হোম গদ্য গল্প উত্তর-আধুনিকার প্রেমগাথা

উত্তর-আধুনিকার প্রেমগাথা

উত্তর-আধুনিকার প্রেমগাথা
673
0

১.
গল্পকার বাতেন বখত্‌কে ‘বাম্বালিকা আধুনিক নওজোয়ানের প্রতি প্রেমার্ত’—গল্পের শিরোনামটি বদলে দিতে বলেছিল সাহিত্য সম্পাদক সরোদ নিনাদ।
কিন্তু গল্পকার তাতে রাজি হন নি। তিনি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, গল্পটি যেভাবে আছে, ছাপতে চাইলে সেভাবেই ছাপতে হবে। একটি বর্ণও বদলানো যাবে না।
বাতেন বখত্ নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য গল্পকার। ছোটগল্পে তাঁর সুদৃঢ় অবস্থান। আশি, নব্বই—এমনকি শূন্য দশকের লেখকদের সাথে তাঁর প্রাণবন্ত রিস্তা, ওঠা-বসা। ক্লাব, বার কিংবা তাঁর নিকেতনের সুবৃহৎ ফ্ল্যাটে গভীর রাত পর্যন্ত নিয়মিত আড্ডা দেন। সাহিত্যের হোমড়াচোমড়া থেকে—সদ্য লিখতে আসা তরুণরাও থাকেন সেসব আড্ডায়।
দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আড্ডা জমিয়ে রাখতে তাঁর জুড়ি নেই। প্রচুর পান করেন, পানের সাথে কথাও বলেন প্রচুর—ইনকাম ট্যাক্স কমিশনার—এই গল্পকার। বলতে কী,—তাঁর পড়াশোনা আর জানাশোনার বহরও বেশ সমৃদ্ধ। সুপরিচিত একটি সাহিত্যিক সার্কেলে তুখোর আড্ডাবাজ হিসেবে তাঁর যেমন বিশেষ সুনাম রয়েছে তেমনি কেউ কেউ তাঁকে বর্তমান ঢাকাই সাহিত্য-সিন্ডিকেটের প্রধান মডারেটরও মনে করে।
এরই মধ্যে তিনি বাগিয়ে নিয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য বেসরকারি পুরস্কারগুলো ঘরে তুলেছেন বেশ আগেই। তাঁর দৃষ্টি এখন একুশে পদকের দিকে। অচিরেই সেটাও চলে আসবে।

সরোদ নিনাদ একটি গল্প চেয়ে অনেক দিন ধরে বাতেন বখত্কে নক করে আসছিল।
অবশেষে এই গল্পটি পেয়ে তার ধন্য হওয়ারই কথা।
তাছাড়া কারো কাছ থেকে চেয়ে আনা লেখা বাতিল করা বা সেই লেখার কোনো লাইন পরিবর্তন করে ছাপিায়ে দেওয়া নীতি বিরুদ্ধ কাজ। এর জন্য লেখকের কাছে আব্দার করাও চলে না।
এ-রকম হলে সাহিত্যাঙ্গনে সরোদের নামে বদনাম রটবে। বাতেন বখতের নবীন ভক্তরা সরোদের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়ে ব্যঙ্গ করবে : ‘দুই দিনের বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন।’
শুধু এটুকুই নয়, সরোদ জানে,—বাতেন বখতে্‌র হাত বেশ লম্বা, সুযোগ মতো অক্টোপাসের মতো তার টুটি চেপে ধরবেন। এমনকি ঢাকা শহর ছেড়ে যাওয়ার হুলিয়া জারি করেও বসতে পারেন সরোদের নামে।
তবে, বাতেন ভাই যেহেতু সুলেখক এবং দৈনিকে কম লেখেন, তাই তাঁর গল্প কোনো দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ছাপা হওয়া মানে শুক্রবারের জন্য একটি ঘটনা। সে কারণে সরোদ এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায় না। বরং দৈনিকের সাহিত্য পাতায় দুর্বিসহ খরার দিনে বাতেন বখতের গল্প ছেপে সে হয়ে উঠতে চায় উজ্জ্বল নক্ষত্র।
কিন্তু তার মনে ভয়! চাকরি হারানোর ভয়!


নারী শরীর জংলার ধারে ফুটে থাকা জংলি গোলাপ নয় যে, কোনো ভ্রমর চাইলেই বসতে পারবে কোমল পাপড়িতে।


গল্পের প্রথম লাইনই গল্পের শিরোনাম। সংস্কৃতি এবং ধর্মকেন্দ্রিক সূক্ষ্ণ একটি বিদ্রূপ বা শ্লেষের আভাস মেলে ছোট্ট এই লাইননটিতে। সরোদের ধারণা, প্রথম লাইন পড়ার পর কোনো পাঠক দ্বিতীয় লাইন না-পড়ে থাকতে পারবে না। তৃতীয় লাইনের পর চতুর্থ লাইনে ঢুকে যাবে তরতর করে। অর্থাৎ পাঠকরা গল্পটা লুফে নেবে। নিশ্চিত হিট হবে গল্পটা।
এসব সত্ত্বেও সরোদ নিনাদ দমে যায়। তার মনে হতে থাকে,—এ গল্প ছাপা হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাবে। তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে দেশে। শুধু মোল্লারা নয়, প্রগতিশীলরা চড়াও হবে গল্পকারের ওপর। শুধু কি গল্পকারই চড়াওয়ের শিকার হবেন? পত্রিকা বা সাহিত্য সম্পাদককে কি সবাই ছেড়ে দেবে? নিশ্চয়ই না।
সরোদ তার কল্পনায় একটার পর একটা স্ট্যাটাস-ঝড়ের চিত্র দেখতে পায় ফেসবুকের পাতায় পাতায়। সেইসব স্ট্যাটাস ঝড়ে বাতেন বখত্‌, দৈনিক স্বাগতম, স্বাগতমের সাহিত্য পাতা এবং নিজেকে—ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যেতে দেখে। বড় অসহায় লাগে তার!

