদ করেছে?

কোনো কিছুই তো লুকানো যায় না। একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়ই। আর স্বামী-স্ত্রী হলে তো কথাই নেই। আজ হোক, কাল হোক, থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবেই। গত শনিবারই থলের বিড়ালের প্রথম অঙ্ক অর্থাৎ ফ্ল্যাটবাড়ি কেনার খবর হারিস গোপনে তাকে বলে দিয়েছে। আজ দ্বিতীয় অঙ্ক বলার কথা। দ্বিতীয় অঙ্ক জানার আগেই তাবাসসুম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, হারিস-কুলসুমাকে আর রাখা যাবে না; বিদায় করে দিতে হবে। যে লোক স্বামীর গোপনীয় বিষয়-আশয় স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করে দেয়, সেই লোক যদি স্ত্রীর গোপনীয় বিষয়-আশয় জেনে যায়, এবং…।

ভাবনা থেকে ভাবনা আসে। ভাবনা বাড়ে। ভাবতে ভাবতে অনেক সময় তালগোল পাকিয়ে যায়। আশে-পাশের এবং অতি কাছের যারা প্রায়ই নিকটে অবস্থান করে, সেইসব যুবতীকে সন্দেহ, অতি সন্দেহ লাগে। তখন দুইয়ে দুইয়ে ভাবনা চার মেলায়।

মাঝেমধ্যে, মাঝেমধ্যে কি, প্রতি সপ্তাহে রবিবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, এখন দেখা যাচ্ছে, মাস খানেক হয় মঙ্গলবারও আবিদা সন্ধ্যার পর ফিরছে। তাবাসসুম কোনোদিন এ ব্যাপারে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করে নি, এবং জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধও করে নি। টিউশনি করে। স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসতে তো একটু দেরি হবেই। কিন্তু মঙ্গলবার? মঙ্গলবারে তো কোনো টিউশনি নেই। তাহলে এত দেরি হয় কেন? নাকি মঙ্গলবারে…। মাস খানেক আগে ফ্ল্যাটবাড়ি কেনা হয়েছে। মাস খানেক আগে থেকে মঙ্গলবারে দেরি করে ফিরছে। তবে, এটাও ঠিক, এসব কাজে মঙ্গলবার-শুক্রবার লাগে না।

তাবাসসুম আর ভাবতে পারে না।

হারিসের কাছ থেকে দ্বিতীয় অঙ্কও শোনা হয় না। সত্যি কথা বলতে কী, হারিস দ্বিতীয় অঙ্কের কথা বলেও না, এবং এসব কথার ধারকাছ দিয়ে যায়ও না। তাবাসসুমও জিজ্ঞেস করে না। আর জিজ্ঞেস করে করবেটা বা কী? হাব-ভাব, আকার-ইঙ্গিত, চাহনি, সবকিছু মিলিয়ে অঙ্ক তো মিলে গেছে।

৪.
অনেক ভেবেচিন্তে তাবাসসুম কাউকে কিছু বলে না। তাছাড়া, কাকেই বা কী বলবে! তাহলে তো প্রথম কথা মেজখালাকে বলতে হয়; আবিদাকে বিদায় করে দিতে হয়। বেয়াদবির জন্যে নাসিমার মাকে তাড়াতে হয়। গোপন বিষয়-আশয় প্রকাশ করার দায়ে হারিস-কুলসুমার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হয়। তাছাড়া, নিজেই তো…।

তবে, পাকা সিদ্ধান্ত নিতে সে হেরফের করে না।

(ক) মেজখালার কাছে দেয়া মায়ের ওয়াদা পূরণ করতে দেয়া হবে না।

(খ) আর, এটি একান্ত ব্যক্তিগত বিধায় এটি আর বলা যাবে না।

ইকবাল তাজওলী

জন্ম ১৯৬৭, সিলেট।

শিক্ষা : স্নাতকোত্তর।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই—
শরীরের কান্না এবং পনেরো ফোঁটা অশ্রু [নাগরী, ২০১৯]

ই-মেইল : itajolee@gmail.com