হোম গদ্য গল্প ইন্দিরা

ইন্দিরা

ইন্দিরা
972
0

আমার গ্রাম আর গ্রাম নাই, তার দেহে শহরের পোশাক আর হৃদয়ে এক জাদুরাজ্য; কখন কোথায় কী সব ঘটনা ঘটে যায় তার সন্ধান পাওয়া যায় না। এই যেমন ধরুন, জুম্মাওয়ালা বাড়ির কথাই। রিয়াজ উদ্দিনের মেয়ে জুলেখার পেট থেকে নাকি বাচ্চা বের করা হয়েছে একটা, কিন্তু তাজ্জব হওয়ার মতো ব্যাপার এই যে, কেউ বলে এটি মানুষের বাচ্চা, কেউবা বলে বিড়ালের বাচ্চা। গত সপ্তাহের কোনো এক সময়ে মাওনা চৌরাস্তার এক ক্লিনিকে কাজটা সম্পন্ন হয়েছে। ফজর আকন্দের মা নাকি নিজ চোখে দেখেছে, তবে চোখে ছানি পড়েছে বলে বিড়ালের বাচ্চা নাকি মানুষের বাচ্চা তা ঠাউর করতে পারে নাই।

কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন, এই জুলেখাকে দেখলে আমার মতো আপনারও হয়তো বমি আসতে পারে, অথবা আপনারও হয়তো ঘেন্না লাগতে পারে অথবা মায়াও হতে পারে, অথচ এই মেয়ের পেটেই নাকি বাচ্চা! এখনো যার বিয়ে হয় নাই অথবা হবার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে, সকাল সকাল যাকে দেখলে অনেকে ভাবে, ‘আহারে, সক্কাল সক্কাল কুফাটা লাইগা গেছে’, তার পেট থেকে বিড়ালের বাচ্চা বা মানুষের বাচ্চা বের করা সম্ভব কিনা সত্যিই এক গোলকধাঁধা।

১০ বছর পরে গ্রামে ফিরে নানান কথা শুনছি, এখন জুলেখার বিষয়টা নিয়ে ভাবছি, মানুষের কথা শুনছি, বোঝার চেষ্টা করছি, সেই সাথে নতুন নতুন গল্প শুনছি। এই গ্রামের পরতে পরতে কত হাসি, কত কান্না, কত গল্প-কাহিনি : কার ছেলে কার মেয়েকে নিয়ে ভেগে গেছে, জামাই বিদেশ যাবার পরে কে কয়টা নাগর রাখে, কার ক্ষেতে মোবাইলের টাওয়ার হয়েছে, জমির উপর দিয়ে গ্যাসলাইন যাবে বলে কে কে জমিতে সস্তা টিন আর তিন নম্বর ইট দিয়ে বাড়ি বানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা কামাই করেছে, কার কার জমিতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি হয়েছে, পরেরটা কার জমিতে হবে, মেম্বারি ভোটের সময় কারা কারা জাল ভোট দিয়েছে, পরের বার কে হবে মেম্বার, এইরকম অসংখ্য কথা পথে-ঘাটে দোকানের মোড়ের চোখে-মুখে-মগজে কৃমির মতো লেগে থাকে।


শত শত জিন ওই ইন্দিরার ভেতরে ঘুমে বিভোর ছিল, মুখ বন্ধ করে দেয়ার ফলে চাঁদতারাযুক্ত ওই পয়সার সাথে সাথে জিনেরাও আটকা পড়ে


অথচ কত আবেগ কত রোমান্স নিয়ে বাড়িতে আসলাম। ঘরে ফেরার পর থেকেই মনে হচ্ছে সেই পড়ার ঘর সেই পথ-ঘাট-মাঠ আমাকে ডাকে না আগের মতো; সেই দিঘি, খাল-বিল ও পতিত জমিগুলো যেন নিজেদের সাথে মন খুলে কথা বলে, কোলাকুলি করে না, চুমোচুমি করে না; তারা আগের মতো কাউকে ছুঁয়ে দেয় না, তাদের প্রাণ বেয়ে পড়ে না নির্মল সুর।