এর আগে—দৈনিক মুক্ত আলো বেশ কয়েকবার এ-রকম তোপের মুখে পড়েছে।
সরোদ নিনাদ শোনাশুন জেনেছে,—হযরত ঈসা আ.-এর কার্টুনকে কেন্দ্র করে টসটসে রস পাতার সম্পাদক মনোরঞ্জন ধর চাকরি হারিয়েছিলেন। জনৈকা নারী সাংবাদিককে নিয়ে আবুল হাই করিমের লেখা অত্যন্ত সমালোচিত একটি গল্পের কারণে চাকরি হারিয়েছিলেন সাহিত্য সম্পাদক আখতারুজ্জামান হাড্ডি খিজির।
সর্বশেষ শরীর নিবন্ধের জন্যে অধ্যাপক আহসানুল্লা আবু মঈন আর মুক্ত আলো যে পরিমাণ তোপের মুখে পড়ল, ভাগ্যিস হুজুররা চুপ ছিলেন। না-হলে মুক্ত আলোর নারী পাতার আলো আর রূপের বল্লরি কবেই না ধপ করে নিভে যেত! চাকরি যেত সম্পাদকের।
না। সরোদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এমনটা হতে দেওয়া যাবে না। সে একটি কন্যা সন্তানের জনক। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
ওদিকে গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন তার বৃদ্ধ মা-বাবা। মাসের শুরুতেই তাঁদের হাত খরচ বাবদ চার হাজার টাকা বিকাশ করতে হয়। চাকরি চলে গেলে পুরো পরিবারসমেত তাকে পথে বসতে হবে।

বছর বিশেক আগে, বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এম.কম. পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল আব্দুল কুদ্দস ওরফে আজকের সরোদ নিনাদ।
স্বপ্নের ঢাকায় পৌঁছনোর পর প্রথম দিন কাটিয়েছিল সদরঘাটেই। তারপর ঢুকে পড়েছিল শ্যামবাজারের কাঁচা তরি-তরকারির আড়তে।
পকেটে ছিল জামাল চাচার লেখা একটা চিরকুট। চিরকুট মিলিয়ে ঠিক ঠিক পৌঁছেছিল আলাবক্স মৃধার ঠিকানায়।
এই আলাবক্স মৃধা ছিলেন জামাল চাচার বাল্যবন্ধু। তার কারণে অনায়াসেই কাজ পেয়ে গিয়েছিল আলাবক্স মৃধার আড়তে।
দূর-দূরান্ত হতে ছালার বস্তায় বা টুকরি ভর্তি যত কাঁচামাল আসত, সেগুলো কুলিরা নৌকা থেকে এনে প্রথমেই বড় পাল্লায় তুলে মাপ দিত।
সরোদের কাজ ছিল টালি খাতায় প্রতিটি বস্তা বা টুকরির ওজন লিপিবদ্ধ করা। পাশাপাশি বস্তা বা টুকরির গায়ে লাল কালি দিয়ে প্রতিটির ওজন লিখে দেওয়া।
আড়ত খোলা থাকত ২৪ ঘণ্টা। তাই সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হতো তাকে। নাওয়া-খাওয়া কোনোটাই ঠিক মতো করতে পারত না।
ঢাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল ঠিকই কিন্তু বছর খানেকের মধ্যে প্রচণ্ড কষ্টে তার শরীর ভেঙে পড়েছিল। আর হোটেলে খেতে খেতে গ্যাস্ট্রিক রূপ নিয়েছিল আলসারে। শেষে ভর্তি হতে হয়েছিল স্যার সলিমুল্লাহ্‌ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এরমধ্যে বাংলা বাজারের রসগোল্লা প্রকাশনীর হানিফ আলীর সাথে পরিচয়।
আড়তের কাজ বাদ দিয়ে কিভাবে যেন রসগোল্লা প্রকাশনীতে কাজ শুরু করা, একই প্রকাশনী থেকে বিধ্বস্ত নীলিমা নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা এবং কাব্যের চাপে কিংবা নতুন ভাগ্যের তাড়নায় দক্ষিণ ঢাকা থেকে মধ্য ঢাকায় চলে আসা হয় সরোদ নিনাদের।
তারপর শাহবাগ আজিজ মার্কেটে দিনের পর দিন আড্ডা দেওয়া, গাঁজা খাওয়া এবং কোনো একদিন দৈবক্রমে মাখরাজ ভাইয়ের সাথে পরিচয়। পরিচয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই দৈনিক স্বাগতমের বর্তমান উপ-সম্পাদক মাখরাজ খান হয়ে পড়েন সরোদের দ্বিতীয় মা-বাবা।
মাখরাজ খানের কল্যাণেই ঘুরে যায় তার ভাগ্যের চাকা। তাঁর কারণেই সে আজ এত বড় একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। অবশ্য সে নামেমাত্র সম্পাদক। সবটা তদারকি করেন মাখরাজ খান নিজেই। সরোদ তাঁর নির্দেশগুলো কেবল পালন করে মাত্র। তা হোক।
এই চাকরিটি সরোদের কাছে সোনার হরিণের মতো। বহু সাধনার পর ভাগ্যে জুটেছে এমন চাকরি। জীবন দিয়ে হলেও সে এই চাকরি রক্ষা করবে। কোনোভাবেই বেহাত হতে দেবে না।

