হোম গদ্য গল্প একাকিত্বে বহুত্ব

একাকিত্বে বহুত্ব

একাকিত্বে বহুত্ব
423
0

সন্ধ্যা জড়ো হচ্ছে ধীরে। গাছগাছালি ঘেরা আবছায়া পরিবেশ, সার বেঁধে বসা চা-স্টল। একটা চা-স্টলের ছোট একখানি ফাঁকা বেঞ্চে বসে আছে একজন মধ্যবয়স্ক লোক, বেশ খানিকটা উবু হয়ে। এখানে সচরাচর যারা আড্ডা জমাতে আসে লোকটি তাদের দলের কেউ নয় এবং মানুষের সাথে মেশার প্রাণোচ্ছ্বলতাটুকুও একাকিত্ব কাল প্রবাহে তার মধ্যে হয়ে উঠেছে বিন্দুবৎ। তবুও ইদানীং তাকে মাঝে মধ্যেই এই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকটাতে আসা-যাওয়া শুরু করার কারণটা তার নিজের কাছেও খুব একটা স্পষ্ট নয়, আসে বোধ করি মানুষের সঙ্গ পাওয়ার লোভেই। হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত দু-একজনের সাথে হয়তো দেখা হয়, সামান্য সময় এটা সেটা নিয়ে দু-একটা হালকা কথা, উষ্ণতা খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থতায় ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে সরে আসা। পুরাতন বন্ধুদের সাথেও যে দেখা হয় না তা নয়, অনেকদিন পর বলে প্রথমে বেশ কিছুটা আবেগ-উচ্ছ্বাস, তবে তাদের সম্পর্কের ফিকে হয়ে যাওয়া ভাবটা আলোকিত হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় নেয় না, কারো কারো সাথে শুধু চোখে চোখ। তবুও আসে, হয়তো মনের এলোমেলো চলাফেরার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে, শরীরটাকেও একটু ঘোরাঘুরি করাতে।

আজ বিকেল শেষের দিকে লোকটি আপন খেয়ালে মানুষে জমজমাট চা-স্টলগুলোর পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, এমন সময় পরিচিত কেউ তার নাম ধরে ডেকে ওঠে। সে হাঁটা থামিয়ে তার পরিচিত জনের পাশে বেঞ্চে বসে; দু-একটা কথাবার্তার পর আর কথা এগোয় না। পরিচিতের পাশে নিশ্চুপ বসে থাকার সময়টুকুতে সে এককাপ চা আর একটা সিগারেট শেষ করে। কিছুক্ষণ পর পরিচিতজন পাশের জনকে সাথে নিয়ে উঠে যায় আর লোকটি কোনো এক অজানা কারণে একাই বসে থাকে।

এখানে নিঃসঙ্গ বসে থেকে লোকটির খুব একটা খারাপ লাগে না। নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করার যথার্থ সামর্থ্য তার আছে এবং বেশ কয়েক বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন সঙ্গহীন থেকে এখন এরকমটাতেই বেশ অভ্যস্ত সে। এমনকি যখন তার অনেক অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধব ও বেশ কিছু কাছের জন ছিল এবং দিন-রাতের অধিকাংশ সময় কেটে যেত নানা ধরনের আড্ডায় নিজেকে ও অন্যদেরকে মাতিয়ে রাখায়, সেই সময়টাতেও সে ক্ষণিকের জন্য হলেও একা হতে চাইত, পছন্দ করত, তার ভালো লাগত।


সঙ্গীটির সাথে মানসিক সঙ্গমে একধরনের আত্মরতি লাভ করে সুখের অত্যুঙ্গে উঠে যাওয়া লোকটার একটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।