আমি চিন্তার নদীতে ডুবসাঁতার দিই, মাত্র ১০ বছরে কী এমন হলো! স্কুলে পড়ার সময় আমরা ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, রেকেট খেলে পার করে দিতাম, আর এখন দেখি সেই মাঠে ইয়া বড় বড় ঘাস, পাড়ার ছেলেরা দলবেঁধে বসে থাকে মোড়ে মোড়ে, হাতে তাদের স্মার্ট ফোন, তারা দল বেঁধে কিসব গেইমস খেলে, এইসব গেমস খেলতে দুই দিন পর পর ইন্টারনেটে ডাটা লাগে কাড়ি কাড়ি, গেইমসের ডলার শেষ হয়ে গেলে নাকি একজন আরেকজনকে ধার দেয়। এইসব ছেলেদের কাছে আমি তো নস্যি, আমি কিসব গল্প কবিতা উপন্যাস নিয়ে পড়ে আছি, কিসব হাবিজাবি লেখার চেষ্টা করছি, এখানে হুদাহুদিই লাইব্রেরি করার চেষ্টা করছি।

আমার কাছে জাদুর মতো মনে হচ্ছে সব! এই কয় বছরের ব্যবধানে কত পরিবর্তন হতে পারে বা হয়েছে তা বুঝতে আপনাকে গ্রামে যেতে হবে, এই গল্প শুনে বা পড়ে বোঝা যাবে না হয়তো, কী সব কাণ্ড যে ঘটে যাচ্ছে গ্রামে গ্রামে! এই বছর, মানে ২০১৭ সালের পরীক্ষার রেজাল্টের কথাই ধরুন। যখন সারা বাংলাদেশে কয়েক হাজার জিপিএ ৫ পেয়েছিল তখন আমাদের স্কুল থেকে আমরা ২ জন পেয়েছিলাম, আমাদের নাম জাতীয় পত্রিকায় এসেছিল, আমাদেরকে দেখার জন্য মানুষ ভিড় করেছিল, আর এই প্রযুুক্তির যুগে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের যুগে সারা বাংলাদেশে লক্ষাধিক জিপিএ ৫ পেলেও আমার স্কুলের সর্বোচ্চ রেজাল্ট হলো ৪.৮৬।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার বুঝতে পারছি, এখন আর টাকার অভাব হচ্ছে না, প্রত্যেক ঘর থেকে ২/৩ জন বিদেশে আছে, তা খুব ভালো কথা, কিন্তু কী যেন হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। আমার মতো আপনারাও জেনে অবাক হবেন, আমাদের বাড়ির উত্তরপাশে ধানের দুই ফসলের যে জমিগুলো ছিল তা এবারও পতিত, সেখানে হাঁটু সমান ঘাস, আমি বিস্ময়ে বড় আপাকে জিগ্যেস করি ‘এইগুলাতে ধান লাগানোর সময় হয় নাই?’ আপা জানায়, ‘সময় শেষ কবেই, এবারও কেউ ধান লাগায় নাই’, আমি কারণ জানতে চাইলে আপা বলে সেচের ব্যবস্থা ভালো না, কামলা পাওয়া যায় না। মোট কথা সেচ, কামলা, সার, বীজ, মাড়ানো সব মিলিয়ে যে টাকা খরচ হয় তাতে নাকি তাদের পোষায় না।

জুলেখার গল্প বলতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি বোধহয়, থাক সেসব বিষয়, যে বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল সে বিষয়েই ফিরে যাই। আমার কায়দা পড়ার সহপাঠিনীর পেট থেকে বিড়ালের বাচ্চা বা মানুষের বাচ্চা বের করার বিষয়টি আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। অবশ্য তার কথা ভুলতে পারি নি বিদেশে বসেও। আপনারা হয়তো জানেন না, এই মেয়েটা বামন, তার উচ্চতা ৪ ফিটের বেশি হবে না, নিচের ঠোঁট যেন ঝুলে পড়ে যাবে, বড় বড় লাল দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা লেগে থাকে, মুখ দিয়ে লালা পড়ে, দুর্গন্ধ বের হয়। ঈশ্বর ওকে সৃষ্টি করার সময় যেন অন্যমনস্ক  ছিলেন, তাই কত দিক দিয়েই অপূর্ণ রয়ে গেল ও।