মনের অজান্তেই পুরনো তিক্ত স্মৃতি জাবর কেটে এবং বর্তমান মধুর হালচালের কথা চিন্তা করে পঁয়তাল্লিশে পা দেওয়া সরোদের হার্টবিট তুঙ্গে উঠে যায়। চিনচিনে একটা চিকন ব্যথা শুরু হয় ঘাড় থেকে শিরদাঁড়া পর্যন্ত। চোখে ঝিকিমিকি সর্ষেফুল দেখতে থাকে। ভীষণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে সে!
ডেস্কের কাগজপত্রের স্তূপের পাশে অনেকক্ষণ ধরে চায়ের কাপ ঠান্ডা হচ্ছে। সেদিকে মন নেই সরোদের।
মনিটরে ভেসে রয়েছে বাতেন বখতে্‌র গল্পটি। চৌদ্দ ফন্টের একেকটা লাইনের ফাঁকা স্পেসগুলোতে যেন ক্যাক্টাসের চিকন কাঁটা বিছানো। ছোঁয়া লাগলেই ফুটে যাবে ত্বকে।
সে মনিটর থেকে চোখ সরায় না। চেয়ে থাকে। ঝাপসা চোখে গল্পের লাইনগুলোতে চোখ বুলিয়ে চলে :

[‘কী প্যান্ট-শার্ট, কী শাড়ি—কোনোটাই আর ভালোলাগছে না শ্রেয়সীর।
বাহারি রঙের টি-শার্টের ওপর বোতাম খোলা সুতি চেকশার্ট পরা ছিল শ্রেয়সীর ইউনিভারসিটি লাইফের ফ্যাশন। বলতে গেলে এই কস্টিউমেই সে পুরো ছাত্রজীবন কাটিয়েছে। বাম রাজনীতি করেছে। অবশ্য বিভিন্ন অকেশান যেমন—একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন কিংবা ভালোবাসা দিবসে পরেছে শাড়ি। যেমনি প্যান্ট-শার্টে, তেমনি শাড়িতে,—শ্রেয়সী সবসময় হাজার তরুণের ঘুম নষ্ট করা মোহময় ও নজরকাড়া উদীপ্ত তরুণী!
বিয়ের পর সঙ্গত কারণেই প্যান্ট-শার্ট পরা অনেকটা কমে এসেছিল। প্যান্ট-শার্টের জায়গা দখল করেছিল চোলি আর লেহেঙ্গা। বাইরে বেরুলে শাড়ি।
কিন্তু এসব আর একদমই ভালোলাগছে না তার। ইদানীং হিজাবটাই বেশি ভালোলাগছে। মিহি সুতায় বোনা বাহারি রং আর নানান ডিজাইনের হিজাবের মাঝখানে মুখখানাকে যেন ফুটন্ত গোলাপের মতো মনে হয়। কী পবিত্র!
নারী শরীর অমূল্য সম্পদ। ভীষণ মোহনীয়। এই অপরূপ মোহনীয় শরীর যত্রতত্র, যাকে-তাকে দেখিয়ে সস্তা করার জন্যে মহান আল্লাহতালা সৃষ্টি করে নি। এ শরীর শুধু একজনই দেখতে পাবে, যাকে সে স্বেচ্ছায় দেখাতে চায়। নারী শরীর জংলার ধারে ফুটে থাকা জংলি গোলাপ নয় যে, কোনো ভ্রমর চাইলেই বসতে পারবে কোমল পাপড়িতে, পান করতে পারবে রূপ-রস-অমৃত সুধা।

শ্রেয়সীর ভালোলাগছে না—ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক, রবীন্দ্র সংগীত। ভালোলাগছে মন পাগল করা দূর আরবের কোনো মোহন সুর।’]

গল্পের এই অংশটি পড়ে সরোদ চমকে ওঠে।
লেনিন, কনফুসিয়াস ও স্তালিনের নিবিড় পাঠিকা আচমকা কী কারণে ধর্মের প্রতি এতটা অনুরাগী হয়ে উঠছে? নাকি কালচারাল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে নিজেকে নতুন করে দেখার সুযোগ নিচ্ছে শ্রেয়সী?
এতবড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বাতেন ভাই-ই বা কী বার্তা দিতে চাইছেন পাঠকদের?
তবে এটা ঠিক যে, গত এক দশকে দেশের নারীদের হিজাব ব্যবহারের পরিমাণ প্রচণ্ডরকম বেড়েছে। ঢাকার অভিজাত শিক্ষিত সোসাইটি থেকে মফস্বল, গ্রাম, এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অসংখ্য তরুণী হিজাবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
তাই বলে শ্রেয়সী কেন? নাকি এটা তার তুলনামূলক ছোট দল থেকে বৃহৎ দলে নিজেকে সামিল করার প্রয়াস?