লোকটির এই একাকিত্ব, তা কি পুরোদস্তুর? নিশ্চয় তা নয়। একা থাকার কালেও তার একজন সঙ্গী থাকে, সঙ্গীটি সে নিজেই বা নিজের অস্তিত্বেরই একটা অংশ। সঙ্গীটি সবসময় তার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করে, তবে একটু লাজুক প্রকৃতির কিনা; লোকটির চারপাশে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলেই মাথা নিচু করে দূরে সরে যায়, গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে থাকে, জোর করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আসা তার ধাতে নেই। লোকটির আশপাশ শূন্য হলেই কেবল গ্রাম্য গৃহবধূর মতো সলজ্জ হাসি মুখে মৃদু পায়ে এসে তার নিজ স্থানে বসে। বেশ কয়েক বছর ধরে লোকটির মনোরাজ্য পুরোপুরি তার আওতায়, ভাগ বসানোর কেউ নেই—এই ভেবে তার স্ফূর্তি অশেষ। তার এই সঙ্গীটির সাথে মানসিক সঙ্গমে একধরনের আত্মরতি লাভ করে সুখের অত্যুঙ্গে উঠে যাওয়া লোকটার একটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এরকম মুহূর্তে অন্য কেউ তার পাশে এসে দাঁড়ালে বা হাসি মুখে স্বাগত জানালে ভেতরে ভেতরে খানিকটা বিরক্তিই বোধ করে সে, প্রেমিক-প্রেমিকার একান্ত মুহূর্তে অন্য কেউ—যত অন্তরঙ্গ বন্ধুই হোক না কেন—চলে এলে যেমন।

নিজের সাথে নিজের সঙ্গ লাভ বাদেও মাঝে মাঝে লোকটি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে গভীর চিন্তায়, আক্রান্ত হয় নানা ধরনের উদ্ভট স্বপ্ন দ্বারাও। তবে অধিকাংশ সময়ই তার চিন্তা-ভাবনাগুলো অগোছালো, এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল। চিন্তার স্পষ্ট সূত্র খুঁজে পেতে বরাবরই ব্যর্থ সে এবং এক পর্যায়ে খুঁজে দেখার শক্তিও ফুরিয়ে যায়। প্রথম দিকে হয়তো চিন্তাসূত্রগুলোর কিছুটা পরম্পরা থাকে, তবে কয়েক মুহূর্ত বাদে সবকিছু কেমন ওলট-পালট হয়ে যায়। এভাবে চলতে চলতে একসময় চরম পুলকের শিহরন দিয়ে বের হয়ে আসে তার ভেতরে জারিত হতে থাকা চিন্তা-রস। অণুবীক্ষণিক ভাবে তাকিয়ে দেখতে পায়—নিঃসৃত চিন্তা-রসের অধিকাংশ শুক্রাণুই মৃত, আধমরা বা ভঙ্গুর। অন্য কোনো ঘনীভূত চিন্তা বস্তুর সাথে দ্বন্দ্বে মিলিত হয়ে ফল উৎপাদনে সক্ষম নয়।