সেই সময় কায়দা পড়ার দিনগুলোতে আমার সাথে ওর কথা হতো না, আসলে কারো সাথেই ওর কথা হতো না হয়তো, ওর ঠোঁট, দাঁত আর ঝুলন্ত লালার দিকে যে একবার তাকাবে সে যদি দেবতা না হয় তবে তার পক্ষে ঠিক থাকা সম্ভবপর নয়। তাই হয়তো কায়দা পড়া শেষ করতে পারে নি ও, অথবা আমাদের ছে ছে ভাব দেখে কোন দিন যে কায়দা পাঠের পাঠ চুকে গেছে কে খবর রাখে!

আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, গ্রামে প্রচলিত আছে যে, ওর বয়স নাকি বাড়েও না কমেও না। তবে একটা খুব ভাবায়, ওর বাবা কিন্তু প্রচণ্ড ভালোবাসে ওকে। একটা পাকা আমে বাবা মেয়েকে একসাথে কামড় দিতে পর্যন্ত দেখেছি। বাবার কাছে এই মেয়েই নাকি বানেছা পরী অথবা সখিনা বিবি। অবশ্য ওর বাবা অত্যন্ত শান্ত ও নামাজি মানুষ, মেয়ের এইরকম অবস্থার জন্য নাকি নিজেকেই দায়ী করে সে, সে নাকি বলে তার নিজের অথবা পূর্বপুরুষের কোনো এক পাপের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ্ তার মেয়েকে এমন করে বানিয়েছেন।

আমার মাথায় অন্য কিছুই নাই, শুধুই ও, ওর ব্যাপারে মানুষের মনস্তত্ত্বটাও বোঝার চেষ্টা করছি। কখনোবা ভাবি, হয়তো এই ঘটনা নিয়ে গল্পটল্প কিছু একটা লেখা যেতে পারে, দেশে থাকার সময় মাকে নিয়ে লেখা গল্প ছাপা হয়েছিল নামকরা এক লিটলম্যাগে। তবে গল্প না হোক অন্তত গ্রামের মানুষের মনস্তত্ত্ব বা তাদের পরিবর্তন বা জুলেখার ব্যাপারটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদিও মানুষকে কিছুই জিগ্যেস করছি না, শুধু অবজারবেশন করে এইটুকু জানতে পারি, একদিন বাতির আজানের পরে কালি আন্ধারের সময় গর্ভবতী বিড়াল নিয়ে ইন্দিরার মুখ থেকে পড়ে গিয়েছিল জুলেখা। কায়দা পড়ার সময়েও দেখেছি, বিড়ালই ওর একমাত্র সঙ্গী বা অবলম্বন, এত বছর পরেও ওর সঙ্গীর পরিবর্তন হয় নাই, এখনো কোলে বিড়াল নিয়ে ইন্দিরার উপর বসে থাকে আর বিড়ালের চোখে মুখে চুমো খায়, বিড়াল ওর গাল চেটে দেয়, ওরা যেন যুগলবন্দি।

অথচ এই ইন্দিরার মুখ বন্ধ করে দেয়ার পরে নাকি আশপাশ দিয়ে মানুষ যেতে ভয় পেত একসময়। ইট-পাথর সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করা মুখে শেওলা পড়েছিল একদিন, কতদিন যাবৎ এখানে কারো স্পর্শ লাগে নাই কে জানে। কিন্তু সেই নিষিদ্ধ ইন্দিরার মুখটাই যেন ওর শান্তির জায়গা, বিড়ালের সাথে বসে থাকার শুয়ে থাকার প্রধান আশ্রয়। প্রথম প্রথম ওর বাবা-মা বাঁধা দিত, বিড়ালটাকে গোলাঘাট বাজারে পর্যন্ত ছেড়েও দিয়ে আসছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই, তাই একটা সময় তারাও মেনে নিয়েছে।

আপনাদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, এই ইন্দিরার মুখবন্ধ কেন? মুখবন্ধ করার ইন্দিরার গল্প বেশ পুরনো, কিন্তু এখনো বেশ প্রচলিত ও দুর্দান্ত জনপ্রিয়, এই ইন্দিরার ভেতরে নাকি কয়েক শত জিনকে আটকে রাখা হয়েছে, মুরুব্বিদের মুখে এই কথা শুনে আসছি, তাই এই ইন্দিরা থেকে দূরে থাকতে চায় অনেকে, কিন্তু যে যাই বলুক না কেন কোনো কিছু বোঝার বা ভয় পাবার বুদ্ধি বা বিবেচনা জুলেখার নাই, ও বিড়াল নিয়ে ইন্দিরার মুখে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে, হাউমাউ করে, হাসে, কখনো-বা ঘুমিয়ে পড়ে।

গ্রামে ফিরে জানতে পারি বিড়াল ও ইন্দিরার সাথে জুলেখার এই প্রেম এখনো আছে, এখনো বিড়ালের সাথে একই প্লেটে ভাত খায়; এখনো বিড়াল নিয়ে ঘুমুতে যায়; এত বছর পরেও এই অভ্যাস একটুও কমে নাই।

জুলেখা বিবি, বিড়ালের বাচ্চা ও ইন্দিরা নিয়ে নতুন কোন ক্লু পাবার জন্য আমার ডিটেকটিভ মন জেগে ওঠে। আমি যেন শার্লক হোমস হয়ে যাচ্ছি। অন্যরকম রোমান্স ফিল করছি। তবে কিছুদিনের মধ্যে এই আলোচনার পরিবর্তে আরেকটা ভয়ংকর কথা শুনি। জুলেখার ইন্দিরাতে নাকি সোনার মোহরভর্তি সাতটা কলসি আছে; এই কারণেই নাকি ইন্দিরা-মুখ ইট সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করা আছে, আসলে জিন-টিন কিচ্ছু না, সবই জুলেখার বাপ-দাদাদের বানানো গল্প।

এতদিন পরে গ্রামে ফিরেছি, সবকিছুতেই বাড়তি টান অনুভব করছি। সড়কের পাড়ে বসে, চায়ের দোকানে বসে প্রতিবেশীদের কথা শুনি, আমি তাদের বলি, ‘আরে বাদ দেন, এইগুলা কুসংস্কার, কলসির ভিতরে আবার মোহর থাকে ক্যামনে?’ তবে আমার এক মন বলে, হলে হতেও পারে, থাকলে থাকতেও পারে। কারণ, এই ইন্দিরা বন্ধ করে দেবার পিছনের কারণ অত্যন্ত রহস্যময়। আপনারা ইচ্ছে করলে আমার দাদার কাছ থেকে শোনা সেই কাহিনিটা শুনতে পারেন। চলুন শুনি :