২.
সম্পাদকীয় পাতার ইনচার্জ শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমি চাই, গল্পটা ছাপা হোক। এই দুঃসময়ে এ-রকম একটা গল্প ছাপা হওয়া খুবই দরকার।’
আর্টিস্ট মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘কিন্তু আমি চাই না ছাপা হোক।’
শাহরিয়ার আলম অবাক হয়ে বলেন, ‘আরে তুমি দেখছি আর্টিস্ট হয়ে কাঠমোল্লাদের মতো কথা বলছ!’
মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘না না আলম ভাই। এটা আমার প্রতি আপনার একটা ভুল অবজারভেশন। আমি মনে করি, বাতেন ভাই খুবই বাজে একটা গল্প লিখেছেন।’
‘কী কারণে বাজে গল্প, ব্যাখ্যা দাও?’—বলে সিগারেট ধরান শাহরিয়ার আলম।
টেবিলে রাখা প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে তাতে আগুন সংযোগ করে মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘ব্যাখ্যার কিছু নাই আলম ভাই। গল্পটা আপনি যেমন পড়েছেন, আমিও তেমনি পড়েছি। সুতরাং আপনি জানেন, এই গল্পের বাজে দিকটা কোথায় আছে!’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘না। আমি এই গল্পে কোথাও কোনো বাজে দিক খুঁজে পাই নি। বরং এটা পড়ে মনে হয়েছে, এভরি থিং ইজ ওকে। এটা একটা সময়োপযোগী গল্প। আধুনিক গল্প।’
সরোদ নিনাদ এতক্ষণ চুপচাপ দুজনের কথা শুনছিল।
শাহরিয়ার আলম সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দেন সরোদের দিকে।
সরোদ একটি সিগারেট নিয়ে ধরায়।
মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘কিভাবে এটা আধুনিক গল্প হলো, বলেন আলম ভাই?’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘সেটা পরে হবে। তার আগে তুমি বলো, গল্পটা কেন বাজে হইছে? আমি তোমার কাছে আগে জানতে চেয়েছি। সুতরাং তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর আগে দিবা।’
কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে পড়ে যায় মোজাক্কের হোসেন। পিটপিট দৃষ্টিতে সরোদের দিকে তাকাতে থাকে।
সরোদ কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না।
শাহরিয়ার আলম আর মোজাক্কের হোসেন—এই দুজনের মতামত নিয়ে গল্পটার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছবে,—সে চিন্তা থেকেই অফিস ক্যান্টিনে ছোট্ট এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সরোদ। এর বাইরে তার কিছু বলার নেই।
সরোদ গতকাল এই দুজনকে গল্পটা মেইল করে পড়ে আসার জন্য অনুরোধ করেছিল। দুজনেই কথা রেখেছেন। তাঁরা গল্পটা পড়ে এসেছেন এবং তুমুল আলোচনা করছেন।
সরোদের ভালোলাগছে। অবশ্য মনে মনে চা-নাস্তা-সিগারেটের বিলের পরিমাণটাও গুনতে হচ্ছে তাকে!
শাহরিয়ার আলম ক্যান্টিন বয়কে ধমকের স্বরে ডেকে তৃতীয় রাউন্ডের চা দিতে বলেন। তারপর মোজাক্কেরের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হাঁ , বলো, কেন এটা বাজে গল্প?’
শাহরিয়ার আলমের সাথে সরোদও তাল মেলায়, ‘ঠিক। আলম ভাইয়ের কথা ঠিক।’
মোজাক্কের হোসেন অবাক হয়ে বলে, ‘ও! তার মানে সরোদ ভাই আপনিও মনে করেন, গল্পটি ভালো হইছে?’
সরোদ বলে, ‘আমার মতামত এখানে মুখ্য না। আমি জাস্ট শ্রোতা। আপনারা বলবেন, আমি শুনব।’
শাহরিয়ার আলম সরোদকে সমর্থন করে বলেন, ‘সরোদ ইজ রাইট। সবাই বললে শুনবে কে?’
মোজাক্কের হোসেন বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে মোবাইল স্ক্রিনে দ্রুত হাত চালিয়ে মেইলবক্স থেকে বাতেন বখতের গল্পটি বের করে এনে পড়তে শুরু করে :