এলোমেলো ভাবনার ভুবনে মাঝে মাঝেই লোকটি এমন মাত্রায় পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে যে আশেপাশের পরিবেশ সমন্ধে তার সচেতনতা লুপ্ত হয় পুরোপুরি। চিন্তার উপাদানগুলোকে যদি—মনে আশার ঝিলিক উঠে—সামান্য মাত্রায়ও সূত্রবদ্ধ করা যেত তাহলে চিন্তার জগতে মহান কিছু করে দেখানো তার পক্ষে হয়তো অসম্ভব হতো না। তবে মূল সমস্যাটা হলো ভাবনার গহিনে খানিকটা দূর প্রবেশ করতেই ভেতরকার জগতের সবকিছু কেমন যেন অন্ধকারময় হয়ে উঠে। এর ফলে তার ধারণা জন্মে- চিন্তা বা ভাবনার জগতে তার বিচরণ হয়ত একধরনের অবসন্নতার প্রবাহ বৈ কিছু নয়, চিন্তা করার এতটুকু শক্তিও বোধ হয় তার মধ্যে নেই। নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার সূক্ষ্ম ভণ্ডামির কারণেই সম্ভবত বিষণ্ণতার প্রবাহকেই ভাবনার জগতে বিচরণ মনে করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি লাভ শুধু। তবে এটাও ঠিক—হঠাৎ দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে সে কল্পনার মোলায়েম টানে ভাবনার রশিগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে বেশ কিছু দূর এগিয়ে নেয়; তবে কতক্ষণের জন্যই বা, নিজের অজান্তেই কোথা থেকে নানা ধরনের দুঃখ বিলাস, রঙচঙে মনোবাসনা, সামান্য প্রয়াসের কাজে অন্যদের ব্যাপক প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা, অবিরত গুঞ্জনরত নানা ধরনের ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রেম-ভাবালুতা প্রচণ্ডভাবে দৌড়ে এসে নানা দিক থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে পারমানবিক বোমার মতো চক্রে চক্রে ভাবনার সুশৃঙ্খল রশিগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। লোকটি ভাবনার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়; মুখ থুবড়ে পড়ে আবর্জনা ও পঙ্কে ভরা অগভীর ডোবায়। পর মুহূর্তেই চিন্তাসূত্রগুলোকে সে আর কোথাও খুঁজে পায় না; তবে গুটিকতক উদ্ধার করতে পারলেও সেগুলোকে ছিন্ন ভিন্ন অবস্থায় মনোভূমিতে পড়ে থাকতে দেখতে পায়। তবুও অন্যদের সাথে কথা বলার মুহূর্তে অথবা নিজের সাথে নিজেরই কথোপকথনে কোনো পরিণত হয়ে ওঠা চিন্তা বের হয়ে এলে সে ধন্ধে পড়ে যায়—রাশি রাশি স্মৃতি হাতড়েও ভাবনাটির পরিপক্বতা লাভের মুহূর্তটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না কোথাও। তবে কি অবসন্নতার প্রবাহ চলাকালীন সময়ের কোনো এক ক্ষণে ভাবনার কতকগুলো উপাদান আলগোছে সাধারণীকরণ হয়ে অচেতন জগতের কোনো এক কোণে অবহেলায় পড়েছিল দীর্ঘদিন বা স্বল্প সময়, আজকে নিজেকে প্রকাশের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে তাকে অবাক করে দিয়ে গর্তের অনেক গভীর থেকে ফণা তোলা সাপের মতো উঠে এসেছে। ফলে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে লোকটির মধ্যে। লম্বা রাস্তার মতো সামনে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ সময়ে সে চেষ্টা করে ভাবনার উপাদানগুলোকে যথাসম্ভব সূত্রবদ্ধ রাখতে এবং বার বার ব্যর্থ হয়ে অবসন্নতার প্রবাহে মিশে যেতে থাকলেও হয়তো এরই মধ্যে নতুন ভাবনা জারিত হয়ে উঠছে মনে করে খানিকটা আত্মপ্রসাদ লাভ করে।

একা থাকার মুহূর্তগুলো বেশ মউজেই কাটে লোকটির, মাঝে মাঝে ছাড়া খুব বেশি খারাপ লাগা বোধ কাজ করে না তার মধ্যে। তবে চারদিকের এই কোলাহলময় পরিবেশে একাকী হয়ে পড়ার ব্যাপারটা আলাদা—এসময় তার বেশ অস্বস্তি বোধ হয়। রমজান মাসে ইফতারের সময় রোজাদারদের ভিড়ে রোজা-না-রাখা কোনো লোক ক্ষুধার্ত বা পিপাসার্ত বোধ না করা সত্ত্বেও অন্তত একঢোক পানিও যদি পান না করে তাহলে যেমন অস্বস্তি হয় এই অস্বস্তিটা অনেকটাই ঠিক সেরকম। আশেপাশের সবাই যখন চাড়িয়ে চাড়িয়ে একে অপরের সঙ্গসুখ লাভে মশগুল তখন একা একা বসে থাকাটা ঠিক যেন মানায় না। আর নিজস্ব ভাবনার জগতে তার হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই অস্বস্তিবোধ একটা বড় বাঁধা। এধরনের পরিস্থিতিতে সে চারদিকটা ভালোভাবে দেখে নেয় এই আশায় যে কোনো কিছু তার বিরক্তির উদ্রেক করে কিনা। অতঃপর সেই বিরক্তি উদ্রেককারী উপাদানটির দিকে তার নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা—নিজের চারপাশে একধরনের বিরক্তির দেয়াল তুলে খুব সহজেই ভিন্ন কোনো জগতের গভীরে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা। মনের অবচেতনেই এই কাজটি করে থাকে সে। আর অস্বস্তি খুব বেশি মাত্রায় ঘনীভূত হয়ে উঠলে সেখান থেকে চুপটি করে সরে পড়াটাই অপরিহার্য বলে মনে হয়। তবে আজকের এই মুহূর্তটি কেন জানি একটু অন্য রকম, বিরক্তি উদ্রেককারী উপাদান খোঁজার কোনো প্রয়াস অনুভূত হচ্ছে না এবং জোরাল চেষ্টা সত্ত্বেও এখান থেকে উঠে যেতে পারছে না। মনে হচ্ছে যেন শক্তিশালী আঠা দিয়ে বেঞ্চটির সাথে তাকে আটকে রাখা হয়েছে আঁটোসাঁটো ভাবে। লোকটি এখনও উবু হয়েই বসা এবং মাঝে মাঝে শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়—তার চারপাশে পরস্পরের সঙ্গসুখে ঝলমল করতে থাকা মানুষগুলোকে দেখে নেয়ার অভিপ্রায়ে।