একদিন জুম্মাওয়ালা বাড়ির কফিল উদ্দিনের গরু হারায়া যায়; সে গরু খুঁজতে যায় মোড়লদের জঙ্গলে; জঙ্গলে ঢোকার পরে সে দেখতে পায় একটা মানুষ; লম্বা নাক, মুখে দাড়ি। বাঁশ পাতা খাইতাছে; এই দৃশ্য দেইখা কফিল উদ্দিন উল্টা দিকে দৌড় দিলে কয়েকটা বাঁশ তাকে কোলে কইরা মানুষটার সামনে রাখে; সে ডরে তাকায় না, থরথর কইরা কাঁপে; তখন মানুষটা কয় : ডরাইস না; এই নে; খা : এই কথা কইয়া বাঁশ পাতা সাধে তাকে; কিন্তু কফিল এই ন্যাংটা মানুষের দেয়া বাঁশপাতা খায় না; তখন মানুষটা তার চোখ রক্তের মতন লাল কইরা কয় : এই নে, খা : এই কথা কইয়া মুখ থেকে এক দলা কফ হাতের তালুতে দ্যায়; এইবার কফিলের বমি আসে এবং একটা ঝারা দিয়া হাতের তালু থেইকা কফ ফেলে দ্যায় মাটিতে; এতে মানুষটা আরো চটে যায়; জোর কইরা হাতের তালুতে একটা কিছু দিয়া কয় : যা; বাড়ি যা; এইটা বাড়িতে গিয়া দেখবি : তারপরে কফিল উদ্দিন এক দৌড়ে বাড়িতে গিয়া বাপেরে ডাকে; বাপেরে ঘরে নিয়া এইটা দ্যাখায়; তারা দ্যাখে এইটা একটা পয়সা; ঠিক কোন দেশের তা বোঝা যায় না; তবে সেই পয়সাতে চাঁদ ও তারার ছবি আছে; আস্তে আস্তে সেই পয়সা থেইকা চান্দের মতন আলো বাইর হইতে থাকে; তাদের আন্ধার ঘর ফরসা হইয়া যায়; তখন কফিলের বাপ এই পয়সাটাকে একটা পিতলের লোটার মইধ্যে ভইরা ছালা দিয়া মুখ বাইন্ধা ঘরের টুইয়ের সাথে লটকাইয়া রাখে; এই ছালা উপচায়া আলো বাইর হইতে থাকে; পরের দিন থেইকা শুরু হয় কফিলের জ্বর; সাত দিন হইয়া গ্যালেও জ্বর ভালো হওয়ার কোনো নাম নাই, তখন কফিল তার বাপেরে কয় : বাজি আমি একটা খোয়াব দ্যাখছি; খোয়াবে ওই ন্যাংটা পাগলারে দ্যাখলাম; আমারে কইল এই পয়সাটা আমগর ইন্দিরাতে ফালায়া দিয়া ইন্দিরাটা ভইরা ফেলতে : এই কথা শোনার পর কফিলের বাপে ঘরের টুই থেইকা লোটাটা পাইরা ইন্দিরাতে পয়সাটা ফালায়; ফালানোর সাথে সাথে ইন্দিরাটা ফলক হইয়া যায়; রাইতের আন্ধারে ইটপাথর সিমেন্ট দিয়া ইন্দিরার মুখটা বন্ধ কইরা দেওয়া হয়; পরের দিন কফিল উদ্দিন সুস্থ হইয়া ওঠে।

আমরা ছোটবেলা থেকে এই গল্প শুনে আসছি। শুনে আসছি যে, সেই সময় শত শত জিন ওই ইন্দিরার ভেতরে ঘুমে বিভোর ছিল, মুখ বন্ধ করে দেয়ার ফলে চাঁদতারাযুক্ত ওই পয়সার সাথে সাথে জিনেরাও আটকা পড়ে, তাই শনি-মঙ্গলের নিশুতি রাতে ইন্দিরার ভেতরে জিনেরা বুকফাটা আর্তনাদ করে বলে, ‘ওঁ আঁদঁমঁ সঁন্তাঁনঁ রেঁ, মুঁক্তিঁ দেঁ, মুঁক্তিঁ দেঁ, দঁমঁ বঁন্ধঁ হঁয়েঁ গেঁলোঁরেঁ, মঁরেঁ গেঁলাঁমঁ রেঁ।’ ওদের আর্তনাদ শোনার কথা শুনেছি অনেক, কিন্তু নতুন করে শুনছি মোহরভর্তি কলসির কথা। তাও আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, এই পর্যায়ে এসে আমি থতমত খেয়ে যাই, কিন্তু পরের খবর শুনে গলাছেঁড়া বিষম খেলাম, জুলেখা ও ওর বিড়ালের কী জানি হয়েছে, ইন্দিরা থেকে পড়ে যাবার পর থেকে ওরা নাকি ফ্যাঁকাসে হয়ে যাচ্ছে, জিন নাকি পিশাচের সর্দার আজর নাকি রক্ত শুষে নিচ্ছে অথবা কী এক কঠিন অসুখে পড়েছে ওরা! উড়াকথা থেকে এতটুকু জানি যে, জুলেখা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না, বিড়ালটাও ওর পাশে শুয়ে আছে, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিছে ও; হ্যাইত, হ্যাইত করে তাড়িয়ে দিলে ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে একবার শুধু বলে ‘মিউ’, যা অর্ধেক গলার ভেতরেই রয়ে যায়।