[‘জানো নাভিদ, তোমার সাথে পরিচিত হওয়ার পর আমি স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছি। নিজের জীবনের পূর্বের কথাগুলো কিছুই মনে নেই আর। ছাত্র জীবনের বাম রাজনীতির আদর্শ, স্বামী-সংসার-বাচ্চা—কোনোকিছুই আর টানছে না আমাকে। শুধু তোমার প্রতি টান অনুভব করছি। গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছি, প্রকৃতি আমাদের দুজনকে একসাথে বেঁধে ফেলেছেন। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের মতো পৃথিবীর কোটি মানুষের মধ্যে থেকেও আমাদের দুজনকে এখন থেকে একই আবর্তের মধ্যে থাকতে হবে। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ নাভিদ?’
—নাভিদ তার মায়াভরা সুরমা আঁকা চোখ দুটি শ্রেয়সীর চোখে রাখল।
অচেনা সমুদ্রের শীতল হাওয়া এসে যেন লাগল শ্রেয়সীর চোখে-মুখে।
নাভিদ তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আম্মুজান তোমাকে দেখলে ভীষণ খুশি হবেন! আমাদের আলিশান বাড়িতে তিনি প্রায় একা থাকেন। তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ নেই।’
শ্রেয়সী বলল, ‘কিন্তু তিনি কেন খুশি হবেন, যেখানে আমি বিবাহিতা, তার উপর তুমি আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট এবং অবিবাহিত?’
নাভিদ হেসে বলল, ‘তুমি অযথাই চিন্তা করছ। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। তিনি মানবের সকল মুশকিল আসান করে দেন।’
‘কিন্তু আমার মেয়েটা? মানে—অপ্সরীর কী হবে?’—বলল শ্রেয়সী।
নাভিদ বলল, ‘তোমার মেয়ে তোমারই থাকবে, তোমার সাথে থাকবে। তাছাড়া তোমার মেয়ে মানে তো আমারও মেয়ে, নয় কি?’
শ্রেয়সী বলল, ‘কিন্তু অপ্সরী তো তোমার আম্মুজানের নাতনি নয়? তিনি অপ্সরীকে কিভাবে সহ্য করবেন?’
নাভিদ বলল, ‘আমার উপর এইটুকু আস্থা রাখো যে, আম্মুজান আস্তে আস্তে সব মেনে নেবেন। তিনি একজন হৃদয়বান মানুষ। প্রচণ্ডরকম আধুনিক। পরিচয় হলেই তুমি বুঝতে পারবে। মহিলা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসর জীবন-যাপন করছেন। তিনি ব্যাপারগুলো ভালোই বোঝেন। তোমাকে এত দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।’
শ্রেয়সী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
ব্যাপারটা লক্ষ করে নাভিদ বলল, ‘আমার আব্বুজানও খুব আধুনিক। গাড়ির ব্যবসা করেন। আম্মুজানের কাছে তোমার কথা শুনে অলরেডি একটি বিএমডব্লিউ উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।’
শ্রেয়সী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে নাভিদের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল, ‘তুমি কি তোমার আম্মুজানের কাছে আমার ব্যাপারে পুরোটা বলেছ?’
নাভিদ বলল, ‘যতটা দরকার—বলেছি। বাকিটা তুমি নিজে বলো, কেমন?’
নাভিদ শ্রেয়সীর হাতটা আলতোভাবে নিজের হাতে টেনে নিয়ে আলতোভাবে চাপ দিল।
নাভিদের এ-রকম নির্ভরতার স্পর্শে মোমের মতো গলে পড়ল শ্রেয়সী। সে বিবাহিতা। প্রেম, বিয়ে, দাম্পত্য জীবন—সব অভিজ্ঞতাই রয়েছে তার। কোনো স্পর্শের ভাষা অজানা নয়। অথচ নাভিদের স্পর্শের অনুভূতি তার কাছে মনে হলো একদমই অচেনা। নতুন। তারমানে কি এই, মানুষের জীবনে যতবার প্রেম আসে ততবার প্রথম প্রেমের অনুভূতি নিয়েই আসে?
শ্রেয়সী বিস্ময় ভরা চোখে পূর্ণ দৃষ্টিতে নাভিদের দিকে তাকাল। দুচোখ ভরে দেখতে লাগল নাভিদকে।
তার মনে হলো, নাভিদ যেন মোঘল আমলের কোনো বাদশাহ। শাহেন শাহ। রূপে-গুণে-যশ-খ্যাতি আর ক্ষমতায় পরিপূর্ণ একজন বাদশাহ।
শ্রেয়সী আলগোছে নিজের মাথাটা নাভিদের বুকের উপর বিছিয়ে দিল।
নাভিদের উঞ্চ ও প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে শ্রেয়সীর নিজেকে মনে হলো আরব্য রজনীর কোনো পরিণীতা! নাভিদের নিশ্বাসে ইরানি এলাচির সুগন্ধ পেল। আশ্বস্ত হলো।’]