তারপর ধীরে ধীরে অনেক লোকের মাঝে একা থাকার অস্বস্তিটা কমতে শুরু করে, ভিন্ন এক আনন্দময় জগতে ঢুকতে শুরু করে সে। একা থাকলে অস্তিত্বের যে অংশটা এগিয়ে এসে তার সাথে মিলিত হয় সেও যেন কোনো এক ফাঁকে মিলিয়ে গেছে—দিগন্ত প্রান্তেও তার দেখা মিলছে না আর অথবা পুরোপুরি সংশ্লেষিত হয়ে গেছে নিজের মাঝে নিজেই। নতুন আমেজের এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করতে করতে, এই আবেশিত মুহূর্তে, লোকটি শুধু মনে মনে নিবিড়ভাবে প্রার্থনা করে—পরিচিত কারো চলে আসার কারণে তাকে এই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে না হয়। অবারিত এক আনন্দ সাগরের দিকে স্রোতের টানে অবিরাম এগিয়ে চলা টের পেতে থাকে সে। কিছুক্ষণ কাটার পর সে বুঝতে পারে যে নিজেই যেন পরিণত হয়ে উঠেছে অস্তিত্বহীন একটা বিশালাকার অস্তিত্বে। নিজস্ব বোধেরা এখন তার মধ্যে পুরোপুরি অনুপুস্থিত। ভেতরটা সম্পূর্ণরূপে শূন্য এবং পরিণত হয়েছে সমুদ্রের মতো এক গভীর আধারে। খানিক বাদেই চারপাশের লোকজন তাদের সকল অনুভূতিসহ একে একে প্রবেশ করে তার ভেতরে বিচরণ শুরু করে যেমনভাবে সমুদ্রের তলদেশে বিভিন্ন ধরনের মাছ, কীট-পতঙ্গ ও জলজ প্রাণী নিজেদের খেয়ালে ঘুরে বেড়ায়। লোকটি এবার টান টান সোজা হয়ে চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে তার চারপাশের মানুষদের—এখনও যারা প্রবেশ করে নি—দু-হাতে আহ্বান করে ভেতরে নিয়ে আসতে আরম্ভ করে। সুচের মতো সূক্ষ্ম অনুভূতির জেগে উঠার মাধ্যমে সে বুঝতে পারে এক অলৌকিক মোহাচ্ছন্নতার বলয় তার অনতিদূর চারপাশটাকে ঘিরে চক্কর খাচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট ত্বরণে। এরই মধ্যে তার ভেতরে চলাফেরা করতে থাকা মানুষদের চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের ভেতরটা বুঝে নেয়ার চেষ্টায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে সে। তাদের যে অনুভূতিগুলো সে বুঝে নিতে পারে সাথে সাথে সেগুলো রূপান্তরিত হয় তার নিজস্ব অনুভবে। অনেক মানুষ—সকল সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, চিন্তা-ভাবনা, কল্পনাসহ—তার ভেতরে অবস্থান নিয়েছে বলে তার ভেতরটা হয়ে ওঠে অনেক ভারি। শুধুমাত্র নিজের অনুভূতির ওজনেই যেখানে মানুষের ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়, সেখানে তার ভেতরে কত মানুষের অনুভূতির ভার! তার মনে হয়, অনেক দ্রুত গতিতে দেবে যাচ্ছে সে, হাদিসে কথিত কারুণ নামক এক অভিশপ্ত ব্যক্তির মতো, যে যাকাত পরিশোধ না করার পাপে নিজের বিশাল পরিমাণ সম্পদের নিচে চাপা পড়ে মাটিতে দেবে গিয়েছিল। বলা হয়, কেয়ামত পর্যন্ত সে দেবে যেতে থাকবে। লোকটির মনে হতে থাকে, কারুণের মতো এই দেবে যাওয়ার হাত থেকে যেন তার নিস্তার নেই। তবে সে নিজেকে আশীর্বাদপুষ্ট মনে করে। যেন নিঃসঙ্গের দেবতা খুশি হয়ে তাকে এই দেবে যাওয়ার বর প্রদান করেছে। এই ক্রান্তি মুহূর্তেও সে তার ভেতরে অবস্থান নেয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে নিবিষ্টভাবে।