আমার ডিটেকটিভ মন এবার আরো সক্রিয় হতে চায়। যে ইন্দিরাকে মানুষ এত ভয় পায়, যে ইন্দিরার পাশ দিয়ে গরুছাগল পর্যন্ত যেতে চায় না, এমনকি জুলেখা এই ইন্দিরার মুখে বসে থাকে বলে ওকেও কেউ কেউ ভয় পায়। সেই ইন্দিরা নিয়ে হঠাৎ করে এমন কথা উঠার কারণ কী? তবে যতটুকু জানতে পেরেছি তার মূলকথা হলো, রিয়াজ উদ্দিনের বাবা মারা যাবার পরে বাঁশের চোঙার ভেতরে ছেঁড়া ও ময়লা কাগজ পাওয়া গেছে একটা, সেখান থেকে জানা যায় যে, দেশভাগের সময় কালী নারায়ণ যখন দেশ ছেড়ে চলে যায় তখন তার কাছ থেকে জোর করে সাত কলসি সোনার মহর রেখে দিয়েছিল সে। সেই সময় মানুষের ভয়ে সরকারের ভয়ে কলসির মোহর খরচ করতে না পেরে শেষমেশ ইন্দিরাতে ফেলে দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল পরে সুযোগ বুঝে উঠিয়ে নিবে, কিন্তু সেই সুযোগ আর আসে নাই।

আমার কাছে মনে হয়, এটা একটা কারণ হতে পারে। দেশভাগের সময় অনেক হিন্দু পরিবার তাদের সর্বস্ব হারিয়েছে, মোহরভর্তি কলসি হয়তো নয়, দামি পাথর, সোনা-রূপা হতে পারে। কিন্তু এই যুক্তিও তেমন জোরাল হচ্ছে না। দামি পাথর, সোনা-রুপা লুকিয়ে রাখতে ইন্দিরার ভেতরে ফেলে দেয়ার মতো বোকা হলে এত সম্পদ করতে পারত না লোকটা। তবে এইসব নিয়ে যেসব কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে তাতে আমাকে উদ্বিগ্ন দেখালেও কোনো এক অনির্ণেয় কারণে এক ধরনের মজা পাচ্ছি বা আমাকে ধরে রাখতে পারছে ব্যাপারটা।


আমি আমার ভেতর থেকে বের হয়ে আসছি যেন, যেন আমার আত্মা বারবার মাথার খুলির ভেতরে চলে যাচ্ছে


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোহরভর্তি কলসির খবর আগেই প্রচার পেয়েছে, এ নিয়ে হইচইও কম হয় নাই। কিন্তু আজ কে বা কারা ইন্দিরার ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে লিখেছে ‘এই ইন্দিরার ভেতরে সোনার মোহরভর্তি কলসি আছে সাতটা’। কয়েকদিনের মধ্যে এই পোস্ট ভাইরাল হয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। খুব সঙ্গত কারণে, রাষ্ট্রের নজরে আসে খবরটা, তাই খুব দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনের লোক আসে। সত্যিই যদি এখানে কোনো মূল্যবান পাথর বা কোনো কিছু থেকে থাকে তবে আইন অনুযায়ী তা রাষ্ট্রের সম্পত্তি।

প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উদ্ধার কাজ শুরু হয়। ১৯০ বছরের পুরানা ইন্দিরার ঢাকনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইন্দিরার তলার মাটি পর্যন্ত তুলে আনা হবে। কিছুক্ষণ খোড়ার পরেই উদ্ধারকর্মীরা কিছু একটা পেয়ে যায় যেন। সবার মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে, যাকে বলে দমবন্ধ উত্তেজনা। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে প্রথমেই তুলে আনা হয় অর্ধগলিত বিড়ালের বাচ্চা। ওর চোখে-মুখে থকথকে রক্ত, বমিফাটা গন্ধ আর গন্ধ, এই দৃশ্য দেখতে মানুষের মাথা মানুষ খেয়ে ফেলবে যেন, তারপরও এক এক করে ৪৭টি বাচ্চা বের করে আনা হয়, দেখে মনে হয় এক সপ্তাহ আগে বিড়ালের পেট কেটে বের করা হয়েছে এদের।