সাহিত্যবাজারে গুঞ্জন রয়েছে, সাহিত্য পুরস্কারগুলো বাতেন বখত্—তথা তাঁর কোরামের লোকজনের হাত দিয়েই বিলি-বণ্টন হয়ে থাকে।


গল্পের নির্বাচিত অংশ পাঠ করে আর্টিস্ট মোজাক্কের হোসেন দুজনের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন এরই মধ্যে গল্পের বাজে দিকটা চোখের সামনে মালভূমির মতো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ার আলম কিংবা সরোদ নিনাদ তা এখনই দেখে নিতে পারেন।
কিন্তু শাহরিয়ার আলম শুকনো হেসে বলেন, ‘তা এইটুকুর মধ্যে তুমি বাজে কী পেলে?’
মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘আরে ভাই, একটা বিবাহিতা মেয়ে বাচ্চাকাচ্চা রেখে অন্যের সাথে পরকীয়া করছে, এটা কি ভালো কিছু হইল?’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তুমি যে কোথাও চাঞ্চ না-পেয়ে শেষে চারুকলায় পড়েছিলে, আজকে সেই প্রমাণ দিলে।’
‘মানে কী?’
‘আরে গাধা, এই গল্পের মূল সুর তো পরকীয়া নয়।’
‘তাহলে কী?’
‘ভালোভাবে পড়ো। পড়লেই বুঝতে পারবে।’
সরোদ বলে, ‘হতে পারে মোজাক্কের ভাই ব্যস্ত ছিলেন। তাই পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারেন নি।’
মোজাক্কের বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম, আমি বুঝি নি। তো আপনি বলেন, মূল সুরটা কী?
শাহরিয়ার আলম চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরান। গালভর্তি ধোঁয়া নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে ছাড়েন। তারপর বলেন, ‘যা দেখছ, তা, তা নয়। যা শুনছ, তা, তা নয়!’
মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘আপনার এই জটিল কথার মানে কী আলম ভাই?’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মানে খুব সোজা। এই গল্পে যা পড়ছ বা দেখছ—ঘটনা আসলে তা নয়। এই ঘটনার ভিতরে আরেকটা ঘটনা লুকায়া আছে। সেইটা হইল আসল ঘটনা।’
মোজাক্কের হোসেন বলে, ‘আপনি তো আরো জটিল করে দিলেন আলম ভাই। সেই আসল ঘটনাটা কী?’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘জগতে সবকিছু জলরঙের মতো না যে, ইজেলে ছিটায়া দিলেই তা চারদিকে ছড়ায়ে যাবে। যাই হোক, তোমার এতকিছু জেনে লাভ নেই। তুমি আর্টিস্ট মানুষ। আর্ট মিশাইয়া ভালো একটা প্রচ্ছদ করে দাও।’
সরোদ উৎসাহী হয়ে বলে, ‘তার মানে আপনি বলছেন, গৌরাঙ্গদাকে না দেখিয়েই গল্পটা ছাপিয়ে দেবো?’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আরে গাধা আমি বললেই তুমি ছাপবে কেন? গৌরাঙ্গদা হলেন এডিটর। মানে ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। তাঁকে বাদ দিয়ে এইরকম সেনসেটিভ একটা ইস্যু তুমি একা একা ডিল করবা কি করবা না সেইটা একান্তই তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার!’
আলোচনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মোজাক্কের হোসেন বলে ওঠে, ‘আপনি দেখি আমার শিল্পসত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেন আলম ভাই। এটা কি আপনি করতে পারেন?’
শাহরিয়ার আলম হো হো করে হেসে বলেন, ‘দেখ দেখ সরোদ, মেজোক্কের কী ক্ষেপেছে! ওর ঠোঁট দুটো কেমন করে কাঁপছে হা হা হা…

৩.
অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিল সরোদ। হঠাৎ কী মনে করে মোবাইল টিপে গল্পটি বের করে :
[‘ফেসবুকে পরিচয় এই দুই কপোত-কপোতির।
শ্রেয়সী টুকটাক কবিতা লেখে। কিংবা সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে। কিংবা কখনো কখনো চলমান কোনো বিষয়ের সমালোচনা করে।
নাভিদ তার পোস্টে লাইক দেয়। কমেন্ট করে।
এভাবেই দুজনের অন্তর্জাল পরিচিতি পোক্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু ঘটনাক্রমে বইমেলাতে আকস্মিক দেখা হয়ে যায় দুজনের। সামনাসামনি নাভিদকে দেখে, বিশেষ করে বইমেলায় নাভিদের মতো একজন নওজোয়ানকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিল শ্রেয়সী।
লম্বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা কালো দাড়িঅলা নাভিদ যখন এগিয়ে আসছিল শ্রেয়সীর দিকে, সে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। তার মনে হয়েছিল, এতদিন অযথাই এদের প্রতি বিদ্বেষ ছিল মনে! অথচ এরাও সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ করে। শিল্প-সংস্কৃতির সহিত এদেরও রয়েছে সম্পর্ক। তবে কেন এদেরকে অপাঙ্‌ক্তেয় বলে দূরে ঠেলে রাখা!’]
এ পর্যন্ত পড়ে সরোদ স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। প্যারাগুলোতে থামে। চোখ বুলায়। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়।
মেইনস্ট্রিম সাহিত্যে সরাসরি মাদরাসা থেকে আসা বা মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেকেই ঢুকে পড়ছেন। গল্পকার হয়তো ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন, সরোদ পরিষ্কার হতে পারে না।
সরোদ ভাবে, বাতেন ভাই হয়তো বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছেন না।
এ বিষয়ে তিনি খুব সূক্ষ্ণভাবে একটি প্রশ্ন করেছেন, ‘এরা কারা?’—যদিও তিনি এর কোনো উত্তর দেন নি। হয়তো পাঠকদের বুঝে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। অথবা তিনি ভেবেছেন, পাঠক নিজে নিজেই বুঝে নেবেন।
সরোদ নিনাদ এ ব্যাপারে বাতেন ভাইয়ের সাথে একমত হতে পারছে না। কেননা সাহিত্যের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ হতে পারে এর পাঠক বা লেখক। তাছাড়া বহুকাল আগে থেকেই সাহিত্যে মাওলানাদের বিচরণ। বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবদানও অনস্বীকার্য। টুপি-দাড়ি আর লম্বা জোব্বা মানেই ব্যাক তো ডেটেড নয়!
সরোদ ভাবে এই অংশটাও এডিট করা দরকার ছিল। কিন্তু কী আর করা!
এবড়োখেবড়ো রাস্তায় হেলেদুলে চলা চলন্ত বাসে বসে সরোদ ভয়ে একসার হয়ে যায়। একদিকে বাতেন বখতে্‌র ভয় অন্যদিকে পাঠকদের।