অনেক লোকের মাঝে সঙ্গহীন থাকলে যে অস্বস্তিবোধটা তাকে ছেঁকে ধরে তাও কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে গ্রাস করে ফেলে।


লোকটি অন্তর্গতভাবে দেখতে বা অনুভব করতে পারে যে নানা ধরনের অনুভূতি একেক জনের মধ্যে জট পাকানো অবস্থায় গতিশীল। এবং অতঃপর ধীর পরিক্রমায় সকলের সমস্ত অনুভূতি মিলিত হয়ে তার ভেতরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অনুভূতিগুলো তার অন্তরতলকে ঘিরে ছেঁড়া মেঘের মতো এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়। আবার কখনো—নানা রঙা অসংখ্য অনুভূতি একে-অপরের সাথে মিশে গিয়ে রূপান্তরিত হয় বর্ণালি ঘন তরলে। তারপর পাহাড়ী ঝরনার মতো ছড়ছড় করে নেমে আসে তার মনোভূমিতে; ভিজে যায় তার শরীর-মনের প্রত্যেকটি কোষ এবং ভরে যেতে থাকে প্রত্যেকটি কোষাভ্যন্তর। এই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন অনুভবের মানস চিত্র বা মানস ক্রিয়া একের ভেতর থেকে আরেকটি পরিস্ফুট হয়ে উঠতে থাকে, একে অপরের মাঝে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয় বা মুছে যেতে শুরু করে, কখনো-বা একটার উপর আরেকটা সুপার ইমপোজ হয়ে থাকে, অথবা একই সাথে পাশাপাশি অবস্থান নেয় বা ক্রিয়া করতে থাকে। ঘোর লাগা ভাবের মধ্যে শুধু এতটুকুই পরিষ্কার বুঝতে পারে যে এখন সে সুনির্দিষ্ট কেউ নয়, সবাইতে পরিণত হয়েছে। অপরদেরকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে তার। তার একাকিত্ব মিলিত হয়েছে দীর্ঘ প্রত্যাশিত বহুত্বের মোহনায়।