আমি আর ভাবতে পারছি না, জুলেখা ও তার বিড়ালের কথা মনে পড়ছে। আপনাদেরও কী মনে পড়ছে? প্যারাসাইকোলজি নিয়ে গল্প-উপন্যাস পড়েছি, কিন্তু বাস্তবে এইরকম ঘটনা কল্পনাও করতে পারি না। দায়িত্বরত প্রশাসনিক কর্মচারীরা এইরকম দৃশ্য দেখার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। উদ্ধারকর্মীদের চোখমুখও চনমনিয়ে ওঠে, উত্তেজিত মানুষের কারো কারো চোখে-মুখে ভয় ও উৎকণ্ঠা দেখা যায়। তারপরও উদ্ধার কাজ চলে, যেন বাস্তব নয়, যেন কোনো এক স্বপ্নে বা ঘোরের মধ্যে কিছু মানুষ হাতড়ে বেড়াচ্ছে, তারপরের ঘটনা আরো বিব্রতকর ও আরো লোমহর্ষক। উদ্ধারকর্মীরা ইন্দিরার ভেতর থেকে মাথার খুলি বের করে নিয়ে আসে একটা, সেটি জিন বা বিড়ালের নয়, মানুষের মাথার খুলি। তা থেকে বের হচ্ছে অদ্ভুত এক গন্ধ, কেউ কেউ বমি করে দিয়েছে বা দিচ্ছে, কেউ-বা ওয়াক ওয়াক শব্দ করে বা ভয়ে দূরে সরে গেছে, তারপরও মাথার খুলি উদ্ধারের নেশা ছাড়ে না তাদের, চলে দুর্দান্ত গতিতে, শেষে ১১৮ টি মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।

এই সময় জুম্মাওয়ালা বাড়ি থেকে বিলাপের আওয়াজ আসে, কারবালার প্রান্তর যেন, যেন আসমান জমিন হাহাকার করছে, কে যেন চিৎকার করে বলছে, ‘জুলেখা মইরা গেছে’। ওর বাবা লেছুর দিয়ে আগায়, যেন তার বাড়ি কোনো এক গুহার ভেতরে, তখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষ ছুটাছুটি করে।

আমি আমার ভেতর থেকে বের হয়ে আসছি যেন, যেন আমার আত্মা বারবার মাথার খুলির ভেতরে চলে যাচ্ছে, অথবা আমার মনে হচ্ছে অর্ধগলিত বিড়ালের বাচ্চার শরীরে আমার রক্ত লেগে যাচ্ছে, তারপরও জুলেখার লাশ দেখে যাচ্ছি, পাশেই পড়ে থাকা বিড়ালের মৃতদেহ দেখে আবারো মাথার মধ্যে কী যেন উঠে, মনে হয় ওটা বিড়াল নয়, আমিই মরে পড়ে আছি, কে যেন একটা দড়ি এনে বিড়ালের গলায় ফাঁস লাগিয়ে টেনে নিয়ে যায়, আমার মনে হচ্ছে আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আমি আর পারছি না টিকে থাকতে, ফট করে বুঝি দড়িটা আলগা হয়ে যাবে, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, ইচ্ছে করছে সত্যি সত্যি ঝুলে পড়ি কুলগাছের ডালে, তারপরের অনেক কিছুই মনে নাই আমার।

হঠাৎ একদিন ব্রেকিং নিউজ থেকে জানতে পারি, শ্রীপুরের বালিয়াপাড়া গ্রামের ইদারা থেকে উদ্ধারকৃত মাথার খুলিগুলোর মধ্যে ৪৭ টির বয়স ৭০ বছর ও ৭১ টির বয়স ৪৬ বছর।

তবে উদ্ধারকৃত বিড়ালের বাচ্চাগুলো সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নি।

মেহেদী ধ্রুব

কথাসাহিত্যিক। জন্ম ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯; বালিয়াপাড়া, শ্রীপুর, গাজীপুর, ঢাকা।

শিক্ষা : বিএ (অনার্স), এমএ (বাংলা), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

পেশা : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সিলেট ক্যাডেট কলেজ। ৩৬তম বিসিএস থেকে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।

ইমেইল : mhdhruboknu1989@gmail.com

Latest posts by মেহেদী ধ্রুব (see all)