তবে একটা গোপন প্রত্যাশা তাকে জাগিয়ে তোলে। সাহস জোগায়।
সাহিত্যবাজারে গুঞ্জন রয়েছে, সাহিত্য পুরস্কারগুলো বাতেন বখত্—তথা তাঁর কোরামের লোকজনের হাত দিয়েই বিলি-বণ্টন হয়ে থাকে। ঘটনা যদি সত্যি সত্যি এমন হয় তবে সরোদ নিনাদ কি লিস্টে উঠে আসতে পারে না?—পারেই তো।
তার ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’র কথা কেউ জানে না। সেটা বাদ। ওই কাব্যগ্রন্থটি দিয়ে তার সাহিত্য মান বিবেচনা করাও যাবে না। কিন্তু তারপর নামকরা প্রকাশনী হতে পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে অনেকেই ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক ও দেশবরেণ্য সাহিত্যিক ড. হেদায়েত আলী স্বপ্রণোদিত হয়ে তার কাব্যগ্রন্থের রিভিউ লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘অনেক কবিতার ভিড়ে সরোদ নিনাদের কবিতা আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়। এই কবি এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী একটি কণ্ঠস্বর তৈরি করে ফেলেছেন!’

এর মধ্যে বাস মাটারটেক স্ট্যান্ডে এসে পড়লে গল্পের চিন্তা বন্ধ রেখে বাস থেকে নামতে হয় সরোদকে।
বাস থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে এশার আজান পড়ে।

রিমঝিমকে ঘুম পাড়াচ্ছিল শিউলি।
অসময়ে মেয়েকে ঘুম পাড়ানো দেখে সরোদ প্রায় ফিসফিস কণ্ঠে বলে, ‘কোনো সমস্যা?’
সরোদের স্ত্রী শিউলি বলে, ‘না। আজকে দুপুরে ঘুমায় নি। বলতেছিল, বাবাই এলে একসাথে ঘুমাবে!’
বলতে বলতে রিমঝিমকে শুইয়ে দিয়ে দ্রুত রান্নাঘরে চলে যায়।
সরোদ ঘুমন্ত মেয়েটার পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিশুকন্যার নরম তুলতুলে হাতটা নিজের হাতে নেয়। ঘুম মোড়ানো মেয়ের মুষ্ঠিবদ্ধ রেশমের মতো পেলব হাতটাকে মনে হয় একটি মুরগির ছানা। মনে পবিত্র অনুভূতি আসে। এ যেন আপন হাতে আরেকটি আপনের অস্তিত্ব। তার চোখ দুটো ভিজে আসে। সে উবু হয়ে চুমো খায় মেয়ের মুখে।
হঠাৎই শ্রেয়সীর মেয়ে অপ্সরীর মুখটা ভেসে ওঠে সরোদের চোখের সামনে।
তার মনে প্রশ্ন জাগে, শ্রেয়সী কেন সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছে? তার স্বামীর সাথে কি গভীর টানাপড়েন চলছিল?
সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল বের করে পকেট থেকে। গল্পে ঢুকে পড়ে। আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে—এ পৃষ্ঠা থেকে ও পৃষ্ঠা। হঠাৎ এক জায়গায় থেমে পড়ে। এই তো। —এখানটাতে লেখা আছে এ বিষয়ে :

[‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের দলের লিডার ও বড় ভাই আসিফকে ভালোবেসে পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিল শ্রেয়সী। সেই হতে পরিবারের সাথে তার বিচ্ছিন্নতা। গত তিন বছরে পরিবারের কারো সাথে তার দেখা হয় নি, কথা হয় নি। পরিবারের কেউ আজ অবধি শ্রেয়সীর সন্তানটিকে পর্যন্ত দেখতে আসেন নি।
মামা, খালা, চাচা, চাচি—কাজিনদের অনেকেই তাকে ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে ছাঁটাই করে দিয়েছে। শুধু একজন, তাকে ছাঁটাই করেন নি। সাবেক সচিব সৈয়দ আশরাফ আলী।
বাবা তাঁর মেয়েকে ছাঁটাই করতে পারেন নি। শ্রেয়সীর মা বেগম সৈয়দা জেবুন্নেসা ফেসবুকে নেই। থাকলে তিনিও হয়তো ছাঁটাই করতে পারতেন না। অথবা কে জানে, হয়তো—পারতেন!
সৈয়দ আশরাফ আলীর টাইম লাইনে শ্রেয়সী প্রায়ই ঢু মারে।
আশরাফ সাহেব ফেসবুকে অনিয়মিত। পরিবারের বিশেষ খবর বা ছবি পোস্ট করা ছাড়া ফেসবুকে আসেন না। যেমন—গত বছর পোস্ট করেছিলেন হজ পালনের ছবি। সৈয়দ আশরাফ আলী এবং বেগম সৈয়দা জেবুন্নেসা একসঙ্গে মক্কা গিয়েছিলেন হজ করতে।
তাঁদের যুগল ছবিটা দেখে শ্রেয়সী কত যে কেঁদেছিল!
কিছু দিন আগে আশরাফ সাহেব তাঁর একমাত্র ছেলে আনাফের একটি ছবি পোস্ট করেছেন। আনাফের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ছবি। আনাফ ক্যামব্রিজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলরের কাছ থেকে সাটিফিকেট নিচ্ছে—এমন একটা ছবি।
গাউন পরা ছোট ভাইটিকে দেখে শ্রেয়সী প্রথমে চিনতে পারে নি। কেননা আনাফ আর আগের মতো নেই। অনেক বদলে গিয়েছে। এখন তার বাবরিছাঁট চুল। লম্বা দাড়ি। হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। আনাফকে দেখেও তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
হজের পর আশরাফ আলীর দাড়ি রাখা বা আনাফের পরিবর্তিত ছবি দেখে নয়, তার কান্না আসে—বাবা বা ভাইয়ের কাছে যেতে না পারার কষ্টে। প্রিয়জনদেরকে কাছ থেকে দেখতে না পারার বেদনায়!
কী এক মর্মান্তিক জীবন যে বহন করে চলেছে শ্রেয়সী তা একমাত্র সে-ই জানে।