সামান্য কিছুক্ষণ মাত্র, ধীরে ধীরে নিচের সবকিছুকে অনালোকিত করে আগুনের সরু শিখার মতো মৃদু কাঁপতে কাঁপতে জেগে ওঠে একটা সুর। আরো বেশি বেশি মানুষকে তার ভেতরে ডেকে আনার আয়োজনে চারদিকে ঘুরতে থাকা লোকটির উৎসুক চোখ দুটোও ধাবিত হয় সুরের উৎসের দিকে, সেখানেই স্থির হয়—একটি তরুণী তার সমস্ত আবেগ মিশিয়ে গান গাচ্ছে। সুরটি উচ্চাঙ্গ হতে শুরু করলেই মেয়েটির অধোমুখ ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বগামী হয় যেন ঠোঁট স্ফুরিত সুরটির অদৃশ্য সূক্ষ্ম সুতার মতো টানে কোমল মুখাবয়বটি আলতোভাবে উপরের দিকে উঠছে। সুরের এগিয়ে চলার বিভিন্ন বাঁকে নানা স্পন্দনের সাথে সাথে মেয়েটির নাকের পাতার তিরতির করে কাঁপা এবং ফুলে ফুলে উঠা এই মৃদু আলোর মধ্যে বেশ দূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়। মনে হতে থাকে শুধু মুখগহ্বর থেকেই নয় সমস্ত মুখমণ্ডল বিশেষ করে চোখ হতে এঁকে-বেঁকে ঢেউ খেলিয়ে বের হয়ে আসছে সুরের অবিরল ধারা। চারপাশের কোলাহলের কারণে লোকটি গানের কথাগুলো খুব স্পষ্ট শুনতে না পেলেও সে গানটিকে ঠিকই দেখতে পায়—গান গাওয়ার মুহূর্তে মেয়েটিকে দেখে নেওয়ার মাধ্যমেই সে গানটিকে দেখতে থাকে নিবিড়ভাবে। মেয়েটির মুখের ত্বকের শ্যামল রঙের সাথে যেন গানটির সবুজাভ মিলেমিশে জড়াজড়ি; সাথে মিশেছে পরিবেশের আলো-আঁধারি।

লোকটির মনে হয়, সুরটির স্রষ্টা যদি মৃত্যুর অপর প্রান্ত থেকে উঠে এসে এই মুহূর্তে মেয়েটির পাশে সকলের অলক্ষিতে দাঁড়িয়ে নিজেরই তৈরি করা সুর উপভোগ করতে পারত, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে জুড়াত তার শিল্পী জীবনের সকল বেদনা এবং শিল্প-অস্থিরতা উত্তীর্ণ হতো অনুভবের প্রশান্তিতে! শিল্পীদের কি দুইটি জীবন থাকা উচিত নয়? এক জীবন ধরে শুধু সৃষ্টি করে চলা, আরেক জীবন ভরে তার সৃষ্টি উপভোগের পালা। এই ভাবনার পিছু পিছু একটা আত্মভাব জেগে ওঠে, এই মেয়েটি যদি এখন তার সৃষ্টি করা কোনো সুর গাইতে আরম্ভ করে আর সে যদি তা এখানে বসে বসে উপভোগ করার সুযোগ পায়, তাহলে কেমন হয়! আত্মভাবটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা, পাতায় বিস্তার হয়ে দাঁড়ালে গানটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে একসময় বুঝতে পারে একাকিত্বে বহুত্ব ভাবটা বেশ কিছুক্ষণ হলো তার মধ্যে আর নেই। নিজস্ব অনুভূতিগুলো ফিরে এসে ইতোমধ্যেই তার ভেতরে আনাগোনা শুরু করে দিয়েছে, খানিকবাদেই হুলস্থুল বাঁধাবে। একা থাকার কালে নিজের যে অংশটা তাকে সঙ্গ দেয় সেও এগিয়ে আসছে অধোমুখে। অনেক লোকের মাঝে সঙ্গহীন থাকলে যে অস্বস্তিবোধটা তাকে ছেঁকে ধরে তাও কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে গ্রাস করে ফেলে। লোকটি বুঝতে পারে বেঞ্চটির সাথে তার আটকে থাকা সেটাও গিয়েছে আলগা হয়ে। লোকটি আর মুহূর্তমাত্র বসে না থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। এরপর নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে গানটিকে পাশ কাটিয়ে সকলের অলক্ষ্যে যেমন বসে ছিল তেমনি সবার অগোচরে হেঁটে চলে চায়।

মেহেদী হাসান

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৮৩; টাংগাইল। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক, সম্মান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই—

অসময়ের গল্প [গল্প, সাকী পাবলিশিং ক্লাব, ২০১৩]

ই মেইল : mehedihassan1952@gamil.com

Latest posts by মেহেদী হাসান (see all)