রংহীন, গন্ধহীন, স্বপ্নহীন সংসারের দৈন্যদশা দেখে শ্রেয়সী হতাশ, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।


শ্রেয়সী খুব করে চায় আসিফকে নিয়ে তাদের বাড়ি যেতে। তার মা-বাবার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াতে। শ্রেয়সীর বিশ্বাস, তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, প্রাণপণে ক্ষমা চাইলে নিশ্চয় তাঁরা ক্ষমা করবেন। কিন্তু আসিফ রাজি নয়!

আসিফ পার্টিতে যতটা অবদান রাখছে সংসারে যদি তার সিকিভাগও রাখত তাহলে কত সুখেরই না-হতে পারত তাদের দাম্পত্য জীবন!
বিয়ের পর তারা যে খুপরি বাসাটায় ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেছিল এখন পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হচ্ছে।
বড় বাড়িতে বড় হওয়া শ্রেয়সীর জন্য এ-রকম খুপরি বাসায় বসবাস করা সত্যিই কষ্টসাধ্য।
তাদের সংসার বড় হচ্ছে, খরচ বাড়ছে, যদিও উপার্জন বাড়ানোর প্রতি আসিফের কোনো চেষ্টা-তদবির নেই। বিয়ের আগে যেই সাব-এডিটরের চাকরি শুরু করেছিল সেখানেই পড়ে আছে। না-হয়েছে পদোন্নতি, না-বেড়েছে বেতন। অথচ তার সাথে অন্য যারা শুরু করেছিল, তাদের অনেকের বেতন হয়েছে প্রায় তার ডাবল। অথচ তার কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না।
শ্রেয়সীর কিছু করার নেই। ছোট্ট মেয়েটার সাথে তার পা দুটো যেন অদৃশ্য এক শেকলে বাঁধা। কোথাও যাওয়া তো দূরে থাক, মেয়েটাকে রেখে কোনোদিকে তাকানোরও ফুরসত নেই তার। মেয়েটা ছোট না-হলে হয়তো সে বলে-কয়ে তার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পুরনো চাকরিতে জয়েন করতে পারত।

এমন রংহীন, গন্ধহীন, স্বপ্নহীন সংসারের দৈন্যদশা দেখে শ্রেয়সী হতাশ, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।’]

চা নিয়ে আসে শিউলি।
সরোদকে মোবাইল টিপতে দেখে বলে, ‘ওমা! তুমি দেখি এখনো মেয়ের কাছেই বসে আছ? জামা-কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হবা না?’
বউয়ের কথায় যেন সম্বিত ফিরে পায় সরোদ। সঙ্গে সঙ্গে বাতেন বখতের গল্পটা বন্ধ করে শিউলির দিকে তাকায়।
চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিউলি।
সরোদ বাসায় ঢুকে খেয়াল করে নি, কিন্তু এখন খেয়াল করে দেখে, তার বউটা হালকা সেজেছে! ঠোঁটে হাওয়াই রঙের লিপস্টিক দিয়েছে। চোখে দিয়েছে কাজল। ব্যস! এটুকুতেই তার রূপের ছটা রীতিমতো হল্লা করছে।
স্ত্রীর দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে হঠাৎ সরোদের মনে পড়ে—আজ ৫ই অক্টোবর। তাদের পঞ্চম বিবাহবাষির্কী!

৪.
ট্রেসিং বের হয়েছে।
গল্পটা ছাপা হচ্ছে আগামীকাল।
সরোদের মনের মতো হয়েছে প্রচ্ছদটা।
একটি পুলের উপর দাঁড়িয়ে প্যান্ট-শার্ট পরা এক তরুণীর প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা নওজোয়ান। তরুণীটিও নওজোয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রচ্ছদে মেঘলা দিনের অবয়ব। ধূসর রঙের আধিক্য।
ধূসর রংটা দিতে বলেছিল সরোদ নিনাদ!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com

Latest posts by মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ (see all)